Golpo কষ্টের গল্প রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র

রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৩২


রোদ্দুরেরছেঁড়ামানচিত্র

পর্ব_৩২

নিলুফানাজমিননীলা

★★★
আদনান নিজের ব্রিফকেসে প্রয়োজনীয় কাপড়-চোপড় গুলো খুব মন দিয়ে গুছাচ্ছিল। ঠিক সেই সময় দরজার কাছে কারও পায়ের শব্দ পেয়ে সে পেছন ফিরল। নৌশিকে সেখানে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আদনান কিছুটা অবাক হলো বটে, তবে মুখে সেটা প্রকাশ করল না। কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে সে আবারও কাপড় গোছানোতে মনোযোগ দিল। নৌশি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধীর পায়ে ভেতরে এগিয়ে এল। তারপর সোজা বিছানায় উঠে পা তুলে বসল। এটা নৌশির ছোটবেলার অভ্যাস পা তুলে আরাম করে বসা ছাড়া মেয়েটা যেন ঠিকমতো স্বস্তি পায় না।

​আদনান আলমারি থেকে কাপড় বের করতে করতে আড়চোখে একবার নৌশিকে দেখল। কিন্তু তার মুখ থেকে কোনো কথা বেরোল না। রুমের ভেতর এক থমথমে নীরবতা। নৌশি কিছুক্ষণ ওভাবে বসে থেকে সহসা বলে উঠল,
“সত্যিই চলে যাবি?”

​আদনান কোনো উত্তর দিল না। সে এখন আলমারির গভীর থেকে তার পছন্দের শার্টগুলো বের করতে ব্যস্ত। নৌশি এবার একটু বিরক্ত হয়ে আবারও বলল,
“কী হলো, কথা বলতে পারিস না নাকি?”

​আদনান এবার হাতের কাজ থামাল। কিন্তু নৌশির দিকে না ফিরেই খুব নিস্পৃহ গলায় বলল,
“কী বলব?”

​নৌশি কিছুক্ষণ চুপ থেকে অভিমানী সুরে প্রশ্ন করল,
“হোস্টেলে চলে যাবি ঠিক আছে, কিন্তু আমার সাথে ঝগড়া না করে থাকতে পারবি তো? ঝগড়া করার মানুষ তো ওখানে পাবি না।”

​আদনান এবার নৌশির দিকে না তাকিয়েই ব্যাগটা চেইন আটকাতে আটকাতে বলল,
“কেন পারব না? মানুষ চাইলে সব পারে। আর ঝগড়া করার অভ্যাসটা না হয় ওখানেই বদলে ফেলব।”

নৌশি কেবল হাসলো। সেই হাসিতে আনন্দ ছিল না বরং একরাশ হতাশা মাখা ছিল, যা দেখে যে কেউ বিভ্রান্ত হতে পারে। নৌশি আবারও নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
“থেকে গেলে হয় না? কথা দিচ্ছি আর কখনো…”

​কথাটা শেষ করতে পারল না নৌশি, গলার কাছে কী যেন একটা দলা পাকিয়ে আটকে গেল। সে ভেতর ভেতর শুকনো ঢোক গিলল। নৌশির কথা মাঝপথে থেমে যাওয়ায় আদনান কিছুটা অবাক হয়ে তাকাল। দেখল, নৌশি মাথা নিচু করে নিজের এক আঙুল দিয়ে অন্য আঙুল খুটছে। আদনান জানে, ছোটবেলা থেকেই নৌশি যখন কান্না চেপে রাখার চেষ্টা করে, তখন সে ঠিক এভাবেই আঙুল খুটে। আদনানের মনে এক তীব্র খটকা জাগল নৌশি কি তবে কাঁদছে?

​আদনান এগিয়ে গিয়ে নরম স্বরে ডাকল,
“কী যেন বলতে চাইলি? থেমে গেলি কেন?”

​কিন্তু নৌশি মাথা তুলল না। তার টলটলে চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়া জল তখন বিছানার চাদরে পড়ছে। আদনান খুব ভালো করেই জানে, নৌশির চোখের জল তার জন্য সবথেকে বড় দুর্বলতা। সে নৌশির একদম কাছে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর খুব আলতো করে থুতনিতে হাত দিয়ে নৌশির মাথাটা উপরে তুলল। দেখল, মেয়েটার ছোট মায়াবী মুখখানা চাপা কান্নায় টকটকে লাল হয়ে উঠেছে। ও অবিকল ছোট বাচ্চাদের মতো ঠোঁট উল্টিয়ে কাঁদছে।
​কান্নারত সেই অদ্ভুত কিউট মুখখানা দেখে আদনানের কেমন যেন হাসি পেয়ে গেল। সে নিজেকে ধরে রাখতে না পেরে হো হো করে হেসে উঠল। নৌশি এবার রাগে আর অভিমানে ফেটে পড়ল। সে বাচ্চাদের মতোই ডুকরে শব্দ করে কেঁদে উঠে বলল,
“তুই খুব পচা!”

​আদনান এবার হাসি থামিয়ে একটু ধমকের সুরে কিন্তু ভীষণ আদুরে গলায় বলল,
“এই নাদানের বাচ্চা! এত কাঁদছিস কেন? পিটানি খাবি?”

​নৌশির কান্না থামছিল না দেখে আদনান এবার হার মানল। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“আচ্ছা বাবা ঠিক আছে, আমি কোথাও যাচ্ছি না। একদম কোথাও না। এবার ঠিক আছে তো?”

​নৌশি সাথে সাথে ভিজে চোখে মাথা তুলে তাকাল। ফোঁপাতে ফোঁপাতে জিজ্ঞেস করল,
“সত্যি বলছিস?”

​আদনান হাসল,
“হুম সত্যি। চলে গেলে তোর মতো পাগলিটার সাথে ঝগড়া করব কীভাবে?”

​কান্নাভেজা চোখে এবার নৌশির মুখে এক চিলতে হাসি ফুটল। আদনানও হাসল। কিন্তু তাদের এই মুহূর্তের শান্তি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। হঠাৎ নিচতলা থেকে এক ভয়াবহ কান্নার আর চেঁচামেচির আওয়াজ তাদের কানে এল। দুজনেই চমকে উঠে দৌড়ে নিচে গেল।
​ড্রয়িংরুমে গিয়ে তারা যা দেখল, তাতে তাদের রক্ত হিম হয়ে গেল। দেখল ফারহানা বেগম পাগলের মতো চিৎকার করে মাটিতে লুটিয়ে কাঁদছেন। বাড়ির সবাই স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মাত্রই হাসপাতাল থেকে একটা ফোন কল এসেছে, যেখানে জানানো হয়েছে বাস স্টেশনে নুসরাতের ওপর ভয়াবহ এসিড হামলা হয়েছে।
★★★
হাসপাতালের করিডোরে হাজারো মানুষের ভিড়, কিন্তু নির্জনের পৃথিবীটা যেন ইমারজেন্সি রুমের ওই ছোট দরজায় এসে থমকে গেছে। সে চাতক পাখির মতো দরজার কাঁচের অংশটা দিয়ে ভেতরে তাকিয়ে আছে। তার চোখ বেয়ে অবাধ্য লোনা জল গড়িয়ে পড়ছে, যা সে কোনোভাবেই আটকাতে পারছে না। ভেতরে তার কলিজার টুকরো, তার প্রাণভোমরা মেয়েটা অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করছে।
​ইমারজেন্সির ভেতরে নার্সরা দ্রুত হাতে নুসরাতের মুখে আর গলায় পানি ঢালছে দহন কমাতে। কিন্তু নুসরাত কোনোভাবেই স্থির হতে পারছে না। আগুনের মতো জ্বলতে থাকা সেই ক্ষতস্থানে সে বারবার হাত দিতে চাইছে, নখ দিয়ে ছিঁড়ে ফেলতে চাইছে সেই অসহ্য যন্ত্রণা। কিন্তু এখন হাত দিলে পুড়ে যাওয়া ত্বকের আরও ক্ষতি হবে, তাই কয়েকজন নার্স মিলে নুসরাতের হাত দুটো শক্ত করে চেপে ধরে রেখেছে। নুসরাতের সেই ক্ষীণ কিন্তু বুকফাটা আর্তচিৎকার নির্জনের কানে তপ্ত সিসার মতো বিঁধছে। সে বারবার দরজায় ধাক্কা দিয়ে বলছে,
​“আমাকে প্লিজ ভেতরে যেতে দিন! ও একা ভয় পাচ্ছে, আমাকে যেতে দিন!”

​কিন্তু কর্তব্যরত নার্সরা তাকে ভেতরে ঢুকতে দিচ্ছিল না। নির্জন বারবার নিজেকে ডাক্তার পরিচয় দিলেও এই হাসপাতালের সবাই তাকে চেনে না। ঠিক তখনই পেছন থেকে এক প্রবীণ ডাক্তার বলে উঠলেন,
“আরে, ডাক্তার নির্জন ইমতিয়াজ! আপনি এখানে? এই অবস্থায় কেন?”

​নির্জন অশ্রুসজল চোখে পেছনে তাকিয়ে দেখল। লোকটিকে সে ব্যক্তিগতভাবে না চিনলেও, তিনি হয়তো তাকে চেনেন। নির্জন কান্নায় ভেঙে পড়ে বলল,
“ভেতরে যে পেশেন্ট আছে সে আমার কলিজার টুকরো, আমার খুব কাছের মানুষ। কিন্তু আমাকে ভেতরে যেতে দিচ্ছে না ওরা। প্লিজ কিছু করুন!”

​ডাক্তার সাহেব পরিস্থিতি বুঝে গম্ভীর গলায় বললেন, “আসুন আমার সাথে।”

​নির্জন এবার ঝড়ের বেগে ভেতরে ঢুকল। দেখল নুসরাতের বুকের ওড়নাটা নেই, যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে সেটা কখন মেঝের ধুলোয় পড়ে গেছে তার খেয়াল নেই। নির্জন এক মুহূর্ত দেরি না করে নুসরাতের একটি হাত নিজের শক্ত মুঠোর ভেতর নিয়ে নিল। নির্জনের স্পর্শ পেতেই নুসরাত কাঁপা কাঁপা চোখে ঝাপসা দৃষ্টিতে তাকাল। মেয়েটার সুন্দর মায়াবী মুখের বাম দিকের অনেকটা অংশ আর গলার নরম চামড়া পুড়ে লাল বর্ণ ধারণ করেছে, সেই লাল রঙ যেন মৃত্যুর চেয়েও ভয়ঙ্কর।
​নুসরাত অস্ফুট স্বরে ‘নির্জন’ নামটা উচ্চারণ করেই ডুকরে কেঁদে উঠল।
নার্স দ্রুত হাতে নুসরাতের শিরায় একটা কড়া সেডেটিভ ইনজেকশন পুশ করে দিল। কয়েক মিনিটের মাঝেই নুসরাতের সেই ছটফটানি থেমে এল, শরীরটা শিথিল হয়ে পড়ল। মেয়েটা গভীর অচেতনের রাজ্যে তলিয়ে গেল। নির্জন যেন দিশেহারা হয়ে পড়েছে, সে কর্তব্যরত ডাক্তারের দুই হাত জাপটে ধরে মিনতি করতে লাগল,
​“প্লিজ ডাক্তার, কিছু একটা করুন। আমার নুসরাত খুব কষ্ট পাচ্ছে। ওর মুখটা পুড়ে যাচ্ছে। দেখুন না, ও কীভাবে অসহায়ের মতো ছটফট করছিল! দোহাই আপনার, ওকে বাঁচান।”

​ডাক্তার নির্জনের কাঁধে হাত রেখে আশ্বস্ত করে বললেন,
“শান্ত হোন ডক্টর নির্জন। আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। এখন আমাদের কাজ করতে দিন।”

​চিকিৎসার স্বার্থে ডাক্তাররা এবার নির্জনকে ইমারজেন্সি রুম থেকে বাইরে বের করে দিলেন। নির্জন টলমল পায়ে বাইরে আসতেই দেখল, মির্জা বাড়ির প্রায় সবাই হাসপাতালে পৌঁছে গেছে। আহাদ মির্জা, এমদাদুল মির্জা আর আরিয়ান সবার চোখেমুখে চরম আতঙ্ক। আরিয়ান ডাক্তারকে দেখেই উৎকণ্ঠা নিয়ে এগিয়ে গিয়ে প্রশ্ন করল,
“ডাক্তার, নুসরাতের কী অবস্থা? ওর কী হয়েছে আসলে?”

​ডাক্তার আরিয়ানকে ঘটনার ভয়াবহতা আর নুসরাতের বর্তমান অবস্থার কথা সব খুলে বললেন। নুসরাতের ওপর এসিড হামলার কথা শুনে উপস্থিত সবার পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে গেল। ফারহানা বেগম ওদিকে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন।
​নির্জন তখন দরজার একপাশে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে। এতক্ষণ মির্জা বাড়ির কেউ নির্জনকে ওভাবে খেয়াল করেনি। বেশ অনেকক্ষণ পর ভেতর থেকে প্রধান ডাক্তার বেরিয়ে আসলেন। মির্জা বাড়ির কেউ কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই নির্জন ভগ্ন গলায় চিৎকার করে বলে উঠল,
“নু… নুসরাতের কী অবস্থা ডাক্তার? ও কি এখন ঠিক আছে?”

​এবার সবার নজর গিয়ে স্থির হলো নির্জনের ওপর। সবার মনে একই প্রশ্ন এই ছেলেটা কে? আর নুসরাতের জন্য সে কেনই বা এতটা অস্থির? কিন্তু এই বিপদের মুহূর্তে কেউ তাকে প্রশ্ন করার ভাষা খুঁজে পেল না। ডাক্তার গম্ভীর মুখে বললেন,
“আমরা ক্ষতস্থান মেডিসিন দিয়ে পরিষ্কার করেছি। কিন্তু এসিডের তীব্রতা বেশ ছিল, তাই এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। পরবর্তী কয়েক ঘণ্টা খুব গুরুত্বপূর্ণ।”

​নির্জনের কানে আর কোনো কথা পৌঁছাচ্ছিল না। তার চারপাশটা যেন ধোঁয়াটে হয়ে এল। পায়ের শক্তি হারিয়ে ছেলেটা ধপ করে হাসপাতালের ঠান্ডা ফ্লোরে হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়ল। দুই হাতে নিজের মুখ ঢেকে সে এক বুকফাটা আর্তনাদ করে উঠল,
​“ও আল্লাহ! তুমি মেয়েটাকে আর কষ্ট দিও না। সব কষ্ট আমাকে দিয়ে দাও আল্লাহ, তবুও ওর যন্ত্রণাটুকু কমিয়ে দাও। তোমার কাছে আমি জীবনে আর কিচ্ছু চাইব না, শুধু আমার চশমাওয়ালি ম্যাডামকে সুস্থ করে দাও আল্লাহ!”

​পুরো করিডোরে এক পিনপতন নীরবতা নেমে এল। সবাই স্তব্ধ হয়ে নির্জনের এই ব্যাকুলতা দেখছে। মিতু, তৃণা আর নৌশি একে অপরের দিকে তাকাল। তাদের আর বুঝতে বাকি রইল না যে, এই সেই নির্জন যার কথা নুসরাত আড়ালে তাদের সাথে গল্প করেছিল। এই সেই মানুষ, যে নুসরাতকে নিজের প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসে।
★★★
পরদিন সকালের দিকে তৃণা আর আরিয়ান বাড়ি ফিরল। মাত্র এই একটা দিনে পুরো মির্জা বাড়ির সবার চেহারার আদল বদলে গেছে। এই চব্বিশ ঘণ্টায় আরিয়ান আর নির্জনকে সবচাইতে বেশি ধকল সইতে হয়েছে। বিশেষ করে নির্জন এক মুহূর্তের জন্য হাসপাতাল থেকে সরেনি। রোহান জরুরি কাজে শহরের বাইরে ছিল, সেও খবর পেয়ে আজই ফিরে আসবে। আদনানও তার সাধ্যমতো ছোটাছুটি করেছে, কিন্তু নুসরাতের এই দুঃসংবাদ যেন সবাইকে স্থবির করে দিয়েছে।পুলিশ আজ সকালেই সেই এসিড নিক্ষেপ করা বখাটে দুই ছেলেকে এরেস্ট করেছে।
​নুসরাতের অবস্থা এখনো সংকটজনক। এসিডের তীব্রতায় তার মুখের বাম দিকের কিছুটা অংশ এবং গলার নমনীয় চামড়া পুড়ে গেছে। তবে ঘটনার পরপরই নির্জন যেভাবে প্রচুর পানি ঢেলেছে, তাতে ক্ষতটা হাড় পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেনি। কিন্তু শরীরের ক্ষতের চেয়েও মনের ক্ষতটা নুসরাতকে বেশি কাবু করে ফেলেছে। জ্ঞান ফেরার পর থেকে মেয়েটা পাথরের মতো পড়ে আছে, একটি শব্দও উচ্চারণ করেনি। এমনকি নির্জন, যে কিনা নুসরাতের জন্য জান বাজি রাখতে পারে, তারও এখন সাহস হচ্ছে না নুসরাতের ওই ঝলসে যাওয়া মুখের দিকে তাকাতে। এক বুক হাহাকার নিয়ে সে হাসপাতালের করিডোরে পায়চারি করছে।

​আরিয়ান রুমে ঢুকে বিছানার এক কোণে মাথা নিচু করে বসে রইল। গত রাতের নির্ঘুম চোখ দুটো লাল হয়ে ফুলে আছে। তৃণা রুমে ঢুকে দেখল আরিয়ানের এই বিধ্বস্ত অবস্থা। বাড়ির সবার মতো আরিয়ানও তার আদরের বোন নুসরাতের এই আকস্মিক ঘটনায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে।
​তৃণা নরম গলায় বলল,
“আপনার একটু বিশ্রাম আর ঘুমের প্রয়োজন। সারা রাত অনেক ধকল গিয়েছে। আগে কিছু খেয়ে নিন, তারপর একটু ঘুমান।”

​আরিয়ান ক্লান্ত স্বরে উত্তর দিল,
“নাহ্, এখন কিছু গলা দিয়ে নামবে না। একটু ঘুমানো দরকার।”

​তৃণা আর কথা বাড়াল না। সে আরিয়ানের জন্য পানি আনতে রুম থেকে বের হতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই আরিয়ানের ক্ষীণ কণ্ঠের অনুরোধ ভেসে এল,
“শোনো, ড্রয়ারে একটা মাথাব্যথার মলম রেখেছিলাম। সেটা কি দেখেছ?”

তৃণা এবার আরিয়ানের দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালো। না ঘুমানোর কারণে আরিয়ানের চোখ দুটো লাল হয়ে আছে। কপালের পাশের রগগুলো যন্ত্রণায় ফুলে কালো হয়ে আছে। আরিয়ানের পুরনো মাইগ্রেনের সমস্যা আছে, সেটা তৃণা জানে। অথচ এতক্ষণ লোকটা একবারও মুখ ফুটে বলল না যে তার মাথা ছিঁড়ে যাচ্ছে! তৃণা এক বুক দীর্ঘশ্বাস ফেলে ড্রয়ার থেকে মলমটা খুঁজে বের করল।
​আরিয়ান ততক্ষণে বিছানার এক কোণে গা এলিয়ে দিয়েছে। তৃণা বিছানার পাশে বসে শান্ত গলায় বলল,
“সোজা হয়ে শুয়ে পড়ুন, আমি মলম মালিশ করে দিচ্ছি।”

​আরিয়ান কিছুটা কুণ্ঠাবোধ করে বলল,
“না না, প্রয়োজন নেই। আমার কাছে দাও, আমি নিজেই মেখে নিচ্ছি।”

​তৃণা এবার কিছুটা ক্ষিপ্ত হলো। মানুষের অসুস্থতা বাড়লে যে নিজের প্রতি অবহেলা বাড়ে, আরিয়ান তার প্রমাণ। সে সামান্য ধমক দিয়ে বলল,
“আপনি এবার প্লিজ একটু চুপ করবেন? অনেক হয়েছে, আমাকে আমার কাজটা করতে দিন।”

​আরিয়ান অবাক হয়ে তৃণার দিকে একবার তাকাল। তৃণার এই অধিকারমাখা ধমকে সে আর কথা বাড়ানোর সাহস পেল না। চুপচাপ শুয়ে পড়ল। তৃণা এক হাতে কনুইয়ে ভর দিয়ে অন্য হাতে মলম নিয়ে আরিয়ানের কপালে খুব আলতো করে মালিশ করতে লাগল। হাতের শীতল ছোঁয়ায় আরিয়ানের বন্ধ চোখের পাতায় রাজ্যের শান্তি নেমে এল। সে এক গভীর প্রশান্তিতে চোখ বন্ধ করে নিল। তৃণা যখন মালিশ করছিল, তার পুরো মনোযোগ ছিল আরিয়ানের মুখশ্রীর দিকে। তৃণার বরাবরই এই অভ্যাস সে যখন আরিয়ানকে দেখে, তখন যেন সব কিছু ভুলে ওর চোখের নেশায় ডুবে যায়।

​এদিকে আরিয়ান চোখ বন্ধ রাখলেও তার মস্তিষ্ক ঝড়ের বেগে কাজ করছে। নুসরাতের এই দুর্ঘটনা তাকে ভেতরে ভেতরে ওলটপালট করে দিলেও একটা দায়িত্ব তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। হাসপাতালের এই ঝামেলাগুলো একটু থিতিয়ে গেলেই তাকে সেই পাহাড়ি মেয়েটার খোঁজ নিতে হবে। যদিও অনেক বছর কেটে গেছে, দুর্গম পাহাড়ে সেই মেয়েকে খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। তবে আরিয়ানের মনে পড়ল, সেই পাহাড়ের কাছেই একটা হোটেল ছিল। হয়তো মেয়েটা আশেপাশেরই কেউ হবে। যেভাবেই হোক মেয়েটাকে খুজে বের করতেই হবে তাঁকে।

চলবে…

(সকলে রেসপন্স করবেন।)

Share On:

TAGS:



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply