Golpo কষ্টের গল্প রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র

রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৩১


রোদ্দুরেরছেঁড়ামানচিত্র

পর্ব_৩১

নিলুফানাজমিননীলা

★★★
গোধূলির রোদ মাথায় নিয়েই তৃণা আর আরিয়ান ঢাকার পথে পা বাড়িয়েছে। আরিয়ানের অনেক কাজ বাকি ছিল, অনেক হিসেব নিকেশ মেলানো হয়নি, কিন্তু তৃণার এই নির্জনতা থেকে পালানোর তীব্র ব্যাকুলতা দেখে আরিয়ান আর না করেনি।
​গাড়িটা হাইওয়ের পিচঢালা পথ চিরে ঝড়ের বেগে ছুটে চলছে। আরিয়ান ল্যাপটপে ডুবে আছে, আঙুলের ডগায় কিবোর্ডের খটখট শব্দ অফিসের কোনো জরুরি ইমেইল হয়তো।তৃণা যেন এক জীবন্ত পাথর। গাড়িতে ওঠার পর থেকে তার দৃষ্টি জানালার ওপাশে ছুটে চলা ধূসর সর্পিল রাস্তার দিকে স্থির হয়ে আছে। সকালের সেই ঝড়ো ঘটনার পর থেকে সে কেবল একবারই কথা বলেছে আরিয়ানের সাথে, তারপর থেকে এক অদ্ভুত মৌনব্রত পালন করছে সে।
​আরিয়ান কাজের ফাঁকে একবার আড়চোখে তৃণার দিকে তাকালো। তৃণার চোখের কোণে কোনো অভিব্যক্তি নেই, যেন সে অন্য কোনো জগতের বাসিন্দা। আরিয়ানের ভেতরটা হঠাৎ খচখচ করে উঠল। সে ভ্রু কুঁচকে নিজের মনেই খুব নিচু স্বরে বিড়বিড় করে বলল,
​“কী অদ্ভুত! মনে হচ্ছে শুধু ও একাই সবকিছু হারিয়েছে, ওর একারই মান-সম্মান সব শেষ হয়ে গেছে। আমি পুরুষ বলে কি আমার কোনো অনুভূতি নেই? আজকালকার সময়ে সব দিক দিয়েই পুরুষরা কতটা অবহেলিত!”

​আরিয়ানের এই শ্লেষ্মাভরা বিড়বিড়ানি তৃণার কানে পৌঁছালো ঠিকই, কিন্তু সে কোনো প্রতিবাদ করল না। বরং তার শরীরের ভেতর এখন অন্য এক যুদ্ধ চলছে। হাইওয়ের টানা গতিতে তার মাথাটা বনবন করে ঘুরছে, নাড়িভুঁড়ি উল্টে বমি বেরিয়ে আসতে চাইছে। সে হঠাৎ করে নিজের নাক চেপে ধরল।
​তৃণার অস্বস্তিটা আরিয়ানের নজর এড়ালো না। সে ল্যাপটপ থেকে মুখ তুলে সরাসরি প্রশ্ন করল,
“ শরীর কি বেশি খারাপ লাগছে?”

​তৃণা কোনো উত্তর দিল না, শুধু নিঃশব্দে দুই দিকে মাথা নাড়ালো। আরিয়ান বুঝল মেয়েটা জেদ করছে। ওর ফ্যাকাশে মুখ আর কপালে জমে থাকা বিন্দু বিন্দু ঘামই বলে দিচ্ছে সে কতটা অসুস্থ বোধ করছে। আরিয়ান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের গলাটা একটু পরিষ্কার করে নিয়ে কিছুটা নরম সুরে বলল,
​“এতটা জার্নি করার ধকল নিতে পারছো না তুমি। জেদ না করে তুমি চাইলে আমার কোলে মাথা রেখে বা এই পেছনের সিটে একটু শুয়ে পড়তে পারো। অন্তত মাথা ঘোরাটা কমবে।”

তৃণা একবার দ্বিধাভরে আরিয়ানের দিকে তাকালো। শরীরটা যে হারে অবাধ্য হয়ে উঠছে, তাতে শুয়ে পড়াই হয়তো বুদ্ধিমানের কাজ হবে। নাহলে হাইওয়ের এই আঁকাবাঁকা পথে যেকোনো সময় বমি হয়ে এক বিশ্রী কাণ্ড ঘটে যেতে পারে। কিন্তু সমস্যা হলো, এই সংকীর্ণ সিটে শুতে গেলে আরিয়ানের উরুতে মাথা রাখা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। তৃণা এক মুহূর্ত ভাবল, তারপর পরিস্থিতির চাপে পড়ে সমস্ত জড়তা ঝেড়ে আরিয়ানের প্রশস্ত উরুর ওপর মাথা রেখে এলিয়ে পড়ল।
​আরিয়ান কিছুটা অবাক হলেও পরক্ষণেই নিজের ল্যাপটপটা বন্ধ করে একপাশে সরিয়ে রাখল। সিটে মাথা রাখতেই তৃণা চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে নিল। দীর্ঘক্ষণ জার্নি আর মানসিক ধকলের কারণে শ্রান্ত শরীরটা দ্রুতই নিস্তেজ হয়ে এল। কিছুক্ষণ পরেই তার নিশ্বাস ভারী হয়ে এল মেয়েটা হয়তো গভীর ঘুমে তলিয়ে গেছে।

​আরিয়ান অপলক দৃষ্টিতে তৃণার দিকে তাকিয়ে রইল। বাইরের গোধূলির ম্লান আলো এসে পড়েছে তার মুখে। কী এক অপার্থিব মায়া এই চেহারায়! আরিয়ান ধীর হাতে তৃণার কপালে এসে পড়া অবাধ্য চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল।
​তাকিয়ে থাকতে থাকতেই আরিয়ানের নজর গেল তৃণার উদরের দিকে। শাড়িটা শরীরের ভাঁজ থেকে কিছুটা সরে যাওয়ায় তার মসৃণ শ্যামলা উদরটা অনাবৃত হয়ে পড়েছে। বিকেলের মরা আলোয় সেই শ্যামল ত্বকে এক রহস্যময়ী রূপ ধারণ করেছে। আরিয়ান চাইলেও সেই দৃশ্য থেকে চোখ সরিয়ে নিতে পারল না। তার ভেতরে এক অজানা তুফান শুরু হলো, নিজের অজান্তেই তার হাত কাঁপতে লাগল।

​এক তীব্র অস্থিরতা নিয়ে আরিয়ান কাঁপাকাঁপা হাতে শাড়ির আঁচলটা টেনে তৃণার উদর ঢেকে দিল। কিন্তু সেই শাড়ি ঠিক করার ফাঁকেই আরিয়ানের তপ্ত হাতের আঙুলগুলো তৃণার নরম ত্বকে আলতো করে ছুঁয়ে গেল। সেই স্পর্শে ঘুমের ঘোরেই তৃণা মৃদু কেঁপে উঠল, যেন কোনো এক বিদ্যুৎলতা তার শরীরের ভেতর দিয়ে বয়ে গেল। আরিয়ান দ্রুত নিজের হাত সরিয়ে নিল, কিন্তু তার হৃদপিণ্ডের ধকধকানি তখন তড়িৎগতিতে বাড়ছে।
★★★
সন্ধ্যার শান্ত পরিবেশে ড্রয়িংরুমে মেতে উঠেছে পারিবারিক আড্ডা। হাসাহাসি আর গল্পের গুঞ্জনে ঘরটা মুখর হলেও, এক কোণে বসে থাকা নৌশির মনে কোনো রঙের ছোঁয়া নেই। তার চিরচেনা সেই চঞ্চলতা আর ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা দুষ্টুমি মাখা হাসিটা আজ নিখোঁজ। ঠিক এমন সময় সদর দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল আদনান।
​আদনানকে দেখেই আহাদ মির্জা চশমার ওপর দিয়ে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন,
“কোথায় গিয়েছিলি আদনান? সন্ধ্যার পর তো তোকে বাড়িতেই পাওয়া যায় না।”

​আদনান ধীর পায়ে এগিয়ে এল। তার কণ্ঠস্বরে আজ এক অদ্ভুত গাম্ভীর্য আর ভদ্রতা। শান্ত গলায় উত্তর দিল,
“একটু বাইরে গিয়েছিলাম আব্বু, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছিলাম।”

​কথাটা বলতে বলতে আদনানের চোখ দুটো অবাধ্যভাবে নৌশিকে খুঁজল। সে ভাবল, এখনই হয়তো নৌশি ফোড়ন কাটবে, আব্বুর কাছে তার নামে দু-চারটে মিথ্যে অভিযোগ লাগিয়ে তাকে বকা খাওয়ানোর চেষ্টা করবে। কিন্তু কই? নৌশি তো পাথরের মতো নিশ্চল হয়ে বসে আছে। যেন আদনানের আসা বা না আসাতে তার কিছুই যায় আসে না।
​আদনানের বুকের ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। গত তিনটে দিন ধরে নৌশি এক অদ্ভুত আচরণ করছে। যে মেয়েটা ছায়ার মতো তার পেছনে লেগে থাকত ঝগড়া করার জন্য, সে আজ তাকে চেনে না বললেই চলে। মানুষের এই হঠাৎ বদলে যাওয়াটা সহ্য করা আদনানের জন্য বড্ড কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিজের অস্থিরতা লুকিয়ে আদনান এবার সবার উদ্দেশ্যে বলল,
​“আব্বু, চাচ্চু… আমি একটা জরুরি কথা বলতে চাচ্ছিলাম।”

​ড্রয়িংরুমের হাসাহাসি থেমে গেল। সবাই অবাক হয়ে আদনানের দিকে তাকাল। আদনান কোনোদিন অনুমতি নিয়ে কথা বলার মতো ছেলে নয়, তার ওপর আজকের এই নম্রতা সবার কাছেই বেশ অভাবনীয় ঠেকল।এবারও নৌশি মাথা তুলে তাকাল না নৌশি।
​ইকবাল সাহেব আগ্রহ নিয়ে বললেন,
“হ্যাঁ বাবা, বল কী বলবি।”

​আদনান কয়েক সেকেন্ড সময় নিল, হয়তো নিজের সিদ্ধান্তটা শেষবার ঝালিয়ে নিল মনে মনে। তারপর স্পষ্ট গলায় বলল,
“আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, এখন থেকে হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করব। বাড়িতে থাকলে পড়ালেখায় মন বসে না।”

​আদনানের মুখ থেকে ‘হোস্টেল’ শব্দটা বেরোতেই নৌশি বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো চট করে মাথা তুলল। তার বুকের ভেতরটা যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। এই ছেলেটা বলছে কী? সে তাকে ছেড়ে দূরে চলে যাবে? নৌশির চোখের কোণে অবাধ্য জলরাশি ভিড় করতে চাইল। যার সাথে একটা দিন ঝগড়া না করলে তার পেটের ভাত হজম হতো না, যে ছিল তার প্রতিটি মুহূর্তের বিরক্তির কারণ আবার এক নিগুঢ় নির্ভরতা, সেই আদনান আজ নিজের ইচ্ছায় নির্বাসনে যেতে চাইছে!

মরিয়ম বেগম রীতিমতো আকাশ থেকে পড়লেন। তিনি অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন,
“সে কী রে! হঠাৎ হোস্টেলে গিয়ে থাকার কী প্রয়োজন পড়ল? দিব্যি তো এখান থেকে পড়াশোনা করছিস, কোনো অভাব তো রাখিনি!”

আদনান এবার মাথা নিচু করে খুব ছোট করে উত্তর দিল, “আসলে আম্মু, আমার এখানে থাকতে একটু সমস্যা হচ্ছে।”

​আদনানের মুখ থেকে সমস্যা শব্দটা শোনামাত্রই নৌশির বুকটা ধক করে উঠল। সে অপলক দৃষ্টিতে আদনানের নুয়ে থাকা অবয়বটার দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে মনে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে লাগল আদনানের সমস্যাটা কি তবে আমাকে নিয়ে? আমি কথা বলছি না বলেই কি ও বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে চাইছে?
​আহাদ মির্জা গম্ভীর মুখে বললেন,
“আমি তো তোকে শুরুতেই বলেছিলাম হোস্টেলে থেকে নিয়মের মধ্যে পড়াশোনা করতে। তখন তো শুনলি না। এখন যদি তোর মনে হয় সেখানে গেলে ভালো হবে, তবে যেতে পারিস। আমার কোনো আপত্তি নেই।”

​আদনান আর কোনো তর্কে গেল না। নিঃশব্দে সিঁড়ি বেয়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। ড্রয়িংরুমের সোফায় নৌশির পাশেই বসে ছিল মিতু। সে শুরু থেকেই আদনান আর নৌশির মধ্যকার এই নীরব যুদ্ধটা পরখ করছিল। মিতু খুব নিচু স্বরে নৌশিকে জিজ্ঞেস করল,
“কী হয়েছে নৌশি? তোমাদের মাঝে কি বড় কোনো ঝগড়া হয়েছে? আদনানকে এমন বিধ্বস্ত আগে কখনও দেখিনি।”

​নৌশি কোনো উত্তর দিল না। তার কণ্ঠ রোধ হয়ে আসছে। সে অসহায়ভাবে মিতুর কাঁধে মাথা রাখল। মিতু দীর্ঘশ্বাস ফেলে নৌশির মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,
“এভাবে পাহাড়সম অভিমান বুকে চেপে রেখে কী হবে নৌশি? পৃথিবীতে কোনো কিছুই অপ্রকাশিত রাখতে নেই। সময় থাকতে মনের কথা বলে দেওয়া ভালো, নাহলে পরে শুধু আফসোসটাই বাকি থাকে।”

​নৌশি মিতুর দিকে অবাক হয়ে তাকালো। মিতু কি তবে সব বুঝে ফেলেছে? কিন্তু নৌশি চাইলেও এই মুহূর্তে মুখ ফুটে কিছু বলতে পারল না। তার ভেতরটা এক অজানা আশঙ্কায় দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে।
​এদিকে বড়দের মাঝে আলোচনার মোড় ঘুরল। এমদাদুল মির্জা মেজো ভাই আহাদ মির্জাকে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞেস করলেন,
“আরিয়ানকে কি একবার কল দিয়েছিস? ওরা কতদূর?”
আহাদ মির্জা ঘড়ি দেখে উত্তর দিলেন,
“দিয়েছিলাম কিছুক্ষণ আগে। বলল রাস্তায় নাকি আজ প্রচণ্ড জ্যাম। ঢাকা পৌঁছাতে পৌঁছাতে ওদের অনেকটা রাত হয়ে যাবে।”
★★★
রাত তখন প্রায় এগারোটার কাছাকাছি। রূপালি চাঁদের আলো আর সোডিয়াম ল্যাম্পের হলুদ আভা মিলেমিশে মির্জা বাড়ির সদর দরজার সামনে এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি করেছে। গাড়ির চাকা থামার মৃদু শব্দে আরিয়ানের কাঁচা ঘুমটা ভেঙে গেল। সে চোখ মেলে দেখল, তৃণা এখনো তার উরুর ওপর মাথা রেখে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।
​আরিয়ান লক্ষ্য করল, তৃণা ঘুমের ঘোরে তার উরুর কাপড়টা দুহাতে শক্ত করে খামচে ধরে আছে,ঠিক যেভাবে মানুষ চরম আতঙ্কে কোনো শক্ত অবলম্বনকে আঁকড়ে ধরে। আরিয়ান কৌতূহলী হয়ে তৃণার মুখের দিকে তাকাল। মেয়েটার কপাল কুঁচকে আছে, বন্ধ চোখের পাতায় অস্থিরতা আর ঠোঁট দুটো ভয়ে কাঁপছে। আরিয়ানের মনে খটকা লাগল,ঘুমের মাঝে যতবার সে তৃণাকে দেখেছে, প্রতিবারই এই একই আতঙ্ক লক্ষ্য করেছে। মেয়েটা কি কোনো ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্ন দেখে? নাকি তার অবচেতন মন কোনো পুরনো ক্ষতের স্মৃতি চারণ করে?

​আরিয়ান আলতো করে তৃণার মাথায় হাত রাখল। সে জানে তৃণাকে জোরে ডাকলেই সে চমকে উঠবে, তাই খুব নীচু স্বরে ডাকল,
“শ্যামলিনি…”

​নামটা উচ্চারণ করেই আরিয়ান মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। নিজের অজান্তেই কেন সে এই মায়াবী নামে ডাকল, তা সে নিজেও জানে না। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে একটু স্বাভাবিক গলায় বলল,
“তৃণা, ওঠো। আমরা বাড়িতে পৌঁছে গেছি।”

​তৃণা ধীরলয়ে চোখ খুলল। আজ সে আগের মতো আঁতকে ওঠেনি, বরং আরিয়ানের শান্ত কণ্ঠস্বর তাকে এক অদ্ভুত স্বস্তি দিল। সে উঠে বসতে চাইতেই বুঝতে পারল দীর্ঘক্ষণ একভাবে থাকার কারণে পা দুটো অবশ হয়ে আছে। প্রতিটি স্নায়ুতে চিনচিনে ব্যথা। আরিয়ান তৃণার কষ্টটা বুঝতে পেরে গাড়ি থেকে নেমে ওর দরজা খুলে দিল এবং পাশে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল,
“একা একা হাঁটতে পারবে তো? নাকি সাহায্য করব?”

​তৃণা আরিয়ানের চোখের দিকে তাকাল। আরিয়ানের এই আকস্মিক যত্ন আর মমতা তাকে সামান্য তৃপ্তি দিলেও, পরক্ষণেই গত রাতের স্মৃতিটা বিষের মতো তার মনে ছড়িয়ে পড়ল। সে জানে আরিয়ান ইচ্ছে করে কিছু করেনি, সে জানে আরিয়ান নির্দোষ হয়েও ক্ষমা চেয়েছে এবং তাকে স্ত্রীর মর্যাদা দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে,কিন্তু একজন নারী হিসেবে নিজের পবিত্রতা হারানোর এই দহন মেনে নেওয়া সহজ নয়।
​তৃণা চোখের জল আড়াল করে শক্ত গলায় বলল, “ধন্যবাদ, আমি একাই যেতে পারব।”

​তৃণা টলমল পায়ে হাঁটতে শুরু করল। আরিয়ান আর জোর করল না ঠিকই, কিন্তু সে তৃণার পেছনে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে তার হাঁটার ছন্দের সাথে পা মিলিয়ে ধীরলয়ে এগোতে লাগল। যেন কোনো অদৃশ্য ছায়া হয়ে সে তৃণাকে আগলে রাখছে।
★★★
ব্যস্ত বাসস্টেশনের এক কোণে চশমা চোখে দাঁড়িয়ে আছে নুসরাত। চারপাশের মানুষের কোলাহল আর বাসের হর্ন তাকে বিন্দুমাত্র বিরক্ত করতে পারছে না। আজ তার মনে বসন্তের হাওয়া বইছে। নির্জন এখনো এসে পৌঁছায়নি, তাতেও তার কোনো ক্ষোভ নেই। ছেলেটা হাসপাতালে মুমূর্ষু রোগী দেখতে গিয়ে আটকে গেছে একজন ডাক্তার হিসেবে নির্জনের এই দায়িত্ববোধ নুসরাতকে সবসময়ই মুগ্ধ করে।
​নুসরাতের ভার্সিটির ছুটি শুরু হয়েছে। অনেকদিন পর বাড়ি যাবে ভাবতেই মনটা ভালো হয়ে যাচ্ছে। তার বাসে জার্নি করতে বেশি ভালো লাগে। জানালার পাশে বসে বাইরের দৃশ্য দেখতে দেখতে নিজের কল্পনার জগতে ডুব দেওয়া যায়। বাস ছাড়ার সময় সকাল দশটা, এখন বাজে নয়টা পঁয়তাল্লিশ। নির্জন বলেছিল বিদায় জানাতে আসবে।

​কাল রাতের কথাগুলো মনে পড়তেই নুসরাতের গালে লাজুক আভা খেলে গেল। নির্জন হুট করেই বলে বসলো,
“আগামী এক-দুই দিনের মধ্যেই আম্মু-আব্বাকে তোমাদের বাড়িতে পাঠাচ্ছি, বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে।”

নুসরাত একটু সময় চেয়েছিল, কিন্তু নির্জনের এক কথা, “দেরি করে লাভ নেই, তোমাকে আমি চিরস্থায়ী ভাবে নিজের করে পেতে চাই।”

নির্জনের পরিবারও নুসরাতকে খুব পছন্দ করে। নামী পরিবার, ভালো মেয়ে এমন পুত্রবধূ কে না চায়?
​ভাবনার সাগরে ডুব দিতে দিতেই নুসরাতের কানে এল পরিচিত এক বাইকের আওয়াজ। তাকিয়ে দেখল, চুলে বাতাস উড়িয়ে ঝড়ের বেগে বাইক নিয়ে স্টেশনে ঢুকছে নির্জন। অবাধ্য কিছু চুল তার কপালে এসে আছড়ে পড়ছে। নুসরাত এক পলক তাকিয়ে ভাবল, ছেলেটা এত সুদর্শন কেন?
​নির্জন বাইকটা স্ট্যান্ড করিয়েই প্রায় দৌড়ে নুসরাতের সামনে এসে দাঁড়াল। দীর্ঘ দৌড়ে বুকটা ওঠানামা করছে, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। হাঁপাতে হাঁপাতে তার চিরাচরিত সুরে ডাকল,
“চশমাওয়ালি ম্যাডাম! খুব বেশি দেরি হয়ে গেল?”

​নুসরাত এই ডাকটা শুনলেই নিজের রাগ ধরে রাখতে পারে না। তার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল, কিন্তু সেটা লুকিয়ে কৃত্রিম গাম্ভীর্য নিয়ে বলল,
“বললেই তো হলো না! এত দেরি কেন? স্টেশনের মোড়ে মোড়ে বাদাম বিক্রি করছিলেন?”

​নির্জন এক গাল হেসে উত্তর দিল,
“বাদাম নয় ম্যাডাম, হাসপাতালে জীবন নামক ঔষধ বিলি করছিলাম। তাই তো আসতে একটু দেরি হয়ে গেল।”

​নুসরাত এবার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল, “নয়টা পঞ্চান্ন বাজে। মাত্র পাঁচ মিনিট সময় আছে। এইটুকু সময়ে কী এমন কথা হবে?”

​নির্জন এবার নুসরাতের একটু কাছে এগিয়ে এল। তার চোখেমুখে তখন দুষ্টুমি আর ভালোবাসার এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ। খুব শান্ত অথচ গভীর গলায় বলল,
“হাজারটা কথা বলার জন্য ঘণ্টার প্রয়োজন হয় না ম্যাডাম। আপনি শুধু কয়েকটা সেকেন্ড স্থির হয়ে আমার সামনে দাঁড়ান। আমি আপনার কাজলকালো চোখের আয়নায় তাকিয়ে লক্ষ কোটি মনের কথা পড়ে নেব।”

​নির্জনের রোমান্টিক এই সংলাপে নুসরাতের সব অভিমান জল হয়ে গেল। সে খিলখিল করে হেসে দিয়ে বলল, “আপনি না পারেনও বটে! এই কারণেই বোধহয় রোগীরা আপনার কথা শুনেই অর্ধেক সুস্থ হয়ে যায়।”

নির্জন আজও সেই পরিচিত ভঙ্গিতে নুসরাতের চশমাটা টেনে নিল। তারপর শার্টের নিচের অংশ দিয়ে খুব যত্ন করে কাঁচটা মুছে দিতে দিতে ধীর স্বরে বলল,
​“এই কটা দিন নিজের আর এই চশমার একটু বাড়তি খেয়াল রাখবেন ম্যাডাম। কয়েকটা দিন সই, তারপর থেকে আপনার সবটুকু যত্নের দায়িত্ব আমি নিজের কাঁধে তুলে নিব।”

​নুসরাত পলকহীন চোখে নির্জনের দিকে তাকিয়ে রইল। ঝাপসা দৃষ্টিতেও নির্জনের মুখটা আজ অনেক বেশি উজ্জ্বল মনে হচ্ছে। নুসরাত ভাবল, পুরুষ মানুষ এত গুছিয়ে আর এত দরদ দিয়ে কথা বলে কেন? এই পরিপাটি করে সাজানো কথাগুলো কি তারা জানেশুনেই বলে? এই কথাগুলো তো সাধারণ কোনো শব্দ নয়, এ যেন এক সম্মোহনী জাদু। কালো জাদুর চেয়েও শক্তিশালী এই মায়া, যা খুব সহজেই যেকোনো নারীর মনে প্রেমের পাহাড় জমিয়ে দিতে পারে।

​ঠিক সেই মুহূর্তে বাসের কন্ডাক্টর চিল্লাইয়া উঠল,
“এই গাড়ির সবাই উঠে পড়েন! বাস ছেড়ে দিল কিন্তু!”

​সময়ের স্রোতে বিচ্ছেদের সুর বেজে উঠল। নুসরাত তার চশমাটা নির্জনের হাত থেকে নিয়ে চোখে পরল। নির্জনের চোখের গভীরে এক মুহূর্তের জন্য ডুব দিয়ে হাসিমুখে বলল,
“তবে আসি এখন বাদামওয়ালা?”

​নির্জন স্মিত হেসে মাথা নাড়ল। শান্ত গলায় বলল,
“সাবধানে যাবেন। আল্লাহ হাফেজ…”

নুসরাত দ্রুত বাসের দরজার কাছে চলে গেল। বাসের রেলিং ধরে ওঠার আগে মেয়েটা আবারও পেছন ফিরে তাকাল। নির্জন তখনও দাঁড়িয়ে আছে নুসরাতের দিকে তাকিয়ে। নুসরাত মুচকি হেসে হাত নাড়াল টাটা দেওয়ার উদ্দেশ্যে, নির্জনও হাসিমুখে হাত নাড়িয়ে বিদায় জানাল।
​নুসরাত যেই না বাসে পা রাখতে যাবে, ঠিক তখনই সেখানে তড়িৎবেগে একটা বাইক এসে থামল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাইকে থাকা দুইটা ছেলের মধ্যে পেছনের ছেলেটা একটা বোতল থেকে কী যেন পানীয় জাতীয় তরল নুসরাতের দিকে ছুড়ে মারল। কয়েক সেকেন্ড নুসরাত হতবাক হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। কিন্তু মুহূর্তের ব্যবধানে তার মুখের বাম পাশে আর গলায় এক অসহনীয়, নরকীয় যন্ত্রণা আরম্ভ হলো। নুসরাত দুই হাতে নিজের মুখ চেপে ধরে এক আকাশবিদারী চিৎকার দিল।

​নির্জন কয়েক সেকেন্ডের জন্য পাথরের মতো নিথর হয়ে গেল। তার মস্তিষ্ক যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে, কী হয়েছে সেটা বুঝতেও কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল। নুসরাত আর্তচিৎকার করতে করতে একবার বাইকটার দিকে তাকাল। বাইকের পেছনে বসা ছেলেটা আর কেউ নয় তাদের ভার্সিটির সেই বখাটে ছেলেটা, যাকে সে দুদিন আগেই সবার সামনে চড় মেরেছিল। নুসরাত যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গিয়ে মাটিতে হাঁটু ভেঙে বসে পড়ল। বুঝতে বাকি রইল না যে, নুসরাতের কোমল মুখে ভয়ংকর এসিড নিক্ষেপ করা হয়েছে।

​নির্জন পাগলের মতো চিৎকার করে নুসরাতের কাছে দৌড়ে আসল। সে নুসরাতকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। নুসরাত দুই চোখ বন্ধ করে জান্তব যন্ত্রণায় ছটফট করছে। নির্জন তাকে বুকের মাঝে আগলে ধরে বাইকের ছেলেগুলোর দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠল,
“ জানোয়ারেরা, এটা কী করলি তোরা!”

​নুসরাত উন্মত্তের মতো চিৎকার করছে, তার মনে হচ্ছে আগুনের লেলিহান শিখা তার চামড়া পুড়িয়ে হাড় পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে। চারপাশের জনতা ভিড় করে দাঁড়িয়েছে এই বীভৎস দৃশ্য দেখতে। নির্জন ব্যাকুল হয়ে চিৎকার করল,
“পানি দিন! কেউ পানি দিন প্লিজ!”

​মুহূর্তের মধ্যে কয়েকজন পানির বোতল এগিয়ে দিল। নির্জন একনাগাড়ে কয়েক বোতল পানি নুসরাতের মুখে, গলায় আর হাতে ঢালতে লাগল। নুসরাতকে জড়িয়ে ধরে নির্জন কান্নায় ভেঙে পড়ল। এখান থেকে হাসপাতাল খুব বেশি দূরে নয়, কিন্তু এই ভিড়ে ট্যাক্সি বা অ্যাম্বুলেন্স ডাকতে গেলেও কয়েক মিনিট সময় নষ্ট হবে। নির্জন আর এক সেকেন্ডও দেরি করল না।

​নুসরাতকে পাজাকোলে তুলে নিয়ে সে হাসপাতালের দিকে দৌড়াতে লাগল। নুসরাত তখনও যন্ত্রণায় বারবার চিৎকার করে কেঁদে উঠছে। নির্জনের মনে হচ্ছে আজকের এই চেনা রাস্তাটা যেন শেষই হচ্ছে না, তার পা যেন মাটির সাথে আটকে যাচ্ছে। তবুও সে দৌড়াচ্ছে আর নুসরাতকে সান্ত্বনা দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করে বলছে,
“কিচ্ছু হবে না তোমার… কিচ্ছু হবে না! আর একটু… আর একটু ধৈর্য ধরো!”
​কিন্তু এই দহন, এই হাহাকার আর আগুনের মতো জ্বলতে থাকা যন্ত্রণা কি আদৌ ধৈর্য ধরে সহ্য করার মতো? নুসরাতের প্রতিটি আর্তনাদ যেন নির্জনের কলিজা ছিঁড়ে ফেলছিল।

চলবে…

(ভুল হলে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন)

Share On:

TAGS:



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply