রোদ্দুরেরছেঁড়ামানচিত্র
পর্ব ২৮
কলমে #নিলুফানাজমিননীলা
★★★
নতুন প্রভাতের সূচনা হলো এক অদ্ভুত স্নিগ্ধতায়। জানালার শুভ্র রঙের পাতলা পর্দা ভেদ করে ভোরের মিঠে রোদ ঘরে এসে আছড়ে পড়ছে, যেন রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র আঁকা হচ্ছে সাদা কার্পেটে। আরিয়ান বিছানায় গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, ওষুধের প্রভাবে তার শরীরটা এখনো নিথর। তৃণা সারারাত বিছানায় মাথা ঠেকিয়ে ফ্লোরের কার্পেটের ওপর বসেই কাটিয়ে দিয়েছে। চোখের ওপর অবাধ্য আলোর নাচন শুরু হতেই তার তন্দ্রা ভেঙে গেল।
তৃণা আড়মোড়া ভেঙে ধীর পায়ে উঠে দাঁড়াল। সোজা হয়ে দাঁড়াতেই শরীরের প্রতিটি হাড় যন্ত্রণার জানান দিল। গলায় হাত দিতেই সে শিউরে উঠল,ব্যথায় টনটন করছে জায়গাটা। আয়নার সামনে না দাঁড়িয়েও সে অনুভব করতে পারছে, গতকালের সেই হিংস্র থাবার কালচে দাগগুলো সেখানে স্পষ্ট হয়ে ফুটে আছে। হাতের বাহুতেও কালশিটে পড়ে গেছে। কিন্তু নিজের এই শারীরিক ক্ষতের চেয়ে আরিয়ানের বিধ্বস্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে তার বুকটা বেশি ফেটে যাচ্ছে।
ঘুমন্ত আরিয়ানকে দেখে তৃণার ভীষণ মায়া হলো। লোকটার মুখটা কেমন যেন ছোট হয়ে গেছে। তৃণা বুঝতে পারছে, আরিয়ান কোনো নিষ্ঠুর মানুষ নয়, সে কেবল তার অতীতের এক ভয়াবহ ট্রমার বন্দি। সেই রহস্যময় মেয়েটির চেয়েও ওই দিনের সেই রক্তাক্ত দুর্ঘটনার স্মৃতি তাকে বেশি তাড়িয়ে বেড়ায়। চার-পাঁচ বছর কেটে গেলেও সেই দুঃস্বপ্ন থেকে আরিয়ান আজও মুক্তি পায়নি।
তৃণা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল আরিয়ানের দিকে। খুব বেশি ফর্সা না হলেও পুরুষালি এক ধরনের আভিজাত্য আছে তার চেহারায়। হালকা ছাঁটা দাড়িতে ঢাকা চোয়ালটা এখন শিথিল, কিন্তু কপালের মাঝখানে এখনো সেই চিরচেনা ভাজ যেটা তার রাগী স্বভাবের চিহ্ন হয়েই রয়ে গেছে। ঘুমের ঘোরেও মানুষটা যেন কোনো যুদ্ধের সাথে লড়াই করছে।
তৃণা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আলমারি থেকে একটা শাড়ি বের করে নিল। সারা শরীরে গতরাতের ধকলের ক্লান্তি লেগে আছে, একটা শাওয়ার খুব জরুরি। তবে ওয়াশরুমে যাওয়ার আগে সে আলতো হাতে ঘরের এলোমেলো হয়ে থাকা ভাঙা জিনিসপত্র আর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ফুলের পাপড়িগুলো গুছিয়ে রাখল। সে চায় না আরিয়ান ঘুম থেকে উঠে গতরাতের সেই ধ্বংসযজ্ঞ দেখে আবারও অপরাধবোধে ভুগুক।
ঘরটা মোটামুটি গুছিয়ে নিয়ে তৃণা ভেজা চোখে একবার আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াল।
তৃণা শাওয়ার শেষ করে হালকা ভিজে চুলে ড্রয়িংরুমে আসতেই দেখল রান্নাঘর থেকে সুগন্ধ আসছে। উঁকি দিয়ে দেখল জমেলা চাচি মন দিয়ে চুলা সামলাচ্ছেন। তৃণা রান্নাঘরে ঢুকতেই জমেলা চাচি অবাক হয়ে বললেন,
“ও মা! আপনি এত সকালে এইখানে আইলেন ক্যান? কোনো দরকার আছিল?”
তৃণা মৃদু হেসে উত্তর দিল,
“এমনিই এলাম চাচি। আর শোনেন, আমি আপনার মেয়ের বয়সী, আপনি করে ডেকে প্লিজ আমাকে আর লজ্জা দেবেন না।”
তৃণার কথা শুনে জমেলা চাচি কাজ থামিয়ে কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। মহিলার চোখের কোণে হঠাৎ একটু জল চিকচিক করে উঠল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“আমার তো কোনো পোলাপান নাই মা। কত আশা আছিল একটা পোলাপান দিয়া ঘরটা আলো করব, কিন্তু কপালে তো সইল না। তেমারে তাইলে কী কইয়া ডাকমু কও তো?”
তৃণা চাচির মনের কষ্টটা বুঝতে পেরে মায়াবী গলায় বলল,
“ আমার নাম তৃণা, তাই আপনি আমাকে নাম ধরেই ডাকবেন।”
জমেলা চাচি এবার একটা চওড়া হাসি দিয়ে বললেন,
“আইচ্ছা, ঠিক আছে মা। তৃণা নামটা অনেক সুন্দর।”
কথার মাঝেই হঠাৎ জমেলা চাচির নজর গেল তৃণার গলার দিকে। ওই কালো আর লালচে দাগগুলো শাড়ির আড়ালে লুকানোর আপ্রাণ চেষ্টা করল তৃণা। তার বুকটা ধক করে উঠল এই ভেবে যে, চাচি যদি বুঝে ফেলেন আরিয়ান তাকে আঘাত করেছে, তবে বাড়ির লোকজনের কাছে আরিয়ানের সম্মান ধুলোয় মিশে যাবে।
কিন্তু তৃণাকে অবাক করে দিয়ে জমেলা চাচি হঠাৎ লাজুক একটা হাসি দিলেন। তারপর মুখ টিপে হাসতে হাসতে অন্যদিকে ফিরে গেলেন। তৃণা প্রথমে একটু ভ্রু কুঁচকে বোঝার চেষ্টা করল চাচি এভাবে হাসলেন কেন? পরক্ষণেই তার মাথায় কাজ করল।
হয়তো জমেলা চাচি ভাবছেন, ভালোবাসার কোনো চিহ্ন ওগুলো। তৃণা মনে মনে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাসল। একদিকে ভালোই হলো, চাচি ভুল বুঝলেও অন্তত আসল সত্যিটা জানলেন না। আরিয়ানের পাগলামির কথা গোপন রইল।
তৃণা নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
“চাচি, কী রান্না করছেন? আমি একটু সাহায্য করি?”
জমেলা চাচি দীর্ঘ হাসির রেশটুকু ধরে রেখেই বললেন,
“না না মা, তোমার সাহায্য লাগব না। তুমি বরং আরিয়ান বাজানরে গিয়া জাগাও। দুজনে মিইলা গরম গরম নাস্তা খাইবা।”
তৃণা কফি বানিয়ে নিজেদের রুমে ফিরে গেল। আরিয়ান তখনো বিছানায় আধশোয়া হয়ে বসে আছে, তার চোখেমুখে রাতের সেই ঝড়ের ক্লান্তি এখনো স্পষ্ট। সর্বপ্রথম আরিয়ানের নজর যখন তৃণার গলার কালচে দাগগুলোর ওপর পড়ল, সে শিউরে উঠল।
আরিয়ান দ্রুত নিজের চোখ দুটো বন্ধ করে ফেলল। এক বুক দীর্ঘশ্বাস নিয়ে সে কপালে হাত দিয়ে নিচু স্বরে বিড়বিড় করল। তৃণা স্পষ্ট বুঝতে পারল আরিয়ান নিজের ভেতর এক ভয়াবহ অপরাধবোধে পুড়ছে। তার ভেতরে থাকা সেই বিশাল মানুষটি নিজের করা আচরণের জন্য লজ্জিত।
তৃণা আরিয়ানের এই নীরব যন্ত্রণা সইতে না পেরে নরম স্বরে বলে উঠল,
“কফিটা খান। আর প্লিজ, আপনি কেন কষ্ট পাচ্ছেন? যা হয়েছে তা তো একটা দুর্ঘটনার মতো।”
আরিয়ান এবার মাথা তুলল। তার চোখ দুটো ভেজা আর প্রচণ্ড অসহায় দেখাচ্ছে। সে ধরা গলায় বলল,
“আই অ্যাম সরি তৃণা। আই অ্যাম রিয়েলি সরি। আমি জানি না কেন আমার এমন হয়। কেন আমি হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। আমি… আমি তোমাকে মারতে চাইনি।”
তৃণা এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল, তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে বলল,
“এই যে নিজের দোষ না থাকা সত্ত্বেও আপনি ক্ষমা চাইলেন, এটাই অনেক। আপনি যে মানুষটা ভালো, এটাই তার প্রমাণ। আর এই রোগটা তো আপনি নিজেই সারিয়ে নিতে পারেন।”
আরিয়ান অসহায়ভাবে তৃণার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“কীভাবে তৃণা? তুমি জানো না, আমি কতটা চেষ্টা করি। কিন্তু যখন ওই মুহূর্তটা আসে, আমার মস্তিষ্কের ভেতর যেন কেউ আগুন ধরিয়ে দেয়। আমি তখন আমি থাকি না। আমি চাইলেও নিজেকে ফেরাতে পারি না।”
তৃণা এবার আরিয়ানের পাশে খাটের এক কোণে বসল। সে খুব শান্তভাবে বলল,
“আপনি পারবেন। শুধু আপনাকে ওই অতীতটার সাথে লড়াই করতে হবে, ওখান থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।”
তৃণা আরিয়ানের চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে শান্ত গলায় আবারো বলল,
“আপনার জীবনে চার-পাঁচ বছর আগে যা ঘটেছিল, সেই দুর্ঘটনাটা আপনাকে ভুলে যেতে হবে। মেয়েটার কথা আপনার মনে থাকতেই পারে, কিন্তু ওই দিনের সেই বিভীষিকা আপনার মস্তিষ্ক থেকে মুছে ফেলতে হবে।”
আরিয়ান প্রচণ্ড অবাক হয়ে তৃণার দিকে তাকাল। তার কণ্ঠে বিস্ময় ঝরে পড়ল,
“তুমি… তুমি এসব কীভাবে জানো? কে বলল তোমাকে?”
তৃণা কোনো লুকোছাপা না করেই উত্তর দিল।
“মিতু ভাবি আমাকে সব বলেছিলেন,”
আরিয়ান একটা যন্ত্রণাকাতর হাসি দিয়ে বলল,
“কিন্তু তৃণা, ওই দিনের এক্সিডেন্টটা তো আমার কারণেই হয়েছিল।”
তৃণা দৃঢ়ভাবে বলল,
“না, একদমই আপনার কারণে হয়নি। ওনাদের মৃত্যু ওই দিন ওভাবেই লেখা ছিল। বিশ্বাস করুন, আপনি সেদিন সেখানে না থাকলেও মৃত্যু ওনাদের ঠিক ওভাবেই কেড়ে নিত। কারণ সৃষ্টিকর্তা কার মৃত্যু কখন আর কীভাবে হবে, তা আগে থেকেই লিখে রেখেছেন। আপনি তো সামান্য মানুষ, আপনি প্রকৃতির এই নিয়ম বদলাতে পারতেন না।”
আরিয়ান নীরব হয়ে গেল। আজ তৃণার প্রতিটি কথা তার পাথরের মতো জমে থাকা অপরাধবোধের দেয়ালে ফাটল ধরাচ্ছে। আগে কেউ তাকে এভাবে যুক্তি দিয়ে বোঝায়নি, সবাই শুধু সান্ত্বনাই দিয়েছে। আরিয়ান বিড়বিড় করে বলল,
“তৃণা, আগে কখনো কেউ আমাকে এভাবে বোঝায়নি। সবাই শুধু বলেছে ভুলে যাও, কিন্তু কেন ভুলব তা বলেনি।”
তৃণা মৃদু হেসে কফির কাপটা আবার এগিয়ে দিয়ে বলল, “এবার অন্তত কফিটা খেয়ে নিন, ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।”
কফিটা নেওয়ার সময় আরিয়ানের নজর গেল তৃণার হাতের সেই কালচে দাগটার ওপর। সে কফির কাপটা না নিয়ে টেবিলের ওপর রাখল। তারপর অত্যন্ত পরম মমতায় তৃণার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় তুলে নিল। আরিয়ানের হাতের উষ্ণ স্পর্শে তৃণার সারা শরীর যেন একবার কেঁপে উঠল। আরিয়ান খুব আলতো করে তৃণার কালশিটে পড়া জায়গাটায় আঙুল বুলিয়ে দিচ্ছিল। তার চোখে এখন অপরাধবোধের চেয়েও বেশি কিছু একটা কাজ করছে হয়তো গভীর কৃতজ্ঞতা।
তৃণা আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে রইল। তার মনে মনে একটাই কথা বাজছে, ‘আমি কি তবে এই রাগি পুরুষটাকেই ভালোবেসে ফেললাম?’
কিন্তু পরক্ষণেই এক রূঢ় বাস্তবতা তৃণার মাথায় খেলে গেল। কয়েকদিন পরেই তো তাদের বিচ্ছেদের কথা! এই অল্প সময়ের মায়া বাড়িয়ে শেষমেশ কি শুধু দীর্ঘশ্বাসই সম্বল হবে? তৃণা হঠাৎ করেই নিজের হাতটা আরিয়ানের স্পর্শ থেকে সরিয়ে নিল। নিজের আবেগ লুকানোর জন্য দ্রুত বলল,
“আপনি কফিটা খেয়ে ফ্রেশ হয়ে নিচে আসুন। আমি নিচে যাচ্ছি, জমেলা চাচি নাস্তা বানাচ্ছেন।”
বলেই তৃণা দ্রুত পায়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। আরিয়ান হাত বাড়িয়েও তাকে থামাতে পারল না। সে শুধু বিষণ্ণ দৃষ্টিতে তৃণার চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল।
★★★
নুসরাত আর তার ফ্রেন্ড আরসি গল্প করতে করতে ভার্সিটির মেইন গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকছিল। তাদের আলোচনার বিষয় ছিল সামনের সেমিস্টার আর কঠিন সব অ্যাসাইনমেন্ট। কিন্তু তাদের এই স্বাভাবিক শান্ত পরিবেশে ছন্দপতন ঘটল যখন পেছন থেকে উচ্চশব্দে শিস বাজানোর আওয়াজ ভেসে এল।
নুসরাত থেমে গেল। আরসি ফিসফিস করে বলল,
“দাঁড়াস না নুসরাত, চল। এদের তো চিনিস, ভার্সিটির সবচেয়ে বখাটে আর উশৃঙ্খল দল এটা। প্রতিদিনের এক অভ্যাস।”
নুসরাত এক মুহূর্তের জন্য নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করল। কিন্তু তারা যখন আবার হাঁটতে শুরু করল, ঠিক তখনই পেছন থেকে অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ আর ঘেন্নাভরা এক মন্তব্য কানে এল,
“পুরো মাল একটা! কী বলিস তোরা?”
কথাটা শোনা মাত্রই নুসরাতের রক্ত মাথায় চড়ে গেল। সে আরসির কোনো বাধা মানল না। ঘুরে দাঁড়িয়ে সটান হেঁটে গেল সেই বাইক আরোহী ছেলেদের সামনে। দাঁতে দাঁত চেপে প্রশ্ন করল,
“কী বললি এখন? সাহস থাকলে আবার বল!”
বাইক থেকে নেমে এক সিনিয়র ছাত্র তাচ্ছিল্যের হাসিতে নুসরাতের মুখোমুখি দাঁড়াল। সে বুক ফুলিয়ে বলল, “আরেহ, তোমার সিনিয়র আমরা, তাই একটু সম্মান দিয়ে কথা বলো। আমি বলেছি তুমি একটা ‘হট মাল’। এতে রাগ করার কী আছে?”
তার কথা শেষ হতে না হতেই বাতাসের বেগে নুসরাতের হাতটা উঠল এবং প্রচণ্ড শব্দে ছেলেটার গালে একটা চড় বসিয়ে দিল। আশেপাশের সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল। পুরো ভার্সিটি প্রাঙ্গণে তখন পিনপতন নীরবতা। ছেলেটা অপমান আর রাগে একবার চারপাশে তাকাল, দেখল অনেকেই তাকে দেখে ঠোঁট টিপে হাসছে।
নুসরাত রাগে কাঁপতে থাকা আঙুল তুলে ছেলেটার চোখের দিকে তাকিয়ে হুংকার দিয়ে বলল,
“ফারদার যদি আবারও এমন অসভ্যতা করার সাহস দেখাস, তবে ডানে আর বামে মিলে ডাবল থাপ্পড় খাবি। মনে থাকে যেন! মাইন্ড ইট।”
বলেই নুসরাত আর পিছু ফিরে তাকাল না, গটগট করে আরসিকে নিয়ে ভেতরে চলে গেল। আর পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা সেই বখাটে ছেলেটা নিজের গালে হাত ঘষতে ঘষতে দাঁত কিড়মিড় করতে লাগল। নুসরাতের চলে যাওয়ার পথের দিকে তার হিংস্র দৃষ্টি জানান দিচ্ছিল যে, অপমানটা সে সহজে হজম করবে না।
★★★
দুইদিন ধরে নৌশির দুরন্তপনা আর মারপিট যেন হঠাৎই উবে গেছে। সারা বাড়ির লোক এই নীরবতা লক্ষ্য করছে, কিন্তু কেউ কিছু বলছে না। আদনান ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে উসখুস করছে। যার সাথে সারাদিনে হাজার বার ঝগড়া না করলে তার পেটের ভাত হজম হয় না, সেই মেয়েটা এমন শান্ত হয়ে গেল কেন? দুইবার নৌশির দরজার সামনে গিয়ে ঘুরে এসেছে সে, কিন্তু ভেতর থেকে দরজা বন্ধ।
আদনান আর সহ্য করতে না পেরে মিতু ভাবিকে ডেকে বলল,
“ভাবি, দুই কাপ কফি দাও তো।”
মিতু রান্নাঘর থেকেই উত্তর দিল,
“দুই কাপ দিয়ে কী করবে? আর লাগলে এসে নিয়ে যাও, আমি ব্যস্ত।”
আদনান আর কথা না বাড়িয়ে নিজেই রান্নাঘরে গিয়ে দুই কাপ কফি বানিয়ে উপরে উঠে গেল। আবারও সেই বন্ধ দরজা। এবার সে বেশ জোরে নক করতেই নৌশি দরজা খুলল। আদনান অনুমতি ছাড়াই ঘরে ঢুকে পড়ল। ভেতরে ঢুকেই সোজা প্রশ্ন করল,
“কী সমস্যা তোর শুনি? এত বড় নাদানের বাচ্চা হঠাৎ এত ভালো মানুষ হয়ে গেলি কীভাবে?”
নৌশি বিরক্তি নিয়ে তাকাল। আদনানের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে শুধু বলল,
“জানিস না কয়েকদিন পরেই আমার এইচএসসি পরীক্ষা? পড়ার জন্য একটু শান্ত হয়েছি।”
আদনান নাক সিঁটকে বলল,
“তা পড়ছিলি তো বুঝলাম, কিন্তু বইপত্র কোথায়? বই ছাড়া কি স্বপ্নে বিদ্যা সাগর হয়ে যাবি?”
নৌশি কোনো জবাব দিল না। আদনানের স্বভাব হলো নৌশির রুমে ঢুকলে এক জায়গায় স্থির না থাকা। সে নৌশির হাতে একটা কফির কাপ ধরিয়ে দিয়ে ড্রেসিংটেবিলের দিকে এগিয়ে গেল। সেখানে রাখা মাটির কারুকার্য করা সুন্দর একটা কাপল পুতুল হাতে তুলে নিল। নৌশি তখনও জানালার বাইরে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে। আদনান পুতুলটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছিল, কিন্তু হঠাৎ হাত ফসকে সেটা টাইলসের ওপর আছড়ে পড়ল।
ঝনঝন শব্দে নৌশি চমকে তাকাল। তাকাতেই তার হৃদপিণ্ড যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। তার প্রাণের চেয়েও প্রিয় সেই মাটির কাপল পুতুলটা ফ্লোরে পড়ে তিন টুকরো হয়ে লুটোপুটি খাচ্ছে।
আদনান অপরাধীর মতো শুকিয়ে যাওয়া মুখে নৌশির দিকে তাকাল। নৌশি পাগলের মতো ছুটে গিয়ে ফ্লোরে বসে ভাঙা টুকরোগুলো তোলার চেষ্টা করল, কিন্তু লাভ নেই মাটির জিনিস একবার ভাঙলে আর জোড়া লাগে না। নৌশি ধীরপায়ে উঠে দাঁড়াল। তার চোখ দুটো এখন টকটকে লাল, আর সেই চোখে আদনানের জন্য বয়ে যাচ্ছে আগ্নেয়গিরির লাভা।
নৌশির গগনবিদারী চিৎকারে আদনান এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সে কিছু বুঝে ওঠার আগেই নৌশি তার বুকের ওপর দুই হাত দিয়ে প্রচণ্ড জোরে এক ধাক্কা দিল।
“এটা কেন করলি? কেন ভাঙলি ওটা?” নৌশির কণ্ঠস্বর রাগে কাঁপছে।
আদনান অপ্রস্তুত হয়ে বলল,
“আরে, এমন করছিস কেন? সামান্য একটা মাটির পুতুলই তো! ভেঙেছে তো কী হয়েছে, আমি অন্য একটা কিনে দেব।”
নৌশি এবার ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল, তার চোখ ফেটে নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে। সে আর্তনাদ করে বলল,
“তোর কাছে সব কিছু সামান্য! সবকিছুই তোর কাছে হাসি-তামাশা!”
আদনান নৌশির এই আকস্মিক ভেঙে পড়া দেখে অবাক হয়ে গেল। সে তো জানত নৌশি অনেক শক্ত মনের মেয়ে। সে একটু নরম গলায় বলল,
“পুতুলটা তো আমিই তোকে ছোটবেলায় মেলা থেকে গিফট করেছিলাম। নিজের দেওয়া জিনিস হাত থেকে পড়ে ভেঙে গেছে, তার জন্য এত রিয়েক্ট করছিস কেন?”
“তুই দিয়েছিস বলে কি সেটা ভেঙে দেওয়ার অধিকারও তোর আছে?” নৌশি আবারও তাকে ধাক্কা দিয়ে দরজার দিকে সরিয়ে দিতে লাগল।
আদনান এবার অপরাধবোধে কুঁকড়ে গিয়ে বলল,
“আমি ইচ্ছে করে করিনি নৌশি, সরি।”
নৌশি এবার আর চিৎকার করল না, বরং খুব হিমশীতল আর রুক্ষ গলায় বলল,
“আদনান, তুই এখনি আমার রুম থেকে বের হ। গেট আউট!”
আদনান যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারল না। ছোটবেলা থেকে বড় হওয়া পর্যন্ত নৌশি তাকে কখনোই নাম ধরে ডাকেনি। সবসময় ‘আদু ভাই’ ‘পচা’, ‘হাদারাম’ বা ‘কুত্তা’ বলে খেপিয়েছে, কিন্তু আজ সরাসরি তার নাম ধরে ডাকার মধ্যে যে পরিমাণ দূরত্ব আর অবজ্ঞা ছিল, তাতে আদনানের বুকের ভেতরটা বিষিয়ে উঠল।
আদনানকে একপ্রকার ধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়েই নৌশি সজোরে দরজাটা আটকে দিল। আদনান করিডোরে একা দাঁড়িয়ে রইল। ভেতর থেকে নৌশির গুমরে কাঁদার শব্দ ভেসে আসছে। তাদের জীবনে এর আগেও হাজারবার ঝগড়া হয়েছে, বালিশ ছোঁড়াছুঁড়ি হয়েছে, কিন্তু কখনো পরিবেশটা এত বিষণ্ণ আর সিরিয়াস হয়ে ওঠেনি।
★★★
সন্ধ্যার আঁধার ঘনিয়ে আসতেই আরিয়ান আর তৃণা বাংলো থেকে বের হলো। আরিয়ানের কোম্পানির ম্যানেজার স্থানীয় একটি অভিজাত রিসোর্টে এক জমকালো পার্টির আয়োজন করেছেন। তৃণা প্রথমে একটু দ্বিধায় ছিল, কিন্তু ম্যানেজারের বিনয়ী অনুরোধ আর শেষ পর্যন্ত রাজি হতে হলো।
গাড়ি এখন ব্রহ্মপুত্র নদের ওপরের দীর্ঘ ব্রিজ দিয়ে চলছে। জানালার কাঁচ দিয়ে বাইরের দৃশ্যটা অপূর্ব লাগছে,নদের বুকে চাঁদের প্রতিফলন আর দূরে ছোট ছোট নৌকার আলো মিলে এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি করেছে। তৃণা মুগ্ধ হয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে। আরিয়ান আড়চোখে একবার তৃণার দিকে তাকাল। মেরুন রঙের শাড়িতে তৃণা আজ অন্যরকম সুন্দরী লাগছে। অজান্তেই আরিয়ানের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল। ইদানীং কেন যেন তৃণার দিকে তাকালেই তার মনটা হালকা হয়ে যায়, যার কারণ হয়তো সে নিজেও পুরোপুরি জানে না।
তারা পার্টিতে পৌঁছাতেই সবাই করতালির মাধ্যমে তাদের স্বাগত জানাল। এত মানুষের ভিড় আর উচ্চশব্দের মিউজিক দেখে তৃণা কিছুটা গুটিয়ে গেল। আরিয়ান তা লক্ষ্য করে তৃণার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরল। সে তৃণার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে অভয় দিল,
“ভয় পেয়ো না, আমি তো আছি। আমার হাতটা শক্ত করে ধরে রাখো।”
তৃণা অবাক চোখে আরিয়ানের দিকে তাকাল। এই মানুষটার ভেতরের এই কোমল রূপটা তাকে বারবার বিস্মিত করে। চারদিকে অনেক যুগল নাচে মত্ত, কিন্তু তৃণা বা আরিয়ান কারও এসব একদম পছন্দ নয়। একপাশে বার কাউন্টারে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের হার্ড ড্রিংকস সাজানো। একজন ওয়েটার এসে ট্রে এগিয়ে ধরল। আরিয়ান ভদ্রভাবে প্রত্যাখ্যান করে বলল,
“থ্যাংক ইউ, আমাদের জন্য শুধু সফট ড্রিংকস নিয়ে আসো।”
ওয়েটার চলে গেল এবং কিছুক্ষণ পর গ্লাসে করে জুস নিয়ে এল। তৃণা উত্তেজনায় আর ঘাবড়ে গিয়ে এক নিশ্বাসে এক গ্লাস জুস শেষ করে ফেলল। তবে তার মনে হলো জুসের স্বাদটা সাধারণের চেয়ে একটু বেশি কড়া। এর মাঝে ম্যানেজার আরিয়ানকে একটু দূরে ডেকে নিয়ে গেলেন জরুরি কিছু লোকজনের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে। আরিয়ান না চাইলেও ম্যানেজার জোর করে তার হাতে এলকোহলের একটি গ্লাস ধরিয়ে দিয়ে বললেন,
“এক গ্লাস খেলে কিছু হবে না স্যার, এনজয় করুন।”
আরিয়ান এবার আর না করতে পারল না।
তৃণার গলা যেন তৃষ্ণায় বারবার শুকিয়ে আসছে। সে ওয়েটারকে ইশারায় ডেকে বলল,
“আরেক গ্লাস সফট ড্রিংকস দিয়ে যাবেন প্লিজ?”
ওয়েটার দ্বিতীয়বার গ্লাস দিয়ে গেল। তৃণা তৃপ্তি সহকারে সেটা শেষ করল। কিন্তু সে জানত না, এই অতিরিক্ত পানীয় তার শরীরের ওপর কী প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে। ড্রিংকসটা যে সাধারণ ছিল না, তা তৃণা কয়েক মুহূর্ত পরেই টের পেতে শুরু করল তার চারপাশটা কেমন যেন দুলতে শুরু করেছে।
চলবে…
(সকলে রেসপন্স করবেন প্লিজ)
Share On:
TAGS: নিলুফা নাজমিন নীলা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২০
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১১
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২৩
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৭
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২৬
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২২
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১৫
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১২
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১৪
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৩