রোদ্দুরেরছেঁড়ামানচিত্র
পর্ব_২৬
কলমে #নিলুফানাজমিননীলা
★★★
বিকেলের মিঠে রোদ তখন জানালার পর্দা চিরে ঘরের কোণে এসে পড়েছে, মিতুর রুমে তখন জমজমাট আড্ডা। বিছানার ওপর কম্বলের ওম নিয়ে পা গুটিয়ে বসে আছে নৌশি। একপাশে তৃণা আর অন্যপাশে মিতু। রোহান আজ অফিসে গিয়েছে,আসলে দেশে স্থায়ী হওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর অফিসের কাজগুলো বুঝে নিতে সে বেশ মনযোগী।
তৃণার মনটা আজ ফুরফুরে। সকালের সেই মায়া আর ছাদের খুনসুটির রেশ যেন কাটছেই না। এরই মাঝে হঠাৎ ঝড়ের বেগে ঘরে ঢুকল আদনান। কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে সে সোজা বিছানার মাঝখানে এক প্রকান্ড লাফ দিয়ে বসল। ঝাকুনিতে পুরো বিছানা কেঁপে উঠল, সাথে তিনজনের ধ্যানও ভেঙে গেল।
নৌশি তো রেগে আগুন! সে আদনানের পিঠে সজোরে এক লাথি বসিয়ে দিয়ে বলল,
“তুই এত বড় গরু কেন? এভাবে কেউ বিছানায় উঠে বসে? আমাদের হার্ট অ্যাটাক করিয়ে দিবি নাকি?”
আদনান একটুও ঘাবড়াল না, উল্টো জিভ ভেঙিয়ে বলল,
“আমি গরু হলে তুই হলি এক নম্বর ছাগল!”
নৌশি দাঁত কিড়মিড় করে তেড়ে আসতে নিলে মিতু দুজনকে ধমকে শান্ত করল। আদনান এবার হঠাৎ খুব গম্ভীর আর সিরিয়াস হয়ে বসল। গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
“শোনো আমার কলিজার দুই ভাবিরা, তোমাদের সাথে একটা অতি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ করতে এসেছি।”
পরামর্শের কথা শুনে মিতু আর তৃণার চেয়ে নৌশিই বেশি আগ্রহী হয়ে উঠল। সে ভ্রু নাচিয়ে সামনে ঝুঁকে বসল। তৃণা হাসি মুখে বলল,
“হুম, বলো কী এমন পরামর্শ?” মিতুও সায় দিয়ে বলল, “খুবই তো সিরিয়াস মনে হচ্ছে, ঘটনা কী?”
আদনান এবার উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে বলল,
“জীবনে এই প্রথম কোনো এক মানবীকে আমার এই পাষাণ হৃদয়ে মনে ধরেছে!”
কথাটা বলেই সে জানালার ওপারে আকাশের দিকে তাকিয়ে গালে আঙুল ঠেকিয়ে এক অতল ভাবনার জগতে হারিয়ে গেল।
মিতু আর তৃণার চোখেমুখে তখন আকাশছোঁয়া উত্তেজনা। তারা ভাবছে কে সেই মেয়ে? কিন্তু নৌশির ভাবভঙ্গি একেবারেই উল্টো। সে আদনানের এই তথাকথিত প্রেমরোগের কথা শুনে মুখটা এমন করল যেন তেতো কোনো ওষুধ খেয়েছে।
নৌশি ঠোঁট বাঁকিয়ে ব্যঙ্গাত্মক স্বরে বলে উঠল,
“এসব হুদাই ভাবিরা। ওর কথার কোনো দাম নেই। এই তো দেখবেন দুদিন পর এসেই বলবে নাহ, মেয়েটাকে আর ভালো লাগছে না। এর আগেও তো কতবার এমন হলো!”
আদনান এবার সত্যি সত্যি চটে গেল। সে বেশ গুরুগম্ভীর হয়ে বুক ফুলিয়ে বলল,
“না, এবার আমি সিরিয়াস বলছি। এই প্রথম কাউকে আমার এতটা ভালো লেগেছে। এটা দুই দিনের মোহ না নৌশি, বেশ অনেক দিন ধরেই আমার মনের ভেতরে ও আছে। কিন্তু কেন জানি কিছুতেই বলে উঠতে পারছি না।”
আদনানের গলার স্বরে এক ধরনের অন্যরকম আকুলতা ছিল। মিতু বেশ উৎসাহ নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“তাহলে তো দারুণ ব্যাপার! তা এত দেরি করছ কেন? সাহস করে প্রপোজ করে ফেলো।”
নৌশি এতক্ষণ তর্ক করলেও এখন হঠাৎ চুপ হয়ে গেল। মেয়েটার উজ্জ্বল চোখে কেমন একটা মেঘলা ছায়া পড়ল, যা কারো নজরে এল না। আদনান আবারও ভাবিদের দিকে তাকিয়ে বলল,
“এই জন্যেই তো তোমাদের কাছে আসা। এবার বুদ্ধি দাও তো, মেয়েটাকে প্রপোজ করব কী দিয়ে? মানে কীভাবে শুরু করলে কাজ হবে?”
তৃণা মিষ্টি করে হেসে বলল,
“মেয়েরা সাধারণত ফুল খুব পছন্দ করে। সুন্দর একগুচ্ছ ফুল নিয়ে প্রপোজ করো, দেখবে না করবে না।”
আদনান মাথা চুলকে বলল, “হুম, আইডিয়াটা মন্দ না। কিন্তু কী ফুল দেব? গোলাপ তো বড্ড কমন হয়ে গেছে। সবাই গোলাপ দেয়। অন্য কোনো আনকমন ফুলের কথা বলো তো।”
নৌশি এবার মুখ ঝামটা দিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল,
“একটা কাজ কর, এক বিশাল বড় দেখে ফুলকপি কিনে নিয়ে যা। এর চেয়ে আনকমন আর কিছু হতে পারে না। পৃথিবীর কোনো প্রেমিক আজ পর্যন্ত ফুলকপি দিয়ে প্রপোজ করেছে বলে আমার জানা নেই।”
নৌশির এমন অদ্ভুত আর উদ্ভট বুদ্ধির কথা শুনে মিতু আর তৃণা দুজনেই হাসিতে ফেটে পড়ল। আদনান মেজাজ হারিয়ে নৌশির মাথায় আলতো করে একটা চড় লাগিয়ে দিয়ে বলল,
“তোর কাছে বুদ্ধি চাওয়াই আমার ভুল হয়েছে! যা তো এখান থেকে।”
সাধারণত এমন চড় খেলে নৌশি লঙ্কাকাণ্ড বাধিয়ে দেয়, কিন্তু আজ সে অদ্ভুতভাবে শান্ত রইল। কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে, বরং এক পলক আদনানের দিকে তাকিয়ে ধীরপায়ে বিছানা থেকে নামল। তারপর কারো কোনো কথার উত্তর না দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। তার এই হঠাৎ চলে যাওয়াটা ঘরের হাসিখুশি পরিবেশটাকে এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ করে দিল।
★★★
সন্ধ্যার আঁধার ঘনীভূত হয়ে চারপাশটা যেন এক মায়াবী চাদরে ঢাকা পড়েছে। আরিয়ান তার রুমের করিডরে দাঁড়িয়ে আছে। সামনে দৃষ্টি যতদূর যায়, সবটাই ঘন কুয়াশার রাজত্ব। সেই কুয়াশার চাদর ভেদ করে রাস্তার সোডিয়ামের আলো কোনোমতে টিমটিম করে জ্বলছে। নিচে ড্রয়িংরুম থেকে সবার হাসাহাসি আর গল্পের আওয়াজ আসছে, তৃণা বোধহয় সবার সাথে আড্ডায় মেতেছে।
আরিয়ান ধীর পায়ে রুমে ফিরে এসে নিঃশব্দে ড্রয়ারটা খুলল। সেখান থেকে বের করে আনল একটি ছোট্ট মখমলের লাল বক্স। বক্সটা হাতে নিয়ে সে আবারও বারান্দার হিমশীতল বাতাসে এসে দাঁড়াল। হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় শরীর প্রায় জমে যাওয়ার উপক্রম, কিন্তু আরিয়ানের কাছে এই শীতলতাই যেন এখন চরম শান্তির।
লাল বক্সটি খুলতেই ভেতরের রুপালি নূপুরটি সোডিয়ামের মৃদু আলোয় চিকচিক করে উঠল। এটি সেই নূপুর, যা সে পাহাড়ের সেই রহস্যময়ী মেয়েটির কাছে পেয়েছিল। নূপুরটার দিকে তৃষ্ণার্থ চোখে তাকিয়ে আরিয়ান অস্ফুট স্বরে বলে উঠল,
“ওহে মায়াবতী কন্যা, তোমাকে কি এই জনমে আর খুঁজে পাওয়া হবে? কী এমন নেশা তোমার মাঝে ছিল যে, যে মেয়েটির মুখ পর্যন্ত আমি ঠিক করে দেখতে পাইনি, তার জন্যই আমার হৃদয়টা এভাবে পুড়ে ছারখার হচ্ছে? কেউ শুনলে হয়তো আমাকে উন্মাদ বলবে। সত্যিই তো, আমি পাগল! পাগল না হলে কি কেউ মাত্র কয়েক সেকেন্ডের দেখাকে এভাবে সারাজীবনের জন্য আগলে রাখে?”
আরিয়ান বুকভরে একটা দীর্ঘশ্বাস নিল। উত্তুরে হাওয়া তার চোখেমুখে আছড়ে পড়ছে, কিন্তু সেদিকে তার বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই। তার পুরো অস্তিত্ব জুড়ে তখন সেই পাহাড়ের স্মৃতি। হঠাৎ পেছনের নিস্তব্ধতা ভেঙে তৃণার মিষ্টি কিন্তু কৌতুকভরা ডাক ভেসে এল,
“রাগী সাহেব!”
চমকে উঠল আরিয়ান। মুহূর্তেই হাতের মুঠোয় লাল বক্সটা আড়াল করার চেষ্টা করল সে। পেছন ফিরে তাকাতেই দেখল তৃণা দরজায় দাঁড়িয়ে হাসিমুখে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
আরিয়ান অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সাথে হাতের লাল বক্সটা জ্যাকেটের পকেটে লুকিয়ে ফেলল। এক মুহূর্তের জন্য তার হৃদস্পন্দন থমকে গিয়েছিল। সে নিজেকে সামলে নিয়ে খুব স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে তৃণার দিকে ফিরল।
তৃণা দরজার কোণে দাঁড়িয়ে ছিল। আরিয়ানের এই তড়িঘড়ি কোনো কিছু লুকিয়ে ফেলাটা তার তীক্ষ্ণ নজর এড়ায়নি। সে স্পষ্ট বুঝতে পারল আরিয়ান তার থেকে কিছু একটা গোপন করল। কিন্তু তৃণা নিজেকে সংযত রাখল। তার আর আরিয়ানের মাঝে তো কোনো ভালোবাসার দাবি নেই, নেই কোনো গভীর বিশ্বাসের লেনদেন। আজ যদি তার পূর্ণ অধিকার থাকত, তবে হয়তো সে জোর করে ওই হাতের মুঠোটা খুলতে চাইত। কিন্তু অকারণে অধিকার ফলানোর মানে সে জানে না।
আরিয়ান ম্লান হেসে জিজ্ঞেস করল,
“কিছু বলবে?”
তৃণা শান্ত স্বরে উত্তর দিল,
“হ্যাঁ, নিচে সবাই আপনাকে ডাকছে।”
“সবাই মানে?” আরিয়ানের কণ্ঠে কৌতূহল।
“সবাই মানে বাবা, বড় আব্বু, চাচ্চু আর রোহান ভাইয়া। সবাই একসাথে বসে আড্ডার আসর জমিয়েছেন, আপনাকে ছাড়া নাকি আড্ডা জমছে না।”
“ও আচ্ছা, চলো নিচে যাই,” বলেই আরিয়ান যাওয়ার জন্য পা বাড়াল। কিন্তু তৃণা আর কিছু না বলে ধীরপায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে শুরু করলে আরিয়ান হঠাৎ থেমে গেল। এক অদ্ভুত টান অনুভব করল সে। আচমকা পেছন থেকে ডেকে উঠল,
“শোনো!”
তৃণার পা দুটো মুহূর্তেই থেমে গেল। আরিয়ানের কণ্ঠস্বরটা আজ কেন যেন বড্ড অন্যরকম শোনাল একটু ভারী, একটু কোমল। তৃণা ধীরপায়ে পেছন ফিরে তাকাল। তার দুচোখে জিজ্ঞাসা। খুব নিচু স্বরে সে বলল,
“হুহ?”
আরিয়ান কয়েক কদম এগিয়ে তৃণার একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। সে তার প্যান্টের পকেটে হাত গুঁজে তৃণার চোখের দিকে গভীর মনোযোগ দিয়ে তাকাল। তার কণ্ঠে এখন গাঢ় শূন্যতা। সে ফিসফিস করে বলল,
“সকল স্ত্রী তো তার স্বামীর থেকে অধিকার চায়, ভালোবাসা আর যত্ন চায়। তোমার কি কখনো এসব পেতে ইচ্ছে হয় না তৃণা? কখনো কি আমার ওপর তোমার রাগ হয় না?”
তৃণা পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। আরিয়ানের এমন আচমকা প্রশ্নে তার বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠল।
আরিয়ানের কথা শুনে তৃণা একচিলতে করুণ হাসি হাসল। সেই হাসিতে কোনো আনন্দ ছিল না, ছিল কেবল এক বুক হাহাকার। সে মাথা নিচু করে খুব শান্ত গলায় জবাব দিল,
“যে জিনিস আমি জানি চেয়ে পাব না, সে জিনিসের আশা করে লাভ কী? কারো কাছে চেয়ে অপমানিত হওয়ার চেয়ে না চেয়ে চুপ থাকাটাই শ্রেয়।”
তৃণা থামল। আরিয়ান স্তব্ধ হয়ে তৃণার ঝাপসা হয়ে আসা মুখটার দিকে তাকিয়ে রইল। মেয়েটার কণ্ঠে আজ কোনো অভিযোগ নেই, শুধু আছে এক চরম সত্যের স্বীকারোক্তি। তৃণা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবারও বলল,
“এমনিতেও আমার কপালে কোনোদিন সুখ সয় না। একটা তিক্ত কথা আছে না,কুকুরের পেটে ঘি হজম হয় না? ঠিক তেমনি আমার মতো অভাগিদের কপালে সুখটা ঠিক হজম হয় না। যখনই মনে হয় একটু ভালো আছি, তখনই কোনো না কোনো ঝড় এসে সব লন্ডভন্ড করে দেয়।”
আরিয়ান অস্ফুট স্বরে বলতে চাইল,
“আমি আসলে ওই মেয়েটাকে…”
তৃণা হাত উঁচিয়ে তাকে থামিয়ে দিল। তার চোখেমুখে এখন এক কঠিন দৃঢ়তা। সে কিছুটা কঠোর স্বরেই বলল,
“থাক, বারবার একই কথা আমাকে স্মরণ করিয়ে দিতে হবে না। আমার স্মরণশক্তি যথেষ্ট ভালো, আপনার হৃদয়ে কার স্থান সেটা আমার মনে থাকে।”
তৃণার চোখের কোণে এক ফোঁটা অবাধ্য জল টলমল করে উঠল। নিজের এই দুর্বলতাটুকু আরিয়ানের সামনে প্রকাশ করতে চাইল না সে। তাই এক মুহূর্ত আর না দাঁড়িয়ে মাথা নিচু করে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
আরিয়ান দীর্ঘক্ষণ তৃণার যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল। তার বুকটা যেন এক অজানা ভারে চেপে আসছে। সে মুখটা সামান্য ফাঁক করে একটা লম্বা দম নিল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিই ঘৃণা জন্মাল তার। আরিয়ান বিড়বিড় করে নিজেকেই শোনাল,
“সত্যিই মেয়েটার সাথে আমি বড় অন্যায় করছি। একটা মিথ্যে বন্ধনে ওকে আটকে রেখে ওর জীবনটা তিলে তিলে শেষ করে দিচ্ছি। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওকে আমার থেকে মুক্তি দিতে হবে। আমার এই অন্ধকার জীবন থেকে দূরে গিয়ে হয়তো ও নিজের মতো করে একটা সুখের ঘর বাঁধতে পারবে।”
★★★
আরিয়ান নিচে নেমে আসতেই চোখে পড়ল এক দারুণ জমজমাট দৃশ্য। ড্রয়িংরুমটা যেন আজ চাঁদের হাট। একদিকে বাড়ির পুরুষেরা গোল হয়ে বসেছেন, আর একটু দূরত্ব বজায় রেখে মহিলারা নিজেদের আড্ডায় মশগুল। সচরাচর মহিলারা পুরুষদের গম্ভীর অফিসের আলাপের মাঝে থাকতে চান না, কারণ সেখানে ডাল-চালের চেয়ে শেয়ার বাজারের হিসেবটাই বেশি থাকে।
আরিয়ান গিয়ে তার ছোট চাচ্চু এনামুল মির্জার পাশে ধপ করে বসল। সেন্টার টেবিলের ওপর সাজানো ধোঁয়া ওঠা গরম চা, বিস্কুট আর মচমচে সাদা মুড়ি। ফারহানা বেগম হাসিমুখে আরিয়ানের হাতে চায়ের কাপটা ধরিয়ে দিলেন। আজ নুসরাতও হোস্টেল থেকে বাড়ি ফিরেছে।
আরিয়ান বসা মাত্রই দুষ্টুমি করে এনামুল মির্জার পেটে বরফ শীতল হাতটা রাখল। চাচ্চু চমকে উঠে কেঁপে উঠলেন। আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে বললেন,
“কী রে! তুই কি মাত্র বরফ জল দিয়ে গোসল করে আসলি? হাত এতো ঠান্ডা কেন?”
আরিয়ান সে কথার জবাব না দিয়ে চাচ্চুর পেটে হাত বুলিয়ে টিপ্পনী কাটল,
“যাক, তোমার ভুঁড়িটা দেখছি এবার আগের চেয়ে অনেকটা কমেছে!”
এনামুল মির্জা গর্বের হাসি হেসে বললেন,
“হ্যাঁ, তুই যে ব্যায়ামগুলো করতে বলেছিলি, ওগুলো নিয়মিত করার ফল এটা। যা, খুশি হয় তোকে একটা বড় চকলেট কিনে দেব!”
কথাটা শুনে আরিয়ান হেসে উঠল। ছোটবেলায় যেকোনো আবদার, বিশেষ করে চকলেটের জন্য সে এই এনামুল মির্জার ওপরই সবচেয়ে বেশি জুলুম করত। সেই ছোটবেলার স্মৃতি যেন মুহূর্তেই ড্রয়িংরুমে জীবন্ত হয়ে উঠল।
ঠিক তখনই আদনান শিস বাজাতে বাজাতে রাজকীয় ভঙ্গিতে নিচে নামছিল। কিন্তু ড্রয়িংরুমে বড়দের বিশাল জমায়েত দেখে ওর শিস বাজানো মাঝপথে থমকে গেল। সে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে সবার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। আদনানের টি-শার্টের ওপর শার্ট পরা, কিন্তু বোতামগুলো সব খোলা একদম হিরো স্টাইল।
আরিয়ান সুযোগ বুঝে উঠে গিয়ে এক টানে আদনানের কান মুচড়ে ধরল। আদনান ব্যথায় ককিয়ে উঠে বলল, “উফফ ভাইয়া! ছাড়ো, করছোটা কী?”
আরিয়ান ধমকের সুরে বলল,
“তোর বখাটেপনা কি দিন দিন বাড়তেই থাকবে? শার্টের বোতাম খোলা কেন?”
আদনান কান ডলতে ডলতে দ্রুত বোতাম লাগাতে শুরু করল। তবে ছাড়ার পাত্র সেও নয়। গাল ফুলিয়ে বলল,
“তুমি এখন ভীষণ ভদ্র সাজছ ভাইয়া! তোমার পুরোনো ছবিগুলো আমি দেখেছি, কানে দুল আর মাথার চুল অব্দি নীল-সোনালি রঙ করা ছিল। তখন কি আমি বখাটে বলতাম?”
আরিয়ান অপ্রস্তুত হয়ে ধমক দিল,
“তুই আমার ভাই নাকি আমার লুকানো শত্রু রে?”
আরিয়ানের অতীত বখাটেপনার কথা মনে পড়ে ড্রয়িংরুমে হাসির রোল পড়ে গেল। সত্যি বলতে, আরিয়ান আগে বেশ বেপরোয়া ছিল, আর সেই পুরোনো দিনের গল্পগুলো এই শীতের সন্ধ্যায় আড্ডায় নতুন প্রাণ ফিরিয়ে আনল।
আহাদ মির্জা চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে বেশ গম্ভীর গলায় বললেন,
“শোন আরিয়ান, ময়মনসিংহে আমাদের যে টেক্সটাইল অফিসটা আছে, সেখানে তোর একবার যাওয়া খুব দরকার। ওখানকার ম্যানেজারকে আমি ইদানীং ঠিক ভরসা করতে পারছি না। তুই নিজে গিয়ে হিসাবপত্র আর স্টকটা একবার দেখে আয়।”
আরিয়ান বিনম্রভাবে মাথা নাড়িয়ে সায় দিল, “আচ্ছা আব্বু, ঠিক আছে। আমি কাল-পরশুর মধ্যেই ব্যবস্থা করছি।”
ঠিক তখনই এনামুল মির্জা সুযোগ বুঝে বলে উঠলেন,
“হ্যাঁ আরিয়ান, তুই আরেকটা কাজ করতে পারিস। বিয়ের পর তো তৃণা মা’কে নিয়ে কোথাও ঘুরতে যাসনি। তুই বরং ওকে নিয়েই যা। অফিসের কাজও হয়ে যাবে, আবার দুজনে একটু ঘুরেও আসতে পারবি। সারাক্ষণ তো চার দেয়ালের মাঝেই বন্দি থাকে মেয়েটা।”
তৃণাকে নিয়ে যাওয়ার কথা শুনেই আরিয়ানের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। সে সাথে সাথে আপত্তি জানিয়ে বলল,
“না চাচ্চু, ওকে নিয়ে যাওয়ার কোনো দরকার নেই। একা যাওয়াই ভালো, কাজ তাড়াতাড়ি শেষ হবে। আর ওখানে গিয়ে ও ঘুরবেই বা কোথায়? ঘুরার মতো তেমন কিছু আছে নাকি?”
আহাদ মির্জা এবার ছেলের দিকে কিছুটা কড়া নজরে তাকিয়ে বললেন,
“কী নেই মানে? ময়মনসিংহের কিসের কমতি আছে শুনি? আর তুই মনে হয় ভুলে যাচ্ছিস, ওটাই আমাদের পৈতৃক নিবাস। ওখানকার স্কুল-কলেজেই আমি আর তোর চাচ্চু বড় হয়েছি। ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ে একবার বসলে একটা যুগও অনায়াসে পার করে দেওয়া যায়। ওখানকার মিষ্টি হাওয়া, জয়নুল আবেদিন পার্ক সব মিলিয়ে এক মনোরম পরিবেশ। আমাদের বাংলোটাও তো একদম নদের কাছেই।”
আরিয়ান দোটানায় পড়ে গেল। কিন্তু বাবার মুখের ওপর কথা বলার সাহস তার নেই। আহাদ মির্জা চূড়ান্ত নির্দেশ দিয়ে দিলেন,
“আমি কোনো কথা শুনতে চাই না। আগামীকাল সকালেই তোরা রওনা দিবি। এটাই ফাইনাল।”
আরিয়ান আর কিছু বলতে পারল না। যদিও তার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই তৃণাকে সাথে নেওয়ার, কিন্তু পরিস্থিতির চাপে পড়ে সে আজ নিরুপায়।
★★★
রাত প্রায় দশটা। নুসরাত নিজের রুমে ঢুকে ধপ করে বিছানায় বসল। হাতে সেই মোটা বইটা, যা নিয়ে সে ড্রয়িংরুমে সবার আড্ডার মাঝেও মুখ গুঁজে ছিল। এই নিয়ে নিচের সবাই মিলে কম ক্ষ্যাপায়নি তাকে! নুসরাত বইটা একপাশে রেখে জানালার দিকে তাকাল। বাইরে কুয়াশার চাদরটা আরও ঘন হয়েছে। আর এই কনকনে ঠাণ্ডা আর কুয়াশার কথা মনে পড়তেই তার মনের গহীনে একজনের চেহারা ভেসে উঠল নির্জন।
সেই যে নির্জন তার নাম্বারটা নিল, তারপর থেকে কথা খুব একটা হয় না। মাঝে মাঝে দু-একটা মেসেজ বা হাই-হ্যালো। কিন্তু আজকের এই নিস্তব্ধ রাতে নুসরাতের বড্ড ইচ্ছে করছে লোকটার সাথে একটু কথা বলতে। নির্জনের কথা ভাবতেই নুসরাতের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। সে ফোনটা হাতে নিয়ে কন্টাক্ট লিস্টে গিয়ে বের করল সেই নাম্বারটা, যা সে ‘বাদামওয়ালা’ নামে সেভ করে রেখেছে।
কল বাটনটা চাপতে গিয়েও নুসরাত থেমে গেল। মন চাইছে কথা বলতে, কিন্তু ইগো বলছে না, মেয়ে হয়ে আগে কল দেওয়াটা কি ঠিক হবে? দ্বিধাদ্বন্দ্বের মাঝে থাকতে থাকতেই হঠাৎ ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠল। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে নুসরাত থমকে গেল। কল আসছে সেই ‘বাদামওয়ালা’র কাছ থেকেই!
নুসরাতের মুখে এক চিলতে জয়ের হাসি। কলটা রিসিভ করেই সে গম্ভীর হওয়ার ভান করে বলল,
“আসসালামু আলাইকুম বাদামওয়ালা।”
ওপাশ থেকে নির্জনের সেই পরিচিত ভরাট কণ্ঠের হাসি ভেসে এল।
“ওয়ালাইকুম আসসালাম চশমাওয়ালা ম্যাডাম। কী অবস্থা আপনার? বিশ্বাস করো, আজ সারাদিন আপনার ওই চশমা পরা মুখখানা দর্শন করতে পারিনি বলে আমার দিনটা একদম পানসে কেটেছে।”
নুসরাত একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কেন?মানে কি হয়েছে? আপনার দিন ভালো যাওয়ার সাথে আমার চেহারার কী সম্পর্ক?”
“সম্পর্ক তো আছেই। আজ বাইক নিয়ে একটা ছোটখাটো এক্সিডেন্ট করেছিলাম তো, তাই…”
পুরো কথা শেষ হওয়ার আগেই নুসরাত আঁতকে উঠল। তার বুকের ভেতরটা যেন মোচড় দিয়ে উঠল। সে ব্যাকুল হয়ে বলল, “সে কী! এক্সিডেন্ট কীভাবে করলেন? বেশি লেগেছে? অনেক ব্যথা পেয়েছেন?”
নুসরাতের গলায় মাখানো নিখাদ দুশ্চিন্তা শুনে ওপাশ থেকে নির্জন মৃদু হাসল। অত্যন্ত শান্ত গলায় বলল,
“আরে নাহ নাহ, তেমন কিছু না। শুধু পায়ের পাতায় একটু চোট পেয়েছি এই যা। আপনি এত চিন্তা করছেন জেনে এখন মনে হচ্ছে এক্সিডেন্টটা হওয়া দরকার ছিল।”
নুসরাত কিছু বলতে চাইল, কিন্তু লজ্জায় শব্দ খুঁজে পেল না। নির্জন সুযোগ বুঝে এবার আসল কথাটা পেড়ে বসল। তার কণ্ঠে এখন গভীর এক আবেদন,
“শুনুন না ম্যাডাম। এই হাড়কাঁপানো শীতে সিঙ্গেল থাকা বড্ড কষ্টের। আমার আর একা থাকতে একদম ভালো লাগছে না। ভাবছি খুব শিগগিরই মা-বাবাকে আপনাদের বাড়িতে পাঠাব বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে। আপনি কী বলেন?”
নুসরাত যেন আকাশ থেকে পড়ল। যে মেয়েটা সাধারণত কাউকে এক চুল ছাড় দিয়ে কথা বলে না, সেই নুসরাতের গাল দুটো আজ মুহূর্তেই লাল হয়ে উঠল। সে কোনোমতে তোতলামি করে বলল, “আ… আপনার যা ইচ্ছে হয় করুন।”
বলেই সে ঝটপট কলটা কেটে দিল। ফোনের ওপাশে নির্জনের হাসিমুখটা কল্পনা করে তার সারা শরীরে এক অজানা শিহরণ বয়ে গেল। নুসরাত দুই হাত দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে বিছানায় গা এলিয়ে দিল। অদ্ভুত এক ভালো লাগায় তার মনটা আজ কুয়াশার চেয়েও বেশি মায়াবী হয়ে উঠেছে।
চলবে…
ভুল ত্রুটি হলে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন☺️
Share On:
TAGS: নিলুফা নাজমিন নীলা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৫
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১৭
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২৩
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৬
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২৮
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২৫
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২৪
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১৮
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২১