রোদ্দুরেরছেঁড়ামানচিত্র
পর্ব_২০
কলমে #নিলুফানাজমিননীলা
★★★
রাত তখন গভীর। চারপাশ পিনপতন নীরবতায় ছেয়ে গেছে। সাধারণ একটি বেডরুম, কিন্তু সব বাতি নেভানো থাকায় চারদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার। জানালা-দরজা সব ভেতর থেকে শক্ত করে বন্ধ করা। রুমের এক কোণে নিঃশব্দে বসে আছে এক যুবক, তার আঙুলের ফাঁকে জ্বলন্ত সিগারেট। সিগারেটের মৃদু আগুনের আভায় মাঝে মাঝে ছেলেটার মুখ স্পষ্ট হচ্ছে সে তৌহিদ। ইদানীং তার বেশিরভাগ রাত এভাবেই কাটে।
তৌহিদ ধীর পায়ে উঠে দাঁড়াল। ড্রয়ার থেকে কয়েকটা মোমবাতি বের করে সেগুলোকে একে একে জ্বালালো। মোমবাতির মায়াবী আলোয় পুরো ঘর যখন আলোকিত হলো, তখন ঘরের দেওয়ালের দিকে তাকালে যে কেউ আঁতকে উঠবে। পুরো দেওয়াল জুড়ে কেবল তৃণার ছবি। ছবিগুলো দূর থেকে চুরি করে তোলা, কখনো বা আড়ালে থেকে।
তৌহিদ অপলক দৃষ্টিতে ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল। নিজের অজান্তেই তার চোখ বেয়ে তপ্ত জল গড়িয়ে পড়ল। সে একা একা বিড়বিড় করে বলতে লাগল,
“তৃণা… তুমি তো ঠিকই নিজের সংসার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেছ। কিন্তু আমার কেন কোনো কিছুতেই মন বসে না? তোমাকে যদি পেয়ে যেতাম, তবে জীবনের সবচেয়ে সুন্দর উপহারটা হয়তো আমারই হতো। কিন্তু দেখো আমার কপাল! তুমি আমার নসিবে নেই। এই মুহূর্তে হয়তো তুমি তোমার স্বামীর বুকে পরম শান্তিতে ঘুমিয়ে আছো।”
তৌহিদ কেবল হাহাকার ভরা দৃষ্টিতে দেওয়ালের ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল। এই স্থির ছবিগুলোই এখন তার বেঁচে থাকার একমাত্র সম্বল, তার একতরফা ভালোবাসার বন্দিশালা।
★★★
ডাক্তারের কেবিনে বসে আছেন উমর হাওলাদার, আর তার ঠিক সামনেই গম্ভীর মুখে বসা নির্জন ইমতিয়াজ। উমর হাওলাদার ঠোঁটের কোণে মিচকে হাসি ঝুলিয়ে বললেন,
“কী ব্যাপার নির্জন? কয়েকদিন ধরে যে তোমাকে হাসপাতালে ঠিকঠাক খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না!”
নির্জন একটু অপ্রস্তুত হয়ে উত্তর দিল,
“না স্যার, তেমন কোনো বিশেষ ব্যাপার না। একটু ব্যস্ত ছিলাম আরকি।”
উমর হাওলাদার এবার বাঁকা চোখে তাকিয়ে বললেন, “তা ব্যস্ততাটা কিসের শুনি? আমি তো শুনলাম তুমি নাকি ইদানীং বাদামের ব্যবসা শুরু করেছ?”
সাফল্যমণ্ডিত একজন প্রবীণ চিকিৎসকের মুখে এমন কথা শুনে নির্জন একেবারে থতমত খেয়ে গেল। সে কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছে না এই খবর স্যারের কানে গেল কীভাবে। তাকে ওভাবে ভড়কে যেতে দেখে উমর হাওলাদার হাসতে হাসতে বললেন,
“আরে, এতে এত ভয় পাওয়ার কী আছে? নতুন নতুন প্রেমে পড়লে মানুষ কত কী-ই তো করে! আমার কথাই ধরো না…”
কথাটা বলতে বলতে উমর হাওলাদার হঠাৎ থামলেন। তার চোখে এক মুহূর্তের জন্য পুরোনো কোনো স্মৃতি ঝিলিক দিয়ে উঠল। নির্জন কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কেন স্যার? আপনিও কি প্রেমে পড়েছিলেন?”
উমর হাওলাদার জানালা দিয়ে বাইরের আকাশের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“আমাদের আমলের প্রেম তো তোমাদের মতো এমন ছিল না। আমরা ছিলাম নব্বই দশকের প্রেমিক। মেহেরজানের এক পলক দেখার জন্য কত ক্লাস ফাঁকি দিয়েছি, কত প্রহর তাদের বাড়ির সামনে ঠায় দাঁড়িয়ে থেকেছি তার কোনো হিসেব নেই।”
নির্জন মুগ্ধ হয়ে প্রবীণ এই মানুষটির রোমাঞ্চকর প্রেমের গল্প শুনছিল। কিন্তু হঠাৎ খেয়াল করল, উমর হাওলাদারের হাসিখুশি মুখে একটা গভীর বিষণ্নতার ছায়া নেমে এসেছে। নির্জন খুব নিচু স্বরে বলল,
“ম্যাডামের কথা আপনার খুব মনে পড়ে, তাই না স্যার?”
উমর হাওলাদার ম্লান হেসে উত্তর দিলেন,
“মনে পড়া তো স্বাভাবিক। নিজের প্রিয়তমাকে ছাড়া এতগুলো বছর একা বেঁচে আছি, এটাই তো অনেক বড় ব্যাপার।”
নির্জন আর কিছু বলতে পারল না। সে বুঝল, আধুনিক যুগের অস্থির ভালোবাসার চেয়ে নব্বই দশকের সেই ত্যাগের মহিমা ছিল অনেক বেশি শক্তিশালী। উমর হাওলাদার কিছুক্ষণ নীরব থেকে আবার নির্জনের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“শোনো নির্জন, যাকে সত্যিই ভালোবাসো তাকে সোজা বিয়ে করে নাও। আজকের দিনে যতই গভীর প্রেম হোক না কেন, সামান্য তুচ্ছ কারণেই তা ভেঙে যায়। সময় থাকতে প্রিয় মানুষকে আগলে রাখো।”
নির্জন এবার একটু লাজুক হেসে মজা করে বলল,
“কিন্তু স্যার, একজন সাধারণ বাদামওয়ালার কাছে কি কেউ নিজের মেয়ে বিয়ে দেবে?”
নির্জনের এই কথা শুনে উমর হাওলাদার এবার হো হো করে শব্দ করে হেসে উঠলেন।
★★★
আরিয়ান অফিসে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে। অথচ ঠিক শেষ মুহূর্তে তার ওয়ালেটটা খুঁজে পাচ্ছে না। এমনিতে অফিসে যেতে দেরি হয়ে যাচ্ছে, তার ওপর এই ছোটখাটো ঝামেলা আরিয়ানের মেজাজটা আরও বিগড়ে দিল। সে অধৈর্য হয়ে কড়া গলায় তৃণাকে ডাকল। তৃণা কয়েক মিনিট পর ধীরলয়ে রুমে ঢুকে বলল,
“কী হয়েছে? এভাবে ডাকছেন কেন?”
আরিয়ান কপালে ভাঁজ ফেলে বলল,
“আমার ওয়ালেটটা কোথায় রেখেছ? খুঁজে পাচ্ছি না কেন?”
তৃণা আরিয়ানের মুখের দিকে তাকিয়ে একটু হেসেই বলল,
“এভাবে যে সারাক্ষণ ভ্রু কুঁচকে থাকেন, কপালে ব্যথা করে না আপনার?”
আরিয়ান এবার সত্যিই বিরক্ত হলো। নিজের ভ্রু স্বাভাবিক করে বলল,
“তৃণা, একদম মজা করো না। আমার অফিসে যাওয়ার সময় পার হয়ে যাচ্ছে!”
“কী অদ্ভুত! আপনার ওয়ালেট কোথায় রেখেছেন তা আমি কী করে বলব? নিজের জিনিস কি নিজে গুছিয়ে রাখতে পারেন না?”
তৃণার পাল্টা জবাবে আরিয়ান বেশ ক্ষিপ্ত হয়ে বলল,
“আমার জিনিস আগে যেখানে রাখতাম সেখানেই থাকত। কিন্তু তুমি এই রুমে আস্তানা গাড়ার পর থেকে আমি আর কোনো জিনিস সময়মতো খুঁজে পাই না।”
তৃণা আর কথা না বাড়িয়ে ওয়ালেটটা খুঁজতে শুরু করল। আর আরিয়ান গজগজ করতে করতে ল্যাপটপ আর প্রয়োজনীয় ফাইল ব্যাগে ঢুকাতে লাগল। তৃণা রুমের প্রায় সব জায়গা দেখে ফেলল, কিন্তু কোথাও নেই। শেষমেশ ড্রয়ারটা খুলতেই দেখল ওয়ালেটটা এক কোণে পড়ে আছে। তৃণা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ওয়ালেটটা হাতে নিল। কিন্তু ড্রয়ারটা বন্ধ করতে যাবে, ঠিক তখনই তার চোখ পড়ল একদম পেছনে রাখা একটা ছোট লাল বক্সের ওপর।
কৌতূহলবশত তৃণা বক্সটা হাতে নিল।
কিন্তু সেটা খোলার আগেই আরিয়ান ঝড়ের বেগে এসে তৃণার হাত থেকে বক্সটা একরকম ছিনিয়ে নিল। তৃণা হকচকিয়ে গেল। সে অবাক হয়ে দেখল, মুহূর্তের মধ্যে আরিয়ানের চোখ দুটো রাগে লাল হয়ে উঠেছে।
তৃণা থতমত খেয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কী আছে এটাতে? এভাবে হাত থেকে কেড়ে নিলেন কেন?”
আরিয়ান দাঁতে দাঁত চেপে গম্ভীর স্বরে বলল,
“তোমাকে দেখতে হবে কেন? খবরদার! আমার পার্সোনাল বিষয়ে একদম হাত দেবে না।”
আরিয়ানের এই রহস্যময় আচরণে তৃণার জেদ আরও বেড়ে গেল। সে শক্ত গলায় পালটা প্রশ্ন করল,
“কী আছে এটাতে এমন যে আপনার চোখ দুটো রক্তের মতো লাল হয়ে যাচ্ছে?”
আরিয়ান এবার নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে চিৎকার করে উঠল,
“তোমাকে আগেও বলেছি তুমি নিজের সীমার মাঝে থাকতে! তবুও কেন তুমি বারবার আমার পার্সোনাল বিষয়ে নাক গলাও? কার অনুমতি নিয়েছ তুমি আমার ড্রয়ারে হাত দেওয়ার?”
আরিয়ানের এই প্রচণ্ড চিৎকারে তৃণা স্তব্ধ হয়ে গেল। পুরো রুমে এক থমথমে নীরবতা নেমে এল।
আরিয়ানের হঠাৎ করা এই উন্মত্ততায় তৃণা যেন পাথর হয়ে গেল। সামান্য একটা বক্স দেখতে চাওয়ায় মানুষটা এমন হিংস্র হয়ে উঠতে পারে, সেটা তার ধারণার বাইরে ছিল। আরিয়ানের ধাক্কায় তৃণা সামলে নিলেও তার মনের ভেতরটা দুলে উঠল। সে স্পষ্ট দেখতে পেল আরিয়ানের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে, আর তার চোখের মণি দুটো অস্থির হয়ে এদিক-ওদিক ঘুরছে।
আরিয়ান তার গায়ের কোটটা রাগে বিছানায় ছুঁড়ে মারল। তৃণা ভাবল আরিয়ান হয়তো অসুস্থ বোধ করছে, সে একটু সাহস করে আরিয়ানের হাত ধরতে গেল তাকে শান্ত করার জন্য। কিন্তু স্পর্শ করা মাত্রই আরিয়ান যেন ইলেকট্রিক শট খেল। সে ঝাড়া দিয়ে তৃণার হাত সরিয়ে দিয়ে জানোয়ারের মতো গর্জন করে উঠল,
“তোমাকে সাহস কে দিয়েছে আমার রুমে আসার? বের হও এখান থেকে! এখনই বের হও!”
তৃণা তবুও স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার এই স্থবিরতা আরিয়ানকে আরও খেপিয়ে দিল। আরিয়ানের এখনের আচরণ দেখে মনে হচ্ছে সে তৃণাকে চিনেই না।সে একরকম হিড়হিড় করে টেনে তৃণাকে রুমের বাইরে বের করে দিয়ে সজোরে দরজাটা বন্ধ করে দিল।
তৃণা করিডোরে একা দাঁড়িয়ে রইল। আশ্চর্যের বিষয় হলো, অন্য সময় হলে সে হয়তো অপমানে কেঁদে ফেলত বা আরিয়ানের ওপর ভীষণ রেগে যেত, কিন্তু আজ তার কিছুই হলো না। বরং তার মনের কোণে এক অদ্ভুত সহানুভূতি জেগে উঠল। আরিয়ানের চোখে সে আজ রাগ দেখেনি, দেখেছিল এক গভীর যন্ত্রণা আর হাহাকার। ছেলেটা ভেতরে ভেতরে কোনো এক অদৃশ্য দহনে পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে।
তৃণা বিড়বিড় করে নিজেকেই প্রশ্ন করল, “কী এমন অতীত লুকিয়ে আছে ওই লাল বক্সটাতে? আরিয়ান কি মানসিকভাবে বিধ্বস্ত, নাকি অন্য কোনো রহস্য ওকে কুরে কুরে খাচ্ছে?”
তৃণার মনে পড়ল সেই রাতের কথা, যখন মিতু ভাবি বলেছিল সময় হলে সব খুলে বলবে। কিন্তু এই মুহূর্তে মিতু ভাবি নিজেই অসুস্থ এবং নিজের সংসার সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। তাকে কি এই অপ্রিয় প্রশ্নগুলো করা ঠিক হবে?
তৃণা দরজার ফাঁক দিয়ে একটু উঁকি দিল। দেখল আরিয়ান বেলকনির রেলিং ধরে শূন্য দৃষ্টিতে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে। মানুষটাকে বড্ড নিঃসঙ্গ দেখাচ্ছে। তৃণা আর ভেতরে ঢোকার সাহস পেল না। সে চুপচাপ নিচে নেমে গেল, তবে তার মনের ভেতর আরিয়ানকে নিয়ে এক রহস্যের জাল বুনতে শুরু করল। তাকে জানতেই হবে আরিয়ানের এই রুক্ষ স্বভাবের পেছনের আসল সত্যিটা।
★★★
মিতু এইমাত্র শাওয়ার নিয়ে বের হলো। হাসপাতালের সেই যন্ত্রণাদায়ক দিনগুলোর রেশ এখনো শরীরে রয়ে গেছে, হাতে ক্যানুলা আর ইঞ্জেকশনের নীলচে দাগগুলো এখনো টনটন করছে। মিতু সবসময় শাড়ি পরতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে, আজকেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ভেজা চুলে হালকা নীল রঙের শাড়িতে তাকে কোনো এক মায়াবী জলপরীর মতো লাগছে।
রোহান বিছানায় আধশোয়া হয়ে বসে ছিল। মিতুকে বের হতে দেখেই তার চোখের পলক পড়া বন্ধ হয়ে গেল। মিতুর ফর্সা মুখে আর গলায় জমে থাকা পানির বিন্দুগুলো মুক্তার মতো জ্বলজ্বল করছে। রোহান নিজের অজান্তেই মুচকি হাসল, কিন্তু মিতু আড়চোখে একবার দেখেও এমন ভাব করল যেন রোহান সেখানে নেই-ই। রোহানের প্রচণ্ড ইচ্ছে করছিল মিতুকে জড়িয়ে ধরে সব ভুল বোঝাবুঝি মিটিয়ে নিতে, কিন্তু সে জানে মিতুর অভিমানের পাহাড় এখনো গলেনি।
মিতু ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে ভেজা চুলগুলো মোছার চেষ্টা করছিল, কিন্তু হাতে ব্যথা থাকায় তোয়ালেটা ঠিকমতো ঘোরাতে পারছে না। হঠাৎ সে অনুভব করল অন্য কারো হাত তার হাতের ওপর। বিস্ময়ে তাকাতেই দেখল রোহান দাঁড়িয়ে আছে। মিতু সরে যেতে চাইলে রোহান আলতো করে ওর কাঁধে হাত রেখে থামিয়ে দিল। কোনো কথা না বলে, পরম মমতায় মিতুর হাত থেকে তোয়ালেটা নিয়ে সে ভেজা চুলগুলো মুছে দিতে শুরু করল।
মিতু আর বাধা দিল না। আয়নায় প্রতিফলিত হওয়া তার সেই চিরচেনা মানুষটির দিকে তাকিয়ে রইল সে। এই সেই পুরুষ, যাকে সে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসে। রোহান খুব যত্ন করে চুলগুলো মুছে একপাশে সরিয়ে নিল। হঠাৎ সে মিতুর কাঁধে নিজের মাথাটা রেখে পরম আবেশে চোখ বন্ধ করল।
রোহানের তপ্ত নিঃশ্বাস মিতুর কাঁধের খোলা অংশে পড়তেই মিতুর সারা শরীর শিউরে উঠল। কত বছর পর! দীর্ঘ চার বছর পর সে আবার এই পরিচিত স্পর্শ অনুভব করছে। মিতুর মনে হলো সময়টা যেন থমকে গেছে।
রোহান এবার মিতুর বাহু ধরে তাকে নিজের দিকে ফেরাল। মিতুর চোখের দিকে তাকাতেই দেখল সেখানে নোনা জল টলমল করছে। মিতুর ঠোঁট দুটো যন্ত্রণায় আর অভিমানে কাঁপছে। রোহান আর নিজেকে সামলাতে পারল না;,সে পরম ভালোবাসায় মিতুর কপালে নিজের ওষ্ঠ জোড়া ছুঁইয়ে দিল। তারপর বুকের গভীর মায়ার সাথে মিশিয়ে মিতুকে জাপ্টে ধরল।
রোহানের উষ্ণতা পেতেই মিতুর দীর্ঘদিনের জমানো বাঁধ ভেঙে গেল। সে ডুকরে কেঁদে উঠল। তার চোখের জলে রোহানের টি-শার্ট ভিজে একাকার হয়ে যাচ্ছে, তবুও রোহান ছাড়ল না। সে মিতুর চুলে মুখ গুঁজে ফিসফিসিয়ে বলল,
“আই অ্যাম সরি নীলাঞ্জনা… আমি খুব বেশি অপরাধী তোমার কাছে। আমাকে মাফ করে দাও।”
হঠাৎ মিতুর মনে হলো এক নিমেষে সব ভুলে যাওয়া এত সহজ নয়। সে সর্বশক্তি দিয়ে রোহানকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। মিতুর এই প্রত্যাখ্যানে রোহান দমে গেল না, বরং আজ সে নিজের সব অহংকার বিসর্জন দিয়ে সরাসরি মিতুর সামনে মেঝেতে হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়ল।
রোহান মিতুর কাঁপা কাঁপা হাত দুটো নিজের শক্ত মুঠোর ভেতর পুরে নিল। হাহাকার ভরা কণ্ঠে বলল,
“ক্ষমা করবে না মিতু? বিশ্বাস করো, অপরাধবোধে আমার বুকের ভেতরটা ছিঁড়ে যাচ্ছে। তুমি কি জানো এই চারটা বছর আমি কীভাবে কাটিয়েছি? একটা রাতও আমি শান্তিতে ঘুমাতে পারিনি। মিথ্যে অভিমান আর ভুল ধারণা আমাকে অন্ধ করে দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তোমার জন্য আমার ভালোবাসা এক বিন্দুও কমেনি। আমি আজও সেই আগের মতো তোমার প্রেমিক পুরুষ হয়ে থাকতে চাই। প্লিজ মিতু, আমাকে এভাবে ফিরিয়ে দিও না।”
মিতু পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। তারপর খুব ধীরে কিন্তু স্থিরভাবে রোহানের মুঠি থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিল। জানালার বাইরের দিকে তাকিয়ে তপ্ত স্বরে বলল, “তুমি কষ্ট পেয়েছো নিজের ভুলের কারণেই, রোহান। তুমি আমাকে বিশ্বাস করোনি, আমাদের ভালোবাসার ওপর ভরসা রাখতে পারোনি। এই চার বছরের যন্ত্রণার কারিগর তুমি নিজেই।”
রোহান মাথা নিচু করে ধরা গলায় বলল,
“আমি মানছি মিতু। আমি সব অপরাধ মাথা পেতে নিচ্ছি। তবুও বলছি, আমার এই অনুশোচনা আর ভালোবাসার দিকে তাকিয়ে কি একটা সুযোগ দেওয়া যায় না? আমি যে তোমাকে ছাড়া আর কিছুই বুঝি না।”
মিতু এবার ফিরে তাকাল রোহানের দিকে। মেঝেতে হাঁটু গেঁড়ে বসে থাকা এই মানুষটার চোখেমুখে এখন আর কোনো দাপট নেই, আছে শুধু তীব্র অনুশোচনা আর ক্ষমা ভিক্ষার আকুতি। মিতু দেখল, তার সেই উদ্ধত প্রেমিক আজ তার কাছে বড্ড অসহায়।
চলবে…
(আজকের পর্বটা ছোটই দিয়েছি,তাই কেউ এই বিষয়ে বলে লজ্জা দিও না।
আর যারা পেইজে ফলো না দিয়ে গল্প পড়ো,তোমাদের কি উচিত না ফলো দেওয়া?)
Share On:
TAGS: নিলুফা নাজমিন নীলা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১৩
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৭
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১৪
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২৭
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১৫
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২৬
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২১
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১৮
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২৪
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২৩