রোদ্দুরেরছেঁড়ামানচিত্র
পর্ব_১৭
নিলুফানাজমিননীলা
★★★
রোহান নিজের রুমে পা রাখতেই বুকটা এক পলকের জন্য কেঁপে উঠল। রুমের প্রতিটি কোণ আগের মতোই পরিপাটি করে সাজানো। চার বছরেও মিতু এই ঘরের একটি আসবাবও এদিক-সেদিক করেনি। ঘরটা আগের মতোই মিতুর স্পর্শে সজীব হয়ে আছে। কিন্তু আজ এই পরিচিত ঘরটাই রোহানের কাছে দমবন্ধ করা এক কারাগার বলে মনে হচ্ছে। ভেতরটা তার তিল তিল করে ভেঙে যাচ্ছে। সে নিচের দিকে না তাকিয়েই বিছানার এক কোণে বসে পড়ল।
বিছানার ওপর মিতুর একটা রূপালি রঙের হেয়ার ক্লিপ পড়ে আছে। ওটা হাতে নিতেই মুহূর্তের জন্য রোহানের সব রাগ আর অভিমান যেন কর্পূরের মতো উড়ে গেল। স্মৃতিগুলো ভিড় করে এল, রোহান মিতুকে কক্ষনো চুল বাঁধতে দিত না। মিতুর ঘন কালো চুল যখন পিঠ ছড়িয়ে থাকত, রোহান সেই চুলে মুখ গুঁজে এক স্বর্গীয় প্রশান্তি খুঁজে পেত। কিন্তু পরক্ষণেই এক ভয়ংকর তিক্ততা তার মনে বিষ ঢেলে দিল। সে ঘৃণাভরে ক্লিপটা বিছানার অন্য প্রান্তে ছুঁড়ে মারল।
হঠাৎ দরজার সামনে কারো ছায়া দেখে রোহান মুখ তুলল। মিতু দাঁড়িয়ে আছে। দরজার মৃদু আলোয় নীল শাড়িতে ওকে ঠিক চার বছর আগের মতোই মায়াবী আর অপরূপা লাগছে। ঠিক যেমনটি রোহান পছন্দ করত তার অবাধ্য চুলগুলো আজও পিঠময় ছড়িয়ে পড়ে আছে। রোহান পূর্ণ দৃষ্টিতে মিতুর দিকে তাকাল, কিন্তু পরক্ষণেই চোখ সরিয়ে নিল। যে সৌন্দর্য একসময় রোহানকে দেওয়ানা করে তুলত, সেই সৌন্দর্য আজ তাকে তীব্র যন্ত্রণা দিচ্ছে।
মিতু ধীর পায়ে এগিয়ে এসে বিছানায় বসল। মাঝে অনেকটা ফাঁকা জায়গা রেখে সে বসল। ঘেঁষে বসলে যদি রোহান উঠে চলে যায়, সেই ভয়ে সে জড়সড় হয়ে রইল। মিতু রোহানের চোখের দিকে তাকানোর সাহস পেল না, যদি চোখের অবাধ্য জলগুলো সব আগল ভেঙে বেরিয়ে আসে সেই ভয়ে।
মিতু খুব ধীর আর ভাঙা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“তুমি কি খুব টায়ার্ড?”
“তোমার কী মনে হয়? এত ঘণ্টা জার্নি করে এসে আমি কি খুব ফুরফুরে মেজাজে থাকব?”
মিতু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। চোখ বন্ধ করে ঠোঁট কামড়ে নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করল সে। রোহান বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। সে ফ্রেশ হওয়ার জন্য ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াতেই মিতু সজোরে উঠে দাঁড়িয়ে তার সামনে বাধা হয়ে দাঁড়াল।
আর্তিভরা কণ্ঠে মিতু বলল,
“এরকম ব্যবহার কেন করছো রোহান? ফোনে যখন খারাপ ব্যবহার করতে, দূরত্বের অজুহাতে মনকে শান্ত করে নিতাম। কিন্তু আজ তুমি সামনাসামনি এসেও এতটা পাথর হয়ে আছো! অন্তত আজকে এতটা নিষ্ঠুর আচরণ করো না। ক…কষ্ট হয় রোহান, ভীষণ কষ্ট হয়!”
রোহান মিতুর কথা শোনা মাত্রই এক ভয়ানক হুংকার দিয়ে তার বাহু নিজের শক্ত মুঠোয় চেপে ধরল। হাতের চাপ এতটাই প্রবল ছিল যে যন্ত্রণায় মিতুর মুখ দিয়ে আর্তনাদ বেরিয়ে এল। রোহানের চোখ দুটো যেন আগুনের গোলার মতো জ্বলছে, তাতে কোনো মমতা নেই, আছে শুধু তীব্র ঘৃণা আর আক্রোশ। সে গর্জে উঠে বলল,
“তোমার কি মনে হয় মিতু, শুধু তুমিই কষ্ট পাও? আমার কোনো অনুভূতি নেই? যখন আমার সাথে এত বড় অন্যায় করলে, তখন আমার ঠিক কেমন লেগেছিল একবারও ভেবেছিলে? তুমি কি ভেবেছিলে আমি খুব সুখে ছিলাম?!”
মিতু ছলছল নয়নে বিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে রইল। চার বছরের অদর্শনে মানুষটা যে এতটা হিংস্র আর অচেনা হয়ে যেতে পারে, তা সে কল্পনাও করেনি। রোহান তাকে আরও কাছে টেনে এনে হিসহিসিয়ে বলল,
“তোমাকে কি আমি কম ভালোবেসে ছিলাম মিতু? নাকি এই উজাড় করে ভালোবাসাটাই আমার জন্য অপরাধ ছিল, কোনটা?”
মিতু এবার ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে অস্ফুট স্বরে বলল,
“তুমি কিসব উল্টোপাল্টা কথা বলছ রোহান? আমি তোমার সাথে কী অন্যায় করেছি? তোমার কি মাথা ঠিক আছে?”
রোহান মিতুকে এক ঝটকায় সরিয়ে দিয়ে তচ্ছিল্যের স্বরে বলল, “একদম আর নাটক করবে না মিতু! তা না হলে… আমার হাত উঠে যাবে তোমার ওপর।”
এতক্ষণ ধরে তিল তিল করে জমিয়ে রাখা মিতুর ধৈর্যের বাঁধটা এবার হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল। তার বুকের ভেতরের হাহাকার আর সহ্য করতে না পেরে সে চিৎকার করে উঠল
“হ্যাঁ, মারো আমাকে! আজ মেনেই ফেলো! অন্তত এই প্রতিদিনের তিল তিল করে জ্বলে মরার চেয়ে মরে যাওয়াও অনেক শান্তির। তুমি তো আমাকে সেই চার বছর আগেই মেরে ফেলেছ রোহান। আমার মন, আমার স্বপ্ন, আমার আনন্দ সব তো তুমি অনেক আগেই খুন করেছ। এবার না হয় এই দেহটা থেকেও প্রাণটা কেড়ে নাও!”
রোহানের চোখে ক্ষণিকের জন্য একটা অদ্ভুত আলোড়ণ খেলে গেল, কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিল। সে আর একটি কথাও না বলে গটগট করে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
রোহান চলে যেতেই মিতু বিছানার সাথে গা মিশিয়ে ফ্লোরে ভেঙে পড়ল। অবরুদ্ধ কান্নাগুলো এবার বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো বেরিয়ে আসতে লাগল। একটা মানুষ আর কতদিন নিজের ভেতরের এই দহন আর দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে রাখতে পারে?
★★★
আরিয়ান নিজের রুমে আধশোয়া হয়ে কফিতে চুমুক দিচ্ছিল। জানালার ওপাশে হাড়কাঁপানো শীতের কামড়, এমন আবহাওয়ায় গরম কম্বলের ওম ছেড়ে ওঠা রীতিমতো যুদ্ধের মতো। ঠিক তখনই তৃণা রুমে ঢুকল। আরিয়ানকে ওভাবে বসে থাকতে দেখে সে বলল,
“কী ব্যাপার রাগী সাহেব? আজ কি অফিসে যাওয়ার নাম নেই? দশটা তো পার হয়ে গেল অনেকক্ষণ।”
আরিয়ান কফির মগটা হাতে নিয়ে অলস ভঙ্গিতে বলল, “উফ! এই শীতে অফিসে গিয়ে মরার কোনো শখ নেই আমার। আর জানোই তো, আমার অফিসের কাজ ল্যাপটপেই সেরে ফেলা যায়। তুমি একটু কষ্ট করে ড্রয়ার থেকে ল্যাপটপটা দাও তো।”
তৃণা ল্যাপটপ না দিয়ে স্থির দাঁড়িয়ে রইল। মৃদু স্বরে বলল, “ল্যাপটপ পরে দিচ্ছি। বাবা নিচে আপনাকে ডাকছেন।”
আরিয়ান কিছুটা অবাক হলো। বাবা সচরাচর এই অসময়ে তাকে ডাকেন না। সে বিছানা থেকে পা নামাতেই তৃণা
একটা ভারী জ্যাকেট বাড়িয়ে দিল।
“নিন, এটা গায়ে জড়িয়ে নিন। হুট করে নিচে নামলে ঠান্ডা লেগে যাবে।”
আরিয়ান কোনো কথা না বাড়িয়ে জ্যাকেটটা টেনে নিয়ে দ্রুত নিচে নেমে গেল।
নিচে ড্রয়িংরুমে আহাদ মির্জা সোফায় পাথরের মতো বসে আছেন। সামনে রাখা চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া ওঠা বন্ধ হয়েছে অনেক আগেই, কিন্তু সেদিকে তাঁর ভ্রুক্ষেপ নেই। আরিয়ানকে সামনে আসতে দেখে তাঁর কপালের ভাঁজ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল। আরিয়ান বিনয়ের সাথে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, “আব্বু, ডাকছিলে?”
আহাদ মির্জা হুট করেই ভীষণ গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করলেন, “আমি শুনলাম তুমি নাকি তৃণাকে ডিভোর্স দেওয়ার জন্য উকিলের কাছে গিয়েছিলে? খবরটা কি সত্যি?”
আরিয়ান থমকে গেল। সে ভাবেনি ব্যাপারটা এত তাড়াতাড়ি জানাজানি হবে। হয়তো উকিলই কোনোভাবে বাবাকে জানিয়েছে। সে নিজেকে সামলে নিয়ে স্বাভাবিক স্বরে বলল, “হ্যাঁ, গিয়েছিলাম।”
কথাটা শোনামাত্র আহাদ মির্জা বাঘের মতো গর্জে উঠে সোফা ছেড়ে দাঁড়ালেন। তাঁর সেই হুংকারে পুরো ড্রয়িংরুম কেঁপে উঠল। তিনি রাগে কাঁপতে কাঁপতে বললেন,
“তোমার সাহস কত বড়! তৃণাকে ডিভোর্স দেওয়ার কথা চিন্তা করার স্পর্ধা তুমি কোথায় পেলে? কোথায় সমস্যা হচ্ছে শুনি?”
আহাদ মির্জার চিৎকারে রান্নাঘর থেকে মায়মুনা বেগমসহ বাড়ির সব মহিলারা ছুটে এলেন। মায়মুনা বেগম পরিস্থিতি বুঝতে পেরে স্বামীর ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে বললেন,
“আরে কী হয়েছে টা কী? এত বড় ছেলেটাকে এভাবে সবার সামনে ধমকাচ্ছ কেন?”
“ধমকাবো না?” আহাদ মির্জা মায়মুনা বেগমের দিকে তাকিয়ে গর্জে উঠলেন। “তোমরা মা-ছেলে মিলে কি এটাকে পুতুলখেলা পেয়েছ? বিয়েটা কি তামাশা? তোমার ছেলে তৃণাকে ডিভোর্স দিতে চায়, এর মানে কী?”
তৃণা সিঁড়ির এক কোণে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল। বাপ-ছেলের এই বাদানুবাদের মাঝে কথা বলার সাহস সে পাচ্ছিল না। চারদিকে এক থমথমে পরিস্থিতি। আরিয়ান এবার কিছুটা শক্ত হয়ে উত্তর দিল, “আব্বু, আমার আইনি অধিকার আছে ডিভোর্স দেওয়ার। আমি আর পারছি না তৃণার সাথে একটা মিথ্যা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ থাকতে।”
আহাদ মির্জা রাগে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে আরিয়ানের দিকে হাত তুলতে গেলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে তৃণা বিদ্যুৎবেগে এসে মাঝখানে দাঁড়িয়ে বাবার হাতটা আগলে ধরল। পুত্রবধূর করুণ মুখচ্ছবি দেখে আহাদ মির্জা থমকে গেলেন, পরম মুহূর্তেই একরাশ ক্লান্তি আর হতাশা নিয়ে ধপ করে সোফায় বসে মাথায় হাত রাখলেন। আরিয়ান তৃণার দিকে একদৃষ্টে রাগী চোখে তাকিয়ে থেকে কোনো কথা না বলে গটগট করে উপরে নিজের রুমে চলে গেল। ড্রয়িংরুমে তখন এক বিষণ্ণ আর থমথমে নিস্তব্ধতা।
কিছুক্ষণ পর তৃণা নিজের মনের ঝড় সামলে নিয়ে হাতে এক কাপ গরম কফি নিয়ে উপরে গেল। রুমে ঢুকে দেখল আরিয়ান বিছানার এক পাশে মাথা নিচু করে বসে আছে, তার দৃষ্টি ফ্লোরে স্থির। লোকটার পুরো অবয়ব জুড়ে যেন আগ্নেয়গিরির লাভা খেলা করছে। তৃণা ধীর পায়ে সামনে গিয়ে দাঁড়াল। আরিয়ান যখন চোখ তুলে তাকাল, তৃণা দেখল সেই চোখ দুটো টকটকে লাল। ভয় আর সংকোচ মিশিয়ে সে একটা শুকনো ঢোক গিলে বলল,
“মাথা ঠান্ডা করুন রাগী সাহেব। এই নিন, কফিটা খান…”
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই আরিয়ান এক ঝটকায় তৃণার হাত থেকে কফিটা ফেলে দিল। কাপটা ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়ে কফিটা মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ল। আরিয়ানের এমন উন্মত্ত ব্যবহারে তৃণা জমে গেল। আরিয়ান চিৎকারের সুরে গর্জে উঠল,
“খবরদার! এসব আদিখ্যেতা আমার সাথে একদম করতে আসবে না। তোমাকে আমার সহ্য হয় না, এটা কেন তুমি বোঝো না? তোমার আত্মসম্মানে কি একটুও লাগে না? কেন বারবার আমার সামনে আসো?”
তৃণা আজ আর মাথা নিচু করে মুখ বুজে সাইল না। সে উত্তর দিল,
“আমি কীভাবে বুঝব আপনার কোনটা পছন্দ আর কোনটা অপছন্দ? মাঝে মাঝে তো এমন ব্যবহার করেন যেন আমাকে আপনি কতই না ভালোবাসেন…”
মূহুর্তেই ঘরটা স্তব্ধ হয়ে গেল একটা সজোরে থাপ্পড়ের শব্দে। আরিয়ান তৃণার গালে হাত তুলেছে।
“খবরদার! ভালোবাসার কথা এই মুখে আর উচ্চারণ করবে না। এই শব্দটা শুনলে আমার মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ শুরু হয়।”
তৃণা গালে হাত দিয়ে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আজ আরিয়ান কোনো ট্রমার মধ্যে নেই, সম্পূর্ণ স্বাভাবিক অবস্থায় সে নিজের ইচ্ছায় তৃণার ওপর হাত তুলেছে। তৃণার দুচোখ বেয়ে অবিরল অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল। আরিয়ান হঠাৎ তৃণার ওই বিধ্বস্ত চেহারার দিকে তাকিয়ে কেমন যেন থমকে গেল। নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে এক গভীর যন্ত্রণায় সে দেয়ালে অনবরত ঘুসি মারতে লাগল।
তৃণা ঘাবড়ে গিয়ে দৌড়ে গিয়ে আরিয়ানের হাত দুটো চেপে ধরল।
“কী করছেন আপনি? কেন নিজেকে কষ্ট দিচ্ছেন? শান্ত হোন!”
আরিয়ান এবার তৃণার দুই হাত নিজের শক্ত মুঠোর ভেতর পিষে ধরল। চোখে চোখ রেখে অত্যন্ত কাতর স্বরে বলল, “প্লিজ তৃণা, তুমি আমাকে ছেড়ে চলে যাও। তুমি সবাইকে বলো যে তুমি আমাকে ডিভোর্স দেবে। এছাড়া আমার আর কোনো পথ খোলা নেই।”
তৃণা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। আরিয়ান আবারও বলতে শুরু করল,
“বিশ্বাস করো তৃণা, আমি আমার মনে অন্য কোনো নারীকে জায়গা দিতে পারছি না। আমি অনেক চেষ্টা করেছি সেই বৃষ্টিভেজা দিনের স্মৃতি আর ওই রমণীকে ভুলে যেতে, কিন্তু আমি পারিনি। আমি কোনোদিন পারবও না। আমি অন্য কারো কথা চিন্তা করলে আমার মাথার ভেতর অসহ্য যন্ত্রণা হয়। আমি বড় অসহায় তৃণা, ভীষণ অসহায়।”
তৃণার সামনে আজ আরিয়ানের ভেতরের মানুষটা সম্পূর্ণ উন্মোচিত হলো। সে দেখতে পেল আরিয়ানের চোখের মণিকোঠায় অন্য এক নারীর প্রতি আজন্ম মায়া আর ভালোবাসা। তৃণা ধীরে ধীরে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিল। সে বুঝতে পারল না কে সেই রমণী, কিন্তু নিজের কান্না গিলে নিয়ে ধীরস্থির কণ্ঠে বলল,
“চিন্তা করবেন না। আমি এতটা পাষাণ নই যে নিজের সুখের জন্য আপনার ভালোবাসার পথে বাধা হব। আমি আপনাকে মুক্তি দেব। আপনার বিরক্তির কারণ না হয়ে এই বাড়ি ছেড়ে আমি চিরতরে চলে যাব।”
তৃণার কথা শুনে আরিয়ানের মুখে এক অদ্ভুত স্বস্তির হাসি ফুটে উঠল। তৃণা আবারও নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“কে সেই রমণী? একবার কি তাকে আমার সাথে দেখা করাবেন?”
আরিয়ান এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে করুণ হাসল।
“কখনো যদি দেখা হয়, তবে সবার আগে তোমার সাথেই তাকে পরিচয় করিয়ে দেব।”
তৃণা আর কোনো প্রশ্ন না করে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। কেন জানি নিজের অজান্তেই তার কলিজাটা আজ ছিঁড়ে যাচ্ছে। আরিয়ানের অন্য নারীর প্রতি এত অগাধ প্রেম দেখে কি তবে তার হিংসে হচ্ছে? কেন হবে? আরিয়ান কাকে ভালোবাসল তাতে তার কী আসে যায়? তৃণা নিজের মনকে প্রশ্ন করলেও কোনো উত্তর পেল না, শুধু দুচোখ উপচে নোনা জল গড়িয়ে এল।
★★★
রোহান শাওয়ার নিতে ঢোকার পর থেকেই মিতু পাথরের মতো বিছানার এক কোণে বসে ছিল। সারা রাত চোখের পাতা এক করতে পারেনি সে। হুট করেই তার নজর গেল টেবিলের ওপর রাখা রোহানের ফোনটার দিকে। একবার মনে হলো ফোনটা হাতে নিয়ে দেখে, এই চার বছরে রোহান কার সাথে কতটা জড়িয়েছে। কিন্তু তাদের সম্পর্কের দীর্ঘ ইতিহাসে কখনোই একে অপরের ফোন চেক করার মতো নীচতা ছিল না।
মিতু দীর্ঘশ্বাস ফেলে রুম থেকে বেরিয়ে যেতে চাইল, ঠিক তখনই ফোনটা উচ্চশব্দে বেজে উঠল। মিতু অবজ্ঞা করতে চেয়েও পারল না, স্ক্রিনের দিকে চোখ পড়তেই তার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে ওঠা নামটা দেখেই তার সারা শরীর কাঁপতে শুরু করল। মিতু টলমল হাতে ফোনটা হাতে তুলে নিল। ঠিক সেই মুহূর্তে ওয়াশরুমের দরজা খুলে রোহান বেরিয়ে এল। ভেজা চুলে তোয়ালে ঘষতে ঘষতে সে গম্ভীর কণ্ঠে গর্জে উঠল,
“আমার ফোন কেন হাতে নিয়েছ তুমি?”
মিতু চমকে পেছন ফিরল। রোহান এক ঝটকায় মিতুর হাত থেকে ফোনটা ছিনিয়ে নিল। মিতু স্থির থাকতে পারল না, কাঁপা আঙুলে ফোনের দিকে ইশারা করে বলল,
“এসব কী রোহান?এই মেয়ে তোমাকে কেন কল করছে? তুমি… তুমি কি ওর সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখো?”
রোহান বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে শান্ত গলায় উত্তর দিল, “হ্যাঁ, কথা বলি। তাতে তোমার কী সমস্যা?”
মিতু এবার রাগে ফেটে পড়ল।
“আমার কী সমস্যা মানে? তুমি জানো না ও আমাদের সাথে কী করেছে? তুমি কেন ওর সাথে কথা বলবে? তুমি কি সব ভুলে গেছ?”
রোহান নিজের হাতের ভেজা তোয়ালেটা সজোরে ফ্লোরে ছুঁড়ে মারল। তার শান্ত চোখ দুটো মুহূর্তেই রক্তবর্ণ হয়ে উঠল। হাহাকার ভরা কণ্ঠে সে চিৎকার করে বলল,
“না, আমি কিচ্ছু ভুলিনি মিতু! আমার সব মনে আছে। তোমার সেই বীভৎস আসল রূপটাও আমার খুব ভালো করে মনে আছে। এতগুলো বছর পরবাসে আমি বুকে পাথর চাপা দিয়ে কাটিয়েছি শুধু এই দিনটার জন্য। তুমি… তুমি একবারও ভাবলে না? কী করে পারলে তুমি আমার নিজের রক্তকে, আমার সন্তানকে এভাবে পৃথিবীর আলো দেখার আগেই শেষ করে দিতে? তোমার হাত একবারও কাঁপল না? তোমার গর্ভে থাকা ওই নিষ্পাপ শিশুটির জন্য একটুও মায়া হলো না, যাকে নিয়ে তার বাবা হাজারো স্বপ্ন বুনেছিল? আমার সন্তানকে তুমি পৃথিবীর মুখ দেখতে দাওনি মিতু, তুমি একজন খুনি!”
রোহানের প্রতিটি শব্দ যেন মিতুর কানে তপ্ত সীসার মতো বিঁধল। সে অস্ফুট আর্তনাদ করে এক পা পিছিয়ে গেল। তার চারপাশের দেয়ালগুলো যেন ঘুরছে। যে দুঃস্বপ্নকে সে চার বছর ধরে মনের গহীনে কবর দিয়ে রেখেছিল, আজ তাকে এভাবে সামনে দাঁড়াতে হবে, তা সে কল্পনাও করেনি। মিতুর ঠোঁট কাঁপছে, কিন্তু গলা দিয়ে কোনো স্বর বের হচ্ছে না। চার বছর আগের সেই অভিশপ্ত স্মৃতিগুলো ঝড়ের বেগে তার চোখের সামনে ভেসে উঠল।
চলবে…
(সবাই ঠিক করে রেসপন্স করো না কেন?পাথরের মতো গল্প পড়েই উধাও হয়ে যাও।কি অদ্ভুত তোমরা!প্রতিদিন প্রায় চল্লিশ হাজার প্লাস মানুষ গল্প পড়ে।)
Share On:
TAGS: নিলুফা নাজমিন নীলা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২৫
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৬
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২১
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১১
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১৫
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৫
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৩
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২২
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১২
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১৮