রোদ্দুরেরছেঁড়ামানচিত্র
পর্ব_১৪
কলমে #নিলুফানাজমিননীলা
★★★
মিতু রান্নাঘরে ছিল। হঠাৎ ড্রয়িংরুম থেকে কারো আনন্দিত চিৎকারের শব্দ শুনে সে হাতের কাজ ফেলে হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে এল। ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই দেখল রাহি বেগম খুশিতে আত্মহারা হয়ে হাসছেন। মিতুকে অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রাহি বেগম প্রায় ছুটে তার কাছে এলেন। মিতুর হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বললেন,
“মিতু মা আমার! সুসংবাদ আছে। এইমাত্র রোহান ফোন করেছিল। ওর বাংলাদেশে আসার ভিসা হয়ে গেছে রে মা! পরশুদিনই ও ফ্লাইটে উঠবে।”
কথাটা শোনার পর মিতু যেন মুহূর্তের জন্য নিথর হয়ে গেল। তার কানে শব্দগুলো বাজছে কিন্তু মস্তিষ্ক যেন বিশ্বাস করতে পারছে না। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর তার স্বামী ফিরছে, তার সবটুকু ভালোবাসা, তার বেঁচে থাকার অবলম্বন। এর চেয়ে বড় খুশির সংবাদ মিতুর জীবনে আর কী হতে পারে? ঘোর কাটিয়ে মিতু কাঁপপা গলায় বলে উঠল,
“সত্যি বলছেন মা? রোহান সত্যি ফিরছে?”
“হ্যাঁ, একদম সত্যি!” রাহি বেগমের চোখও তখন আনন্দাশ্রুতে টলমল করছে।
মিতু আর নিজেকে সামলাতে পারল না। আবেগের আতিশয্যে নিজের শাশুড়িকে জড়িয়ে ধরল সে। এতদিনের একাকিত্ব আর অপেক্ষার অবসান হতে চলায় মেয়েটা শিশুর মতো ডুকরে কেঁদে উঠল। রাহি বেগম মিতুর মাথায় হাত বুলিয়ে পরম মমতায় সান্ত্বনা দিয়ে বললেন,
“আরে বোকা মেয়ে! এতো খুশির খবর, এই সময় কি কেউ এভাবে কাঁদে? চোখের পানি মোছো।”
ঠিক সেই মুহূর্তে রাহি বেগমের হাতে থাকা ফোনটা আবার বেজে উঠল। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে তিনি হাসিমুখে বললেন,
“এই দেখ, রোহান আবারও কল করেছে।”
রাহি বেগম কলটা রিসিভ করে মিতুর দিকে ফোনটা এগিয়ে দিয়ে বলতে চাইলেন,
“মিতু এই তো কাছেই, তুই ওর সাথেই কথা বল।”
কিন্তু ওপাশ থেকে রোহান তার মাকে থামিয়ে দিয়ে বেশ চনমনে গলায় বলল,
“মা, আদনান আর নৌশি ওরা কোথায়? আশেপাশে থাকলে একটু জিজ্ঞেস করো তো ওদের স্পেশাল কিছু লাগবে কি না। ভাবলাম আসার সময় ওদের জন্য মনের মতো কিছু গিফট নিয়ে আসি।”
আদনান আর নৌশিকে জিজ্ঞেস করতেই তাদের উত্তরের তুবড়ি ছুটল। আদনান বেশ কায়দা করে জানাল তার একটা হাই-কনফিগারেশনের ল্যাপটপ চাই, আর নৌশি আবদারের সুরে বলল তার জন্য যেন দামী ব্র্যান্ডের মেকআপ বক্স আর প্রচুর চকলেট নিয়ে আসা হয়।
রাহি বেগম হাসিমুখে তাদের তালিকা শুনলেন। তারপর মিতুর থেকে কিছুটা দূরে গিয়ে ফোনের ওপাশে থাকা রোহানকে নিচু স্বরে বললেন,
“বাবা, মিতুকেও একবার জিজ্ঞেস কর, মেয়েটার কী লাগবে? ও তো মুখে কিছু বলে না, তুই অন্তত নিজের থেকে কিছু দিতে চাইলে ও খুশি হবে।”
কিন্তু রোহান মায়ের কথায় বিশেষ কোনো আগ্রহ দেখাল না। সে যেন প্রসঙ্গটা এড়িয়ে যেতে চাইল। নির্লিপ্ত গলায় বলল,
“আচ্ছা আম্মু, এখন রাখি। আমি খুব কাজে ব্যস্ত আছি।” এটুকু বলেই কোনো সুযোগ না দিয়ে রোহান কলটা কেটে দিল।
মিতু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল ঠিকই, কিন্তু শাশুড়ির বলা কথাগুলো সে আন্দাজ করতে পেরেছে। রোহানের এমন দায়সারা আচরণ তার বুকে বিঁধলেও সে তা প্রকাশ করল না। বরং মুখে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে রাহি বেগমের কাছে এগিয়ে এল। খুব নরম স্বরে বলল,
“আপনার ছেলে সুস্থ শরীরে দেশে ফিরছে মা, এটাই তো আমার জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে বড় উপহার। এর চেয়ে দামী আর কী-ই বা হতে পারে?”
মিতুর এই গভীর আর নিঃস্বার্থ ভালোবাসা দেখে রাহি বেগমের চোখে জল চলে এল। বাড়ির বড় ছেলে হিসেবে রোহান ছিল এই পরিবারের গৌরব। কিন্তু ইংল্যান্ডে গিয়ে ছেলেটা যে কতটা বদলে গেছে, তা মিতুর প্রতি তার এই উদাসীনতা থেকেই বোঝা যায়। রাহি বেগম মনে মনে শক্ত এক প্রতিজ্ঞা করলেন রোহান এবার দেশে ফিরলে তাকে আর কিছুতেই ইংল্যান্ড যেতে দেবেন না। নিজের ঘরের লক্ষ্মী মিতুকে আর এভাবে একা ফেলে যেতে দেবেন না তিনি।
★★★
গোধূলির সময়। পড়ন্ত বিকেলের রোদটা এখন বেশ শান্তিদায়ক আর মিঠে। তৃণা ছাদের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে। শরীর থেকে জ্বরটা কমেছে ঠিকই, কিন্তু ভেতরে এখনও ভীষণ দুর্বলতা রয়ে গেছে। সারা শরীরে এক অদ্ভুত অস্বস্তি বোধ হচ্ছে তার। তৃণার সাথে ছাদে মিহুও এসেছে সে আপাতত ফ্লোরে বসে চোখ বন্ধ করে শান্ত হয়ে আছে।
ছাদে হালকা বাতাস বইছে। বাতাসের ঝাপটায় তৃণার ঝাপসা স্মৃতিতে বারবার সেই বৃষ্টির রাতের কথা ভেসে উঠছে। তার মনে পড়ছে, কীভাবে সে ভয়ার্ত অবস্থায় আরিয়ানকে আঁকড়ে ধরেছিল। সেসব কথা মনে পড়তেই তৃণার বুকের ভেতর এক অজানা অনুভূতি তোলপাড় শুরু করেছে। এটা কি কৃতজ্ঞতা, নাকি অন্য কিছু? তৃণা নিজেও তা ঠিক জানে না।
এমন সময় নিচে থেকে নৌশি এসে তৃণার পাশে দাঁড়াল। নৌশি মিষ্টি করে হেসে বলল,
“বউমনি, তোমাকে নিচে যেতে বলেছে। এই সময় এখানে বেশ বাতাস, বেশিক্ষণ থাকলে তোমার আবারও জ্বর বাড়বে।”
তৃণা ভ্রু কুঁচকে অবাক হলো। এই বাড়ির কেউ তাকে নিয়ে এতটা চিন্তা করছে, এটা ভেবেই তার মনটা ভালো হয়ে গেল। সে কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কে বলল?”
নৌশি চনমনে গলায় উত্তর দিল, “মেজমা বলেছে।”
তৃণা যেন নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারল না। মায়মুনা বেগম তার স্বাস্থ্যের কথা ভাবছেন, এটা ভাবা যায়! তৃণার মলিন মুখে এক চিলতে অমায়িক হাসি ফুটে উঠল। নৌশি মিহুকে কোলে তুলে নিল, তারপর তারা দুজনেই সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এল।
নিচে নামতেই দেখল মায়মুনা বেগম, ফারহানা বেগম আর রাহি বেগম সোফায় বসে গল্প করছেন। তৃণা কাছে আসতেই মায়মুনা বেগম কেন জানি আড়ষ্ট হয়ে চোখ ফিরিয়ে নিলেন। বড়মা অর্থাৎ রাহি বেগম হাসিমুখে তৃণাকে জিজ্ঞেস করলেন,
“কী তৃণা, এখন শরীরটা কেমন? সুস্থ তো?”
তৃণা নম্র স্বরে জবাব দিল,
“জি বড়মা, এখন অনেকটা ভালো লাগছে।”
কথার মাঝেই মায়মুনা বেগম নৌশিকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“নৌশি, যা তো মা, আমার রুম থেকে কোমর ব্যথার বেল্টটা নিয়ে আয়।”
নৌশি যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই তৃণা তাকে আলতো করে থামিয়ে দিয়ে বলল,
“তুমি বোসো নৌশি, আমিই নিয়ে আসছি।”
তৃণা এগিয়ে যেতেই মায়মুনা বেগম আবারও তাঁর আগের কঠোর রূপে ফিরে এলেন। তিনি বেশ রাগী স্বরে বলে উঠলেন, “আমি কি তোমাকে আনতে বলেছি? শোনো, তোমার মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দিয়েছিলাম তার একমাত্র কারণ ছিল তুমি ভীষণ অসুস্থ ছিলে। তা না হলে তোমার মতো মেয়ের ছায়া মাড়াতেও আমার রুচিতে বাধে!”
মায়মুনা বেগমের এত রূঢ় কথা শুনেও তৃণা কেন জানি এবার একটুও কষ্ট পেল না। বরং তার ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। সে বুঝল, মানুষটা বাইরে থেকে যতটা কঠিন হওয়ার নাটক করছেন, ভেতরে ঠিক ততটা নন। তাঁর এই বাক্যগুলোও তৃণার কাছে আজ ভীষণ আপন মনে হতে লাগল।
রাহি বেগম এবার মায়মুনা বেগমকে থামানোর চেষ্টা করে বললেন,
“আহা মেজো, কেন শুধু শুধু মেয়েটাকে এভাবে কথা বলছিস?”
মায়মুনা বেগম আর সেখানে বসলেন না, গটগট করে নিজের ঘরে চলে গেলেন। কিছুক্ষণ পর বাকিরাও ড্রয়িংরুম ছেড়ে যে যার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। তৃণা ক্লান্ত হয়ে সোফায় পিঠ ঠেকিয়ে বসল মাথাটা এখনও একটু ভার হয়ে আছে।
ঠিক সেই মুহূর্তে তৃণার দৃষ্টি গেল প্রধান ফটকের দিকে। দেখল আরিয়ান অফিস থেকে ফিরছে, তবে সে একা নয়। তার সাথে অত্যন্ত আধুনিক পোশাক পরা এক তরুণী। মেয়েটির হাঁটাচলা আর চালচলনে এক ধরণের আভিজাত্য মেশানো অহংকার। তৃণা কপালে ভাঁজ ফেলে ভাবল এই মেয়েটি কে হতে পারে? আরিয়ান অবশ্য তৃণার দিকে ফিরেও তাকাল না, আরিয়ান একাই গটগট করে সোজা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে চলে গেল।
মীরা কয়েক কদম এগিয়ে গিয়ে তৃণার সামনে এসে দাঁড়াল। তীক্ষ্ণ নজরে তৃণার পা থেকে মাথা পর্যন্ত খুঁটিয়ে দেখল সে। যেন কোনো পণ্য বিচার করছে।
“তুমিই কি তৃণা?”
তৃণা শান্ত থেকে হালকা মাথা নাড়িয়ে জবাব দিল, “হুম।”
মীরা তৃণার পাশে সোফায় বেশ আয়েশ করে বসল। আবারও প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল,
“তোমাকে আরিয়ান ঠিক কী দেখে বিয়ে করল বলো তো? বেশ অবাক লাগছে!”
মেয়েটার ধরণ দেখে তৃণার ভেতরে রাগের সঞ্চার হলো। এভাবে কেউ অপরিচিত কাউকে অপমান করতে পারে? মীরা নিজের পরিচয় দিয়ে বলল,
“আমি মীরা চৌধুরী। আরিয়ানের পার্টনার বলতে পারো।”
তৃণা এবার ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
“কেমন পার্টনার?”
মীরা ঠোঁটে বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে সপ্রতিভ ভঙ্গিতে উত্তর দিল, “বিজনেস পার্টনার তো বটেই, চাইলে তুমি অন্য পার্টনারও বলতে পারো। আমাদের আন্ডারস্ট্যান্ডিংটা বেশ গভীর।”
তৃণা মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। মীরার কথাগুলো তার বুকের ভেতর বিষাক্ত তীরের মতো বিঁধল। সে মনে মনে ভাবতে লাগলো তবে কি এই সেই মেয়ে, যাকে আরিয়ান ভালোবাসে? মেয়েটা সত্যিই অপরূপ সুন্দরী, আর আরিয়ান নিজেও তো বলেছিল তার পছন্দের মানুষটি খুব সুন্দরী। তৃণার মনের ভেতর এক মেঘলা বিষণ্ণতা ধীরে ধীরে ডানা মেলতে শুরু করল।
তৃণার মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া দেখে মীরা বেশ পৈশাচিক আনন্দ পেল। সে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে শরীর দুলিয়ে বলল, “যাই, আন্টির সাথে দেখা করে আসি। অনেকদিন আড্ডা দেওয়া হয় না।”
এটুকু বলেই মীরা চটপটে পায়ে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে গেল।
তৃণা নিথর হয়ে কিছুক্ষণ ড্রয়িংরুমে বসে রইল। মনের ভেতর জমে থাকা একরাশ মেঘ সামলে নিয়ে সে ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল। নিজের রুমে ঢুকে দেখল আরিয়ান সেখানে নেই। সোফার ওপর অগোছালোভাবে পড়ে আছে আরিয়ানের সুট-কোর্ট আর ল্যাপটপ ব্যাগ। আরিয়ানের বরাবরের অভ্যাস, বাইরে থেকে ফিরেই সে শাওয়ার নিতে ঢোকে।
তৃণা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোফার দিকে এগিয়ে গেল। আরিয়ানের কোটটা হাতে নিয়ে পরিপাটি করে গুছিয়ে আলমারিতে রাখতে গেল সে। কিন্তু হঠাতই কোটের বুকের বাঁ পাশের অংশে নজর পড়তেই তৃণার হাত দুটো জমে পাথর হয়ে গেল। তার চোখের মণি স্থির হয়ে রইল সেখানে। কালো রঙের কোটটার ওপর লেপ্টে আছে লাল রঙের লিপস্টিকের স্পষ্ট একটা দাগ।
মুহূর্তেই তৃণার মনের ভেতরে এক প্রলয়ংকরী ঝড় বয়ে গেল। দুফোঁটা তপ্ত জল টুপ করে গড়িয়ে পড়ল গাল বেয়ে। পরক্ষণেই তৃণা হাতের উল্টো পিঠে তা মুছে নিল। তার মানে নিচে ওই মেয়েটা যা যা বলছিল, তার প্রতিটি শব্দ ধ্রুব সত্য! তার ধারণাই ঠিক মীরাই আরিয়ানের।
তৃণার মাথায় হাজারো চিন্তা ভিড় করতে লাগল, তার যেন দম বন্ধ হয়ে আসছে। কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল সে। মনে মনে নিজেকে কড়া শাসনে বোঝাল, “এত কষ্ট কেন হচ্ছে আমার? আরিয়ান যা ইচ্ছে করুক, যার সাথেই থাকুক, তাতে আমার কী? আমি কেন অহেতুক পুড়ছি? আমি কি আরিয়ানকে ভালোবাসি? না, একদম না। তবে কেন এই এসব দেখে বুকের ভেতরটা খামচে ধরছে?”
তৃণা আর নিজেকে বেশিক্ষণ ভাবার সুযোগ দিল না। মনের সবটুকু জোর খাটিয়ে কোটটা আলমারির ভেতরে রেখে দিল সে।
আলমারিতে কোটটা রেখে তৃণা পেছনে ঘুরতেই তার চোখের মণি স্থির হয়ে গেল। আরিয়ান মাত্রই ওয়াশরুম থেকে বেরিয়েছে, তার পরনে কেবল কোমরে জড়ানো একটা সাদা তোয়ালে।
আরিয়ানের ফর্সা সুঠাম শরীরে তখনও শাওয়ারের পানির অবশিষ্টাংশ মুক্তোর দানার মতো চিকচিক করছে। প্রশস্ত বুক আর পেশিবহুল কাঁধ বেয়ে পানির রেখাগুলো নিচে নেমে যাচ্ছে। শরীরটা একেবারে সিক্স-প্যাক না হলেও জিম করা নিয়মিত অভ্যাসের কারণে বেশ টানটান আর সুগঠিত। ভেজা চুলের অবাধ্য কিছু গোছা কপাল ছাপিয়ে চোখের ওপর এসে পড়েছে, যেখান থেকে পানি চুইয়ে চুইয়ে টুপটুপ করে মেঝেতে পড়ছে। আরিয়ানের এই সতেজ আর কিছুটা বুনো রূপ দেখে তৃণা নিজের অজান্তেই পলকহীনভাবে হা করে তাকিয়ে রইল। তার যেন নড়ার শক্তিটুকুও নেই।
তৃণাকে এভাবে মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে থাকতে দেখে আরিয়ান নিজেই অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। এক ধরণের লজ্জা আর অস্বস্তি তাকে ঘিরে ধরল। সে দ্রুত হাত দিয়ে নিজের অনাবৃত শরীর আড়াল করার ব্যর্থ চেষ্টা করে চেঁচিয়ে উঠল,
“এই মেয়ে! তোমার কি কোনো কাণ্ডজ্ঞান নেই? লজ্জা-শরম সব কি ধুয়ে খেয়েছ? এভাবে হা করে তাকিয়ে আছ কেন? অন্যদিকে তাকাও!”
আরিয়ানের কড়া ধমকে তৃণার সম্বিত ফিরল। সে জিভ কেটে নিজের ওপর মনে মনে ভীষণ বিরক্ত হলো ‘ছি ছি! এভাবে তাকিয়ে ছিলাম কেন?’ সে চটজলদি চোখ বন্ধ করে উল্টো দিকে ঘুরে দাঁড়াল।
সে ওপাশ ফিরেই পালটা আক্রমণ করে বলল,
“আপনার কি সামান্য কমনসেন্স নেই? ঘরে একটা মেয়ে থাকা সত্ত্বেও কেউ এভাবে অর্ধনগ্ন হয়ে বেরিয়ে আসে?”
আরিয়ান তখন তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে তাচ্ছিল্যের স্বরে বলল,
“শোনো, এটা আমার রুম। আমি আমার রুমে কীভাবে চলব, সেটা কি এখন তোমার থেকে শিখতে হবে?”
তৃণা এবার তড়িৎবেগে জবাব দিল,
“আগে এটা আপনার একার রুম ছিল ঠিকই, কিন্তু এখন এই রুমটা আমারও। এই রুমে আমিও থাকি। তাই লোকলজ্জার খাতিরে হলেও আপনার অবশ্যই উচিত সাবধানে চলাফেরা করা!”
আরিয়ান এবার সত্যিই একটু বেশি খেপে গেল। তবে তার রাগের মাঝে এক ধরণের দুষ্টুমি আর দাপট ফুটে উঠল। সে কড়া গলায় বলে উঠল,
“পুরুষ মানুষের অত কিসের লজ্জা শুনি? এটা আমার ব্যক্তিগত জায়গা, আমি যেভাবে ইচ্ছে সেভাবেই থাকব। লজ্জা পেলে তুমি পাবে, আমার কিছু যায় আসে না। আর লজ্জা না পেলে তাকাও এদিকে, আমি কি মানা করেছি?”
তৃণা ওদিকে মুখ ফিরিয়ে থাকা অবস্থাতেই নাক-মুখ কুঁচকে বলে উঠল, “ছিঃ! কী অসভ্য কথাবার্তা!”
আরিয়ান ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি ফুটিয়ে বলল, “কেন? এখন লজ্জা লাগছে? খুব তো আমাকে কমনসেন্স শেখাতে আসছিলে। তাকাও না আমার দিকে! প্রয়োজনে তোয়ালেটাও খুলছি, দেখবে?”
তৃণার ইচ্ছে হচ্ছে এই লোকটাকে ঠাস করে একটা চড় বসিয়ে দিতে। তার অসভ্যতার যেন সীমা নেই! তৃণা বিরক্ত হয়ে ধমকের স্বরে বলল,
“দয়া করে আপনি কিছু পরুন তো! না হলে আমাকে এখান থেকে যেতে দিন।”
“তোমাকে কি আমি শিকল দিয়ে বেঁধে রেখেছি? দরজা তো খোলাই আছে, যাও না!” আরিয়ানের কণ্ঠে তাচ্ছিল্য।
“কোথা দিয়ে যাব? আমি যেদিক দিয়ে দরজার কাছে যাব, সেদিক দিয়েই তো আপনি দাঁড়িয়ে আছেন!” তৃণা চোখ বন্ধ রেখেই চিৎকার করে বলল।
আরিয়ান এবার শব্দ করে হেসে উঠল। হাসতে হাসতেই বলল, “আরে শ্যামলিনী, তাকিয়ে দেখো! আমি পোশাক সেই কখন পড়ে নিয়েছি। তুমি তো চোখ বন্ধ করে হাওয়ায় মারামারি করছ।”
তৃণা অবিশ্বাস্য চোখে ধীরে ধীরে তাকাল। দেখল সত্যিই আরিয়ান একটা প্যান্ট আর টি-শার্ট পরে নিয়েছে। সে যে তখন থেকে তৃণাকে মিছেমিছি ক্ষেপাচ্ছিল, সেটা বুঝতে বাকি রইল না। লজ্জায় তৃণার মুখটা লাল হয়ে গেল।
নিজেকে সামলে নিয়ে তৃণা গলার স্বর কিছুটা শক্ত করে বলল,
“হয়েছে, আর মজা করতে হবে না। নিচে আপনার গার্লফ্রেন্ড নিশ্চয়ই আপনার জন্য পথ চেয়ে বসে আছে। তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে নিচে চলে যান।”
আরিয়ান জামার হাতা ঠিক করতে করতে থেমে গেল। ভ্রু কুঁচকে অবাক হয়ে তাকাল তৃণার দিকে।
“গার্লফ্রেন্ড? কে গার্লফ্রেন্ড? তুমি কার কথা বলছ?”
তৃণা তাচ্ছিল্যের স্বরে বলে উঠল,
“এত সাধু সাজার কিছু হয়নি। নামটা মনে নাই ছাই! ওই যে আপনার সাথে এখন বাড়িতে আসলো, উনিই।”
“মীরা? ও আবার আমার গার্লফ্রেন্ড কোনদিন থেকে হলো?”
তৃণা এবার শব্দ করে হেসে উঠল, তবে সেই হাসিতে কিছুটা তিক্ততা মেশানো ছিল। সে বলল,
“এভাবে লুকানোর কী আছে? আমি তো আর অন্য সব সাধারণ বউদের মতো এই নিয়ে আপনার সাথে ঝগড়া করতে আসব না, নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন।”
আরিয়ানের কপালের ভাঁজ এবার আরও গভীর হলো। সে গম্ভীর গলায় বলল,
“এইসব উল্টোপাল্টা কথা আমার একদম শুনতে ইচ্ছে করছে না। থামো তো এবার!”
“জি, বুঝতে পেরেছি। গোপন কথা ফাঁস হয়ে যাচ্ছে তো, তাই রাগ লাগছে।” তৃণা দরজার দিকে এক কদম এগিয়ে গিয়েও থেমে গেল। পেছন ফিরে নির্লিপ্ত স্বরে বলল,
“ও, আরেকটা কথা। আপনার কোর্টে লিপস্টিকের দাগ ছিল। আগামীকাল সময় করে ধুয়ে দেব।”
কথাটা বলেই তৃণা আর উত্তরের অপেক্ষা করল না, দ্রুত রুম থেকে বেরিয়ে গেল। আরিয়ান কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে পড়ল, অফিসে মীরা যখন তার গায়ে হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল, তখনই হয়তো দাগটা লেগেছে।
তবে আরিয়ানের মাঝে কোনো ভ্রুক্ষেপন নেই। তৃণা তাকে ভুল বুঝল কি না, সেটা নিয়ে তার বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই। বরং সে বেশ নির্ভার ভঙ্গিতে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শিস বাজাতে লাগল। তারপর নিজের প্রিয় পারফিউমটা সারা শরীরে মেখে ড্রয়িংরুমের দিকে পা বাড়াল।
চলবে..
(নোট:গতকালের ১৩ নাম্বার পর্বে রেসপন্স একদমই কম ছিল।এভাবে কি গল্প লিখতে ভালো লাগে বলো?তোমাদের কথার জন্য প্রতিদিন গল্প আপলোড দিই ব্যস্ততা থাকার পরও।)
Share On:
TAGS: নিলুফা নাজমিন নীলা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২০
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২৭
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২৬
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৬
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২৩
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১৭
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১৩
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২২