রোদ্দুরেরছেঁড়ামানচিত্র
পর্ব_১৩
কলমে #নিলুফানাজমিননীলা
★★★
রাত তখন গভীর। নিশিযাপনের শেষ প্রহর হয়তো, পুরো শহর তখন গভীর ঘুমে মগ্ন। তৃণাকে বাড়িতে নিয়ে আসার পরপরই ডাক্তারকে কল দেওয়া হয়েছিল। তিনি এসে তৃণাকে দেখে গেছেন এবং কিছু ঔষধ লিখে দিয়েছেন। ডাক্তারের মতে, দীর্ঘক্ষণ বৃষ্টিতে ভেজার কারণেই এই তীব্র জ্বর হয়েছে।
কিন্তু আরিয়ান তো জানে, এই জ্বরের নেপথ্যে কেবল বৃষ্টিতে ভেজা নয়, বরং বৃষ্টি দেখে তৃণার ওই অস্বাভাবিক ভয় কাজ করছে। আরিয়ান মনে মনে ঠিক করল, সুস্থ হলে সে তৃণাকে অবশ্যই জিজ্ঞেস করবে কেন সে বৃষ্টি দেখে এতটা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। তৃণা বিছানায় জ্বরে নিস্তেজ হয়ে শুয়ে আছে, আর আরিয়ান তৃণার মাথার পাশে টুলে বসে একনাগাড়ে জলপট্টি দিয়ে যাচ্ছে। মেয়েটার শরীরের তাপমাত্রা যেন কমছেই না। কিছুক্ষণ আগে জ্বর কিছুটা কমলেও এখন তা আবারও মারাত্মকভাবে বেড়েছে। তৃণা জ্বরের ঘোরে প্রায় অচেতন, আর যন্ত্রণায় বারবার মুখ দিয়ে অস্ফুট কিছু শব্দ করছে।
তৃণার শান্ত মুখটার দিকে তাকাতেই হঠাৎ আরিয়ানের দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল। কয়েক মুহূর্ত অপলক তাকিয়ে থাকতেই ঝাপসা স্মৃতির পর্দা ছিঁড়ে তার চোখের সামনে ভেসে উঠল এক পুরনো অতীত। একটা মেয়ে, যে বৃষ্টিতে ভীষণ আনন্দ নিয়ে ভিজছে… আর তার পরপরই কিছু বিভীষিকাময় দৃশ্য। স্মৃতিগুলো মনে পড়তেই আরিয়ানের সারা শরীরে এক অদ্ভুত অস্বস্তি বয়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যে তৃণার প্রতি তার মায়াটা বিষাক্ত এক বিরক্তিতে রূপ নিল। তার ইচ্ছে হলো, এখনই মায়ার এই মরীচিকা ভেঙে তৃণাকে বিছানা থেকে টেনে নিচে নামিয়ে দিতে।
আরিয়ান আর এক মুহূর্ত সেখানে বসে থাকতে পারল না। গটগট পায়ে বারান্দায় চলে গেল সে। রাগে আর যন্ত্রণায় নিজের মাথার চুলগুলো মুঠো করে চেপে ধরল। তার বুক চিরে এখন গগনবিদারী একটা চিৎকার করতে ইচ্ছে করছে, যেন সেই চিৎকারে সমস্ত পুরনো ক্ষত মুছে যায়।
পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ধরিয়ে নিল আরিয়ান। ধোঁয়ার কুন্ডলী পাকিয়ে সে হাতে তুলে নিল তার পুরনো গিটারটা। একসময় এই গিটারটাই ছিল তার প্রাণভোমরা, কিন্তু এখন এটাকে ছুঁয়ে দেখলেতেও ইচ্ছে হয়না।সময়ের সাথে সাথে মানুষের শখ গুলো হারিয়ে যায় বুঝি!গিটারের তারে সে কয়েকটা অর্থহীন আর বিষণ্ণ সুর তুলল। রাতের নিস্তব্ধতায় সেই সুর যেন আরও বেশি ধারালো হয়ে বাজছে।
নতুন শীত পড়তে শুরু করেছে। বাইরের হাড়কাঁপানো ঠান্ডা বাতাস এসে আরিয়ানের শরীর হিম করে দিচ্ছে। তার পরনে কেবল একটা টি-শার্ট আর ট্রাউজার। ঠান্ডার তীব্রতায় গায়ের লোমগুলো শিহরিত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু আরিয়ানের সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। তার ভেতরের আগুন বাইরের এই ঠান্ডার চেয়েও বেশি প্রখর।
অনেকক্ষণ বারান্দায় বসে থাকার পর সে ধীর পায়ে রুমে ফিরে এল। দেখল তৃণা পাশ ফিরে অন্য দিকে মুখ করে শুয়ে আছে। আরিয়ান এক মুহূর্ত নির্লিপ্ত চোখে তৃণার দিকে তাকিয়ে রইল। বিরক্তি থাকলেও অবচেতন মনেই সে তৃণার গায়ের কম্বলটা ভালো করে টেনে দিয়ে শরীর ঢেকে দিল। তারপর নিজে গিয়ে সোফায় শুয়ে পড়ল।
★★★
তৃণার ঘুম ভেঙেছিল খুব সকালেই। আরিয়ান ততক্ষণে অফিসে চলে গেছে। সকালে মিতু এসে নিজ হাতে জোর করে তাকে কিছু খাইয়ে দিয়েছে। মিতু মেয়েটা সত্যিই খুব ভালো, তৃণার সাথে তার আচরণ ঠিক নিজের বড় বোনের মতো। নাস্তা করার পর শরীরের দুর্বলতার কারণে তৃণা আর বাইরে যেতে চাইল না। রুমে শুয়ে থাকতে থাকতেই সে আবার গভীর ঘুমে তলিয়ে গিয়েছিল।
হঠাৎ করেই আবারও ঘুমটা ভেঙে গেল। একটা ভয়াবহ স্বপ্ন দেখেছে তৃণা কিছু কালো হাত তাকে নিচ্ছিদ্র অন্ধকারের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। এই স্বপ্নটা একটা সময় নিয়মিত দেখলেও ইদানীং আর দেখা হতো না। কিন্তু আজ হঠাৎ সেই পুরনো আতঙ্ক ফিরে আসায় তৃণা ছটফট করে বিছানা থেকে উঠে বসল। তার মাথা ঝিমঝিম করছে, পুরো ঘরটা যেন লাটিমের মতো ঘুরছে। চোখের সামনের সবকিছু ঝাপসা হয়ে আসছে। এক অদ্ভুত মৃত্যুভয় গ্রাস করল তাকে মনে হচ্ছে এখনই তার নিঃশ্বাস থেমে যাবে। ঝাপসা দৃষ্টিতে বারবার মায়ের করুণ মুখখানা ভেসে উঠছে। এখন ঠিক কয়টা বাজে, সেই আন্দাজটুকুও করার মতো অবস্থায় নেই তৃণা।
সে অস্থির হয়ে বিছানা থেকে নেমে পড়ল। শরীরের ভারসাম্য ঠিক নেই, তবুও টলটলে পায়ে দরজা খুলে করিডর দিয়ে হাঁটতে লাগল। আরিয়ানের রুম থেকে একটা রুম পরেই মায়মুনা বেগমের ঘর। তৃণা দিশেহারা অবস্থায় মায়মুনা বেগমের ঘরে ঢুকে পড়ল। মায়মুনা বেগম তখন বিছানায় হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে আধশোয়া হয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন।
তৃণাকে নিজের রুমে ঢুকতে দেখেই মায়মুনা বেগমের মাথায় রাগ চড়ে বসল। তিনি ভ্রু কুঁচকে কর্কশ স্বরে বলে উঠলেন,
“এই মেয়ে! তুমি আমার রুমে কী করছ? বের হও এখান থেকে।”
কিন্তু তৃণা যেন মায়মুনা বেগমের কোনো কথাই শুনতে পাচ্ছে না। তার পৃথিবীটা এখন কেবলই শৈশবের সেই হারানো স্মৃতির গোলকধাঁধায় বন্দি। মায়মুনা বেগমকে চরম অবাক করে দিয়ে তৃণা আচমকা এগিয়ে গিয়ে তাঁর কোলে মাথা রেখে কুঁকড়ে শুয়ে পড়ল। মায়মুনা বেগম বিস্ময়ে হতভম্ব হয়ে গেলেন। যে মেয়েটাকে তিনি দুচক্ষে সহ্য করতে পারেন না, যাকে এই বাড়ি থেকে তাড়ানোর ফন্দি আঁটেন, সেই মেয়ে আজ তাঁর কোলেই আশ্রয় নিয়েছে!
মায়মুনা বেগম রাগে কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গেলেন। তিনি তৃণার মাথায় হাত দিয়ে তাকে সরিয়ে দিতে চাইলেন, কিন্তু স্পর্শ করতেই টের পেলেন মেয়েটার শরীর জ্বরে তপ্ত আগুনের মতো পুড়ছে। সেই উত্তাপ অনুভব করতেই মায়মুনা বেগমের ভেতরের মাতৃত্ব জেগে উঠল, তিনি চাইলেও আর মেয়েটাকে সরিয়ে দিতে পারলেন না।
তৃণা হঠাৎ মায়মুনা বেগমের উরুর ওপর মুখ গুঁজে হু হু করে কেঁদে উঠল। কান্নার শব্দ শুনে মায়মুনা বেগমের কণ্ঠ আপনাতেই নরম হয়ে এল। তিনি নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করলেন,
“কী হয়েছে মেয়ে? কাঁদছ কেন এভাবে?”
তৃণা অস্পষ্ট ঘোরের স্বরে বারবার আওড়াতে লাগল, “আম্মু… ও আম্মু…”
মায়মুনা বেগম পাথরের মতো থমকে গেলেন। তৃণা কান্নারত অবস্থায় আবারও বলে উঠল,
“আম্মু, আমার মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দাও না! কতগুলো বছর হয়ে গেল তোমার স্পর্শ ছাড়া বেঁচে আছি। বড্ড একা লাগে আমার, ভীষণ কষ্ট হয় মা।”
তৃণার গলার সেই হাহাকার মায়মুনা বেগমের হৃদয়ে তীরের মতো বিঁধল। জীবনের সব তিক্ততা আর ঘৃণা মুহূর্তেই ম্লান হয়ে গেল এক অসীম মায়ার কাছে। তিনি অতি সন্তর্পণে তৃণার মাথায় হাত রাখলেন এবং খুব নরম স্পর্শে তার চুলে বিলি কাটতে লাগলেন। পরম মমতায় হাত বুলিয়ে দিতেই তৃণার যন্ত্রণাকাতর মুখে এক অপার্থিব প্রশান্তি ফুটে উঠল। এই গভীর মাতৃত্বের স্পর্শটাই হয়তো বছরের পর বছর ধরে খুঁজে বেড়িয়েছে মা-হারা এই মেয়েটা।
★★★
পড়ন্ত শীতের বিকেল। সূর্যের ম্লান আলোয় ভার্সিটির পিচঢালা রাস্তা দিয়ে এই সময় হাঁটলে এক অন্যরকম প্রশান্তি অনুভূত হয়। ভার্সিটি ছুটি হয়েছে বেশ অনেকক্ষণ। নুসরাত সাধারণত ক্লাস শেষ করে ভার্সিটির পাশেই একটা টিউশনি করায়, তারপর হোস্টেলে ফেরে। জায়গাটা খুব বেশি দূরে নয়, হেঁটে যাওয়া যায়। তবে প্রতিদিন ক্লাস আর টিউশনির ধকল শেষে পেটে প্রচণ্ড খিদে থাকে বলে হাঁটার শক্তি পায় না সে। কিন্তু আজ ছাত্রীর মা পরম মমতায় চা আর বিস্কুট খাইয়েছিলেন, তাই খিদের তাড়নাটা একটু কম।
নুসরাত আজ খুব ধীর পায়ে হেঁটে চলেছে। কিছুক্ষণ আগে ছাত্রীর মা তাকে বলছিলেন, “ইসস! এতটুকু বয়সে তুমি কত কষ্ট করে পড়াশোনা করছো। নিশ্চয়ই তোমার ফ্যামিলিতে আয়-রোজগার করার মানুষ কম!”
মহিলার কথা শুনে নুসরাত মনে মনে শুধু মৃদু হেসেছিল। সে যে শহরের অন্যতম ধনাঢ্য মির্জা পরিবারের মেয়ে, সেটা মহিলাকে বুঝিয়ে লাভ নেই। সত্যিটা বললে মহিলা হয়তো আরও একগাদা প্রশ্ন নিয়ে হাজির হতেন, তাই নুসরাত চুপচাপ শুনে গেছে।
আনমনে হাঁটতে হাঁটতে রাস্তার পাশে চোখ যেতেই নুসরাতের কপাল কুঁচকে গেল। মুহূর্তের মধ্যে মনের শান্ত ভাবটুকু উধাও হয়ে গেল তার। সামনেই উজ্জ্বল হাসি মুখে দাঁড়িয়ে আছে নির্জন। তাকে দেখামাত্রই নুসরাতের পায়ের গতি থেমে গেল। নির্জন এগিয়ে এল তার দিকে। ছেলেটার পরনে ইস্ত্রি করা ঝকঝকে শার্ট আর প্যান্ট, আভিজাত্য ফুটে উঠছে পোশাকে। দেখলেই বোঝা যায় কোনো প্রতিষ্ঠিত পরিবার থেকে এসেছে এবং হয়তো ভালো কোনো পেশায় নিয়োজিত।
নির্জন নুসরাতের একদম সামনে এসে দাঁড়াল।
নুসরাত নির্জনকে কোনো সুযোগ না দিয়েই সরাসরি আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে বলে উঠল,
“আজ আবার এখানে কেন দাঁড়িয়ে আছেন? কিছু বলবেন? যা বলার বলে ফেলুন। প্রতিদিন এভাবে আমাকে মাঝরাস্তায় থামানোটা আমি ভীষণ অপছন্দ করি। আমি কিন্তু সত্যিই বিরক্ত হচ্ছি!” নুসরাতের কণ্ঠে রাগের আভা স্পষ্ট।
নুসরাতের তীব্র রাগ দেখেও ছেলেটার মাঝে বিন্দুমাত্র ভাবান্তর দেখা গেল না। বরং সে ঠোঁটে এক চিলতে অমায়িক হাসি ধরে রেখে শান্ত গলায় বলল,
“শুনলাম মেয়েরা নাকি ছেলেদের মনের কথা পড়তে পারে, চোখের ভাষা বুঝতে পারে। আপনি কি কিছুই বুঝতে পারছেন না?”
নুসরাত ভ্রু কুঁচকে জবাব দিল,
“হ্যাঁ, পারছি! ভীষণভাবেই পারছি। আর পারছি বলেই বলছি, আমার এসব ন্যাকামি খুব বিরক্ত লাগে। দয়া করে প্রতিদিন এভাবে আমার পথ আগলে দাঁড়িয়ে থাকবেন না। তা না হলে লোক ডেকে আপনাকে কিন্তু গণপিটুনি দেওয়াবো, তখন সামলাতে পারবেন না!”
কথাটা বলেই নুসরাত হনহন করে হাঁটা শুরু করল। কিন্তু কয়েক কদম যেতেই নির্জন পেছন থেকে চিৎকার করে বলে উঠল,
“ওহে চশমাওয়ালী ম্যাডাম! এই অধম আপনাকে ভীষণ রকমের ভালোবাসে। আই লাভ ইউ!”
নুসরাতের মেজাজ এবার সপ্তমে চড়ল। সে ঝট করে পেছনে ফিরল এবং নির্জনের চোখের দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় বলল,
“আপনাকে দেখে তো বেশ ভদ্রলোক বলেই মনে হয়। তা রাস্তাঘাটে কি এভাবেই মেয়েদের ‘আই লাভ ইউ’ বলে বেড়ান?”
নির্জন পকেটে হাত দিয়ে ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে হাসল।
“সবার কাছে বলে বেড়াতাম না, তবে আজ থেকে শুরু করলাম। আর সেটা শুধুমাত্র আপনার জন্যই।”
নুসরাত রাগে ‘ধ্যাৎ’ শব্দ করে মুখ ঘুরিয়ে পা বাড়াতেই আবারও পেছন থেকে নির্জনের ডাক এল,
“শুনুন, আমার নাম নির্জন। ও চশমাওয়ালি ম্যাডাম, আপনার নামটা তো অন্তত বলে যান!”
নুসরাত এবার আর থামল না। সে জোরে পা চালিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে যেতে বিড়বিড় করে বলতে লাগল, “কী অদ্ভুত সব মানুষ রে বাবা! নাম জানে না, পরিচয় জানে না, আর মাঝরাস্তায় প্রপোজ করে বসে আছে! এই ধরনের মানুষের জন্যই দুনিয়াটা আজ রসাতলে যাচ্ছে।”
★★★
নৌশি কলেজ থেকে ফিরে অনেকক্ষণ হলো। ফ্রেশ হয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় মনের সুখে সুর করে একটা অদ্ভুত গান গাইতে শুরু করল সে,
“চাই না আমি সুন্দর জামাই, চাই না ফর্সা বর্সা,
বুইড়া বেডার লগে এবার যামু পলাইয়া…
বুইড়া বেডার ট্যাকা পয়সা আছে কারি কারি,
বুইড়া বেডা বিয়া করলে পাইমু গাড়ি বাড়ি।
বুইড়া দেখলে লডর পডর, দুইদিন পরে মরব,
সব সম্পত্তির দলিল তখন আমার নামে হইবো!
ও বুইড়া বিয়া করলে জিতমু আমি, ঠকমু না যে!”
নৌশি যখন গানের শেষ লাইনে গিয়ে বিলাসিতার স্বপ্ন দেখছে, ঠিক তখনই পেছন থেকে কেউ গম্ভীর গলায় বলে উঠল, “আমিন!”
নৌশি চমকে গিয়ে পেছন ফিরে দেখল আদনান তার ঠিক পেছনেই দাঁড়িয়ে। নৌশি চোখ পাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “তুই আমিন বললি কেন রে?”
আদনান খুব সিরিয়াস মুখ করে বলল,
“কেন বললি মানে? জানিস না, আমিন বললে আল্লাহ তায়ালা দোয়া খুব তাড়াতাড়ি কবুল করেন? তাই তোর হয়ে একটু প্রার্থনা করে দিলাম। ওগো খোদা, এই নাদানের বাচ্চার মনের নেক মকসুদ পূর্ণ করো, ওর জন্য জলদি এক কারি কারি টাকার মালিক বুইড়া জামাই পাঠায় দাও!”
আদনান মোনাজাতের মতো করে দুই হাত তুলে আকাশের দিকে তাকাল।
নৌশি এবার রাগে ফেটে পড়ল। দাঁত কিড়মিড় করে বলল, “শোন আদুর বাচ্চা, আমার কপালে অন্তত একটা বুইড়া জামাই জুটবে, কিন্তু তোর কপালে কোনো মেয়ে জুটবে না মিলিয়ে নিস। তোকে আমি অভিশাপ দিলাম, তুই চিরকাল ব্যাচেলর থাকবি!”
আদনান নৌশির অভিশাপ কানেই তুলল না। তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলল,
“শোন, অভিশাপ দিয়ে লাভ নাই। অলরেডি আরেকটা মেয়েকে পটিয়ে ফেলেছি, বুঝলি? একদম হুরপরীর মতো সুন্দরী!”
নৌশি ভ্রু কুঁচকে অবাক হয়ে তাকাল। অবিশ্বাসের সুরে বলল, “এই শালার মেয়েগুলো এত নির্বোধ কেন রে? তোর মতো একটা বাদরের গলায় ঝুলে পড়ে! জাস্ট অবিশ্বাস্য!”
“খবরদার, বাদর বলবি না! আমি হলাম এলাকার ক্রাশ। হ্যান্ডসাম তো, তাই মেয়েরা এক দেখাতেই কুপোকাত হয়ে যায়।” আদনান নিজের শার্টের কলারটা একটু ঠিক করে ভাব নিল।
নৌশি দমবার পাত্র নয়। সে সোফায় জাঁকিয়ে বসে পা তুলে বলল,
“হুম, তুই একাই হ্যান্ডসাম আর আমি বুঝি পচা? আমাকেও দিনে গণ্ডা গণ্ডা ছেলে প্রপোজ করে। আজও একজন করল আহা! কী সুন্দর দেখতে, কী হ্যান্ডসাম!”
নৌশির মুখে অন্য ছেলের প্রশংসা শুনে আদনানের চোখের মণি বড় বড় হয়ে গেল। গলার স্বর সপ্তমে তুলে বলল, “শোন! যদি কোনো ছেলের সাথে কোনো প্রকার লটর-পটর করতে দেখি, একদম ঠ্যাং ভেঙে ঘরে বসিয়ে রাখব। বলে দিলাম!”
নৌশি ভেঙচি কেটে বলল, “এ্যাহ! নিজে তলে তলে ডবল টেম্পু চালাচ্ছো, আর আমি একটু টোটো চালালেই তোমার হরতাল শুরু? যত্তসব!”
আদনান আর কোনো উত্তর দিল না, তবে নৌশির দিকে এমন রাগী চোখে তাকাল যে নৌশি বুঝল বেশি ঘাঁটালে আজ কপালে দুঃখ আছে।
★★★
আরিয়ান নিজের কেবিন থেকে বের হয়ে দ্রুত পায়ে লিফটের দিকে এগোচ্ছিল। মেজাজটাও সকাল থেকে খিটখিটে হয়ে আছে,বাড়ি গিয়ে শাওয়ার নিলে হয়তো ঠিক হবে। ঠিক তখনই মোড়ের মাথায় মীরা আচমকা এসে প্রায় আরিয়ানের গায়ের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল। অপ্রস্তুত আরিয়ান কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে এক ঝটকায় মীরাকে দূরে সরিয়ে দিল। তার রাগ তখন আকাশচুম্বী। আরিয়ান গর্জে উঠে বলল,
“মীরা! তুমি কিন্তু ইদানীং সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছ। এভাবে হুটহাট অন্যের গায়ের ওপর পড়ার মানে কী?”
মীরা এতটুকুও লজ্জিত হলো না। বরং ঠোঁটে একটা বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
“কই, আবার কিসের মানে? পা পিছলে গিয়েছিল, তাই একটু ভর নিতে চেয়েছি। তুমি তো দেখি মাউন্ট এভারেস্টের মতো শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছো!”
মীরার চোখের চপলতা আর হাসি দেখেই আরিয়ান পরিষ্কার বুঝল, মেয়েটা ইচ্ছে করেই এই কাজ করেছে। আরিয়ান তিতিবিরক্ত হয়ে কথা না বাড়িয়ে চলে যেতে চাইল। কিন্তু মীরা আবারও পথ আগলে দাঁড়িয়ে বলল, “ওইদিন আমাকে মাঝপথে ফেলে একা একা বাড়ি চলে গেলে, অথচ আমি তোমার জন্য কতক্ষণ ওয়েট করেছি! আজ অন্তত সেই পাপের প্রায়শ্চিত্ত করো। আমাকে সাথে করে নিয়ে যাও।”
আরিয়ান চোয়াল শক্ত করে শান্ত গলায় বলল,
“অসম্ভব!”
আরিয়ান পা বাড়াতে যাবে, ঠিক তখনই পেছন থেকে এক গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এল “কী ব্যাপার আরিয়ান? ব্যস্ততা কি এতটাই বেশি যে মীরাকে একটু সাথে করে নিয়ে যেতে পারবে না?”
আরিয়ান তাকিয়ে দেখল মীরার বাবা, অর্থাৎ তাদের বিজনেস পার্টনার জনাব আসলাম চৌধুরী দাঁড়িয়ে আছেন। এই প্রবীণ ভদ্রলোককে আরিয়ান বড় চাচার মতো সম্মান করে। আসলাম সাহেব হাসিমুখে এগিয়ে এসে আরিয়ানের কাঁধে হাত রাখলেন।
“আরিয়ান তুমি যখন যাচ্ছই, ওকে সাথে নিয়ে যাও। তোমাদের বাড়ি থেকে না হয় ও একটু ঘুরে আসলো, মায়মুনার সাথেও ওর অনেকদিন দেখা হয় না।”
আসলাম চৌধুরীর মুখের ওপর সরাসরি ‘না’ বলার ধৃষ্টতা তার নেই। আরিয়ান দাঁতে দাঁত চেপে মীরার দিকে একবার তাকাল। মীরা তখন বিজয়ের হাসি হাসছে।
আরিয়ান নিরুপায় হয়ে বলল, “ঠিক আছে আঙ্কেল, আপনি যখন বলছেন তখন ও আমার সাথেই যাবে।”
মীরা আহ্লাদী স্বরে বলে উঠল,
“থ্যাঙ্ক ইউ ড্যাড! আরিয়ান, চলো দেরি হয়ে যাচ্ছে তো।”
আরিয়ান গটগট পায়ে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল।
চলবে…
Share On:
TAGS: নিলুফা নাজমিন নীলা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১১
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২৬
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৫
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২৫
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১৫
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২২
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২৩
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১৭
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৭