রোদ্দুরেরছেঁড়ামানচিত্র
পর্ব_১১
কলমে:#নিলুফানাজমিননীলা
★★★
মিষ্টি রোদের ছোঁয়ায় একটি নতুন প্রভাতের সূচনা হলো। ধূসর রঙের পর্দার ফাঁক গলে আসা সোনালী রোদ ফ্লোরে শুয়ে থাকা তৃণার চোখে-মুখে খেলা করছে। ঘুমের ঘোরেই তৃণা মুখ কুঁচকে হাত দিয়ে রোদ আটকানোর চেষ্টা করল। তারপর ধীরলয়ে চোখ খুলতেই সে চমকে উঠল বিছানায় পা ঝুলিয়ে আরিয়ান বসে আছে এবং সরু চোখে একধ্যানে তৃণার দিকেই তাকিয়ে আছে।
আরিয়ানকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে তৃণা খানিকটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। জানালা দিয়ে বাইরের প্রখর রোদ দেখে ঘড়ির দিকে তাকাতেই তার পিলে চমকে উঠল আটটা বেজে গেছে! সে দ্রুত উঠে বসে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে বলে উঠল,
“কী হলো রাগী সাহেব? এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন?”
আরিয়ান তার দৃষ্টি সরালো না। কন্ঠে কিছুটা মেকি রাগ মিশিয়ে বলল,
“এই কয়েকদিনেই তো তোমার সাহস বেশ খানিকটা বেড়ে গেছে দেখছি। খবরদার, আমাকে এই রাগী সাহেব নামে ডাকবে না!”
তৃণা দুষ্টুমি করে মাথা নেড়ে বলল,
“আচ্ছা ঠিক আছে রাগী সাহেব, আপনাকে এই নামে আর ডাকব না।”
“আবারও একই নামে ডাকলে?” আরিয়ানের কন্ঠে এবার মৃদু ধমক।
তৃণা মুচকি হাসল। তার সেই স্নিগ্ধ হাসি দেখে আরিয়ান হঠাৎ কেমন যেন থমকে গেল। সে ইতস্তত করে বলে উঠল, “এভাবে হেসো না তো! এখন তুমি আমার অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছো।”
তৃণা অবাক হয়ে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
“তার মানে?”
আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, যেন কথাটা গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। তৃণা উৎসুক চোখে তাকিয়ে রইল। আরিয়ান এদিকে-সেদিক চোখ ঘুরিয়ে অবশেষে মাথা নিচু করে খুব ধীরস্বরে বলল,
“রাতের বেলা… শাড়ি ঠিক করে ঘুমাবে।”
মুহূর্তেই তৃণার মুখের সেই মিষ্টি হাসিটা মিলিয়ে গেল। এক নিমেষেই রাজ্যের লজ্জা এসে ওর মুখে ভিড় করল। লজ্জায় আর আড়ষ্টতায় তৃণা মাথা নিচু করে ফেলল। আরিয়ানও পরিবেশের এই অস্বাভাবিক অস্বস্তিটা টের পেল। সে আর এক মুহূর্ত সেখানে না দাঁড়িয়ে দ্রুত রুম থেকে বের হয়ে গেল।
তৃণা নিজের দুই হাতের তালু দিয়ে মুখ চেপে ধরল। লজ্জায় ওর কান পর্যন্ত ঝাঁঝাঁ করছে। মনে মনে ভাবল, ‘ইসসস! কী একটা বিশ্রী অবস্থা!’ সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, কাল থেকে অবশ্যই একটা কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমাবে।
তৃণা ধড়ফড় করে উঠে ফ্লোর থেকে বিছানা গুছিয়ে দ্রুত বাথরুমে ঢুকে পড়ল। আজ অনেকটা বেলা হয়ে গেছে, এতটা সময় সে কীভাবে বেঘোরে ঘুমালো তা ভেবে সে নিজেই অবাক হচ্ছে।
★★★
তৃণা নিচে নামতেই দেখল বাড়ির সবাই ইতিমধ্যে রান্নাঘরে জড়ো হয়েছে। সকালের নাস্তা বানানোর তোড়জোড় চলছে পুরোদমে। তৃণা রান্নাঘরে পা রাখা মাত্রই মায়মুনা বেগম কড়া গলায় ঝামটে উঠলেন,
“এত বেলা পর্যন্ত মানুষ কীভাবে ঘুমায়? বাড়ির ছোট ছোট ছেলে-মেয়েগুলো পর্যন্ত সেই ভোরে উঠে পড়েছে। আর এদিকে আমাদের মহারানীর এখন আসার সময় হলো!”
তৃণা মায়মুনা বেগমের সেই তপ্ত রাগকে এক চিলতে হাসি দিয়ে শুষে নিল। সে ওসব রুক্ষ কথায় একদম পাত্তা না দিয়ে খুব মিষ্টি করে বলল,
“শুভ সকাল, মা।”
মায়মুনা বেগম যেন বিষম খেলেন। তিনি হাতের খুন্তিটা থামিয়ে চোখ পাকিয়ে তাকিয়ে কর্কশ স্বরে বললেন,
“মা? খবরদার! তুমি আমাকে মা বলে ডাকবে না।”
তৃণা দমে যাওয়ার পাত্রী নয়। সে কাঁধ উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল, “তাহলে কী বলে ডাকব?”
“যা মন চায় তা-ই বলে ডাকো, তবুও মা বলবে না।”
মায়মুনা বেগমের কণ্ঠে বিরক্তি ঝরে পড়ছে।
তৃণা মোটেও বিচলিত হলো না। বরং আরও হাসিমুখে বলল,
“আচ্ছা, মা ডাক যখন পছন্দ না, তাহলে ‘আম্মু’ বলে ডাকি?”
মায়মুনা বেগম এবার একদম বোবা হয়ে গেলেন। রাগে আবারও চোখ পাকিয়ে তাকালেন, কিন্তু তৃণা সেই প্রখর দৃষ্টির বিপরীতে আবারও চমৎকার একটা স্নিগ্ধ হাসি দিয়ে অন্য পাশে সরে গিয়ে নিজের কাজে হাত লাগালো।
মায়মুনা বেগম অবাক হয়ে তৃণার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলেন। মনে মনে ভাবলেন কী মেয়েরে বাবা! আমি বলছি কী আর ওই মেয়ে একদম বেক্কলের মতো হাসছে! কোনো কথা কি ওর গায়ে লাগে না?
★★★
আরিয়ান স্টাডি রুমের আরামদায়ক চেয়ারে বসে একটি ইংরেজি নোভেল পড়ছে। সামনে টেবিলে ধোঁয়া ওঠা হট কফিনসকালের এই নিস্তব্ধ সময়ে বই পড়া আর কফি পান করা তার দীর্ঘদিনের পুরনো অভ্যাস। আজ শরীরটা ভালো লাগছে না বলে সে অফিসে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কয়েক মাস ধরে একটা প্রচণ্ড মাথাব্যথা তার মাথার ভেতরে জেঁকে বসেছে। মাঝে মাঝেই কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই এই তীব্র যন্ত্রণাটা শুরু হয়। শহরের নামি-দামি ডাক্তারের দেওয়া কড়া পাওয়ারের ট্যাবলেট খেয়েও এই ব্যথার হাত থেকে সে রেহাই পাচ্ছে না।
এমন সময় টেবিলের ওপর রাখা ফোনটা ভাইব্রেশনে কেঁপে উঠল। ল্যাপটপের পাশে রাখা মোবাইলের স্ক্রিনে ভেসে উঠল তার কলেজ জীবনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু রৌনকের নাম্বার। বন্ধুর কল দেখে আরিয়ানের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল। কলটা রিসিভ করেই সে বলল,
“হেই ব্রো! এতদিন পর হঠাৎ এই অধমের কথা মনে পড়ল তোর?”
ওপাশ থেকে রৌনক অভিযোগের সুরে বলল,
“আমি তো না হয় এতদিন পর মনে করলাম, কিন্তু তুই তো নিজ থেকে তাও করিস না। বন্ধু বলে কি কিছু অবশিষ্ট আছে তোর ভেতরে?”
আরিয়ান হালকা হেসে বলল, “আরে দোস্ত, ব্যস্ততা তো বুঝিসই। এসব মান-অভিমান বাদ দে। বল, তোর দিনকাল কেমন কাটছে?”
“এই তো চলছে। শোন, তোর সাথে কয়েকদিন ধরেই কন্টাক্ট করার ট্রাই করছি কিন্তু পাচ্ছিলাম না। আজ সন্ধ্যায় আমার বাড়িতে একটা পার্টি আছে, তোকে কিন্তু আসতেই হবে। কোনো না বলা চলবে না।”
আরিয়ান কফির মগটা হাতে নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“হঠাৎ কিসের পার্টি?”
“আজ আমার আর নিধির বিবাহ বার্ষিকী। খুব ছোটখাটো একটা ঘরোয়া আয়োজন করেছি। আর হ্যাঁ, শুনলাম তুই নাকি বিয়ে করেছিস! ভাবিকে কিন্তু অবশ্যই সাথে নিয়ে আসবি। অনেকদিন হলো তোর সাথে আড্ডা হয় না, ভাবির সাথেও আলাপ হয়ে যাবে।”
কথাটা শোনামাত্রই আরিয়ানের মুখের হাসিটা এক নিমিষেই মিলিয়ে গেল। সে কিছুক্ষণ চুপ থেকে ইতস্তত করে বলল,
“না রে দোস্ত, আসলে আজ আমার আসাটা বোধহয় সম্ভব হবে না। শরীরের অবস্থাটা একটু…”
“তোর কোনো বাহানা আমি শুনব না আরিয়ান। তোকে আসতেই হবে, ব্যাস!” রৌনক আর কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই কলটা কেটে দিল।
আরিয়ান ফোনটা কানের কাছ থেকে নামিয়ে পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে বসে রইল।
★★★
তৃণা রুমে ঢোকা মাত্রই তার ফোনটা বেজে উঠল। টেবিলের ওপর রাখা মোবাইলটার দিকে তাকাতেই বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধক করে উঠল তার। স্ক্রিনে তৌহিদের নামটা ভেসে উঠছে। তৃণা কিছুক্ষণ স্থির চোখে তাকিয়ে রইল সেদিকে। এক হাত দূরত্বে রাখা ফোনটা তার কাছে মনে হলো এক বিশাল পাহাড়। কলটা ধরার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই তার, অথচ এক অজানা দায়বদ্ধতা বা মায়ার টানে কলটা না ধরলে শান্তিও পাচ্ছে না।
এক চরম হীনম্মন্যতা আর দোটানায় ভুগে অবশেষে কাঁপা হাতে কলটা রিসিভ করল তৃণা। ওপাশ থেকে ভেসে এল অতি পরিচিত সেই বিষণ্ণ কণ্ঠস্বর,
“তৃণা…”
নামটা শোনামাত্র তৃণার বুকের ধুকপুকুনি বেড়ে গেল। ছেলেটার কণ্ঠের সেই হাহাকার যেন তৃণার হৃদপিণ্ডটা ছিঁড়ে বের করে আনতে চাইছে। চোখের কোণে নোনা জল জমে ঝাপসা হয়ে এল চারপাশ, তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে গলাটা যতটা সম্ভব শক্ত করে তৃণা বলল,
“হুম, বলুন।”
ওপাশ থেকে এক দীর্ঘ নীরবতা। কোনো শব্দ নেই, শুধু মাঝেমধ্যে বড় বড় দীর্ঘশ্বাসের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। তৃণার বুঝতে বাকি রইল না যে ওপাশে মানুষটা নীরবে চোখের জল ফেলছে। যে মানুষটার হাসিতে একসময় তৃণার আকাশ রঙিন হতো, আজ তার দীর্ঘশ্বাস তৃণার কানে বিষের মতো বিঁধছে। তৃণা আর্তস্বরে জিজ্ঞেস করল,
“আপনি কি কাঁদছেন?”
তৌহিদ একটু সময় নিয়ে নিজেকে সামলে নিয়ে উত্তর দিল,
“না না, কাঁদব কেন! পুরুষ মানুষের কি আর কাঁদা মানায়? কিন্তু বিশ্বাস করো তৃণা, আমার না ইদানীং নিঃশ্বাস নিতে বড্ড কষ্ট হয়। তোমার কি হয় না বুঝি? তোমাকে প্রাণভরে ভালোবাসা কি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অপরাধ ছিল?”
তৃণা তৌহিদের কথার কোনো উত্তর দিতে পারল না। তার মাথায় শুধু একটা প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে বিয়ের আগে তো তৌহিদ কোনোদিন এত ভালোবাসা প্রকাশ করেনি! তবে কি হারিয়ে ফেলার ভয় মানুষকে বেশি আবেগপ্রবণ করে তোলে? কিন্তু এখন এই ভালোবাসার কোনো মূল্য নেই তৃণার কাছে। যদিও আরিয়ান ডিভোর্সের কথা তুলেছে, কিন্তু তৃণা চায় না তার নামের পাশে ‘বিচ্ছেদ’ শব্দটা বসুক। আর যদি বিচ্ছেদ হয়ও, তবে কি সে তৌহিদের কাছে ফিরে যেতে পারবে? সমাজ কি তাকে সেই চোখে দেখবে?
নিজের দুর্বলতা ঢাকতে তৃণা গলাটা যথাসম্ভব কঠোর করে বলল,
“এসব ছেলেমানুষি এবার বন্ধ করুন। আপনি যাই বলেন না কেন, বাস্তব এটাই যে আমি এখন আরিয়ান মির্জার স্ত্রী।”
তৌহিদ হাহাকার করে বলে উঠল,
“আমি জানি ওর সাথে তোমার সম্পর্ক একদমই ভালো নেই তৃণা। তুমি ভালো নেই আমি জানি…”
“না, আপনি ভুল জানেন।আমরা…আমি সকালেই গোসল করে পবিত্র হয়েছি।”
চোখ বন্ধ করে বুক ফাটা এক মিথ্যা বলে দিল তৃণা। সে চাইল তৌহিদ তাকে ঘৃণা করুক, অন্তত ঘৃণার আড়ালে হলেও তৌহিদ এই মায়া থেকে মুক্তি পাক।
ওপাশে তৌহিদের কথা যেন গলায় আটকে গেল। তার কণ্ঠস্বর দ্বিগুণ ভারী শোনাল,
“এতটা পাষাণ কী করে হলে তৃণা? একবারও আমার কথা ভাবলে না? বাব্বাহ! স্বামীর সাথে দেখি ভালোই সুখে আছ আমাকে কাঁদিয়ে। ঠিক আছে, তুমি সুখে থাকো, তবে আমি তোমাকে আমৃত্যু ভালোবেসে যাব।”
তৃণার গলা ভেঙে আসছে। সে আর কথা না বাড়িয়ে ফোনটা কেটে দিল এবং তৌহিদের নাম্বারটা ব্লক লিস্টে পাঠিয়ে দিল। এ ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। যতবার তৌহিদের করুণ কণ্ঠ সে শুনবে, ততবার সে ভেঙে পড়বে। ফোনটা বুকের সাথে চেপে ধরে ওখানেই বসে পড়ল সে। হৃদয়ের ভেতর থেকে কান্নারা দলা পাকিয়ে আসলেও সে তা গিলে ফেলল। প্রথম প্রেম কি এত সহজে ভোলা যায়? তৌহিদই তো ছিল তার জীবনের প্রথম অরণ্য, প্রথম বসন্ত।
হঠাৎ কারো পায়ের শব্দ পেয়ে তৃণা তড়িঘড়ি করে চোখের জল মুছে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করল। পেছনে ফিরে দেখল আরিয়ান দাঁড়িয়ে। আরিয়ান তীক্ষ্ণ নজরে তৃণার লাল হয়ে থাকা চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কাঁদছিলে নাকি?”
তৃণা জোর করে মুখে একটা হাসি ফুটিয়ে বলল,
“কই, না তো!”
আরিয়ান আর কথা বাড়াল না। বিছানায় বসতে বসতে গম্ভীর গলায় বলল,
“আজ সন্ধ্যায় একটা পার্টি আছে, সেখানে আমার সাথে তোমাকেও যেতে হবে।”
তৃণা অবাক হয়ে বলল,
“পার্টি? অসম্ভব! আমি ওসব পার্টি-টার্টিতে যাই না।”
আরিয়ানের বিরক্তি ফুটে উঠল চেহারায়,
“আরে, এটা আমার বন্ধুর বিবাহবার্ষিকীর ঘরোয়া অনুষ্ঠান, কোনো ডিস্কো পার্টি নয়।”
তৃণা জানালার দিকে তাকিয়ে বলল,
“আপনি একাই যান না, সমস্যা কী?”
“আমি তো যাবই, কিন্তু আমার বন্ধু রৌনক জেদ ধরেছে তোমাকেও সাথে নিতে হবে। তাই তোমাকেও যেতে হচ্ছে।”
তৃণা আলমারি থেকে শাড়ি গোছাতে গোছাতে নিচু স্বরে বলল,
“আমি গিয়ে কী করব? আপনার লজ্জা করবে না আমার মতো একটা কালো মেয়েকে সবার সামনে স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দিতে?”
আরিয়ানের বিরক্তি এবার চরম পর্যায়ে পৌঁছাল। সে খাট থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“প্রথমত, তুমি কালো নও। আর দ্বিতীয়ত, তোমাকে নিয়ে যাওয়ার খুব একটা শখ আমারও নেই। বন্ধুর জোরাজুরিতে যেতে হচ্ছে। না যেতে চাইলে বলো, আমি একাই ম্যানেজ করে নেব।”
তৃণা কিছুক্ষণ চুপ থেকে ভাবল। তারপর শান্ত গলায় বলল, “আচ্ছা, আমি যাব।”
★★★
সন্ধ্যার আবছা আলোয় বাড়ি থেকে বের হওয়ার প্রস্তুতি চলল। আরিয়ান অনেকক্ষণ ধরে নিচে সোফায় বসে বিরক্তি নিয়ে অপেক্ষা করছে। মনে মনে গজগজ করছে আরিয়ান মেয়ে মানুষের কেন যে সাজগোজ করতে এত সময় লাগে! বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে সে।
ঠিক যখন রাগে আবারও ডাক দিতে যাবে, তখনই সিঁড়ি দিয়ে তৃণাকে নামতে দেখল। পরনে একটা হালকা সিল্কের শাড়ি। তবে তৃণা জুতো জোড়া পায়ে না দিয়ে হাতে নিয়ে নামছে। সাথে নৌশি আর মিতুও আছে, বোঝা যাচ্ছে দুজন মিলে মনের মতো করে সাজিয়েছে তৃণাকে।
তৃণা বরাবরই হাই হিল পরতে অপছন্দ করে, কারণ এতে তার হাঁটতে ভীষণ অসুবিধা হয়। আরিয়ান তৃণার হাতে জুতো দেখে বিরক্তি সামলাতে পারল না। ধমকের সুরে বলে উঠল,
“জুতো কি মানুষ হাতে নিয়ে হাঁটে? এটা কেমন আচরণ!”
তৃণা কিছুটা লজ্জিত হয়ে বলল,
“আসলে হাই হিল পরে সিঁড়ি দিয়ে নামতে খুব ভয় লাগছিল, তাই…”
“কোনো সমস্যা হবে না, জুতো পায়ে দাও। আর যদি ঠিকঠাক না চলতে পারো, তবে আমার সাথে যাওয়ার প্রয়োজন নেই,” আরিয়ানের গলায় কাঠিন্য।
আরিয়ানের কড়া ধমক খেয়ে তৃণা তড়িঘড়ি করে জুতো জোড়া পায়ে গলিয়ে নিল। কিন্তু ওই হিল জুতোয় তার হাঁটাচলা কেমন যেন আঁকাবাঁকা হয়ে যাচ্ছে। নৌশি পরিস্থিতি সামাল দিতে বলল,
“দাদাভাই, তুমি শুধু শুধুই বউমনিকে ধমকাচ্ছো। একবার তাকিয়ে দেখো তো ওকে কত সুন্দর লাগছে!”
আরিয়ান ভ্রুক্ষেপহীন ভাবে বলল,
“তোরাই দেখ, আমার সময় নেই।”
বলেই সে হনহন করে মেইন দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল। নৌশি আর মিতু মিলে সাবধানে তৃণাকে গাড়িতে বসিয়ে দিয়ে এল।
আরিয়ান গাড়ি স্টার্ট দিয়ে নিচু স্বরে বলল,
“সিট বেল্টটা লাগিয়ে নাও।”
তৃণা কোনো কথা না বাড়িয়ে শান্তভাবে বেল্ট লাগালো। গাড়ি চলছে সন্ধ্যার ব্যস্ত রাস্তা দিয়ে। জানালার কাঁচ নামানো থাকায় বাইরের ঠান্ডা বাতাস এসে তৃণার অবাধ্য চুলগুলোকে উড়িয়ে দিচ্ছে। গাড়িতে চড়লেই তৃণার চোখে রাজ্যের ঘুম নামে। গন্তব্য কত দূরে জানা নেই, শুধু দেখল পাশে বসে থাকা মানুষটা পাথরমুখ করে গাড়ি চালাচ্ছে। ক্লান্তি আর বাতাসের দোলায় তৃণা একটা বড় করে হাই তুলল।
কিছুক্ষণ পর আরিয়ানের গাড়িটা রৌনকদের বাংলোর সামনে গিয়ে থামল। আরিয়ান গাড়ি থামিয়ে পাশের সিটের দিকে তাকাতেই দেখল তৃণা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। সিটে মাথা হেলান দিয়ে সে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে, মুখটা একদিকে কিছুটা বেঁকে আছে।
হঠাৎ করেই আরিয়ানের দৃষ্টি থমকে গেল তৃণার নিষ্পাপ আর শান্ত মুখটার দিকে। আজ যেন প্রথমবার আরিয়ান খুব গভীর মনোযোগ দিয়ে তৃণার মুখটা দেখল। মেকআপের সামান্য ছোঁয়ায় মেয়েটাকে কেমন মায়াবী লাগছে। এক মুহূর্তের জন্য আরিয়ানের মনের কোথাও একটা সূক্ষ্ম ঢেউ খেলে গেল। কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিল সে। ধীর গলায় ডাকল,
“তৃণা? শুনছো? আমরা পৌঁছে গেছি।”
তৃণার কোনো সাড়াশব্দ নেই। আরিয়ান এবার কোনো উপায় না দেখে তৃণার কাঁধে আলতো করে একটা ধাক্কা দিল। ধাক্কাটা লাগামাত্রই তৃণা আঁতকে উঠে চোখ খুলল। মেয়েটার চোখেমুখে একরাশ আতঙ্ক, যেন কোনো দুঃস্বপ্ন দেখছিল। ভালো করে আরিয়ানকে দেখার পর সে লম্বা একটা শ্বাস ফেলে নিজেকে শান্ত করল। আরিয়ান বুঝতে পারল না এভাবে অহেতুক কেঁপে ওঠার কারণ কী। সে আবার বলল,
“আমরা পৌঁছে গেছি, এবার নামো দয়া করে।”
বলেই আরিয়ান গাড়ি থেকে নেমে পড়ল। তৃণা গাড়ি থেকে নামতে গিয়ে টের পেল হাই হিলগুলো যেন আজ ওর পরম শত্রু। আরিয়ান কয়েক কদম সামনে এগিয়ে পেছনে তাকিয়ে দেখল, তৃণা টলমলে পায়ে কোনোমতে ব্যালেন্স রাখার চেষ্টা করে অদ্ভুতভাবে হেঁটে আসছে। তৃণা টাল সামলাতে না পেরে সামনের দিকে পড়ে যেতে নিলেই আরিয়ান বিদ্যুৎবেগে তাকে আগলে ধরল।
মুহূর্তের জন্য দুজনের চোখাচুখি হলো। এক আশ্চর্য স্তব্ধতা নেমে এল সেখানে। পরক্ষণেই দুজনেই অস্বস্তিতে চোখ সরিয়ে নিল। আরিয়ানের বিরক্তি যেন সব সীমা ছাড়িয়ে গেল। সে দাঁতে দাঁত চেপে চাপা কণ্ঠে বলল,
“আমার মান-সম্মান কি আজ রাস্তায় ধুলোয় মিশিয়ে ছাড়বে? এই নাও, আমার হাত ধরো। হাত ধরেই হাঁটো।”
বলেই আরিয়ান নিজের শক্তপোক্ত হাতটা বাড়িয়ে দিল। তৃণা কয়েক সেকেন্ড বাক্যহীন হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে অভিমানে বলল,
“না দরকার নেই। আমি একাই যেতে পারব।”
আরিয়ান ভাবলেশহীন কণ্ঠে জবাব দিল,
“ওকে, ইউর উইশ।”
বলেই আরিয়ান আবার হাঁটতে শুরু করল। জেদ করতে গিয়ে তৃণা এক কদম পা ফেলতেই আবারও পা মচকে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। ভারসাম্য রক্ষা করতে সে সামনে থাকা আরিয়ানকে খপ করে ধরল। কিন্তু উত্তেজনায় হাতটা আরিয়ানের পেটের ওপর গিয়ে পড়ল।
আরিয়ান তৃণার হাত নিজের পেটের ওপর দেখে এক চিলতে বাঁকা হাসি হাসল। ব্যঙ্গ করে বলল,
“ধরতে বললাম হাত, আর তুমি তো দেখছি সরাসরি আমার পেট চেপে ধরছো! বলি কি মেয়ে, এত নির্লজ্জ হওয়া কি ভালো? তোমার লাজ-লজ্জা না থাকতে পারে, আমার কিন্তু একটু আছে।”
তৃণা ভ্রু কুঁচকে আরিয়ানের দিকে তাকালো। এই লোকটাকে সে কিছুতেই বুঝে উঠতে পারে না। গিরগিটির মতো রং বদলায় সে। এইমাত্র ভীষণ রাগ দেখাচ্ছিল, আর এখন তার সাথে ঠাট্টা করছে! তৃণা আর তর্কে গেল না। দ্রুত আরিয়ানের পেটের ওপর থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে তার শক্ত হাতটা আঁকড়ে ধরল।
ভেতরে পা রাখতেই রৌনক উচ্ছ্বসিত হয়ে এগিয়ে এল এবং আরিয়ানকে জড়িয়ে ধরল। বন্ধুদের চিরচেনা সেই খুনসুটি আর কুশল বিনিময় শেষে রৌনকের দৃষ্টি পড়ল তৃণার ওপর। সে একটু কৌতুকমাখা হাসিতে আরিয়ানকে জিজ্ঞেস করল,
“ইনিই কি তোর স্ত্রী?”
আরিয়ান খুব নিচু স্বরে ‘হুম’ বলে সায় দিল। রৌনক অমায়িক একটা হাসি নিয়ে তৃণার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল হ্যান্ডশেক করার জন্য। কিন্তু তৃণা হাত বাড়ানো তো দূরের কথা, সে উল্টো আরিয়ানের হাতটা আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। তৃণার আঙুলগুলো কাঁপছে। আরিয়ান কিছুটা অবাক হয়ে তৃণার দিকে তাকালো। সে দেখল তৃণার চোখে-মুখে স্পষ্ট ভয়ের ছাপ। এই ঝলমলে আলো আর মানুষের ভিড়ে মেয়েটা কেন জানি কুঁকড়ে যাচ্ছে। আরিয়ান ঠিক বুঝে উঠতে পারল না, এটা কি স্রেফ সামাজিক জড়তা নাকি অন্য কিছু?
আরিয়ান পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে দ্রুত বলল,
“তোর বউয়ের সাথে আলাপ করিয়ে দিবি না রৌনক?”
রৌনক হাসল এবং তার স্ত্রী নিধির সাথে পরিচয় করিয়ে দিল। নিধি বেশ চটপটে এবং আধুনিক মনস্ক মেয়ে, সে তৃণার সাথে মিষ্টি করে কথা বলার চেষ্টা করল।
কিছুক্ষণ পর তৃণা ভিড় থেকে একটু দূরে কোণার একটি টেবিলে গিয়ে বসল। চারদিকের উচ্চস্বরে মিউজিক, ঝলমলে সোডিয়াম আলো আর অচেনা মানুষদের অহেতুক হাসাহাসি সবকিছুই তৃণার কাছে প্রচণ্ড অস্বস্তিকর লাগছে।
আরিয়ান, রৌনক আর নিধি দাঁড়িয়ে কথা বলছিল। হঠাৎ নিধি তৃণার দিকে তাকিয়ে আরিয়ানের উদ্দেশ্যে বলল,
“আরিয়ান, ইউ আর রিয়েলি আ লাকি ম্যান! তোমার ওয়াইফ ভীষণ মিষ্টি একটা মেয়ে। জানো তো, মানুষ শুধু ফর্সা হলেই সুন্দর হয় না। তৃণা শ্যামলা হতে পারে, কিন্তু ওর মুখে অদ্ভুত একটা মায়া আর জাদু আছে। আমি মেয়ে হয়েও ওর দিক থেকে চোখ ফেরাতে পারছি না।”
নিধির কথা শুনে আরিয়ান কিছুটা অবাক হয়ে তৃণার দিকে তাকালো। দূরে একাকী বসে থাকা তৃণা তখন অস্বস্তিতে নিজের এক হাতের নখ অন্য হাত দিয়ে খুঁটছে, দৃষ্টি তার মেঝের দিকে নিবদ্ধ। আরিয়ান এবার চারপাশটা একটু ভালো করে লক্ষ্য করল। সে দেখল, পার্টির বেশ কয়েকজন পুরুষ আড়চোখে তৃণার দিকে তাকাচ্ছে। আরিয়ান এর আগে কখনো তৃণার চেহারা নিয়ে এতটা ভাবেনি। আজই প্রথম সে দূর থেকে মেয়েটাকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত খুঁটিয়ে পরখ করল। আরিয়ানের মনের গহীনেও একটা কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনি করে উঠল হ্যাঁ, মেয়েটার শান্ত শ্যামল চেহারায় আসলেই এক সম্মোহনী জাদু আছে।
ঠিক তখনই একটি ছেলে এসে বেশ সাবলীল ভঙ্গিতে সোজা তৃণার টেবিলের সামনের চেয়ারটায় বসল। তৃণা ভীষণ হকচকিয়ে গেল এবং ভয়ার্ত চোখে ছেলেটার দিকে তাকালো। ছেলেটা একগাল হাসি নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“হ্যালো! হোয়াট ইজ ইউর নেইম?”
তৃণা এতটাই ঘাবড়ে গেছে যে তার কণ্ঠস্বর কাঁপতে শুরু করল। সে কোনোমতে তোতলামি করে বলল,
“তৃণা… তৃণা হাওলাদার।”
ছেলেটা যখন আরও কিছু বলার জন্য মুখ খুলতে যাবে, ঠিক তখনই আরিয়ান এসে পেছন থেকে শক্ত হাতে ছেলেটার কাঁধে চাপ দিল। আরিয়ানের স্পর্শে ছেলেটা কিছুটা বিরক্ত হয়ে ঘুরে তাকিয়ে বলল,
“হোয়াট প্রবলেম?”
আরিয়ান তার মুখে সেই চেনা গম্ভীর শীতল হাসিটা ধরে রেখে জবাব দিল,
“নো প্রবলেম। সি ইজ মাই ওয়াইফ। সো…”
আরিয়ানের কথার ধরনেই ছেলেটা বুঝে গেল আর এগোলে বিপদ আছে। সে অপ্রস্তুত হয়ে তড়িঘড়ি করে বলল, “ওহ, আই অ্যাম সরি! আমি ভেবেছিলাম শি ইজ সিঙ্গেল।”
কথাটা বলে ছেলেটা দ্রুত সেখান থেকে সরে গেল। আরিয়ান তৃণার দিকে তাকালো। তৃণা তখনো থরথর করে কাঁপছে,
আরিয়ান বিস্ময় নিয়ে তৃণার দিকে তাকালো,
“কী হয়েছে তৃণা? এমন কুঁকড়ে যাচ্ছো কেন? এইটুকুতেই ভয় পাওয়ার কী আছে?”
তৃণা আরিয়ানের চোখের দিকে তাকাতে পারল না। ধরা গলায় মিনতি করে বলল,
“প্লিজ, চলুন বাড়ি ফিরে যাই। আমার এখানে আর এক মুহূর্তও ভালো লাগছে না।”
আরিয়ান ভ্রু কুঁচকে বিরক্তি প্রকাশ করল,
“এখনই? আরে, মূল অনুষ্ঠান তো এখনো শুরুই হলো না!”
“প্লিজ…!” তৃণার কণ্ঠস্বর এতটাই করুণ শোনাল যে আরিয়ানের কঠিন মনটা মুহূর্তেই নরম হয়ে এল। সে আর দ্বিরুক্তি না করে বলল, “ওকে, চলো।”
আরিয়ান রৌনককে নানারকম বাহানা দিয়ে পার্টি থেকে দ্রুত বেরিয়ে এল। সে ড্রাইভিং সিটে বসে গম্ভীর মুখে গাড়ি স্টার্ট দিল। তৃণা জানালার ওপাশে অন্ধকার রাস্তার দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে বসে রইল। আজ রাস্তাঘাট প্রতিদিনের তুলনায় বেশ ফাঁকা, যানজট নেই বললেই চলে। অনেকটা পথ যাওয়ার পর হঠাৎ একটা ঝাকুনি দিয়ে গাড়িটা মাঝরাস্তায় থেমে গেল। তৃণা অপ্রস্তুত হয়ে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ল।
আরিয়ানের কপালের ভাঁজ আরও গভীর হলো। সে কোনো উত্তর না দিয়ে গাড়ি থেকে নেমে ইঞ্জিল চেক করতে শুরু করল। কিছুক্ষণ দেখার পর সে বুঝতে পারল, ইঞ্জিনে বড় কোনো সমস্যা হয়েছে যা এখনই সারানো সম্ভব নয়। মেজাজ হারিয়ে আরিয়ান গাড়িতে সজোরে একটা লাথি বসাল, যার ফলস্বরূপ ব্যথায় সে নিজেই কুঁকড়ে উঠল।
তৃণা গাড়ি থেকে নেমে ধীরপায়ে আরিয়ানের পাশে এসে দাঁড়াল। আরিয়ান ব্যথাতুর গলায় বলল,
“গাড়িতে মেকানিক্যাল প্রবলেম হয়েছে। এখান থেকে কিছুটা রাস্তা আমাদের হেঁটেই যেতে হবে। কপাল ভালো থাকলে সামনে হয়তো কোনো রিকশা বা গাড়ি পাওয়া যেতে পারে।”
রাস্তাটা একদম জনমানবশূন্য। দু-একটা গাড়ি পাশ দিয়ে শো শো করে বেরিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু এই নির্জন রাতে বিপদের ঝুঁকি নিয়ে কেউ সাহায্যের জন্য থামবে না সেটা আরিয়ান ভালো করেই জানে। নিরুপায় হয়ে তারা হাঁটতে শুরু করল। আকাশের অবস্থা ক্রমেই খারাপ হচ্ছে। মেঘের গর্জনের সাথে বিদ্যুতের তীব্র ঝিলিক চারপাশটা কাঁপিয়ে দিচ্ছে। তৃণা হিল জুতো জোড়া হাতে নিয়ে প্রায় দৌড়ানোর মতো করে হাঁটছে, তার চোখেমুখে স্পষ্ট ভীতি।
তৃণা কাঁপা গলায় বলল,
“মনে হয় বৃষ্টি আসবে। প্লিজ, একটু তাড়াতাড়ি চলুন।”
আরিয়ান ভ্রু কুঁচকে তৃণার দিকে তাকিয়ে হালকা চালে বলল, “হুম, আসুক বৃষ্টি! তো হয়েছেটা কী? বৃষ্টিতে ভিজতে তো আমার ভালোই লাগে।”
তৃণা প্রায় আর্তনাদ করে উঠল,
“প্লিজ, ওরকম বলবেন না! আমার বৃষ্টিতে বড্ড ভয় লাগে।”
আরিয়ানের কাছে পুরো ব্যাপারটাই অদ্ভুত লাগছিল। বৃষ্টি তো রোমান্টিক হওয়ার কথা, সেখানে বৃষ্টি দেখে কেউ এভাবে মৃত্যুভয়ে কুঁকড়ে যেতে পারে এটা তার কল্পনারও বাইরে ছিল।
কিন্তু ভাবতে ভাবতেই আকাশ চিরে মেঘের গর্জন শুরু হলো। চোখের পলকে মুষলধারে বৃষ্টি নেমে তৃণা আর আরিয়ানকে ভিজিয়ে একাকার করে দিল। তৃণা বৃষ্টির শব্দে নিজের কান দুটো চেপে ধরল। তার মনে হচ্ছিল, চারপাশের অন্ধকার আর এই বৃষ্টির শব্দ তাকে গ্রাস করে নিচ্ছে। তার মনে হচ্ছে এক বিষাক্ত কালো হাত যেন তাকে অন্ধকারের অতলে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।
আরিয়ান তৃণার অস্বাভাবিক অবস্থা দেখে আঁতকে উঠল। সে বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে চিৎকার করে জিজ্ঞেস করল,
“কী হয়েছে তৃণা? আর ইউ ওকে?”
তৃণা কোনো উত্তর দিতে পারল না। সে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে আচমকা আরিয়ানকে জড়িয়ে ধরল। কান্নায় ভেঙে পড়ল মেয়েটা। বৃষ্টির শব্দের সাথে পাল্লা দিয়ে সে বলতে লাগল,
“প্লিজ আমাকে বাঁচান…”
আরিয়ান প্রথমে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গিয়েছিল। সে চেয়েছিল তৃণাকে নিজের থেকে দূরে সরাতে, কিন্তু তৃণার শরীরের তীব্র কম্পন অনুভব করে সে স্থির হয়ে গেল। তৃণা এমনভাবে আরিয়ানকে আঁকড়ে ধরেছে, যেন এই বিশাল পৃথিবীতে আরিয়ানই তার শেষ আশ্রয়।
কিছুক্ষণ পর আরিয়ান অনুভব করল, তৃণার সেই প্রচণ্ড কাঁপুনিটা হঠাৎ থেমে গেছে। সে নিচু হয়ে তৃণার মুখের দিকে তাকাতেই দেখল, মেয়েটার চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করা, শরীরটা একদম এলিয়ে পড়েছে। আরিয়ান কয়েকবার ডাকল,
“তৃণা! এই তৃণা, শোনো!”
কিন্তু কোনো সাড়াশব্দ নেই। তৃণা জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। জনমানবশূন্য এই অন্ধকার রাস্তায় আরিয়ান একা। দূরে কোনো গাড়ির চিহ্ন নেই। সে আর সময় নষ্ট না করে তৃণাকে দুই হাতে পাজাখোলা করে কোলে তুলে নিল। বৃষ্টির ঝাপটায় তৃণার ভেজা চুলগুলো আরিয়ানের মুখে এসে পড়ছে। তৃণা এমনিতেই খুব ছিপছিপে গড়নের, তাই তাকে কোলে নিয়ে হাঁটতে আরিয়ানের খুব একটা কষ্ট হলো না।
আরিয়ান বৃষ্টির মাঝে হাঁটতে হাঁটতে একবার তৃণার ম্লান মুখটার দিকে তাকাল। যে মেয়েটাকে সে অবহেলা করত, আজ সেই মেয়েটা তার বুকেই নিথর হয়ে পড়ে আছে। আরিয়ানের বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন যেন হাহাকার করে উঠল।
চলবে…
(৩৪০০+ শব্দ। এই পর্বটা বোধহয় সবচেয়ে বড়।আচ্ছা যাই হোক অবশ্যই গল্প সম্পর্কে মন্তব্য করে যাবেন।ভালো রিয়েক্ট না পেলে আগামীকাল গল্প আসবে না)
Share On:
TAGS: নিলুফা নাজমিন নীলা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১৪
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১৮
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১৩
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১৭
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৩
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২৮
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২৩
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২১