Golpo romantic golpo যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ

যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ৮


যেখানেপ্রেমনিষিদ্ধ

ইশরাতজাহানজেরিন

পর্ব_৮

সারা রাত মশার কামড়ে ঘুম আসেনি আর্যার। ভোরে যাও চোখ লেগেছে, সেই ঘুমটা ভেঙে দিয়েছে এই তেজ নামক লোকটা। ঘোড়ার ডিম মার্কা স্বামী একটা। ঘুমাতে পারেনি রাতে আর্যা। ঘুম আসবে কেমন করে বাসর রাতে, তার তো বাসর হলোই না উল্টো অসভ্য স্বামীটা তাকে ফ্লোরে শুইয়েছে। আবার মশায় কামড়ে ৫ কেজি ওজন বাড়িয়ে দিয়েছে। আর্যা আগে ভাবতো মশা কেবল গরীবের ঘরে থাকে, এখন দেখছে বড়লোকদের ঘরে কেবল মশা না, একেবারে ডেঙ্গু ম্যালেরিয়া থাকে। বড়লোকি ব্যাপার স্যাপার। তার ওপর ফ্লোরে ঘুমিয়ে পিঠে কী ভিষণ রকম যন্ত্রণা হচ্ছে। বলে বোঝানো সম্ভব নয়। গায়ে পানি পড়তেই ছটফটিয়ে উঠে বসল আর্যা। কিছুক্ষণ তো বুঝতেই পারল না তার সাথে এটা কী এমন হচ্ছে। যখন বুঝতে পারল তখন ক্ষেপে গিয়ে তেড়ে আসল তেজের দিকে। তা দেখে তেজ ধমকে বলল,” দূরে থাকো, খানদানি পাগলের স্পর্শ এই সকাল সকাল আমার গায়ে লাগুক আমি তা চাই না।”

“কথায় কথায় খানদানি পাগল বলো কেন?”

“তো পাগলের গুষ্টিকে পাগল বলব না তো তোমাদের সবাইকে কোলে তুলে চুমু খাবো?”

“তোমার নামে যদি বাবার কাছে নালিশ না করেছি। তোমার পরিবারের তো সবাই আমায় কত আদর করছে, ওই কাজের লোকটাও।”

“তো গিয়ে কাজের লোকের ঘাড়ে গিয়ে পড় না। আমার কাছে কী?

” কারণ বিপদ তোমাকে ভালোবাসে।”

“বিপদের মায়রে গাছে তুলে চিনি ছাড়া লাড়া দিবো। ফাউল কোথাকার। এখন সামনে থেকে সর, নইলে তোর ওপর দিয়ে যাবো।”

“সরব না।”

“না সর। পরে দেখবি আর লম্বা হবি না ডিঙিয়ে গেলে।”

“হায় খোদা তুমি আমায় এত ভালোবাসো।”

“ভালোবাসি কবে বললাম? তোকে আমি বাল দিয়েও বাসি না। ভালোবাসা সে তো বিরাট দূরের ব্যাপার। কই আগারতলা আর কই বেলতলা।”

আর্যা জবাব দিলো না। তবে সামনে থেকে সরে যেতেই তেজ ওয়াশরুমের দিকে যেতে নিলে আর্যা পথ আটকে বলল, “এই স্বামী আমার আগে যেতে হবে। তোমরা বড়লোক মানুষ, ওইসব হিশু করলেও চলে। ছোট বেলায় তো আমার মাথায় হিশু করেই ছিলে।”

“সরবি? এবার তোর বাপের মুখের ওপর হলদু রঙা লিকুইড বির্সজন দিবো।”

“কেন আপনার কী জন্ডিস নাকি? জন্ডিস হলে লুকাবেন না কিন্তু, আমি এক কবিরাজকে চিনি। ডাবপড়া দেয়। দেখি কাছে আসেন তো, চোখ দেখি তাকান গরুর মতো ড্যাব ড্যাব করে। ওমা হলুদের বদলে লাল কেন? মনে হয় জন্ডিসের জায়গায় আপনার ভেতর জন্ডিসের দূর সম্পর্কের আত্মীয় বাসা বেঁধেছে। তবে চিন্তা নেই স্বামীজান, আমি থাকতে আপনার বুকে অন্য কেউ বাসা বাঁধতে পারবে না।”

“নাটক বন্ধ হলে একটু সাইড পাওয়া যাবে?”

“তুমি একটু পরে যাও, আমার ইমারজেন্সি। আমরা গরীব মানুষ হতে পারি, হালকার ওপর ঝাপসা কিপ্টা হতে পারি কিন্তু সকাল সকাল সবার আগে পেট খালি করতে কিপ্টামি করিনা। আর এমনিতেও সারারাত আমার পানির পিপাসা পায় বুঝতেই তো পারছেন পেটের থলি একেবারে সাগর হয়ে আছে।”

“যা ভাই যা, তুই আগে ওয়াশরুমে যা, তোর সাগরের বাঁধ ছেড়ে দিয়ে আয় জায়গা মতো। নইলে বন্যায় মীর বাড়ি তলিয়ে যাবে।”

আর্যা হেসে তেজের থুতনি ধরতে গেলে সে পিছিয়ে যায়। তা দেখে আর্যা পুনরায় হেসে বলে, “ওলে আমার চিড়িয়াখানার বানরটা। তোমায় উম্মাহ।”

“মর বেটি লুইচ্ছা।”

মাটির ওপর পাতলা হলুদের পরত মেখে আছে। পাড়ার বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ক্লাবঘর আজকে জমজমাট। এপমি হওয়ার পর আব্রাজের তো এখানে আসাই হয়ে উঠে না। তবে এককালে কতই না আড্ডা দিয়েছে এই জায়গায়। টিনের চালের নিচে লম্বা বেঞ্চ আর পুরোনো টেবিলগুলো সরিয়ে জায়গা করছে ছেলেরা। এক কোণে বড় ডেকচি ধুয়ে রাখা, আরেক পাশে কেউ চাল বাচছে, কেউ মাংস ধুচ্ছে। আজ ক্লাবে বিরিয়ানি পার্টি হবে। গরম পোলাউর গন্ধ এখনো ওঠেনি, কিন্তু মসলা ভাজার গন্ধ আগাম উৎসবের ঘোষণা দিচ্ছে। এই সব কোলাহলের মাঝেই কাঠের বেঞ্চে হেলান দিয়ে বসে আছে মীর আব্রাজ রোদ। সাদা শার্টটা বেশ ঝকঝকে, কিন্তু নিচে কালো লুঙ্গি। আঙুলে ধরা সিগারেট থেকে ধোঁয়া উঠছে সরু সাপের মতো। অন্য হাতে ছোট কাঁচের কাপে চা। সে একবার ধোঁয়া ছাড়ে, একবার চায়ে চুমুক দেয়। পাশেই টিভি চলছে। পুরোনো স্পিকারের ভাঙা সুরে ভেসে আসছে গান,
“টিকাটুলির মোড়ে একটা হল রয়েছে,
হলে নাকি এয়ারকন্ডিশন রয়েছে…” ক্লাবঘরের ভেতরে ছেলেপেলেদের হাঁকডাক করেই যাচ্ছে। তার এসিস্ট্যান্ট কচি শসা খেতে খেতে হঠাৎ বলল, “এই সুমন, পেঁয়াজটা একটু পাতলা করে কাট। বিরিয়ানিতে মোটা পেঁয়াজ দিলে কেমন লাগে রে? গুয়ের মতো ভেসে থাকে।”

পাশ থেকে আব্রাজ বলে উঠল, “ভালো করে বাল পানি না দিলে তো গু ভাসবেই তোমার।”

“ভাই!”

আব্রাজ মুখ বাঁকিয়ে বলল, “পুরা এলাকার ঘরে ঘরে বিরিয়ানি সাপ্লাই করবি যেন সবাই বুঝতে পারে আমি আব্রাজ যদি এবারও এমপি হই, তাহলে বাঙালির আর কপালে ভাত জুটবে না।”

“ইয়ে মানে?”

“আরে বাল, ভাতের বদলে বিরিয়ানি জুটবে।”

“তো ওইটা সরাসরি বললেই তো পারেন। কিন্তু এই বিরিয়ানি খাওয়াইয়া লাভ কী ভাই? শেষে গিয়ে তো আমাদের সেই ভোটই চুরি করতে হয়।”

“হোপ আস্তে মানুষ শুনলে তোমার পেছন দিয়া শিক ঢুকাবো আমি।”

“কেন ভাই আমি কাবাব না নবাব? যে আমার পেছন নিয়ে শিক ঢুকাবেন। আপনার পেছন নাই? ওইটা ফাঁকা রাখছেন কেন?”

“আমার আছে, বর্তামানে বাশঁ বাগানের সব বাঁশ জনগণ আমার পেছন নিয়ে ঢুকিয়ে বাঁশের ওপর কাপড় মিলতাছে। এখন তোর কোনো সমস্যা?”

“না ভাই সমস্যা থাকে বড়লোকগো, আমরা তো গরীব।”

“খোঁচা মারলি?”

“না ভাই, খোঁচা মারে বড়লোকরা, আমরা তো গরীব।”

“তুই আবার খোঁচা মারলি?”

সামির চুপ হয়ে গেল। এই বাঁচাল নেতার সাথে আর দু’টো কথা বললে নির্গাত ঝগড়া লেগে যাবে। সামির কেটে পড়ল। চিপায় দাঁড়িয়ে আবারও শসা কামড়ে খেতে শুরু করল। সামির যেতেই আব্রাজ সিগারেটের ছাই ঝেড়ে দিয়ে একটু গম্ভীর ভঙ্গিতে বলল,
“শুনো সবাই।” আশেপাশের দু–একজন থেমে তাকাল।
আব্রাজ ধীরে ধীরে চায়ের কাপটা টেবিলে রাখল। তারপর কাঁধটা সোজা করে বলল, “রাজনীতি কেবল চেয়ার টেবিলের খেলা না। আওয়ামী লীগ করতে হলে আগে ইতিহাস জানতে হয়।”
একজন ছোকরা হেসে বলল, “আবার শুরু হইছে ভাইয়ের লেকচার!”
আরেকজন বলল, “চুপ কর, শোন। ভাইয়ের কথা মাঝে মাঝে মাথায় ঢুকে যায়। তাই ভালো করে শুনতে দে।”

রোদ সিগারেটে শেষ টান দিয়ে ধোঁয়া আকাশের দিকে ছাড়ল। “দেখো, এই যে তোমরা আজকে বিরিয়ানি খাচ্ছো, পতাকা টাঙাচ্ছো এই স্বাধীন দেশে দাঁড়িয়ে রাজনীতি করছো… এর পেছনে একটা ইতিহাস আছে। ত্যাগ আছে। রক্ত আছে। রাজনীতি মানে শুধু মিছিল না, পোস্টার না… রাজনীতি মানে দায়িত্ব। আর এই দায়িত্ব পালন প্রতিটি নাগরিকের উচিত। তাই তো তোমাদের উচিত আমাকে ভোট দেওয়া। ভোট দেও আমায়, জনগনকে পাঠাও কোমায়।”

কথা বলতে বলতে সে আবার চায়ের কাপটা হাতে তুলে নিল। এই সময় রান্নার পাশে দাঁড়ানো জসিম হেসে বলল, “ভাই, দায়িত্বের কথা পরে বলবেন। আগে বলেন মাংসটা একটু বেশি দেবেন তো প্লেটে? আগের বারে বিরিয়ানি দিছিলেন, মাংসের দেখা নাই খালি আলু আর আলু।”

“তোমারে আমার আন্ডা দিবো। যাহ ভাগ, তুই এমনিতেও গতবার ভোট দেস নাই। আমি খাওয়াইলাম বিরিয়ানি, তুমি জননেত্রী নৈশি আপারে ভোট দিয়া করলা আমার মানহানি। এই সবাই শুন, ওরে কুত্তা ভাইবা এইবার একটা হাড্ডিও দিবি না। হালারপোর কপালে পিছা মারি।”

হঠাৎ বাইরে থেকে দূর থেকে ভেসে এলো আরেকটা শব্দ। “দুর্নীতি নয়, সত্যের হোক জয়
“রাত্রিকা নৈশি সরকার—জনতার সরকার”

ক্লাবঘরের ভেতরের ছেলেরা একসাথে থেমে গেল। সামির দৌড়ে এসে বলল, “এই এই… মিছিল যাচ্ছে মনে হয়! ভাই দেখেন ডাইনীর মিছিল যাচ্ছে। চিনের থেকে মিশাইল ভাড়া করে দেব নাকি মেরে?”

“টাকা কী তোর নানায় দিবে?”

“ভাই আপনি যদি এত বড় নেতা হয়ে, এত বড়লোক বাড়ির ব্যাটা ছাওয়াল হয়ে এসব বলেন তো আমরা কোনে যাব ভাই?”

আব্রাজ খবর এনে দেওয়ার জন্য একটা ছোকরাকে পাঠালো। সে গিয়ে দেখল রাস্তার ওপর একটা বড় মিছিল এগিয়ে আসছে। হাতে ব্যানার, মাথার ওপর সবুজ পতাকা সবার। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল এর কর্মীরা স্লোগানে স্লোগানে রাস্তা কাঁপিয়ে দিচ্ছে।
ব্যানারের মাঝখানে বড় বড় অক্ষরে লেখা, “এমপি প্রার্থী রাত্রিকা নৈশি সরকার” মাইকে ভেসে আসছে প্রচারণার গান, “ধানের শীষের ডাকে এবার
জাগবে সারা দেশ,
জনতার নেত্রী নৈশি আপা গড়বে বাংলাদেশ।

তারপরই কর্মীদের স্লোগানের ঢেউ,
“রাত্রিকা আপা এগিয়ে চলুন!
আমরা আছি আপনার সাথে!
ভোট চাই, অধিকার চাই!
দূর্নীতি যাতে না হয় ।” মিছিলের সামনে একটি খোলা জিপ। সেখানে দাঁড়িয়ে আছেন রাত্রিকা নৈশি সরকার। হালকা আকাশি শাড়ি, কাঁধে দলীয় ওড়না। হাতে মাইক ধরে মাঝে মাঝে হাত নাড়িয়ে জনতার দিকে হাসছেন তিনি। ক্লাবঘরের সামনে দিয়ে মিছিলটা যখন গর্জন তুলে এগিয়ে গেল, তখন ভেতরের ছেলেদের মুখে এক ধরনের কৌতূহল আর বিরক্তির মিশ্র অভিব্যক্তি।
একজন নিচু গলায় বলল, “এইখান দিয়েই যাওয়ার রাস্তা পাইছে নাকি!”
আরেকজন দাঁত কেলিয়ে বলল, “ভোটের সময় তো সবাই দয়াল বাবা কেবলা খাবা হয়ে যায়।”

মীর আব্রাজ রোদ তখনো বেঞ্চে বসে। সে ধীরে ধীরে সিগারেটের শেষ টানটা দিল। চোখ দুটো সরু করে বাইরে তাকাল। তার ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি।
“রাজনীতির রাস্তা বড় অদ্ভুত রে… আজ যে স্লোগান দেয়, কাল সে-ই আবার অন্য স্লোগান শুনে।”

চায়ের শেষ চুমুকটা দিয়ে কাপটা টেবিলে রাখল সে।
বাইরে তখনো মিছিলের শেষ অংশটা যাচ্ছে। হঠাৎ আব্রাজ বলে উঠল, “এই মহিলার নামই রাত্রিকা। নামের মধ্যেই তো অন্ধকার, সে আবার জনতার ঘরে আলো জ্বালাবে কেমন করে? জোনাকির পেছনের মতো তারও কী স্পেশাল বাতি আছে নাকি? ইশ আপারে বল একটু ব্যাক সাইড দেখাইতে।” আব্রাজ আরো দু’টো পবিত্র বাক্য মুখ থেকে বের করতে যাবে তার আগেই একটা ছেলে দৌড়ে এসে তাকে একটা বাক্স ধড়িয়ে দিয়ে বলল, “নৈশি আপা সালাম পাঠাইছে।”

আব্রাজ একটু অবাক হলো। তাকে দেখলে গালি দেওয়া জনতার ডিজিটাল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ডাকে সালাম পাঠিয়েছে? আবার বাক্স কিসের? বোম নেই তো এটায়?”

আব্রাজ বাক্স খুলতেই রেগে গেল। তাকে গোবরের মালা আর একটা চিরকুটও দিয়েছে। সেখানে লিখা, “এবার ফুলের মালা তো আপনার গলায় ঝুলে আত্মহত্যা করার সুযোগ পাবে না তাই দয়ামায়া করে আপনার জন্য স্পেশাল গোবরের মালার ব্যবস্থা করেছি। আশা করছি আপনার থোথমার সাথে একছের মানাবে।”

আব্রাজ রাগে কটমট করে লুঙ্গি সামলে উঠে দাঁড়াতেই সামির বলল, “ভাই আস্তে ধীরে উঠেন। নিচে কিছু পড়েন নাই। পরে সর্বনাশ হয়ে যাবে। আপনি ভাই নিচে কিছু পড়েন না কেন? কিসের এত সমস্যা আপনার?”

“আরে বাল, ওইসব ছোট জিনিস লুঙ্গির নিচে পড়লে আমার একটু পর পর চুলকায় বাল। এখন মিছিলে মিছিলে ভাষণ দিব? নাকি চুলকাবো?”

“আর যদি মিছিল করতে গিয়া লুঙ্গিই খুলে যায়?”

“তখন আর কী হবে? সবাইকে নাচিয়ে নাচিয়ে সম্পত্তি দেখাবো। আমি যদি জনতার হই, আমার সম্পত্তিও তো তাদেরই। দেখলে ৯৯.৯ পার্সেন্ট পাপ লাগবে। বাকিটা মাফ।”

“তো আপনার লুঙ্গি পড়ার কী দরকার ছিল? এসব তো আপনি পড়েন না। আজকে কোন নাটক দেখানোর জন্য পড়ছেন?”

“ওইসব তুমি বেআক্কল বুঝবা কেমনে? পায়জামা পড়লে সবাই আমারে বড়লোক, অহংকারী ভাবত। তাই লুঙ্গি পড়ছি। যাতে সবাই ভাবে আমিও সাধারণ মানুষ, রাতে আর ১০ টা বাঙালির মতো ঠ্যাং ২ টা দু’পাশে দিয়া চ্যাগাইয়া ঘুমাই। এখন জাউরার ঘরের জাউরা তুই নৈশির একটা ব্যবস্থা কর।”

সামির একবার আব্রাজের দিকে তাকিয়ে পরক্ষণেই কাছে এসে ফিসফিস করল, “আমরা যদি একবার প্রমাণ করতে পারি নৈশি আপা চান্দাবাজ তাহলেই খেলা জমবে।”

“কেমনে প্রমাণ করব?”

“আরে ভাই, আপনি রাস্তায় চাঁদা ফেলে রাখবেন। সে তুলতে গেলেই ক্যামেরা অন করব।”

“এইসময় ওর পিছনে টাকা উড়ানো ঠিক হবে? কয়টাকা চাঁদা হিসেবে ফেলতে হবে ওই ভিক্ষুকের সামনে?”

“আরে টাকা ফেলবেন কেন? জ্যামিতি বক্সের চাঁদা ফেলবেন। চাঁদা তো চাঁদাই। বেটি খালি তুললেই হইছে।”

“হালারপো হালা এত বুদ্ধি কই থেকে বের হইল।”

“বায়ু নিষ্কাশনের সাথে পেছন থেকে বের হইছে। এই তো মাত্রই।”

“শালা বাঙ্গিরপো তাই তো কই, কুত্তা মরা গন্ধ আসে কই থেকে।”


শুটিং স্পটে আজকে সবাই ব্যস্ত। মেকআপ রুমের সামনে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে অনেক মেয়ে। কারও চোখে স্বপ্ন, কারও চোখে দুশ্চিন্তা।ফ্লোরের মাঝখানে একটা চেয়ার। মীর আরবিন সেই চেয়ারে বসে নেই। সে হাঁটছে। একবার মনিটরের দিকে তাকাচ্ছে, আবার অডিশন দেওয়া মেয়েদের দিকে। তার হাতে একটা স্ক্রিপ্ট। কিন্তু স্ক্রিপ্টে চোখ নেই। আজ নতুন ছবির নায়িকা বাছাই। সহকারী পরিচালক রিয়াদ হাতে লিস্ট নিয়ে দাঁড়িয়ে।

“স্যার, আজকে মোট পঞ্চান্নজন।”

মীর আরবিন হালকা বিরক্ত হয়ে বলল, “পঞ্চান্নটা মুখ দেখব… একটা নায়িকা পাবো তো?”
রিয়াদ হাসল। “স্যার, এখনকার নায়িকা তো ইনস্টাগ্রাম, টিকটকেই জন্মায়।”

মীর আরবিন স্ক্রিপ্টটা টেবিলে ছুড়ে দিল। “আমি ইনস্টাগ্রামের, টিকটকের নায়িকা চাই না। আমি আসল নায়িকা চাই।
ঠিক তখনই ক্যামেরাম্যান চিৎকার করল, “ক্যামেরা রেডি!”
রিয়াদ বলল, “প্রথমজনকে পাঠান।”

একটা মেয়ে ভেতরে ঢুকল। চুল কার্ল করা, ভারী মেকআপ মুখে।
রিয়াদ বলল, “সিন ৭। টেক ওয়ান। অ্যাকশন।”

মেয়েটা নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল,“তুমি আমাকে ছেড়ে গেলে কেন? আমি তো তোমার জন্য সব করতে পারতাম…”
প্রাণ পাঁচ সেকেন্ডও দেখল না। “কাট।”

মেয়েটা থেমে গেল। বলল, “ডায়ালগ মুখস্থ আছে। কিন্তু অনুভূতি নেই।”

মেয়েটা হতাশ হয়ে বেরিয়ে গেল। আরেকজন এল। সে খুব আত্মবিশ্বাসী। এসেই সে বলল, “স্যার, আমি আগে দুইটা মিউজিক ভিডিও করেছি।”
প্রাণ মাথা নাড়ল। “অভিনয় দেখাও।”

মেয়েটা ক্যামেরার সামনে এসে নাটকীয় কান্না শুরু করল। কিন্তু সেই কান্না যেন কৃত্রিম।

“কাট।”

প্রাণ বিরক্ত হয়ে বলল, “কান্না করতে হলে চোখে জল লাগে। শুধু আওয়াজ করলেই হয় না।”

তৃতীয়… চতুর্থ… দশম… একটার পর একটা মেয়ে আসছে। কেউ খুব সাজগোজ করে এসেছে, কেউ আবার ক্যামেরা দেখলেই নার্ভাস হয়ে যাচ্ছে।
ফ্লোরে ক্লান্তি জমে উঠছে।
রিয়াদ বলল, “স্যার, চল্লিশজন হয়ে গেল।”
প্রাণ কপালে হাত রাখল। “এসব যে কেন আসে টাইম নষ্ট করতে।”
লাইটম্যান পাশে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করল, “স্যার, ব্রেক নেবেন?”

“না। চালাও।”
শেষের দিকে আরও কয়েকজন এলো। কেউ ঠিকঠাক, কেউ একেবারেই খারাপ। প্রাণ আরো বিরক্ত হলো।
রিয়াদ বলল, “স্যার, আর একজন বাকি।”

“পাঠাও।”
শেষ মেয়েটি স্টুডিওর দরজা ধীরে খুলল।
প্রাণ প্রথমে মাথা নিচু করে স্ক্রিপ্ট দেখছিল।
কিন্তু যখন মাথা তুলল সে স্থির হয়ে গেল। মেয়েটার গায়ে খুব সাধারণ একটা সাদা সালোয়ার কামিজ। কোনো ভারী মেকআপ নেই। তবু তাকে দেখে মনে হচ্ছে পুরোনো বাংলা সিনেমার পর্দা থেকে কেউ হেঁটে নেমে এসেছে। তার মুখশ্রী অবিশ্বাস্য শান্ত। ভ্রুগুলো নিখুঁত বাঁকা। গায়ের রং উজ্জ্বল শ্যামল। চুলগুলো ঘন কালো, কোমর ছুঁইছুঁই। প্রাণ হঠাৎ নিজের সাথেই কথা বলে উঠল, “এমন মুখ… আজকাল আর দেখা যায় না।”

সে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে বলল, “তোমার নাম?”
মেয়েটা শান্ত কণ্ঠে বলল, “প্রত্যাশা নওরিন ।”

“অভিনয় কতখানি জানো?”

মেয়েটা একটু লাজুকভাবে বলল, “তেমন একটা না স্যার।” ফ্লোরে কয়েকজন হেসে ফেলল।
রিয়াদ বলল, “স্যার, তাহলে?”
প্রাণ হাত তুলল। “চুপ।” সে কয়েক সেকেন্ড মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে বলল, “ক্যামেরা অন করো।”
ক্যামেরাম্যান বলল, “ডায়ালগ?”
প্রাণ মাথা নাড়ল। “ডায়ালগ লাগবে না।”
সে মেয়েটাকে বলল, “শুধু দাঁড়াও… আর ক্যামেরার দিকে তাকাও।” মেয়েটা ধীরে ক্যামেরার দিকে তাকাল।
মনিটরে তার মুখ ফুটে উঠল। সে মেয়েটিকে বলল, “মনের মধ্যে যা আসে, তাই অভিনয় করে দেখাও, নিজের ভেতরকার ডায়ালগ দিয়ে। অভিনয় অভিনয়ের মতো নয় বাস্তবের মতো করে করার চেষ্টা করো।”

মেয়েটা তাই করল। তার অভিনয় শুরু হলো। কিছুক্ষণের মধ্যে শেষ হলেও সবাই ঘোরে চলে গেল। এত নিখুঁত তাই বলে?

প্রাণের চোখে বিস্ময় ফুটে উঠল, “এই মুখটাই আমি খুঁজছিলাম রিয়াদ।” রিয়াদ তার পাশেই দাঁড়িয়ে রইল। প্রাণের এতক্ষণে বিরক্তি ভাব দূর হয়েছে। সে প্রত্যাশার দিকে তাকিয়ে মনে মনে সুধিয়ে উঠল, “এ যেন আবার জন্ম নেওয়া… একটা নতুন সুচিত্রা সেন।”

বিমান প্রেন টেক-অফ করেছে। আকাশের নীলিমা ছোঁয়ার তীব্র বাতাসের মধ্যে। মীর আব্রাহাম তাজের সাদা ড্রেস চোখে পড়ার মতো। পরিষ্কার, ফিটেড, যাতে তার কাঁধের স্ট্রিপ আর ইউনিফর্মের ক্রিস্প লাইনগুলো আরও উজ্জ্বল ফুটে উঠছে। বুকের পকেটে জড়ানো নামের ব্যাজ চকচক করছে। হালকা নীল গ্লাভস হাতে, আর ফিটেড শু-তে পা ঠিকভাবে স্থির। তাজ তার কেবিনের কন্ট্রোল প্যানেল দিকে চোখ রাখল। হাতের আঙ্গুলগুলো প্রফেশনালভাবে থ্রটল, রডার, ফ্ল্যাপস ও গিয়ার লিভার নিয়ন্ত্রণ করছে। প্রতিটি মুভমেন্ট তার নির্ভুল। তার চোখ প্রাইমারি ফ্লাইট ডিসপ্লে এর ওপর ঝুঁকে আছে। হঠাৎ উচ্চতা ও গতি স্ক্রিনে দেখল সে। বিমানের স্পিড 160 নট, উচ্চতা ক্রমশ বাড়ছে। তাজ কানের কাছে হেডসেট টেনে ATC-এর সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করল,
“টাওয়ার, দিস ইজ ফ্লাইট ফোর-ওয়ান-নাইন, উই আর এয়ারবর্ন। ক্লাইমিং টু টেন থাউজ্যান্ড ফিট, রিকোয়েস্ট ভেক্টরস।”

কেবিনের প্যানেল থেকে আলো ঝলমল করছে, বিভিন্ন রেডিয়ো সংকেতের লাইট জ্বলছে। মীর একটি মাল্টি-ফাংশন ডিসপ্লে দেখছে, যেখানে আবহাওয়ার তাত্ত্বিক তথ্য, উড়ন্ত উচ্চতা, ভেঙে আসা বাতাসের দিক সবকিছু এক নজরে। বাইরের নিয়ন্ত্রণ ক্যানপি দিয়ে দেখা যাচ্ছে। বিমান আস্তে আস্তে উড়ন্ত ট্র্যাক ধরে, রানওয়ে থেকে দূরে যাচ্ছে। তাজ শ্বাস নেয়। চোখ কেবল সামনের ভিউ ফোকাসে। সে এক মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করে, তারপর আবার রডার, আয়েলরন, থ্রটল সব ঠিকভাবে সামলাতে শুরু করল।
বাইরে আকাশ নীল, সাদা মেঘ ভরা, তাজ তার সেই গম্ভীর আর্কষনীয় গলায় যাত্রীদের জানিয়ে দেয়,
“এভরিথিং’স স্মুথ। উই আর ক্লাইমিং থ্রু টোয়েলভ থাউজ্যান্ড ফিট। অল সিস্টেমস নর্মাল।”

বিমানটি নিরাপদ উচ্চতায় উঠে যাওয়ার পর অটোপাইলট সক্রিয় করা হয়েছে। ককপিটে আলো একটু নরম হয়ে এসেছে। সামনে অসীম নীল আকাশ। মেঘের ভেলা ভেসে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। মীর আব্রাহাম তাজ শেষবারের মতো প্রাইমারি ফ্লাইট ডিসপ্লেতে চোখ বুলিয়ে নিল। সবকিছু স্থির, নিয়ন্ত্রিত। তার ঠোঁটের কোণে তৃপ্তির রেখা ফুটে উঠল। সহ-পাইলটকে
প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়ে সে কেবিন থেকে বেরিয়ে এলো। সে বেড়িয়ে আসতেই বিমানবালা সাইয়ারা সিয়া তার সামনে হুট করে এসে উপস্থিত হলো। তাজ তাকে এড়িয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হতেই সিয়া বলে উঠল, ” স্যার ছুটি লাগবে?” তাজ কিছুক্ষণ চেয়ে থাকল। এই যাত্রীদের মাঝে সে কোনো ড্রামা দেখতে চায় না। তাজ হাত ধরে টেনে সিয়াকে ক্যাবিনে নিয়ে গিয়ে ধমক দিয়ে বলল,”আরেকবার ছুটি ছুটি করলে ধাক্কা মেরে প্লেন থেকে ফেলে দিবো। তারপর সারাজীবনের ছুটি একসঙ্গে উপভোগ করো। ননসেন্স।”

দীর্ঘ ফ্লাইট শেষে কয়েক ঘণ্টা পর বিমানটি নিরাপদে অবতরণ করল দুবাইয়ের রানওয়েতে। দুবাইয়ের এক বিলাসবহুল হোটেলের রুমেই আজকের রাত কাটিয়ে দিবে। আবার নেক্সট ফ্লাইট ৫টায় ভোর। রুমে গিয়ে জানালার পাশে দাঁড়ায় তাজ। ফ্লোর-টু-সিলিং জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে শহরের ঝকঝকে স্কাইলাইন। দূরে রাস্তার আলো নদীর মতো বয়ে যাচ্ছে। তাজ তার ইউনিফর্ম খুলে রেখে বাথরুমে ঢুকল। গরম পানির নিচে দাঁড়াতেই সারাদিনের ক্লান্তি ধীরে ধীরে গলে যেতে লাগল। কিছুক্ষণ পর বাথরুমের দরজা খুলে বের হলো সে। কোমরে সাদা তোয়ালে জড়ানো। ভেজা চুল থেকে পানির ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে তার কাঁধ বেয়ে। প্রশস্ত বুক, শক্ত কাঁধ তার। বের হতে দেরি ওমনি কলিং বেল বেজে উঠল। তাজ ভ্রু কুঁচকে তাকাল সেদিকে। এই সময়ে কে? সে ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। তোয়ালে একটু শক্ত করে বেঁধে দরজাটা খুলে দিল। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল এক বিমানবালা। সম্ভবত একই ফ্লাইটের ক্রু।
নীল ইউনিফর্ম, গলায় স্কার্ফ, হাতে ছোট একটা ফাইল। চেনা চেনা লাগছে দেখি। ওমা লাগবে না কেন? এটা তো সেই ননসেন্স বিমানবালা সাইয়ারা সিয়া। আবার ছ্যাচড়ার মতো ছুটি চাইতে এসেছে বুঝি? সিয়া তাজকে কিছু বলতে যাবে কিন্তু এই অবস্থায় তাকে দেখে তার মুখের জবান থমকে যায়।
সিয়ার চোখ বড় বড় হয়ে গেল। মুখ লাল হয়ে উঠল মুহূর্তে। তাজ অবাক হয়ে বলল,
“ইয়েস মিস সিয়া? কিছু বলবেন?”
সিয়া তোতলাতে লাগল, “স্যা…স্যার… আমি… আসলে…” তার দৃষ্টি বারবার তাজের ভেজা চুল আর খোলা বুকের দিকে চলে যাচ্ছিল। লজ্জায় সে চোখ নামিয়ে ফেলল। হঠাৎ তার মাথাটা একটু ঘুরে উঠল।
“স্যার… আমার… একটু…”
এরপরই ধপ! সে অজ্ঞান হয়ে দরজার সামনে পড়ে গেল। তাজ মুহূর্তের জন্য হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর দ্রুত ঝুঁকে পড়ে বলল,
“হেই ননসেন্স! ঠিক আছো?” সে দ্রুত তাকে ধরল যাতে মাথা মেঝেতে না লাগে। “ওহ গড…মরার আর জায়গা পেলে না?”

সিয়া আর চোখ মেলে তাকাতে পারল না৷ তবে পুরোপুরি সেন্সলেস হওয়ার আগ মুহূর্তে তাজকে বলল, “এত সুন্দর ফিগার দেখিয়ে দিলেন তো আমার উপরের টিকিট কাটিয়ে। উফ বাবা মরে গেলুম।”

চলবে?

(সবাই একটু রেসপন্স করবেন কিন্তু। এই পোস্ট আপনার কাছে গেলে অবশ্যই রিয়েক্ট দিবেন।)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply