Golpo romantic golpo যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ

যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ৫


যেখানেপ্রেমনিষিদ্ধ

ইশরাতজাহানজেরিন

পর্ব_৫

বিয়ে বাড়ির আসরটা আজ বিচারের মঞ্চ। চারপাশে গিজগিজ করছে মানুষ। সবাই মুরুব্বি গোছের, চোখে মুখে চাপা রাগ আর কৌতূহল। মাঝখানে একটা চেয়ারে দড়ি দিয়ে বাঁধা তেজ। হাত-পা শক্ত করে আটকানো, নড়ার কোনো সুযোগ নেই। এই শালা পাগলের খানদান এখন পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। ভিড়ের একপাশে দাঁড়িয়ে আছে সেই বাটপার বউটা। বয়সে তুলনামূলক কচি, কিন্তু চোখে মুখে কেমন একটা ধূর্ত নিশ্চুপ ভাব।
তেজের ধৈর্য এবার সত্যিই ভাঙছে। সে চোখের ইশারা করতেই সামনে এগিয়ে আসে কালো, ভুঁড়িওয়ালা লোকটা। লোকটা ধীরে ধীরে তেজের মুখের টেপ খুলে দেয়। টেপ খুলতেই তেজ গর্জে ওঠে, “এই পাগলদের খানদান! আপনারা জানেন আমি কে? হাজতে পুরো গুষ্টিকে চালান করতে সেকেন্ড খানেকও লাগবে না। কত্ত বড় সাহস মীর বাড়ির ছেলেকে কিডন্যাপ করা! সরে দাঁড়ান। আপনাদের ফটোগ্রাফির টাকাও দিতে হবে না। আগে আমাকে মুক্তি করেন।”

সামনের লোকটাই মেয়েটার বাবা। দাঁত বের করে একরকম বিকৃত হাসি হেসে সে বলল, “কত খরচা করছি তোমার জন্য জানো? এখন তোমার আর উপায় নাই। আমার মেয়েকেই বিয়ে করতে হবে।”
তেজ হতভম্ব। “হোয়াট?”মাথা ঝাঁঝরা হয়ে আসে তার। “মাথায় নির্ঘাত আলসার হইছে। হে খোদা, এই কোথায় ফাঁসালে?” লোকটা একচুল বিচলিত না হয়ে বরং গর্বের সুরে বলতে লাগল, “আরে বাবা, ভয় পাও কেন? তোমারে আমার মেয়ের সঙ্গে বিয়া দেওয়ার জন্যই তো এত টাকা খরচ কইরা এই আয়োজন করা। আমি জীবনে কোনোদিন পান, বিড়ি, সিগারেটের নেশা ধরি নাই। এইজন্য মানুষ আমারে ভালো কয়। কিন্তু জানো কেন ধরি নাই? কারণ ওইসব খাইলে টাকা খরচ হয়। আর আমি অপচয় একেবারেই পছন্দ করি না। আমাগো বাড়িতে একটা সাবান বিশ জন মিইলা এক মাস ব্যবহার করলেও ফুরায় না। তাইলে বুঝো, আমরা কতখানি অপচয় রোধ করি।”

তেজের শ্বাস আটকে আসে। এটা কোন পাগলখানা! মাথা ঝিমঝিম করছে এদের কথাবার্তা শুনে।
এইমাত্র সে বুঝেছে এই বিয়ের আসরের বর সে নিজেই। কেমন করে জানল? একটু আগেই, টুকরো টুকরো কথার ফাঁকে ফাঁকে পরিষ্কার হয়ে গেছে সব। এই খানদানের নজর নাকি তার ওপর অনেক আগ থেকেই। আজ থেকে প্রায় বিশ বছর আগে। তেজ তখন পাঁচ বছরের বাচ্চা। পরিবারের সঙ্গে গ্রামে গিয়েছিল। আশ্চর্য, এই কিপ্টে লোকগুলোর বাড়িও নাকি তখন তাদের গ্রামের বাড়ির পাশেই ছিল। কোথায় মীর বাড়ির লোক, আর কোথায় এই কিপ্টে পরিবার। তবু একদিন কি কাজে যেন লোকটা তাদের বাড়িতে এসেছিল। ফকিন্নি লোক, খালি হাতেই হাজির। সেদিনই ছোট্ট তেজের সঙ্গে তার দেখা। কথায় কথায় কী নিয়ে যেন শর্ত হয়। লোকটা তখন ঘোড়া সেজে তেজকে কাঁধে তুলে নেয়। আর তেজের তখন অসম্ভব হিসু পেয়েছিল। চাপ সামলাতে না পেরে সামান্য হিসু করে ফেলেছিল।
এইটুকু ঘটনার জন্য এত বছর পর এমন প্রতিশোধ?
এই পাগলের গুষ্টি সত্যিই একটা পাগলের গুষ্টিই। তেজ তো এদের চিনতেই পারেনি। কে জানত, বিশ বছর আগের একেবারে তুচ্ছ একটা ঘটনার জন্য আজ তাকে এভাবে ফাঁদে ফেলা হবে! তখন তো তেজের খৎনা পর্যন্ত হয়নি। কত ছোট ছিল! এখন সবই বদলেছে, সে নিজেও বড় হয়েছে, তার যাবতীয় জিনিসও। তাহলে এখন প্রতিশোধের মানে কী? আর এই পুরো বিয়ের নাটক, এত আয়োজন, এত লোক সবই কি কেবল তেজকে ফটোগ্রাফার বানিয়ে এখানে এনে বন্দী করার জন্য?
কি ছোটলোকি কাণ্ড! তেজ দাঁত চেপে আবার বলল,
“নাটকের সস্তা কাহিনি বাদ দিয়ে আমাকে ছেড়ে দিন।”

“না, ছাড়ব না,” লোকটা গলা চড়িয়ে বলল। “তুমি আর আমার মেয়ে এই রুমে ছিলে। এখন আমাদের বদনাম হয়ে গেছে। জলদি বিয়ে না করলে আমার মেয়ে আত্মহত্যা করবে তখন এই দায় কে নেবে?”
তেজ প্রায় চিৎকার করে উঠল, “আরে ভাই, আমি আপনার মেয়ের ছবি তুলতে এসেছিলাম। রঙ্গতামাশা করতে না!”
লোকটার চোখ চিকচিক করে উঠল। “সাংঘাতিক! তাহলে ছবি তুলে আমার মেয়েকে ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টাও করছিলে, জামাই বাবাজি?”

“কিসের জামাই? কার জামাই?” তেজ ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। “পুলিশ ডাকব আমি!”

লোকটা হেসে ফেলল। “আরে বাবাজি, কাজী থাকতে পুলিশ কেন? কাজী সাহেব, জলদি শুভ কাজটা সারুন না। আর্যা, মা এদিকে আয়। তোর জামাইয়ের নামে কবুল বলার সময় হয়ে গেছে।” আর্যা তার লাল বেনারসি সামলে এসে তেজের পাশে বসে পড়ল। তেজের গা জ্বলে উঠল। এই পরিবারে একটা মানুষও স্বাভাবিক না! বাপ যেমন, মেয়ে তো তেমনই হবে। সারাজীবন প্রেম করতে পারেনি বলে কি এই তাড়ছেঁড়া গুষ্টির মেয়েকে গলায় ঝুলাবে সে? নেভার। তেজ হাত-পা ছটফট করে কিছু বলতে যেতেই আর্যার বাবা আলাউদ্দিন তালুকদার বলল, “আহারে আর্যার মা, জলদি জামাইয়ের মুখে টেপ মেরে দাও। আমি চাই না জামাই বেশি কথা বলে ক্লান্ত হয়ে পড়ুক। আর বেশি টেপ মেরো না। ওই টেপ আমি বিশ টাকা দিয়া কিনছি, যাতে দুই বছর চলে।” আলাউদ্দিনের কথা শুনে হাজেরা মিটমিটিয়ে হেসে বলল, “চিন্তা কইরো না, তুমি যা বলবা তাই হবে।”

হঠাৎ কাজী গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, “দেনমোহর কত বাঁধব?”
আলাউদ্দিন হাত নেড়ে বলল, “ওইসব টাকা-পয়সার কথা বাদ দেন। দেনমোহর হিসেবে জামাইয়ের ওই দু’টো ইয়ে লিখে দেন। যাতে আমার মেয়েকে ডিভোর্স দিতে চাইলে যাওয়ার সময় দেনমোহর উসুল কইরা দিয়ে যায়।”
কাজী চোখ কুঁচকে তাকাল। “কিন্তু দেনমোহর তো স্ত্রীকে ছোঁয়ার আগেই দিতে হয়। আপনার বয়স তো কম হইল না নির্ঘাত আপনার বউরে দেনমোহর দেন নাই? কিসব নাফরমানি কাজকারবার!”

আলাউদ্দিন গম্ভীর মুখে বলল, “আপনারে কইছে? আমি বিয়েতে বউরে পঞ্চাশ পয়সা দেনমোহর দিছিলাম। কী গো, আর্যার আম্মা কও না কেন?”
হঠাৎ পাশে বসা আর্যা কাজীর দিকে ঝুঁকে বলল,
“দেনমোহর আমার হবু উনি বাসর রাতেই দিয়ে দেবে। তবে উনি যদি কোনোদিন আমাকে ছাড়তে চায় তখন আমার জিনিস আমি কেটে রেখে দেব, বলে দিচ্ছি।”
সে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল। “বাকিটা আমার বরের ইচ্ছা। কী বলো, হবু বর? কাজী সাহেব, লিখুন লিখুন দেনমোহরের জায়গায় আমার হবু স্বামী মীর আরভিদ তেজের ওই ইয়ে দু’টো লিখুন। আমিও দেখি জামাই আমাকে ছাড়ে কীভাবে। হুহ!” আর্যা তেজের দিকে তাকাতেই তেজ দাঁত কামড়ে বলল, “দেখা ছাড়ব, সব কটাকে। এখন তোমাদের সময়, বিয়ের পর আমার। এই যে, কিপ্টে আলাউদ্দিন আপনার মেয়েকে আমার বড়লোক বাড়িতে পাঠাচ্ছেন তো? ডিভোর্স পেপার আগেই বানিয়ে রাখবেন। আপনার মেয়েকে নিতে আপনাকেই এসে হাজির হতে হবে।”

আলাউদ্দিন মুখ ভেংচিয়ে কাজীর দিকে তাকিয়ে বলল,
“আরে মশাই, হা করে ভ্যাবলার মতো বসে আছেন কেন? এই জন্যই কি আপনাকে একশ টাকা পারিশ্রমিক দিছি? জলদি কাজ শুরু করেন। এই জামাই বাবাজি ছোটবেলায় আমার মাথায় মুতেছিল আজ তার বিয়ে আমার মেয়ের সাথেই হবে। আর কাল আমার নায়–নাতকুরাই ওর মাথায় মুতবে। তবেই তো প্রতিশোধটা কমপ্লিট হবে। কী কন মশাই?” কাজীর মাথার ওপর দিয়ে সবকিছু যেন বয়ে গেল। চোখ কপালে তুলে সে খানিক থমকে রইল। তারপর হাবার মতো গলায় বলল, “কি আর বলব? আপনে যেডা কন আমি ওইটাই কই।”


সকাল সকাল ক্ষণিকালয়তে শোরগোল বেঁধে গেছে। বাড়িতে আরযান নেই, সাঁঝও নেই। দু’জনই নিখোঁজ। সবচেয়ে আতঙ্কের খবরটা আসে আরযানের ফোনে। সে জানিয়েছে, সাঁঝ তার সঙ্গেই আছে। এটাই ভয় ধরিয়ে দেয় সবাইকে। কে জানে, মেয়েটা আবার কী কাণ্ড ঘটিয়েছে! রাতে আরযান বাড়ি ফেরেনি। সাঁঝও বাড়িতে ছিল না। সাঁঝের বান্ধবী ডালিয়া জানিয়েছে, রাতে পড়াশোনা করতে সাঁঝ তার বাসায় গিয়েছিল। পরে নাকি ঘুমিয়ে পড়েছে। কিন্তু মেয়েটা বাড়ি থেকে রাতে বের হওয়ার কথা বলে যায়নি এটাই তো ভয়ের বিষয়। আসুক আজ, দেখে নিবে। এরই মধ্যে সকালে আরযান আবার কল করে জানায় সে সাঁঝকে তার গেস্টহাউজে নিয়ে গেছে। খবরটা শুনে বাড়ির সবার বুক ধক করে ওঠে। নির্ঘাত মেয়েটাকে উদুম কেলানি দেওয়া হচ্ছে।
এই উত্তেজনার মধ্যেই নতুন আরেকটা বিস্ফোরণ। সকাল সকাল তেজ হাজির হয়েছে—বউ নিয়ে। শুধু বউ না, বউয়ের সঙ্গে তার চৌদ্দ গুষ্টিও এসে পড়েছে।
তেজের মা একসঙ্গে কাঁদছেন আর হাসছেন। হাসছেন এই ভেবে যে, তার ছেলে এই বাড়িতে জন্মে একটা প্রেমও করতে পারেনি আর এখন নিজেই বিয়ে করে ফেলেছে। এবার অন্তত বউয়ের সঙ্গে জমিয়ে প্রেম করতে পারবে, কেউ বাঁধা দেবে না। আবার কাঁদছেন এই আশঙ্কায় আরযান এই খবর জানলে ছেলের কী দশা হবে, কে জানে! বাড়ির বাকিদের প্রতিক্রিয়াই বা কী হবে? চিন্তায় পড়ে গেলেও বাস্তবতা তার ধারণার মতো হলো না। বাড়ির সবাই দেখছি তেজের এই আকস্মিক বিয়েতে খুশিই। আরযানের চোখ ফাঁকি দিয়ে যে ছেলেটা বিয়ে করতে পেরেছে এইটাই নাকি তার সাত কপালের ভাগ্য। শুধু বরের মুখে কোনো হাসি নেই।
তেজ কারও দিকে না তাকিয়ে সোজা নিজের ঘরের দিকে চলে গেল হনহন করে। বউকে রেখেই। বউটা তার পেছন পেছন প্রায় দৌড়েই যাচ্ছে। নিচে তখনও বউয়ের পরিবার দাঁড়িয়ে আছে। আলাউদ্দিন সবার সঙ্গে ভাব জমানোর চেষ্টা করছে। ঠিক তখনই পেছন থেকে আলাউদ্দিনের স্ত্রী বলে উঠল, “কি গো, আমরা তো মেয়েকে তুলে দিতে আসছিলাম। ঝামেলার তো সমাধান হইছে এবার যাব না?”

“ধূরু, চুপ করো,” আলাউদ্দিন বললেন। “সকাল সকাল যেহেতু বেয়াই বাড়িতে আসছি, নাস্তা খাইয়াই যাই। তাহলে আমাদের বাসার এক দিনের আটার টাকা বাঁচবে। আর এমনিতেও তো আমরা নতুন মেহমান। কত বড় বাড়ি দেখছো? নাস্তা না সাইধা, যাইব কোথায়?”
এরই মধ্যে হঠাৎ আরযানের বাবা বাড়ির মহিলাদের দিকে বললেন, “আরে, উনি এখন আমাদের আত্মীয় হয়ে গেছেন। নাস্তার ব্যবস্থা করতে এত দেরি কেন? এই, আপনারা বসুন। বিয়েটা কীভাবে হয়ে গেল, বুঝতেও পারলাম না। আমাদের ছেলে তো এই বিষয়ে কিছুই জানায়নি। যেহেতু ঘটনা ঘটেই গিয়েছে, তাই আমরা চাই একটু বড়সড়ভাবে পুনরায় একটা আয়োজন করি। আপনারা কী বলেন?”

“হুম, তা দেখা যাবে। কিন্তু আজকে নাস্তা খেতে পারব না। এখন তো আমাদের আসা-যাওয়া থাকবেই।”

“আরে, কি বলছেন? আপনারা কোথায় যাবেন না। একেবারে লাঞ্চ করে, তারপরই যাবেন।”

তখনই আলাউদ্দিন মেকি হেসে ফিসফিসিয়ে স্ত্রীকে বলল, “দেখছো আর্যার মা, দুই বেলার খরচা বাঁইচা গেছে।”

“আপনার মূল্যবান ভোট আমাকে দিয়ে দেশের পুন মারতে সাহায্য করুন।” বলেই থেমে গেল আব্রাজ। এমা এই ভাষণের স্ক্রিপ্ট কে লিখেছে? নির্গাত এতে বিপরীত পার্থীর হাত আছে। শালাদের পিন্ডি না চটকালে দেখি হচ্ছে না। হাত সাফাই করতে হবে। কিন্তু এখন এত জনগনকে ম্যানেজ করবে কি করে? শালার ভাগ্যের চাকায় এমন ছ্যাঁদা কি করে হলো? হঠাৎ তার এসিস্ট্যান্ট সামির তাকে পেছনে চিমটি মেরে হিসহিসিয়ে বলল, “আরে ভাই কি বলতাছেন? আপনি জনগণের সামনে ভাষণ দিতাছেন নাকি ওপেনলি দেশের ভবিষ্যতের সাথে বাসর করতাছেন? লাগাম টানেন মুখে।”

“চুদনা ভাষণের স্ক্রিপ্ট পড়ছিলি? মনে তো হয় না। এইখান থেকে একবার বের হই তারপর তোরে খাইছি।” বলেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে আব্রাজ সবার দিকে তাকিয়ে হাসল। সে নিজেও ফ্যাসাদে পড়ে গেছে। এখন কী বলবে?আব্রাজের আগেই সামির বলে উঠল, “আরে আপনারা কিছু মনে করবেন না, আমার ভাই আপনার ভাই আব্রাজ ভাই আপনাদের ভালোবাসার কাঁপাকাঁপিতে আবেগের বসে একটু হড়কে পড়েছে আরকি। যাই হোক আপনারা নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে ভাইকে দেশের অকল্যাণ না মানে কল্যাণ করতে সাহায্য করুন।”

কোনোমতে মঞ্চ থেকে নেমে গায়ের সাদা পাঞ্জাবির কলারটা ঠিক করল আব্রাজ। সামিরের দিকে তাকিয়ে বলল, “দেখ তো, ঠিকঠাক লাগছে নাকি আমাকে? সুন্দর না লাগলে তো মেয়েরা ভোটই দেবে না।”

“হ্যাঁ ভাই, লাগছে।”

“আজকের সিডিউল কী?” আব্রাজ আবার জিজ্ঞেস করল। “কোন জায়গায় গিয়ে আজ বাল ফালাইয়া তালগাছে উঠতে হবে?”

সামির বিরক্ত মুখে বলল, “ভাই, মুখে একটু বাঁধ নির্মাণ করেন। জনগণ আপনার মাতৃভাষা শুনলেই দেশ ছেড়ে পালাবে।”

আব্রাজ হেসে ফেলল। “ভালোই তো হবে। তাহলে তাদের ভাগের জমি আমি নিজের নামে চালান করে দিতে পারব। যাকগে, শিডিউল বল।”

“একটু পর আপনাকে বাজারে যেতে হবে।”

“কেন?” আব্রাজ ভুরু কুঁচকে তাকাল। “আজকাল বাজারে গিয়েও নাকি ভাষণ দেওয়ার ট্রেন্ড বের হইছে?”

“না ভাই। ওখানে গিয়ে সবজি বিক্রেতাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করবেন। দোকানদারদের সমস্যা শুনবেন, সাহায্যের আশ্বাস দেবেন। এতে আপনার ভোট আরও বাড়বে।”

আব্রাজ বিরক্ত হয়ে বলল, “ব্যাটা হয়ে এত সময় এখন আমার অন্য ব্যাটাদের দিতে হবে? এই সময় যদি একটা মেয়েকে দিতাম, এতদিনে দেশের ভবিষ্যৎ রক্ষার জন্য দক্ষ জনশক্তি তৈরি হয়ে যেত। কীসব বাল ফালানি কাজ করতাছি!”

সামির একটু ইতস্তত করে যোগ করল, “ভাই, আরেকটা কথা… বাজারে কিন্তু অপজিট দলের প্রার্থীও থাকবে।”

“কোন বাল থাকবে?” আব্রাজ গর্জে উঠল।

“ওই শিক্ষামন্ত্রী রাত্রিকা নৈশি। এবার সেও এমপি পদে দাঁড়িয়েছে। মনে হচ্ছে এইবারও শিক্ষামন্ত্রীর আসনটা ওরই হবে।”

আব্রাজের মুখ মুহূর্তে কালো হয়ে গেল। “ওই শালীর নাম মুখে আনবি না। মন চায় সংসদের ভেতরেই ওর মুখে বোম মারি। দেশের বাচ্চাকাচ্চারা খেলাধুলায় মন দেবে ওইটা তার সহ্য হয় না। মন্ত্রী হয়ে বসে বসে বাচ্চাদের জীবন নিয়ে ছক্কা খেলে। ওকে আর ওই পদে আসতে দেওয়া যাবে না। দেশের পোলাপানের মাথা নষ্ট করে দিচ্ছে।” একটু থেমে সে দাঁত চেপে বলল,
“ওয়েট কর। এইবার দেখিস আমি প্রধানমন্ত্রীই হয়ে যাব। তখন ওকে উচিত শিক্ষা দেব।”

সামির শুকনো গলায় বলল, “আগে যে পদে আছেন, সেটা টিকিয়ে রাখতে পারেন কিনা সেটা দেখেন।”

আব্রাজ ঘুরে তাকিয়ে থুথু ছিটিয়ে দিল।
“থু, মারি তোর মুখে, হারামজাদা।”


দলের লোক নিয়ে বাজারে প্রবেশ করল আব্রাজ। ঢুকতেই চোখ পড়ল ধানের শীষ খাওয়া দলের আপার দিকে। মুখ বাঁকিয়ে নিজের দল-বল নিয়ে সে বাজারের সবজি দোকানে ঢুকল। আজকে সবজি সব সে একাই কিনে নেব। নিজের হাতে কিনে জনগণকে বিলিয়ে দেশের কল্যাণ করবে। সবজির দোকানে গিয়ে মামাকে জিজ্ঞেস করল, “তো কেমন যাচ্ছে আপনাদের দিনকাল?”

মামার মুখে ভাঁজ পড়ে গেল। “প্রতিদিন আপনার মতো একজন আসে, আইসা একই আলাপ করে। আপনাগো আলাপের কারণে আমাগো সময় নষ্ট হয়। দুই-চারজন কাস্টমার আসে, তাও আপনাগো ভিড় দেইখা আসে না। এখন তাইলে ভাবেন, আমাগো দিনকাল কেমন যাইতাছে স্যার?”

আব্রাজ ভ্রু কুঁচকে সামিরের দিকে তাকাল। সামির দাঁত কেলিয়ে বলল, “মাইন্ড কইরেন না ভাই, প্রসংশা করছে আপনার।” হঠাৎ আব্রাজের চোখ গেল বড় বড় লাউগুলোর দিকে। সে হাতে তুলে ধরে বলল,
“লাউগুলো কি বড়!”
সামির উচ্ছ্বাসে চেঁচিয়ে উঠল, “লাউ বড় না, কদু বড় আব্রাজ ভাইয়ের মন বড়!” সাথে সাথেই সবাই ঐ কথা দোল খাইয়ে বলল। আসলে এগুলো সব আগে থেকেই সাজানো ছিল। আব্রাজ চোখে ভালো করে সানগ্লাস টা দিলো। আহা গর্ভ হচ্ছে তার। তাও ভালো এবার আর মনের জায়গায় অন্য কিছু বলেনি। এইবারকার স্পেলিং মিস্টেক হলে সর্বনাশ হয়ে যেত। হঠাৎ লাউ রাখতে গেলে মনে হলো, পাশে কেউ ধাক্কা দিচ্ছে। আব্রাজ চশমা নামিয়ে দেখল। জননেত্রী নৈশি আপা দাঁড়িয়ে আছে। আরে বাপরে! এইখানেও হাজির? নৈশি আসতেই আশেপাশের মানুষের ভিড়ও বেড়ে গেল। এত মানুষ এতক্ষণ কখনও আসেনি। আব্রাজ নিচু কণ্ঠে সামিরকে জিজ্ঞেস করল,
“এত ভিড় কেন?”
“আরে, আপায় মাইয়া মানুষ না? তাই ভিড় বাড়ছে, সবাই তাকে দেখার জন্য এসেছে। বেডা মানুষ মাইয়া দেখলেই কুত্তার মতো দৌড়াইয়া আসে।”

“তো আমরা দৌড়ালাম না কেন?”

সামিরের মুখ বন্ধ হয়ে যায়। হঠাৎ আব্রাজ পুনরায় বলল, “তো মেয়ে মানুষ কোথায় পাবো আমি? আমারও তো ভিড় দরকার।”

“কসমেটিকের দোকানে চলেন, তখন ভিড় মিলবে।”

আব্রাজ চোখে সানগ্লাস দিয়ে নৈশিকে বলল, “ঠিক আছে, আমি ওইদিকে ঘুরে আসি।”

“চলে যাচ্ছেন কেন?” নৈশি প্রশ্ন করল। “মনে হচ্ছে আপনি জায়গায় দখল দিচ্ছেন।” আব্রাজের মন কেঁপে উঠল। হাতে ইচ্ছে করছে থুথু ছিটিয়ে চড় বসাতে, কিন্তু সেটা করতে পারবে না। শালার জীবন!

হঠাৎ নৈশি মুখ খুলল, “যতই সবজি খাক না কেন সবাই, জনগণের কিন্তু ভাত না খেলে চলবে না। আর সেই ভাত আমাদের ধানের থেকেই আসে। তাই বেশি বেশি ভাত খাওয়ার জন্য ধানের শীষে ভোট দেওয়া উচিত।”

আব্রাজ কণ্ঠ উচ্চ করে বলল, “কেন ধানের শীষে ভোট কেন? ভাত তো ধান থেকে হয়, শীষের থেকে নয়। জনগণের উচিত নৌকা মার্কায় ভোট দেওয়া। নৌকা না থাকলে মানুষ নদী পথে ধান চালান করত কি করে? বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ, তাই নৌকা মার্কায় ভোট দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।”

নৈশির মুখ মুহূর্তে বন্ধ হয়ে গেল। হঠাৎ পেছন থেকে জায়ামতের প্রার্থী ভিড় ঠেলে আব্রাজের পাশে এসে দাঁড়াল। বলে উঠল, “কিন্তু দাঁড়িপাল্লা না থাকলে ধানের ওজন কিভাবে মাপা হতো? ওজন না মাপা হলে ধান নদী পথে কৃষক চালান কি করে করত? তখন চালান না হলে দেশের মানুষ ভাত পেত কীভাবে? তাই সব ছেড়ে সবার উচিত দাঁড়িপাল্লায় ভোট দেওয়া।” এই কথা শুনে সবাই আব্দুল মোতালেব নিজামীর দিকে ছুটে গেল। প্রশংসায় পঞ্চমুখ। সুবহানআল্লাহ বলে মুখের পানি শুঁকিয়ে ফেলল। শেষে ফাঁকা জায়গায় পড়ে থাকল আব্রাজ আর নৈশি। এই দুইজনের সাথে কি কাজটাই না হলো?
চলবে…

( এই গল্পে সাতটা নায়ক আর সাতটা নায়িকা তাই সব চরিত্র সমান তালে থাকবে। এবার পড়েন আর বিছানায় হাসতে হাসতে ইয়ে করে দেন। কেউ ডায়াপার চাহিয়া লজ্জা দিবেন না। ডায়াপার স্টক আউট🐸)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply