Golpo romantic golpo যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ

যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ১১


যেখানেপ্রেমনিষিদ্ধ

ইশরাতজাহানজেরিন

পর্ব_১১

স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে বসে আছে সাঁঝ। চারপাশে তার মা, চাচিরা, আর মীর বাড়ির সব বউরা একসাথে হৈচৈ করছে। কারো হাতে পতাকা, কেউ আবার ইতিমধ্যেই চিৎকার শুরু করে দিয়েছে। সাঁঝ মুখ গোমড়া করে বসে আছে। তার সকালের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। আজকে কি হয়ে গেল তার সাথে। আরযান ভাই কলেজের মাঠে সবার সামনে তাকে কান ধরে উঠবস করিয়েছে। শুধুই কি তাই? তার আবার ভিডিও করে রেখেছে। তাতেও যদি থামত! ওই অধ্যক্ষ একগাদা নালিশ করেছে। চার সাবজেক্টের জন্য ৮ হাজার টাকা এক্সট্রা দিয়ে ম্যানেজ করা হয়েছে। এখন আরযান ভাই ৮ হাজার টাকা নিয়ে খোঁটা দিচ্ছে! এমন টাকা সাঁঝ হিশুর সাথে ফেলে দেয়। সাঁঝের মা সাঁঝের দিকে তাকিয়ে বলল, “কুত্তার পুটকির মতো চেহেরা বানিয়ে রেখেছে। গুষ্টির স্বভাব পেয়েছে বলে কথা!”

সাঁঝ মুখ ভেংচি কেটে বলল, “আমি না বলেছিলাম, আমি আসবো না? তাও জোর করে আনলে! “

সে একটু থেমে বলল, “এসব ফালতু খেলা কে দেখে? সাঁঝের কত কাজ আছে, এসব খেলা দেখা ছাড়া।” সাঁঝ বিরক্ত গলায় বলল।

তার মা ধমক দিলেন, “চুপ করে খেলা দেখ। নিজের ভাইয়ের খেলা, আর তুই এমন মুখ কালো করে বসে আছিস ? তুই তো পারলি না জীবনে কিছু করতে। এই বাড়ির সবাই যোগ্য। আল্লাহ জানে কি পেটে ধরলাম আমি। আরযানের থেকে কিছু শিখতেও তো পারিস? তিন বেলা ওর চরণ ধোঁয়া জল খাবি।”

“তুমি আমার মা নাকি ওই নিমপাতার? নিজের একটা মাত্র মেয়ে, তাও ভালো দেখতে পারো না। কি একটা অবস্থা!”

সাঁঝ নিচু গলায় বিড়বিড় করল, ” আর ওটা ভাই না, আতঙ্ক…! কেমন করে সাঁঝের জীবনে আগুন ধরানো যায় সারাদিন তাই ভাবে।”

পাশে বসা মেজো চাচি শুনে হেসে ফেললেন, “আতঙ্ক আবার কেমন?”

সাঁঝ একটু ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল, “ওনার সামনে গেলেই মনে হয় ভাইবা দিতে বসছি! একদম চোখ দিয়ে স্ক্যান করে দেয়।”

সবাই আবার হেসে উঠলো। সেজো চাচি মজা করে বললেন, “এই যে এত ভয় পাও, ছোটবেলায় তো সারাক্ষণ ওর পেছনে পেছনে ঘুরতে!”

সাঁঝ চোখ বড় করে বলল, “ওইটাই তো ভুল ছিল! তখন বুঝিনি মানুষটা এত খারাপ হয়ে যাবে! আর সাঁঝ কারো পিছনে ঘুরে না সেজো মা, সাঁঝের পিছনে সবাই ঘুরে।”

হঠাৎ পাশের সিটে বসা বড় চাচি হেসে বললেন, ” তোর মনে আছে সাঁঝ একবার যে তুই আরযানের কোলে পাতলা হাগু করে দিয়েছিলি? তাও ছেলেটা তোকে কোল থেকে ফেলে দেয়নি।”

আশপাশের মানুষ সব সাঁঝের দিকে তাকালো সেই কথা শুনে। লজ্জায় পড়ে গেল সাঁঝ। এসব বলার আর জায়গা পাচ্ছে না তার বাড়ির মানুষ। আর বড় মা এই কথা আর কতবার বলবে? পুরো একালার মানুষ এই খবর জানে। দূর বাল দুনিয়া সাঁঝের মর্ম বুঝল না। সে বড় মাকে বলল, “দেখো তোমরা আমাকে জোর করে এখানে এনেছো। বেশি করলে আমি চলে যাবো। আমার আজকের শিডিউল তোমাদের জন্য নষ্ট হলো।”

“তবুও আসতে তো রাজি হয়েছিস। কারণটা কি? ভাইয়ের খেলা… নাকি অন্য কিছু?” সাঁঝের মা ভ্রু কুঁচকে বলল।

সাঁঝ নিজের মায়ের মুখের দিকে তাকালো। এটা কি আসলেই তার মা? ডিএনএ টেস্ট এইবার না করলেই নয়।

সাঁঝ একটু গলা খাঁকারি দিল, “খেলা দেখতে এসেছি। আর… একটু মানুষজনও দেখা যায়।”

সেজো মা হাসি চেপে বললেন, “মানুষজন? না কি সুন্দর সুন্দর ছেলে?”

সাঁঝ এবার ধরা পড়ে গিয়ে ঠোঁট কামড়ালো, “আচ্ছা একটু দেখলে সমস্যা কি?” ঠিক তখনই মাঠে খেলোয়াড়দের এন্ট্রি শুরু হলো। পুরো স্টেডিয়াম কাঁপিয়ে স্লোগান উঠলো। “বাংলাদেশ! বাংলাদেশ!”
ঘোষণার কণ্ঠ ভেসে এলো, “আজকের ম্যাচে বাংলাদেশের হয়ে খেলছেন… আরযান এবং তার টিম!” এক মুহূর্তে সবাই উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার শুরু করলো। সাঁঝও অজান্তেই উঠে দাঁড়িয়ে গেল। তার চোখ মাঠে আটকে গেল। আরযান দূরে দাঁড়িয়ে। কনফিডেন্ট কত মরার ব্যাটার। সাঁঝের বুক ধক করে উঠলো।
সে দ্রুত বসে পড়ল। খেলোয়াড়রা প্রবেশ করতেই সাঁঝ তার ব্যাগ থেকে দূরবীনটা বের করে তাদের উপর-নীচ ভালো করে দেখতে লাগল। উফ কি সুন্দর দৃশ্য! হাফপ্যান্ট পড়া ছেলেদের সেইরকম ভালো লাগে সাঁঝের। ওদের লম্বা লম্বা ড্রাগনের মতো পা গুলো তো হৃদয়ে দোলা জাগিয়ে তুলে। আর এখানে তো বিদেশীও আছে। ওদের তো আরো লম্বা ঠ্যাং। ভালোই মজা পাবে দেখে। কিন্তু আরযান ভাই যদি একবার দেখে ফেলে খেল খতম। সাবধানে থাকতে হবে সাঁঝকে। সে ভালো করে দূরবীন দিয়ে ছেলে দেখা শুরু করে। ঠিক তখনই একছেলের উন্মুক্ত পা দেখে সাঁঝের মাথা নষ্ট হয়ে যায়। মুচকি হাসে সাঁঝ। ধীরে ধীরে ওপরের দিকে চোখ যায় তার। ছেলেটার মুখের দিকে তাকাতেই ভয়ে সাঁঝের বুক আঁটকে উঠে। ওরে মা এটা তো আরযান ভাই। কেলো করেছে। আরযান ভ্রু কুঁচকে তারই দিকে তাকিয়ে আছে। ভয়ে সাঁঝ জলদি তার দূরবীন ব্যাগে ঢুকিয়ে ভালো মেয়ের মতো বসে থাকে।

রেফারির লম্বা হুইসেল বাজতেই খেলা শুরু।
স্টেডিয়াম একসাথে গর্জে উঠলো। “বাংলাদেশ! বাংলাদেশ!” সাঁঝ ঠোঁট বাঁকিয়ে বসে আছে, চোখ কিন্তু মাঠেই।

“এই লোকটা আজকে হারবেই।” সে খুব আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলল।

পাশের চাচি হেসে বললেন, “নিজের ভাইয়ের জন্য এমন অভিশাপ দেয় নাকি কেউ?”

সাঁঝ গম্ভীর মুখে বলল, “ও হারলেই শান্তি পাবো। একটু নাক উঁচু ভাব কমবে।”

সাঁঝের মা পাশে বসে ফিসফিস করে বললেন, “তোমার অভিশাপে কিছু যায় আসে না, ম্যাডামপুলি। ও কিন্তু ক্যাপ্টেন।”

সাঁঝ কাঁধ ঝাঁকালো, “ক্যাপ্টেন হোক আর প্রেসিডেন্ট হোক, হারবেই।” মাঠে তখন বল পায়ে নিয়ে খেলছে আরযান। সে আজ বাংলাদেশ দলের ক্যাপ্টেন। হাতে কালো আর্মব্যান্ড, গায়ে লাল-সবুজ জার্সি, পেছনে বড় করে লেখা “আরযান 10”। তার জার্সি ঘামে ভিজে শরীরের সাথে লেগে আছে, শক্ত বুক আর কাঁধের গঠন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। চুলগুলো একটু এলোমেলো, কিন্তু তাতেই একটা অদ্ভুত রাফ-হ্যান্ডসাম লুক। সে বল পায়ে নিয়ে ডিফেন্ডার কাটিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। একটা টাচ, দুইটা ফেইন্ট… তারপর দ্রুত পাস। গ্যালারি চিৎকারে ফেটে পড়লো।

১০ মিনিট পার হয়েছে। অস্ট্রেলিয়া আক্রমণে হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের ডিফেন্স একটু চাপে।
সাঁঝ হাত গুটিয়ে বলল, “এই তো! শুরু হয়ে গেছে… এখন গোল খাবেই।” কিন্তু ঠিক তখনই আরযান পিছনে নেমে এসে ট্যাকল করে বল ছিনিয়ে নিল।
ডালিয়াও সাঁঝের সাথে এসেছে। সে মুচকি হেসে বলল, “দেখলি? তোর অভিশাপ উল্টো কাজ করছে মনে হয়।”

সাঁঝ চোখ ঘুরিয়ে বলল, “একটা ট্যাকল দিয়ে কি হবে!”

দেখতে দেখতে কেটে গেল ২৫ মিনিট। আরযান মিডফিল্ড থেকে বল নিয়ে দৌড় শুরু করলো।
একজন, দুজন, তিনজন প্লেয়ার কাটিয়ে গেল। পুরো স্টেডিয়াম দাঁড়িয়ে গেছে। “শট দে!” কেউ চিৎকার করছে। আরযান বক্সের বাইরে থেকে হঠাৎ শট নিল।
বলটা ক্রসবারের একটু ওপর দিয়ে গেল।
সাঁঝ অজান্তেই উঠে দাঁড়িয়েছে। সে নিজেই অবাক হয়ে বসে পড়ল। মা তাকিয়ে বললেন,

“কি হলো? গোল হলে তো খুশি হতি না?”
সাঁঝ দ্রুত বলল, “আমি উঠিনি! মানে… সবাই উঠছিল তাই…” বলেই আবার মুখ ভেংচি কাটল।

হাফটাইম হয়ে গেছে। স্কোর ০-০। সাঁঝ পানি খেতে খেতে বলল, “দেখলা? কিছুই করতে পারতেছে না।”
ডালিয়া হাসল, “তুই যত বলবি, উনি তত ভালো খেলবে মনে হচ্ছে।” সাঁঝ চোখ বড় করে ভয় দেখাল ডালিয়াকে। তারপর বলল, “ওরে বালের দালাল, চান্দা বাজ ডাইরিয়া ওই নিমপাতা তোকে কয়টাকা দিয়েছে? আজ এত সাফাই গাইছিস? বিশ্বাস কর কানের কাছে মশা গুন-গুন করলে যেমন শোনায়, তোর মুখে নিমপাতার প্রশংসাও আমার কাছে তেমনই শোনাচ্ছে।”

দ্বিতীয়ার্ধ। ৫৫ মিনিট খেলা হবে। অস্ট্রেলিয়া কর্নার পেল। বলটা বিপজ্জনকভাবে বক্সে ঢুকলো। হেড!
কিন্তু গোলকিপার সেভ করলো। সাঁঝ চোখ বন্ধ করে বলল, “হ্যাঁ, এবার গোল খাইছে নিশ্চিত…”
চোখ খুলে দেখে গোল হয়নি। চাচিরা হেসে উঠলেন।
৭০ মিনিট খেলা এখন দ্রুত। দুই দলই মরিয়া।
আরযান বল পেল ডান দিক থেকে। সে স্পিড বাড়ালো। একটা কাট, তারপর ইনসাইডে ঢুকে গেল।
একজন ডিফেন্ডার তাকে ঠেকাতে গেল। আরযান শরীর দিয়ে ঠেলে জায়গা করে নিল। তার চোখে এখন একটাই লক্ষ্য। সাঁঝ নিঃশ্বাস আটকে তাকিয়ে আছে।
“এইবার… এইবার দিবে…” সে নিজেও বুঝতে পারছে না কেন ফিসফিস করছে।

আরযান বক্সে ঢুকে একটা নিখুঁত শট দিলো।
গোওওওল!!! পুরো স্টেডিয়াম বিস্ফোরিত হয়ে গেল। সাঁঝ কিছুক্ষণ স্তব্ধ।
তারপর হঠাৎ লাফিয়ে উঠল, “ইয়েসসস” বলেই থেমে গেল। চারপাশে সবাই তাকিয়ে আছে।
মা ভ্রু তুলে বললেন, “এই তুই না বলছিলে ও হারবে?”

সাঁঝ লজ্জা পেয়ে বলল, “আমি… মানে… দেশ তো জিততেছে…”

ডালিয়া হেসে বলল, “ঢং।”

সাঁঝ কনুই দিয়ে ধাক্কা দিল, “চুপ!”

শেষ ২০ মিনিট বাকি আরো। অস্ট্রেলিয়া মরিয়া হয়ে আক্রমণ করছে। কিন্তু আরযান পুরো টিমকে লিড দিচ্ছে। কখনো সামনে, কখনো পিছনে। শেষ মিনিটে সে আবার একটা বল কন্ট্রোল করে সময় নষ্ট করল না। দারুণ স্কিল। ৯০ মিনিট + ইনজুরি টাইমও দেখতে দেখতে শেষ হয়ে গেল। রেফারির শেষ হুইসেলও বাজল। বাংলাদেশ জিতে গেছে। স্টেডিয়াম আনন্দে ফেটে পড়েছে। সাঁঝ চুপচাপ বসে আছে, ডালিয়া তাকিয়ে বলল, “তোর অভিশাপটা মনে হয় কাজ করেনি।”

সাঁঝের মুখে আর কোনো কথা রইল না। এই লোকটা এখন জিতেছে না? খালি নিজের গীত গেয়ে যাবে। আর বাড়ির লোকের তো এমনিতেও মাথায় থাকত। এখন কই রাখবে একে কে জানে? কিন্তু এখান থেকে জলদি কেটে পড়তে হবে। সে নিশ্চিত লোকটা এসেই তাকে কথা শুনিয়ে বলবে, “দেখলি সাঁঝ আমি কত গুণধর? এখন থেকে তুই ৩ বেলা আমার পা ধোঁয়া পানি খাবি।” এসব শোনার থেকে তো কেটে পড়াই ভালো।

আরযানের সতীর্থরা এসে তাকে জড়িয়ে ধরলো।
“ক্যাপ্টেন! তুমি না থাকলে এই ম্যাচ জেতা যেত না!” একজন উত্তেজিত গলায় বলল।
আরযান হেসে বলল, “টিমওয়ার্ক, বয়েজ। সবাই মিলে জিতছি।”

ট্রফি সেরিমনি শুরু হলো। মঞ্চে উঠতেই আলো ঝলমল করে উঠলো চারপাশ। ঘোষণা ভেসে এলো। বাংলাদেশ দল বিজয়ী। আরযানের হাতে তুলে দেওয়া হলো ট্রফি।
সে দু’হাতে তুলে ধরতেই স্টেডিয়াম আবার গর্জে উঠলো! কনফেটি উড়ছে, ক্যামেরার ফ্ল্যাশ একের পর এক ঝলসে উঠছে। টিমমেটরা চিৎকার করছে,
“ক্যাপ্টেন! ক্যাপ্টেন!”

গ্রুপ ফটো তোলা হলো। সবাই একসাথে ট্রফি নিয়ে, কেউ লাফাচ্ছে, কেউ হাসছে। আরযান মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। সেলিব্রেশন চলছে। মাঠের একপাশে দৌড়ে গেল তারা। ফ্যানরা গ্যালারি থেকে হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে। “আরযান! একবার দেখেন!” “একটা ছবি প্লিজ!” “অটোগ্রাফ!” সে এগিয়ে গিয়ে হাসিমুখে সবার সাথে ছবি তুলছে। একটা ছোট ছেলের জার্সিতে সাইন করে দিল। “ভালো করে খেলবা, ঠিক আছে?” মাথায় হাত রেখে বলল। ছেলেটা খুশিতে লাফিয়ে উঠলো।
কিন্তু এইসব কোলাহলের মাঝেও হঠাৎ আরযানের চোখ একটু থেমে গেল। সে গ্যালারির দিকে তাকালো।
সেই নির্দিষ্ট জায়গাটা… যেখানে কিছুক্ষণ আগেও তার মা-চাচিরা বসেছিল। তার দৃষ্টি একটু খুঁজে বেড়ালো।
ভিড়ের মাঝে অনেক মুখ কেউ হাসছে, কেউ চিৎকার করছে কিন্তু সেই মুখটা নেই। একজন টিমমেট কাঁধে হাত রাখল, “এই, কি হলো? চল, আরেকটা ফটো!”
আরযান হালকা চমকে উঠল, “হ্যাঁ… আসছি।”
সে আবার হাসল, ক্যামেরার দিকে তাকাল। কিন্তু চোখের কোণে একফোঁটা খোঁজ থেকেই গেল।

স্টেডিয়ামের বাইরে… সাঁঝ দ্রুত পায়ে হাঁটছে। ওড়না তার পড়তে ভালো লাগে না। এই টিশার্ট আর জিন্সের সাথে কেউ ওইসব পড়ে নাকি? নিজেকে কেমন অশিক্ষিত, মুর্খ লাগে। সে ওড়না খুলে ব্যাগে ঢুকিয়ে রেখেছে। এখন সে আরামছে কয়টা সেলফি তুলবে। তারপর সেইসব তো আবার পোস্টও করতে হবে! উফ কত কাজ তার।

স্টেডিয়ামের বাইরের রাস্তা তখনো সরগরম। এর মাঝেই সাঁঝ নিজের দুনিয়ায় ব্যস্ত। সে মোবাইলটা একটু উঁচু করে ধরল, ঠোঁট বাঁকিয়ে একেকটা পোজ দিচ্ছে। কখনো চুলটা এক পাশে সরিয়ে, কখনো হালকা হাসি… “উফ! লাইটটা পারফেক্ট!” নিজের মনেই বলল সে।
ওড়নাও বুকে নেই। ঠিক তখনই পাশের কয়েকটা ছেলে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করতে লাগল। “দেখছিস?” — “একদম সিনেমার মতো লাগতেছে…”

“একটু কথা বলি?”

সাঁঝ চোখের কোণ দিয়ে তাদের লক্ষ্য করল। মুখে হাসি ফুটে উঠল। “হুম… আমাকে দেখেই তো মনে হয় পাগল হয়ে গেছে…” মনে মনে ভাবল সে। সে ইচ্ছে করেই আরো একটু ঘুরে দাঁড়াল, ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে চুল উড়িয়ে দিল। যেন তাদের নজরটা আরো নিশ্চিত করে নিতে চায়। ছেলেগুলো এবার একটু সাহস পেয়ে সামনে এগোতেই হঠাৎ পেছন থেকে ভারী কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।
“অনেক সাহস হয়েছে, না?”

সবাই একসাথে ঘুরে তাকাল। দেখল জনপ্রিয় ফুটবোল প্লেয়ার আরযান দাঁড়িয়ে। সে পোশাক বদলে ফেলেছে।
কালো শার্টে তাকে আরে অপূর্ব লাগছে। ছেলেগুলোর মুখের রঙ এক সেকেন্ডে উড়ে গেল। “স্যার… আমরা তো”

“কি যেন বলবে বলছিলে?” আরযান ধীরে ধীরে এগিয়ে এল। তার চোখ একবারও সাঁঝের দিকে যায়নি এখনো। সবটা মনোযোগ ছেলেগুলোর ওপর।

“চোখ নামাও।” একটা কথাই যথেষ্ট ছিল। তারা মাথা নিচু করে ফেলল। “যে চোখ তুলে তাকাইছো… আর যেন কখনো তা না ওঠে। না হলে…” সে বাকিটা শেষ করল না। করার দরকারও পড়ল না। ওরা প্রায় দৌড়ে সেখান থেকে সরে গেল। চারপাশ আবার স্বাভাবিক হতে শুরু করল। আরযান ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে তাকাল সাঁঝের দিকে। তার দৃষ্টিটায় কী ওমন আছে? রাগ? না। অভিমান? নাকি অন্যকিছু? হয়তো কিছু একটা গভীর… দমিয়ে রাখা। সাঁঝ একটু থমকে গেল। ভয় করছে তার। আবার কপালে দূর্গতি তার। তবুও সে সাহস করে বলল, “কি?” সে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, “ওরা তো কিছু করেনি। আপনি অত রিয়্যাক্ট করলেন কেন?”

আরযান এক পা এগিয়ে এল। “তুই বুঝিস না সা়ঁঝ?”

“কি বুঝব?” সাঁঝ বিরক্ত, “লোকজন তাকালে কি আমি দায়ী?”

আরযান এবার একদম কাছে এসে দাঁড়াল।
খুব নিচু গলায় বলল, ” রাগাবি না একদম চুপ।”

সাঁঝ এখনো রাগে ফুঁসছে, “আপনি কে আমাকে কন্ট্রোল করার?”
আরযান একদম কাছে এসে দাঁড়াল। “আমি কে… সেটা তুই জানিস না, ঠিকই।” হঠাৎ সে সাঁঝের হাত থেকে মোবাইলটা কেড়ে নিল।
— “এই! ফেরত দেন!”
সাঁঝ ঝাঁপিয়ে পড়তেই চটাক করে শব্দ হলো। আরযান সাঁঝের ফোনটা আছড়ে ভেঙে দিলো। সাঁঝ জমে গেল।

“আপনি… এটা কি করলেন?” তার গলা কেঁপে উঠল।

আরযান নিচু হয়ে ভাঙা ফোনটা একবার দেখল, তারপর পা দিয়ে ঠেলে সরিয়ে দিল। “বাসায় যাবি চল।”
কোনো উত্তর নেই। সাঁঝ শুধু তাকিয়ে আছে।
আরযান এবার ধীরে ধীরে বলল, “আজ থেকে তোর একটা জিনিসও আমার চোখের বাইরে যাবে না।”
সে একটু ঝুঁকে এল, “তুই কি পরবি… কোথায় যাবি… কার সাথে কথা বলবি—সব আমি ঠিক করব।”

“আপনি পাগল!” সাঁঝ চিৎকার করে উঠল, “আমি আপনার কিছু না! আপনি খালি আমাকে শাস্তি দেন।”

আরযান এবার তার থুতনিটা শক্ত করে ধরে উপরে তুলল। “এইজন্যই শাস্তি দিচ্ছি কারণ তুই বুঝিস না… তুই নিজেকে কতটা সস্তা করে ফেলছিস।”

আরযান পকেট থেকে নিজের ফোন বের করল।
নাম্বার ডায়াল করল। কল রিসিভ হতেই কাকে যেন বলল, “হ্যালো… হ্যাঁ। আজ থেকে সাঁঝের সব একাউন্ট, সব সোশ্যাল। বন্ধ করে দে। হ্যাঁ, একদম। এখনই।”
সাঁঝ হতবাক। “আপনি এসব করতে পারেন না।”

“আমি পারি।” কল কেটে সে তাকাল তার দিকে। “তুই যতটা নিজেকে দেখাতে ভালোবাসিস… আমি তোকে ঠিক ততটা পুড়াতে ভালোবাসি সাঁঝ। বলেছিলাম ভালো মেয়ের মতো চলবি। কথা শুনবি, বাড়ির সম্মান খাবি না। বলেছিলাম তুই তোর স্বামীর আমানত, তোকে প্রোপার ভাবে হেফাজত করতে আমায় যা করতে হয় আমি তাই করব। তুই মাথায় ঢুকিয়ে রাখ, তুই জাস্ট তোর স্বামীর। তোকে সে ব্যতিত আর কেউ দেখতে পারবে না, ছুঁতে পারবে না। বুঝলি?”

“তো আমাকে বিয়ে দেন না কেন?”

“যা গাড়িতে যাহ। মানুষের সামনে তামাশা করতে পারব না। আর ওড়না কই? কাল থেকে হিজাব আর বোরকা পড়বি।”

“পারব না।”

“তুই পারবি না, তোর বাপ পারবে।”

“হু বাপকেই পারতে বলেন।”

আরযান চোখ বন্ধ করে একটা নিশ্বাস ছাড়ল। সাঁঝের দিকে তাকিয়ে শেষ বার বলল, “গাড়িতে উঠবি না?”

“না।”

“ওকে ফাইন।” বলেই সে সাঁঝকে সকলের সামনে জোর করে কোলে তুলে নিলো। সাঁঝ নামার জন্য ছটফট করতেই আরযানের হাতের বাঁধন শক্ত হলো। আরযান বেখেয়ালি ভাবে সাঁঝকে বলল, “আরযানকে তুই চিনিস না সাঁঝ। আরযান যা চায় তা উসুল করে ছাড়ে। জিনিস যদি বাঁকা হয় তা আমি সোজা করতে জানি। অন্যের জিনিসকেই সোজা করে ছাড়ি। আর তুই তো নিজেরই। আমার কথা শুনবি না? তুই শুনতে বাধ্য, তোকে শুনতেই হবে। মাইন্ড ইট।”

চলবে?

( এই গল্পের পছন্দের চরিত্র নিয়ে এল লাইন বলুন। আর কেন পছন্দ সেটাও।)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply