Golpo ডিফেন্স রিলেটেড মেজর ওয়াসিফ

মেজর ওয়াসিফ পর্ব ১৩


মেজর ওয়াসিফ পর্ব ১৩

লেখনীতেঐশীরহমান

পর্ব_১৩

[ 🚫 কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ 🚫]

” তুমি? তুমি স্যারের ওয়াইফ”?

মেয়েলি কন্ঠস্বরে পেছন ফিরে তাকায় ধারা। ও তখন সবে নাস্তা সেরে ইন্টারের বায়োলজি বইটা খুলে বসেছে বারান্দায়। ধারা পেছন ফিরে শশীর দিকে তাকিয়ে আছে। এই মেয়েটা এসেছে ওদের সঙ্গে, তবে এসে থেকেই ভীষণ চুপচাপ ছিলো। গতদিনগুলো ধারা দেখেছে, সে ও দেখেছে ধারাকে তবে সরাসরি কথা হয়নি। ধারা পাশ থেকে একটা চৌকি এগিয়ে দিয়ে বলে।

” বসুন আপু”

শশী বসলো সেই চৌকিতে।

” কি পড়ছো”?

” বই পড়ছি”

শশী, ধারার হাতের বইটার থেকে চোখ বুলিয়ে বলে।

” তুমি সবে ইন্টারে পড়ছো? তুমি তো তাহলে আমার অনেক জুনিয়র “

ধারা আলতো হাসে, মুখে কিছু বলেনা। শশী মেয়েটা আর পাঁচটা সাধারণ মেয়ের মতো নয়। বেশ উচু লম্বা। বডি ফিটনেস খুব ভালো। সেই রকম গায়ের রঙটাও বেশ উজ্জ্বল। এক দেখাতে যে কেউ আন্দাজ করে নিতে পারবে উনি সরকারি কর্মী। শশীও স্থির দৃষ্টি ফেলে ছোটখাটো গড়নের ধারা কে দেখে। মেয়েটার চেহারা সৌন্দর্যে কোথাও একটা ঐ বাচ্চা ছাপ রয়েই গেছে। রুপ, সৌন্দর্যের দিক থেকে এই মেয়েটাকে মোটেও হেও করা যায় না। যথেষ্ট সুন্দর আছে। এক দেখাতে যে কোনো পুরুষের চোখ পড়বেই। হঠাৎ করে শশী চৌকি ছেড়ে উঠে যেতে যেতে বলে।

” আচ্ছা পড়ো, ডিসটার্ব করলাম”

” না, না, কোনো সমস্যা নেই, বসুন না আপু”

শশী সামান্য হেঁসে ওখান থেকে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়, আবার কি মনে পেছন ফিরে দেখে ধারাকে। ধারা পুনরায় বইয়ের উপর মনোযোগ ঢেলেছে। মনে মনে শশী বলে।

” আমি অবাক হচ্ছি, মেজর শাহেদ ওয়াসিফ এতটুকু মেয়েকে বিয়ে করেছে? কোথায় শাহেদ ওয়াসিফ আর কোথায় এই মেয়ে? শেষ মেষ পঁচা শামুকে পা কেটে বসলেন তিনি? উনার সঙ্গে যায় এই মেয়ে “?


পড়ার পাঠ চুকিয়ে মা-চাচীদের সঙ্গে হাতে হাত লাগিয়ে টুকটাক কাজ করছে ধারা। তখন ওর কানে আসে ছোট আম্মা ওর বড়ো আম্মা কে বলছে।

” বড় ভাবী,ওয়াসিফের সঙ্গে একটু কথা বলে দেখবেন কিন্তু এই বিষয়ে, ছেলে দুটো কে আমার ভীষণ ভালো লেগেছে। যেহেতু ওয়াসিফের চেনা পরিচিত, আমাদের ঘরেও তো বিয়ে উপযুক্ত মেয়ে আছে। আমার বড়ো মেয়েটার বয়স তো একেবারে কম হলোনা। লুইপার বিষয়টা নিয়ে একটু কথা বইলেন কিন্তু মনে কইরে”

ও কথা শুনে কাজ থেকে ধারার হাত থামে। এই কথা যদি আপার কানে যায় ধারা নিশ্চিত ঐ মেয়ে কেঁদে ভাসাবে। ধারা সেদ্ধ ডিম গুলো কোনোরকম ছুলে ওড়নায় হাত মুছে রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে বড়ো ঘরে ঢোকে। লাফিয়ে ঝাপিয়ে দোতলায় উঠতেই টের পায় ওয়াসিফের ঘর থেকে কথার সোরগোল ভেসে আসছে। ও আরেকটু সামনে এগিয়ে উঁকি দিলো, দরজা খোলা, দরজা পর্দা একপাশে গুছিয়ে রাখা বলে স্পষ্ট করে দেখতে পাচ্ছে ঘরের ভেতরটা। ওর মেজাজ তখন খারাপ হলো যখন দেখলো শশী নামের মেয়েটা বিছানায় আধশোয়া হয়ে কোলবালিশে হাত ঠেকিয়ে আছে। পা দুটো মেঝেতে ঝুলিয়ে রাখা। আরিয়ান,সামির খাটের পাশে দুটো চেয়ার টেনে বসেছে। ধারা আরেকটু এগিয়ে দেখার চেষ্টা করে এই ঘরের মালিক ওয়াসিফ কে। কিন্তু ওর দৃষ্টিতে কোথাও ওয়াসিফ কে দেখে না। এমন দৃশ্য দেখতেই একটু না বহুত মেজাজ চটে গেলো ধারার। এই মেয়েকে সে যথেষ্ট ভদ্র সভ্য ভেবেছিলো। পুরুষের সামনে ওভাবে শুয়ে আছে কিভাবে? ধারা চোখ মুখ রাগে ঝুলিয়ে যখন এক হাত কোমরে চেপে ওদের দিকে তাকিয়ে ছিলো হঠাৎ ওর পেছন থেকে ওয়াসিফ গম্ভীর কণ্ঠে বলে ওঠে।

” চোরের মতো উঁকি ঝুঁকি দিচ্ছিস কেনো? চল ভেতরে চল, পরিচয় করিয়ে দি”

আচমকা পেছন থেকে ওভাবে ওয়াসিফের কন্ঠ শুনতেই চমকে ওঠে ধারা, তাকায় ওয়াসিফের দিকে, বলে।

” আমি মোটেই চোর নই, আর উঁকি ঝুঁকি দিচ্ছি, অনেক কথা হচ্ছে তাই দাড়িয়েছে”

কথা শেষ করেই ধারা হাঁটা ধরলো, ওয়াসিফ ওর ঘরে ঢুকতে যাবে তার আগেই ধারা থেমে এসে একটানে ওয়াসিফকে সরিয়ে দিয়ে, দরজার কাছে দাড়িয়ে বেশ উঁচু গলায় বলে।

” এই আপু, আপনি প্লিজ একটু শোয়া থেকে উঠে বসুন, এটা ব্যাড ম্যানার”

ওর কথায় শশী দরজার দিকে তাকিয়ে জলদি উঠে বসে, আরিয়ান, সামির চকিত ঘুরে তাকায় ধারার দিকে। ধারা আর কিছু বলেনা ওদের। ওয়াসিফ ওর দিকে তাকিয়ে আছে, ধারা আস্তে করে ওয়াসিফ কে বলে। যা শুধু মাত্র ওয়াসিফ শোনে।

” আপনি না এদের স্যার, বেয়াদবি করার সাহস পায় কিভাবে? ভালো খারাপ গুনা বলি শেখাতে পারেন না”? বলেই ধারা হাটা ধরে, ওয়াসিফের উত্তর শোনার সময় তার নেই।

ওয়াসিফ এখনো ঘোরের মধ্যে, ওকে কিভাবে আচমকা টেনে সরিয়ে দিলো, তারপর আবার কিসব বলে গেলো। গলা খাকাড়ি দিয়ে ওয়াসিফ ঘরে ঢুকতেই শশী বিছানা ছেড়ে উঠে আরেকটা চেয়ারে বসলো। আরিয়ান স্যারকে দেখতে পেয়েই বললো।

” স্যার, বিনা অনুমতি তে ঘরে ঢুকেছি তার জন্য সরি, আপনাকে খুঁজেছি কিন্তু পায়নি, একটু জরুরি কথা ছিলো “

ওয়াসিফ বিছানায় বসে এক পা ভাজ করে, অন্য পা ফ্লোরে রেখেছে।

” ইট’স ওকে, বলো কি বলবে”?

এরপর ওদের অফিসিয়াল এক বিস্তারিত আলাপ আলোচনায় বসে ওরা ক’জন।


দুপুরে খাওয়ার পরপরই ওয়াসিফ ওদের কে সঙ্গে নিয়ে বের হয় ওদের বাড়ির আশপাশটাতে ঘুরতে। একটু পরই ওরা তিনজন রওনা হবে।

ওরা এতক্ষণ সবাই সরু রাস্তায় এক সঙ্গে হাঁট ছিলো। এরপর ওয়াসিফ সবার আগে, তারপর শশী হাঁটছে আর ফোন চাপছে। পেছনে পরেছে আরিয়ান আর সামির, ওরা ইচ্ছে করেই পড়েছে। সামির আরিয়ানকে কনুই দিয়ে গুতা মেরে বল।

” আরে একটু পর তো চলেই যাবো, স্যার কে একটু বল ভাবির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে”

” আমি পারবোনা বলতে, তুই গিয়ে বল”

” কেনো পারবিনা”?

” আরে সে স্যারের ওয়াইফ, আমরা স্যারের জুনিয়র কলিগ, তার পারসোনাল লাইফ নিয়ে জিজ্ঞেস করাটা ভালো দেখায়না, স্যার যদি অন্য কিছু মনে করে “

” আরে ধূর”

সামির এগিয়ে গিয়ে এবার শশীর পাশাপাশি হাঁটে আর বলে।

” স্যারের ওয়াইফের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে তোমার “?

শশী হাঁটছে, দৃষ্টি ফোনের দিকে। বললো।

” হলো”

” কখন “?

” সকালে”

” ও তোমার পরিচয় তাহলে হয়ে গেছে, আমাদের হয়নি এখনো”

” বাড়িতে ঢুকে পরিচয় করে ফেলো”

” না, ওভাবে হয় নাকি, তুমি মেয়ে তাই সহজে পেরেছো। আমাদের পরিচয় না করিয়ে দিলে কিভাবে হবো”?

শশী ফোন থেকে চোখ সরিয়ে তাকায় এক পলক সামিরের দিকে, বলে।

” এতো ইন্টারেস্ট কেনো স্যারের বৌয়ের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার “?

সামির ধুম করে বলে দেয়।

” তোমার যেমন বেশি, আমাদের ওতোটাও বেশিনা। আমরা পিওর ভাবি হিসাবেই তার সঙ্গে পরিচিত হতে চাচ্ছি। “
ওয়াসিফের দিকে ইশারা করে দেখিয়ে বলে।

” এমন কাটখোট্টা একটা মানুষের জীবনসঙ্গীর সঙ্গে পরিচিত হতে পারা ভাগ্য বুঝলে শসা। ও সরি! শশী”

নামের বিদ্রুপ করাতে সঙ্গে সঙ্গে শশী কটমট চোখে তাকায় আরিয়ানের দিকে। আরিয়ান ইতস্তত হয়ে আশেপাশে তাকিয়ে থেকে একটা ছোটখাটো মাপের শসা ক্ষেতে ছোট মাপের শসা ঝুলে থাকতে দেখে বলে।

” শশী, শসা খাবে”?

” তোমার শসা তুমি খাও, গাছ ধরে ঝুলে থাকো”

কথা শেষ করেই দ্রুত পা ফেলে হাঁটা দেয় শশী। সামির অবাক ভঙ্গিতে শুধায়।

” উচিত কথা কওয়োনা যাইনা এই দুনিয়ায়, লক্ষী বেজার হয়”


মাগরিবের ওয়াক্ত শেষ হতেই সন্ধ্যের নাস্তা খেয়ে পড়তে বসেছে ধারা। ওয়াসিফ সেই বিকেলে ওদের এগোয় দিতে বেরিয়েছে এখনো ফেরেনি বাড়িতে। পড়তে পড়তে বই থেকে মনোযোগ কেটে গিয়ে ভাবতে বসে ধারা। সারাদিন পর ওর এখন মনে পড়ে সেই কথা। ওয়াসিফ তো ওকে বলে দিয়েছিলো আজকে দুপুরের মধ্যে সবকিছু গুছিয়ে ঐ ঘরে যেতে। কথাটা মনে পড়তেই মুখে ভেঙেছি কেটে বিড়বিড় করে বলে।
‘ উনি বললেই শুনতে হবে নাকি’?
ধারার ধ্যান ভাঙ্গে নিচ তালা থেকে ওয়াসিফের ভারি গলা শুনতে পেয়ে। চেচিয়ে ডেকে বলছে।

” আম্মা আমাকে এক কাপ চা দিও তো” পরপর আবার বলে ওঠে।

” কই গেলে তোমরা? কাউকে তো দেখিনা”

ধারা ঘর থেকে বেরিয়ে উঁকি দেয় নিচে। ওয়াসিফ বসে আছে বেতের সোফায়। বড়ো আম্মা একেবারে এশার নামাজ শেষ না করে ঘর থেকে বের হবেনা। ওর মা, আর ছোট চাচী গেছে লোপাকে নিয়ে সদরের এক ডাক্তার আপার চেম্বারে। লুইপা বেরিয়েছে টিউশন করাতে। ধারা ওখানে দাড়িয়ে চেচিয়ে বলে।

” বাড়িতে কেউ নেই, বড়ো আম্মা কোরআন পড়ছে, এশার নামাজ শেষ না করে বের হবেনা”

সঙ্গে সঙ্গে ওয়াসিফ মাথা ঘুরিয়ে তাকায় দোতালায়। বলে।

” তুই আছিস কি জন্য? এক কাপ চা করে দিয়ে যা”

ধারা স্পষ্ট করে জানায়।

” আমার পড়া আছে “
বলেই ধারা ঘরে ঢোকে, ওয়াসিফ ওর দিকে সরু চোখে তাকিয়ে বলে।

” ও আচ্ছা “

ততক্ষণে সোফা ছেড়ে ওয়াসিফ সোজা ওঠে দোতলায়। পেছনে কারো কদম পেতেই ধারা ঘুরে তাকায়। দেখে রুমে ওয়াসিফ এসেছে। ধারার পাশ থেকে আরেকটা চেয়ার ঘুরিয়ে মুখোমুখি বসতে বসতে ওয়াসিফ বলে।

” দেখি বই দে? কি পড়েছিস আর কি পড়ছিস হিসাব হয়ে যাবে “

ধারা কপালে সুক্ষ ভাজ ফেলে ওয়াসিফ কে দেখে। ওয়াসিফ একে একে ওর বইখাতা গুলো টেনে নিয়ে খুলছে, দেখছে, ঘাটছে। বুদ্ধিমতি ধারা বুঝতে পারে আজ আর ওর রক্ষা নেই। এই লোক এমন ভাবে একেকটা প্রশ্ন করে মাথা গুলিয়ে ফেলে যে মুখস্থ বা জানা উত্তরটাই ধারা ভুলে যায়। মনে মনে ধারা নিজেই নিজেকে বকাঝকা করে। এর থেকে তো ভালো এক কাপ চা করে দেওয়া ভালো ছিলো। কি মসিবতে পড়লো ও। ওয়াসিফ যখন পদার্থ বিজ্ঞান বইটা ঘেঁটে কিছু বলতে যাবে ওমনি ধারা মিনমিন করে বলে ওঠে।

” চা.. চা করে দি”?

ওয়াসিফ এক পলক তাকিয়ে আবার চোখ সরিয়ে বইতে রেখে বললো।

” তখন চেয়েছি, দিসনি, এখন লাগবে না”

ভেবেছিলো ওয়াসিফ রাজি হবে, যখন হলোনা ধারার মুখটা চুপসে এতটুকু হয়ে গেলো। ওয়াসিফ জিজ্ঞেস করে।

” এই চ্যাপটারের কতটুকু পড়েছিস? আর্কিমিডিসের সূত্র, ব্যাখ্যা এগুলো পড়েছিস”?

সাইন্সের অন্যসব সাবজেক্ট যেমন তেমন ধারা ভীষণ কাঁচা এই পদার্থ বিজ্ঞানে। কোনো রকম পড়ে টেনেটুনে পাস করার ইচ্ছে ওর। ওতো ব্যাখ্যা পড়ে হবে কি? ধারা কোনো কথা বলেনা। ওয়াসিফ ফের বলে।

” পড়েছিস? ধরবো এখান থেকে? আচ্ছাহ বল..’

ওয়াসিফের কথা শেষ হওয়ার আগেই ধারা ছটফটিয়ে বলে ওঠে..

” আমি ওয়াশরুমে যাবো”

ওয়াসিফ ওর দিকে তাকিয়ে সেকেন্ডের মাথায় বলে।

” আচ্ছা যা”

ধারা নিরবে লম্বা দম ফেলে চেয়ার ছেড়ে ওঠে। এই যাত্রায় বোধহয় ও বেঁচে গেলো..

চলবে

[ পর্ব ছোট হয়েছে বলে কেউ অভিযোগ করবেন না। আমি ভাই ব্যাচেলার মানুষ। পড়াশোনার তাগিদে পরিবার থেকে দূরে থাকি। এই রমজানে রোজা রেখে নিজের বাজার করে রান্না করা, টিউশন করানো, নিজের পড়াশোনা সবকিছু সামলে লিখতে হয়। আপনারা যেহেতু আমার পাঠক, আমার গল্প পড়েন, সেই হিসেবে আমার সুবিধা-অসুবিধাগুলো বুঝতে হবে।

যে বা যারা গল্প পড়ছেন অবশ্য রেসপন্স করবেন। কমেন্ট করবেন ]

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply