মেজর_শিকদার-০৯
ঈশিতা_ইশা
(কপি নিষিদ্ধ। রিচেক দেইনি। পরে দিবো।)
…
“আপনি না সেদিন গেলেন। আজ আবার ঢাকায় এলেন কীভাবে?”
অনেকক্ষণ চুপ থাকার পর প্রশ্নটা করে বসে তৃণা।
“গাড়িতে করে গিয়েছিলাম আবার গাড়িতে করে এসেছি।”
“আমি তা জানতে চাইনি।”
ড্রাইভিং করা অবস্থায় রওনক তার দিকে তাকায়।
ভ্রু উঁচিয়ে প্রশ্ন করে,
“তাহলে কী জানতে চাইছো?”
ঢোক গিলে তৃণা উত্তর দেয়,
“আপনার হঠাৎ উপস্থিতির কোনো বিশেষ জারণ আছে কিনা তা জানতে চাই।”
রওনকের মুখোবয় কোমল হয়। খানিকটা হাসে সে।
চোখ সরিয়ে জবাব দেয়,
“বিশেষ কারণ আছে আবার নেই।”
তৃণা ভ্রু কুঁচকে তাকায়।
“এটা কেমন উত্তর?”
রওনক সামান্য হাসে।
“যে কারণ বললে তুমি বিশ্বাস করবে না—সেটা আছে। আর যে কারণ তুমি শুনতে চাও—সেটা নেই।”
তৃণা চুপ করে যায়। কথাটা স্বাভাবিক ভাবে বলা হলেও ভেতরে কোথাও গিয়ে লাগে।
গাড়ি ধীরে ধীরে এগোচ্ছে। সূর্যের ক্ষীণ আলো জানালার কাঁচে লম্বা দাগ কেটে যাচ্ছে। তৃণা আঙুল দিয়ে সিটের সেলাইয়ের ওপর অকারণে রেখা আঁকে।
“আমি কি কিছু ভুল করেছি?”
নিচু স্বরে প্রশ্নটা করে।
রওনক সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দেয় না। কয়েক সেকেন্ড চুপ থাকে। শুধু গাড়ির শব্দ শোনা যায়।
তারপর বলে,
“না।”
ফট করে তৃণার মুখ থেকে অদ্ভুত এক প্রশ্ন বের হয়।
“তাহলে দূরে থাকেন কেনো?”
প্রশ্নটা করেই এক হাত দিয়ে নিজের মুখ চেপে ধরে মেয়েটা।
রওনক এবার গাড়ির গতি একটু কমায়। সামনে প্রায় ফাঁকা রাস্তা। তৃণার দিকে এক পলক তাকিয়ে উত্তর দেয়,
“দূরে থাকি না। তোমার ভুল ধারণা।”
“থাকেন।”
“নিজেকে সামলাই।”
রওনকের এই স্বীকারোক্তিটা অপ্রত্যাশিত।
তৃণা তাকিয়ে থাকে তার দিকে। এমন উত্তর সে প্রত্যাশা করেনি।
মেয়েটা ফিরতি প্রশ্ন করে,
“আমার জন্য?”
রওনক এবার চোখ ফেরায় না। সামনে তাকিয়েই বলে,
“নিজের জন্য। আর হয়তো তোমার জন্যও।”
তৃণার বুকটা হালকা কেঁপে ওঠে।
“আমি কী এতটাই কঠিন?”
“তুমি কঠিন না।”
রওনকের কণ্ঠ নরম হয়।
“তুমি খুব সহজ। তুমি বর্ষায় ঝরা প্রথম বৃষ্টির ন্যায় শীতল। যেই শীতলতায় ভিজলে মাদকতায় জড়িয়ে যাওয়ার প্রবল আশংকা রয়েছে।”
লোকটার কথা শুনে তৃণা থ হয়ে যায়। তার স্থানে অন্য কেউ হলে পরবর্তী প্রশ্নটা হয়তো করতো না কিন্তু সে করে বসে।
“সেটা সমস্যা? তাই দূরে দূরে থাকেন?”
“সমস্যা না তবে সহজ জিনিস ভাঙলে শব্দ বেশি হয়। আমি তোমায় ভাঙতে চাই না।”
গাড়ির ভেতর নীরবতা নেমে আসে।
তৃণা ধীরে জানালার বাইরে তাকায়। তার চোখে আলো পড়ে আবার সরে যায়।
কিছুক্ষণ পর সে খুব ধীরে বলে,
“আপনি চলে যাওয়ার পর বাসাটা ফাঁকা লাগছে।”
রওনকের হাত স্টিয়ারিংয়ে শক্ত হয়ে আসে।
কিন্তু সে কিছু বলে না।
তৃণা যোগ করে,
“রিশান আপনাকে খোঁজে। সবাই খুব মিস করে আপনাকে।”
এবার রওনক তাকায়।
প্রশ্ন করে,
“শুধু রিশান?”
প্রশ্নটা খুব সহজ। কিন্তু সরাসরি। তৃণার গলা শুকিয়ে যায়। সে উত্তর দেয় না। লোকটা এভাবে সরাসরি প্রশ্ন করে তাকে বিভ্রান্ত করবে ভাবেনি সে।
গাড়ি একসময় শহরের ভিড় ছেড়ে অপেক্ষাকৃত নিরিবিলি এলাকায় ঢোকে। রাস্তার পাশে বিশাল বড়ো বড়ো গাছ।
রওনক হঠাৎ বলে,
“তুমি কি আমার সাথে স্বাভাবিক থাকতে পারো?”
তৃণা অবাক হয়।
“মানে?”
“ভয় ছাড়া। ভাবনা ছাড়া। শুধু..”
কয়েক মূহুর্ত চুপ থেকে যোগ করে,
“শুধু পাশে থাকা। পারবে থাকতে?”
তৃণা কিছুক্ষণ চুপ থাকে।
তারপর ধীরে বলে,
“চেষ্টা করবো।”
রওনক মাথা নাড়ে।
“চেষ্টা না।”
একটু থামে।
“আমার পাশে থাকলে অভিনয় করতে পারবে না। স্বাভাবিক ভাবে থাকতে হবে। কোনো ভনিতা করতে পারবা না।”
তৃণা নিঃশ্বাস নেয়।
“ঠিক আছে। তাহলে একটা প্রশ্ন করবো?”
“করো।”
“আপনি আজ আমাকে নিতে এলেন..দায়িত্ব থেকে? নাকি..”
কথা শেষ করে না।
রওনক উৎসুকভাবে বলে,
“নাকি কী?”
নিচু স্বরে তৃণা জবাব দেয়,
“নাকি ইচ্ছে থেকে?”
রওনক এবার সরাসরি তাকায় তার দিকে।
চোখে সেই স্থিরতা, কিন্তু স্বর অনেক নরম।
সে জবাব দেয়,
“ইচ্ছে থেকে।”
শব্দটা খুব ধীরে বলা, তবু গাড়ির ভেতর স্পষ্ট শোনা যায়।
তৃণার বুকের ভেতর ধুকপুকানি বেড়ে যায়।
রওনক আবার সামনে তাকায়।
গাড়ি ধীরে একটি নিরিবিলি লেনের দিকে মোড় নেয়।
তৃণা কেমন ঘোরের মাঝে চলে যায়। সব কিছু কপমন এলোমেলো লাগছে তার। কতটা সময় চলে গেছে গাড়ির ভেতর তা টের পায়নি সে। ঘোর ভাঙে গাড়ি থামলে।
তৃণা আশেপাশে তাকলে দেখে তাদের গাড়ি এক দো-তলা বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে। আশেপাশে গ্রামীণ পরিবেশ।
রওনক ড্রাইভিং সিটে বসে কাউকে কল লাগায়। তৃণা তার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে,
“আমরা কোথায় এলাম?”
রওনক ইশারায় তাকে দুই দেখায়। সে বুঝে নেয় দুই মিনিট পর সে তার প্রশ্নের উত্তর পাবে।
ফোন কানে দিয়ে রওনক অপরপাশের ব্যক্তিকে বলে,
“আমি বাসার নিচে। ওকে নিয়ে আসো।”
অপরপাশ থেকে কিছু বললে রওনকের কোমল চেহারায় বিরক্তিতে ছেয়ে যায়।
“আমি উপরে আসবো না। ওকে জলদি নিয়ে আসো।”
কথাটা বলে কল কেটে দেয় সে। আগামাথা কিছুই বুঝতে পারছে না তৃণা। দো-তলা বাড়িটার দিকে সে তাকিয়ে থাকে।
একটু পর দো-তলা বাড়ির প্রধান গেইট থেকে একজন রোগা পাতলা তরুণ বের হয়। তাকে রেখে রওনক গাড়ির দরজা খুলে। তৃণার দিকে তাকিয়ে বলে,
“তুমি বসো আমি কথা সেরে আসি। বের হবা না।”
তৃণা কিছু বলার পূর্বেই লোকটা গাড়ি হতে বেরিয়ে শব্দ করে দরজা বন্ধ করে দেয়।
তৃণা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে।
রওনক লম্বা পায়ে হেঁটে গেইটের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। রোগা-পাতলা ছেলেটা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। তার গায়ে ফ্যাকাসে টি-শার্ট, চোখে অস্বস্তি। দূর থেকে পুরো কথা শোনা না গেলেও শরীরের ভাষা স্পষ্ট বলে দিচ্ছে রওনক জেরা করছে।
তৃণার বুক ধুকপুক করতে থাকে।
রওনক নিচু স্বরে কিছু বলে। ছেলেটা মাথা নাড়ে। আবার কিছু ব্যাখ্যা দেয়।
হঠাৎ রওনকের কণ্ঠ একটু কঠিন হয়।
তৃণা স্পষ্ট শুনতে পায় না, কিন্তু ভঙ্গিতে বোঝা যায় কোনো বিষয়ে ছেলেটাকে সে সতর্ক করছে।
ছেলেটা রওনকের দিকে এবার সরাসরি তাকিয়ে কিছু বলে। তারপর রওনক তাকে গাড়ির দিকে ইশারা করলে সে ঘাড় ঘুরিয়ে একবার গাড়ির দিকে তাকায়। তৃণা তাড়াতাড়ি চোখ সরিয়ে নেয়।
তার মনে প্রশ্নের পর প্রশ্ন জমে ওঠে—
এখানে কেন? এই ছেলে কে? এখানে তাকে রওনক কেনো আনলো?
নানান প্রশ্নে জর্জরিত হয়ে যায় তৃণা। মস্তিষ্ক হাঁপিয়ে ওঠে এসব প্রশ্নের উত্তর বের করতে গিয়ে।
মিনিট দশেক রওনক আর ছেলের মাঝে কথা হয়। কথা বললে ভুল হবে৷ চলে বাক-বিতণ্ড।
বাক-বিতণ্ডা ধীরে ধীরে তীব্র হয়ে ওঠে।
হঠাৎ রওনক এক ধাপ এগিয়ে যায়। কিছু একটা বলে।
ছেলেটা চুপ করে তাকিয়ে থাকে।
তৃণার বুক ধড়ফড় করে ওঠে।
সে দরজার হ্যান্ডেলে হাত রাখে কিন্তু রওনকের বলা কথাটা মনে পড়ে। “বের হবা না।”
হাত ধীরে সরিয়ে নেয়।
গেটের ভেতর থেকে আরেকজন বের হয় এবার।
একজন বয়স্ক লোক। মুখ ভর্তি সাদা দাঁড়ি। গায়ে ধবধবে সাদা পাঞ্জাবী। মুখোবয় কঠিন। দেখে মনে হচ্ছে সহজে তিনি হাসেন না। তিনি এগিয়ে এসে দুজনের মাঝখানে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন।
রওনক সঙ্গে সঙ্গে পেছনে সরে যায়।
লোকটা কিছু বলে। রওনক মাথা নিচু করে ফেলে। খুব নরম স্বরে জবাব দেয় সে।
তারপর পকেট থেকে মোবাইল বের করে কিছু দেখায়। লোকটা আর ছেলেটা তা দেখে একে অপরের দিকে তাকায়।
বয়স্ক লোকটা হাত নেড়ে রওনককে যেতে বলে। সে জবাবে কিছু একটা বলে ঘুরে গাড়ির দিকে হাঁটে।
গাড়ির দরজা খুলে বসে সে। তখনো দু’জন গেটের সামনে দাঁড়িয়ে। বিরক্তি নিয়ে ইঞ্জিন স্টার্ট দেয় রওনক।
তৃণা ধীরে বলে জিজ্ঞেস করে, “কী হয়েছে?”
“কিছু না।”
তৃণা চুপ থাকে।
তার চোখ এখনো গেটের দিকে—যেখানে বয়স্ক লোকটা দাঁড়িয়ে আছে। ছেলেটা ভেতরে চলে গেছে।
গাড়ি ঘুরিয়ে নেয়। ধীরে রাস্তায় ওঠে।
গাড়ির ভেতরের লুকিং মিররে একবার চোখ রাখে রওনক। গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বয়স্ক লোকটা এখনো স্থির। তারপর আর সে তাকায় না।
স্টিয়ারিংয়ে তার আঙুলের চাপ গাঢ় হয়।
চোয়াল শক্ত। বাড়ে গাড়ির গতি।
তৃণা বুঝতে পারে লোকটা রেগে আছে। কি করবে বুঝতে পারছে না সে।
গাড়ির ভেতর ভারী নীরবতা নেমে আসে।
কিছুক্ষণ পর তৃণা খুব আস্তে জিজ্ঞেস করে,
“ওরা কারা?”
রাস্তা থেকে রওনক চোখ না সরিয়েই বলে,
“কেউ না।”
তৃণা আর কিছু বলে না।
জানালার বাইরে তাকায়। বিকেলের আলো ম্লান হয়ে আসছে ধীরে ধীরে।
হঠাৎ বাতাসের গতি বদলে যায়।
আকাশে মেঘ ঘন হয়ে আসে।
তৃণা জানালার কাচ নামিয়ে দেয়। ঠান্ডা হাওয়া মুখে লাগে। কয়েকটা সাইনবোর্ড পড়ে সে নিশ্চিত হয় তারা এখন সাভারে।
চোখ ঘুরিয়ে রওনকের দিকে তাকাতে চায় কিন্তু সাহস পায় না। লোকটার ভেতরে কী চলছে তা বোঝা অসম্ভব।
প্রায় বিশ মিনিট গাড়ি চলে নীরবতায়।
হঠাৎ উইন্ডশিল্ডে টুপ করে একটা জলের ফোঁটা পড়ে। তারপর আরেকটা। এরপরই শুরু হয় বৃষ্টি।
প্রথমে ঝিরঝির, তারপর দ্রুত ঘন হয়ে আসে।
ওয়াইপার চলতে শুরু করে।
রাস্তায় প্রচন্ড জ্যাম। জ্যামের মধ্যে বসে থাকতে থাকতে রওনক আরও বিরক্ত হয়। গাড়ি ঘোরায় সে। একসময় পাকা রাস্তা ছেড়ে গাড়ি ঢুকে যায় লম্বা গাছঘেরা পথে।
রাস্তার পাশে ছোট বড়ো গাছ, দূরে সারি সারি তালগাছ। মাঝে মাঝে ছোট টং দোকান যেখানে হলুদ আলো জ্বলে উঠতে শুরু করেছে। শহরের কোলাহল শব্দ নেই, শুধু দূরের বাতাস আর চলন্ত গাড়ির মৃদু শব্দ।
তৃণা ভ্রু কুঁচকে চারপাশ দেখে।
“আমরা কোথায় যাচ্ছি?”
রওনক সামনে তাকিয়েই উত্তর দেয়,
“শান্ত স্থানে।”
বৃষ্টি ক্রমে বাড়ছে।
গাড়ির ছাদে টুপটাপ শব্দ।
তৃণা আর কিছু জিজ্ঞেস করে না।
তবে নিশ্চিত তারা বাড়ির দিকে যাচ্ছে না।
কিছুক্ষণ বাদে সামনে দেখা যায় বিশাল কাঠের গেইট। বৃষ্টির মধ্যে আলো ঝাপসা। গাড়ি এসে সেখানে থামে। বাহিরে থাকা সাইনবোর্ড লেখা “ইডেন গার্ডেন রিসোর্ট।”
দু’জন দারোয়ান ছাতা মাথায় দৌড়ে এসে গেইট খুলে দেয়। গাড়ি ধীরে রিসোর্টের ভেতরে ঢোকে।
ভেতরে ঢুকতেই পরিবেশ বদলে যায়।
সবুজে ঘেরা জায়গা। এমন বৃষ্টিতে চারপাশটা কেমন মন মুগ্ধকর লাগছে।
দারোয়ান পার্কিং দেখিয়ে দেয়। গাড়ি সেখানেই থামে।
ইঞ্জিন বন্ধ হয়। কিন্তু কেউ নামে না।
বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি। কাচের ওপারে শুধু জলরেখা।
রওনক দুই হাত স্টিয়ারিংয়ে রেখেই বসে থাকে। চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস নেয়।
তৃণা তাকিয়ে থাকে তার দিকে।
এত কাছে বসে থেকেও আজ লোকটাকে অচেনা লাগে।
বজ্রপাতের আলো এক মুহূর্তের জন্য গাড়ির ভেতর আলোকিত করে দেয় দুজনকে।
একটু পর দারোয়ান এসে দরজায় নক করে। চোখ মেলে গাড়ির কাচ নামায় সে।
দারোয়ান প্রশ্ন করে,
“আপনাদের ট্রলি নামানো লাগবে?”
রওনক উত্তর দেয়,
“না।”
“কিছু লাগবে স্যার?”
“ছাতা হলে ভালো হয়।”
মাথা নাড়িয়ে দারোয়ান চলে যায়। রওনক ঘাড় হালকা ঘুরিয়ে তৃণার দিকে দৃষ্টি রাখে। মেয়েটা বাহিরে তাকিয়ে বৃষ্টি দেখায় মগ্ন।
ছাতা সহ দারোয়ান ফেরত আসে। বেশি বড়ো না মাঝারি আকৃতির ছাতা। দু’জন অনায়াসে যেতে পারবে এমন না।
মানিব্যাগ থেকে একশত টাকার একটা নোট বের করে লোকটার হাতে দিয়ে ছাতাটা নেয়। দারোয়ান খুশি হয় তাকে সালাম দিয়ে বিদায় হয়।
কিছুক্ষণ পর রওনক দরজা খুলে নামে।
মুহূর্তেই বৃষ্টিতে ভিজে যায় সে। ছাতা মেলে গাড়ির দরজা বন্ধ করে।
ঘুরে এসে গাড়ির দরজার পাশে দাঁড়িয়ে তৃণার দিকে তাকায়। গাড়ির দরজা খুলেসে বলে,
“নামো।”
তৃণা কয়েক সেকেন্ড স্থির বসে থাকে।
তৃণা কয়েক সেকেন্ড স্থির বসে থাকে।
তারপর ধীরে নেমে আসে গাড়ি থেকে।
ছাতাটা মাঝখানে ধরে দাঁড়িয়ে থাকে রওনক। কিন্তু তবুও বৃষ্টির তীব্রতায় দুজনেই ভিজে যায় মুহূর্তে।
রওনক কোনো কথা বলে না। শুধু একবার তাকিয়ে দেখে তৃণাকে দেখে তারপর দ্রুত পায়ে রিসোর্টের মূল ভবনের দিকে হাঁটে।
লবির সামনে পৌঁছাতেই ছাতার আড়াল থেকেও ভিজে যায় দুজন। ভেতরে ঢুকতেই উষ্ণ আলো আর শুকনো বাতাস গায়ে লাগে। শীতল হাওয়া ছুঁতেই তৃণা মৃদু কেঁপে ওঠে।
সোফার দিকে ইশারা করে রওনক নিচু স্বরে বলে,
“তুমি বসো। আমি রুম আছে কিনা দেখে আসি।”
মাথা হালকা নাড়িয়ে তৃণা চুপচাপ সোফায় গিয়ে বসে। ভেজা ওড়না চেপে ধরে। চারপাশে অচেনা পরিবেশ।
রওনক রিসেপশনের দিকে এগিয়ে যায়।
রিসেপশনে বসা মেয়েটা ভদ্র হাসি দেয়।
“জি স্যার? হাউ ক্যান আই হেল্প ইউ?”
“একটা রুম লাগবে।”
“বুকিং ছিলো?”
“না।”
“তাহলে দেখছি।”
মেয়েটা কম্পিউটারের দিকে তাকিয়ে কয়েক মুহূর্ত টাইপ করে। তারপর মুখ তুলে দুঃখিত স্বরে বলে,
“সরি স্যার। আজকে সব রুম বুকড।”
রওনকের মুখ শক্ত হয়ে যায়।
সে কিছু বলার আগেই পেছন দিক থেকে দ্রুত পায়ে একজন এগিয়ে আসে।
“স্যার! আপনি?”
রওনক তাকায়। ভালো করে তাকালে বুঝতে পারে লোকটাকে চেনে সে। কোনো এক সময় সাহায্য করেছিলো।
ম্যানেজার হালকা হাসি নিয়ে বলে,
“হঠাৎ এখানে?”
রওনক সংক্ষিপ্ত স্বরে জবাব দেয়,
“বৃষ্টির কারণে এদিকে আসা।”
ম্যানেজার মাথা নাড়ে।
“রুম লাগবে?”
“জি।”
“সিঙ্গেল নাকি ডাবল বেডের?”
“ডাবল বেডের। সাথে মিসেস আছে।”
ম্যানেজারের দৃষ্টি স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই সোফার দিকে যায় যেখানে তৃণা বসে আছে।
তৃণা সঙ্গে সঙ্গে চোখ নামিয়ে ফেলে। বুকের ভেতর অকারণ টান লাগে।
ম্যানেজার আবার রওনকের দিকে তাকায়।
“ডাবল বেডের রুম তো সব বুকড স্যার..”
রওনক বলে,
“একটা রাত থাকবো; জাস্ট।”
ম্যানেজার একটু ভেবে বলে,
“আপনি এক মিনিট বসুন। দেখি কী করা যায়।”
রওনক মাথা নাড়িয়ে ফিরে আসে।
তৃণা তখন উঠে দাঁড়িয়েছে।
“রুম পেয়েছেন?”
“এখনো না।”
বৃষ্টি বাইরে আরও জোরে নামছে। লবির কাঁচে পানি ধাক্কা দিচ্ছে অবিরাম।
কিছুক্ষণ পর রিসেপশন থেকে ডাক আসে,
“স্যার?”
রওনক আবার এগিয়ে যায়। তৃণা দাঁড়িয়ে থাকে।
ম্যানেজার এবার নিচু স্বরে বলে,
“একটা রুম ফাঁকা আছে। গেস্ট আগামীকাল দুপুর বারোটায় আসবে। ততক্ষণ থাকতে পারবেন।”
রওনক মাথা নাড়ে।
“ঠিক আছে।”
সংক্ষিপ্ত পেপারওয়ার্ক সারে সে।
ম্যানেজার চাবি এগিয়ে দেয়।
রওনক সৌজন্য হেসে বলে,
“ধন্যবাদ।”
ম্যানেজার সাথে সাথে বলে,
“ধন্যবাদ বলে আমাকে ছোট করবেন না স্যার। আপনি ঐদিন সাহায্য না করলে আমি তো আজকে থাকতামই না।”
রওনক কথা সেরে ফিরে আসে।
তৃণার সামনে এসে থামে।
“চলো।”
দুজন পাশাপাশি হাঁটে করিডোর ধরে।
লিফটে ঢোকার আগে একবার তৃণার দিকে তাকায় রওনক।
লিফটের দরজা বন্ধ হয়ে যায়।
উপরে উঠতে উঠতে শুধু তাদের নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যায়। তৃণা ঢোক গিলে কাচুমাচু হয়ে আছে। রওনক তার পাশে বুক টানাটান করে দাঁড়িয়ে।
আজকের রাতটা সহজ হবে না—দুজনেই তা বুঝতে পারছে।
লিফটের দরজা খুলে গেলে রওনক প্রথমে বের হয়। পেছন পেছন তৃণা বের হয়।
চাবিতে লেখা রুম নং খুঁজতে শুরু করে। পেয়েও যায়।
করিডোরটা নরম হলুদ আলোয় ভাসছে। বাইরে বৃষ্টির শব্দ এখানে মৃদু প্রতিধ্বনির মতো শোনা যায়।
রওনক চাবিটা দরজায় ঢুকিয়ে একবার ঘোরায়। টিক শব্দে লক খুলে যায়।
সে দরজা খুলে সরে দাঁড়ায়।
“ভিতরে যাও।”
তৃণা এক মুহূর্ত থেমে থাকে তারপর ধীরে ভেতরে ঢোকে।
রুমটা বড়ো না, আবার ছোটও না। এক পাশে ডাবল বেড, সাদা চাদর টানটান। দেয়ালের পাশে কাঠের টেবিল, আলমারি, সোফা।
রওনক দরজা বন্ধ করে দেয়। ক্লিক শব্দটা অদ্ভুত স্পষ্ট শোনা যায়।,কিছুক্ষণ কেউ কথা বলে না।
তৃণা আঙুল দিয়ে চুলের ডগা থেকে পানি ঝরায়। শরীরটা ঠান্ডায় কাঁপছে, কিন্তু সে কিছু বলে না। জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়।
আলমারি খুললে সেখানে নতুন দুটো তোয়ালে দেখতে পায় রওনক। সেগুলো বের করে নেয় সে।
তৃণা তখনও জানালার দিকে তাকিয়ে।
বজ্রপাতের আলো এক ঝলক এসে তার মুখ আলোকিত করে। তার চোখে অদ্ভুত অস্থিরতা।
রওনক ধীরে বলে,
“চুল মুছে ফ্রেশ হয়ে নাও। বেশিক্ষণ ভেজা কাপড়ে থাকলে ঠান্ডা লাগবে।”
তৃণা তাকায় না। শুধু বলে,
“ঠিক আছি আমি।”
এগিয়ে এসে পেছনে দাঁড়ায় রওনক। কি মনে করে তৃণাও ঘুরে।
রওনকের চোখও সরাসরি তার চোখে। ধীরে ধীরে তাদের দৃষ্টি মিলে যায়। মুহূর্তটি স্থির হয়ে যায়। বৃষ্টির ফোঁটা জানালার কাচে পড়ে ঝকঝক শব্দ করছে, কিন্তু এই নীরবতার মাঝে সব কিছু স্তব্ধ।
দু’জন মানব হারিয়ে যায় একে অপরের দৃষ্টিতে। গ্রাস করে নেয় নীরবতা। যেই নীরবতার শুরু আছে, কোনো শেষ নেই।
…
(চলবে..)
(কিছুটা সময় দেরি হওয়ার জন্য আমি দুঃখিত। কেমন লাগলো জানাতে ভুলবেন না।)
Share On:
TAGS: ঈশিতা ইশা, মেজর শিকদার
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
মেজর শিকদার পর্ব ৫
-
মেজর শিকদার পর্ব ২
-
মেজর শিকদার পর্ব ৮
-
মেজর শিকদার পর্ব ৬
-
মেজর শিকদার গল্পের লিংক
-
মেজর শিকদার পর্ব ৪
-
মেজর শিকদার পর্ব ৭
-
মেজর শিকদার পর্ব ১
-
মেজর শিকদার পর্ব ৩