মেজর_শিকদার-০৮
ঈশিতা_ইশা
(কপি পোস্ট সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এটা বলার পরও নিলর্জ্জ চোরেরা কপি করে।)
…
ফোনটা ধীরে বালিশের পাশে রেখে তৃণা বিছানায় শুয়ে পড়ে। চোখ বন্ধ করলেও ঘুম আসে না। বুকের ভেতরটা কেমন অদ্ভুত উষ্ণতায় ভরে আছে।
পাশ ফিরে শুয়ে থাকা রিশানের দিকে তাকায়। ঘুমের ঘোরে ছেলেটা ঠোঁট বাঁকিয়ে কিছু একটা বলে, তারপর আবার নিশ্চুপ হয়ে যায়। তৃণা আলতো করে কমর্ফোটার ঠিক করে দেয়। ছেলেটা একদম বাপের কার্বন কপি। তার তাকানো, কথা বলার বাচন ভঙ্গি, হাঁটার ধরণ রওনকের মতো।
তৃণা রিশানের ছোট হাতের মাঝে নিজের আঙুল পুরে দেয়। চোখ বুজে থাকে।
কখন যে চোখ লেগে এসেছে, সে নিজেও টের পায় না।
পরদিন সকালটা শুরু হয় আগের মতোই ব্যস্ততায়। রিশানকে স্কুলে পাঠানো, নিজের ক্লাস। সবকিছু মিলিয়ে সময় যেন কীভাবে বয়ে যায় তা টের পায় না সে।
বিকেলের আলো ধীরে ধীরে নরম হয়ে এসেছে। বাগানের ঘাসে লম্বা ছায়া পড়েছে। আতিয়া শিকদার ধীর পায়ে হাঁটছেন। হাতে লাঠি, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। মুখে সেই চিরচেনা কঠোরতা, তবে শরীর কেমন ক্লান্ত লাগছে তার।
তৃণা ট্রেতে চায়ের কাপ নিয়ে এগিয়ে আসে। কয়েক পা দূরে দাঁড়িয়ে নরম গলায় বলে, “দাদুন, চা।”
আতিয়া শিকদার থেমে তাকান। কুঁচকে যাওয়া চোখে মাপেন তাকে।
“চা? আঁই চা খামু না।”
তৃণা থেমে যায়। তারপর ধীরে বলে,
“ঠিক আছে। তবে এখানে রেখে যাই?”
কোনো উত্তর আসে না। তিনি আবার হাঁটতে শুরু করেন।
তৃণা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর বাগানের একপাশে রাখা কাঠের ছোট টেবিলে কাপ রেখে চুপচাপ সরে যেতে উদ্যত হয়।
ঠিক তখনই পেছন থেকে ডাক আসে,
“এই মাইয়া।”
তৃণা ঘুরে দাঁড়ায়। “জি?”
“চা ঠান্ডা হইলে স্বাদ থাকে না; দে।”
তৃণার ঠোঁটে অজান্তেই মৃদু হাসি ফুটে ওঠে। ট্রে তুলে নিয়ে সে কাপ এগিয়ে দেয়।
আতিয়া শিকদার ধীরে চেয়ারে বসেন। কাপ হাতে নিয়ে প্রথমে গন্ধ নেন, তারপর ছোট চুমুক দেন। মুখে নিরপেক্ষ ভাব, কিন্তু দ্বিতীয় চুমুকটা একটু বড় হয়।
কিছুক্ষণ নীরবতা। তৃণা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। চলে গেলে যদি দাদুন রাগ করে! সেই ভয়ে নড়ছে না সে।
তারপর হঠাৎ প্রশ্ন,
“তোর বাপের বাড়ি কই?”
একটু চমকে তৃণা উত্তর দেয়,
“ঢাকাতেই। আজিমপুরে।”
“বাপে কী করে?”
“রিটায়ার্ড পুলিশ অফিসার। মা গৃহিণী।”
আতিয়া শিকদার মাথা নেড়ে আবার চুমুক দেন।
“তুই পড়াশোনা করিস?”
“মেডিকেলো পড়ছি।”
মেডিকেল শুনে আতিয়া শিকদার এর চোখ মুখের ভাজ শিথিল হয়। সে বোধ-হয় মোটেও এমন কিছু আশা করেনি।
নিজের গাম্ভীর্য ধরে রাখতে তিনি চোখ কুঁচকে তাকান।
“কয় ভাইবোন?”
“আমরা দুই বোন, এক ভাই।”
“তারা কী করে?”
“আপুর লেখাপড়া শেষ। ছোট ভাই এখন কলেজে পড়ে।”
সব শুনে আতিয়া শিকদার কিছু একটা ভাবেন এরপর জিজ্ঞেস করেন,
“ভাই-বোনের নাম কী?”
কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে তৃণা জবাব দেয়,
“বড়ো আপুর নাম তিন্নি। ছোট ভাই তমাল।”
কাপটা ঠোঁটের কাছে নিয়েই আতিয়া শিকদার থেমে যান। ধীরে কাপ নামিয়ে তাকান সরাসরি তৃণার চোখে।
“কী নাম কইলি?”
তৃণার বুক কেঁপে ওঠে।
“তিন্নি।”
আতিয়া শিকদারের কণ্ঠ ধীর কিন্তু ভারী হয়ে ওঠে,
“তিন্নি মানে ওই মাইয়া? বিয়া রাইখা যে..”
কথা শেষ করেন না তিনি। কিন্তু বাকিটা দুজনেই বোঝে।
তৃণার আঙুল ট্রের কিনারায় শক্ত হয়ে ওঠে। “জি, সে আমার বড়ো বোন।”
আতিয়া শিকদার এবার পুরোপুরি চেয়ারের পিঠে হেলান দেন। চোখে বিস্ময়।
“তাইলে কপালের লিখন এমনই আছিল।”
তিনি ধীরে চা খান। মুখের কঠোরতা আগের মতো থাকলেও স্বরটা আর ততটা ধারালো নয়।
তিনি অনেকক্ষণ কিছু বলেন না। দূরে খেলতে থাকা রিশানের দিকে তাকিয়ে থাকেন।
তারপর খুব ধীরে বলেন,
“সংসার করতে সাহস লাগে। তোর আছে?”
তৃণা মাথা তোলে।
“চেষ্টা করছি। সেই সাথে শিখছি।”
আতিয়া শিকদার সরাসরি তাকান।
“চেষ্টা না। মন লাগাইয়া কর।”
তৃণা নীরবে মাথা নাড়ে।
কাপটা টেবিলে রেখে তিনি বলেন,
“যা; এখন যা।”
তৃণা ট্রে তুলে নেয়। কয়েক পা হেঁটে আবার থামে।
পেছন থেকে ধীর স্বর আসে,
“চা ভালো আছিল।”
তৃণার ঠোঁটের ভাজ শিথিল হয়। সে কিছু না বলে চুপচাপ ভেতরে চলে যায়।
বাগানে বসে আতিয়া শিকদার দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।
“কপাল.. কপাল বড় জিনিস।”
.
সন্ধ্যা নেমেছে শহরের ওপর। আকাশে শেষ আলোটা মুছে গিয়ে চারদিকে হলুদ বাতির আভা। রাস্তার দুই পাশে দোকানগুলোতে লাইট জ্বলেছে, ধোঁয়া, হর্ন, মানুষের কোলাহলে গাঢ় হয়ে উঠেছে নগরের চেনা ব্যস্ততা।
নাবিলা রিকশায় বসে আছে। ওড়না সামলে ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে ছিল, কিন্তু নেটওয়ার্কের দোষে পেজ লোড হচ্ছে না। বিরক্ত হয়ে ফোনটা ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখে।
রিকশা হঠাৎ ঝাঁকুনি দিয়ে থেমে যায়।
সামনে লম্বা যানজট। বাসের ধোঁয়া এসে মুখে লাগে। রিকশাওয়ালা ঘাড় ঘুরিয়ে বলে,
“আপা একটু সময় লাগবো।”
নাবিলা বিরক্ত গলায় শুধু “হুঁ” বলে। তার আজ এমনিতেই মেজাজ ভালো নেই।
ঠিক তখনই পাশ ঘেঁষে একটা কালো বাইক এসে থামে। ইঞ্জিনের শব্দটা বেশ জোরে। নাবিলা একবার তাকিয়ে আবার মুখ ঘুরিয়ে নেয়।
বাইকটা কিন্তু সরে যায় না। বরং আরও একটু কাছে আসে।
নাবিলা ভ্রু কুঁচকে সামনে তাকিয়েই থাকে। এমন ভাব যেন পাশে কিছুই নেই।
কয়েক সেকেন্ড পর বাইকের ছেলেটা হেলমেটের কাচ তুলে বলে,
“এই ভরা সন্ধ্যায় কোথায় যাচ্ছেন, মিস?”
কণ্ঠটা শুনেই নাবিলা চমকে মাথা ঘুরিয়ে তাকায়।
লোকটা আর কেউ নয় রাহি! চোখে সেই চেনা দুষ্টু হাসি।
নাবিলা ঠোঁট শক্ত করে সোজা হয়ে বসে। “আপনাকে হিসাব দিতে হবে নাকি?”
রাহি ভ্রু তুলে তাকায়।
“ওহ, হিসাব না। চিন্তিত হলাম। শহরের অবস্থা তো জানেন। নিরাপত্তা ব্যবস্থা খুবই করুন। তাই একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে জিজ্ঞেস করলাম।”
নাবিলা শুষ্ক হাসি দেয়।
“আপনার চিন্তা আমার জন্য অপচয়।”
রাহি কাঁধ ঝাঁকায়।
“বেশ। তবুও বেয়াইন মানুষ, খোঁজ না নিলে হয় বলেন? পাঁচটা না দশটা না একটা মাত্র বেয়াইন আমার।”
“ভাবার জন্য থ্যাংকস।”
রাহি বাইক থেকে সামান্য ঝুঁকে বলে,
“তাহলে কোথায় যাচ্ছেন?”
“আপনাকে কেনো বলবো? আপনার কী দরকার?”
“দরকার নেই তবুও। ইসিবি যাচ্ছেন?”
নাবিলা চোখ সরু করে তাকায়।
“আপনি কী আমাকে ফলো করছেন?”
“ইচ্ছে করলে করতেই পারতাম। কিন্তু ইচ্ছে নেই।”
“করুন না। সময় কাটবে।”
পাশ দিয়ে একটা বাস হর্ন বাজিয়ে এগোয়। রিকশা একটু নড়ে আবার থামে।
রাহি হালকা হাসে।
“আপনার মেজাজ দেখছি খুব খারাপ।”
নাবিলা জবাব দেয় না।
সামনে গাড়ি একটু এগোয়। রিকশাওয়ালা প্যাডেল ঘোরাতে শুরু করে।
রাহি কাচ নামাতে নামাতে বলে,
“বেশি রাতে বাহিরে একলা ঘুরাঘুরি করবেন না।”
নাবিলা সঙ্গে সঙ্গে জবাব দেয়,
“আপনার চিন্তা করতে হবে না।”
রাহি ইঞ্জিন স্টার্ট দেয়। তারপর এক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকে।
“করলাম না।”
বাইকটা সামনে এগিয়ে যায়।
রিকশা ধীরে ধীরে জ্যাম পেরিয়ে এগিয়ে যায়। সন্ধ্যার আলো আরও ঘন হয়ে নামে শহরের ওপর।
.
সাতদিন পেরিয়ে গেছে ইতিমধ্যে।
তৃণা টেবিলে বসে এসাইনমেন্ট লিখছে। খাতা, বই, ল্যাপটপ সব ছড়িয়ে আছে সামনে। মনটা পুরোপুরি পড়ায় ডুবে ছিল।
হঠাৎ করিডোর থেকে কারো দৌড়ের শব্দ হয়।
তারপর রিশানের গলা পাওয়া যায়।
“তৃণ..বাঁচাও আমাকে।”
চমকে উঠে দাঁড়াতেই রিশান দৌড়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে। ছোট্ট বুকটা ধুকপুক করছে।
তৃণা ঝুঁকে তার কাঁধ ধরে।
“কী হয়েছে? কেউ বকেছে?”
রিশান মুখ গুঁজে বলে,
“আমি কিছু করিনি। সত্যি করিনি।”
ঠিক তখনই দরজার কাছে দাঁড়িয়ে যায় মাহি। দুহাতে কোমর চেপে, ভ্রু কুঁচকে।
“কিছু করিসনি?”
তার গলায় অবিশ্বাস।
তৃণা তাকায় মাহির দিকে।
“আরে কী হয়েছে বল তো?”
মাহি এক পা ভেতরে এসে বলে,
“তোর আদরের রিশান আমার লিপস্টিক দিয়ে দেয়ালে ছবি এঁকেছে। তাও আবার কী! এক বিশাল দাড়িওয়ালা মানুষ!”
রিশান ফিসফিস করে,
“ওটা সুপারহিরো।”
তৃণা ফিক করে হেসে দেয়।
“তৃণা তুই হাসছিস?”
“সরি।”
তৃণা ঠোঁট চেপে হাসি আটকায়। তারপর গম্ভীর হওয়ার চেষ্টা করে।
“রিশান, এটা কী ঠিক হয়েছে?”
রিশান ধীরে মুখ তোলে।
“আমি সুন্দর বানাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু লিপস্টিকটা পঁচা তাই ছবি সুন্দর হয়নি।”
মাহি হাত নেড়ে বলে,
“পঁচা? আমার নতুন লিপস্টিক! তুই আমার ম্যাকের লিপস্টিককে পঁচা বলছিস!”
তৃণা রিশানের কাঁধে হাত রাখে।
“মাফ চেয়েছো?”
রিশান চুপ।
তৃণা নরম গলায় বলে,
“ভুল করলে সরি বলতে হয়।”
কিছুক্ষণ চুপ থেকে রিশান মাথা নিচু করে বলে, “সরি মাহি।”
মাহির মুখ শক্তই থাকে, কিন্তু চোখ নরম হয়ে আসে। “দেয়ালটা কে পরিষ্কার করবে?”
রিশান তৃণার দিকে তাকায়।
তৃণা মৃদু হেসে বলে,
“আমরা দুজন মিলে পরিষ্কার করবো। ঠিক আছে?”
রিশান মাথা নাড়ে।
মাহি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিছানায় বসে।
“আচ্ছা ঠিক আছে কিন্তু পরের বার আমার জিনিসে হাত দিলে..”
রিশান তাড়াতাড়ি বলে,
“আর ধরবো না।”
“মনে থাকে যেনো।”
রিশান জবাব না দিয়ে ছুটে চলে যায়।
মাহি এবার তৃণার খাতার দিকে তাকায়।
“কী পড়ছিস?”
“এসাইনমেন্ট। কাল জমা দিতে হবে।”
“কাল ক্লাস শেষে আমার জন্য অপেক্ষা করিস তো।”
তৃণা তাকায়।
জিজ্ঞেস করে,
“কেনো?”
“অনেকদিন ঘুরতে যাই না৷ তুই আর আমি কালকে ঘুমবো। শাড়ি পরবি?”
মুখ কালো কটে তৃণা জবাব দেয়,
“ক্লাস করে কূল পাই না আবার শাড়ি। তুই তাহলে ক্লাস সেরে মেডিকেলের সামনে এসে কল দিস।”
“ঠিকাছে।”
তৃণা চেয়ারে গিয়ে বসে। মাহি রুমের চারদিকে তাকায়। এরপর প্রশ্ন করে,
“ভাইয়ার সাথে তোর কথা হয়?”
“হয়েছিলো কিছুদিন পূর্বে। এরপর আর তার খবর নেই।”
“বোধহয় ব্যস্ত আছে। তুই কল দিয়েছিলি?”
“না।”
“ঠিক আছে থাক আমি গেলাম।”
মাহি উঠে চলে যায়। তৃণা আবারো ব্যস্ত হয়ে যায় নিজের পড়ায়।
.
তৃণার আজ টানা তিনটা ক্লাস ছিল।
সকালের ক্লাস শেষ হতে হতে দুপুর গড়িয়ে গেছে।
ক্লাস শেষ হতেই তৃণা ব্যাগ কাঁধে নিয়ে করিডোর দিয়ে বের হয়। দুপুরের রোদ জানালা দিয়ে এসে মেঝেতে সাদা আলো ফেলে রেখেছে। মেডিকেল কলেজের একাডেমিক ভবনের করিডোরে হালকা জীবাণুনাশকের গন্ধ। ওড়না দিয়ে নাক মুখ চেপে ধরে সে। এ গন্ধ তার সহ্য হয় না।
পেছন থেকে কেউ ডাক দেয়,
“তৃণা, এক মিনিট।”
সে ঘুরে দেখে তার ক্লাসমেট সৌভিক। সাদা অ্যাপ্রন পরমে, হাতে নোটবুক।
“হ্যাঁ বলো।”
আরিফ একটু হাঁটতে হাঁটতে পাশে এসে দাঁড়ায়।
“ফিজিওলজির যে গ্রাফটা স্যার দেখালেন। প্রেশার–ভলিউম লুপ। তোমার নোটটা একবার দেখাবে? আমারটা একটু মিস হয়েছে।”
তৃণা ব্যাগ খুলে খাতা বের করে দেয়।
“এইটা। তবে কালকে লাইব্রেরিতে রিভাইজ করবো ভাবছি।”
আরিফ পাতা উল্টাতে উল্টাতে বলে,
“তুমি সবকিছু এত গুছিয়ে লিখো কীভাবে!”
তৃণা হালকা হাসে।
“গুছিয়ে না লিখলে বুঝতে পারি না।”
দুজন ধীরে ধীরে একসাথে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামে। চারপাশে ছাত্রছাত্রীদের ভিড়। যার যার মতো হেঁটে চলেছে।
সৌভিক প্রশ্ন করে,
“এখন কি বাসায় যাবা?”
তৃণা এক কথায় জবাব দেয়,
“হ্যা।”
ঠিক তখনই পেছন থেকে গভীর, স্থির এক কণ্ঠ ভেসে আসে,
“তৃণলতা।”
শব্দটা যেন সময় থামিয়ে দেয়।
তৃণার পা থেমে যায়। বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। সে ধীরে পেছন ফিরে তাকায়।
এক মুহূর্তের জন্য মনে হয় ভ্রম। করিডোরের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে রওনক। প্রচন্ড অবাক হয় সে।
গাঢ় নেভি ব্লু ফরমাল শার্ট, হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো। শার্টটা নিখুঁতভাবে টাক করা। চারকোল গ্রে প্যান্ট। সাথে কালো লেদারের বেল্ট। পায়ে পালিশ করা জুতো। কব্জিতে স্টিল স্ট্র্যাপের ঘড়ি।
চুল আগের মতোই ছোট করে ছাঁটা, মুখে হালকা দাড়ির রেখা। চোখে সেই একই স্থিরতা।
দীর্ঘদেহী, সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মুখে ক্লান্তির রেখা আছে, কিন্তু চোখ সরাসরি তার দিকে।
এতো মানুষের মাঝে তিনি যেন এখানে আলাদা করে দৃশ্যমান। তৃণার মনে হয় এই মানুষটাকে সে নতুন করে দেখছে।
এক মুহূর্তের জন্য মনে হয় সত্যি না। এখানে তিনি কেন আসবেন! তিনি তো ডিউটিতে!
করিডোরের ভিড় যেন ধীরে ধীরে স্তব্ধ হয়ে যায় তৃণার কাছে। চারপাশের শব্দ ম্লান হয়ে আসে।
আরিফ অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে।
“তুমি চেনো?”
তৃণা কোনো উত্তর দিতে পারে না।
তার আঙুল খাতার ওপর শক্ত হয়ে আছে। বুকের ভেতর অদ্ভুত এক ধুকপুকানি।
রওনক কয়েক পা এগিয়ে আসে। তৃণা সব কিছু গুলিয়ে ফেলে। রওনক থামে তার সামনে এসে।
গভীর, নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করে,
“ক্লাস শেষ?”
তৃণার গলা শুকিয়ে আসে। সে মাথা নাড়ে।
করিডোর দিয়ে মানুষ চলাচল করছে, তবু তাদের চারপাশে যেন শব্দ কমে গেছে।
রওনকের চোখে ক্লান্তি আছে, কিন্তু দৃষ্টি নরম। যেন কিছু বলতে চেয়েও আটকে রাখছেন।
তৃণার বুকের ভেতরটা ধীরে ধীরে ভারী হয়ে ওঠে।
সে খেয়াল করে, রওনকের শার্টের হাতার ভাঁজে সূক্ষ্ম কুঁচকানো দাগ। যেন অনেকক্ষণ বসে ছিলেন, অথবা দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এসেছেন।
রওনক আবার বলে,
“চলো তাহলে।”
তৃণা বলে,
“আসলে এখনো..”
কথা শেষ করার পূর্বে রওনক বলে,
“সময় চলে যাচ্ছে, চলো।”
তৃণা একপলক সৌভিকের দিকে তাকায় এরপর নিজের নোটটা তাকে দিয়ে হাঁটা দেয়। রওনক তার পেছন পেছন হাঁটে।
মস্তিষ্কে হাজারো প্রশ্ন নিয়ে গাড়িতে এসে উঠে বসে তৃণা।
লোকটা কী বাসা থেকে সোজা এখানে এসেছে? নইলে গাড়ি কোথায় পেলো?
ড্রাইভিং সিট এ বসে সিটবেল্ট লাগিয়ে নেয় সে। তৃণা ইচ্ছে করে সিটবেল্ট আটকাচ্ছে না এমন ভান করে।
“সিটবেল্টটা পরে নাও।”
তৃণা বলে,
“হচ্ছে না।”
রওনক একবার তার দিকে তাকায়। তাকানোটা দীর্ঘ না, তবু এমন যে তৃণার বুক ধুকপুক করে ওঠে।
“হচ্ছে না?”
তৃণা আরও ব্যস্ত মুখ করে বেল্টটা টানাটানি করে।
“লকটাই নষ্ট মনে হয়।”
রওনক ইঞ্জিন স্টার্ট দেয় না। কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ বসে থাকে। তারপর শরীর সামান্য ঘুরিয়ে তার দিকে ঝুঁকে আসে। তৃণার নিঃশ্বাস আটকে যায়।
গাড়ির ভেতর হালকা ফ্রেশনারের গন্ধ, সাথে তার পরিচিত সেই সংযত পুরুষালি গন্ধটা মিশে যায়। রওনকের হাত খুব কাছে দিয়ে বেল্টটা নেয়। তার আঙুল ছুঁয়ে যায় তৃণার কাঁধের কাছে কাপড়ের প্রান্ত।
“দাও।”
তৃণা আর কিছু বলে না।
রওনক বেল্টটা টেনে এনে একটানে ক্লিক করে লাগিয়ে দেয়। তার হাত সরিয়ে নিতে এক মুহূর্ত দেরি করে না।
সরে বলে,
“হয়েছে।”
তৃণা নিচের দিকে তাকিয়ে থাকে।
“আমি পারতাম।”
“জানি।”
রওনক গাড়ি স্টার্ট দেয়।
ধীরে ধীরে গাড়ি চলতে শুরু করে। গন্তব্য অজানা তবে তৃণার ভীষণ ভালো লাগছে। সে চোখ তুলে রওনকের দিকে তাকিয়ে থাকে। লোকটা মনোযোগ দিয়ে ড্রাইভিং করছে।
এক ফাঁকে চোখ সরিয়ে তাকায়। মৃদু হাসি দেয়। লজ্জায় সাথে সাথে তৃণা দৃষ্টি সরিয়ে ফেলে।
রওনক আবার সামনে তাকায়। কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা ক্ষীণ হাসিটা আর মিলায় না।
গাড়ির ভেতর নরম নীরবতা। তৃণার মনে হচ্ছে গাড়িটা এগোচ্ছে, অথচ সময় যেন ধীরে ধীরে থেমে আছে।
হঠাৎ রওনক বলে,
“এভাবে তাকিয়ে থাকলে ড্রাইভিংয়ে সমস্যা হয়।”
তৃণা থতমত খেয়ে যায়।
“আমি তাকাইনি তো।”
“আচ্ছা।”
শব্দটা শুনে বোঝা যায় সে বিশ্বাস করেনি।
তৃণা জানালার দিকে মুখ ঘুরিয়ে দেয়। কিন্তু নিজের অজান্তেই ঠোঁটে হাসি লেগে থাকে।
…
(চলবে..)
(কোথাও বানান ভুল হলে বলবেন পরে ঠিক করে দিবো। কেমন লেগেছে কমেন্টে জানাতে ভুলবেন না।)
Share On:
TAGS: ঈশিতা ইশা, মেজর শিকদার
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
মেজর শিকদার পর্ব ৩
-
মেজর শিকদার পর্ব ১
-
মেজর শিকদার পর্ব ৭
-
মেজর শিকদার পর্ব ৫
-
মেজর শিকদার পর্ব ৪
-
মেজর শিকদার পর্ব ২
-
মেজর শিকদার পর্ব ৬
-
মেজর শিকদার গল্পের লিংক