Golpo ডিফেন্স রিলেটেড মেজর শিকদার

মেজর শিকদার পর্ব ৭


মেজর_শিকদার-০৭

ঈশিতা_ইশা

(কপি পোস্ট কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।)

চারিদিকে মাগরিবের আজান প্রতিধ্বনি হচ্ছে। ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নামছে ধরণীর বুকে।

রওনক চলে গেছে ইতিমধ্যে ঘন্টা খানেক পেরিয়ে গেছে। তৃণার জামা কাপড় লাগেজ থেকে বের করে বিছানায় রাখা। মাহি সেগুলো ভাজ করে এক পাশে রাখছে। তৃণা কাবাড ঝেরে কাপড় গুলো একে একে গুছিয়ে রাখতে শুরু করে। এমন সময় রিশান রুমে প্রবেশ করে।

“কিরে পন্ডিত এখানে তোর কী চাই?”

মাহির কথার পিঠে রওশান জবাব দেয়,
“চাচ্চু বাহিরে চলে গেছে। আমাকে নেয় না।”

মাহি মুখ ভেংচি দিয়ে বলে,
“এই জন্য চলে এসেছিস আমাদের জ্বালাতে? তখন ডাকলাম আসলি না তো। চাচ্চু..চাচ্চু করে রাহির পেছনে ছুটলি।”

রিশান তাকে জড়িয়ে বলে,
“সরি মাহি। আর করবো না। ইউ নো আই লাভ ইউ মাহি।”

“এহ্! চাচ্চু পাত্তা না দিলে তখন মাহির কাছে আসিস।”

তৃণা কাপড় রাখছে আর দুজনের কান্ড দেখে মুচকি মুচকি হাসছে।

মাহি রিশানের দুই হাত ধরে তাকে সামনে দাঁড় করায়।
বলে,
“রাহিকে চাচ্চু ডাকিস আর আমাকে মাহি..কেনো?”

রিশান ফট করে জবাব দেয়,
“কারণ তোর নাম মাহি।”

“কী বললি?”

“মাহি..মাহি..মাহি..”

রিশান মাহির হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে ছুটে আর তার নাম ধরে ডাকতে শুরু করে। মাহিও তার পেছনে ছুটে।

“তবে রে! আজকে তোকে খালি ধরি তারপর দেখাচ্ছি।”

রিশান গিয়ে তৃণার পেছনে লুকায়।

“তৃণ বাঁচাও আমাকে।”

তৃণা ঘুরতেই মাহি বলে,
“তুই সর। ওর পাকনামী আমি আজকে ছুটাবো।”

তৃণা হাসতে হাসতে বলে,
“আরে আগে আমাকে সব গুছাতে তো দে..”

এমন সময় দরজায় কেউ নক করে। তিনজনই থেমে যায়।

তৃণা দেখার জন্য শাড়ির আঁচল টেনে দরজার দিকে হাঁটা দেয়। তার শাড়ি মুঠো করে রিশানও তার পেছন পেছন যায়। মাহি তাকে ধরতে গেলে সে দৌড়ে রুম থেকে পালায়।

দরজায় মহিলা সার্ভেন্ট দাঁড়িয়ে। তৃণাকে দেখে সে বলে,
“ম্যাম আপনাকে ডেকেছেন।”

মাহি পেছন থেকে জিজ্ঞেস করে,
“মম ডেকেছে?”

মাথা নিচু করে সার্ভেন্ট জবাব দেয়,
“জি।”

মাহি বলে,
“ঠিকাছে আপনি যান।”

সার্ভেন্ট যেতেই তৃণা ঘুরে বলে,
“আমি কী কিছু করেছি? এই সময় আমায় ডাকলো যে?”

মৃদু হেসে মাহি আশ্বস্ত করে তাকে।
“আরে না পাগলী। হয়তো কিছু বলার জন্য ডেকেছে। গিয়ে শুনে আয়। আমি ততক্ষণে তোর কাপড়গুলো কাবাডে রেখে দিচ্ছি।”

তৃণা নিশ্চিন্তের হাসি দেয়। বেস্ট ফ্রেন্ড ননদিনী হওয়াতে তার কত সুবিধা হচ্ছে। মাহির মতো ননদ ভাগ্য করে মানুষ পায়।

সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে বাড়িটার ভেতরের চেহারা বদলে যেতে থাকে।
বারান্দা, করিডর আর সিঁড়ির পাশে ঝুলে থাকা হলুদ আলোগুলো একে একে জ্বলে ওঠে। আলোয় রাঙিয়ে যায় সাদা দেয়াল, কাঠের রেলিং আর পুরোনো ফ্রেমে বাঁধানো ছবিগুলো।
ঘরের ভেতর আলোতে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

বাড়ির ভেতরের প্রতিটা কোণায় আলো–আঁধারের এক অদ্ভুত ভারসাম্য।

মাহিকে রুমে রেখে তৃণা এগিয়ে যায় সিঁড়ির বা দিকের করিডরের দিকে। সেদিকটায় তার শ্বশুর-শাশুড়ির কক্ষ। অবশ্য সকাল থেকে শ্বশুর মশাইকে দেখতে পায়নি। সে বোধ-হয় বাড়িতে নেই। রওনকের চলে যাওয়ার খারাপলাগা এমন ভাবে তাকে চেপে ধরেছিলো যে আশেপাশের কিছুই তেমন খেয়াল করেনি সে।

তৃণা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে এক মুহূর্ত দম নেয়। মাথায় দেওয়া ঘোমটা আরেকবার ঠিক করে। অকারণেই বুকের ভেতরটা কেমন করছে। এই ভরা সন্ধ্যাবেলায় তাকে কেনো ডাকলো সেটা ভেবেই দুশ্চিন্তা হচ্ছে তার। নিজেকে সামলে দরজায় টোকা দেয়।

“কে?”

তৃণা জবাব দেয়,
“আমি, তৃণা।”

ভেতর থেকে নরম স্বর ভেসে আসে,
“ভেতরে আসো।”

দরজা ঠেলে ঢোকে তৃণা।
রুমটায় কেমন নীরবতা বইছে। পর্দা টানা, বাতি জ্বলছে, এসি চলমান। মিসেস জান্নাত জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তৃণাকে দেখে ঘুরে তাকান।
“বসো।”

বলেই চেয়ারের দিকে ইশারা করেন।
তৃণা বসে। আঁচলটা আরও একটু গুছিয়ে নেয়। চোখ নামানোই থাকে।

কিছুক্ষণ নীরবতা বহে।
এই নীরবতাই তৃণার অস্বস্তি বাড়িয়ে দেয়।

মিসেস জান্নাত ধীরে প্রশ্ন করেন,
“ভয় পাচ্ছো?”

তৃণা চমকে তাকায়।
মিথ্যে বলতে পারে না। মাথা নিচু করেই জবাব দেয়,
“একটু।”

মিসেস জান্নাত মৃদু হাসেন।
“আমি জানতাম। হঠাৎ করে এত কিছু..সামলানো কঠিন।”

তিনি চেয়ার টেনে তৃণার সামনে বসেন। গলার স্বর আরও নরম হয়ে আসে।
“রওনকের দাদুন একটু কড়া। মুখে যা বলেন, তার অর্ধেকেরও কম মনে থাকে তার। তাছাড়া বয়স হয়েছে অনেক কিছুই বলবেন, সে-সব মনে রাখার প্রয়োজন নেই।”

তৃণা সাহস করে প্রশ্ন করে,
“দাদুন..আমাকে মেনে নেবেন তো?”

মিসেস জান্নাত এক মুহূর্ত চুপ থাকেন। তারপর নিশ্চিত কণ্ঠে বলেন,
“নেবেন। কারণ রওনক যাকে নিজের বলে মেনেছে, তাকে রওনকের দাদুন কখনোই অস্বীকার করেন না।”

শেষের কথাটা শুনে তৃণার মনে হলো তাকে মিসেস জান্নাত রওনকের প্রথম স্ত্রী’র বিষয়ে কিঞ্চিৎ নাড়া দিলেন। সে চোখ নামিয়ে ফেলে।

মিসেস জান্নাত সেটা লক্ষ করেন।
হালকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন,
“রওনককে বাইরে থেকে শক্ত মনে হয়। কিন্তু দায়িত্ব একবার নিলে.. সে কখনো পিছু হটে না।”

একটু থেমে যোগ করেন,
“তাছাড়া এই সংসারে তুমি একা না, তৃণা। অন্তত আমার পাশে পাবে। আর মাহি তো সকল পরিস্থিতিতে তোমার পাশেই থাকে।”

তৃণার চোখ ভিজে ওঠে। সে দ্রুত চোখ নামিয়ে ফেলে।
“ধন্যবাদ।”
খুব আস্তে বলে।

মিসেস জান্নাত দেয়ালে থাকা তার বিয়ের ছবির দিকে তাকান। এরপর বলেন,
“বিয়ের পর আমার জীবনের বেশিরভাগ একা কেটেছে। আমি কিংবা আমার সন্তানেরা তাদের প্রাপ্য পাইনি। রওনকের বাবা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলো কাটিয়েছেন সেনাবাহিনীর ক্যাম্পে। এদিকে আমি আমার সন্তানদের একা হাতে মানুষ করেছি। আমি জানি একজন মেয়ের জন্য এ পরিস্থিতি কতটা বিভীষিকাময়।”

কথাগুলো শুনে তৃণা তার দিকে তাকিয়ে থাকে। ছবি থেকে চোখ সরিয়ে মিসেস জান্নাত বলেন,
“তুমিও এখন ঐ একই পরিস্থিতিতে পড়তে যাচ্ছো। রিশানের সব দায়িত্ব তো তোমার। এখন থেকে তুমিই ওর মম।”

তৃণার বুকের ভেতর কেমন অজানা অনুভূতি আঁচড়ে পড়ে। হঠাৎ করে “মা” শব্দটার ভার টের পায় সে।

নরম গলায় বলে,
“আমি চেষ্টা করবো… নিজের সর্বোচ্চটা দেবো।”

“চেষ্টা নয় তৃণা। সন্তানের জন্য কখনো চেষ্টা করতে হয় না। ভালোবেসে চাইলে দেখবা সব আপনা-আপনি হয়ে যাবে।”

তৃণা হালকা মাথা নাড়ায়।

“দেখো মা বিহীন ছেলেটা মায়ের আদর, ভালোবাসা পাক আমরা সকলে চাই। আর আমার তোমার উপর বিশ্বাস আছে। রওনকও তাই বিশ্বাস করে।”

রওনকের নাম শুনে তৃণা চোখ তুলে।
মিসেস জান্নাত উঠে দাঁড়ান।

“এখন রুমে যাও। আর কাল থেকে সকালবেলা ড্রাইভার তোমাকে তোমার ক্লাসে নামিয়ে দিয়ে আসবে। রওনক বারবার আমায় বলে গেছে যাতে তোমার ক্লাস না মিস হয়। সংসারে পাশাপাশি পড়াশোনাটাও জরুরী।”

তৃণা ছোট্ট করে জবাব দেয়,
“ঠিকাছে।”

তৃণা উঠে দরজার কাছে আসতেই পেছন থেকে তিনি বলেন,
“আর একটা কথা—যা কিছুই হোক, নিজের মূল্য কম ভাববে না। এই বাড়িতে তুমি কারো দয়ার উপর আসোনি।”

তৃণা ঘুরে তাকায়। শাশুড়ি আজ তাকে বেশ ভারী ভারী কথা বললেন। সে ভেবেছিলো এই মানুষটা রাগী, গম্ভীর আর বদমেজাজি। অথচ তিনি সবটা মিথ্যে প্রমাণিত হলো। তৃণার মনে হলো তিনি মিসেস জান্নাতকে চোখ বুজে ভরসা করতে পারে।
.

তৃণা মাহির রুম থেকে বের হয়। এমন সময় সার্ভেন্ট এসে তাকে জানায় দাদুন তাকে চা নিয়ে যেতে বলেছে।

প্রথমে একটু সংশয় থাকলেও এরপর তৃণা রান্নাঘরে চলে যায়। আগে থেকে চা বানানো থাকলেও নিজ হাতে আবারো চা বানানোর কাজে লেগে পড়ে।

ট্রে তে করে চায়ের কাপ নিয়ে এগোয় সে। আতিয়া শিকদারের শরীর খারাপ থাকায় তিনি আজ রুম থেকে বের হননি।

তৃণা দরজায় নক করলে ভেতর থেকে তাকে অনুমতি দেওয়া হয় প্রবেশের।

পর্দা সরিয়ে ঢুকতেই তৃণার নজর যায় বিছানায় আধশোয়া হয়ে থাকা আতিয়া শিকদারের দিকে। তিনি চশমা চোখে রবীন্দ্রনাথের বই পড়ছেন।

তৃণা তার পাশে থাকা সাইড ড্রয়ারের উপর চায়ের কাপ রাখতেই তার ধ্যান ভাঙে। বইয়ের মাঝে তিনি এতোটাই ডুবে ছিলেন যে কারো উপস্থিতি খেয়াল করেননি।

চোখ তুলে তাকালে অপরিচিত মেয়েকে দেখে ভ্রু কুঁচকে যায়।

সাথে সাথে প্রশ্ন করে বসেন,
“এই মাইয়া, তুই কে?

প্রশ্নটা শুনে তৃণা ঘাবড়ে যায়। তবুও সাহস করে জবাব দেয়,
“তৃণা। এ বাড়ির বড়ো ছেলের স্ত্রী।”

আতিয়া শিকদার নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারেন না। চমকে তাকিয়ে থাকেন।

রাত বাড়ে। শিকদার ভিলাতে কেমন নীরবতা বইছে। ডান দিকের প্রথম রুম থেকে রিশানের গলা পাওয়া যাচ্ছে। সে রাহিকে কিল দিচ্ছে আর চেঁচাচ্ছে। বোধ-হয় গেমস খেলা নিয়ে দুজনের মাঝে ঝগড়া বেজেছে। ঘটনা কী ঘটেছে অজানা তবে ভালোই ঝামেলা তা বোঝা যাচ্ছে। তাই তো দাদুনের কক্ষ হতে স্পষ্ট তা কানে আসছে।

তৃণা মাথা নিচু করে কক্ষের এক পাশে দাঁড়িয়ে। মাথায় ঘোমটা টেনে দেওয়া। মিসেস জান্নাত চেয়ারে বসা। তার পাশে মাহি।

আতিয়া শিকদার নাক মুখ কুঁচকে বলেন,
“শেষমেষ তোরা সবাই আঁইরে মিছা কইলি?”

মাহি বলে,
“আসলে দাদুন..”

“রওনকও আঁইরে মিছা কইলো?”

“ভাইয়া মিথ্যে বলেনি তো। তুমি ভুল বুঝছো।”

মাহির কথায় আতিয়া শিকদার তেতে উঠলেন।

“কনে বদল অইয়া গ্যাছে, আঁইরে একবারো জানাইবার দরকার মনে কইলি না? এতো বড় ঘটনা অইলো আর তোরা আরেকজনরে বউ কইরা নিয়া আইলি!”

মিসেস জান্নাত বলেন,
“আম্মা যা হয়ে গেছে তা নিয়ে কথা বললে তো আর ঘটনা বদলাবে না। বরং এটা নিয়ে কথা না বলাই ভালো।”

তার কথায় আতিয়া শিকদার আরও চেতে যান।
“তুই অহন আঁইরে শেখাবি কোনটা ভুল আর কোনটা ঠিক?”

“না আম্মা, তা বলিনি।”

হাত উঁচিয়ে আতিয়া শিকদার বলেন,
“থাক। আঁই বুজ্জা পাইছি তুই কি কইতে চাইছোস।”

মাহি চোখ তুলে তৃণার দিকে তাকায়। সে বলে,
“দাদুন তৃণার তো দোষ নেই। যে পালিয়েছে দোষ তার। আর তাছাড়া ভাইয়া নিজ থেকে ওকে বিয়ে করেছে। তৃণা তো সেধে বিয়ে করেনি।”

কথাগুলো শুনে আতিয়া শিকদার কিছুক্ষণ থম মেরে থাকেন। এরপর বলেন,
“আঁই অহন আর এই বিষয়ে কথা কইতে চাই না। তোরা সব বাইর অইয়া যা।”

মিসেস জান্নাত মাহিকে ইশারা করতেই সে তৃণাকে নিয়ে বেরিয়ে যায়। মিনিট দুয়েক পর তিনিও বের হন।

.

খাওয়া দাওয়া সেরে যে যে যার যার কক্ষে চলে গেছে। তৃণা বিছানায় আধ শোয়া হয়ে বসা। ভেবে চলেছে নানান বিষয়। রিশান তার পাশে শুয়ে গেমস খেলছে।

এক সময় তৃণা তার হাতের ফোন কেঁড়ে নেয়।
রিশান কান্নার ভান করে বলে,
“তৃণ ফোন দাও।”

তৃণা সাথে সাথে বলে,
“নো। এখন ঘুমাবা। কাল তোমার ক্লাস আছে।”

রিশান শোয়া থেকে উঠে বসে। এ বছর তাকে প্রি স্কুলে ভর্তি করানো হয়েছে। এ ক’দিন বিয়ের কারণে তাকে ক্লাসে যেতে হয়নি। কাল থেকে আবারো সকাল সকাল ক্লাসে যেতে হবে ভেবে সে আঁতকে উঠল।

“তৃণ আই হেট ক্লাস। আমি ক্লাসে যাবো না।”

“তা বললে তো হবে না। আপনি এখন চুপচাপ ঘুমান। সকাল বেলা আপনি আমি দুজনেই ক্লাসে যাবো।”

রিশান অবাক হয়ে প্রশ্ন করে,
“তুমিও স্কুলে পড়ো?”

প্রশ্নটা শুনে তৃণা হেসে দেয়।
বালিশ ঠিক করে বলে,
“হ্যা। এখন আপনি এসে জলদি এখানে শুয়ে পড়েন। আর আপনি যদি গুড বয় হয়ে আমার কথা শোনেন তাহলে আপনাকে আমি স্টোরি শোনাবো।”

রিশান বালিশে মাথা দিয়ে বলে,
“গোস্টের স্টোরি?”

মাথা চুলতে তৃণা বলে,
“ঐরকমই।”

“তাহলে আমি গুড বয় হলাম।”

মৃদু হেসে তৃণা তার চুলে আঙুল চালায়। বলা শুরু করে ভূতের গল্প।

এক সময় রিশান ঘুমিয়ে যায়। তৃণা পাশ থেকে ফোন তুলে নেয়। রওনক এখন কোথায় আছে কে জানে!
এই অবধি কোনো মেসেজ, কল কিছুই দেয়নি। খানিকটা দুশ্চিন্তা হয় তার। বালিশের পাশে ফোন রেখে শুয়ে পড়ে সে। অপেক্ষা শুরু হয় রওনকের কলের।
.

সূর্যের হালকা আলো ঘরে ঢুকে পড়ছে। জানালার পর্দার ফাঁক দিয়ে বাতাসের সাথে লাফিয়ে ওঠা সূর্যের রশ্মি তৃণার মুখে পড়ে। সে চোখ তুলে দেখে রিশান ঘুমুচ্ছে। ফোন তুলে দেখে ঘড়িতে সময় সকাল সাতটা। ঠিক আটটা বাজে রিশানের ক্লাস।
ফোন রেখে রিশানকে ডাকতে শুরু করে।

“তৃণ, আই হেট স্কুল। যাবো না আমি।”
সে ঘুমন্ত স্বরে বলে।

তৃণা হাসি দিয়ে বলে,
“রিশান উঠে পড়ো। নইলে আমি মন খারাপ করবো।”

অনেকক্ষণ ডাকাডাকির পর রিশান উঠে বসে। তৃণা তার মাথায় হাত বুলিয়ে তাকে বাথরুমে নিয়ে যায়। ব্লাশ করিয়ে দেয়। এরপর রুমে এসে পোশাক বদলে স্কুল ড্রেস পরিয়ে দেয়। এমন সময় দরজায় সার্ভেন্ট নক করে। সে দরজা খুলতেই সার্ভেন্ট বলে,
“রিশান বাবাকে রেডি করাতে এসেছি।”

পেছন থেকে রিশান জবাব দেয়,
“তোমাকে লাগবে না। আমি রেডি।”

সার্ভেন্ট বেশ অবাক হয়। বিগত ছয় মাস ধরে সে-ই রিশানকে সকাল বেলা তুলে রেডি করিয়ে স্কুলে পাঠায়। বাকিদের উঠতে লেট হয় তাই তার কাঁধে এই দায়িত্ব।

মাথা নাড়িয়ে সে চলে যায়। তৃণা রিশানকে নিয়ে নিচে আসে।

সার্ভেন্ট খাবার টেবিলে নিয়ে আসে। এক গ্লাস দুধ, একটি স্যান্ডউইচ। রিশান সেগুলো খেয়ে নেয়। তৃণা তার ব্যাগ চেক করে বইগুলো দেখে চেইন লাগায়। রিশানের খাওয়া শেষ হলে তাকে গাড়িতে তুলে দেয়৷ রিশান যেতেই সে রুমে চলে আসে।
তারও ক্লাসও রয়েছে। দ্রুত রেডি হয়ে সে-ও ছুটে ক্লাসে।

সারাদিন ক্লাস সেরে বাসায় ফিরতে ফিরতে বিকেল হয়ে যায়। তৃণা বেশ ক্লান্ত থাকায় বাসায় ফিরে আগে চলে যায় গোসল করতে।
গোসল সেরে খাবার খেয়ে মাহির সাথে কিছুক্ষণ গল্প করে। এরপর পড়তে বসে। সাথে রিশানকে টেনে পড়তে বসায়।

সেদিনের রাত কেটে পেরিয়ে যায় আরও দুটো দিন। সব কিছু স্বাভাবিক ভাবেই চলছে কিন্তু এর মাঝে রওনক নিরুদ্দেশ। লোকটার কোনো খোঁজই নেই। এ বাড়ির কাউকে তেমন মাথা ঘামাতে দেখা গেলো না। তাদের কাছে এসব স্বাভাবিক।
মাহি তাকে দুশ্চিন্তায় দেখে বলে ফেলে,
“ভাইয়া তো মাসের পর মাস খোঁজ খবর না দিয়েই থাকে। টেনশন করিস না তাকে নিয়ে।”

মাহির কথায় সে হালকা হয় না বরং দুশ্চিন্তা বাড়ে।

সারাদিন পেরিয়ে রাত নামে আবারো। তিনদিন হয়ে গেছে রওনক চলে যাওয়ার।
পড়তে পড়তে কখন অনেক রাত হয়ে গেছে খেয়াল করেনি সে। টেবিল ক্লকে চোখ গেলে দেখে সময় রাত দুটো।
এক পলক বিছানায় চোখ রাখে। রিশান নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। বই বন্ধ করতেই ফোনটা ভাইব্রেট হয়। অচেনা নাম্বার দেখে ফোন তুলে নেয়। প্রথমে রিসিভ করতে চায় না। কলটা কেটে যায়।
এরপর সাথে সাথে আবার ফোনটা বাজে। এবার রিসিভ করে ফোন কানে দিয়ে চুপ করে থাকে। অপর পাশ থেকেও বইছে নীরবতা। দশ সেকেন্ডের মতো নীরবতা শেষে অপরপাশ থেকে পুরুষালী স্বরে বলে,
“হ্যালো, তৃণলতা?”

তৃণার সারা শরীর কেমন কেঁপে ওঠে। মুখ দিয়ে কথা বেরোয় না।

অপরপাশ থেকে থেকে আবারো বলে,
“হ্যালো, শুনতে পাচ্ছো?”

এবার তৃণা জবাব দেয়,
“জি, শুনছি।”

“থ্যাংক গড। আমি তো ভেবেছি নেটওয়ার্ককের কারণে কথা শুনতে পাচ্ছো না।”

“না। পরিষ্কার শুনতে পাচ্ছি।”

“তোমার ঘুমে কী ডিস্টার্ব করলাম? সরি, আসলে এতো রাতে কল দেওয়াতে..”

“একদমই না। আমি পড়ছিলাম।”

তৃণার কথায় লোকটা আশ্বস্ত হয়।

মৃদু হেসে বলে,
“তাই বলো। আমি আরও ভাবছিলাম ঘুমুচ্ছো।”

“উহু। রিশান ঘুমাচ্ছে। আমি মাত্রই ঘুমাতে যাওয়ার কথা ভাবছিলাম।”

“ও আচ্ছা। তাহলে আমি কী তোমার ঘুমানোর পূর্বের কিছু সময় পেতে পারি?”

তৃণার হাসি পায়। তবুও সে বলে,
“অনুমতি চাইছেন?”

“অবশ্যই। জেন্টেলম্যানরা অলওয়েজ অনুমতি নিয়ে কাজ করে। বিনা অনুমতিতে অভদ্ররা কাজ করে। ইউ নো আ’ম এ জেন্টেলম্যান।”

রওনকের কথা শুনে তৃণা ফিক করে হেসে দেয়।

“হাসছো যে? আমায় তোমার জেন্টলম্যান মনে হয়?”

তৃণা হাসি থামিয়ে বলে,
“মোটেও না।”

কথাটা শুনে রওনকের ভ্রু কুঁচকে যায়।
“হোয়াই?”

গম্ভীর গলায় তৃণা জবাব দেয়,
“জেন্টলম্যানরা কখনো নিরুদ্দেশ থাকে না। তারা নিয়ম করে খবর দেয়।”

“ওহহো এই ব্যপার! আই এম সরি, ভুল বুঝো না। আমি আসলে অতি ব্যস্ত থাকায় ফোন হাতে নেওয়ার ফুরসত পাইনি। তাছাড়া যে খানটায় ছিলাম নেটওয়ার্ক পাচ্ছিলো না। কিছুক্ষণ পূর্বে ক্যাম্পে ফিরলাম। আর ফোন হাতে নিয়েই সব প্রথম তোমায় কল দিলাম।”

কথাগুলো বলে রওনক থামে। আবার বলে,
“রাগ কোরো না, তৃণলতা। আমি একটু মন ভুলো আর অতি ব্যস্ত মানব। তারপরও পরের বার থেকে খেয়াল রাখবো।”

রওনক এতো কোমল স্বরে কথাগুলো বললো যে তৃণা কেমন আইসক্রিমের ন্যায় গলে গেলো। সেই সাথে তার লজ্জাও লাগছে। লোকটা তাকে এতো গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে!

তৃণাকে চুপ থাকতে দেখে রওনক বলে,
“কী হলো? রাগ করেছো? তৃণলতা? এই তৃণলতা..”

রওনক যতবার তাকে কোমল স্বরে ডাকছে তার সারা শরীরে কেমন বৈদ্যুতিক প্রবাহ হচ্ছে। কান গরম হয়ে কপালে জমেছে বিন্দু বিন্দু ঘাম। ওড়নার একাংশ দিয়ে কপাল মুছে সে জবাব দেয়,
“বলুন, শুনছি।”

“উহু। আমি বড্ড ক্লান্ত। তুমি বলো আমি শুনছি।”

“কী বলবো?”

“তোমার যা ইচ্ছে। দিনকাল কেমন যাচ্ছে, পড়াশোনা কেমন যাচ্ছে, রিশান বিরক্ত করছে কিনা..বলার কত কিছুই আছে।”

কথা বলতে বলতে তৃণা বারান্দায় এসেছে। কাচের রেলিং এ হেলান দিয়ে দাঁড়ায় সে।

“রিশান একদম বিরক্ত করছে না। আমার সব কথা শুনছে। আমি নিয়ম করে ক্লাসে যাচ্ছে। এদিকের সব ঠিকাছে আর সবাই ভালো আছে।”

রওনক বালিশে হেলান দিয়ে বলে,
“যাক নিশ্চিন্ত হলাম।”

তৃণা হুট করে প্রশ্ন করে,
“আপনি কেমন আছেন?”

প্রশ্নটা করার পর কয়েক সেকেন্ড নীরবতা বহে।
রওনক উত্তর দেয়,
“আমি ভালো নেই। বিগত তিন রাত- তিন দিন ধরে টানা কাজ করে চলেছি। খাওয়া ছাড়া এক সেকেন্ড ফুরসত পাইনি। জানো এর মাঝে তোমাদের খুব মিস করেছি। রিশানকে বারবার মনে পড়ে..”

“আর আমাকে?”

প্রশ্নটা করে তৃণা জিহ্বায় কামড় দিয়ে চোখ বুজে ফেলে।

রওনকের ঠোঁটের ভাজ প্রসারিত হয়। সে ইচ্ছে করে কথা ঘুরায়।
“আগামী কিছুদিন আমি ভীষণ ব্যস্ত থাকবো। তোমায় কল দেওয়ার চেষ্টা করবো। তবে এরকম রাত হবে। এইটুকু সময় আমি একটু ফ্রি থাকি।”

তৃণা ছোট্ট করে জবাব দেয়,
“আচ্ছা।”
প্রশ্নের জবাব না পেয়ে তার মন খারাপ হয়ে যায়।

এর মাঝে কেউ একজন এসে বলে,
“স্যার সব রেডি। চলুন।”

কান থেকে ফোন নামিয়ে রওনক গম্ভীর গলায় জবাব দেয়,
“যান। আসছি।”

লোকটা যেতেই সে ফোন কানে দেয়।
তৃণা বুঝে যায় এক্ষুণি কলটা কাটা হবে। সে মন খারাপ করে বলে,
“এখন কল কাটবেন, তাই তো?”

“সরি। ডাকছে, না গিয়ে উপায় নেই। তোমায় আমি পরে কল করবো, কেমন?”

“আচ্ছা।”

“এখন তাহলে রাখছি। নিজের আর রিশানের যত্ন নিও। আল্লাহ হাফেজ।”

“আপনিও নিজের খেয়াল রাখবেন।”

কলটা কেটে যায়। তৃণার মুখটা আঁধারে ছেয়ে যায়। কল আসাতে যতটা খুশি হয়েছিলো এখন কল কাটাতে বেশি খারাপ লাগছে। ঘুরে রেলিং এ হাত রেখে আকাশের পানে তাকায় সে।

এমন সময় ফোনে মেসেজ আসার শব্দ হয়।
মেসেজ ওপেন করতেই স্ক্রিনে ভেসে ওঠে,
“সব কিছু ঠিক থাকলেও সময়টা আমার অনুকূলে নেই। আমার উপর বিশ্বাস রাখো তৃণলতা। একদিন প্রচুর সময় হবে। তখন সবসময় তুমি আমায় পাশে পাবা। কথা দিলাম। এন্ড জেন্টলম্যান কিপস হিস প্রমিস।”

মেসেজটা পড়ে তৃণার ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি ফুটে ওঠে। ফোনটা বুকের কাছে চেপে ধরে সে এক মুহূর্ত চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকে। রাতের বাতাস কপালের ঘাম শুকিয়ে দেয়। মনে হয়, এই অল্প কয়েকটা শব্দই আজ তার সারাদিনের ক্লান্তি ধুয়ে দিয়েছে।

(চলবে..)

(রিচেক দেইনি। পরে সময় করে রিচেক দিবো। কোথাও বানান ভুল হলে কমেন্টে উল্লেখ করে দিবেন। আর আমার পাঠকরা আমার পেইজ Eshita Isha – The Infinite Trail ব্যতিতো অন্যত্র মেজর শিকদার পড়বেন না।)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply