মেজর_শিকদার-০৬
ঈশিতা_ইশা
(চোরা পেইজ সহ সকলের জন্য সর্তকতা-আমার লেখা কপি পোস্ট করবেন না।)
…
সকালবেলা টেবিলে সকলে একত্রে নাশতা খেতে বসেছে। অনুপস্থিত শুধু রাহি। সে এখনো পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছে।
শবনম বেগম তো মেয়ে জামাইয়ে জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। কি রাঁধবেন, কি খাওয়াবেন তা নিয়ে তার এক রাশ চিন্তা। ভোর বেলা তিনি উঠে লেগে গেছেন জামাইয়ের জন্য দেশী মোরগ রান্না করতে। সাথে করেছেন ছিটা রুটি। এর পাশাপাশি মিক্স সবজি ভাজি সহ, ডিমও রয়েছে।
এতো খাতির যত্নে রওনক বেশ অবাক। এ বাড়ির লোকজন তার জন্য কেমন ব্যস্ত হয়ে যাচ্ছে। সেই সাথে তার ছেলেটাকে অনেক আদর যত্ন করছে। ছেলের হাসিমুখ দেখে সে খুশি।
রিশান তৃণার নানীর পাশে বসা। সে দুষ্টুমি করছে আর একটু একটু করে খাচ্ছে। একটু পরপর তাকে নানান প্রশ্ন করে বিভ্রান্ত করছে। সে-ও ধৈর্য্য ধরে প্রশ্নের উত্তর দিয়ে চলেছে।
তৃণা আর শবনম বেগম সকলের খাওয়ার বিষয়টা দেখছে।
মা’কে রেখে তৃণা খাবে না তাই তাকে আর কেউ তেমন জোর করেনি। রওনক তাকে বসতে বলেছিলো সে বলেছে,”মায়ের সাথে খাবো।”
এর বিপরীতে সে আর তাকে কিছু বলেনি।
মাহি অবশ্য নিজে খাচ্ছে আবার তৃণাকে ডেকে খাইয়ে দিচ্ছে।
রুটি মুখে পুরতেই রওনকের ফোন বেজে উঠে। ফোন হাতে নিতেই তার চেহারার রঙ কেমন বদলে যায়।
“আমি একটু আসছি।”
বলে ফোন হাতে সে উঠে ভেতরের রুমে যায়।
তৃণা তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে।
প্রশ্ন জাগে, হঠাৎ কার কল এলো?
উত্তর পেতে অবশ্য বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়নি। কিছুক্ষণ বাদে রওনক ফিরে এসে নিজের আসনে বসে।
ফোনটা টেবিলের উপর রেখে আবারো খাবারে মনোযোগ দেয়। তৃণা একবার তার দিকে তাকায় তারপর বাবার দিকে। তৈয়ব উদ্দিন বিষয়টা বুঝতে পারে।
তিনিই নিরবতা ভাঙেন।
মেয়েকে জিজ্ঞেস করেন,
“তৃণা আজকে তো তোরা থাকছিস তাই না?”
তৃণা জবাব দেওয়ার পূর্বে রওনক তৈয়ব উদ্দিনের দিকে তাকিয়ে বলে,
“একটা সংবাদ দেওয়ার আছে।”
রওনকের কথার স্বরে তৈয়ব উদ্দিন নড়ে চড়ে বসেন।
তৈয়ব উদ্দিন প্রশ্ন করেন,
“কিছু কি ঘটেছে?”
“আসলে, স্যার কল দিয়েছেন। ছুটি ক্যান্সেল করে আর্জেন্টলি ফিরতে বললেন।”
রওনকের কথা শুনে উপস্থিত সকলেই চমকায়। এমনটা মোটেও কেউ প্রত্যাশা করেনি। তৃণার চোখ-মুখ এক পলকে বদলে বিষাদে ছেয়ে যায়। মাহি তার দিকে তাকায়। তারও একই হাল।
নিজেকে সামলে তৈয়ব উদ্দিন জিজ্ঞেস করেন,
“তা আজ থাকবা না?”
“জি না। আজই ফিরতে হবে। রাতে রওনা দিবো।”
টেবিলে নেমে আসে অদ্ভুত এক নীরবতা। মাহি নিজেও অবাক। সে জানতো আরও কিছুদিন ভাই থাকবে। আজ হুট করে এভাবে যেতে হবে ভাবেনি সে।
তৈয়ব উদ্দিন ধীরে গলা খাঁকারি দিয়ে বলেন,
“আজই? এত তাড়া?”
রওনক মাথা নেড়ে বলে,
“পরিস্থিতি ভালো না। আমাকে বলা হয়েছে যত দ্রুত সম্ভব যেতে। কি ঘটেছে আমিও বুঝতে পারছি না। বর্ডারে তো এক সেকেন্ড অনেক কিছু ঘটে। আন্দাজ করছি গুরুতর কিছু হবে।”
শবনম বেগমের মন খারাপ হয়। সে ভেবেছিলো আরেকটা দিন মেয়ে আর জামাই থাকবে। তিনিও যত্ন করে আদর আপ্যায়ন করবেন। তা আর হলো না।
“এই গতকালই তো বিয়ে হলো..”
তৈয়ব উদ্দিনের চোখে চোখ পড়তেই কথাটা অসম্পূর্ণ রেখেই চুপ করে যান শবনম বেগম।
তৃণা পুরো সময়টায় কিছু বলেনি। সে চুপচাপ নীরবতা পালন করছে।
তৈয়ব উদ্দিন শান্ত স্বরে বলেন,
“ঠিকাছে, সমস্যা নেই। দেশ সবার আগে। আবার ছুটি পেলে এসো।”
তারপর তৃণার দিকে তাকিয়ে বলে,
“তবে, আমি ভেবেছিলাম অন্তত আজকের দিনটা..”
রওনক সাথে সাথে বলে,
“আমি দুঃখিত। তবে তৃণা চাইলে আপনাদের কাছে কিছুদিন থাকতে পারে।”
সাথে সাথে তৃণা বলে,
“না। আজই আপনাদের সাথে ফিরবো।”
তার কথার পিঠে কেউ আর কিছু বলে না। বোধ-হয় তারা মেয়েটার মনের অবস্থা খানিকটা আন্দাজ করতে পারছে।
বাকিটা সময় সকলে নীরবে খাওয়া সেরেছে।
.
তৃণার ভেতর অদ্ভুত এক তাড়াহুড়ো।
বিছানার উপর বই ছড়িয়ে আছে। মেডিকেলের নোট, ফাইল এলোমেলো হয়ে আছে। সে একটার পর একটা গুছিয়ে ব্যাগে রাখছে।
আপনমনে কাজটা করে চলেছে। হাতে সময় কম তাই তাড়াহুড়ো করে সব ব্যাগে রাখছে।
হঠাৎ দরজার কেউ টোকা দেয়। তৃণার ধ্যান ভাঙে। তাকিয়ে দেখে দরজায় রওনক দাঁড়িয়ে।
চুপচাপ।
“আমি ভেতরে আসতে পারি?”
তৃণা ভ্রু কুঁচকে বলে, “আসুন।”
রওনক ভেতরে ঢোকে।
কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখে তৃণা কি করছে। মেয়েটা তার দিকে তাকায় না। নিজের মতো কাজ করে চলেছে।
“তুমি তাড়াহুড়ো করছো।”
“আপনিও তো করছেন।”
তৃণা ব্যাগের চেইন লাগাতে লাগাতে বলে।
রওনক কিছু বলে না।
কয়েক কদম এগিয়ে এসে বলে, “আমি ভাবিনি হঠাৎ এমন কিছু হবে।”
“জানি।”
ব্যাগ রেখে তৃণা যেতে নিলো রওনক বলে,
“আধা ঘন্টা পর আমার বেরবো। বাড়িতে কল দিয়ে জানিয়েছি।”
“ঠিকাছে।”
বলে তৃণা কক্ষ হতে বেরিয়ে যায়।
.
রওনক ড্রাইভ করছে। পাশের সিটে তৃণা চুপচাপ বসে আছে। পেছনে মাহি আর রিশান। রাহি তার বাইকে চড়ে যাচ্ছে। সে তাদের ছেড়ে অনেকটা রাস্তা এগিয়ে গেছে।
জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকা তৃণার চোখে কোনো দৃশ্য ঠিকভাবে ধরা দিচ্ছে না। পেছনের সিটে মাহি আর রিশান কথা বলছে ফিসফিস করে। রিশান জানে, বাবার ডিউটি মানেই তাড়া কিন্তু ঠিক কতটা তাড়া, সেটা তার ছোট্ট মাথায় ধরা পড়ে না।
হঠাৎ রওনক গাড়ির গতি কমায়।
একটা ছোট আইসক্রিমের দোকানের সামনে গাড়ি থামে।
রওনক আয়নায় একবার ছেলের দিকে তাকায়।
“রিশান, আইসক্রিম খাবা?”
রিশান যেন এই কথাটার অপেক্ষাতেই ছিলো। চোখ দুটো ঝলমল করে ওঠে।
খুশিতে আত্নহারা হয়ে বলে,
“খাবো, ড্যাডি।”
তৃণা তার দিকে তাকায়। হঠাৎ লোকটার কি হলো?
মাহি নিজেও অবাক। রওনক এসব খাওয়া অপছন্দ করে। সে হঠাৎ করে নিজ থেকে খাওয়াতে চাইছে বিষয়টা হজম করতে তারও কষ্ট হচ্ছে।
সিটবেল্ট খুলে রওনক বলে,
“ফুপ্পীর সাথে নামো তাহলে।”
“চল রিশু, জলদি নামি।”
মাহি রিশানকে নিয়ে নামে। সিটবেল্ট খুলে তৃণাও নামে।
রিশান কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে প্রায় লাফাতে থাকে।
“ড্যাডি, চকলেট খাবো।”
মাহি হেসে বলে,
“আস্তে, পড়বি।”
রওনক পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে কাউন্টারের দিকে এগোয়।
বলে,
“একটা চকলেট, একটা ভ্যানিলা আর..”
মাহি জবাব দেয়,
“ট্রবেরি।”
রওনক তৃণার দিকে তাকায়।
তৃণা একটু থেমে বলে,
“ভ্যানিলা।”
ঘাড় ঘুরিয়ে রওনক দোকানদারের উদ্দেশ্যে বলে,
“সাথে দুটো ভ্যানিলা আর একটা স্ট্রবেরি।”
একে একে আইসক্রিম গুলো সকলের হাতে তুলে দেয় রওনক। রিশানের আইসক্রিমের প্যাকেট খুলে টিস্যু সহ তাকে খেতে দেয়।
রিশান তাড়াহুড়ো করে খেতে গিয়ে হাত নোংরা করে ফেলে। তৃণা তার হাত মুছিয়ে দেয়।
খাওয়া শেষ হতেই আবার সকলে গাড়িতে চড়ে বসে।
দুপুরের মধ্যে তারা শিকদার ভিলাতে পৌঁছে যায়।
মিসেস জান্নাত আরাম করে সোফায় বসে চা পান করছেন। এমন সময় রিশানের গলা কানে আসে।
“দিদুন..”
কাপ থেকে চোখ সরিয়ে তাকাতেই ঝড়ের বেগে রিশান এসে তাকে জড়িয়ে ধরে।
চায়ের কাপটা টি-টেবিলে রেখে নাতীকে এক হাতে জড়িয়ে ধরে। ততক্ষণে তৃণা আর মাহিও ভেতরে প্রবেশ করে।
তওনি তৃণাকে জিজ্ঞেস করেন,
“আজ চলে এলে যে? তোমাদের তো কাল আসার কথা ছিলো।”
তৃণা জবাব দেওয়ার পূর্বে পেছন থেকে রওনক জবাব দেয়,
“আমার ছুটি শেষ। আজকে ডিউটিতে ফিরতে হবে।”
“সে-কি! এতো বড়ো সংবাদটা আমায় জানালে না?”
“ড্যাডকে জানিয়েছিলাম।”
“তো আমায় জানাবে না? তিনি তো সে-সব আমাকে বলার প্রয়োজন মনে করেন!”
“চলেই তো এলাম।”
মিসেস জান্নাত তবুও মন খারাপ করেন। আরেক ঝামেলা হলো তার শ্বাশুরি এখনো বাড়িতে। তৃণার ব্যপারটা কীভাবে কি করবেন বুঝতে পারছেন না।
রওনক সিঁড়ি বেয়ে উপরের দিকে যাচ্ছে। পেছন থেকে মিসেস জান্নাত বলেন,
“কখন বের হবা?”
“বিকেলে।”
জবাব দিয়ে সে নিজের রুমে চলে যায়।
মিসেস জান্নাত বাড়ির কুককে ডাক দেন। রওনকের জন্য আলাদা করে রান্না করতে বলেন।
মাহি নিজের রুমে আর তৃণাও চলে আসে রওনকের রুমে।
একজন সার্ভেন্ট তৃণার ব্যাগ দুটো রুমে দিয়ে যায়। তৃণা ব্যাগ দুটো এক পাশে রাখে। রওনক চলে গেলে তারপর খুলে সব গুছিয়ে রাখবে।
বাসা থেকে একটা সুতির শাড়ি পরে এসেছে। এখন ভাবছে বদলে নিবে নাকি এটা পরোই থাকবে। রওনক ঢুকেছে গোসলে। গোসল সেরে সে তার প্যাকিং করবে। অবশ্য প্যাকিং বলতে হাতে অত্যাবশ্যকীয় কিছু জিনিসপত্রর নিবে।
গোসল সেরে তোয়ালে দিয়ে চুল মুছতে মুছতে বের হয় রওনক।
তৃণা তখন নিজের জামা কাপড়ের লাগেজের সামনে বসা। শাড়িগুলো উল্টে পাল্টে দেখছে।
“ঐ বাড়ি থেকে তো গোসল সেরেই এসেছে।”
রওনকের গলা পেয়ে তৃণা তাকায়।
লোকটা আরও বলে,
“শাড়িটা বদলাতে হবে না, এটাই পরনে থাক।”
কথাটা বলে সে আয়নার সামনে চলে যায়। তৃণার কপালে ভাজ স্বাভাবিক হয়। নিজের পরনের শাড়িটার দিকে তাকায়। কচুপাতা রঙের একটা শাড়ি তার পরনে, যার বর্ডার গাঢ় সবুজ, তার মাঝে গোল্ডেন রঙের সুতোর কাজ। বিয়েতে শাড়িটা তাকে নানী উপহার দিয়েছেন।
লাগেজের চেইন বন্ধ করে তৃণা উঠে দাঁড়ায়।
চুলে চিরুনী চালানো অবস্থায় রওনক বলে,
“আমার কাবাড খালিই আছে, তুমি নিজের জামাকাপড় তাতে রাখো। আর সার্ভেন্টকে বলে আমার বই গুলো সরিয়ে নিজের বই রেখো।”
তৃণা তার কথার জবাব না দিয়ে বলে,
“আপনার সঙ্গে আমার কথা আছে।”
“বলো, কী কথা?”
চুল আঁচড়ানো শেষ করে রওনক ঘুরে দাঁড়ায়।
দুই হাত গুঁজে ফেলে সাদা রঙের ট্রাউজারের পকেটে।
তৃণা চোখ নামিয়ে ফেলে। অভ্যাস বশত শাড়ির আঁচল আঙুলের ভাঁজে নিয়ে পেঁচাতে শুরু করে।
“কি হলো? বলো।”
“আসলে, আমি আমাদের বিষয়ে জানতে চাচ্ছিলাম।”
“আমাদের বিষয় বলতে?”
তৃণা ঝট করে জবাব দেয়,
“বিয়ের..”
কথাটা বলে জিভে কামড় দেয়।
“আসলে বলতে চাচ্ছিলাম..”
রওনক দুই কদম এগিয়ে আসে।
“কি বলতে চাচ্ছিলে?”
তৃণা চোখ তুলতেই দেখে রওনক তার একদম সামনে দাঁড়িয়ে। চোখ নামাতেই লোকটা বলে ফেলে,
“আমার দিকে তাকিয়ে কথা বলো। লুক এট মি।”
তাকতেই দুজনের দৃষ্টি রেখা মিলিত হয়।
স্বাভাবিক স্বরে রওনক বলে,
“এবার বলো, যে-সব প্রশ্ন আছে। তবে হ্যা এই মূহুর্তে হয়তো তোমার সকল প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে নেই। যেগুলোর উত্তর আছে সেগুলোর উত্তর অবশ্যই দিবো।”
“আসলে..বিয়ের পর থেকে আপনি কেমন স্বাভাবিক আচরণ করছেন। বিষয়টা আমায় ভাবাচ্ছে। কনে চলে গেলো অথচ আপনি রাগ না করে উল্টো আমায় বিয়ে করলেন। এর পেছনে বিশেষ কোনো কারণ আছে?”
প্রশ্নটা করে তৃণা চুপ রইলো। রওনকও চুপ। কয়েক সেকেন্ড পর সে হো হো করে হেসে দেয়।
তার হাসির শব্দে মেয়েটা ভ্যাবাচ্যাকা খায়। সে হাসির এমন কি বলেছে! আশ্চর্য লোকটা হাসছে কেনো!
রওনকের হাসি থামতে সময় নেয়।
ধীরে মাথা নেড়ে বলে,
“তোমরা মেয়েরা সবকিছুর পেছনে কারণ খুঁজো কেনো?”
সে তৃণার সামনে থেকে সরে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়।
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর গম্ভীর গলায় বলে,
“হুটহাট রাগ করলে জীবন চলে না। কখনো কখনো পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। পরিস্থিতির ভার যেদিকে সেদিকে সিদ্ধান্ত নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। আমার জায়গায় অন্য কেউ থাকলে কি করতো সেটা নিয়ে ভাবিনি, আমি কি করতে পারি সেটাই ভেবেছি শুধু।”
তৃণা নিঃশ্বাস আটকে রাখে।
সে চেয়েছিলো উত্তর। পেয়েছে ব্যাখ্যা।
রওনক এবার তার দিকে পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়ায়।
“আমি যেটা করেছি, সেটা আবেগে না। আর তুমি যেটা ভাবছো, সেটাও পুরোটা ভুল না। আমরা দুজনেই নিজেদের জায়গায় সঠিক। পরিস্থিতি আমাদের একত্রিত করেছে।”
তৃণা বলে,
“সব দোষ পরিস্থিতির! আপু না পালালে এমনটা হতো না।”
এক পা এগিয়ে এসে সে থামে। খুব কাছে না, আবার দূরেও না। তৃণার দৃষ্টি মেঝের টাইলসের দিকে।
“যেমন তুমি এই বিয়েতে হঠাৎ করে চলে এসেছো। আমিও। দু’জনেই প্রস্তুত ছিলাম না। কিন্তু পরিস্থিতি এমন জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছিলো সিদ্ধান্ত নেওয়া ছাড়া উপায় ছিলো না।”
তৃণা অবাক হয়ে তাকায়।
“আপনি.. মানে?”
“বিয়েতে আমার বিশেষ মত ছিলো না। দেখো আমি যেই পেশার মানুষ তাতে নিজের ছোট্ট ছেলেটাকে অবধি সময় দিতে পারি না সেখানে নতুন আরেকজনকে আনলে তার শুধু কষ্টই হবে। এটা ভেবে বিয়ে করতে চাইনি।”
তৃণা নিম্ন স্বরে প্রশ্ন করে
“আমি কি..একটা সিদ্ধান্ত মাত্র?”
রওনকের চোখে প্রথমবারের মতো একটা কাঁপুনি দেখা যায়। খুব ক্ষণিকের।
সে সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে সামলে নেয়।
“না।”
একটু থেমে বলে,
“কিন্তু এখনো স্ত্রী হয়ে ওঠার গল্পটা শুরু হয়নি। আমি বর্ডারে যাচ্ছি। সামনে কী আছে জানি না। ফিরবো কিনা সেটাও নিশ্চিত না। এই অবস্থায় তোমাকে কোনো স্বপ্ন দেখাতে চাই না।”
তৃণার ভেতরটা মুচড়ে উঠে। গলার কাছে এসে শব্দগুলো দলা পাকিয়ে যায়।
“তুমি এখানে নিরাপদে থাকবে। সম্মান পাবে। কারো সামনে মাথা নিচু করতে হবে না। কিন্তু আমাদের সম্পর্কের বিষয়ে.. সেটা সময় নেবে।
তৃণা চোখ নামিয়ে নেয়।
শাড়ির আঁচলটা শক্ত করে মুঠোয় ধরে।
কিছুক্ষণ পর খুব ছোট গলায় বলে
“আমি শুধু বুঝতে চেয়েছিলাম।। আমি,কোথায় দাঁড়িয়ে আছি।”
রওনক শান্ত স্বরে উত্তর দেয়,
“আমার পাশে। আপাতত এটুকুই যথেষ্ট।”
ঘরে আবার নীরবতা নামে।
.
দুপুরবেলা বাসায় রওনকের জন্য বেশ রান্নাবান্না হয়। মিসেস জান্নাত তার পাতে এটা ওটা দিচ্ছেন আর জিজ্ঞেস করছেন কিছু লাগবে কিনা। রওনক খাচ্ছে। তৃণা তার পাশেই বসা। রিশানকে সে খাইয়ে দিচ্ছে। সে বায়না করেছে তাকে খাইয়ে দিতে হবে।
“ড্যাড বাড়িতে নেই?”
“তিনি তো সকালে বের হলেন। বলে গেলেন, ফিরবেন জলদি।”
এমন সময় রাহি প্রবেশ করে। হেলমেটটা ডাইনিং এর উপর রাখতেই মিসেস জান্নাত রাগ করেন।
“এটাকে ঘরে কেনো এনেছো? সরাও রাহি।”
“মম একটু পরই রুমে যাবো।”
চেয়ার টেনে পা ছড়িয়ে রিশানের পাশে বসে। তার বিপরীতে মাহি বসা।
রওনক জিজ্ঞেস করে,
“কই ছিলি তুই? আমাদের সাথে রওনা দিলি তারপর আর তোর খবর নেই।”
হেসে রাহি জবাব দেয়,
“এই তো একটু দরকারি কলের ডাকে সাড়া দিতে গিয়েছিলাম।”
মাহি বিরবির করে,
“ওর দরকারি কল মানে, বন্ধু নয়তো গার্লফ্রেন্ড।”
“মম খেতে দাও।”
মিসেস জান্নাত বিরক্তি নিয়ে বলেন,
“নিয়ে খাও।”
রাহিও একে একে দেখতে শুরু করে কি রান্না হয়েছে।
রওনক এর মাঝে মিসেস জান্নাতকে জিজ্ঞেস করে,
“দাদুনকে দেখতে পাচ্ছি না যে?”
“গত রাতে প্রেশার হাই হওয়াতে সারারাত ঘুমায়নি। এখন ঘুমাচ্ছে।”
“ওহ। তাহলে খেয়ে একবার দেখা করে আসবো।”
রওনকের কথার পিঠে মিসেস জান্নাত আর কিছু বলেন না।
.
সময় খুব দ্রুত এগোয়। দুেুর গড়িয়ে এখন বিকেল বেলা। রওনক নিজ রুমে দাঁড়িয়ে রেডি হচ্ছে। পরনে সাদা শার্ট আর কালো প্যান্ট। কোমরে বেল্ট ঠিক করে, চুল সামান্য হাত দিয়ে ঠিক করে।
বিছানায় রিশান শুয়ে আছে। রওনক এক নজর ছেলের দিকে তাকায়, হাসি এসে যায়। ছোট্ট হাত দুটো বুকে চেপে ধরে তার ড্যাডিকে দেখছে।
“রিশু, চলে আসো। ড্যাডি চলে যাচ্ছে।”
রিশান বসে পড়ে, ছোট্ট পা দুটো ঠেসে ঠেসে ড্যাডির দিকে এগোয়।
বিছানার পাশে গিয়ে রওনক ছেলেকে দুই হাত দিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে। ছোট্ট গালের ওপর চুমু দিয়ে সে বলে,
“ড্যাডি তোমাকে মিস করবো।”
ছোট্ট ছোট্ট হাত দিয়ে ড্যাডির গলা জড়িয়ে রিশান বলে,
“রিশানও তার ড্যাডিকে মিস করবে।”
ছেলের কথা শুনে রওনক হেসে দেয়।
নাক টেনে বলে,
“খুব পেকে গেছো।”
রিশান দাঁতের কপাটি বের করে হাসে।
“তৃণকে একদম বিরক্ত করবা না। যা বলে সব কথা শুনবা। আর মাহিকে তুই তোকারি করা যাবে না। দিদুনের সাথে কম দুষ্টুমি করবে আর রাহির সাথে রাত জেগে গেমস খেলবা না। জলদি ঘুমাবা। এই কয়দিন স্কুল যাওনি। কাল থেকে নিয়মিত স্কুলে যাবা। তুমি গুড বয় হয়ে থাকলে ড্যাডি আবার তোমার জন্য অনেক অনেক চকলেটস আনবো।”
মাথা নেড়ে রিশান বলে,
“ওকে ড্যাডি।”
তৃণার দিকে তাকালে দেখে সে হাসিমুখে তাদের দিকেই তাকিয়ে।
“পড়াশোনা ঠিক মতো কোরো। নিজের আর রিশানের যত্ন নিও। আমার খুব বেশি কল করতে পারবো না। তবে চেষ্টা করবো।”
তৃণা এক শব্দে জবাব দেয়,
“আচ্ছা।”
রওনক আরেকবার রিশানের দিকে তাকায়, ছোট্ট মাথা চেপে ধরে আর চুমু দিয়ে জড়িয়ে ধরে। রিশান এবার তাকে ছেড়ে ছোট্ট পা নিয়ে দ্রুত তৃণার দিকে দৌড়ে আসে। দু-হাত দিয়ে তৃণার গলা জড়িয়ে ধরে।
সে ও তাকে জড়িয়ে মাথায় হাত বুলায়। রওনক বেশ অবাক হয়। বিদায়ের মূহুর্তে ছেলেটা তার কাছে না এসে তৃণার কাছে গেলো!
রওনক বলে,
“ড্যাডিকে আরেকটা হাগ দিবা না?”
রিশান তৃণাকে ছেড়ে বলে,
“ড্যাডি, তুমি না বলেছো কারো মন খারাপ হলে হাগ দিলে মন ভালো হয়ে যায়?”
রওনক হেসে উত্তর দেয়,
“হ্যা, ঠিক।”
রিশান এবার তৃণার দিকে তাকিয়ে বলে,
“কই! তৃণের তো মন ভালো হলো না। ওকে তো হাগ দিলাম।”
রওনক কিছু বলার আগেই রিশান জোরে বলে,
“ড্যাডি, তৃণের মন ভালো করে দাও। ড্যাডি, হাগ তৃণ!”
তৃণা লজ্জা পেয়ে চোখ নামিয়ে বলে,
“এসব বলে না রিশান। ড্যাডির লেট হচ্ছে।”
রিশান জেদ করে মাথা নাড়ায়। বিছানা থেকে নেমে হাত পা ছুঁড়তে শুরু করে।
“ড্যাডি, হাগ তৃণ..”
ছেলের জেদে দুজনেই বিপাকে পড়ে যায়। তৃণা রওনকের দিকে তাকায়। লোকটা নিজেও বোধ-হয় ছেলের জেদের কাছে অসহায়বোধ করে।
শেষে জয়ী হয় রিশানের জেদ।
রওনক ধীরে দুই হাত মেলে বলে,
“কাম ফাস্ট, তৃণলতা।”
তৃণা কিছু বলতে গিয়েও থেমে যায়। ধীর কদম ফেলে রওনকের দিকে এগোয়। কাছাকাছি যেতেই রিশান পেছন থেকে আলতো ধাক্কা দেয়। সাথে সাথে সে ধাক্কা খায় রওনকের বুকের সাথে। ঝট করে রওনক নিজের বাহুতে তাকে আবদ্ধ করে ফেলে। চোখ তুলে তাকায় তৃণা। রওনকের দৃষ্টি তার দিকে। তৃণার হাত জোড়া তার বুকের কাছে রাখা।
“ভাইয়া..”
মাহির গলা পেয়ে দুজন দুদিকে ছিটকে সরে যায়। দরজায় দাঁড়িয়ে মাহি বলে,
“ড্রাইভার চলে এসেছে। নামবা এখন?”
গলা ঝেরে রওনক জবাব দেয়,
“আসছি।”
এরপর সে নিজের ব্যাগ তুলে নেয়। অপর হাত দিয়ে রিশানের হাত ধরে। তৃণার দিকে একপলক তাকিয়ে বলে,
“আসছি তৃণলতা। ভালো থেকো।”
“আপনিও।”
লোকটা বেরিয়ে যায়।
তৃণা এগিয়ে যায় বারান্দার দিকে। নিচে গাড়ি দাঁড়িয়ে। রওনকের কোলে রিশান। সে তাকে চুমু দিয়ে নামিয়ে দেয়। এরপর মিসেস জান্নাত, মাহি, রাহিকে জড়িয়ে ধরে।
গাড়ির ভেতরে ঢুকতে গিয়ে একপলক নিজের বারান্দার দিকে তাকায়। তৃণার উদ্দেশ্যে হাত নাড়ে। তৃণাও হাত নাড়ে। এরপর লোকটা গাড়ির ভেতর ঢুকে যায়।
মিনিট দুয়েকের মধ্যে গাড়িটা শিকদার ভিলা থেকে প্রস্থান করে।
…
(চলবে..)
(কোথাও বানান ভুল হলে জানাবেন। আপনারা রেসপন্স কমিয়ে দিলে লিখতে ইচ্ছে করে না। এই পর্বে বেশি বেশি লাইক কমেন্ট করুন। যে যতগুলো পারেন স্টিকার কমেন্ট করবেন।)
Share On:
TAGS: ঈশিতা ইশা, মেজর শিকদার
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
মেজর শিকদার পর্ব ৩
-
মেজর শিকদার পর্ব ১
-
মেজর শিকদার পর্ব ৫
-
মেজর শিকদার পর্ব ২
-
মেজর শিকদার গল্পের লিংক
-
মেজর শিকদার পর্ব ৪