Golpo ডিফেন্স রিলেটেড মেজর শিকদার

মেজর শিকদার পর্ব ৫


মেজর_শিকদার-০৫

ঈশিতা_ইশা

(পেইজ, ইউটিউবার, টিকটকার সকলের জন্য আমার লেখা কপি পোস্ট সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
পাঠকরা লেখার শেষাংশ এবং পিন পোস্ট পড়বেন।)

ভর দুপুর বেলা টেবিলে এক এক করে খাবার গুলো সাজিয়ে রাখছে তৃণা। তাকে সাহায্য করেছে তানিয়া। নাবিলাকে ডাকা হয়েছিলো। আসছি বলে তার আর খবর নেই। কাজের সময় সে গায়েব হয়ে যায়। আবার কাজ শেষ হলেই হাজির হয়।

তৈয়ব উদ্দিন নিজের ছোট ভাই সৈয়দ উদ্দিন এবং তার পরিবারকে দুপুরে খেতে দাওয়াত দিয়েছিলেন। তারা এ বাড়ির পাঁচ তলার এক ফ্ল্যাটে থাকেন। সকাল থেকে তারই স্ত্রী ইন্দিরা রান্নাঘরে সাহায্য করেছে। রান্না শেষ হওয়ার কিছুক্ষণ বাদে সৈয়দ উদ্দিন তার দুই ছেলেকে নিয়ে হাজির হন।

নতুন জামাইয়ের জন্য হরেক রকম রান্নাবান্না করেছেন শবনম বেগম। তাকে অবশ্য নির্দেশনা দিয়েছে তার মা। বিয়ের পরপরই শাশুড়িকে হারান তিনি। শ্বশুর মশাইও গত হয়েছেন বেশ কয়েক বছর হলো। তাই তো এখন বাসায় ছোট থেকে বড়ো আয়োজনে নিজের মা’কে ডেকে আনেন।

রওনক এসে চেয়ার টেনে বসে। পাশেই রিশান বসে খাচ্ছে। তৈয়ব উদ্দিন মাছের কাটা বেছে প্লেটে দিচ্ছে, রিশান নিজ হাত তুলে খাচ্ছে।
রওনক অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। বাসায় থাকলে সবসময় মাহি না হয় মা রিশানকে এভাবে মাছ বেছে দেয়।

সৈয়দ উদ্দিন এবং তার ছেলেরা বিপরীতে বসে।

রওনক তৃণাকে জিজ্ঞেস করে,
“নানু খাবে না? ওনাকে ডাক দাও একসাথে খাই। শ্বাশুড়ী আম্মাকেও বসতে বলো।”

তৃণা জবাব দেওয়ার পূর্বেই শবনম বেগম জবাব দেন,
“না বাবা, তোমরা আগে খাও। এরপর আমরা মা-জিয়েরা একসাথে খাবো।”

“ওরা বসুক তাহলে।”
নাবিলা আর তানিয়ার দিকে ইশারা করে বলে।

নাবিলা সাথে সাথে বলে,
“না দুলাভাই। আপনি আগে খান। আমরা বোনেরা এক সাথে রিল্যাক্সে খাবো।”

রওনক আর কিছু বলে না।
তৃণা প্লেট উল্টে তাতে গরম গরম সাদা পোলাও দিতে নিলে সে বলে,
“আগে শ্বশুরকে দাও।”

তৈয়ব উদ্দিন বলেন,
“তোমাকে দেক না। সমস্যা নেই তো।”

“আগে গুরুজন। আপনাকে এবং চাচাকে দিয়ে তারপর আমাকে দেক।”

পোলাও এর বাটি নিয়ে বাবার পাশে এসে দাঁড়ায় তৃণা। চামচ দিয়ে পোলাও তুলে বাপ চাচার প্লেটে দেয়।
এরপর রওনকের পাশে দুই চামচ পোলাও দেয়। এমন সময় কলিংবেল বেজে ওঠে।

“মনে হয় ওরা চলে এসেছে। খুলে দে।”
তৃণার কথা মতো তানিয়া যায় দরজা খুলতে।

শবনম বেগম ইলিশ মাছ ভাজা মেয়ে জামাইয়ের প্লেটে তুলে দেন।

তৃণা তার সামনে ছোট ছোট বাটিতে করে তরকারি বেড়ে রাখে। বিষয়টা রওনকের নজর এড়ায় না৷ বাসাতে খেতে বসলে তাকে এভাবে দেওয়া হয় নইলে সে চেয়ে খায় না। যতটুকু দেওয়া হয় ততটুকু খেয়ে উঠে যায়। তাই তার মা বুদ্ধি করে এভাবে তার খাবার আলাদা করে দেয়। এতে রওনক নিজের মতো করে খেতে পারে।
তৃণা এসব কী করে জানলো—রওনক নিজেই বুঝে উঠতে পারে না। কিঞ্চিত অবাক সে।

“বিগ ব্রো আমাদের রেখেই খাচ্ছো? এই জন্য লোকে বলে, বিয়ের পর সবাই বদলে যায়।”

রাহির গলা পেয়ে ফিরে তাকায় সে।
সাথে মাহিকেও দেখে যায়। তাদের দেখে রিশান বলে,
“মাহি-রাহি এখানে কি চাস?”

মাহি তার গাল টেনে বলে,
“তো? তুমি আর তোমার ড্যাডি আমাদের ফেলে খাবা? তা হচ্ছে না।”

চেয়ার টেনে মাহি ধপ করে বসে পড়ে।

“বাহির থেকে এসেছিস হাত-মুখ তো ধুবি নাকি?”

রওনকের কথার পিঠে রাহি জবাব দেয়,
“আমার হাতে গ্লাভস ছিলো। এই দেখো খুলে ফেললাম। হাত একদম পরিষ্কার।”

রাহি নিজের হাত উল্টেপাল্টে দেখায়। রওনক কিছু না বলে শুধু সরু নজরে তাকায়। রাহি কিছু না বলে চুপচাপ হাত ধুতে চলে যায়। মাহি বলে সে পরে ওদের সাথে খাবে।

তৃণা কল করে ওদের আসতে বলেছে। শবনম বেগম ওদের না দেখে রাগ করেছিলেন তাই তো তৃণার কল পেয়ে ওরা ছুটে এসেছে।

হাত ধুয়ে এসে রাহি খেতে বসে। সে তো সব কিছুর বড়ো টুকরো খুঁজে বলছে পাতে দিতে। রওনক খাওয়ার মাঝে ভাইয়ের অবস্থা দেখছে। মনে হচ্ছে- রাহি এ বাড়ির নতুন জামাই। এ বাড়ির কেউ ওদের আচরণে বিরক্ত হচ্ছে না তবে তার লজ্জা লাগছে।

“তৃণ অরে হানি দাও।”
হঠাৎ রিশানের কথায় সকলে বিস্ময়কর দৃষ্টিতে তাকায়।

মাহি জিভে কামড় দিয়ে বলে,
“রিশান সোনা এসব বলে না। শুদ্ধ ভাষায় কথা বলো।

রিশান বলে,
“ওই, মুই তো হানি চাইতাছি। এরম কইতাসিস কেন, মাহি?”

তৃণা পানির গ্লাস দিয়ে বলে,
“বাবা এটাকে হানি বলে না তো, পানি বলে। তুমি না লক্ষী ছেলে। আমার কথা শুনবে না?”

রিশান মাথা নাড়িয়ে পানি পান করে।

তৃণার নানী শবনমকে ধরে বলে,
“হায় খোদা, শেষমেশ নোয়াখাইল্লাগো বাড়ি মাইয়া বিয়া দিলি!”

শবনম বেগম মায়ের হাত চেপে বলে,
“আম্মা আপনে চুপ থাহেন। রুমে গিয়া বন, যান।”

তৃণার নানী রুমে চলে যায়। শবনম বেগম এগিয়ে এসে মেয়ে জামাইয়ের কিছু লাগবে কিনা সেদিকটা দেখেন।

খাওয়া শেষ হলে রওনককে বলা হয় তৃণার রুমে গিয়ে বিশ্রাম নিতে। সে রিশানের খোঁজ করলে দেখে, ছেলেটা তৃণার বাবার সাথে তার বিছানায় বসে খেলছে।

বাড়ির সকল মেয়েরা খেতে বসেছে। তৃণার রুমে এলে দেখা যায় কেউ নেই। রাহিকে গেস্ট রুমে।

রওনকের নজর যায় পড়ার টেবিলের দিকে। সে সেদিকে এগিয়ে যায়। পুরো টেবিল ভর্তি মেডিকেলের বই। টেবিলের উপর একটা ফটো ফ্রেম রাখা। রওনক সেটা তুলে নেয়। ফটোতে ছোট দুই বাচ্চা মেয়ে, তাদের পেছনে তৈয়ব উদ্দিন আর শবনম বেগম। তৈয়ব উদ্দিনের কোলে কয়েক মাসে একটা ছেলে বাচ্চা।

বড়ো মেয়েটা তিন্নি বুঝতে অসুবিধা হয় না। পাশেই পুচকু মেয়েটা গোল ফ্রগ পরনে দাঁড়িয়ে। যার ছোট ছোট চুল। সেগুলো ঝুটি করা৷ চোখে সে কালো রঙের সানগ্লাস পড়া।

পুচকু তৃণাকে দেখে রওনকের হাসি পায়। মুচকি হাসে সে।

রওনক ফটো ফ্রেমটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। ছবির পুচকু মেয়েটার চোখে মুখে এমন একরকম নিষ্পাপ চাহনি যা বড়ো হয়ে গিয়েও পুরোটা হারায়নি। ফ্রেমটা টেবিলে আগের জায়গাতেই রেখে দেয় সে। ঠিক তখনই পেছন থেকে পায়ের শব্দ শোনা যায়।

তৃণা রুমে ঢুকতেই থমকে দাঁড়ায়। রওনককে নিজের পড়ার টেবিলের সামনে দেখে কিঞ্চিৎ অবাক হয়।

রওনক ঘুরে তাকায়। চোখে সেই চেনা স্থিরতা।
দরজা বন্ধ করে তৃণা এগিয়ে আসে।

“আপনি বিশ্রাম করবেন না?”

“নিলাম। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে।”

তৃণা কিছু বলার ভাষা খুঁজে পায় না। সে এগিয়ে এসে পড়ার টেবিলের চেয়ারটা একটু সরিয়ে রাখে। বইগুলো হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখে।

“আপনি.. বইগুলো দেখছিলেন?”
নিজেই প্রশ্নটা করে ফেলে।

রওনক হালকা মাথা নাড়ায়।
“হ্যা, আমার মনে হয় মেডিকেল লাইফ কঠিন।”

“শুরুতে কঠিন লাগে তবে অভ্যেস হয়ে যায়।”

কিছুক্ষণ নীরবতা নেমে আসে। জানালা দিয়ে দুপুরের আলো এসে মেঝেতে পড়েছে। রওনক সেই আলোর দিকে তাকিয়ে বলে,
“আমাদের বাড়িতে তোমার পড়াশোনার সমস্যা হবে না?”

তৃণা অবাক হয়ে তাকায়।
“কেন হবে?”

রওনক তার দিকে পুরোপুরি ফিরে তাকায়।

“পরিবেশ বদলালে অনেক সময় মন বসে না। নতুন মানুষ, নতুন ঘর—সব মিলিয়ে।”

তৃণা এক মুহূর্ত চুপ করে থাকে। তারপর ধীরে বলে,
“আমি পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নিতে শিখেছি।”

রওনক তার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে। সেই চোখে কোমল দৃষ্টি।
“তবুও—যদি কখনো সমস্যা মনে হয়, আমাকে জানাবে।”

তৃণা একটু অবাক হয়ে চোখ তুলে তাকায়। এমন প্রস্তাব সে আশা করেনি।
“আপনি কেনো ভাবছেন এতটা?”
প্রশ্নটা বেরিয়ে আসে অজান্তেই।

রওনক কয়েক সেকেন্ড চুপ থাকে। তারপর স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলে,
“কারণ ওটা এখন তোমার বাড়িও। হুট করে বিয়েটা হলেও তুমি আমার স্ত্রী। তোমার সকল সুবিধা-অসুবিধা দেখার দায়িত্ব আমার।”

কথাটা স্বাভাবিকভাবে বলা হলেও তৃণার ভেতরে কোথাও একটা কেঁপে ওঠে। সে চোখ নামিয়ে নেয়।

ঠিক তখনই বাইরে থেকে নাবিলার গলা ভেসে আসে,
“এই তৃণা! তোরা কি রুমে মিটিং করছিস নাকি? দরজা খুল, ছাদে যাবো।”

তৃণা অপ্রস্তুত হয়ে দরজার দিকে তাকায়।
বলে,
“ওর স্বভাব এমন দুষ্টুমি করা। কিছু মনে করবেন না।”

ঠোঁটে হালকা হাসি টেনে রওনক জবাব দেয়,
“না, মনে করিনি কিছু।”

তৃণা দরজা খুলতে এগিয়ে যায়।
দরজা খোলার ঠিক আগে রওনক শান্ত গলায় বলে ওঠে,
“চিন্তা কোরো না। সব ধীরে ধীরে সহজ হয়ে যাবে। তুমি শুধু আমার উপর বিশ্বাস রেখো তৃণলতা।”

দরজার হাতলে হাত রেখে তৃণা থমকে যায়। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালে লোকটার শান্ত হাসি দেখতে পায়।

লোকটার হাসিটা অদ্ভুতভাবে তার বুকের ভেতর কোথাও গেঁথে থাকে।

দরজা খুলে তৃণা বেরিয়ে যায়।

.

বিকেলবেলা ছাদে সকলে বসে আড্ডা দিচ্ছে। রিশান তমালের সাথে খেলছে। রওনক চেয়ারে বসে ছেলেকে দেখছে। পাশেই তৃণা বসা। মাহি, নাবিলা, তানিয়ার সাথে লুডু খেলছে।

নাবিলা প্রথমে জিতে যায়। বাকি তিনজনের খেলা চলমান।

এর মাঝে তৃণা নাবিলাকে বলে,
“দেখে আয়, মায়ের চা বানানো হয়েছে কিনা।”

নাবিলা বিরক্তির সুরে বলে,
“তানিয়াকে পাঠা না।”

“না। তুই যাবি। তানিয়া খেলছে দেখছিস না?”

“দূর ভাল্লাগে না।”
নাবিলা উঠে যায়। জিতেও শান্তি নেই। লিফট দিয়ে দোতলায় আসে।

রান্নাঘরে উঁকি দিলে দেখতে পায় শবনম বেগম একা সেখানে।
“ফুপু হয়েছে তোমার?”

“এই তো হয়ে এসেছে। আমি সব রেডি করতে করতে একটা কাজ কর তো।”

“কী কাজ?”

“রাহি গেস্ট রুমে ঘুমাচ্ছে। ওকে ডেকে দে। সবাই ছাদে আর ছেলেটা একা একা ঘুমাচ্ছে।”

নাবিলা বলতে নেয়, পারবো না। পরক্ষণেই গতকালকের ঘটনা আর ছবির কথা মনে পড়ে। এটাই সুযোগ ছবিখানা ডিলিট করার।

“যাচ্ছি।”
বলে গেস্ট রুমের দিকে এগোয় সে।

পর্দা সরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলে দেখতে পায় রাহি নিশ্চিন্তে ঘুমুচ্ছে। ফোনটা তার বুকের সাথে এক হাত দিয়ে চেপে ধরা।
নাবিলা ভাবে, এই তো সুযোগ কার্য সিদ্ধি করার!

পা টিপে টিপে বিছানার পাশে গিয়ে দাঁড়ায় নাবিলা। মোবাইলটা রাহির বুকের উপর এমনভাবে রাখা, যেন এটা তার জীবন। তাই কড়া পাহারা দিচ্ছে।

নাবিলা ফিসফিস করে বলে,
“আহাম্মক! ঘুমের মধ্যেও ফোন আঁকড়ে রেখেছে।”

আস্তে করে ফোনটা টান দিতেই রাহির কপাল কুঁচকে যায়। নাবিলা থমকে যায়। নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে থাকে।

কিছু হয় না।
সে আবার সাহস পায়। এবার একটু জোরে টান দেয়।

ঠিক তখনই রাহি পাশ ফিরে ঘুমের ঘোরে বিড়বিড় করে বলে ওঠে,
“মাহি..আমার চার্জারটা নিস না..”

নাবিলা ঝট করে হাত গুটিয়ে নিয়ে নিচে বসে পড়ে। এরপর ধীরে ধীরে মাথা তুলে তাকায়। রাহির চোখ বন্ধ। সে চোখে কুন্ডলী পাকিয়ে তাকিয়ে থাকে। এরপর উঠে দাঁড়ায়। কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে।
তারপর মনে মনে বলে, “এখন না করলে আর কোনোদিন হবে না। এটারই মোক্ষম সুযোগ।”

আবার এগোয়। ফোনটা কোনোমতে হাতে আসতেই বিজয়ের হাসি মুখে ফুটে ওঠে।

কিন্তু ঘটে যায় আরেক কান্ড।
তার কনুই গিয়ে লাগে বেডসাইড টেবিলে রাখা পানির গ্লাসে। গ্লাস উল্টে গিয়ে কিছুটা পড়ে পানি সরাসরি রাহির গায়ে!

রাহি ঝাঁকুনি দিয়ে উঠে বসে,
“এই কে.. কে.. কে?”

এর মাঝে হাতের ফোনটা ছিটকে পড়ে যায় বিছানায়। নাবিলা ভয়ে নিজের মুখ দুই হাত দিয়ে চেপে ধরে।

রাহি আধো ঘুম, আধো জাগা চোখে তাকিয়ে দেখে নাবিলা তার সামনে দাঁড়িয়ে, মুখে এমন এক্সপ্রেশন যেন ধরা পড়া চোর। তার বুঝতে বাকি নেই কিছু একটা ঘটেছে।

“আপনি এখানে কী করছেন?”

নাবিলা সঙ্গে সঙ্গে মাথায় যা আসে বলে ফেলে,
“আমি..আমি আপনার ঘুম ভাঙাতে এসেছি। ফুপু ডাকছে আপনাকে।”

রাহি ভ্রু কুঁচকে তাকায়।

সে আরও যোগ করে,
“ছাদে সবাই আড্ডা দিচ্ছে আপনি একা একা তাই ডাকতে বলেছে।”

নাবিলা হাবভাব দেখে রাহি বুঝে নেয় কিছু একটা গন্ডগোল রয়েছে। সে এদিক ওদিক তাকাতেই খাটের এক কোণায় ফোনটা দেখতে পায়। ‘খপ’ করে ফোনটা তুলে নেয়। নাবিল ধরা পড়ার পূর্বেই পালাতে চায়।

“আপনি তো উঠেই গেছেন। আমি গেলাম..”

সে পা বাড়াতে নিলেই রাহি তড়িৎ গতিতে বিছানা থেকে নেমে পথ আটকায়।

ঢোক গিলে নাবিলা এক পা পিছিয়ে বলে,
“কি সমস্যা?”

রাহি কথার পুনরাবৃত্তি করে বলে,
“আপনি না বলবেন কি সমস্যা? এটা নিতে এসেছিলেন?”

ফোনটা দেখিয়ে বলে।

নাবিলা সাথে সাথে বলে,
“মোটেও না। আমাকে কি ছেঁচড়া চোর মনে হয় নাকি?”

“উহু৷ আপনি একটা আস্ত চুন্নি। ঘুমন্ত মানুষের সুযোগ নিয়ে ফোন চুরি করতে চাইছিলেন।”

প্রতিবাদের স্বরে নাবিলা বলে,
“এক্সকিউজ মি আপনি আমাকে এভাবে অপবাদ দিতে পারেন না। শত হলেও আমার একটা রেপুটেশন তো আছে।”

ভ্রু উঁচিয়ে রাহি বলে,
“আচ্ছা? তা রেপুটেশনটা কি চুরির জন্য?”

“ইউ..”
আঙুল উঁচিয়ে নাবিলা কিছু বলতে নেয় এর মাঝে শবনম বেগমের গলা পায়, তাকে ডাকছে।

“আপনাকে আমি পরে দেখে নিবো।”

কথাটা বলে দ্রুত রুম হতে বেরিয়ে যায়।
রাহি বিরবির করে,
“চুন্নি কোথাকার।”

রুম থেকে বেরিয়ে নাবিলা দরজার দিকে তাকিয়ে বলে,
“আহাম্মক একটা। ছবিটা ডিলিট করে তারপর এরে এক উচিত শিক্ষা দিবো। না দিতে পারলে আমার নামও নাবিলা না।”

“নাবিলা কই গেলি?”

“এই তো, আসছি।”
রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ায়।
.

রাতের বেলায় এক দফা হৈ-হুল্লোড় চলে। মাহি আর রাহিকে আজকে যেতে দেওয়া হয়নি৷ অবশ্য তারাও আজ ফিরতে চাইছে না। নাবিলা, তানিয়াও থেকে গেছে। ঘর ভর্তি মানুষ থাকায় পুরো ফ্ল্যাট কেমন গমগম করছে।

সকলে মিলে কয়েক দফায় লুডু খেলে। রাহি মাঝে এসে উনো খেলার আসর বসায়। রিশান এ খেলায় পারদর্শী। সে তৃণার হয়ে খেলছে।

রওনক আর তৈয়ব উদ্দিন সোফায় বসা। দু’জনে নিজেদের সন্তানকে দেখে চলেছে।

তৈয়ব উদ্দিন হঠাৎ জিজ্ঞেস করেন,
“তা রওনক ডিউটিতে কবে ফিরছো?”

রওনক তাকিয়ে জবাব দেয়,
“এই তো সতেরো তারিখে।”

তৈয়ব উদ্দিন কিছু একটা ভাবলেন এরপর বলেন,
“বর্ডারে তো জীবনযাপন বেশ কষ্টের তা তুমি পোস্টিং এর বিষয়ে বলোনি?”

“আসলে আমি নিজ থেকেই বর্ডারে থাকতে চেয়েছি।”

“পরিবার ছেড়ে কীভাবে থাকছো? তাছাড়া তোমার চঞ্চল ছেলেটা তো বাবাকে ছাড়া বড়ো হচ্ছে। তুমি তো ওর শৈশব মিস করে ফেলছো।”

এক পলক ছেলের দিকে তাকিয়ে চুপ থাকে।
তৈয়ব উদ্দিন এর মাঝে বলেন,
“তৃণার যখন দুই মাস বয়স তখন আমার কুষ্টিয়াতে পোস্টিং হয়েছিলো। বউ বাচ্চা ফেলে কিছুতেই যেতে চাচ্ছিলাম না। ছ’মাস সেখানে থাকার পর, দরখাস্তের উপর দরখাস্ত দিয়ে তারপর আবার নিজের পরিবারের কাছে ফেরত আসি। আমার জীবনের বহু সময় পরিবারের সাথে কাটিয়েছি কিন্তু সেই ছ’মাস আর আমি ফেরত পাইনি।”

তৈয়ব উদ্দিন তার কাঁধে হাত রেখে বলেন,
“আশা করি আমার কথাটা বুঝতে পেরেছো।”

রওনক তার দিকে তাকায়। জবাবে কিছু বলে না। কি বুঝেছে একমাত্র সে-ই জানে।

বেশ রাত করে সকলে খেতে বসে। রাতের খাবার শেষে বাড়িটা ধীরে ধীরে নিস্তব্ধ হয়ে আসে। নাবিলা, মাহি একত্রে তিন্নির কক্ষে ঘুমাবে। তানিয়া ঘুমাবে তৃণার নানীর সাথে। রাহি ঘুমাচ্ছে গেস্ট রুমে।

শবনম বেগম সব গুছিয়ে রেখে একে একে লাইট বন্ধ করেন।

রিশান ঘুমিয়ে গেছে অনেক্ষণ। রাহি আর তমালের সাথে খেলতে খেলতে ক্লান্ত হয়ে সেখানেই ঘুমায় সে। রওনক তাকে কোলে করে রুমে এনেছে। সাবধানে ছেলে বিছানায় শোয়ায় সে। ছেলের হাত পা ঠিক করে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায়।
বারান্দা থেকে তৃণা বলে,
“বাতি নিভিয়ে শুয়ে পড়ুন।”

সুইচ চাপতেই বাতি নিভে যায়। তৃণা বারান্দার মেঝেতে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে কিছু ভাবছে।

“তুমি ঘুমাবে না?”
রওনকের প্রশ্নে চোখ তুলে তাকায়। চাঁদের আলোতে লোকটাকে কেমন মায়াবী লাগছে।

“পরে শুবো। আপনি শুয়ে পড়ুন।”

বারান্দার দরজা চাপিয়ে রওনক এসে তার পাশে বসে। তৃণা খানিকটা অবাক হয় বটে।

“একি বসলেন কেনো? অনেক রাত হয়েছে শুয়ে পড়ুন।”

“কেনো? আমি তোমার পাশে বসলে তোমার ভালো লাগবে না? উঠে যাবো?”

তৃণা সাথে সাথে বলে,
“আমি এমনটা বলিনি তো। আপনি বসুন।”

“এই তো এক্ষুণি বললে, শুতে।”

“বলেছি কারণ আপনি জলদি ঘুমিয়ে সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেন তাই।”

রওনক তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলে,
“একটা রাত একটু দেরিতে ঘুমালে কিছু হবে না।”

তৃণা তাকতেই দুজনের দৃষ্টি মিলিত হয়। একে অপরকে দিকে তাকিয়েরয়। কতক্ষণ তাকিয়ে ছিলো তা অজানা। তবে মূহুর্তটা ভাঙে একটা মশার কারণে। মশাটা দুজনের মাঝে এসে বেসুরো গলায় গান গাইতে শুরু করে।

রওনক দুই হাত তুলে মশাটাকে মারার চেষ্টা করে। তবে ব্যর্থ হয়।
তৃণা ফিচলে হাসে। রওনক অপমানবোধ করে।
সামান্য একটা মশাকে সে মারতে পারছে না!

“থাক। মশাটা চলে গেছে।”

“মশাটা মশকরা করে পালালো তাই তো মজা নিচ্ছো!”

রওনকের কথা শুনে তৃণা ভ্রু কুঁচকে বলে,
“মোটেও না।”

লোকটা চুপ থাকে। কয়েক মূহুর্ত কেটে যায়। আকাশের দিকে তাকায়। তৃণাও তার দৃশ্য অনুসরণ করে বলে ওঠে,
“চাঁদটা সুন্দর না?”

“হুম, সুন্দর।”

এক মূহুর্ত পর রওনক বলে,
“তোমার সাথে কিছু কথা ছিলো।”

তৃণা তাকায়।

“কীভাবে বলবো বুঝতে পারছি না।”

“বলুন, শুনছি।”

“সব মিলিয়ে সাতদিনের ছুটিতে এসেছিলাম। আজকের রাত কাটলে আর চারদিন ছুটি থাকবে। তার মধ্যে তিনদিন ছুটি কাটাবো। এর পরের দিনই ফেরত গিয়ে নেক্সট ডে তে সকাল বেলা ডিউটিতে জয়েন করতে হবে।”

কথাগুলো বলে রওনক তার দিকে তাকায়। তৃণা কিছু না বলে চোখ নামিয়ে ফেলে। তার নীরবতা বলে দিচ্ছে অনেক কিছু।

“আমাকে ক্ষমা করে দিও তৃণলতা। আমি তোমার পাশে থাকতে পারছি না।”

তৃণা কিছুক্ষণ চুপ থাকে। জবাব না পেয়ে রওনকের ভেতরে অস্বস্তি হয়।

“কিছু তো বলো..”

মৃদু স্বরে জবাব দেয়,
“আপনি যদি কথা দেন সহি সালামত আমাদের কাছে ফিরবেন তাহলে আর আমার খারাপ লাগবে না।”

রওনক হালকা নিশ্বাস ফেলে। চাঁদের আলোতে তার চোখে কিছুটা ক্লান্তি, কিছুটা দুশ্চিন্তা ফুটে ওঠে।

“আমি ঠিক থাকবো চিন্তা কোরো না। তুমি শুধু রিশানকে আগলে রেখো, ওকে ভালোবেসো।”

“আর আপনাকে?”

প্রশ্নটা করে তৃণা নিজেও থমকে যায়। এমন প্রশ্ন তার মুখ দিয়ে বেরোবে ভাবেনি সে।

রওনক তাকাতেই তৃণা খানিকটা বিচলিত হয়ে নিজের শাড়ির আঁচল হাতের মুঠোয় নিয়ে শক্ত করে চেপে ধরে। লোকটা কি বলবে এবার? ভাবতেই তার সারা শরীর ঘেমে ওঠে।

“আমায় ভালোবাসা যায় না তৃণলতা। আমি ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য নই।”

তৃণার বিচলিত নয়নে বিস্ময়ে ভরে ওঠে।

(চলবে..)

(একদল আমি পোস্ট করার পূর্বেই চ্যাট জিপিটি দিয়ে লিখে পর্ব পোস্ট করতেছে। কি যে যন্ত্রণায় পড়লাম! আপনারা আমার পেইজ ব্যতিতো অন্য কোথাও মেজর শিকদার পড়বেন না। কষ্ট করে এদের উক্ত পোস্টে একটা রিপোর্ট দিয়ে দিবেন।

এই চোরদের কারণে পেইজে রিচ নেই। তাই আপনারা কষ্ট করে পেইজের রিভিউ সেকশনে গিয়ে দুই লাইনের একটা রিভিউ লিখে দিন। এতে সকলের কাছে আমি পর্ব পোস্ট করলে পৌঁছাবে। কীভাবে কি করতে হবে পিন পোস্টে দিয়ে দিবো।

এই পর্বে ২.৫ রিয়েক্ট আর যে যত পারেন কমেন্ট করুন। রিচ হলে দ্রুত পরের পর্ব পাবেন।)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply