মেজর_শিকদার-০৪
ঈশিতা_ইশা
(আমার লেখা কপি পোস্ট করতে নিষেধ করছি। যারা এই কাজ করছেন তাদেরকে আবারো নিষেধ করে দিচ্ছি। আপনাদের কপি পোস্টের কারণে আমার পেইজের রিচ তলায় চলে গেছে।)
…
সুন্দর এক রাত পেরিয়ে সকাল হয়। সূর্য উঠেছে বহু পূর্বে। বারান্দার কাচে লাগানো পর্দা ভেদ করে সেই আলো রুমের ভেতর অবধি পৌঁছাতে পারেনি।
কমফোটারের নিচে আরাম করে ঘুমুচ্ছে তৃণা। ঘুমের মাঝে নড়েচড়ে পাশ ফিরে শোয়। কয়েক মূহুর্ত পর কমফোটারটা কপাল অবধি টেনে নেয়। এরপর কি হলো কে জানে! আচমকা ধীরে ধীরে কমফোটার নামিয়ে চোখ মেলে তাকায় সে। ঘুমঘুম চোখে পাশে তাকালে দেখে রওনক পাশে নেই। কয়টা বাজে দেখার জন্য পাশ থেকে ফোন তুলে নেয়। ঘড়িতে সময় সকাল আটটা। ভ্রু কুঁচকে চিন্তা করে- এতো সকাল সকাল লোকটা উঠে কোথায় গেলো?
কমফোটার সরিয়ে সে বিছানা থেকে নামে। চুলগুলো হাত খোঁপা করে বারান্দায় থাই খুলে দাঁড়ায়।
রওনকের বারান্দার অর্ধেক অংশ খোলা গ্রিল নেই, স্রেফ কাচ লাগানো। খোলা অর্ধেক দিয়ে হাওয়ার ঝাপটা এসে ছোট ছোট চুল গুলোর সাথে খেলছে। সতেজ হাওয়ায় তৃণার মন প্রাণ জুড়িয়ে যায়।
চারিদিকে চোখ বুলালে তার নজর যায় বাগানের বাম দিকটাতে। সেখানে খোলা ঘাসের উপর কেউ পুশ আপ করছে। তার উচ্চতা আার স্বাস্থ্য দেখে তৃণার বুঝতে বাকি নেই লোকটা রওনক।
হাঁটু অবধি শটর্স, গায়ে হাতা কাটা গেঞ্জি। তার পাশে একজন মেইল সার্ভেন্ট একটা বড়ো সাইজের বোতল আর তোয়ালে হাতে দাঁড়িয়ে।
পুশ আপ শেষ হতেই রওনক উঠে দাঁড়ায়। তোয়ালে আর বোতলটা নিয়ে সার্ভেন্টকে কিছু বলে। তা তৃণার কান অবধি এসে পৌঁছায়নি।
সার্ভেন্ট যেতেই রওনক তোয়ালে দিয়ে কপাল, মুখ মুছে গলায় ঝোলায়। এরপর বোতলের মুখ খুলে পান করার জন্য উদ্যত হতেই নজর যায় দোতলার বারান্দার দিকে। তৃণা অর্ধ কাচে হাত ঠেকিয়ে তাকিয়ে ছিলো।
বাম হাত উঁচিয়ে বলে,
“গুড মনিং। এক্সারসাইজ করবা? চলে আসো।”
রওনকের কথা শুনে লজ্জায় তৃণা আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়ায়নি। সোজা রুমে ঢুকে যায় সে। রওনক বুঝলো না মেয়েটার এভাবে প্রস্থানের কারণ।
রুমে এসে তৃণা লজ্জায় কিছুক্ষণ বালিশ জড়িয়ে ধরে। পরক্ষণেই মনে হয়- সে কেমন কিশোরীদের মতো আচরণ করছে! তাছাড়া রওনক তার বর হয়। নিজের বরকে সে দেখতেই পারে! এতে লজ্জা পাওয়ার কী আছে?
বিছানা থেকে নেমে চিন্তা করে ফ্রেশ হয়ে পোশাক বদলে নিবে। চিন্তা মাফিক তোয়ালে আর থ্রি-পিস নিয়ে বাথরুমে ঢুকে।
মুখ ধুয়ে থ্রি-পিস বদলে বের হয়ে দেখে রওনক সিঙ্গেল সোফায় পায়ের উপর পর তুলে বসা। ফোনে কারো সাথে কথা বলছে। শব্দ পেয়ে সে তাকায়।
তৃণা যথা সম্ভব নিঃশব্দে আয়নার সামনে এসে চুল আঁচড়ে নেয়।
“নিচে যাচ্ছো?”
প্রশ্নটা শুনে তৃণা না তাকিয়ে উত্তর দেয়,
“হ্যা।”
“শাড়ি পরে যাও। দাদুন না হয় রাগ করবে।”
“কিন্তু..”
বাকিটা বলার পূর্বেই রওনক বলে,
“গেস্ট রুমে যাও। সেখানে মাহি আছে তোমাকে সাহায্য করার জন্য। আমি গোসল করে একেবারে ফ্রেশ হয়ে নিচে আসবো।”
তৃণা কি বলবে বুঝতে পারছে না। লোকটা না চাইতেই তার দিকে এতো খেয়াল রাখছে! সবটাই কী দায়িত্ব নাকি সে নিজ থেকে এসব করছে? অগণিত প্রশ্ন আছে কিন্তু উত্তর নেই!
লাগেজ খুলে তৃণা শাড়ি বাছাই করতে বসে।
রওনক এগিয়ে এসে বসে,
“লাল রঙের শাড়ি আছে? থাকলে সেটা পরো। লালে তোমায় খুব মানায়।”
কথাটা বলে লোকটা বাথরুমে ঢুকে যায়। তৃণা বিস্ময়কর দৃষ্টিতে এখনো তাকিয়ে আছে। এই লোকটা এমন কেনো? সব কিছু গুলিয়ে দিচ্ছে। এতো স্বাভাবিক আচরণ হজম করতে তার বেশ কষ্ট হচ্ছে।
.
মাহি শাড়ি পরিয়ে তাকে সুন্দর করে সাজিয়ে দিয়েছে। দাদুন নাকি সাজগোছ বেশ পছন্দ করেন। তার সামনে পরিপাটি হয়ে না গেলে রাগ করবেন। কনে বদলের কথাটা তাকে এখনো বলা হয়নি। তিন্নিকে তিনি সরাসরি দেখে পছন্দ করেছিলেন। তৃণার ভেতরে ভেতরে ভয় হয়- দাদুন তাকে পছন্দ করবেন তো?
সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছে সে। তাকে ধরে রেখেছে মাহি। একটু পরপর মাথার ঘোমটা ঠিক করে সে।
সোফায় আতিয়া শিকদার বসা। তার পাশের সোফায় আকরাম শিকদার খবরের কাগজ পড়ছেন। মিসেস জান্নাত এসে শাশুড়ীর বাম দিকে বসেন। সার্ভেন্ট চায়ের ট্রে রেখে যায়। তিনি এক কাপ তুলে শাশুড়ীর দিকে বাড়িয়ে দেন।
আতিয়া শিকদার বিরক্তি নিয়ে বলে,
“তোর হোলার বউ কি অহনো গুমাই? বেলা অইয়া গ্যাছে, অহনো নয়া বউ উঠে নাই?”
মিসেস জান্নাত বিব্রত গলায় জবাব দেন,
“মাহি ওকে আনতে গেছে।”
আতিয়া শিকদার চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বিরক্ত হন। কাজের মেয়েটা আবারো চায়ে কম চিনি দিয়েছে। অথচ চায়ে মিষ্টি না হলে তিনি একদমই খেতে পারেন না।
দুজনকে দেখে মিসেস জান্নাত বলে উঠেন,
“ঐ তো ওরা চলে এসেছে।”
মাহি তৃণার কানে কানে কিছু বলে ইশারা করে আতিয়ার সামনে যেতে। মাথা নিচু করে তৃণা তার সামনে যান। এরপর কোনো মতে একটু হাঁটু ভেঙে আতিয়ার পায়ে হাত দেয়।
মাহি বলে দিয়েছে, এভাবে দাদুনের পায়ে হাত দিয়ে সালাম না করলে তিনি অখুশি হবেন। অথচ তৃণা এসব অপছন্দ করে। শুধু মাত্র মাহির কথায় কোনোমতে পায়ে হাত ছুঁইয়ে উঠে দাঁড়ায়।
আতিয়া শিকদার চরম অসন্তোষ হন।
ধমকের স্বরে বলে,
“এ কি তুই মুরব্বিদের সালামও কইতে পার না? তোরে দেহি কিছুই শিখাই নাই।”
তৃণা পায়ে আবার হাত দিতে নিলে তিনি বলে উঠেন,
“থাক, আর কইতে হইব না। অহন যা, তোর শ্বশুর-শাশুড়ীকেও সালাম কর।”
আকরাম সাথে সাথে বলে,
“না না থাক। আপনাকে করেছে তাতেই হবে।”
আতিয়া শিকদার তখনো তৃণাকে ভালো করে দেখেননি। চশমা ছাড়া তিনি অস্পষ্ট দেখেন।
“নাত বউ পাসে আইয়া বস।”
তৃণা ভয়ে ভয়ে তার ডান দিকে এসে বসে। আতিয়া চোখ কুঁচকে তাকে দেখার চেষ্টা করেন। গতকালকেই তার চশমাটা ভেঙে গেছে। চশমা ছাড়া কাছের সব কিছু অস্পষ্ট দেখেন। তার দূরের ভিশনেরও একই অবস্থা।
মিসেস জান্নাত ভাবছেন- তৃণাকে দেখার পর তার শ্বাশুড়ী কেমন রিয়েক্ট করবে! যদিও আকরামকে সে এই কারণেই এখানে বসিয়ে রেখেছে পরিস্থিতি সামাল দিতে কিন্তু তাও তার ভয় হচ্ছে।
আতিয়া বলেন,
“দেহি তো, নাত বউর মুখটা ঠিকমত। জদুও চশমা ছাড়া ঠাওর করতে পারতেছি না।”
তিনি তৃণার থুঁতনি ধরে মুখ এদিক ওদিক ঘুরান। তৃণা ভয়ে ভয়ে তার দিকে তাকায়।
“হ্যাঁ রে জান্নাত, নাত বউ কি এরে দেহতাছি? মুইর কাছে তো চেহারা মিলে না।”
মিসেস জান্নাত ঢোক গিলে কিছু বলতে নিলে মাহি বলে,
“দাদুন তোমার বয়স হয়েছে তো তাই চেহারা ভুলে গেছো। আর ওকে তো তুমি একবার দেখেছিলে তাও সেই কবে। এতোদিন কি চেহারা মনে থাকে?”
আতিয়া শিকদার মাথা নাড়িয়ে বলেন,
“না তো। আঁই এমন মাইয়া না জে এতো সহজে ভুল্যা যাইমু। চশমা থাকলে ভাল হইত।”
আকরাম শিকদার কিছু বলতে নিলে মিসেস জান্নাত তাকে ইশারায় চুপ থাকতে বলে। এই সময় আতিয়া যদি জানে কনে পালিয়ে গেছে আর সেই মেয়ের বোনকে ছেলের বউ করা হয়েছে তাহলে সে এটা নিয়ে বিলাপ করবে। তিনি চান না, এই ঘটনা নিয়ে তার শ্বাশুড়ি ঝামেলা করুক। তার চেয়ে মাহি যেভাবে ঘটনা ধামাচাপা দিচ্ছে, দেক।
আকরাম শিকদার বলেন,
“আম্মা আপনার বয়স হয়েছে তো তাই হয়তো চিনতে পারছেন না।”
আতিয়া শিকদার বলেন,
“কি জানি বাপ! অহকাল অনেক কিছুই ভুল্যা যাই। কয়েকবার না দেহলে কিছু মনে থাকে না।”
তিনি আঁচলের তলা থেকে গয়নার বাক্স বের করে তৃণার সামনে ধরে বলেন,
“তিন্নি নিছে, এ তোর লাইগা।”
তিন্নি নাম শুনে মাহি জিভে কামড় দেয়। দাদুন নামটা ভুলেনি! এবার কি হবে!
তৃণা মাথা নিচু করে বাক্সটা নেয়। তবে তিন্নির নাম শুনে সে আহত হয়েছে। সবাই কেনো কনে বদলের বিষয়টা লুকাচ্ছে! বললেই হতো তিন্নি আর তৃণা ভিন্ন মেয়ে।
রিশান চোখ ডলতে ডলতে রাহির রুম থেকে বের হয়। বসার ঘরে সকলকে দেখে ছুটে আসে। তার নজর যায় তৃণার দিকে। তাকে দেখে ছুটে এসে তার কোমড় জড়িয়ে ধরে।
আতিয়া শিকদার হেসে বলেন,
“রিশু, মুইর কাছে আই।”
রিশান জবাব দেয়,
“নো।”
“কেন আইব না?”
“তৃণের কাছে থাকবো।”
“ড্যাডির কাছেও আসবা না?”
রওনকের গলা পেয়ে রিশান তাকায়। ড্যাডিকে দেখে তার কাছে ছুটে যায়। রওনক ছেলেকে কোলে তুলে নেয়।
এর মধ্যে সার্ভেন্ট এসে জানায় নাশতা বানানো হয়ে গেছে।
আতিয়া শিকদার বলেন,
“নয়া বউ অহনো আজকে রানব না?”
মিসেস জান্নাত জবাব দেন,
“ও তো আজকে বাপের বাড়ি যাবে। এসে তারপর না হয় একদিন রান্না করবে।”
আতিয়া শিকদার আর কিছু বলেননা। উঠে ডাইনিং এর দিকে যান। মিসেস জান্নাত হাঁপ ছেড়ে বাঁচেন। খবরের কাগজ ভাজ করে আকরাম শিকদার ও উঠে যান।
মিসেস জান্নাত মাহিকে বলে,
“তৃণাকে নিয়ে ডাইনিং এ যাও, আমরা আসছি।”
কথা মতো মাহি তৃণাকে নিয়ে চলে যায়।
মিসেস জান্নাত রওনকের দিকে তাকিয়ে বলেন,
“তৃণাকে নিয়ে দুদিন তোমার শ্বশুরবাড়িতে থেকে আসো। এর মাঝে তোমার দাদুনও বেড়াতে যাবে।”
“কেনো মম? এনিথিং রং?”
ছেলের প্রশ্নে মিসেস জান্নাত চুপ থাকেন। রওনক সবটা জানলে রাগ করবে। তাই তিনি ঘটনা এড়িয়ে যেতে বলেন,
“কিছু না। তৃণাকে ওর বাবার বাড়ি থেকে ঘুরিয়ে আনো।”
তিনি উঠে চলে যান। রওনকের কিছু একটা খটকা লাগে। তারপরও সে চুপ থাকে। চলে যায় নাশতা খেতে।
সকালের নাশতা খাওয়ার পর রওনক নতুন বউ আর ছেলেকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।
গাড়ি ড্রাইভ সে-ই করছে। তৃণা পাশের সিটে বসা। রিশান পেছনের সিটে বসে ফোনে গেমস খেলছে।
রাস্তায় জ্যাম থাকাতে পৌঁছাতে বেশ সময় লাগে। সকাল গড়িয়ে বেলা হয়।
বাসার নিচে গাড়ি থামতেই তৃণা তার বাবাকে কল লাগায়।
রওনক বিষয়টা খেয়াল করতেই বলে,
“কাকে কল দিচ্ছো?”
“বাবাকে।”
“কেনো?”
“বাবা বলেছিলো বাসার নিচে এসে কল দিতে।”
রওনক কিছু বলার পূর্বেই তৈয়ব উদ্দিন আর তমাল এসে হাজির হয়। এবার সে বুঝতে পারে ঘটনা।
গাড়ি থেকে একে একে তারা নামে। রিশান তৃণার হাত ধরে দাঁড়ায়। তৈয়ব তাদেরকে ভেতরে যেতে বলে। রওনক তাকে সালাম দেয়।
এরপর শ্বশুর বাড়ির জন্য আনা বাজার, মিষ্টি গাড়ির ডিঁকি থেকে বের করে। তৈয়ব এতো কিছু দেখে বেশ রাগ করেন।
“এসবের কি দরকার ছিলো বাবা? তোমরা এসেছো তাতেই আমরা খুশি।”
রওনক সৌজন্য হাসে। এই প্রথমবার সে নিজ হাতে বাজার করেছে। অনভিজ্ঞ হওয়াতে বুঝতে পারছে না সব কিছু ঠিকঠাক এনেছে কিনা।
“এভাবে বলে আমায় লজ্জা দিবেন না প্লিজ। আমার ইচ্ছে হয়েছে তাই সামান্য এসব এনেছি।”
তৈয়ব আর কিছু বলার মতো খুঁজে পাননি। রওনক নিজে নিজে ব্যাগ দুটো তুলতেই সে সাহায্য করতে চায়। কিন্তু ছেলেটা সাহায্য নাকচ করে দেয়। একাই ব্যাগ দুটো নিয়ে উঠবে বলে মনঃস্থির করে।
তৈয়ব তমাল দুজনেই বেশ বিব্রতকর পরিস্থিতে পড়ে।
তৃণা ফ্ল্যাটে ঢুকতেই রান্নার সুবাস পায়। সে রিশানকে নিয়েই এগিয়ে যায়। মা, চাচী আর নানী রান্নাঘরে রান্না করছেন। রিশানের হাত ছেড়ে পেছন থেকে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে।
আচমকা কারো স্পর্শ পেয়ে শবনম বেগম খানিকটা হকচকিয়ে যায়। পরক্ষণেই বুঝতে পারে এ তার মেয়ে তৃণা।
তার দু-চোখ ভিজে ওঠে।
“কেমন আছো মা?”
তিনি ঘুরে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন,
“আমরা তো ঠিক আছি। তুই ঠিক আছিস কিনা বল আগে।”
“হ্যা আমি ভালো আছি। চিন্তা করো না। ও বাড়ির লোক সবাই খুব ভালো।”
তৃণার চাচী মাঝ খানে বলে ওঠে,
“নতুন নতুন সবাই ভালো থাকে রে মা। আসল চেহারা তো পরে বের হয়। তার উপরে এক বাচ্চার বাপ! হেয় কি নিজের প্রথম বউরে ভুলতে পারছে নাকি?”
“ইন্দিরা থামো তো। আজেবাজে কথা বইলো না একদম।”
মুখ কালো করে তিনি তরকারি নাড়তে থাকেন।
তৃণার নানী বলেন,
“নাত জামাইয়ের লইগ্গা সরবত বানাইছিস না? তৃণারে দে, দিয়া আহুক।”
শবনম বেগম মেয়েকে ছেড়ে ফ্রিজ খুলে এক জগ সরবত, মিষ্টি বের করেন। সেগুলো ট্রে তে সাজিয়ে তৃণার হাতে তুলে দেন।
ট্রে হাতে নিয়ে তৃণা ধীর পায়ে বসার ঘরের দিকে এগোয়। রিশান তাকে ফেলেই ছুটে আগে চলে গেছে।
তৃণা এগুচ্ছে আর বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে কাঁপছে। নিজের ঘর, নিজের মানুষ তবুও আজ সবকিছু নতুন লাগছে।
বসার ঘরে ঢুকতেই দেখে রওনক আর তৈয়ব উদ্দিন মুখোমুখি বসে আছেন। তমাল পাশে দাঁড়িয়ে। রওনক কথা কম বলছে, বেশি শুনছে। চোখে-মুখে একধরনের গভীর মনোযোগ। তৈয়ব উদ্দিন নানান বিষয়ে কথা বলে চলেছেন। রওনক শুনছে আবার মাঝে মাঝে জবাব দিচ্ছে।
রিশান ড্যাডির পাশে বসে পা নাড়িয়ে চারপাশটা কৌতূহলী চোখে দেখছে। গতকালকে এতো মানুষ ছিলো অথচ আজ মানুষ না থাকায় তার নজর ফ্ল্যাটের আনাচে-কানাচে ঘুরছে।
তৃণা ট্রেটা টেবিলে নামিয়ে প্রথমে বাবার দিকে সরবতের গ্লাস বাড়িয়ে দেয়।
তৈয়ব উদ্দিন বলেন,
“আরে জামাইকে দাও আগে।”
তৃণা রওনকের দিকে গ্লাস ধরলে সে বলে,
“আগে শ্বশুর আব্বাকে দাও। আপনি নেন, আমি নিচ্ছি।”
মেয়ে জামাইয়ের কথা তিনি ফেলেন না। তৃণার হাত থেকে গ্লাসটা নেন। রওনক তমালকে ডেকে পাশে বসতে বলে। সে বেশ লজ্জা পাচ্ছিলো। ভাইকে লজ্জা পেতে দেখে তৃণা বেশ অবাক হয়।
তার এই বজ্জাত, দূরন্ত ভাইটা লজ্জা পাচ্ছে!
রওনক তার দিকে সরবতের গ্লাস এগিয়ে দিলে সে নেয় না। শেষে তৈয়ব উদ্দিন তাকে নিতে বললে নেয়।
সরবতের একটা গ্লাস তুলে রওনক তাতে চুমুক দেয়। রান্নাঘর থেকে শবনম বেগম এবং তার মা বেরিয়ে আসে। ওড়না তুলে মাথায় দিয়ে নেয় শবনম।
“কেমন আছো বাবা?”
শাশুড়ীর গলা পেয়ে রওনক উঠে আসে সালাম করতে। শবনম বেগম কোনো মতে তাকে থামায়।
সালাম দিয়ে রওনক জবাব দেয়,
“আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। আপনারা ভালো আছেন?”
“হ্যা আমরা তো ভালোই। তুমি গিয়ে বসো।
“নানু আপনি ভালো তো?”
তৃণার নানী হেসে জবাব দেয়,
“হ ভালো।”
“আপনিও বসুন।”
“না তুমি গিয়া বসো।”
নানীর কথা মতো রওনক এসে সোফায় বসে।
তৃণা নিজের মায়ের দিকে তাকিয়ে ছোট করে হাসে। সেই হাসির ভেতরে কতটা স্বস্তি তা তার মা বুঝতে পারেন।
শবনম বেগম বেশ অবাক হয়েছেন মেয়ে জামাইয়ের আচরণে। তার বড়ো মেয়ে এতো ঝামেলা বাঁধিয়ে চলে গেলো অথচ ছেলেটা এতো সহজে সবটা মেনে নিয়ে তাদের সাথে কি সুন্দর ব্যবহার করছে!
লোকটা দেখতে যেমন, আচরণেও তেমন।
রিশান হঠাৎ সোফা থেকে নেমে তৃণার পাশে এসে দাঁড়ায়।
“তৃণ, এইটা তোমার বাড়ি?”
তৃণা মাথা নেড়ে বলে,
“হ্যাঁ। আমার বাড়ি।”
রিশান মুহূর্তও দেরি না করে বলে,
“তাহলে আমিও এখানকার মানুষ?”
এই কথায় তৈয়ব উদ্দিন হেসে ফেলেন।
“হ্যা তুমি এই বাড়ির মানুষ। এদিকে আমার কাছে আসো।”
রিশান তৈয়ব উদ্দিনের দিকে তাকায়। তৃণা বলে,
“যাও।”
ছোট্ট ছোট্ট পায়ে সে তৈয়ব উদ্দিনের কাছে এগিয়ে যায়। সে রিশানকে কোলে তুলে নেয়।
রওনকের চোখে এক ঝলক স্বস্তি ভেসে উঠে। নিজের বাড়ির লোক ব্যতিতো, ছেলেটাকে এভাবে কখনো কারো সাথে মিশতে দেখেনি সে।
.
নতুন জামাইয়ের জন্য বেশ তোরজোর করে রান্না করা হচ্ছে। শবনম বেগম সকল রান্না নিজ হাতেই করছেন।
দরজা ঠেলে নাবিলা রুমে উঁকি দিয়ে দেখে তৃণা একা একা বসে ডায়েরি খুলে কিছু একটা লিখছে। সে বিনা অনুমতিতে ভেতরে প্রবেশ করে। হঠাৎ চোখ তুলে নাবিলাকে দেখে তৃণা অবাক হয়ে যায়। সাথে সাথে ডায়েরিটা পেছনে লুকায়।
নাবিলা মন খারাপ করে বলে,
“দিলি তো সারপ্রাইজ নষ্ট করে! ধ্যাত!’
“তুই কখন এলি?”
“মাত্রই। সকাল বেলা কল পেলাম তোরা আসবি তাই দাওয়াত খেতে চলে এলাম৷ তানিয়াও এসেছে।”
“ভালো করেছিস এসে। রান্নাঘরে যা। আমি ব্যস্ত আছি।”
“কি করছিস রে? কি লুকিয়ে রেখেছিস একবার দেখা।”
“উহু। এটা আমার ব্যক্তিগত জিনিস। তুই এখান থেকে যা।”
তৃণার বারণ শুনে নাবিলা ভেংচি দিয়ে বেরিয়ে যায়।
নাবিলা যেতেই তৃণা স্বস্তি পায়। এর মাঝে সে ডায়েরিটা বিছানার উপর রেখে নামে দরজা আটকাতে। যেই দরজায় হাত দেয় অমনি রওনক ভেতরে প্রবেশ করে। তৃণা বেশ হচকচিয়ে যায়।
প্রশ্ন করে,
“আপনি এই রুমে? কিছু লাগবে?”
রওনক পাল্টা বলে,
“তুমিই তো ডাকলে। তাই তো উঠে এলাম।”
“আমি আবার কখন ডাকলাম? আর আপনাকে কেনোই বা ডাকবো?”
“সেটা তো তুমিই ভালো জানো। নাবিলা বললো, তুমি ডাকছো তাই..”
এরি মাঝে দরজা লাগনোর শব্দ হয়। তৃণা ঘুরে দেখে নাবিলা দরজাটা বাহির থেকে বন্ধ করে দিয়েছে। সে ঘুরে দরজায় কয়েকবার আঘাত করে বলে,
“নাবিলা দরজা খোল।”
বাহির থেকে মুখ চেপে সে হাসতে থাকে।
“তুই দরজায় এভাবে আঘাত করলে খুলবো না। চুপচাপ থাক একটু পরই খুলে দিবো।”
তমাল শব্দ পেয়ে এগিয়ে এলে নাবিলা তাকে ভাগিয়ে দেয়। সেখানে দাঁড়িয়ে দু-এক মিনিট ফোন স্ক্রোল করে, তারপর তার ডাক পড়তেই সেখান থেকে সরে যায়।
বিছানার উপর রাখা ডায়েরিটায় রওনকের চোখ পড়ে। অজান্তেই সে তুলে নেয়।
তৃণা বেশ বিরক্ত হয়। সে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে রওনকের হাতে তার ডায়েরি। তার প্রাণ পাখি উড়ে যায় যায় অবস্থা।
“ওটা ধরবেন না..”
রওনক কিছু বলার আগেই তৃণা দৌড়ে এগোয়।
দ্রুত কদম ফেলে এগুতেই পা পিছলে সোজা গিয়ে পড়ে রওনকের গায়ের উপর। লোকটা অপ্রস্তুত থাকায় দুজনেই ‘ধপাস করে বিছানায় আঁচড়ে পড়ে।
দুজনেই বিছানায় পড়ার পর এক মুহূর্তের জন্য সময় যেন থমকে যায়।
তৃণার দু’হাত রওনকের বুকের ওপর চেপে আছে। শ্বাসটা এলোমেলো হয়ে গেছে। রওনকও নড়ছে না। হঠাৎ পাওয়া এই নিকটতায় সে নিজেও অপ্রস্তুত।
তৃণা তড়িঘড়ি করে সরে যেতে চায় কিন্তু ততক্ষণে চোখে চোখ পড়ে যায়। এই প্রথম এতো কাছ থেকে রওনকে দেখা।
রওনক নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করে,
“তুমি ঠিক আছো?”
লোকটার কণ্ঠস্বরটা অদ্ভুতভাবে শান্ত।
তৃণা কথা খুঁজে পায় না। শুধু মাথা নাড়ে।
রওনক ধীরে উঠে বসে, সাথে সাথে তৃণাকেও বসতে সাহায্য করে।
ইচ্ছাকৃতভাবে ছোঁয়া এড়িয়ে গেলেও অনিচ্ছুক আঙুলের হালকা স্পর্শটা দু’জনেই টের পায়। তৃণা চোখ নামিয়ে নেয়। বুকের ভেতর অকারণে ধকধক করছে।
রওনক ডায়েরিটার দিকে তাকায়, আবার তাকায় তৃণার দিকে।
“আমি কিছু দেখিনি।”
সে ধীরে বলে,
“তুমি চাইলে আমি কখনোই তোমার ব্যক্তিগত বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবো না।”
এরপর সে তৃণাকে তার ডায়েরি ফিরিয়ে দেয়।
মাথা নিচু করেই তৃণা তা ফেরত নেয়। চোখ তুলতে পারে না।
এক মুহূর্তের জন্য দু’জনেই চুপ করে থাকে।
হঠাৎ তৃণার কপালের উপর নেমে আসা কয়েক গোছা চুল বাতাসে সরে এসে চোখ ঢেকে দেয়।
রওনক অন্যমনস্কভাবে হাত তুলেই থমকে যায়।
এক সেকেন্ড দেরি করে সে বুঝতে পারে—
হাতটা আর নামানো যাচ্ছে না।
ধীরে, খুব সাবধানে সে তৃণার খোলা কেশগুলো আঙুল দিয়ে সরিয়ে কানের পেছনে গুঁজে দেয়।
স্পর্শটা এতটাই হালকা যে, তৃণা বুঝতে পারে না কি হচ্ছে।
রওনক সঙ্গে সঙ্গে হাত নামিয়ে নেয়। গলা পরিষ্কার করে বলে,
“সরি..আসলে চুলগুলো তোমার চোখ ঢেকে দিচ্ছিলো তাই..”
তৃণা কিছু বলে না।
শুধু ডায়েরিটা বুকের সাথে চেপে ধরে।
ঠিক তখনই বাইরে নাবিলার কণ্ঠ শোনা যায়,
“এই! দরজা খুলছি। বের হ।”
মুহূর্তটা আবার ভেঙে যায়। রওনক উঠে ধীর পায়ে বেরিয়ে যায়।
কিন্তু তৃণা স্বাভাবিক হতে পারে না। তার কানের পেছনে এখনো সেই স্পর্শটা জ্বলজ্বল করে।
…
(চলবে..)
(আমি নোয়াখালীর ভাষা পারি না। গুগল ঘেঁটে ট্রান্সলেশন করেছি। ভুল ভ্রুটি হলে ছঋ। এই পর্বে সবাই রেসপন্স করবেন প্লিজ। আজকে বেশ বড়ো করে লিখেছি। লাইক কমেন্ট না করলে লিখার উৎসাহ হারিয়ে ফেলবো।)
Share On:
TAGS: ঈশিতা ইশা, মেজর শিকদার
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE