মেজর_শিকদার-০২
ঈশিতা_ইশা
(কপি নিষিদ্ধ)
…
রওনকের কথা শুনে সকলে বিস্ময় নিয়ে তাকায়। তৃণার মনে হলো লোকটার কথা বোমার মতো বিস্ফোরণ হয়েছে। সকলের চাওনি কেমন অদ্ভুত ভাবে বদলে গেছে।
কোনো রকম ভনিতা ছাড়া রওনক বলে,
“হুট করে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়াতে আমাকে সকলে ক্ষমা করবেন। আঙ্কেল আপনাদের আপত্তি নেই তো?”
লোকটা এতো সাবলীলভাবে কথা বলছে যেনো কিছুই হয়নি!
তৈয়ব উদ্দিন জবাব দেন,
“তৃণা তো তোমার চেয়ে অনেকটা ছোট বাবা। ও কী সংসার সামলাতে পারবে?”
রওনক তৃণার দিকে তাকিয়ে বলে,
“এতোটাও ছোট নয় সে। তারপরও আমি ওর সাথে কথা বলে নিবো। আপনারা রাজি থাকলে তারপর ওর মতামত নেওয়া হবে। আপনারা রাজি না থাকলে এই কথা এখানেই শেষ।”
তৈয়ব উদ্দিন স্ত্রীর দিকে তাকান। তাদের চোখে মুখে সংকোচ স্পষ্ট। তিন্নির সাথে বিয়ের বিষয়ে আপত্তি করেননি তারা। দুজনের বয়সের ফারাক ছিলো দশ বছরের। কিন্তু তৃণার বিষয়ে তারা ভাবতে পারছেন না।
রওনক মিসেস জান্নাতকে বলে,
“মম কিছু বলো।”
মিসেস জান্নাত বলেন,
“রওনক যদি বিয়েটা করে তাহলে আমাদেরও আপত্তি নেই। তবুও বিয়েটা হোক।”
শবনম বেগম চোখের ইশারায় স্বামীকে অভয় দেন।
“ঠিকাছে তবে তৃণার যদি কোনো আপত্তি না থাকে তাহলে আমাদেরও আপত্তি নেই।”
মেয়ের বাবা রাজি হতেই রওনক বলে,
“তাহলে আমি কি তৃণার সাথে একান্ত পাঁচ মিনিট কথা বলতে পারি?”
শবনম বেগম বলেন,
“অবশ্যই। ভেতরে আসো আমরা বেরিয়ে যাচ্ছি।”
শবনম বেগম স্বামীকে ইশারা করেন। তিনি প্রথমে বেরিয়ে যান। এরপর একে একে সকলে রুমটা ফাঁকা করে দেয়।
তৃণা সরে খাটের সাথে লেগে দাঁড়ায়। রওনক ভেতরে প্রবেশ করে দরজার ছিটকিনি আঁটকে দেয়।
বাড়ির মুরব্বিরা বসার ঘরে চিন্তিত হয়ে বসে আছে। এদিকটায় কেউ নেই। নাবিলা পা টিপে টিপে এসে দরজার সামনে দাঁড়ায়। আশে পাশে তাকিয়ে দরজায় কান লাগায়।
তৃণা অনুভব করে তার হাত-পা কাঁপছে। সেই সাথে ভীষণ নার্ভাস লাগছে। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে সে। ওড়নার একাংশ মুঠো বন্দী করে রেখেছে। ইতিমধ্যে তা ঘামে ভিজে উঠেছে। বুকের ভেতর টিপটিপ করছে। এভাবে কখনোই লোকটার সাথে একান্ত কথা হয়নি। মাহির সাথে থাকা অবস্থায় যতবার দেখা হয়েছে ততবার শুধু সে হেসে জিজ্ঞেস করেছে,
“ভালো আছো? পড়াশোনা কেমন চলে?”
এইটুকু অবধিই ছিলো তার প্রশ্নের গন্ডি। আজ তার সাথে বিয়ে হবে! আর কিছু ভাবতে পারছে না সে।
রওনক দরজার সামনে দাঁড়িয়ে অনুমতি চায়,
“আমি যদি আরেকটু কাছে এসে কথা বলি তাহলে কি তুমি বিরক্ত হবা?”
তৃণা ঝড়ের বেগে মাথা নাড়িয়ে জবাব দেয়,
“না। বসুন।”
খাটের দিকে ইশারা করে। রওনক এগিয়ে এসে খাটের একপাশে বসে।
“তুমিও বসো। ডোন্ট বি নার্ভাস। আ’ম এ জেন্টেলম্যান।”
কথাটা শুনে তৃণা লজ্জা পেলো। নিঃশব্দে দুই হাত দূরে খাটে বসে সে। মন মস্তিষ্কে তৃণার ঝড় বইছে। এরি মাঝে স্বাভাবিক গলায় রওনক প্রশ্ন করে,
“ভালো আছো? পড়াশোনা কেমন চলছে?”
“জি ভালো।”
তৃণার দৃষ্টি মেঝেতে। রওনক রুমের এদিক ওদিক তাকাচ্ছে।
“এটা তোমার রুম?”
“না, আপুর।”
“আচ্ছা। সুন্দর। দুটো প্রশ্ন করবো, তুমি এক শব্দে উত্তর দিবা, কেমন?”
প্রশ্নের কথা শুনে তৃণা আরও নার্ভাস হয়ে গেলো। আজকে মনে হচ্ছে সে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় একটু বেশিই নার্ভাস হচ্ছে।
“জি বলুন।”
“তুমি কি কাউকে ভালোবাসো?”
তৃণার গলার কাছে “হ্যা” এসে আঁটকে যায়। সে কি করে বলবে যে, আমার সামনে বসা লোকটাকে ভালোবাসি?
রওনক বোধহয় কিছু বুঝলো।
“আচ্ছা জাস্ট বলো যে, তোমার কোনো বয়ফ্রেন্ড আছে?”
“না।”
“আমাকে বিয়ে করতে তোমার আপত্তি আছে?”
তৃণা ঠোঁট ভিজিয়ে ধীরে বলে,
“আপত্তি..নেই।”
কথাটা শেষ হতেই রুমে অদ্ভুত নীরবতা নামে।
রওনক আর কোনো প্রশ্ন করে না। কয়েক সেকেন্ড চুপ করে বসে থাকে। কি ভাবছে বুঝা গেলো না।
নাবিলা অত্যাধিক চেষ্টা করেও রুমের ভেতরের কথা শুনতে পাচ্ছে না। এরা এতো আস্তে কথা কেনো বলছে?
“লুকিয়ে লুকিয়ে অন্যের কথা শোনা বদ অভ্যাস।”
পুরুষালী গলা পেয়ে নাবিলা জমে যায়। ধরা পড়া চোরের মতো দরজা থেকে সরে সোজা হয়ে দাঁড়ায়।
কাঁচুমাচু হয়ে বলে,
“আর এমনটা করবো..”
কথা বলতে বলতে চোখ তুলে। অপরিচিত এক ছেলেকে দেখে কথা থামায়। পাঞ্জাবী, পায়জামা পরা, চোখে আবার রোদচশমা তার! এই রাতের বেলায় ঘরের মধ্যে কে রোদচশমা পড়ে? ছেলেটাকে নাবিলার কাছে ছ্যাবলা মনে হলো।
নিরীহ কন্ঠ হুট করে গর্জে উঠে। আঙুল উঁচিয়ে এক কদম এগিয়ে শাসায়,
“আপনি কে? আমি কী করছি এতে আপনার মাথা ব্যাথা দেখাতে হবে না। যান তো এখান থেকে। শুধু শুধু ভয় পেলাম।”
ছেলেটা হাতে থাকা ফোন স্ক্রোল করে বলে,
“আপনার একটা সুন্দর ছবি আমার কাছে আছে। আই হোপ ইউ উইল লাইক ইট।”
ছেলেটা কয়েক কদম এগিয়ে এসে ফোনটা নাবিলার সামনে ধরে। স্ক্রিনে দরজায় কান পেতে রাখা নিজের ছবি দেখে নাবিলা ভড়কে যায়। বদ ছেলেটা তার ছবি কখন তুললো?
সে ফোনটা নিতে নিলে ছেলেটা হাত সরিয়ে ফেলে।
ভ্রু কুঁচকে ছেলেটা বলে,
“আমার সাথে নো চালাকি। জিজ্ঞেস করছিলেন না আমি কে? ঐ যে বর মশাই সে আমার আপন ব্রাদার হয়।”
ছেলেটার পরিচয় পেয়ে নাবিলা মনে মনে ‘ইন্না নিল্লাহ’ পড়ে। বরের এমন বজ্জাত ভাই আছে জানতো না সে। জানবেই বা কীভাবে? গতরাতে বাসায় এক প্রকার যুদ্ধ করে হলুদে এসেছিলো। বরের বাড়ির কারো সাথেই আলাপ নেই। এমনকি তৃণার বান্ধবী মাহির সাথে ‘হাই, হ্যালো’ করার সময় হয়নি তার। সে এসেছে বিয়েতে নিজের মতো এনজয় করতে।
জোর পূর্বক হেসে বলে,
“আরে আপনাকে তো চিনতেই পারিনি। সরি ভাইয়া।”
“এবার তো চিনেছেন। চালাকি না করে আমার কথা শুনলে কাউকে কিচ্ছুটি বলবো না। বায় দ্য ওয়ে, আ’ম রাহি। ইউ?”
নাবিলা দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
“নাবিলা।”
নাম শুনে রাহি মুখটা কুঁচকে ফেলে।
“নামটা আপনার মতোই পুরনো আমলের। ভীষন ব্যাকডেটেড। এসব নাম এখন আর চলে না। সে যা-ই হোক। আমার খুব তৃষ্ণা পেয়েছে। কোল্ড ডিংক পাওয়া যাবে?”
নামের বদনাম শুনে নাবিলা ইতিমধ্যে চটে গেছে। ছবির কারণে মুখ বন্ধ রেখেছে।
“ঐ তো ডাইনিং যান না। সেখানে লোক আছে।”
রাহি এক আঙুল দিয়ে রোদচশমাটা চোখ থেকে হালকা নাকের ডগায় নামিয়ে বলে,
“মিস নাবিলা আমি চাই আপনি যত্ন করে আমার জন্য কোল্ড ডিংকস আনুন। দুই কিউব আইস দিবেন অবশ্যই। নইলে..”
সে ফোনের দিকে ইশারা করে।
তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ফেলে নাবিলা পা বাড়ায়। রাগে তারা গা পিত্তি জ্বলে যাচ্ছে। এই বদমাশকে একটা শিক্ষা সে দিবে।
রাহি তাকে অনুসরণ করে পেছন পেছন যায়। বিয়ে বাড়িতে এমন মুরগী ধরতে পেরে পৈচাশিক আনন্দ হচ্ছে তার। মেয়েটাকে হেব্বি নাচাবে।
রওনক খাট থেকে উঠে দাঁড়ায়। তৃণার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলে,
“থ্যাংকিউ। সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছো।”
কথাটা বলে সে মুচকি হাসে। তৃণা তার দিকে তাকাতেই হাসিটা চোখে পড়ে।
দরজা খুলে রওনক বেরিয়ে যায়। তৃণা দুই হাতের মাঝে নিজের মুখ চেপে ধরে।
মিনিট খানেক বাদে মাহি দৌড়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে।
“আমি তো ভাবতেই পারছি না তুই আমার ভাবী হবি!”
মাহির উচ্ছ্বসিত কন্ঠ শুনে তৃণা তাকে দূরে ঠেলে দেয়।
“তখন কি জানি বলছিলি?”
মাহি আবারো তাকে জড়িয়ে ধরে বলে,
“আরে তখন তো বুঝিনি তোকে ভাইয়া বিয়ে করবে। বুঝলে তো হাঙ্গামা করতাম না। সরি পাখি।”
“হইছে আর ঢং করতে হবে না।”
এরিমধ্য রুমে নাবিলা সহ আরও কাজিনরা ঢুকে। পেছন পেছন শবনম বেগম আসেন। একটা শপিং ব্যাগ নাবিলার হাতে দিয়ে বলে,
“ওরে শাড়িটা পরিয়ে সাজিয়ে দে। আমি আমার গয়না আনছি।”
নাবিলা ব্যাগ থেকে শাড়ি বের করে বলে,
“এটা কই পেলেন?”
“ওরা এনেছিলো তন্নির জন্য। কিন্তু তন্নি নিজের পছন্দ করে কেনা শাড়ি পরেছিলো।”
মাহি তৃণাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলে,
“শাড়িটা আমার বেস্টুর নসিবে ছিলো।”
তৃণাকে তৈরি করিয়ে বিছানায় বসানো হয়। তাকে পরানো হয়েছে লাল টুকটকে রঙের শাড়ি। সেই শাড়ির আঁচল দিয়েই ঘোমটা দেওয়া হয়েছে। তাকে ঘিরে বসে আছে মেয়েরা। তার ডান পাশে মাহি বসা। সে তার হাত শক্ত করে জড়িয়ে রেখেছে। মাহি এই বিয়েতে এতো খুশি হবে ভাবেনি সে।
নাবিলা একটু পর এসে তৃণার বাম পাশে বসা তানিয়াকে সরিয়ে বসে পড়ে।
বসার ঘর থেকে কাজীর গলা পাওয়া যায়। সে মেয়ের বিস্তারিত তথ্য লিখছে। কিছুক্ষণ পর সে খাতা হাতে রুমের ভেতর প্রবেশ করে। তার সাথে তমাল এবং তৈয়ব উদ্দিনও রয়েছে। শবনম বেগম এসে এক পাশে দাঁড়ান। পেছন পেছন রাহি আর তার বাবা আকরাম শিকদার এসে উপস্থিত হয়।
তৃণার সামনে রেজিস্ট্রারের খাতা এবং কলম দেওয়া হয়। ডান পাশে ইংরেজিতে রওনকের সই। কাজী তাকে বাম পাশে আঙুল রেখে সই করতে বলে।
সে কয়েক সেকেন্ড স্থির থাকে। ঘোরে হারিয়ে যায়। মাহি তার বাহুতে চিমটি দেয়। হুঁশ ফিরতেই সই করে। শুদ্ধ বাংলাতে নিজের নাম ‘মাহজাবিন তৃণা’ লিখে।
কাজী খাতাটা নিয়ে চলে যেতেই তৈয়ব উদ্দিন মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে যান।
কিছুক্ষণ বাদে মোনাজাত ধরা হয়। মোনাজাত শেষ হতেই মেয়েগুলো তৃণাকে রেখে বসার ঘরের দিকে যায়।
একটু পরই খাওয়ার তোর জোর শুরু হয়। শবনম বেগম এক প্লেট পোলাও মাংস এসে মেয়ের মুখে তুলে দেন। কোনো মতে কয়েক লোকমা সে গিলে। সারাদিন না খাওয়াতে তেমন খেতে পারে না।
বিয়েটা কীভাবে কি হলো পুরো ঘটনা তৃণার মস্তিষ্কে এখনো জায়গা করে নিতে পারেনি।
সময় পেরিয়ে বেশ রাত হয়ে গেছে। তৃণা এখন নিজের রুমে এসেছে। কাপড় চোপড় একে একে বের করছে। কি কি ঘটেছে সবটা এখনো স্বপ্ন লাগছে। মনে হচ্ছে ঘুম ভাঙলেই স্বপ্নটা ভেঙে যাবে। সব কিছু স্বপ্ন নাকি সত্যি তা যাচাই করতে নিজের বাহুতে চিমটি কাটে।
“আউচ!”
বাহু ডলতে ডলতে চিন্তা করে, তার মানে এটা স্বপ্ন না। সত্যি সত্যি কয়েক মুহূর্ত আগেই তার বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে—তাও তার পছন্দের পুরুষের সঙ্গে।
মনের ভেতরটা কেমন যেন লাফালাফি করছে। বুকের ভেতর আনন্দের ঢেউ, অথচ বাইরে সে একদম স্থির। এক বিন্দুও নড়ে না। যতটা সম্ভব মুখটা স্বাভাবিক রেখে নিজের জিনিসপত্র গুছিয়ে লাগেজে ভরতে থাকে।
খালাতো বোন তানিয়া তাকে সাহায্য করছে। নাবিলাকে কয়েকবার ডাকা হয়েছে, কিন্তু সে নিজের ছবি তুলতে ব্যস্ত।
“এখন আর সাহায্য লাগবে না। তুই যা। আমি বাকিটা করে নেবো।”
তানিয়া মাথা নেড়ে বেরিয়ে যায়। দরজাটা বন্ধ হতেই তৃণা দু’হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরে।
খুশিতে চিৎকার করতে ইচ্ছে করছে।
ইচ্ছে করছে দেবের ‘পাগলু’ গানটা ফুল ভলিউমে ছেড়ে দিয়ে ঘরের মাঝখানে নাচতে।
কিন্তু সে চুপ করে থাকে।
কারণ মনের ভেতর ভয় হানা দিয়েছে। রওনক কি তাকে মেনে নিয়েছে? নাকি জেদের বশে বিয়েটা করেছে।
প্রশ্নটা মস্তিষ্কে হানা দিতেই হাত-পা বরফের ন্যায় শীতল হয়ে আসে।
দরজায় কারো ঠকঠক শুনে চমকে ঘুরে তাকায় সে।
“তৃণা দরজা খোল।”
মায়ের গলা পেতেই দ্রুত দরজা খুলে।
শবনম বেগম রুমে ঢুকে লাগেজ দেখে নেন। পেছন পেছন তমালও আসে।
“কিরে পুচকু সব নিয়েছিস তো? নাকি জিনিস নেওয়ার বাহানায় আবার ফেরত আসবি?”
তমালের কথায় রাগ হলেও তৃণা চুপ রইলো। তার চেয়ে দুই বছরের ছোট হয়েও ছেলেটা তাকে তুই তোকারি করে। এটা নিয়ে রাজ্যের ঝগড়া করাও বিশেষ লাভ হয়নি। তমাল শুধু তিন্নিকে ভয় পায়। তাকে এক বিন্দুও ডরায় না।
“এই তুই চুপ থাক। বাহিরে গিয়ে তোর বাবাকে ডাক দে।”
মায়ের ধমকো মুখ কালো করে তমাল বেরিয়ে যায়। শবনম বেগম বলেন,
“যা হয়ে গেছে তা ভাগ্যের লিখন। আমরা এতো জলদি তোকে বিয়ে দিতে চাইনি কিন্তু কীভাবে কি যে হলো সেটা বুঝতে পারছি না। সে যাই হোক- আমার বিশ্বাস ঐ বাড়িতে তুই ভালো থাকবি। তবে হ্যা- ঐ বাড়িতে গিয়ে সকলের কথা মেনে চলবি, স্বামীকে সম্মান করবি। সে যা বলবে তা শুনবি। কারো সাথে বেয়াদবি করবি না একদম। শ্বাশুড়ি যদি বলে,’বউ মা সূর্য পশ্চিমে উঠে।’ তুইও বলবি, ‘জি ঠিক বলেছেন।’ বুঝছিস?”
মায়ের কথা শুনে তৃণার হাসি পেলো। হাসলে এক্ষুণি সপাট করে মা চড় বসাবে। তাই ঠোঁট চেপে বিজ্ঞের ন্যায় সে মাথা নাড়ে। এরি মাঝে তৈয়ব উদ্দিন এসে হাজির হন। বাবাকে দেখে তৃণা এগিয়ে জড়িয়ে ধরে। তোর চোখ টলমল করে উঠে। এক ফোঁটা দুই ফোঁটা করে বেয়ে ইতিমধ্যে অশ্রু বর্ষণ হচ্ছে।
মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে তৈয়ব উদ্দিন বলেন,
“কখনো কারো মুখের উপর জবাব দিবা না আম্মা। নিজের খেয়াল রাখবা। আর কখনো কোনো সমস্যা হলে আমাকে সবার আগে কল দিবা। বিয়ে হলেও তোমার বাবা চিরকাল তোমার পাশে থাকবে। আজ তুমি বিয়েটা করে আমার সম্মান বাঁচিয়েছো। বাবা হিসেবে তোমার মতো মেয়ে পেয়ে আমি গর্বিত।”
বাবার কথা তৃণার কর্ণে পৌঁছেছে কিনা তা বোঝা গেলো না। সে অঝরে কেঁদে চলেছে। কয়েক মূহুর্ত পূর্বে বিয়ে হওয়াতে কত খুশি ছিলো সে অথচ এখন ইচ্ছে করছে না নিজের পরিবার ছেড়ে যেতে।
শবনম বেগমেরও চোখ ছলছল করছে। মেয়ের পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন।
“তৃণা হয়েছে তোর..”
মাহির গলা পেয়ে বাবা-মেয়ে একে অপরকে ছেড়ে সরে দাঁড়ায়। মাহি অপ্রস্তুত হয়ে যায়। তৃণা চোখ মুছতে শুরু করে।
“সরি বিরক্ত করার জন্য। আসলে মা পাঠালো। বললো অনেক রাত হয়েছে এখন ফিরতে হবে।”
মাহির কথার পিঠে শবনম বেগম কোনো মতে চোখ মুছে বলেন,
“হ্যা হয়ে গেছে। তোমরা নামো ওকে নিয়ে আসছি।”
মাহি মাথা নাড়িয়ে যেতে নেয় এরি মাঝে রিশান এসে হাজির হয়।
“চল এখন বাড়িতে ফিরবো।”
তার কথায় পাত্তা না দিয়ে রিশান এসে তৃণায় হাতের আঙুল নিজের ছোট্ট হাতের মাঝে মুঠো বন্দী করে নেয়।
“তৃণ যাবা না? চলো।”
রিশানের কথা শুনে তৃণা হেসে দেয়। মাহি বলে,
“রিশান তৃণা এখন তোমার মাম্মি হয়। মাম্মিকে কেউ নাম ধরে ডাকে?”
“মাহি তুই যা এখান থেকে। আমি তৃণ ডাকবো।”
“বেশ। আবার আসিস আমার কাছে চকলেট চাইতে।”
রিশান তার কথায় পাত্তা দিলো না। সে তৃণার ভেজা চোখের দিকে তাকিয়ে আছে।
মাহি যেতেই শবনম বেগম তাড়া দেন।
“তৃণা চল।”
মায়ের কথা মতো বের হয় সে। দরজায় দাঁড়িয়ে শেষবার নিজের রুমটা দেখে নেয়। শ্বাস ফেলে রিশানের হাত ধরে ফ্ল্যাট থেকে বের হয়।
গাড়িতে উঠার পূর্বে তৃণায় প্রচন্ড কান্না পেলো। মাকে জড়িয়ে আরেক দফা কাঁদে সে। তমালকে দেখা গেলো না। ছেলেটা বাড়ির ভেতর থেকে বের হয়নি। একা একা চোখের জল মুছে নেয় সে।
বরের গাড়ির পেছনের গাড়ির ড্রাইভিং সিট থেকে উঁকি মেরে রাহি বলে,
“সিস্টার ইন ল, এখন কান্নাকাটি করে এনার্জি নষ্ট করবেন না। মম বলেছে আগামীকাল আবার বাপের বাড়ি আসবেন।”
রাহির কথা শুনে তৃণা কান্না থামায়। ছেলেটা হুটহাট মুখ খুলে সকলকে অপ্রস্তুত করে দেয়। মাহি তার পাশের সিটেই বসা। হাত মুঠো করে বাহুতে কিল বসায়। মাথাটা আবারো গাড়ির ভেতরে ঢুকায়।
গাড়িতে উঠে জানালার কাচ নামিয়ে সকলের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়েরয় তৃণা। যতক্ষণ অবধি সকলকে দেখা যায় চোখ সরায় না।
“পানি খাবা?”
রওনকের গলা পেয়ে তৃণা তাকায়৷ লোকটা কেমন সাবলীল ভাবে তার দিকে তাকিয়ে আছে পানির বোতল হাতে।
তৃণা মাথা নাড়িয়ে না সূচক জবাব দেয়।
রওনক বোতলটা রেখে আবার জিজ্ঞেস করে,
“টিস্যু লাগবে?”
আবারো তৃণা মাথা নাড়ায়।
লোকটা কি বুঝলো কে জানে? পেছন থেকে টিস্যুর বক্সটা তুলে সামনে দিয়ে বললো,
“নাও। কাঁদতে কাঁদতে সর্দি বের হলে রিশান হাসবে।”
রওনকের কথা শুনে রিশান খিলখিল করে হেসে দেয়।
“ড্যাডি তুমি এতো ফানি..”
বলেই আবারো সে হাসতে শুরু করে।
মুচকি হেসে রওনক বলে,
“দেখলে তো? সর্দির কথা শুনেই কেমন হাসছে। একদম বাপের কার্বন কপি।”
তৃণা টিস্যু নিয়ে চোখ মুছে নেয়।
বারিধারাতে অবস্থিত “শিকদার ভিলা।”
পৌঁছাতে বেশ রাত হয়। ঘড়িতে তখন রাত বারোটা বেজে কুড়ি মিনিট।
ইতিমধ্যে গাড়িগুলো শিকদার বাড়িতে পৌঁছেছে। বড়োরা নেমে ভেতরে চল গেছে।
তৃণা স্থির হয়ে বসা। গাড়ি থেকে প্রথমে রওনক নামে। তার সাথে চোখ ডলতে ডলতে রিশানও নামে। তৃণা গাড়ির দরজা খুলে বের হতে নিলে রিশান তাকে থামায়।
রাহি ছুটে গিয়ে সার্ভেটদের ডাক দিলে তারা দুটো ডালা নিয়ে হাজির হয়।
তৃণা বুঝতে পারছে না কি হচ্ছে। রওনক দরজা খুলে দিলে ডালা থেকে ফুল নিয়ে মাহি, রাহি তার গায়ে ছেটাতে শুরু করে। রাহি এক হাতে ভিডিও করছে সবটা। রওনক কিছু গোলাপের পাপড়ি নিয়ে ছেলের হাতে দেয়।
রিশান আনন্দের সহিত গোলাপের পাপড়ি গুলো তৃণার গায়ে ছুঁড়ে। সে হাসিমুখে হাত বাড়িয়ে রিশানকে কাছে টেনে গালে চুমু দেয়। বাড়িতে প্রবেশের পূর্বে এতো বড়ো সারপ্রাইজ পাবে ভাবেনি সে।
মাহি রাহিকে কনুই দিয়ে গুঁতা দিলে সে রিশানকে কোলে তুলে নেয়।
“চাচ্চু চলো আমরা ভিতরে যাই।”
মাহিও তাদের সাথে চলে যায়। তৃণা গাড়ি থেকে বের হতে নিলে রওনক তার দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়।
এক মুহূর্ত থমকে যায় সে। বাড়িয়ে রাখা হাতের দিকে তাকায়। সে দ্বিধা নিয়েই নিজের হাতটা রওনকের হাতের ওপর রাখে।
আঙুলের স্পর্শ মাত্রই রওনকের হাত শক্ত হয়, তবে টান দেয় না।
তৃণা ধীরে গাড়ি থেকে নামতে থাকে। নামার সময় তার আঁচলের একপাশ হালকা করে পিছলে যায়। রওনক অন্য হাত দিয়ে নিঃশব্দে সেটা ঠিক করে দেয়।
চোখ তুলে তৃণা লোকটার মুখে দৃষ্টি রাখে। রওনক ঠোঁটের ভাজ ভেঙে হাসি দেয়। এ হাসিতে কি ছিলো জানে না মেয়েটা। তবে আবারো ঘায়েল হলো সে।
…
(চলবে..)
(গল্প পড়ে সবাই নিজেদের মতামত জানাবেন। রাতের মধ্যে ১হাজার রিয়েক্ট হয়ে গেলে। সকালে বাসর স্পেশাল পর্ব দিবো। রিয়েক্ট কমেন্ট করুন বেশি বেশি।)
Share On:
TAGS: ঈশিতা ইশা, মেজর শিকদার
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE