Golpo ডিফেন্স রিলেটেড মেজর শিকদার

মেজর শিকদার পর্ব ১২


মেজর_শিকদার-১২

ঈশিতা_ইশা

(কপি কিংবা কপি পোস্ট নিষিদ্ধ।)

গাড়িটা ধীরে ধীরে শিকদার বাড়ির বড় গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢোকে। দুপুরের আলো তখন বাগান জুড়ে ছড়িয়ে আছে। গত রাতের বৃষ্টির পর ঘাসগুলো ধুয়ে যাওয়া সবুজে চকচক করছে।

বাগানের মাঝখানে রিশান বল নিয়ে এক সার্ভেন্টের সাথে খেলছে। ছোট্ট পায়ে দৌড়ে দৌড়ে বল কিক করছে সে। তার হাসির শব্দ পুরো বাগান জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।

এক পাশে বেতের চেয়ার টেনে বসে আছেন আতিয়া শিকদার। সামনে ছোট টেবিলে চায়ের কাপ। ধীরে ধীরে চুমুক দিতে দিতে রিশানের খেলাটা দেখছেন তিনি।

ঠিক তখনই ড্রাইভওয়ের দিকে গাড়ির শব্দ হয়। রিশান খেলা থামিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। কালো গাড়িটা এসে থামে। ড্রাইভার নেমে দরজা খুলে দেয়। ধীরে ধীরে গাড়ি থেকে নামে তৃণা।

পা মাটিতে পড়তেই বুঝতে পারে শরীরটা কেমন দুর্বল হয়ে আছে। মাথার ভেতরটা এখনও ভারী লাগছে।

রিশান তৃণাকে দেখেই উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে।

“তৃণ এসেছে!”

চিৎকার করে বল ফেলে দৌড়ে যায় তার দিকে। সার্ভেন্টও তার পেছন পেছন যায়। যেভাবে ছেলেটা ছুটছে পড়ে গেলে হাত-পা ছিঁলে যাবে।

রিশানকে আসতে দেখে তৃণা ক্লান্ত মুখেও হালকা হাসে। রিশান এসে তার কোমর জড়িয়ে ধরে।

“তুমি এত দেরি করলে কেনো?”

তৃণা তার মাথায় আলতো হাত বুলিয়ে দেয়।

“পরীক্ষা ছিল তো।”

রিশান গম্ভীর মুখ করে বলে,
“ড্যাডি বলেছে তুমি অসুস্থ। অসুস্থতার মধ্যে তোমার এতো কীসের পরীক্ষা?”

তৃণা একটু অবাক হয়।

“ড্যাডির সাথে কথা হয়েছে?”

“হুম। বলেছে তোমার খেয়াল রাখতে। তাই এখন থেকে তুমি আমার কথা শুনবা।”

রিশানের কথা শুনে তৃণা মৃদু হেসে তার গাল টেনে বলে,
“ওকে।”

ওদের কথা শুনতে শুনতেই আতিয়া শিকদার চায়ের কাপ নামিয়ে রাখেন। তিনি কিছুক্ষণ স্থির চোখে তৃণার দিকে তাকিয়ে থাকেন।
তাকে খেয়াল করে রিশানের হাত ধরে তার সামনে গিয়ে দাঁড়ায় তৃণা।

আতিয়া শিকদার ধীর গলায় বলেন,
“পরীক্ষা শেষ অইছে?”

তৃণা মাথা নাড়ে।

“জি।”

আতিয়া শিকদারের চোখ তখনও তার মুখের ওপর স্থির।

তিনি লক্ষ্য করেন তৃণার মুখটা ফ্যাকাশে, চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। মেয়েটার চোখ-মুখ কেমন মলিন লাগছে। এই কয়েকদিনে মেয়েটাকে দেখে তার মোটেও খারাপ লাগেনি। মেয়েটা তার কত খেয়াল রাখে। অথচ তার কি হাল!

“তোর শরীরডা ভালা না মনে অইতাছে।”

তৃণা দ্রুত বলে,
“না৷ ঠিক আছি। আপনার কিছু লাগবে?”

আতিয়া শিকদার ধীরে মাথা নাড়েন।
“না।”

কয়েক সেকেন্ড পর বলেন,
“তোরে দেইখা সুস্থ লাগে না। উপ্রে গিয়া বিশ্রাম কর।”

তৃণা জবাব দেয়,
“ঠিক আছে।”

রিশান সঙ্গে সঙ্গে বলে,
“আমিও যাবো তোমার সাথে।”

“চল।”

রিশান খুশি হয়ে লাফাতে লাফাতে তার সাথে বাড়ির ভেতরের দিকে হাঁটতে থাকে।

পেছনে বসে আতিয়া শিকদার আবার চায়ের কাপ তুলে নেন। আগের ন্যায় ভর দুপুরে চা পানে মনোযোগ দেন।

বাড়ির ভেতরটা অদ্ভুত ভাবে নীরব। রিশানের হাত ধরে তৃণা প্রবেশ করতেই দেখে সার্ভেন্টরা নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত। মিসেস জান্নাত এর সবচেয়ে কাছের মহিলা সার্ভেন্ট তাদের দেখে এগিয়ে আসেন।

তৃণার উদ্দেশ্যে বলেন,
“ম্যাম আপনার অপেক্ষায় আছেন। আপনি ফ্রেশ হয়ে খাবার খেয়ে ম্যামের সাথে দেখা করবেন।”

মাথা নাড়িয়ে তৃণা জবাব দেয়,
“ঠিক আছে।”

সার্ভেন্ট সরে যেতেই দু’জন সিঁড়ি বেয়ে কক্ষের দিকে এগোয়। মাহি এখনো ভার্সিটি থেকে ফেরেনি।
রুমে ঢুকে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে তৃণা। দরজা বন্ধ করে ব্যাগটা টেবিলে রেখে দেয়। এদিকে রিশান তার হাত ছেড়ে বিছানার উপর গিয়ে ধপ করে শুয়ে পড়ে।
ব্যাগ থেকে ফোন বের করে নোটিফিকেশন চেক করে ফোনটা রেখে গোসলে ঢুকে যায় সে।

গোসল সেরে বের হলে দেখে রিশান বিছানায় গড়াগড়ি খাচ্ছে। চুল মুছে তৃণা বলে,
“অনেক দুষ্টুমি করেছো এখন খেতে চলো।”

বাধ্য ছেলের মতো রিশান উঠে বিছানায় সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে তৃণার কপালে হাতের উল্টো পিঠ রেখে গম্ভীর হয়ে পর্যবেক্ষণ করে। কিছু না বলে তৃণা শুধু তার হাবভাব দেখছে।

গম্ভীর গলায় রিশান বলে,
“জ্বর মনে হচ্ছে নেই। বিষয়টা ড্যাডিকে জানাতে হবে।”

হাসি চেপে তৃণাও তাল মিলিয়ে বলে,
“আচ্ছা! তা ড্যাডিকে বললে কী হবে?”

মালা চুলকে রিশান বলে,
“তা তো জানি না।”

কথাটা শুনে ফট করে তৃণা হেসে দেয়। রিশানের গাল টেনে চুমু দেয়।

“আর পাকনামি করতে হবে না। চলো খেতে যাই।”

দু’জনে একত্রে নামে খাবার খেতে। ডাইনিং এ এসে বসতেই সার্ভেন্টরা একে একে খাবার সাজিয়ে দেয়।

“গুড মনিং রিশু।”
রাহির গলা পেতেই রিশান চেয়ারের একাংশ ধরে পেছনে ঘুরে তাকায়।

হাই তুলে ডাইনিং এ এগিয়ে আসে সে।
“এখন তো মনিং না দুপুর চাচ্চু।”

তার বিপরীতের চেয়ারটা টেনে বসে রাহি বলে,
“তোর জন্য দুপুর আর আমার জন্য এখন ভোর বেলা।”

ছোট্ট রিশান তার চাচ্চুর কথার আগামাথা কিছুই বুঝলো না।
রাহি চেয়ারে বসতেই সার্ভেন্ট তার প্লেটে খাবার দেয়। সে খাবার খেতে শুরু করে।
তৃণা এবং রিশান কিছুক্ষণ শান্তভাবে খাবার খাচ্ছে। রাহি খাবারের সঙ্গে ফোন হাতে নিয়ে বারবার মেসেজ চেক করছে।

এক ফাঁকে তৃণার দিকে তাকিয়ে বলে,
“সিস্টার ইন ল আপনার জ্বরের কী অবস্থা? শুনলাম আপনি খুব অসুস্থ?”

রাহির কাছ থেকে এমন প্রশ্ন মোটেও আশা করেনি সে। এ বাড়ির সকলের মধ্যে সবচেয়ে কম আলাপ হয়েছে রাহির সাথে। প্রয়োজনের বাহিরে রাহিও কখনো তার সাথে দুষ্টুমির নামে বেয়াদবি করেনি। সবসময় দূরত্ব রাখে। প্রয়োজন ব্যতিতো আগ বাড়িয়ে কিছু বলে না। কথা বলতে এলে সম্মান দিয়ে কথা বলে সবসময়।

অপ্রস্তুত স্বরে তৃণা জবাব দেয়,
“এখন ঠিকাছি। জ্বর কমেছে।”

“কোনো কিছু প্রয়োজন হলে অবশ্যই বলবেন।”

তৃণা মাথা নাড়িয়ে হ্যা সূচক জবাব দেয়।
খাবার শেষ করে রাহি উঠে দাঁড়ায়। তাকে দেখে মনে হচ্ছে এক্ষুণি বের হবে। হাত মুখ ধুয়ে টিস্যু দিয়ে মুখ মুছতে ব্যস্ত সে।

“রিশু থাকো চাচ্চু গেলাম।”

রিশান গলা উঁচিয়ে বলে,
“আমার জন্য আইসক্রিম এনো।”

“ওকে ওকে।”

রাহি বেরিয়ে যায়।
এদিকে রিশানের খাওয়া শেষ হয়নি তাই তৃণাও বসে আছে।
.

রাত অনেকটা গড়িয়ে গেছে।

পড়া শেষ করে বিছানায় এসে বালিশে হেলান দিয়ে বসে তৃণা। টেবিল ল্যাম্পের নরম আলোটা ঘরজুড়ে মৃদু হলুদ আভা ছড়িয়ে রেখেছে। জানালার বাইরে রাত নেমেছে অনেক আগেই। সেই সন্ধ্যার নামতেই পড়তে বসেছে সে। মাঝে একবার শুধু টেবিল ছেড়ে রিশানকে আর নিজে খেতে উঠেছিলো। তাও মাহি এসে বকাঝকা করে তাকে টেনে নিয়ে যায়। রাতের খাবারটা সকলের সাথেই খাওয়া হয়। অবশ্য শ্বশুর মশাই আর রাহি ফিরতে দেরি করেন।

গায়ের জ্বরটা এখন আর নেই। কিন্তু শরীরটা কেমন যেন বড্ড দূর্বল লাগছে। মনে হচ্ছে হালকা চাপ দিলেই হাড়গোড় ভেঙে যাবে। মাথার ভেতরও একটু ভারী ভাব রয়ে গেছে।

তৃণা ধীরে মাথা ঘুরিয়ে পাশে তাকায়।
রিশান ঘুমিয়ে পড়েছে অনেকক্ষণ আগেই। ছোট্ট ছেলেটা বালিশে মুখ গুঁজে হাত-পা গুটিয়ে ঘুমাচ্ছে। ঠিক তার বাবার মতোই। বালিশের এক কোণ আঁকড়ে ধরে আছে সে। শ্বাসটা ধীর। মুখে একদম নিশ্চিন্ত একটা ভাব।

তৃণার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই মৃদু হাসি ফুটে ওঠে। আস্তে করে হাত বাড়িয়ে রিশানের মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দেয় সে।

এই বাড়ির মানুষগুলো তাকে কত যত্ন করে!
আতিয়া শিকদার তাকে পছন্দ না করলেও অসুস্থতার কথা শুনে বারবার তার বিষয়ে জিজ্ঞেস করেন। মিসেস জান্নাতও তাকে নিজের মেয়ের মতোই দেখেন। অনিয়ম করলে মাহি তাকে বকাঝকা করে। তার এই বকাঝকার পেছনে লুকিয়ে রয়েছে একরাশ ভালোবাসা। আর রিশান তো তার ছায়া হয়ে গেছে। ছেলেটা তার সাথে আঠার মতো লেগে থাকে।

রিশানের বাবা লোকটা দূরে থেকেও নিয়ম করে তার খোঁজ নেয়। এতো ব্যস্ততার মধ্যেও বাড়ির সকলকে তার খেয়াল রাখতে বলতে ভুলেনি সে।

তাহলে অচেনা সেই নাম্বার থেকে তাকে কেনো এমন অদ্ভুত কথাবার্তা বলা হলো? কেনো বলা হলো তার জীবন বিপদের মধ্যে? কেনো বলা হলো তাকে বিয়ে করা ছিল একটা পরিকল্পনা?

তৃণার ভ্রু ধীরে কুঁচকে আসে।
আজ সারাদিন চেষ্টা করেও সে প্রশ্ন গুলোর কোনো উত্তর খুঁজে পায়নি।

এই বাড়ির মানুষগুলোকে দেখে তো কখনো মনে হয়নি তারা তার কোনো ক্ষতি করতে পারে। রওনকের আচরণেও তো এমন কিছু নেই।

তাহলে লোকটা মিথ্যা বলেছে? নাকি সত্যিই এমন কিছু আছে যেটা সে জানে না?
তৃণার বুকের ভেতরটা অকারণেই হালকা ধক করে ওঠে। ঠিক তখনই হঠাৎ করে ফোনটা কেঁপে উঠে বেজে ওঠে।

তৃণার ধ্যান ভেঙে যায়। সে চমকে তাকায়৷ বিছানার পাশে রাখা ফোনটার স্ক্রিন জ্বলে উঠেছে। স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে রওনকের নাম।

তৃণা কয়েক সেকেন্ড স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে। রিশান যেন না জেগে যায় সেজন্য দ্রুত ফোনটা হাতে তুলে নেয় সে। কল রিসিভ করার আগে একবার ছেলেটার দিকে তাকায়। এখনও নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। কল রিসিভ করে ফোন কানে দেয়।

তৃণা ধীরে বলে,
“হ্যালো..”

ওপাশ থেকে ভেসে আসে পরিচিত কণ্ঠ।

“ঘুমাওনি এখনো?”

রওনকের গলাটা সবসময়ই শান্ত। কিন্তু আজ যেন একটু ক্লান্ত শোনাচ্ছে।

তৃণা বালিশে হেলান দিয়ে বসে থাকে।

“না। পড়ছিলাম।”

কিছু সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর রওনক জিজ্ঞেস করে,
“জ্বর কেমন?”

তৃণা স্বাভাবিক গলায় বলে,
“কমে গেছে।”

“থার্মোমিটার দিয়ে মেপেছো?”

প্রশ্নটা শুনে তৃণার ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে ওঠে। আজকে একই প্রশ্ন দু’বার শুনলো সে। রিশানও তাকে একই প্রশ্ন করেছিলো।

“মেডিকেলে পড়ি আমি। জ্বর আছে কি নেই বুঝতে পারি।”

ওপাশ থেকে হালকা একটা নিঃশ্বাসের শব্দ আসে।

“ডাক্তাররা নিজের অসুখ সবচেয়ে বেশি অবহেলা করে।”

তৃণা কিছু বলে না।
রুমের ভেতরটা নিঃশব্দ। শুধু রিশানের নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে।

রওনক আবার প্রশ্ন করে,
“খেয়েছো?”

“হ্যাঁ।”

“ওষুধ খেয়েছো?”

“হুম।”

রওনক কিছুক্ষণ চুপ থাকে।

তারপর হঠাৎ জিজ্ঞেস করে,
“আজ সারাদিন কী কী করেছো?”

প্রশ্নটা শুনে তৃণা একটু থেমে যায়।

তার মনে হঠাৎ মস্তিষ্কে ভেসে ওঠে দুপুরের সেই ফোনকল। সেই অচেনা কন্ঠস্বর, অদ্ভুত কথাবার্তা!

তৃণার আঙুলগুলো ফোনের চারপাশে অজান্তেই শক্ত হয়ে আসে।

রওনকের কণ্ঠ আবার শোনা যায়।

“তৃণলতা? শুনতে পাচ্ছো?”

সে ধীরে জবাব দেয়,
“হুম.. পরীক্ষা দিয়ে বাসায় চলে এসেছি।”

“শরীর খারাপ ছিল। এত কষ্ট করে পরীক্ষা দিতে যাওয়ার দরকার ছিল না।”

তৃণা মৃদু গলায় বলে,
“পরীক্ষা মিস দিলে পরে ঝামেলা হতো। ওসব আপনি বুঝবেন না।”

ওপাশ থেকে আর কোনো উত্তর আসে না।

তারপর রওনক হঠাৎ জিজ্ঞেস করে,
“রিশান কী করছে?”

তৃণা পাশে তাকায়।
ছেলেটা এখনও বালিশে মুখ গুঁজে ঘুমাচ্ছে।

“ঘুমাচ্ছে।”

রওনক হালকা হাসে।

“বালিশে মুখ লুকিয়ে?”

তৃণা অবাক হয়ে যায়।

“আপনি কীভাবে বুঝলেন?”

“কারণ ও আমার মতো ঘুমায়। আমি এটা জানতাম না। রাহি আমায় বলেছে। একদম বাপ কা বেটা।”

শেষের কথাটা বলেই রওনক হাসে।
তৃণার মুখে আবার মৃদু হাসি ফুটে ওঠে।

হাসি থামিয়ে রওনক বলে,
“আজকে আমিও একটু বেশি ব্যস্ত ছিলাম। তবে তুমি দুপুরে কল করার আগ মূহুর্তে অচেনা নাম্বার থেকে বেশ কয়েকবার কল আসে। রিসিভ করতে পারিনি। পরে কল ব্যাক করলে নাম্বারটি বন্ধ দেখায়।”

অচেনা নাম্বারের কথা শুনে তৃণার বুকের ভেতরটা আবার অস্বস্তিতে কেঁপে ওঠে।

মনে হতে থাকে, রওনককেও কী ঐ একই নাম্বার থেকে কল করা হয়েছে? সে কি রওনককে ফোন কলটার কথা বলবে?

তৃণার গলা শুকিয়ে আসে। কি করবে কিছুই বুঝতে পারছে না সে।

রওনকের কণ্ঠ আবার ভেসে আসে।

“কী ভাবছো?”

তৃণা তড়িঘড়ি বলে,
“কিছু না।”

রওনক ধীরে বলে,
“তোমার গলা শুনে মনে হচ্ছে কিছু একটা হয়েছে।”

সে দ্রুত বলে,
“না, কিছু হয়নি।”

তারপর খুব শান্ত গলায় রওনক বলে,
“তৃণলতা, তুমি আমাকে মিথ্যা বলছো।”

তৃণা চুপ করে থাকে। কী বলবে বুঝতে পারে না। ফোনের ওপাশে যেন রওনকের নিঃশ্বাসের শব্দও শোনা যাচ্ছে।

রওনক আবার বলে,
“আমি আমার প্রশ্নের উত্তর পাইনি। কী হয়েছে বলো আমায়।”

তৃণা অকারণে ঠোঁট কামড়ে ধরে।
তার চোখ অন্যমনস্কভাবে গিয়ে পড়ে রিশানের ঘুমন্ত মুখের দিকে। ছোট্ট ছেলেটা নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। যেন পৃথিবীর কোনো চিন্তা তার নেই।

তৃণা ধীরে বলে,
“আমি মিথ্যা বলছি না।”

রওনক শান্ত স্বরেই জবাব দেয়,
“তাহলে কিছু লুকাচ্ছো।”

তৃণা চুপ করে যায়।
ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা। টেবিল ল্যাম্পের আলোয় দেয়ালে দু’জনের ছায়া লম্বা হয়ে পড়েছে। তার চোখ সেই ছায়াতে আঁটকে আছে।

কিছুক্ষণ পর রওনক নিজেই বলে,
“আজকে তুমি অস্বাভাবিক আচরণ করছো। দুপুরে যখন কল করেছিলে তখনও তোমার গলা অদ্ভুত লাগছিল।”

তৃণা আস্তে বলে,
“আপনি আমার আচরণ লক্ষ্য করেন?”

রওনক হালকা হেসে বলে,
“আমার পেশাই এটা। তাছাড়া মানুষ অস্বাভাবিক আচরণ করলে তা তো চোখে পড়বেই! যেমনটা তুমি এখন করছো।”

তৃণা আর কিছু বলে না।

কিছুক্ষণ নীরবতা থাকার পর রওনক হঠাৎ গম্ভীর হয়ে বলে,
“কেউ কি তোমাকে কিছু বলেছে?”

প্রশ্নটা শুনে তৃণার আঙুলগুলো ফোনের চারপাশে শক্ত হয়ে যায়। মুহূর্তের জন্য তার মনে হয় সবকিছু বলে দেওয়া উচিত। কিন্তু কীভাবে কি বলবে বুঝতে পারছে না।

তৃণা ধীরে বলে,
“না। কেউ কিছু বলেনি।”

কয়েক সেকেন্ড পর রওনক খুব ধীর স্বরে বলে,
“ঠিক আছে।”

কিন্তু তার গলায় স্পষ্ট বোঝা যায় সে কথাটা বিশ্বাস করেনি। তৃণা অনুভব করতে পারে, ফোনের ওপাশে লোকটা নিশ্চয়ই ভ্রু কুঁচকে বসে আছে।

কিছুক্ষণ পর রওনক স্বাভাবিক গলায় বলে,
“ওষুধটা ঠিকমতো খেয়ো। আর আজকে আর পড়তে হবে না। শরীর দুর্বল। ঘুমিয়ে যাও।”

তৃণা মৃদু স্বরে বলে,
“ঠিক আছে।”

রওনক আবার বলে,
“আর একটা কথা।”

“জি?”

“আগামী কয়েকদিন হয়তো আমি কল করবো না। একটা অপারেশন আছে। ব্যস্ত থাকবো।”

তৃণার ভ্রু কুঁচকে যায়।

“অপারেশন?”

রওনক সংক্ষেপে বলে,
“হুম। একটু ঝামেলার মিশন।”

তৃণার বুকের ভেতরটা হঠাৎ অকারণে অস্বস্তিতে ভরে ওঠে।

সে আস্তে বলে,
“সাবধানে থাকবেন।”

“ঠিক আছে। ঘুমাও। রাখছি তাহলে?”

তৃণা কিছু না বলে চুপ করে থাকে। রওনকও বোধহয় কিছু একটা আন্দাজ করে কলটা কাটে না।

হঠাৎ তৃণা বলে,
“শুনছেন?”

“হ্যাঁ, বলো।”

“একটা প্রশ্ন করবো। আপনি সরাসরি উত্তর দিবেন। ঠিক আছে?”

“সেটা তো ডিপেন্ড করছে তোমার প্রশ্নের উপর।”

“প্রশ্নটা বিয়ে নিয়ে। আপনি আগে কথা দিন ঠিকঠাক করে উত্তর দিবেন।”

“প্রশ্নটা করো।”

তৃণা টের পেলো রওনকের গলা কেমন গম্ভীর হয়ে এসেছে। সে দমে না গিয়ে প্রশ্নটা করে বসে। এভাবে দোটানায় তার পক্ষে থাকা অসম্ভব।

“আপনি আমায় কেনো বিয়ে করেছেন? পাত্রী পালানোর পর তো বিয়ে করতে আপনি বাধ্য ছিলেন না। তাহলে কেনো?”

ওপাশে হঠাৎ নীরবতা নেমে আসে।
মনে হয় যেন কয়েক সেকেন্ডের জন্য সময়টাই থেমে গেছে।

তৃণা ফোনটা কানের কাছে ধরে নিঃশ্বাস আটকে অপেক্ষা করে। রওনকের কোনো শব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। শুধু দূর থেকে হালকা বাতাসের শব্দ ভেসে আসছে।

কিছুক্ষণ পর রওনক ধীরে বলে,
“এই প্রশ্নটা হঠাৎ?”

তৃণা চোখ নামিয়ে ফেলে।
“উত্তরটা আগে দিন।”

রওনক কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। যেন উত্তর দেওয়ার জন্য শব্দ বেছে নিচ্ছে।

তারপর বলে,
“তুমি তো ঘটনাটা জানোই।”

তৃণা সাথে সাথে বলে,
“জানি। কিন্তু পুরোটা জানি না।”

রওনকের নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যায়।
“বিয়ের দিন পাত্রী পালিয়ে গিয়েছিল। দুই পরিবারের সম্মান তখন প্রশ্নের মুখে ছিল।”

তৃণা শান্ত গলায় বলে,
“তাই বলে আপনি বাধ্য ছিলেন না। আপনি চাইলে সেখান থেকে চলে আসতেও পারতেন।”

আবার নীরবতা।
রওনক এবার একটু ধীরে বলে,
“হ্যাঁ, পারতাম।”

তৃণার বুকের ভেতরটা হালকা ধক করে ওঠে। ঘুরে ফিরে সেই একই প্রশ্নে এসে আবার সে থামে।
“তাহলে? কেনো আমাকেই বিয়ে করেছেন?”
….
(চলবে..)

(এই পর্বে আপনারা ঠিক মতো লাইক কমেন্ট করলে এই সপ্তাহে আরও একটা পর্ব দিবো। এখন আপনারা সিদ্ধান্ত নিন আরেকটা পর্ব চান কিনা। দয়া করে পর্ব পড়ে অবশ্যই লাইক কমেন্ট করবেন। বারবার বলতে বলতে বিরক্ত হয়ে গেছি।)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply