মেজর_শিকদার-১০
ঈশিতা_ইশা
(কপি পোস্ট সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। রিচেক দেইনি।)
…
আকাশে রোদ উঠেছে, কিন্তু রোদটা কড়া নয় নরম, ধোঁয়াটে সোনালি। ভেজা মাটির গন্ধ বাতাসে মিশে আছে।
গাছের পাতাগুলো ধুয়ে একেবারে টাটকা সবুজ হয়ে গেছে। পাতার ডগায় ছোট ছোট পানির ফোঁটা ঝুলে আছে; সূর্যের আলো পড়তেই সেগুলো কাঁপতে কাঁপতে ঝিলমিল করছে। হালকা বাতাস এলেই টুপ করে একটা ফোঁটা নিচে পড়ে।
রওনকের ঘুম ভাঙে খুব হালকা এক নড়াচড়ায়। প্রথমে কিছুই বোঝে না। তারপর টের পায় তার বুকের ওপর যে উষ্ণ ভার ছিল, সেটা একটু সরে গেছে।
চোখ খুলতেই দেখে তৃণা এখনো তার খুব কাছেই। তবে আর আঁকড়ে নেই। ঘুমের মধ্যেও কপালে সুক্ষ্ম ভাঁজ। হাতের উল্টো পিঠ কপালে ঠেকিয়ে ঠাওর করার চেষ্টা করে জ্বরটা আছে কি নেই!
রাতের মতো গা অতটা গরম নয়। তার মানে জ্বরটা ছেড়েছে। কথাটা নিশ্চিত হতেই হাত সরিয়ে ফেলে রওনক।
কি মনে করে কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে থাকে। তার মনে হচ্ছে, নড়লেই মুহূর্তটা ভেঙে যাবে।
তারপর খুব ধীরে নিজের অপর হাতটা পিঠের নিচ থেকে সরিয়ে নেয়। সাবধানে কমফোর্টারটা ঠিক করে দেয় তৃণার গলা পর্যন্ত।
রওনক উঠে বসে। হাত দিয়ে নিজের কপাল চেপে ধরে কিছুক্ষণ।
তারপর উঠে জানালার কাছে যায়। পর্দা সরাতেই ভেজা সবুজ আলো ঢুকে পড়ে ঘরে। বৃষ্টির পর এক নতুন দিনের সূচনা। বাহিরটা অদ্ভুত ভাবে শান্ত। পাখির কিচিরমিচির কানে আসতেই প্রাণ জুড়ায়। কিছু সময় চোখ বুজে থাকে সে।
এরপর ঘাড় ঘুরিয়ে বিছানার দিকে তাকায়।
তৃণা কুঁকড়ে শুয়ে আছে। গাল লালচে। চুল এলোমেলো।
রওনক আবার বিছানার পাশে এসে দাঁড়ায়।
খুব ধীরে ডাকে,
“তৃণলতা.. শুনতে পাচ্ছো?”
তৃণা চোখ খুলতে চেষ্টা করে। পাপড়ি কাঁপে। আধখোলা চোখে তাকায়। কয়েক সেকেন্ড লাগে বিষয়টা ধাতস্থ হতে।
মৃদু স্বরে বলে,
“বলুন..”
রওনকের ভেতরটা কেমন নরম হয়ে যায়। কিন্তু মুখে কোনো পরিবর্তন আনে না।
স্বাভাবিক গলায় জিজ্ঞেস করে,
“রাতে জ্বর এসেছিল তোমার। এখন কেমন লাগছে?”
তৃণা উত্তর দিতে গিয়ে থেমে যায়। গলাটা কেমন শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। ঠোঁট ভিজিয়ে ফিসফিস করে বলে,
“মাথা ঘুরছে..পানি খাবো।”
সে উঠতে নিলে রওনক তার বাহু ধরে আটকায়।
“শুয়ে থাকো। উঠবে না।”
সে দ্রুত টেবিল থেকে পানির বোতল নিয়ে আসে। গ্লাসে পানি ঢেলে এক হাত দিয়ে তৃণাকে সামান্য তুলে ধরে। অন্য হাতে গ্লাস এগিয়ে দেয়।
তৃণা পান করতে গিয়ে তার হাত আঁকড়ে ধরে ফেলে অজান্তেই। স্পর্শটা টের পেয়ে দুজনেই থেমে যায় এক মুহূর্ত।
রওনক ধীরে বলে,
“পানি খাও।”
তৃণা বাধ্য মেয়ের মতো পান করে। তারপর আবার শুয়ে পড়ে।
রওনক উঠে গিয়ে ল্যান্ডলাইন থেকে রিসিপশনে কল দেয়।
“একটা থার্মোমিটার আর ফিভার মেডিসিন লাগবে। রুম নম্বর ২০৫।”
কল কেটে সে এগিয়ে এসে চুপ করে বসে থাকে বিছানার পাশে। হাত দুটো জোড়া করা। চোখ তৃণার দিকে স্থির।
তৃণা চোখ আধবোজা রেখেই বলে,
“আপনি..যাবেন না?”
রওনক কয়েক সেকেন্ড উত্তর দেয় না।
তারপর শান্ত স্বরে বলে,
“যাবো। কিন্তু তার আগে তুমি ঠিক হও।”
তৃণা তাকায় তার দিকে। এই মানুষটার সাথে তার কত দূরত্ব অথচ এই মূহুর্তে লোকটা তার একমাত্র ভরসার স্থান।
নিজেকে সামনে তৃণা বলে,
“আমি ঠিক আছি..”
রওনক সরাসরি তার চোখে তাকায় এবার।
গম্ভীর গলায় বলে,
“না। তুমি ঠিক নেই।”
ঘরে নীরবতা নেমে আসে।
তৃণা ধীরে চোখ বন্ধ করে। কিন্তু তার হাত এখনো কমফোর্টারের ওপর। যেখানে একটু আগে রওনকের হাত ছিল। মাথাটা বড্ড ঝিমঝিম করছে। চোখ মেলো রাখতেও কষ্ট হচ্ছে।
রওনক উঠে দাঁড়ায়। রুমের ভেতর কতক্ষণ পায়চারী করে।
পিছনে না তাকিয়েই ডাক দেয়,
“তৃণলতা..”
“হুম?”
“আমি আজকেই আবার ফিরে যাবো। তোমার সাথে সকল বিষয়ে ছুটিতে এসে কথা বলবো।”
“কোন বিষয়ে?”
রওনক চুপ করে যায়। এই মূহুর্তে কথা বলার উপযুক্ত সময় না।
দরজায় নক করার শব্দ হয়।
রওনক এক মুহূর্ত তৃণার দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর দরজার দিকে এগিয়ে যায়।
দরজা খুলতেই রিসোর্টের এক স্টাফ থার্মোমিটার আর ওষুধের ছোট প্যাকেট এগিয়ে দেয়। রওনক সংক্ষিপ্ত ধন্যবাদ জানিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়।
বিছানার পাশে এসে বসে।
“তাপমাত্রা দেখি।”
তৃণা খুব ধীরে উঠে বসতে চায়। রওনক আবারও কাঁধে হাত রেখে থামায়।
“শুয়ে থাকো বলেছি।”
থার্মোমিটার মুখে নিয়ে শুয়ে থাকে তৃণা।
কিছুক্ষণ বাদে সেটা মুখ থেকে বের করলে দেখে জ্বর কমেছে।
“জ্বর কমেছে।”
তৃণা চোখ বন্ধ করেই বলে,
“বলেছিলাম তো আমি ঠিক আছি।”
রওনক দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
“জ্বর কমলেই মানুষ ঠিক হয়ে যায় না। তোমার বিশ্রাম প্রয়োজন। বাড়ি ফিরে বিশ্রাম করবা।”
কথাগুলো বলে ওষুধ এগিয়ে দেয়।
“এটা খাও।”
তৃণা বিনা বাক্যব্যয়ে খেয়ে নেয়। পানি শেষ করে আবার বালিশে মাথা রাখে। তার চোখে ক্লান্তি স্পষ্ট।
ঘরের ভেতর আবার নীরবতা।
রওনক কিছুক্ষণ বসে থাকে। তারপর ধীরে জিজ্ঞেস করে,
“কাল রাতের কিছু মনে আছে?”
তৃণা ভ্রু কুঁচকে তাকায়।
“মানে?”
রওনক কয়েক সেকেন্ড চুপ থাকে।
এরপর বলে,
“তুমি ঘুমের মধ্যে খুব কাঁপছিলে।”
তৃণার গাল লাল হয়ে ওঠে। সে দৃষ্টি সরিয়ে নেয়।
“আপনাকে বিরক্ত করার জন্য সরি।”
রওনক তাকে থামিয়ে দেয়।
“সরি বলার কিছু নেই।”
তৃণার দৃষ্টি কোমল হয়। রওনক বাথরুমে ঢুকে ফ্রেশ হতে।
.
শুক্রবার হওয়াতে আজকে সকলে বাসায় উপস্থিত। নাশতা সেরে বসার ঘরে পত্রিকা পড়ছেন আকরাম শিকদার।
সার্ভেন্ট চায়ের কাপ রেখে যায়। কাপটা তুলে তিনি তাতে কয়েক চুমুক বসান৷ মিসেস জান্নাত এসে তার পাশে বসেন। একটু আগে শ্বাশুড়ির রুমে গিয়েছিলেন। তার নানান প্রশ্নে মাথা ধরে গেছে। তিনি তৃণাকে খুঁজছেন। কি জবাব দিবেন বুঝতে না পেরে বলেছেন, “তৃণার নানু অসুস্থ তাই সে বাবার বাড়িতে গিয়েছে।”
এতে অবশ্য শ্বাশুড়ি ঠান্ডা হয়েছেন তবে কতক্ষণ চুপ করে থাকবে তা দেখার বিষয়।
মিসেস জান্নাতের দিকে এক পলক তাকিয়ে আকরাম শিকদার জিজ্ঞেস করেন,
“তোমাকে বেশ দুশ্চিন্তাগ্রস্থ লাগছে যে? কি হয়েছে?”
বিরস গলায় জবাব দেয়,
“ওরা এখনো ফিরলো না! তাই একটু চিন্তা হচ্ছে।”
“চিন্তা কোরো না। জলদি ফিরবে।”
এমন সময় সার্ভেন্ট এসে জানায় রওনক আর তৃণা ফিরেছে।
খবর পেয়েই মিসেস জান্নাত উঠে বাড়ির সদর দরজার দিকে এগোয়। আকরাম শিকদার তখনো চা পানে ব্যস্ত।
রওনক আগে নামে। তারপর গাড়ির অন্য পাশ ঘুরে দরজা খুলে দাঁড়ায়। তৃণা ধীরে নামে। মুখটা ফ্যাকাসে, চোখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। ওড়নাটা চাদরের মতো করে গায়ে জড়ানো। রওনকের হাতে তার ব্যাগ।
পাশাপাশি হেঁটে দু’জন একত্রে বাড়ির সদর দরজার দিকে এগোয়। দরজায় মিসেস জান্নাত দাঁড়িয়ে।
তৃণাকে দেখে মিসেস জান্নাত এক নজরেই বুঝে যান কিছু একটা ঠিক নেই।
“কি হয়েছে? তোমায় এমন লাগছে কেনো তৃণা?”
তৃণা স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে।
“কিছু না। একটু ঠান্ডা লেগেছিল। এখন ঠিক আছি।”
রওনক সংক্ষিপ্ত স্বরে বলে,
“জ্বর এসেছিল রাতে। এখন কমেছে। বিশ্রাম দরকার।”
মিসেস জান্নাতের চোখ কপালে উঠে যায়। “জ্বর! আমাকে একটা ফোন দিলা না কেনো? ডাক্তারকে কল দিতে বলি।”
রওনক শান্তভাবে উত্তর দেয়,
“মধ্য রাতে জ্বর এসেছিলো। আসার পথে ডাক্তারের চেম্বারে গিয়েছিলাম। বলেছেন, প্যারাসিটামল খেতে।”
মিসেস জান্নাত আর কোনো প্রশ্ন করেন না। দুজনকে ভেতরে আসতে বলেন।
ভেতরে ঢুকতেই বসার ঘর থেকে আকরাম শিকদার পত্রিকা নামিয়ে তাকান। চোখ দুটো তীক্ষ্ণ। পর্যবেক্ষণী দৃষ্টিতে তাকান দু’জনের দিকে।
“এসেছো?”
রওনক এগিয়ে গিয়ে সালাম দেয়। তৃণাও ধীরে সালাম করে।
আকরাম শিকদার তৃণার দিকে তাকিয়ে খানিকক্ষণ চুপ থাকেন। তার অভিজ্ঞ চোখ এড়িয়ে যায় না মেয়েটার দুর্বলতা।
“শরীর খারাপ?”
রওনক উত্তর দেয়,
“বৃষ্টিতে ভিজেছিল। তাই জ্বর।”
আকরাম শিকদার গম্ভীর গলায় বলেন,
“তুমি থাকার পরও এমনটা হল! জ্বর তো খুবই খারপ জিনিস। তার উপরে মেয়েটার রেগুলার ক্লাস থাকে। জ্বরে ভুগলে ক্লাস মিস হবে তো।”
বাবার কথার বিপরীতে রওনক কিছু বলে না। শুধু মাথা নত করে।
মিসেস জান্নাত তৃণার হাত ধরে বলেন,
“রুমে গিয়ে বিশ্রাম করো। তোমার জন্য আমি স্যুপ পাঠাচ্ছি।”
মাথা হালকা নাড়িয়ে তৃণা এগোয়। যেতে যেতে একবার পেছনে তাকায়।
রওনক তখনো বসার ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে। তার আর আকরাম শিকদারের চোখাচোখি।
ঘরে এক ধরনের চাপা উত্তেজনা।
তৃণা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে থাকে। প্রতিটা ধাপে তার মাথা একটু একটু ঘোরে। কিন্তু তার চেয়েও বেশি ঘুরছে মনে নানান প্রশ্ন।
নিচে বসার ঘরে আকরাম শিকদার ধীরে জিজ্ঞেস করেন,
“কতদিনের জন্য এসেছো?”
রওনক সরাসরি উত্তর দেয়,
“আজ মিটিং অ্যাটেন্ড করে, ফিরতে হবে।”
“তৃণাকে সবটা বলেছো? আশা করি তুমি ওকে পুরো পরিস্থিতি বুঝিয়ে বলবে।”
রওনক জবাব দেয়,
“সময় হলে বলবো।”
মিসেস জান্নাত বলেন,
“একের পর এক ঝামেলা ভালো লাগছে না। মেয়েটাকে সব দ্রুত জানানো উচিত।”
চিন্তিত গলায় আকরাম শিকদার বলেন,
“পরিস্থিতি এতো ঘোলা হবে জানলে বিয়ে..”
কথার হঠাৎ মাহির গলা পাওয়া যায়। আকরাম শিকদার থেমে যায়।
“তোমরা ফিরেছো? তৃণা উপরে?”
মাহির প্রশ্নে রওনক মাথা নাড়িয়ে হ্যা সূচক জবাব দেয়।
রওনক বলে,
“ওর জ্বর এসেছিলো। গিয়ে ওর পাশে থাক।”
সময় নষ্ট না করে দ্রুত সিঁড়ির ধাপ অতিক্রম করে রুমের দিকে ছুটে সে।
রওনক তার বাবা-মায়ের উদ্দেশ্যে বলে,
“তোমরা কেউ কিছু তৃণাকে বোলো না। আমি ওকে সময় সুযোগ করে সবটা বুঝিয়ে বলবো।”
দু’জনেই মাথা নেড়ে সায় দেয়।
মাহি প্রায় দৌড়াতে দৌড়াতে দরজার সামনে এসে থামে। দরজায় নক না করেই ভেতরে ঢুকে পড়ে।
তৃণা তখন বিছানায় বসে ছিল। দরজা চাপিয়ে সবেই বিছানায় এসে বসেছে সে। শব্দ পেয়ে সেদিকে তাকায়।
মাহি ঢুকেই এগিয়ে আসে।
“কী হয়েছে তোর? জ্বর এসেছে শুনলাম!”
তৃণা হালকা হাসার চেষ্টা করে।
“এই তো, বৃষ্টিতে ভিজেছিলাম তাই একটু জ্বর এসেছিলো। সিরিয়াস কিছু না।”
মাহি বিছানায় বসে তার কপালে হাত রাখে। “গরম তো এখনো। ডাক্তার দেখিয়েছিস?”
“হ্যাঁ। আসার পথে।”
মাহি একটু থেমে যায়। তারপর ধীরে জিজ্ঞেস করে, “ওহ! এমনিতে তুই ঠিক আছিস তো?”
মাহির অদ্ভুত প্রশ্নে তৃণার ভ্রু কুঁচকে আসে। সবাই কেমন অদ্ভুত কথা বলছে!
তৃণা সরাসরি তাকায় মাহির দিকে।
“আমি কি ঠিক থাকার মতো কিছু জানি?”
মাহি অপ্রস্তুত হয়ে যায়।
“আসলে আমি অমন কিছু মিন করিনি।”
তৃণা নিচু স্বরে বলে,
“সবাই কিছু জানে। শুধু আমি না। কেনো?”
মাহির চোখে এক মুহূর্তের জন্য দুশ্চিন্তা ভেসে ওঠে। সে দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নেয়।
“তুই বেশি ভাবছিস। ভাইয়া তোকে নিজেই বলবে।”
“কখন?”
এই প্রশ্নে মাহি চুপ। তার কাছে কোনো উত্তর নেই।
ঠিক তখন দরজা খোলার শব্দ হয়। দুজনেই চুপ হয়ে যায়। দরজায় রওনক দাঁড়িয়ে।
দুজনের কথোপকথনের শেষ অংশটা সে শুনেছে কিনা বোঝা যায় না। তার মুখটা একদম শান্ত হয়ে আছে।
“মাহি, ওকে বিশ্রাম নিতে দে। তুই পরে আসিস।”
মাহি উঠে দাঁড়ায়।
“আমি পরে আসছি।”
রুম থেকে বেরিয়ে দরজা টেনে দেয়।
ঘরে আবার নীরবতা নামে।
রওনক ধীরে এগিয়ে আসে।
“তুমি বিশ্রাম না নিয়ে এসব নিয়ে ভাবছো কেনো?”
তৃণা এবার আর এড়িয়ে যায় না। সরাসরি বলে,
“কারণ আমি এই গল্পের চরিত্র। অথচ কাহিনি জানি না।”
রওনকের চোয়াল শক্ত হয়।
“সব কথা একদিনে বলা যায় না।”
“তাহলে বিয়ে একদিনে করা গেল কীভাবে?”
প্রশ্নটা করে তৃণা নিজেও বিব্রত হয়ে যায়।
রওনক কয়েক সেকেন্ড চুপ থাকে। তারপর ধীরে বলে,
“সব কিছু নিয়ে বেশি বুঝা ভালো না। আমাকে আমার মতো করে সবটা হ্যান্ডেল করতে দাও।”
“ড্যাডি..”
রিশানের গলা পেয়ে দুজনেই চমকে, থামে।
রওনকের মুখোবয় পরিবর্তন হয়। রিশান তার দিকে ছুটে আসতেই সে হাঁটু গেঁড়ে বসে।
রিশান দৌড়ে এসে রওনকের গলায় ঝাঁপিয়ে পড়ে।
“ড্যাডি! তুমি এসেছো বলোনি তো!”
রওনকের মুখের কঠিন রেখাগুলো এক মুহূর্তে নরম হয়ে যায়। সে দু’হাতে ছেলেটাকে জড়িয়ে ধরে। কপালে একটা চুমু খায়।
“সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিলাম, চ্যাম্প।”
রিশান গম্ভীর মুখ করে বলে,
“আমি কিন্তু রাগ করেছি।”
“ও আচ্ছা?”
রওনক অবাক হওয়ার ভান করে।
“তাহলে এই রাগ ভাঙাতে কি চকলেট লাগবে?”
রিশান হেসে ফেলে।
“না। আমার কারটার হ্যান্ডেল ভেঙে গেছে। নিউ আরেকটা কিনে দাও।”
“আজকেই রাহিকে বলবো তোমায় নিয়ে কিনে দিতে।”
“তুমি যাবে না?”
“না, সোনা। ড্যাডির অনেক কাজ আছে। একটু পরই ড্যাডি বেরিয়ে যাবো।”
রিশান সঙ্গে সঙ্গে মুখ ফুলিয়ে ফেলে।
“না, তুমি যাবে না। তুমি আমার সঙ্গে গিয়ে কার কিনে দিবা।”
রওনক হেসে তার নাকটা চেপে ধরে।
“ড্যাডির তো কাজ আছে।”
রিশান এবার গলা চড়িয়ে বলে,
“তুমি সবসময় এটাই বলো। এবার মানবো না।”
বলে সে দু’হাত দিয়ে রওনকের শার্ট আঁকড়ে ধরে। ঠোঁট ফুলিয়ে কান্নার ভান করে।
তৃণা বিছানায় বসে দৃশ্যটা দেখছে। তার অজান্তেই ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে ওঠে।
রিশান এবার গলা নামিয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে,
“আমাকে কার না কিনে দিলে আর কখনো তোমার সাথে কথা বলবো না।”
রওনক ভয় পাওয়ার ভান ধরে।
“আরে! এত বড় শাস্তি?”
“হুম!”
রিশান মাথা নাড়ে জোরে।
রওনক হাসে।
রিশান এবার একদম গলায় ঝুলে পড়ে।
“প্লিজ ড্যাডি। প্লিজ প্লিজ প্লিজ.. এখনই চল।”
তার কণ্ঠে আদর মাখা জেদ।
বিছানায় বসে থাকা তৃণা নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকে। এই দৃশ্যটা তার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অনুভূতি তোলে। রওনক যখন রিশানের সাথে কথা বলে, তখন সে একদম আলাদা মানুষ; সহজ, উষ্ণ, নির্ভার।
রওনক একবার তৃণার দিকে তাকায়।
তৃণার চোখে অদ্ভুত এক কোমলতা। সে ধীরে বলে,
“বেচারা এতোবার করে বলছে নিয়ে যান।”
রওনক কিছুক্ষণ চুপ থাকে। তারপর রিশানের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,
“ঠিক আছে। কিন্তু এক শর্ত।”
রিশানের চোখ চকচক করে ওঠে।
“কি?”
“আমি চলে যাওয়ার পর তৃণকে বিরক্ত করা যাবে না। আর প্রমিজ করতে হবে তুমি তৃণকে একদম বিরক্ত করবা না, সকল কথা শুনবা।”
রিশান সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ে।
“প্রমিজ!”
“গুড বয়।”
রিশান হাত ধরে টানতে শুরু করে।
“এখন চলো।”
“যাবো তো। ড্যাডি ফ্রেশ হয়ে আসছি ততক্ষণ তুমি নিচে গিয়ে রাহিকে ডাক দাও।”
“ঠিক আছে।”
বলেই রিশান ছুটে।
তৃণা গলা উঁচিয়ে সাবধান করে,
“রিশান আস্তে যাও নইলে হোঁচট খাবা।”
ছেলেটা কথা শুনলো কিনা বুঝা গেলো না।
রিশানের ছোট ছোট পায়ের শব্দ সিঁড়ি বেয়ে মিলিয়ে যায়। ঘরে আবার নিস্তব্ধতা।
পোশাক নিয়ে রওনক ঢুকে যায় বাথরুমে। বিছানাতে তৃণা চুপচাপ বসে আছে। মাথার ভেতরটা এখনো কেমন টিপটিপ করছে। চোখ বুজে এক হাত তুলে কপাল ঘষতে শুরু করে।
রুমের ভেতর নিস্তব্ধতা।
বাথরুমে পানির শব্দ থেমে গেছে অনেকক্ষণ। তৃণা বুঝতেই পারেনি কখন রওনক বেরিয়ে এসেছে।
সে এখনো চোখ বুজে কপাল টিপছে।
হঠাৎ খুব কাছে থেকে শান্ত গলায় রওনক বলে,
“ব্যথা করছে?”
চমকে চোখ খোলে তৃণা। রওনক ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে। চুল ভেজা, হাতের তোয়ালে দিয়ে মুছছে।
তৃণা একটু অপ্রস্তুত হয়ে হাত নামায়।
“না.. ঠিক আছি।”
রওনক ভ্রু তোলে।
“মিথ্যা বলার সময় অন্তত চোখ নামিয়ে ফেলো না।”
তৃণা তাকিয়ে থাকে। কি বলবে শব্দ খুঁজে পাচ্ছে না।
রওনক ধীরে বিছানার ধারে বসে।
“দাও।”
“কি?”
“তোমাকে একটু সেবা করার সুযোগ।”
তৃণা দ্বিধা করে।
রওনক খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে তার কপালের দুই পাশে আঙুল রেখে হালকা চাপ দিতে থাকে। খুব ধীরে। যত্ন নিয়ে। তার আঙুলের ছোঁয়া অদ্ভুতভাবে আরামদায়ক।
তৃণার চোখ নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে আসে।
“আরাম লাগছে ভীষণ।”
রওনক কিছু বলে না। শুধু চাপটা আরও সামান্য ঠিক করে দেয়।
তৃণা ধীরে চোখ খুলে তাকায়। সদ্য গোসল করে আসা লোকটাকে স্নিগ্ধ লাগছে। এত কাছ থেকে রওনককে দেখার অভ্যাস তার নেই।
“আপনি সবসময় এমন থাকেন না কেনো?”
রওনকের আঙুল থেমে যায় এক মুহূর্ত।
“কেমন?”
“এমন শান্ত, সহজ।”
রওনক খুব মৃদু হেসে বলে,
“তুমি সবসময় এমন অদ্ভুত প্রশ্ন করো যার উত্তর আমার কাছে নেই।”
তৃণা হালকা লজ্জা পায়। দৃষ্টি সরাতে যায়, কিন্তু রওনকের হাত এখনো তার কপালে। সে থেমে যায়।
হঠাৎ তৃণার চুলের একটা গোছা মুখের ওপর পড়ে। রওনক খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে সেটা সরিয়ে দেয়। আঙুলের ডগা গাল ছুঁয়ে যায়।
দুজনেই স্থির। হুট করে লোকটা তাকে ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। কিছু না বলে রেডি হতে শুরু করে।
তৃণা চুপচাপ তাকে দেখে চলেছে।
এর মাঝে রিশান এসে আবারো উপস্থিত হয়। রওনক ততক্ষণে তৈরি।
ছেলের হাত ধরে রওনক বলে,
“তাহলে আমি আসছি। রিশান আর রাহিকে মলে নামিয়ে সোজা অফিসের দিকে যাবো।”
তৃণা শুধু বলে,
“সাবধানে যাবেন।”
“আবার জ্বর এলে ডাক্তারকে কল দিও। ড্রয়ারে তার কার্ড আছে। আর কিছু প্রয়োজন হলে মাহি বা রাহিকে বোলো।”
“চিন্তা করবেন না। আমি সবটা সামলে নিবে।”
রওনক মৃদু হাসে। তৃণার কথায় ভরসা পেলো কিনা বুঝা গেলো না।
রিশান হাত নাড়িয়ে বলে,
“তৃণা থাকো আমি কার কিনেই তোমার কাছে ফিরবো।”
তৃণা মুচকি হেসে হাত নাড়ায়।
বাপ ছেলে গল্প করতে করতে রুম থেকে বেরিয়ে যায়।
তারা যেতেই তৃণা লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ে। মাথার ভেতরটা এতো বেশি যন্ত্রণা করছে যে একটু ঘুম দরকার।
বালিশে ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে। হঠাৎ তার ফোন কেঁপে ওঠে। ফোন হাতে নিতেই স্ক্রিনে ভেসে ওঠে এক অচেনা নাম্বার।
কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে সে। তারপর কল রিসিভ করে।
ওপাশ থেকে ভেসে আসে অপরিচিত কণ্ঠ,
“মিসেস তৃণা শিকদার?”
তৃণার বুক ধক করে ওঠে। নিজেকে শান্ত করে জবাব দেয়,
“জি। কে বলছেন?”
ওপাশের কণ্ঠ ঠান্ডা।
“মেজর রওনক শিকদারের বিষয়ে আপনার সঙ্গে কিছু জরুরি কথা আছে। আপনি কি একা আছেন?”
তৃণার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসে।
….
(চলবে..)
(কোথাও বানান ভুল হলে জানাবেন অবশ্যই। পর্বটা বড়ো করে লিখেছি তাই আপনাদের মন্তব্য চাই। আপনারা লাইক কমেন্ট করলে নিয়মিত পর্ব পাবেন। আপনাদের উৎসাহ পেলে লিখতে ইচ্ছে করে। বেশি বেশি লাইক কমেন্ট করুন।)
বইটই এ মেজর তৃণাকে নিয়ে লেখা ই-বুক পাওয়া যাচ্ছে। যারা এখনো পড়েননি অনেক কিছু মিস করবেন। দ্রুত বইটই থেকে ওদের পড়ে আসুন। ই-বুক লিংক কমেন্টে দিয়ে দিবো।
Share On:
TAGS: ঈশিতা ইশা, মেজর শিকদার
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
মেজর শিকদার পর্ব ৬
-
মেজর শিকদার পর্ব ৪
-
মেজর শিকদার গল্পের লিংক
-
মেজর শিকদার পর্ব ১
-
মেজর শিকদার পর্ব ৮
-
মেজর শিকদার পর্ব ২
-
মেজর শিকদার পর্ব ৫
-
মেজর শিকদার পর্ব ৩
-
মেজর শিকদার পর্ব ৯
-
মেজর শিকদার পর্ব ৯.২