Golpo ডিফেন্স রিলেটেড মেজর শিকদার

মেজর শিকদার পর্ব ১


আমি আমার বেস্ট ফ্রেন্ডের মেজর ভাইয়ের প্রেমে পড়েছি। যেমন-তেমন প্রেম নয় এ এক অসুখের মতো। চোখের পাতা বুজলেই তার মুখটা ভেসে ওঠে, আর বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে ভারী হয়ে আসে। লোকটা আমার চেয়ে ঠিক পনেরো বছরের বড়ো। তার চোখে আমি স্রেফ বাচ্চা এক মেয়ে। অথচ আমি পড়ছি মেডিকেলের দ্বিতীয় বর্ষে। তার সাথে যতবার দেখা হয়েছে ততবার সে আমায় নিজের বোনের বান্ধবী হিসেবেই কুশলাদি বিনিময় করেছেন। এদিকে আমি এই লোকটাকে মন দিয়ে বসে আছি যখন আমার বয়স ষোল। সেই ষোল বছর বয়সে তাকে এক নজর দেখার পর আমার ভেতরে এক উথাল-পাতাল অনুভূতির ঢেউ বয়ে যায়।

মাহির সাথে আমার বন্ধুত্ব গাঢ় করার অন্যতম কারণ তার বড়ো ভাই মেজর শিকদার সাহেব। তিনি ছুটিতে এলে তাকে দেখতে বেহায়ার মতো ছুটে যেতাম মাহিদের বাসায়। মাহি তো দূর স্বয়ং লোকটাও কখনো বুঝতেই পারেনি তাকে মন দিয়ে বসে আছে এক কিশোরী।

যাকে আমি ভালোবাসি লোকটার নাম রওনক শিকদার। মনে মনে তাকে আমি মেজর শিকদার সম্মোধন করি। হাসোজ্জল, শান্ত লোকটা যখন কথা বলে, ইচ্ছে করে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকি। একটা মানুষ এতো সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বলতে পারে আমার ধারণার বাহিরে ছিলো।
তার একটা ছোট্ট পুত্র সন্তানও আছে। হ্যা সে বিবাহিত! তার পুত্রকে জন্ম দেওয়ার ঘন্টা দুয়েক পর তার স্ত্রী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে।
এরপর থেকে সে তার ছয় বছর বয়সী পুত্রকে নিয়ে একা জীবন যাপন করেন। তার পুত্রের নাম রিশান। ছেলেটা এতো মিষ্টি। আমার সাথে ওর বেশ ভালো বন্ধুত্ব। দেখলেই ছুটে এসে জড়িয়ে ধরে। রিশানের মতো লক্ষী বাচ্চা আমি খুব কমই দেখেছি।

আমি তেমন চঞ্চল নই আবার চুপচাপ স্বভাবেরও নই৷ যার সাথে মিশে যাই তার সাথে লাগাতার বকবক করে চলি। তবে লোকটাকে দেখা মাত্র নার্ভাস হয়ে যাই। ঠিক মতো কথা বলতে পারি না। সরাসরি তার দিকে তাকাতেও কেমন লজ্জা করে। আঁড়চোখে, লুকিয়ে তাকে দেখি।
ভেবেছিলাম কোনো একদিন মেজর শিকদার বুঝতে পারবেন আমার কোমল অনুভূতি। সেদিন তার সামনে হৃদয়ে জমিয়ে রাখা সকল গোপন অনুভূতি মেলে ধরবো। এমনটা হলো না।

দিনের পর দিন এমন একটা দিনের অপেক্ষায় কাটিয়েছি বিগত চারটা বছর। অথচ আজ তার সাথে আমারই বড়ো বোনের বিয়ে হতে চলেছে। তিনি আর কয়েক ঘন্টা পর আমারই আপন বোনের বর হয়ে যাবেন আর আমি তখন সম্পর্কে হবো তার শালিকা। আমার ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে। না এই কথা কাউকে বলতে পারছি, না সইতে পারছি।

আপু ভীষণ ভাগ্যবতি। না চাইতেও সে এমন এক মানুষকে জীবন সঙ্গী হিসেবে পেতে চলেছে।

দরজায় ঠকঠক শব্দে তৃণা দ্রুত ডায়েরি বন্ধ করে ফেলে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে বেশ বেলা হয়েছে। ডায়েরিটা বালিশের নিচে রেখে গায়ের ওড়না দিয়ে চোখ-মুখ মুছে নেয়। এতোক্ষণ দরজায় খিল দিয়ে মনের গোপন কথাগুলো ডায়েরিতে লিখছিলো সে। গতরাতে হলুদের অনুষ্ঠানের পর কেউ ঘুমায়নি৷ আগত কাজিনরা তৃণাকে এক সেকেন্ডের জন্য একা ছাড়েনি৷ কিছুক্ষণ পূর্বে একান্ত সময় পেয়ে নিজের রুমে এসেছিলো সে।

দরজা খুলতেই মায়ের চিরচেনা চিন্তিত মুখ দেখতে পায়।

“রেডি না হয়ে এখনো বসে আছিস? কতবার সকাল থেকে বললাম শুনিস না কেনো? এদিকে বরযাত্রী তো চলে আসবে। কতদিক একা সামলাবো বল তো?”

মায়ের গলায় বিরক্তি কম, উৎকণ্ঠা বেশি।
তৃণা কিছু বলার চেষ্টা করেও পারে না।
মাথা নিচু করে শুধু বলে,
“আসছি মা।”

শবনম বেগম তাকায় মেয়ের চোখের দিকে। চোখ দুটো অস্বাভাবিক লাল।
“কাঁদছিলি?”

তৃণা দ্রুত মাথা নাড়ে।
“না তো।”

শবনম বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেলে। ভাবেন বোনের বিয়ে তাই তৃণার মন খারাপ। মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। দুই মেয়ে এক ছেলেকে কোলে পিঠে করে একা মানুষ করেছেন তিনি। আজ বড়ো মেয়ের বিয়ের পর বাড়িটার একাংশ ফাঁকা হয়ে যাবে। ভেতরে ভেতরে তারও ভীষণ খারাপ লাগছে। সব চেপে রেখেছে সে।

“আজ তোর আপুর জীবনের সবচেয়ে বড়ো দিন। সবাই ব্যস্ত, সবাই টেনশনে। তুই একটু নিজেকে সামলা মা।”

তৃণা হালকা ঘাড় এপাশ-ওপাশ করে।
“তিন্নি তোকে ডেকেছে। জামাকাপড় নিয়ে ঐ রুমে গিয়ে রেডি হয়ে নে। পার্লারের মেয়েগুলো ওকে সাজানো শেষ করলে তুইও সেজে নিস। যা জলদি। গোসল সেরে আমিও রেডি হয়ে নিচ্ছি।”

“ঠিকাছে।”

মা যেতেই তৃণা বিছানার উপর থাকা শপিং ব্যাগগুলো তুলে নেয়। একদম কোণার রুমটা আপুর। ফ্ল্যাটের সবচেয়ে বড়ো রুমটা তার জন্য বরাদ্দ। রুমের সাথে বিশাল এক খোলা বারান্দা এবং ওয়াশরুম রয়েছে। রিটায়ার্ডের পর দাদার কাছ থেকে প্রাপ্ত এই জমিতে তৃণার বাবা পাঁচতলা এই বাড়িটা তুলেছেন। বাড়ির দ্বিতীয় তলা সম্পূর্ণ নিজেদের থাকার জন্য গড়েছেন।

তৃণা খেয়াল করে ফ্ল্যাটটা আজ অচেনা রকম সরব। ড্রয়িংরুম জুড়ে আত্মীয়স্বজনের ভিড়। কেউ চা খাচ্ছে, কেউ ফোনে কথা বলছে, কেউ আবার নিজেদের মধ্যে গল্পে ব্যস্ত করছে। মাঝে মাঝে কারও হাসির শব্দ কানে আসছে।

তিন্নির রুমের সামনে এসে দাঁড়ায় সে। ভেতর থেকে পার্লারের আপুদের চাপা কথা, আর তার ফাঁকে ফাঁকে তিন্নির হাসির শব্দ আসছে।

তৃণা একবার গভীর শ্বাস নেয়। তারপর দরজায় হালকা করে নক করে।
দরজা খুলে দেয় তার মামাতো বোন নাবিলা।
“এতোক্ষণ কই ছিলি? ভেতরে আয়।”

নাবিলা আর সে সমবয়সী।
রুমে পা রাখতেই তৃণার চোখ আটকে যায় তিন্নির দিকে। বিছানার মাঝখানে বসে আছে সে। লাল বেনারসিতে আধা–সাজা অবস্থা। চোখে সাজানোর কাজ চলছে। আয়নার সামনে বসে থাকা মানুষটাকে আজ অন্যরকম সুন্দর লাগছে। তৃণা অপলক দৃষ্টিতে বোনের দিকে তাকিয়ে থাকে।

“তৃণা!”
তিন্নি আয়নায় তাকিয়েই নাম ধরে ডাকে। তৃণার ধ্যান ভাঙে।

“এইদিকে আয়। এত দেরি করছিস কেন? সেই কখন থেকে তোকে খুঁজছিলাম।”

তৃণা বোনের কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। ব্যাগগুলো একপাশে রেখে দেয়।

“তোকে খুব সুন্দর লাগছে আপু।”

তিন্নি হেসে ফেলে।
“আজ সুন্দর লাগতেই হবে। আজ তো আমার দিন।”

কথাটা শুনে তৃণা মুচকি হাসে। সে কিছু বলে না। শুধু আয়নার দিকে তাকায়। আয়নার ভেতরে তিন্নির মুখের পাশে নিজের মুখটাও দেখতে পায়। কেমন ফ্যাকাশে, ক্লান্ত, চোখের কোণে লুকানো একরাশ ভাঙন দেখতে পায়।

পার্লারের আপু বলে ওঠে,
“এই যে, ছোট আপু তুমি বসো। তোমাকেও তো সাজাতে হবে।”

তৃণা হালকা করে মাথা নাড়ে।
“আমি পরে বসবো। আগে আপুকে সাজান।”

নাবিলা বলে,
“সর তাহলে৷ আমি সেজে নেই।”

তৃণা সরতেই নাবিলা নিজের সাজসজ্জা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। একটু পর দরজায় আবার কড়া নাড়ার শব্দ হয়। নাবিলা বিরক্ত হয়।
“তুই বোস আমি খুলছি।”

তৃণা দরজা খুলে দেয়। খালাতো-মামাতো বোনেরা হুড়মুড়িয়ে ভেতরে ঢুকে যায়।

নাবিলা তাদের দেখে চেঁচায়।
“তোরা বের হ। আমাদের বিরক্ত করিস না।”

কেউ তার কথা পাত্তাই দিলো না। ওরা এসে নাবিলাকে ঘিরে বসলো। দরজা লাগিয়ে তৃণা এসে এক পাশে দাঁড়ায়। তিন্নি হাত টেনে তাকে পাশে বসায়।

সন্ধ্যার পর বিয়ে।
সাজগোছ শেষ করতে করতেই বিকাল গড়িয়ে যাবে—এই কথা সকাল থেকেই সবাই বলছিল। হলোও তাই। কনের সাজসজ্জা শেষ করতে করতে বিকেল নেমে এলো।

পার্লারের মেয়েরা যখন বিদায় নেয়, তখন তিন্নির রুমে একটা অদ্ভুত নীরবতা নেমে আসে। তিন্নি একে একে কাজিনদেরও বের করে দেয়।

“তোরা সবাই একটু বাইরে যা। এখন আমার মাথা ধরছে।”

কেউ কিছু না বলেই বেরিয়ে যায়।
দরজা বন্ধ হতেই তিন্নি ফিরে তাকায় তৃণার দিকে।

তৃণা তখনও সাজেনি। স্রেফ একটা সিম্পল সেলোয়ার কামিজ পরনে। পার্লারের মেয়েরা সাজাতে নিলে তিন্নি না করে দেয়। সে জানায়, নিজেই বোনকে সাজিয়ে দিবে।

হঠাৎ তিন্নি ওর হাত ধরে টেনে বসিয়ে দেয় নিজের পাশে।

“তৃণা আমার খুব দরকার তোকে।”

তৃণার বুকটা কেমন ধক করে ওঠে।
“কি হয়েছে আপু?”

তিন্নি কথা বলে না। কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকে। তারপর হঠাৎ বলে,
“আমি এই বিয়ে করতে চাই না তৃণা..”

তৃণা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকে।
“কি বলছো আপু? আজ তো..”

“আমি অন্য কাউকে ভালোবাসি।”

কথাটা যেন ঘরের ভেতর আছড়ে পড়ে।
তৃণার মাথা ঝিম ধরে যায়। সে কিছু বলতে পারে না। কী বলবে, সেটাও বুঝতে পারে না।

তিন্নি কাঁদতে কাঁদতে বলে
“আমি কাউকে কিছু বলতে পারিনি। আম্মু, আব্বু কেউ বুঝবে না। সবাই ভাববে আমি স্বার্থপর মেয়ে। কিন্তু আমি যদি আজ এই বিয়েটা করি..আমি মরে যাবো তৃণা।”

তৃণা শুধু বলে,
“এভাবে বলো না আপু। তুমি বিয়েটা করো দেখবা সুখী হবা।”

“ঠিক বলছিস?”

তৃণা মাথা নাড়িয়ে বলে,
“হ্যা রে আপু। এখন বিয়েটা করে নে।”

তিন্নি ওর হাত চেপে ধরে।
“ঠিকাছে করবো। তবে আমার শেষ ইচ্ছেটা রাখ।”

“কেমন ইচ্ছে আপু?”

“আমি একটু বের হবো। ও আমার জন্য অপেক্ষা করছে। আমি শুধু শেষবার ওর সাথে দেখা করে আসবো। বিশ্বাস কর, আমি ফিরে আসবো। কিন্তু যদি কেউ দেখে ফেলে তাহলে সবটা শেষ হয়ে যাবে। তুই একটা এদিকটা সামলে নিস বোন আমার।”

তৃণার বুকের ভেতর ভয় ঢুকে পড়ে।
“আপু, কিন্তু..”

“প্লিজ তৃণা। তুই ছাড়া আমার কেউ নেই। তুই সাহায্য না করলে আমি কিছুই করতে পারবো না।”

তিন্নি এতো অনুরোধ করে যে তৃণা আর কিছু ভাবতে পারে না।

“আমি তোকে বিশ্বাস করি তৃণা। দরজাটা সামলে রাখিস। কেউ আসলে বলিস আমি ওয়াশরুমে। কসম দে, তুই কাউকে কিছু বলবি না।”

তিন্নি তার হাত টেনে নিজের মাথায় রাখে।
তৃণাও বলে,
“ঠিকাছে।”

তিন্নি চোখ মুছে উঠে দাঁড়ায়।
একবারও পিছনে তাকায় না।

তৃণা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসে।

“তোর কতক্ষণ লাগবে?”

“দশ মিনিট। যাবো আর আসবো।”

তৃণা আর কিছু বলার পূর্বেই তিন্নি বারান্দায় চলে যায়।

দোতলার বারান্দা বেয়ে নামতে তিন্নির কোনো সমস্যা হয়নি। এর পূর্বে বহুবার সে এই কাজ করেছে। রুম থেকে বের হওয়ার সময় সুতির একটা ওড়না নিয়েছে। আশেপাশে তাকিয়ে ওড়না দিয়ে নিজের মুখটা ভালো করে ঢেকে ঝট করে নেমে যায় নিচে। এরপর নিচে অপেক্ষারত সিএনজিতে উঠে যায়।

এদিকে তৃণা রুমের মধ্যে পায়চারী করে চলেছে। দশ মিনিট পেরিয়ে বিশ মিনিট অতিক্রম হয়, তিন্নি ফিরে আসে না। ঘড়ির কাটা টিকটিক করে এগিয়ে চলে। দুশ্চিন্তায় অস্থির হয়ে বারান্দায় গিয়ে কয়েকবার উঁকি দিয়েছে সে। এরপর ফোন তুলে তিন্নির নাম্বারে কল লাগায়। অপর পাশ থেকে জানায়, নাম্বারটি বন্ধ আছে।

“আপু কি ফিরবে না?”
আপন মনে প্রশ্নটা করে তৃণা আবার নিজেকে সামলায়।
“না, আপু ফিরবে। ও কখনো কথা দিয়ে বরখেলাপ করেনি।”

বিছানায় বসে পড়ে সে।
ঘণ্টার কাঁটা ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়।
বাইরে থেকে হঠাৎ হৈ–হুল্লোড়ের শব্দ ভেসে আসে। ড্রয়িংরুমের দিক থেকে মানুষের কথার শব্দ কানে আসে। হঠাৎ কারও গলা শোনা যায়,
“বরযাত্রী এসে গেছে!”

তৃণার বুকটা কেঁপে ওঠে।
সে দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে। চোখের পাতা ফেলতে পারে না।

হঠাৎ দরজায় জোরে কড়া নাড়ার শব্দ।

“তৃণা! দরজা খোল। বরযাত্রী আসছে।”

নাবিলার গলা।
তৃণা নড়ে না। দরজার কাছে গিয়েও দরজা খোলে না।
ভেতর থেকেই বলে,”আমি আপুর কাছ থেকে যাবো না।”

“কি বলছিস তুই? দরজা খোল! তুই আপন শালিকা, তুই বরের গেইট ধরবি না?”

“না। আপুকে একা রেখে যাবো না।”

নাবিলা বিরক্ত গলায় বলে,
“পাগল নাকি তুই? পরে টাকার ভাগ পাবি না।”

সে চলে যায়।
তৃণা দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে পড়ে। বুকের ভেতরটা ধুকপুক করছে। ঘড়ির দিকে তাকায়। সময় গড়িয়ে যাচ্ছে। খুব দ্রুত।

হঠাৎ মাগরিবের আজানের ধ্বনি ভেসে আসে।
আকাশে আলো কমে এসেছে।

আজানের শব্দে তৃণার ভেতরটা কেঁপে ওঠে। চোখের সামনে সব অন্ধকার হয়ে আসে। হাত কাঁপতে থাকে।

ঠিক তখনই আবার দরজায় নক পড়ে।
এইবার মায়ের গলা শুনতে পায়,
“তৃণা দরজা খোল।”

“কাজি সাহেব বসে আছেন। তিন্নির আইডি কার্ডের কপি লাগবে। দরজা খোল মা।”

তৃণা নড়ে না।
শবনম বেগম আবার নক করেন। এরি মাঝে তৃণার বাবা তৈয়ব উদ্দিন এসে বলেন,
“কি করছো তিন্নির মা? তাড়াতাড়ি কাগজ নিয়ে আসো।”

“হ্যা আসছি।”

তৈয়ব উদ্দিন যেতেই তিনি আবারো দরজায় নক করেন। তবে এবার তার চোখে মুখে বিরক্তি।
“তৃণা!”

কিছুক্ষণ পর সে ধীরে ধীরে দরজা খুলে দেয়।
শবনম বেগম ভেতরে ঢুকতেই থমকে যান।
মেয়ের চেহারা দেখে এক ঝলকে বুঝে যান, কিছু একটা ঘটেছে। ফ্যাকাশে মুখ, কাঁপা ঠোঁট, চোখে আতঙ্ক।

“কি হয়েছে?”
গলা নামিয়ে প্রশ্ন করেন।

তৃণা কোনো উত্তর দেয় না।

“তিন্নি কই?”
এবার তার গলায় ভয়ের আভাস।

তৃণা চুপ।
শবনম বেগম হঠাৎ ঘরের ভেতর দৌড়াতে শুরু করেন। বাথরুমের দরজা খুলে দেখেন খালি। বারান্দায় গিয়ে তাকান কেউ নেই।

মুহূর্তের মধ্যে ঘরে ফিরে এসে তৃণার বাহু শক্ত করে চেপে ধরেন।
“তোর আপু কই?”

তৃণার চোখে পানি চলে আসে।
“আপু বলছিলো..চলে আসবে..”

শবনম বেগমের চোখ দুটো বড় হয়ে যায়। বিশ্বাস করতে পারেন না।

ঠিক তখনই দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকে মাহি।

মাহিকে দেখে মা-মেয়ে থমকে যায়।
মাহি অবাক হয়ে প্রশ্ন করে,
“তিন্নি আপু চলে গেছে?”

তৃণা আর শবনম বেগম দুজনেই চমকে ওঠে।

মাহির মুখের রঙ বদলে যায়।
“মানে..পালিয়েছে?”

ওরা কিছু বলার আগেই মাহি চিৎকার করে ওঠে,
“কনে পালিয়েছে!”

সে দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।
এক মুহূর্তে নিস্তব্ধতা বয়ে যায়।
পরের মুহূর্তেই পরপর দু’টো শক্ত চড় পড়ে তৃণার গালে।

“সব দোষ তোর! তোর জন্য আজকে মানুষের সামনে অপমানিত হতে হবে।”

তৃণার চোখ ছলছল করছে। গালে হাত রেখে মায়ের দিকে তাকায়। গাল জ্বালা করছে। মাথা নুইয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।

হঠাৎ দরজায় হুড়মুড় করে মানুষ ঢুকতে শুরু করে। মাহি তার মা, মেজ ভাই সহ আরও কয়েকজন মুরুব্বি নিয়ে আসে। ড্রয়িংরুমে হৈচৈ শুরু হয়ে গেছে।

মাহির মা মিসেস জান্নাত শক্ত গলায় জিজ্ঞেস করেন,
“বেয়াইন, যা শুনলাম সব কি সত্য? তিন্নি কি পালিয়েছে?”

শবনম বেগম চুপ করে থাকেন। এর মাঝে ভীড় ঠেলে তৈয়ব উদ্দিন আর তমাল এসে হাজির হয়।

এক ফাঁকে রিশাদ ছুটে এসে তৃণার বাম হাতের আঙুল জড়িয়ে ধরে। তৃণা অশ্রু চোখে তার দিকে তাকায়। এটা দেখে মাহি তাকে কোলে তুলে নিতেই সে চেঁচায়।
“দাবো না। মাহি আমালে ছাড় ছাড়..”

মাহি তাকে নিয়ে বেরিয়ে যায়।

তৈয়ব উদ্দিন বলেন,
“বেয়াইন আপনারা গিয়ে বসুন। আমি দেখছি কি হয়েছে।”

মিসেস জান্নাত আগের স্বরে বলেন,
“কি আর দেখবেন? আপনাদের মেয়ে পালিয়েছে। এভাবে আমাদেরকে ডেকে অপমান করার মানে কি? বিয়ে না করলে আগেই বলতো।”

মিসেস জান্নাতের তীক্ষ্ণ কথার বিপরীতে বিনয়ী স্বরে তৈয়ব উদ্দিন জবাব দেন,
“হয়তো কোথাও ভুল হচ্ছে। তিন্নি এমনটা করতে পারে না।”

“এসব আমার কথা না। আপনার ছোট মেয়ে নিজ মুখে বলেছে। মাহি সবটা শুনেছে। ওরেই জিজ্ঞেস করুন তিন্নি কোথায়? তাহলেই সবটা জলের মতে পরিষ্কার হয়ে যাবে।”

তৈয়ব উদ্দিন মেয়ের দিকে তাকান। এরপর স্ত্রী’র দিকে।

শবনম বেগম নিচু স্বরে বলেন,
“তিন্নি এখানে নেই। ও সত্যি চলে গেছে।”

কথাটা কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারেন না তৈয়ব। তার বড়ো মেয়ে এভাবে চলে গেলো!

“বেয়াই সাহেব এটা কোনো কথা? কি শুনলাম এটা?”

মাহির বাবা আকরাম শিকদার এসে হাজির হন।

“বড়ো মেয়ে তো পালিয়ে গেছে তাহলে এখন বিয়েটা কীভাবে হবে? আমাদের ছেলের সাথে এমন অসম্মান জনক কাজ আপনারা কি করে করতে পারলেন?”

মিসেস জান্নাতের কথা শুনে তৈয়ব উদ্দিন মাথা নুইয়ে হাত জোড় করে বলেন,
“আমাকে ক্ষমা করে দিন। কথা দিয়ে কথা রাখতে পারিনি। আজকে বিয়েটা হবে না।”

“বিয়েটা হবে।”
হঠাৎ ভরাট পুরুষালী গলা শুনে সকলে দরজার দিকে তাকায়। তৃণাও অশ্রুসিক্ত নয়নে সেদিকে তাকায়।
ধবধবে সাফেট পাঞ্জাবী তার উপর হাফহাতা গাঢ় নীল রঙের কোটি গায়ে দাঁড়িয়ে তার স্বপ্নের পুরুষ মেজর শিকদার। তৃণা তাকাতেই দুজনের চোখাচোখি হয়।

রওনক শান্ত গলায় বলে,
“তৃণা উইল বি মাই ব্রাইড। আই উইল ম্যারি হার।”
….
(চলবে..?)

মেজর_শিকদার-০১

ঈশিতা_ইশা

(আপনাদের রেসপন্স পেলে গল্পটা রেগুলার আসবে। আমি চাই সবাই ভালো মন্দ যেমনই হোক গল্পটা পড়ে নিজেদের মতামত দিন। বহুদিন বাদে রোমান্টিক থ্রিলার লিখছি তাই আপনাদের সহায়তা প্রয়োজন।)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply