Golpo ডিফেন্স রিলেটেড মেজর ওয়াসিফ

মেজর ওয়াসিফ পর্ব ৯


মেজর_ওয়াসিফ

লেখনীতেঐশীরহমান

পর্ব_০৯

[ 🚫 কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ 🚫]

বয়সটা যখন ঠিক ঐ ষোলো’র কোঠায়, আচমকা মেয়েটা মন হারিয়ে বসেছিলো আঠাশের এক যুবকের ঝলমলে হাসিতে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে সেই মানুষটা এখন আর হাসেনা। সহজ সরল মেয়েটা নিজের অজান্তেই হুমড়ে পড়েছিলো তার চেহারা সৌন্দর্যের মারপ্যাচে। তখন কি আর বুঝেছিলো চেহারায় মাধুর্যতা থাকলেই তাকে পাওয়া যায় না, সইতে হয় অপমান। শুনতে হয় সেই মুখে কড়া কথা। নিজের মনে দুলে ওঠা সেই আবেগের কথা গুলো তাকে জানিয়ে দেওয়া ই ছিলো বোধহয় জীবনের সবচেয়ে ভুল সিদ্ধান্ত।
ঐ ষোলো বছর বয়সটা পরযন্ত ধারা কখনো দেখেনি ওয়াসিফকে এতোটা কঠোর হতে। অন্যান্য ভাই বোনগুলোর মতো করে ওকেও ভীষণ ভালোবেসে আগলে রাখতো। শহর থেকে যখনই ছুটিতে বাড়ি আসতো সবার আগে ধারার চাওয়া পাওয়া গুলো পূরণ করতো, বায়না মেটাতো। ঐ আদর, স্নেহ, আর যত্নে ধারার আবেগি মন তখন বুঝতো অন্য হিসেব। তার হিসাবকে অন্য হিসাব মনে করে বোকা ধারা আজও সেকথা মনে করে নিজেকে গালাগাল করে ইচ্ছে মতো। ঐ চিন্তা, ঐ আবেগ সবকিছু যেনো ওকে আরো কয়েকধাপ বাড়িয়ে দেয়। লাই পেতে থাকে সব বিষয়ে। সময় গড়ায়, ছোট্ট মনে অনুভূতি গাঢ় হয়। নিজ মনে চেপে রাখার বয়সটা তো তার তখন ছিলোনা।
হঠাৎ ই একদিন বাড়িতে সুখবর এলো, ভদ্রলোকের চাকরির দরখাস্ত এলো। এক লম্বা সময়ের জন্য তাকে ছাড়তে হবে বাড়ি। এটা সবার জন্য খুশির খবর হলেও ধারার জন্য মোটেও ছিলোনা সুখবর। মানুষটাকে চোখের সামনে হুটহাট আর দেখতে পাওয়া যাবে না’ বিষয়টা ভেবেই আবেগি মন তখন কেঁদে উঠতো। তাই তো মানুষটার লাই পেয়ে পেয়ে ইনিয়ে বিনিয়ে তাকে বুঝিয়ে দেওয়া হলো একটা মনের গোপন কথোপকথন। আর সর্বনাশটা ঠিক ঘটেছিলো সেখানেই। নিজেকে প্রকাশ করার মধ্যে দিয়ে বড়োসড়ো বাশটা ধারা তখনই খেয়েছিলো। যা এখনো ওকে লজ্জায়, আতংকে, গুমরে মরতে হয়’

পুরাতন এসব কথা গুলো যখন আচমকাই মস্তিষ্কে ভার জমিয়ে জেগে ওঠে ধারা পারেনা নিজেকে সামলে উঠতে। ওর চোখ দুটো ভিজে ওঠে সঙ্গে সঙ্গে। আজও বারবার ওর মনে প্রশ্ন ওঠে। সেদিনের সেই রুড বিহেভ করা মানুষটা কিভাবে পারে বিয়ে করে তার জীবনের সঙ্গে ওকে জড়িয়ে নিতে? আর জড়িয়ে নিলেও ধারা কি ভুলে গেছে সেদিনের করা ঐ বাজে ব্যবহার? ভুলতে পারেনা, মানুষ এই জীবনে সবকিছু ভুলতে পারলেও কথার আঘাত ভুলতে পারেনা। কখনো ভোলা যায়না।
আচমকাই ওর ধ্যান ভাঙে বাইরের গাড়ির শব্দে, ও নিজের ধ্যান ভেঙে দ্রুত উঠে দাড়িয়ে দু’হাতে চোখের পানিটুকু মুছে ফেলে। হঠাৎ ই ও বুঝতে পারে ওর পা দু’টো কাঁপছে থরথর করে, হাত কাঁপছে। সচারাচর এবাড়ির উঠানে গাড়ি বলতে ঐ একটা গাড়িই আসে। এই গাড়ির শব্দ ধারার চেনা ভালো মতো। গায়ের ওড়নাটা ভালো মতো পেচিয়ে মাথায় কাপড় তুলে ও ঘর থেকে বের হয়। নিচে নামেনা। গিয়ে দাঁড়ায় দোতলার খোলা বারান্দায়। সেদিন ও এখানে দাড়িয়ে থেকে ওয়াসিফ কে বিদায় দিয়েছিলো আজও সেখানে গিয়েই দাঁড়ালো।

বারান্দায় দাঁড়াতেই অন্যদিনের মতো সবার আগে ওয়াসিফ কে দেখতে পেলোনা ও। ওর চোখে পড়লো বাকিদের দিকে।তাদের মধ্যে দুজন ছেলে একজন মেয়ে। তাদের পরনে ফর্মাল ড্রেস। ধারা বুঝে উঠতে পারছেনা এরা কারা? কিন্তু যখন ই গাড়িটার দিকে চোখ পড়লো বুঝলো এরা হয়তো ওয়াসিফের সহকর্মী। তাকে পৌঁছে দিতে এসেছে। তবে আগে পরে এভাবে কখনো কেউ ঘটা করে তাকে বাড়িতে পৌঁছে দিতে আসেনি, তাহলে কি এবার তার অসুস্থতা গুরুতর? বিষয় সত্যি কি মিথ্যা যাচাই-বাছাই করতে ধারা উঁকি ঝুঁকি দিতে থাকে ওর চোখে তেমন কিছু ই পরেনা। বাকিরা তো বেশ হাসি মুখে কথা বলছে। ইতিমধ্যে নিচতলায় এক প্রকার কথার সোরগোল শুরু হয়েছে। ধারা তাড়াতাড়ি করে বারান্দা থেকে দোতালার সিঁড়ির কাছটাতে নিজেকে একটু আড়াল করে দাঁড়ালো।

ওয়াসিফ বসার ঘরে প্রবেশ করতেই শাহেনূর ছেলেকে দেখে বিষ্ময়কর ভাবে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। এরপর ছুটে গিয়ে ছেলেকে ধরে হাজার প্রশ্ন তার।

” একি তোর হাতে কি হয়েছে? এভাবে বুকের সঙ্গে বাঁধা কেনো?”

পাশ থেকে সামির, আরিয়ান ওরা এগিয়ে এলো। বললো। “আন্টি, স্যার একটু সামান্য ছোট পেয়েছে, তেমন কিছু ই না”

প্রথমদিকে ওয়াসিফ যখন একাই রওনা হলো সঙ্গে সঙ্গে মেজর হাসান কল দিয়ে ওদের উপর ধমকে উঠেছিলো। তারা কেনো ওয়াসিফ কে অসুস্থ অবস্থায় একা যেতে দিলো। তাদের কি কোনো দায়িত্ব ছিলো না। পরপরই ওরা দু’জন গাড়ির ড্রাইভারকে কল করে গাড়ি থামিয়ে ওয়াসিফের সঙ্গ হলো। সেই সাথে ওদের ডিপার্টমেন্টের জুনিয়র অফিসার শশীও এলো। ওয়াসিফ বিষয়টাতে না করলে আজ ওরা শোনেনি স্যারের কথা। পরবর্তী তে ওয়াসিফ ও আর না করেনি। সবগুলো কে এনেছে সাথে করে। তারাও স্যারের অসুস্থতায় স্যারকে সঙ্গ দিতে পেরে বেজায় খুশি মনে মনে।

শাহেনূর ওদের কথা শোনার থেকে তখন ছেলেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে থাকে। ওয়াসিফ যথাসম্ভব নিজেকে শক্ত রেখে ডানহাতে মায়ের কাঁধ পেচিয়ে বসার ঘরে সোফার কাছে যেতে যেতে বলে।

” একটু চোট পেয়েছি, সামান্য বিষয় আম্মা, চিন্তা করে না। দেখো কত মেহমান এসেছে, ওদের দিকে খেয়াল দেও”

শাহেনূর তারপর ছেলেকে ভালো মতোন দেখে শান্ত হয়। আহামরি বেশি অসুস্থতার ছাপ খুঁজে পায়না সে। বাকিরাও বসে সোফায়। সামির, আরিয়ান, ওরা চোখ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বাড়িটা দেখতে থাকে। শশী একটা সোফায় বসে আছে চুপচাপ। সামিরা, শাহেনূর, পারুল, লোপা এরা ইতিমধ্যে সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ে মেহমান আপ্যায়নে। শাহেনূর ছুটে রান্না ঘরে যেতে যেতে লোপাকে ডেকে বলে।

” বাপ, চাচাদের ফোন করে জলদি পোলাও এর চাল, বাজার করতে বল। “
ছোট জা পারুল কে ডেকে বলে, ” কটা ধান নিয়ে পেছনের উঠোনে ফেল, বড়ো মোরগটা ধরতে হবে”

নিচের বসার ঘরের সমস্ত দৃশ্য এতক্ষণ মনোযোগ দিয়ে দোতালার রেলিঙের আড়ালে দাড়িয়ে দেখছিলো ধারা। ওর টনক তখন নড়লো যখন বড়ো আম্মা ছোট আম্মা কে ডেকে ওর শখের বড়ো মোরগটাকে ধরতে তাড়া দিলো। ও উপায়ন্তর না পেয়ে একহাত ঘোমটা টানলো, যার ফলে ওর মুখ কপাল পুরোটা ঢেকে গেছে। এবার ওকে উঠানের দিকে যেতেই হবে। ওর শখের মোরগ কেনো জবাই করা হবে? এদের টাকা পয়সার কি অভাব পড়েছে? একটা কিনে আনতে পারছেনা?

ওয়াসিফ সেই তখন থেকে আশেপাশে তাকিয়ে দেখছে। মুমতাহিনা কে দেখেনি ও এখনো। কারো কাছে জিজ্ঞেস ও করছেনা। ও ভেবে নিয়েছে হয়তো সে কলেজে। ওয়াসিফ হাতে থাকা ফোনে সময় দেখে দুপুর পৌনে একটা। দুটোই কলেজ শেষ। ওয়াসিফ সোফা ছেড়ে উঠেই ওপাশে গিয়ে মেঝো মা সামিরাকে ডেকে বলে।

” দুটো রুম খুলে দেও মেঝো মা। জার্নি করে এসেছে রেস্ট প্রয়োজন ওদের”

সামিরার হাতে কাজ ছিলো, তাড়াতাড়ি হাত দু’টো পানির গাবলায় চুবিয়ে শাড়ির আঁচলে মুছতে মুছতে ওয়াসিফের পেছন পেছন গেলো চাবি নিয়ে।

এই সুযোগটাই কাজে লাগালো ধারা। ওয়াসিফ সরে যেতেই ও গোমটা আরেকটু টেনে ভো দৌড় দিয়ে বসার ঘর পেরিয়ে গেলো। বসার ঘরে তখন ছিলো আরিয়ান, সামির আর শশী। আচমকা এভাবে কাউকে দৌড়ে যেতে দেখে সামির কনুই দিয়ে গুতা মেরে আরিয়ানকে বলে।

” এটা কে ভাই “?

আরিয়ান সদর দরজার দিকে ই তাকিয়ে ছিলো তখন। যে দরজা দিয়ে ধারা চিলের মতো উড়ে গেছে। বলে।

” ভূত”

” ভূত কিভাবে মেয়ে মানুষ হয়? আমি তো দেখলাম একটা মেয়ে মানুষ “

আরিয়ান কটমট চোখে ওর দিকে তাকিয়ে বলে।

” মানুষই যখন দেখলি ভাই তখন আবার আমাকে জিজ্ঞেস করিস ক্যান? স্যারের বাড়িতে আসছি হবে হয়তো তার ফ্যামিলির কেউ। চুপচাপ থাক”

” আচ্ছা থাকলাম চুপচাপ, কিন্তু স্যারের সেই ওস্তাদি বৌ টা কই? তারে তো এখনো দেখলাম না”

” কি জানি! কই আছে, হতে পারে এটাই স্যারের বৌ”

সামির অবাক হয়ে বলে এবার।

” এ যদি স্যারের বৌ ই হয় তবে স্যারের পিছুপিছু না ঘুরে দৌড় প্রতিযোগিতা খেলছে কেনো”?

আরিয়ান এবার সত্যি সত্যি বিরক্ত হয়।

” এই ব্যাটা চুপ কর। এতকিছু আমি কিভাবে জানবো”?

শশী বিরক্ত হয়ে ফোন থেকে মুখ তুলে বলে।

” আমাদের মনে হয় ফিরে যাওয়া উচিত”

সঙ্গে সঙ্গে চোখ মুখ কুঁচকে ফেলে সামির, বলে।

” এতো যখন তাড়া এসেছো কেনো আমাদের সঙ্গে, আমারা আজ ফিরছি না”

চলবে

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply