Golpo ডিফেন্স রিলেটেড মেজর ওয়াসিফ

মেজর ওয়াসিফ পর্ব ৬


মেজর_ওয়াসিফ

লেখনীতেঐশীরহমান

পর্ব_০৬

[ 🚫 কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ 🚫]

হাসপাতালের কেবিনের সেই চেনা সাদা দেয়ালগুলো শাহেদ ওয়াসিফের চোখে বড় বেশি ঝাপসা হয়ে ধরা দিচ্ছে। কড়া অ্যান্টিবায়োটিকের ঘোরে মাথাটা অসম্ভব ভার। তবুও মনের গহিনে একটা চাপা অস্বস্তি মিশনটা তো শেষ হলো, কিন্তু বাড়ি সামলাবে কে? আরিয়ান যখন ফোনটা লাউডস্পিকারে দিয়ে ওর মায়ের নাম্বারে ডায়াল করলো, শাহেদ একবার বুক ভরে শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করলো। কাঁধের ক্ষতটা যেন সেই নিঃশ্বাসের টানেই টনটন করে উঠলো।

ওপাশে ফোন রিসিভ হতেই ভেসে এলো সেই চেনা, চঞ্চল,কণ্ঠস্বর। ধারার গলা।

“হ্যালো, কে বলছেন”?
এটা আরিয়ানের আরেকটি সিম, যেটা বড়ো আম্মার ফোনে সেইভ করা নেই। ধারার কাছে অপরিচিত মনে হলো নাম্বারটি।

ওয়াসিফ চোখ বুজে ফেলল। ধারা! এই মেয়েটা এখানে কেন? আরিয়ান কাঁচুমাচু মুখে ওয়াসিফের দিকে তাকাল। সে বুঝতে পারেনি ফোনটা সরাসরি ধারার হাতে চলে যাবে।স্যারের ওয়াইফের গলা চিনতে পেরেছে আরিয়ান।ওয়াসিফ খুব ক্ষীণ স্বরে বলল, “হ্যালো…”

ফোনটা কানে নিতেই ধারার বুকের ভেতরটা কেমন যেন ছ্যাৎ করে উঠল। এই স্বরটা তো চেনা শাহেদ ওয়াসিফেরই, কিন্তু তাতে সেই তেজ কই? সেই ধমকের সুর কোথায়? কেন যেন মনে হচ্ছে কণ্ঠটা অনেক দূর থেকে ভেসে আসছে, যেন বাতাসের টানে কোনোমতে টিকে আছে।

ধারা এক মুহূর্ত থমকে গেলো, রাগ, অভিমান সাময়িক সময়ের জন্য পাশে সরিয়ে রেখে বলল, “আপনি কি অনেক অসুস্থ? গলা এমন লাগছে কেন?”

ওয়াসিফ নিজেকে সামলে নিয়ে একটু কড়া হওয়ার চেষ্টা করল, যদিও দুর্বলতা ঢাকতে পারল না। “জ্বর হলে মানুষের গলা এমনই হয়। আম্মা কোথায়? আম্মাকে দেও।”

এই দেও সম্মোধন শুনে ধারা যেনো টুপ করে আকাশ থেকে পড়লো। ধারা অবাক ভঙ্গিতে একবার কান থেকে ফোন নামিয়ে আবার কানে চেপে রেখে ভাবে জ্বরের ঘোরে এই লোকের কি মাথায় সমস্যা হলো নাকি? তুই থেকে তুমি তে কিভাবে গেলো? ধারার ভীষণ আনইজি লাগে, সেই ছোট থেকে যার মুখে তুই! তুই! শুনতে শুনতে এসেছে, সেই লোকের মুখে হুট করে তুমি বড্ড বেমানান ঠেকলো। ওপাশে ধারাকে চুপচাপ থাকতে দেখে ওয়াসিফ ফের বলে।

” আম্মা কই”?

” রান্না ঘরে “

” তাকে ফোন দেও”

ধারা দমে যাওয়ার পাত্রী নয়। সে ফোনটা বড় আম্মাকে দেওয়ার জন্য পা বাড়াল না। উল্টো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করতে লাগল, “জ্বর হয়েছে নাকি অন্য কিছু? আরিয়ান সাহেব বললেন আপনি ব্যস্ত, কথা বলতে পারবেন না। কিন্তু এখন তো আপনিই কল দিলেন। বিষয়টা কি..”

ধারাকে থামিয়ে ওয়াসিফ আবারও বলল, “তর্কে যেও না। আম্মাকে ফোনটা দাও। আমার বেশি কথা বলার শক্তি নেই।”

“ কেনো? আপনার শক্তি নেই কেনো? শক্তি কই গেছে ফুরিয়ে গেছে”?

বেডের দুইপাশে আরিয়ান আর সামির চেয়ে আছে ওয়াসিফের দিকে। ওয়াসিফ একপলক ওদের দিকে তাকিয়ে ফের বলে।

“ আম্মা কে দিতে বলেছি”

ধারা ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকে কিছু সময়। আসলেই সে কেনো এতো ঝেছে পড়ে ঐ লোকের সঙ্গে কথা বাড়াচ্ছে। তার তো এই লোকের সঙ্গে কথা বলার কোনো প্রয়োজনই নেই। তার সঙ্গে এতটুকু কথা বলা ই ওর ভুল হয়েছে। ধারা আর কোনো কথা না বলে ছুটে গিয়ে ফোন দিয়ে আসে রান্না ঘরে। বড়ো আম্মার দিকে ফোন বাড়িয়ে দেয়।

“ তোমার ফোন”?

শাহেনূর তরকারি কাটতে কাটতে জিজ্ঞেস করে।

“ কে”?

“ তোমার ছেলে”?

দ্রুত কাজ ফেলে শাহেনূর ফোন নেয়।

“ হ্যালো! ওয়াসিফ”?

“ আম্মা! কেমন আছো তোমরা? তোমার শরীরের কি অবস্থা, কোমরের ব্যথা বেড়েছে কি”?

“ আমরা সবাই ভালো আছি, তুই কেমন আছিস? জ্বর কমেছে “?

ওয়াসিফ সেকেন্ড খানেক চুপ থেকে বলে।

“ কমেছে আম্মা। ভালো আছি আমি”

টুকটাক ওদের মা-ছেলের কথা চলতে থাকলো, ধারা পাশেই দাড়িয়ে ছিলো। হঠাৎ ওয়াসিফ জিজ্ঞেস করে।

“ তোমার পাশে কে আছে আম্মা”?

ও কথা শুনে ধারা লাফিয়ে ওঠে, শাহেনূর ধারার দিকে তাকিয়ে বলে।

“ ধারা আছে, কথা বলবি, এই নে”
শাহেনূর ফোনটা ধারার দিকে এগিয়ে দিতেই ধারা মিনমিন করে বলে।

“ আমি বলেছি তো..”

“ আরে কথা বল”

এক প্রকার জোর করে ধারা ফোনটা হাতে নেয় ওপাশ থেকে ওয়াসিফ বলে।

“ আগামী সপ্তাহে বাড়িতে ফিরছি, আমার ঘর এলোমেলো করে রাখলে গুছিয়ে রাখবি নিজ দায়িত্বে”

ধারা ফোন নিয়ে এক পা দুপা করে তখন রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে যায়, ওয়াসিফের কথার বিপরীতে বলে।

“ ও ঘরে আমি যাইনি,এলোমেলো ও হয়নি”

“ তবুও গুছিয়ে রাখবি”

“ পারবোনা” ধারা চটপট উত্তর দেয়।
এই মুহূর্তে সামির ফিক করে হেঁসে দেয়, আরিয়ান হাসি আঁটকে শক্ত হয়ে দাড়িয়ে আছে। সামির ওয়াসিফের দিকে তাকাতেই হাসি মুখ লুকিয়ে সঙ্গে সঙ্গে চুপচাপ দাড়িয়ে থাকে। ওপাশে থাকা ধারা বুঝতে পারে ওয়াসিফের আশেপাশে লোক আছে, শুধু সে একা না। ওয়াসিফ বুঝতে পারে এই মেয়ের সঙ্গে আর একটা কথা বাড়ালে ওকে জুনিয়রদের সামনে সম্মান হারাতে হবে। ওয়াসিফ রাখছি বলে ইশারায় আরিয়ানকে কল কাটতে বলে। এরই মধ্যে দুইজন ডাক্তার ঢুকলো কেবিনে ভিজিট করতে। বেখেয়ালি আরিয়ান জলদি ফোনকল কাটতে গিয়ে পকেটে ঢুকিয়ে ফেলে। ডাক্তারদের সঙ্গে মেজর হাসান সাহেবও এসেছেন। আরিয়ান, সামির তখন সিনিয়রকে স্যালুট দিতে ব্যস্ত।
ডাক্তার ওয়াসিফের শারিরীক অবস্থা দেখে, রিপোর্ট গুলো চেক করতে করতে বলে।

“ আপনার রক্তের তেজ আপনার মতোই জোরালে। কোন দুয়োর থেকে ফিরে এসেছেন আশা করি বুঝতে পারছেন। গুলির ক্ষত কিন্তু বেশ গভীর, সারতে সময় লাগবে”

ওয়াসিফ চুপচাপ শোনে ডাক্তারের কথা। ডাক্তারের ভিজিট শেষে বেরিয়ে যেতেই মেজর হাসান টুকটাক কথা বলে ওয়াসিফকে জানায়।

“ আপনার এক মাসের ছুটি হয়েছে, শারীরিক অবস্থার উপর বিবেচনা করে পরবর্তীতে ছুটি বাড়বে। হাসপাতাল থেকে রিলিজের পর অবশ্যই হেডকোয়ার্টার থেকে একবার ঘুরে যাবেন। আমরা অপেক্ষায় থাকবো”

ফোনের অপরপাশে থাকা ধারা ততক্ষণে শুনে ফেলেছে সবটা। দেয়ালের সঙ্গে পিঠ ঠেসে কতক্ষণ থ হয়ে দাড়িয়ে রইলো। ওর মস্তিষ্ক ওকে কয়েক সেকেন্ডের জন্য পুরোপুরি অকেজো করে রেখে দিলো। ও কি করবে কি প্রতিক্রিয়া দেখাবে কিছুই বুঝে উঠতে পারছেনা। মিনিট খানেক ওভাবে কাটতেই ঠাস করে কল কেটে দেয় ধারা। মনে মনে ভাবে। ঐ লোকটা যখন গুলি খেয়েছিলো নিশ্চয় এবাড়িতে ওরা সবাই তখন নিশ্চিত হয়ে ঘুমাচ্ছিলো। ঐ মানুষটা যখন গুলি খেয়ে ছটফট করেছে ওরা তখন এবাড়িতে নিরাপদে রয়েছে। অথচ কেউ একটা খবর ওদের কানে দিলোনা। কখন দিতো খবর? মানুষটা মরে পঁচে গেলে তারপর বাড়িতে খবর পাঠাতো? অবুঝ মস্তিষ্কে তখন রাগ বাড়ে হিড়হিড় করে। ও নিজের হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ঝটপট কল দেয় আরিয়ানের নাম্বারে। আরিয়ান আর সামির তখন হাসপাতালের ক্যান্টিনে ঢুকেছে চা খেতে। ফোন বেজে উঠতেই আরিয়ান চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে ফোন বের করে সঙ্গে সঙ্গে রিসিভ করে কানে ঠেকাতেই ওপাশ থেকে তিরিক্ষি মেজাজে কথা ছোটে ধারার।

” মানুষ কতবড় মিথ্যাবাদী হতে পারে আপনাকে না দেখলে জানতাম না। এই আপনি গুলি খেয়েছেন কখন? আমাদের মিথ্যা বললেন কেনো আপনার জ্বর হয়েছে? কত বড়ো মিথ্যাবাদী আপনি? আপনার ঐ চ্যালাপ্যালা গুলো আপনার চেয়েও বড়ো মিথ্যাবাদী। ফোন দিন, ফোন দিন আপনার ঐ চ্যালাপ্যালার কাছে। আমি জানতে চাই এতোবড়ো একটা মিথ্যা কেনো বলা হলো আমাকে”?

আরিয়ান চা খাওয়া থামিয়ে বড়ো বড়ো চোখ করে তাকিয়ে আছে সামিরের দিকে। ফোন হালকা লাউডে থাকায় সামিরও শুনছে সব কথা।সেনাবাহিনীর কর্ম কর্তা হয়েও তাদের শুনতে হচ্ছে চ্যালাপ্যালা। নতুন নামকরণ হলো তাদের। আরিয়ান ঠাস করে ফোন চেপে ধরে সামিরের কানে। সামির কি বলবে? ধারা একদমে ওতোগুলো কথা বলে এখনও রাগে ফোঁস ফোঁস করছে। এপাশে এদের নিরবতা দেখে ধারা ফের বলে।

” কি সমস্যা কথা বলছেন না কোনো? কথা হারিয়ে গেলো? কথা খুঁজে পাচ্ছেন না”?

সামির আমতা আমতা করে বলে।

” আসলে! স্যার.. ভাবি ঠান্ডা হন”

ধারা লম্বা দম ফেলে নিজেকে সামলে ওঠে বলে।

” আপনাদের স্যার কোথায় “?

” কেবিনে, ঘুমাচ্ছে “

” শাহেদ ওয়াসিফ গুলি খেয়েছে, হাসপাতালে ভর্তি একথাটা তার ফ্যামিলিকে জানানোর প্রয়োজন মনে করেননি আপনারা “?

” জি করেছি, তবে স্যারের তরফ থেকে নিষেধ ছিলো। আমরা তার কথা অমান্য করতে পারিনা ভাবি”

ধারা কিছু সময় চুপ থেকে শান্ত কন্ঠে বলে।

” এখন কি অবস্থা আপনাদের স্যারের”?

” আলহামদুলিল্লাহ, স্যার এখন যথেষ্ট সুস্থ “

” এই কথাটা কি সত্যি সত্যি বললেন নাকি এখানেও মিথ্যে আছে “?

সামির সামান্য হেঁসে বলে। ” জি, একদম সত্যি কথা ভাবি। স্যার ভালো আছে “

” আচ্ছা, রাখছি তাহলে। উনার ঘুম ভাঙলে ভিডিও কলে আম্মার সঙ্গে কথা বলতে বলবেন। আম্মা অপেক্ষা করছে “

” জি আচ্ছা “

কল কাটতেই সামির তাকায় আরিয়ানের দিকে। কয়েক সেকেন্ড একে অপরের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলে দুজনই বলে। আরিয়ান বলে।

” ভাইরে ভাই! এটা তো বাঘিনী। গলায় কি তেজ? “

” সেটাই, তবে উনি খবর পেলেন কিভাবে স্যার গুলি খেয়েছেন “?

আরিয়ান হাসি থামিয়ে বলে।

” ছোট্ট একটা ভুল করে ফেলেছিলাম, স্যার তখন ঐ যে কথা বললেন আর কেবিনে তখন ডাক্তাররা ঢুকলেন তাড়াহুড়ো করে কল না কেটে পকেটে ঢুকিয়েছিলাম, কাহিনি ঐখানে হয়েছে”

” আরেহ সর্বনাশ”

চলবে

[ আমি গতদিন থেকে অসুস্থ, সিজিনাশ জ্বর,কাশিতে পরেছি। যা পারি সেভাবে একটা পর্ব সাজিয়ে গুছিয়ে দিলাম। আজকে দেওয়ার ইচ্ছে ছিলো না তবুও আপনারা অপেক্ষায় আছেন বলে দিলাম। গল্প পড়ে রেসপন্স করে যাওয়া আপনার দায়িত্ব ]

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply