মেজর_ওয়াসিফ
লেখনীতেঐশীরহমান
পর্ব_২০
[ 🚫 কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ 🚫]
ধারার ‘ আপা’ বলে বিকট এক চিৎকার বাড়ি খায় দোতলার দেয়ালগুলো। মুহুর্তেই হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে থ হয়ে দাড়িয়ে থাকে ধারা। কি করবে? কাকে ডাকবে? এমন মুহুর্তে ওর মস্তিষ্ক পুরোপুরি ওকে চুপ করিয়ে রেখেছে। মিনিট খানেক ওভাবে পাথর হয়ে দাড়িয়ে থাকা ধারা এতটুকু পরিমাণ সচলতা ফিরে পেতেই তোড়পাতে থাকে জানালার গ্রিল ধরে।
‘ আপা, আপারে, এমন করিসনা আপা, ও আপা’
ওর ওভাবে চেচিয়ে অনুরোধ শুনছেনা লুইপা। পুরোপুরি মনোযোগ দিয়ে হাতের সুতির শাড়িটা জোরসে ছুড়ে মারলো উপর দিকে। শাড়িটা গিয়ে পড়লো সিলিং ফ্যানের পাখাতে। ওতোটুকু দৃশ্য দেখেই ধারা দোতালার এদিকে ওদিকে ছুটাছুটি করে আর আহাজারি করে ডাকতে থাকে।
‘ বড়ো আম্মা, আম্মা, তোমারা কোথায়? দেখে যাও, আপা পাগলামি করছে, আমি পারছিনা, তোমরা একটু আসো’
ওখান থেকে পুনরায় ধারা ছুটে আসে দরজার কাছে, আবারও কেঁদে অনুরোধ করে আপাকে।
‘ এমন করিসনা, পাগলামি বন্ধ কর আপা, ও আপা’
লুইপা অধৈর্য্য হয়ে এবার চেয়ার টেনে নিলো, শাড়ি ঠিক মতো ফ্যানে বাঁধাতে পারছেনা। ধারা ছুটে গিয়ে আবার ডাকে সবাই কে। এখনো কেনো কেউ এগিয়ে আসছেনা, পরপর ওর মনে পড়ে, বাড়িতে তো কেউ নেই, মাগরিবের পরপরই মা চাচীরা ওই পাড়ায় গিয়েছে কার যেনো অসুস্থতার খবর শুনে। ভরসন্ধ্যায় বাবা বা চাচা ও কেউ বাড়িতে নেই। ছোট ভাই বোনগুলোও পড়তে হবেনা বুঝে ছুটেছে পিছুপিছু মায়ের।
নোনাপানিতে টলমল দুই চোখে মাথা ঘুরিয়ে তাকায় দক্ষিণের ঘরটার দিকে। মস্তিষ্ক ডেকে বলে। এতো চিল্লাচ্ছে ও তারপরেও এই লোকটা কেনো এগিয়ে আসছে না? ধারা তার অপেক্ষায় দাড়িয়ে থাকেনা, ছুটে যায় ও ঘরের দুয়োরে। দরজাটাতে হাত রাখতেই ক্যাচক্যাচ শব্দ দরজা খুলে ফাঁকা হলো ঠিকই কিন্তু পুরো ঘর শূন্য পড়ে আছে। একটুখানি ভরসা নিয়ে যখনই এসে দাঁড়ালো মেয়েটা ঠিক তখনই সেই আলোটুকুও নিভে গেলো। তবুও নিজের ধারণাকে ভুল প্রমাণ করতে কয়েকবার ডাকলো।
‘ আছেন? শুনছেন আপনি? আপা..’
আচমকা বিকট এক শব্দ হতেই ধারা পুরোপুরি এবার স্তব্ধ হয়ে যায়। গায়ের বল শূন্য হয় সঙ্গে সঙ্গে। আর একপা টেনে সামনে এগিয়ে নেওয়ার শক্তিটুকু পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়। মাথা চক্কর কেটে তাল মিলিয়ে ধপ করে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে ছোটখাটো গড়নের শরীরখানা।
রাতের মধ্য প্রহর, বাইরে ঝড়ো হাওয়া বইছে, সাই সাই করে বয়ে যাওয়া বাতাস দোতালায় উপর দিয়ে যেনো এক রাতের তান্ডব চালিয়ে যাচ্ছে। খোলা জানালার পর্দা গুলো উড়ছে মন খুশি মতো। দিনের গরমকে এক নিমিষেই হারিয়ে দিয়েছে এই মধ্যরাতের বাতাস। খাটের বেডসাইডে মাথা হেলান দিয়ে হাঁটু ভাজ করে চুপচাপ বসে আছে ধারা।
বাইরের ঝড়ো হাওয়া যতটা তীব্র হচ্ছে ওদের বাড়ির ভেতরকার ঝড় ততটাই শান্ত হয়েছে এখন। ধারা মিনিট বিশেকের মতো জ্ঞান শূন্য হয়ে পড়ে ছিলো এই ঘরের মেঝেতে। ঐ বিশ মিনিটে কি কি ঘটেছে তা নিজ চোখে কিছু দেখতে না পারলেও জ্ঞান ফেরা মুহুর্তেই সবটা পরিষ্কার হয়েছে।
ঐ মুহুর্তের দৃশ্য চোখের পাতায় ভেসে উঠতেই গায়ের লোম এখনো কাটা দিয়ে উঠছে। কি অঘটন ঘটাতে যাচ্ছিলো তার বুদ্ধিমতি আপা?
ধারা এবার এলিয়ে রাখা মাথাটা সোজা করে তাকায় রুমের কোণায়, খোলা জানালার পাশে একটা চেয়ার পেতে সেখানে ওয়াসিফ বসে আছে। মুখ দেখা যাচ্ছে না, পিঠ ঘুরিয়ে বসেছে ধারা দিকে। কারেন্ট নেই, ঝড় শুরু হতেই কারেন্ট গেছে সেই তখনই। ঘরের সবকিছু অন্ধকারে ডুবে থাকলেও বিজলির আলোয় এক ঝলক ঘরের সবকিছু পরিষ্কার হয়ে চোখে ধরা দিচ্ছে। ধারা তাকিয়ে থাকে অন্ধকারে ওয়াসিফের দিকে। ভাগ্যিস! লোকটা সময় মতো এসেছিলো নয়তো এবাড়িতে আজ একটা শোক আয়োজন চলতো এতো সময়। অন্য সময় হলে, তার আপাকে এতোগুলো থাপ্পড় দেওয়ার কারণে এই লোকের সঙ্গে কথা বলাই বন্ধ করতো ধারা, তবে আজ আপার ঐ চড় গুলো পাওনাই ছিলো। আপার মতো মানুষের কাছে আজকের এই ছেলেমানুষী, পাগলামি মোটেও আশাকর ছিলো না। অবুঝের মতো নিজেকে শেষ করতে চাওয়ার অপরাধে এতটুকু শাসন আপা ডিজার্ভ করে। ধারা বয়সে বড়ো হলে ও দুটো দিতো কায়দা মতো।
ধারা যাখন এসব কথাগুলো নিজ মনে ভাবতে ব্যস্ত তখনই পুরুষালী ভরাট কন্ঠের মানুষটি বলে ওঠে।
‘ ও ঘরে আজ লুইপার সঙ্গে আম্মা থাকছে, আজ আর ও ঘরে যাসনা তুই। তুই গিয়ে তোর মায়ের কাছে ঘুমা। বিছানা ছাড়, আমি ঘুমাবো। আর কতক্ষণ এভাবে ঠায় বসে থাকবো আমি?’
ও কথা শুনে ধারা একটু নড়েচড়ে বসে। আসলেই তো ও আর কতক্ষণ এই লোকের ঘরে বসে থাকবে?
অন্ধকারে কিছু ই দেখা যাচ্ছে না, পা বাড়াতে গেলেই হোটচ অবধারিত বুঝতে পেরে ধারা বলে।
‘ আমার ফোন কোথায় জানি না, আপনার ফোনের আলোটা একটু এদিকে ধরুন আমি চলে যাচ্ছি ‘
মিনিট খানেক কেটে গেলেও ওয়াসিফ কোনো কথা বলেনা, আলোও ধরেনা। ধারা আবার বলে।
‘ ধরুন না একটু আলো’
হঠাৎ নিরবতা ভেঙে ওয়াসিফ বলে ওঠে।
‘ অনুরোধ করছিস’?
সঙ্গে সঙ্গে ধারা জবাব দেয়।
‘ নাহ’
‘ তাহলে কি’?
‘ বলছি, এমনি বলছি’
‘ সাধারণ ভাবে বলাতে আমি কারো কথা শুনিনা’
‘ তাহলে কিভাবে বলতে হবে’?
‘ তুই যেভাবেই বলিস না কেনো আমি আলো ধরবোনা, তুই যা এখান থেকে ‘
‘ আলো না পেলে আমি যাবো কিভাবে? আমি তো পড়ে যাবো’?
ওয়াসিফের স্পষ্ট জবাব।
‘ পড়ে যা’
ওমন কথা শুনে অন্ধকারে ভ্রু কুঁচকে ফেলে ধারা। মানুষ ঘাউড়ামি করে তাই বলে এই লোকের মতো এমন তো কেউ করে না। কি এমন অশুদ্ধ হয়ে যেতো একটু আলো ধরলে? বহুত মেজাজ চটে, সেই মেজাজ সহিত বলে বসে।
‘ বিয়ে করেছেন কেনো আমাকে?’
ধারার মেজাজ যতটা উত্তপ্ত ওয়াসিফের জবাব ততটাই শান্ত তবে ধারাকে খুঁচিয়ে তুলতে যথেষ্ট, বলে।
‘ বিয়ের সময়ে কাগজে বা কাবিনে কোথাও কি লেখা ছিলো তোকে যখন তখন আমার আলো ধরে এঘর থেকে ওঘরে পাঠাতে হবে’?
‘ না ছিলো না, এসব কিছুই লেখা ছিলো না, তাই বলে কি আপনি আলো ধরবেন না? এসব ছোটখাটো বিষয় গুলো কি আপনার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না’?
ওয়াসিফ ওর কথা শুনে এদিকটায় ঘুরে বসে, তবে অন্ধকারে কেউ কাউকে সেভাবে দেখতে পায়না। ওয়াসিফ তাচ্ছিল্য করে বলে।
‘ সেদিন না তুই বললি আমি তোর জন্য পর পুরুষ? তাহলে তুই ও তো আমার জন্য পর নারী। আর পর-নারীদের প্রতি আমার বিশেষ কোনো দায়িত্ব কর্তব্য নেই। জাস্ট গেট আউট’
শেষ কথাটাতে ধারার ভীষণ গায়ে লাগলো। এমন ভাবে কথাটা বললো যেনো এঘর থেকে কোনো কুকুর বিড়াল তাড়াচ্ছেন উনি। ধারা চুপচাপ বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়। হাত এগিয়ে হাতড়ে হাতড়ে নিরবে এক পা দু পা করে দরজার কাছে এগোতে থাকে।
আচমকা আবার কি মনে করে পা জোড়া থামিয়ে ঘুরে দাঁড়ায়। মনের কথাটা এবার মুখে এনে বলেই বসে।
‘ আপার ব্যাপারে কি সিদ্ধান্ত নিলেন? কি ভাবলেন’?
ওয়াসিফ এবারও গা ছাড়া ভাবে বলে।
‘ আমার কোনো সিদ্ধান্ত নেই। তার বাপ মা এখনো বেঁচে আছে সিদ্ধান্ত যা নেওয়ার তারাই নিবে’
‘ তাহলে আপনি আপাকে মারতে গেলেন কেনো? মারের সিদ্ধান্তটা তো চাচা-চাচীই নিতে পারতেন’
‘ তুই কি আমাকে আমার সীমাবদ্ধতা শেখাচ্ছিস’?
‘ আপনার যদি মনে হয় শেখাচ্ছি কিছু তাহলে তাই ই শেখাচ্ছি, সিদ্ধান্ত যখন নিতে পারবেন না তখন আপাকে ওভাবে মারাটাও উচিত হয়নি আপনার ‘
‘ আচ্ছা, ওকে মারা উচিত হয়নি তবে তোকে মারার রাইট বা উচিত দু’টোই আমার আছে তাই না? চল তবে তোকেই মারি’?
ধারা বুঝলোনা কথা, চমকে উঠে জিজ্ঞেস করে।
‘ মানে? আমাকে মারবেন কেনো আপনি ‘?
‘ তোকে মারবো না কেনো সেইটা বল আগে’?
‘ যেহেতু বৌ তুই, সেহেতু তোকে শাসন-বারন দুটোই করা যাবে ‘?
‘ কে বলেছে আমি আপনার বৌ’?
‘ আমি বলেছি, সমাজ বলেছে, তোর জন্মদাতা পিতা মেনেছে। আর কাকে মানতে বলছিস তুই ‘?
‘ আমি মানিনি’
হেয়ালি হাসে ওয়াসিফ, বলে।
‘ তোর ঐ চামড়ার মুখ না মানলে আমার কিছু যায় আসেনা’
‘ তাহলে কি করবেন? জোর করে মানাবেন’?
‘ না, ওতো ঠ্যাকা আমার পড়েনি’
‘ তাহলে কি করবেন’?
‘ আরেকটা বিয়ে করবো, তুই তো কথা শুনিস না। স্বামীর অবাধ্য বৌ তুই ‘
‘ করুন, একটা কেনো পারলে আরো কয়েকটা করুন। তাতে আমারও কিছু যায় আসেনা। তবে একটা কথা। ওদের বিয়ে করার আগে আপনার নামের পাশ থেকে আমার নামটা কেটে দিবেন, তালাক আমাকে বুঝিয়ে দেবেন’
কথাটা শেষ করেই ধারা ঘুরে পা বাড়াতেই আচমকা ওর কানের গোড়ায় শব্দ হলো কাঠের দরজা আঁটকে দেওয়ার। বিজলির আলোয় ও স্পষ্ট দেখলো ওয়াসিফকে। দরজা আটকে ওর দিকেই ঘুরে দাড়িয়ে আছে লোকটা।
‘ মাস খানেক ধরে নাটক তুই আমাকে কম দেখাসনি মুমতাহিনা, ছাড় দিয়েছি, মানিয়ে নেওয়ার সময়ও দিয়েছি, কিন্তু তাতে আমার লাভের লাভ কিছু ই হয়নি। বরং তোর বেয়াদবি বিন্দু পরিমাণ কমেনি,বেড়েছে। আমার ধৈর্য্যের সীমা অতিক্রম করে গেছে। এঘরের বাইরে আজকের রাতের পর থেকে এক পা বেরিয়ে দেখা তোকে সেই জায়গাতে পুঁতে রেখে দেবো’
কথা শেষ করেই ওয়াসিফ ওর পাশ কাটিয়ে গিয়ে শুয়ে পড়ে বিছানায়। ধারা কতক্ষণ ঐ দরজার কাছে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। কিছু সময় পর শুনতে পায় ওয়াসিফ একা একা বলছে। ওকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলছে।
‘ মানুষ বিয়ে করে ভদ্র সভ্য একটা বৌ পায়, আর আমি পেয়েছি একটা বেয়াদব। সেই বেয়াদবের কথার আগে মুখে থাকে তালাকের কথা। এই ফাজিল! তোকে তালাক দিতে আমি লাখ তিনেক কাবিন বেধে বিয়ে করেছি? ‘
একটু থেমে আবার বলে।
‘ টাকা কি আমার গাছে ধরে? নাকি আমি শুয়ে বসে থেকে টাকা আয় করি? আমার তিনলক্ষ টাকা আগে উশুল হবে এরপর তোর মুক্তি ‘
এতক্ষণ পর ধারা মুখ খুলে জিজ্ঞেস করে।
‘ কতদিন লাগবে ঐ টাকা উশুল হতে’?
‘ এক জনম কেটে যাবে’
‘ মানুষ তো একজনমই বাঁচে’
‘ তাহলে তুই ও আমার সঙ্গে এই এক জনমই বেঁচে যাবি’
‘ সম্ভব না ‘
‘ অসম্ভবেরও কিছু নেই এখানে ‘
চলবে
গল্প যারা পড়ছেন অনুগ্রহ করে একটু লাইক কমেন্ট করে যাবেন। পেজের রিচ তলানিতে। নিয়মিত দেওয়ার চেষ্টা করবো গল্পটি।
ধন্যবাদ..
Share On:
TAGS: ঐশী রহমান, মেজর ওয়াসিফ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ১৯
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ৯
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ৪
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ১৩
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ১৫
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ১৪
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ১
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ১৮
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ৬
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ৭