Golpo ডিফেন্স রিলেটেড মেজর ওয়াসিফ

মেজর ওয়াসিফ পর্ব ১৯


মেজর_ওয়াসিফ

লেখনীতেঐশীরহমান

পর্ব_১৯

[ 🚫 কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ 🚫]

‘তোমার সিদ্ধান্ত কি ওয়াসিফ ‘?

ওয়াসিফ তখন বুকে আড়াআড়ি হাত বেঁধে সম্মুখ বরাবর দাড়িয়ে আছে চাচার। ভদ্রলোক ও প্রশ্নটি করে উত্তরের অপেক্ষা তাকিয়ে আছে ভাইপোর দিকে।

ওয়াসিফ প্রশ্নটির জবাব ভীষণ কোমল তবে দৃঢ়তার সঙ্গে দিলো।

‘ মেয়ের গার্ডিয়ান আপনি, সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ আপনার নেওয়ার কথা। আমরা তো শুধু মতামতটাই দিতে পারি। মেইন সিদ্ধান্ত তো আপনি আর চাচি আম্মা নিবেন’

‘ আচ্ছা বেশ, তাহলে বড়ো ভাই হিসেবে তোমার মতামত টুকু শুনি আগে, বলো’?

ওয়াসিফ চাচার মুখের দিক থেকে চোখ নামিয়ে মেঝেতে রাখলো। বললো।

‘ মুনিব লুইপাকে পছন্দ করে এবং লুইপা ও মুনিবকে পছন্দ করে, ওদের দুজনের মতামতের দিক থেকে ওরা পজেটিভ। এখন বাকি রইলো আমরা দুই পরিবার। আমার ধারণা মতে মুনিবের পরিবারের সদস্যরা শুধু আনুষ্ঠানিক দেখতে এসেছে, তাদের পছন্দ অপছন্দ এখানে ম্যাটার করবেনা। তারা তাদের ছেলের তরফের কথা রাখতে এসেছে এবং আপনার মতের পর তারা হয়তো পাকাপোক্ত বিয়ের আলোচনা শুরু করবে’

এতটুকু বলেই ওয়াসিফ থামে, তাকায় চাচার মুখের দিকে। পরপর আবার বলে।

‘ আমি আপনার পরিস্থিতি ওতোটা বুঝতে না পারলেও কিছিটা আচ করতে পারছি, তবে আমি বলবো মুনিব ছেলে হিসেবে ভালো। যতটা সম্ভব আমি ওর খোঁজ খবর নিয়েছি। ভরসা করে বোনের হাত তাকে তুলে দেওয়াই যায়। আর বাকি রইলো ভাগ্য, ওটা আমাদের কারো হাতে নেই। এবার পাকাপোক্ত সিদ্ধান্ত আপনার উপর। আপনি বুঝে শুনে সিদ্ধান্ত জানান, উনারা অপেক্ষা করছেন’

ভদ্রলোক আচমকাই বলে বসলেন।

‘ আমি হুটহাট কোনো সিদ্ধান্তে যেতে চাচ্ছিনা, আমার আরেকটু সময় প্রয়োজন’

সঙ্গে সঙ্গে ওয়াসিফ জিজ্ঞেস করে।

‘ তাহলে এই একঘর মানুষকে আপনি ফিরিয়ে দেবেন’?

‘ ফিরিয়ে কেনো দেবো? যথা সাধ্য তাদের সম্মান বজায় রেখে আপ্যায়ন করে দেবো। আশা করি তারা বুঝবে’

ওয়াসিফ কিছু সময় চুপ থেকে বলে।

” চাচা! আপনি যদি এমনটা করেন তবে একটা ছেলে তার নিজ জায়গা থেকে অনেকটা ভেঙেচুরে যাবে। সেই সাথে আপনার মেয়ে ও। শুধু আপ্যায়নে কিন্তু ওদের এই ক্ষত পোষাবেনা’

ভদ্রলোক এবার কিছুটা চওড়া গলায় বলেন।
‘তাহলে তুমি কি বলতে চাচ্ছো উনারা এলেন আর ওমনি আমি মেয়ে দেখিয়ে, মেয়ে তাদের দিয়ে দেবো’?

‘ আমি ও কথা কখন বললাম আপনাকে’?

‘ বলোনি কিন্তু তোমার কথার মানে তো এটাই’

ওয়াসিফ নিরবে দম ফেলে, বলে।

‘ যে কথা আমি বলিনি সেকথার নিজ মানে বের করা ঠিক না। যাইহোক, মেয়ে যেহেতু আপনার সিদ্ধান্ত তবে আপনি ই নিন পুরোটা, কারো মতামতের আর প্রয়োজন পড়বে না নিশ্চয় ‘

ওয়াসিফ আর দাঁড়ায় না, ওখান থেকে সোজা হেঁটে পেছনের সিড়ি দিয়ে দোতালায় ওঠে।


ওরা মেয়েরা কজন দোতলার ঘর থেকে বারবার উঁকি ঝুঁকি দিচ্ছে। ওদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিরক্ত ধারা। সেই কখন কোন বেলা আপাকে সুন্দর মতো সাজগোছ করিয়ে ওরা অপেক্ষা করছে, নিচ থেকে মুরুব্বিরা ওদের যেতে বলে ডেকে উঠবে। কিন্তু কারো কোনো পাত্তাই নেই। কতক্ষণ পেরিয়ে গেলো কেউ ডাকছেনা ওদের। ধারা সমানতালে পায়চারি করছে, একবার ঘর থেকে বেরিয়ে নিচে উঁকি দিচ্ছে আবার এসে আপার কানের কাছে সুর তুলে বলছে।

‘ এই আপা তোকে এখনো ডাকে না ক্যান’?

পরপর দুইবার ঐ একই কথা জিজ্ঞেস করতে লুইপা কপাল কুঁচকে বলে।

‘ তুই এতো অধৈর্য্য কেনো? সময় হলে ডাকবে, তুই চুপচাপ থাক’

ওকথা শুনে ধারা মাথা ঘুরিয়ে দেখে আপাকে, কিছুটা তাচ্ছিল্যের সুরে বলে।

‘ ওরেরেরে আপারে আপা! ধৈর্য্যের ঔষুধ খেয়েছিস? একথা তুই আমাকে বলছিস? তাও আবার ধৈর্য্য ধরে থাকতে। বাবাহ! মেয়ের উন্নতি হয়েছে’
ধারার কথা শেষ হতেই মোহনা হাতের ইশারায় দরজার কাছ থেকে ডেকে বলে।

‘ এই ধারা! একটু এদিকে এসো, দেখে যাও’

ধারাকে ডাকতে যতক্ষণ সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গিয়ে দাঁড়ালো মোহনার পাশে। খাটের উপর বসে থাকা লুইপা হঠাৎ বোঝেনা, এতো জলদি কি জন্য ডাকলো ধারাকে।


মেহমানদের আপ্যায়নের মূল আয়োজন শেষ হয়েছে অনেক আগেই। এখন তারা প্রত্যেকে অপেক্ষারত ছিলো মেয়ে দেখার। কিন্তু সেই বিশেষ সময়টিতে যেনো কথা পারলেন ভদ্রলোক। যিনি লুইপার বাবা।

‘ আপনারা যে এভাবে আয়োজন করে হুট করেই চলে আসবেন আমি বুঝতে পারিনি, আসলে আমি মেয়েকে বিয়ে দেবার ব্যাপারে এখনো প্রস্তুত নই। আমার মেয়ে পড়ছে। ওর পড়াশোনাটা আগে শেষ হোক তারপর নাহয় ভেবে দেখবো’

উপস্থিত মেহমানেরা কথাটা শোনা মাত্রই এক যোগে সবাই মুনিবের দিকে তাকালো। মুনিব এতক্ষণ চুপচাপ বসে ছিলো। কথাটা ওর কানে যেতেই ও মাথা তুলে তাকালো ভদ্রলোকের দিকে। তারপর একে একে চেয়ে দেখলো নিজের পরিবারের সদস্যদের। সদস্যদের চাহনি ওকে নিরবে একসঙ্গে প্রশ্ন করছে ‘ মেয়ে নাকি তোর পছন্দ, মেয়েরও নাকি তোকে পছন্দ। মেয়ের বড়ো ভাই নাকি তোকে ডেকেছে বিয়ের ব্যাপারে কথা বলতে তবে এখন এসব কি? এই ধরনের কথার মানে কি’?

মুনিব আর ওর ফ্যামিলি যতটা চমকেছে তার চেয়েও বেশি চমকেছে ধারা আর লুইপা। আচমকা ধারা বিড়বিড় করে বলে।

‘ চাচা-চাচিকে ক’দিন আগেও শুনলাম মেজর শাহেদ ওয়াসিফ কে বলতে ইনিয়ে বিনিয়ে, সে যোনো আপার জন্য ডিফেন্স সেক্টরের কাউকে বাছাই করে আনে। সেই মানুষ আজ বলছে মেয়ের বিয়ে ব্যাপারে এখন কিছু ভাবেইনি? কি আশ্চর্য! কি ভয়ানক মিথ্যা!’

ওতোটুকু দৃশ্য দেখতে এবং শুনতেই এতোসময় ধরে হাসি হাসি মুখটাতে নেমে এলো চৈত্রের খড়া। চোখ দুটোতে নোনাপানি এসে টলমল করতেই লুইপা বলে।

‘ যে ভয়টা পাচ্ছিলাম সেটাই হলো। আমি চিনি, আমার জন্মদাতা বাপকে আমি ভালো করেই চিনি। তাই তো সারাদিনের আনন্দ, খুশিটুকু আমি ফুটিয়ে তুলতে পারিনি নিজের মধ্যে। শেষ হয়ে গেলো, সব শেষ হয়ে গেলো’

ধারা স্থির চোখে আপার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে, শুনছে আহাজারি। আজ যে একটু আগেও খুশি ভাবটা ছিলো এই রুমে তা এখন হাওয়াতে মিশে গেছে পুরোপুরি।

নিচের কথোপকথন এখনো শেষ হয়নি, ওরা নিজেদের কথা, আলোচনা বন্ধ করে আবার ও মনোযোগ দিলো ওদিকে।

ভদ্রলোকের কথাটাকে হজম করে মুনিবের মামা হাসি হাসি মুখ করে বললেন।

‘ সে আপনি বিয়ের জন্য প্রস্তুত পরে হন, আমাদের কোনো অসুবিধা নেই। বলতে গেলে আমরাও সেভাবে তৈরি হয়নি এখনো। বুঝতেই পারছেন ছেলে মেয়েদের পছন্দটাকে গুরুত্ব দিয়েই আমরা কেবল আয়োজন করে এসেছি হবু বৌমা কে দেখতে। দেখাদেখির শেষ বেলায় আজ নাহয় আংটি পরিয়ে রেখে যাই এরপর আরেকদিন দুই পরিবার বসে বিয়ের দিন তারিখ ঠিক করে ফেলবো’

লুইপার বাবা, এবার আর কোনো ভণিতা ছাড়াই স্পষ্ট জবাব দিলেন।

‘ সামনে ওর পরীক্ষা, টোটালি বিয়ের বিষয় বাদ দিতে চাচ্ছি। বিয়ে উপযুক্ত মেয়ে যেহেতু আমার ঘরে আছে পাত্র ও আসবে। কোনো ব্যাপারনা, তবে আপাতত মেয়ে বিয়ে দেবোনা’

ডাইনিং এর পাশে দাড়িয়ে এবাড়ির তিন গিন্নী ও শুনলো বসার ঘরের আলোচনা। যেহেতু তাদের বাড়ির পুরুষ লোক কথা বলছে সেখানে তারা আর কেউ নিজেদের মতামত রাখেনা। মেহমানদের সঙ্গে কথা যা বলার লুইপার বাবা একাই বলছে। পাশে আরেক ভদ্রলোক অর্থাৎ ধারার বাবা চুপচাপ আছেন। সে সুযোগ দিচ্ছে ভাই কে। সবার আগে মেয়েটা তো তার। কথা সে ই বলুক।

মুনিবের মামা বেশ বিচক্ষণ এবং শান্ত মানুষ। বিষয় পুরোপুরি বিশ্লেষ করে নিতে খুব বেশি সময় লাগলোনা তার। বাকি সদস্যরা কথার আকার ইঙ্গিত বুঝলো। পুরোটা সময় চুপ রইলো মুনিব। ও শুধু আশেপাশে নজর বুলিয়ে খুঁজছে সেই মানুষটাকে। যে মানুষটা গতকাল ওকে আশা দেখিয়েছিলো। ওদের সম্পর্কের একটা নাম দেওয়ার ওয়াদা দিয়েছিলো। তাহলে আজ এখন সেই মানুষটা কোথায়? কোথায় সেই অকুতোভয় মেজাজ শাহেদ ওয়াসিফ?


কিছুক্ষণ আগের সেই ফুরফুরে আমেজের আনন্দ এবাড়ি থেকে বিদায় নিয়েছে অতিথিদের বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গেই। উপরের দোতলা ঘর গুলো গোটাটাই নিস্তব্ধতায় ঘিরেছে। বসার ঘরের দুটো সোফাতে এ বাড়ির দুই কর্তা এখনো বসে আছে। মেহমানরা যেতেই সেসব গোছগাছ করছে তিন গিন্নী।

কতক্ষণ পর লুইপার দুই বান্ধবী বেরিয়ে গেলো বাড়ি থেকে। যে খুশিটুকু নিয়ে এবাড়িতে এসেছিলো তা এখন পানসে। ধারা চুপচাপ মুখভার করে তাকিয়ে আছে তার আপার দিকে। নাহ লুইপা একটুও কাঁদছে না এখন।গায়ের শাড়িটা এখনো খোলেনি। খাটে হাঁটু ভেঙে একধ্যানে চুপচাপ বসে আছে। কতক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে ধারা দেখে আপাকে। আস্তে করে একটু বুঝ দিতেই বলে।

‘ জানি, তোর ভীষণ মন খারাপ হচ্ছে, হওয়ারই কথা কিন্তু আপা..’

ধারা পুরো কথা শেষ করে পারেনা তার আগেই লুইপা ওকে থামিয়ে বলে দেয়।

‘ এ ঘর থেকে যা ধারা, আমি একা থাকবো’

আপার বলা কথাটা শুনেই ভয়ে ধারার বুক ধক করে ওঠে। আপার এমন চুপ হয়ে যাওয়া রুপটা ওকে ভীষণ ভয় পাইয়ে দিচ্ছে। আপা মোটেও কান্নাকাটি করছে। আহাজারি করে ভেতরের দুঃখ বলছেনা। এখন আবার বলছে ওকে এ ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে। আপা হঠাৎ এমন চুপ হলো কেনো? ধারা আস্তে করে বলে।

‘ আমি একটু এখানে থাকি আপা, কথা বলছিনা, তোকে বিরক্তও করবো না’

লুইপা ওর কথার জবাব দেয় না। তবে কিছুক্ষণ পর আস্তে করে বলে।

‘ আমি একটু পানি খাবো, পানি এনে দে’

ধারা লাফিয়ে ওঠে আবার জিজ্ঞেস করে।

‘ পানি খাবি আপা’?

‘ হু’

ধারা আর এক মুহূর্ত ও বসে থাকে না, ও দৌড়ে যায় নিচে পানি আনতে। ওদের ঘরের জগে আপাতত পানি নেই। ধারা জগ থেকে গ্লাসে পানি নিয়ে উপরে উঠলো তখন বাড়ির কারো সঙ্গেই ওর দেখা হয়না। ও নিজে থেকে আর কাউকে খুঁজে কথা বলতেও যায়নি। পানির গ্লাস হাতে ও যখন পৌঁছালো ঘরের সামনে আচমকা ওর চোখ বড়ো বড়ো হয়ে যায়। দরজা তো খোলা ই রেখে গেলো তাহলে এখন দরজা আটকেছে কেনো আপা। ধারা গলায় জোর বাড়িয়ে কয়েক ডাক দিলো তবে কাজ হলোনা। দরজা ধাক্কিয়ে ডাকে।

‘ আপা, এই আপা, পানি খাবিনা? দরজা খোল’

‘ ও আপা? আপা?’

কোনো ডাকেই কাজ হলোনা। ভয়ে চোখ মুখ কুচকে যায় ধারার, বছর দুই আগে হিন্দু পাড়ায় এমন একটা ঘটনা ঘটেছিলো, পুষ্প আপা ভালোবাসতো একজনকে। আপার পরিবার সেখানে বিয়ে দেয়নি তাকে আর সেই রাতেই পুষ্প গলায় দড়ি দিয়েছিলো। এমন কিছু ভাবতেই হাত পা কেপে ওঠে ধারার। ও কি করবে দিশেহারা হয়ে বারেবারে আপাকে ডাকে। আচমকা ছুটতে গিয়ে ওর চোখ থামে ঘরের খোলা জানালায়, ঘরের ভেতরের ঐ দৃশ্য দেখতেই হাত কেঁপে স্টিলের পানি সমেত গ্লাসটা ঝনঝন শব্দে তুখোড় তোলে। ধারার ‘ আপা’ বলে বিকট এক চিৎকার বাড়ি খায় দোতলার দেয়ালগুলো।

চলবে

গল্প যারা পড়ছেন একটু কষ্ট করে লাইক কমেন্ট করে যাবেন।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply