Golpo ডিফেন্স রিলেটেড মেজর ওয়াসিফ

মেজর ওয়াসিফ পর্ব ১৫


মেজর_ওয়াসিফ

লেখনীতেঐশীরহমান

পর্ব_১৫

[ 🚫 কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ 🚫]

ঘড়ির কাটা তখন ঠিক ঠিক করে রাত দশটার ঘরে পৌঁছে গেছে। এবাড়ির লোকেরা রাতের খাওয়া দাওয়ার পাঠ চুকিয়ে উঠেছে কিছুক্ষণ আগেই। ধারা খেয়ে এসেই ঘরে ঢুকেছে নিজের, ঘরের এক মাথা থেকে অন্য মাথায় লাগাতার পায়চারি করছে। ওমনি ঘরে ঢোকে লুইপা। পেছন থেকে বোনের এমন দুশ্চিন্তায় নাজেহাল দশা দেখে বলে ওঠে।

” তুই ও ঘরে যাসনা কেনো এখনো? তুই কি অপেক্ষা করছিস ভাইজান তোকে এসে পাজাকোলে করে নিয়ে যাক”?

লুইপার কথায় পেছনে ঘুরে দাঁড়ায় ধারা, চোখ মুখ কুঁচকে ফেলে কিছু বলতে যাবে তার আগেই লুইপা বলে ওঠে।

” আমি ডাকবো ভাইজান কে, ডাকি”?

বলেই লুইপা জোর গলায় ডাকতে যাচ্ছিলো ওমনি ধারা ছুটে এসে ওর মুখ চেপে ধরে কড়া গলায় বলে।

” সবসময় ইয়ার্কি ভালো লাগেনা আপা, আমি আছি চিন্তায় আর তুই কিনা এমন সময় মজা নিচ্ছিস”?

লুইপা ওর মুখ থেকে ধারার হাতটা আলগা করে বলে।

” নাটক কম করে জলদি জলদি এ ঘর থেকে বের হ, আমি একটু শান্তি মতো বিছানায় আজ হাত পা ছড়িয়ে ঘুমাবো। তোর জন্য বহুদিন শান্তি মতো ঘুমাতে পারিনা, তোর শোয়া খুব খারাপ, মাঝরাতে শুধু হাত পা ছুঁড়িস “

লুইপার কথায় ভীষণ রাগ হয় ধারার, আপা তাকে এভাবে বলতে পারলো? এভাবে মুখ ফুটে বলে দিতে পারলো ওর জন্য নাকি আপার ঘুমের অসুবিধা হয়? আসলেই, ঐ যে মানুষ বলেনা, বিয়ে দেওয়া মেয়েদের বাপের বাড়ির ঘরের খুটিও আঁড়চোখে তাকাবে বেশিদিন এখানে পড়ে থাকলে। ওর বিষয়টাও হয়েছে তেমন, কিন্তু পরপর ও ভেবে পায়না ওর বাপের বাড়ি আর শশুরবাড়ির ঘরটা তো ঐ এক ই। শুধু উত্তর দক্ষিণ রুমের দরজা দুটো ভিন্ন। ধারাকে চুপচাপ দাড়িয়ে থাকতে দেখে লুইপা বলে।

” এই তুই যাসনা কেনো”?

ধারা এবার একরাশ দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে বললো।

” আজ আমার সাথে এরকম করছিস তো, ঠিক আছে মনে রাখলাম আজকের দিনটা। তোর যেদিন বিয়ে হবে ঐদিন আমিও এভাবে বলবো, ‘ এই আপা জলদি যা, যাসনা কেনো’? তখন বুঝবি কেমন লাগবে”?

ওর কথা শুনে লুইপা হো হো করে হেসে উঠে বলে।

” সেদিন আমার খুব ভালো লাগবে, আমি নাচতে নাচতে আমার শশুরবাড়ি যাবো, তোর মতো বাপের বাড়ির খুঁটি ধরে বসে থাকবোনা। আমার শামীই হবে জীবন, আমার শামীই হবে মরণ”

আপার বলা শেষ কথাটায় ধারা চোখ বড়ো বড়ো করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলে।

” বাবাহ! তুই এতো শামী ভক্ত হবি আপা? আমি তো চোখের সামনে দেখলেও একথা, কাজ বিশ্বাস করবোনা”

লুইপা ছিলো সিরিয়াস মুডে, ধারার এমন গা ছাড়া কথায় ওর মেজাজ সামান্য চটে যেতেই ও বোনকে টেনে নিয়ে মৃদু ধাক্কা দিয়ে দরজার বাইরে বের করে দিয়ে বলে।

” এ ঘরে তোর জায়গা হবেনা, আপাতত দূর হ”

বলেই কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে ঠাস করে মুখের উপর দরজা আঁটকে দেয় লুইপা। ধারা হতবাক হয়ে তাকিয়ে রয় সেই বন্ধ দরজার দিকে কিছু সময়। তারপর চৈতন্য ফিরতেই ও কয়েকবার বন্ধ দরজা ধাক্কায় আর ডাকে।

” এই আপা, আপারে, দরজা খোল। শোন কি বলি”?

ভেতর থেকে লুইপার কাটকাট জবাব এলো।

” আমি কিছু শুনবো না, বাকি গল্প বরের লগে গিয়ে কর যা। “

” আপা দরজা খোল”

” ও আপা”

” এই আপা”

…… ভেতর থেকে লুইপার আর কোনো কথা আসেনা। ধারা মুখটা বেজার করে দাড়িয়ে থাকে কতসময়, আরো কত ডাকাডাকি করে কিন্তু বিশেষ কোনো লাভ হলোনা। তারপর ও ঘুরে দাড়িয়ে তাকায় দক্ষিণের ঘরটার দিকে, ঘরের দুয়োর তখন হাট করে খুলে রাখা। ধারা দোতলায় ওদের ঘরের সামনে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে পুরো বাড়িতে একবার নজর বুলায়, যে যার ঘরের দুয়োর এঁটেছে। কেবল ও ই শুধু ঘরের বাইরে পড়ে আছে আজ।

ধারা বেশ সময় ধরে দাড়িয়ে থাকার পর গুটি গুটি পায়ে এগোয় দক্ষিণের ওয়াসিফের ঘরের দিকে। ওর মতলব ও শুধু এক পলক উঁকি ঝুঁকি দিয়ে দেখবে কিন্তু আজ রাতে ঘুমাবে গিয়ে বড়ো আম্মার ঘরে। কিন্তু ওর ধারণা কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে উঁকি দিতেই পেছন থেকে কেউ একজন ওকে ধাক্কা মেরে ঘরে ঢুকিয়ে নিলো। ব্যাপারটা ঘটলো সেকেন্ডের মাথায়, ধারা মস্তিষ্ক সজাগ হতেই টের পেলো ঠাস করে দরজা ছিটকিনি তুলে দিচ্ছে ওয়াসিফ। ধারা হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছে ওয়াসিফের দিকে। ওয়াসিফ ছিটকিনি তুলে ঘুরে এলো ওর দিকে। বললো।

” তখন না বললি তোর মুখ যা দলিল তাই তবে আসতে এতো সময় লাগলো কেনো”?

ধারা হতভম্ব ভাব কাটিয়ে এবার চোটপাট বলে।

” আমি তো এসেছিলাম ই, তাই বলে আপনি আমাকে এভাবে ধাক্কা দিবেন”?

ওয়াসিফ তড়িৎ এগিয়ে এসে কিছুটা নরম কন্ঠে জানতে চায়।

” ব্যথা পেয়েছিস”?

ওয়াসিফের এমন নরম সরম ভাবে কথা বলতে দেখে ধারা যেনো ঠিক এই মুহূর্তে টুপ করে গাছ থেকে পড়লো। ওর চোখে মুখে বিস্ময় ছাপ স্পষ্ট। আস্তে করে জানতে চায়।

” আপনি এতো বিচলিত হচ্ছেন কেনো? পেয়েছি, পেয়েছি আমি ব্যথা পেয়েছি, তাতে আপনার কি”?

ওয়াসিফ কিছুটা পেছনে সরে গিয়ে বলে।

” তাই ই তো তাতে আমার কি? আমার তো কিছু ই না”

কথাটা বলতে বলতে ওয়াসিফ ওর পাশ কাটিয়ে হেঁটে যায় আলমারির কাছে, আলমারি থেকে আরো একটা বালিশ বের করে বিছানায় ফেলে দিয়ে বলে।

” শুয়ে পড়, বকবক করে মাথা খাসনা”

ধারা ওর কথার পিঠে বলে ওঠে।

” আমি শোবো না”

ওয়াসিফ জানতে চায়।

” তাহলে কি করবি”?

” আপনি কি জন্য এঘরে ডেকেছেন তাই বলুন, আপনি বলা শেষ করুন তারপর আমি চলে যাবো”

” কোথায় যাবি”?

” আমার ঘরে “

” তোর ঘর কোনটা”?

” কেনো? যে ঘরে আমি আর আপা এতোকাল থেকে এসেছি ওটাই তো আমার ঘর,আমার রুম”

ওয়াসিফ ওকে চ্যাতাতে তাচ্ছিল্য করে বলে।

” মেয়ে মানুষের আবার নিজের ঘর হয় নাকি? মেয়ে মানুষের জন্য তার স্বামীর ঘর ছাড়া পরবর্তী আর কোনো ঘর নেই”

কথাটা বলে ওপাশে মুখ ঘুরিয়ে সামান্য হাসে ওয়াসিফ, এবার এই মেয়ে চেতে যাবে, সঙ্গে সঙ্গে হলোও তাই, ধারা তেতে উঠে বলে।

” আপনার মতো শিক্ষিত মানুষ এসব কথা বলে কিভাবে? আপনি কি নারীবিদ্ধেষী। মেয়ে মানুষের নিজের বাড়ি, ঘর হবে না কেনো? একসময় সেও পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাড়িয়ে ঘর বানাতেই পারে”

ওয়াসিফ তাকায় ওর দিকে, মুখের সেই হাসিটা এখন নেই, চিরচেনা গম্ভীরতা টুকু এসে ভীড় করেছে মুখে। বললো।

” আমি নারীবিদ্ধেষী হলে কি তোকে বিয়ে করতাম “?

” তাহলে কাকে করতেন? আপনার মতো আরেকজন পুরুষ কে”?

ওর এমনতরো কথা শুনে ওয়াসিফ হা হলো বটে। ধারা চোখ পিটপিট করে ওয়াসিফের দিকে তাকিয়ে আছে। ওয়াসিফ বলে।

” তোর মাথায় কি সমস্যা “?

” নাহ”

ওয়াসিফ ও কথার প্রসঙ্গে না গিয়ে বললো।

” চুপচাপ ঘুমা, বালিশ দিয়েছি”

” আমি এ ঘরে ঘুমাবো না”

” তুই কি চাচ্ছিস এখন? এই মাঝরাতে এখন তোর উপর আমি চেচিয়ে সবাই কে জানাই আমাদের ম্যারিড লাইফ ভালো যাচ্ছে না!”?

” যেইনা ম্যারিড, তার আবার ম্যারিড লাইফ”

ধারা কথাটা বিড়বিড় করে বললো যার বলে ওয়াসিফ শোনেনি, জিজ্ঞেস করে।

” কিছু বললি”?

” না”

” আচ্ছা শুয়ে পড় তাহলে, রাত অনেক হলো”

কথাটা শেষ করে ই ওয়াসিফ ড্রয়ার থেকে কিছু একটা পকেটে ঢুকিয়ে বারান্দায় যেতে যেতে বলে।

” আমি এসে যেনো তোকে জ্বলে থাকতে না দেখি, ঘুমিয়ে যা”

চলবে

মেজর_ওয়াসিফ [ ই-বুক ভার্সন ]

লেখনীতেঐশীরহমান

মেজর সাহেব! আপনি সত্যি সত্যি ই এসেছেন? নাকি আমি ভুল কিছু দেখছি ‘?

ঘুমোয়নি ওয়াসিফ। আধো ঘুমের মধ্যে এক ঝটকায় ওকে ঘুরিয়ে শুইয়ে ঘাড়ে মুখ ডুবিয়ে রেখেই বলে।

‘ সত্যি ই এসেছি, ছুঁয়ে দেখো আমাকে’

বুঝবান ধারা এবার অবুঝের মতো কেঁদে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে মানুষটাকে। অস্ফুটস্বরে বলে।

‘ আমি চলে আসার পর মিস করেছিলেন আমাকে?’
ওয়াসিফ মাথা তোলেনি গলা থেকে এখনো, ওভাবে মুখ গুঁজে ক্ষণে ক্ষণে আদর ছুঁইয়ে দিতে দিতে বলে।

‘ খুউবব মিস করেছি’

‘ মিথ্যে কথা, মিস করলে আমাকে কল না দিয়ে আপনি থাকতেই পারতেন না, মাত্র দুটো কল দিলেন আর কেনো দিলেন না’?

‘ কল দিয়ে সময় নষ্ট করার প্রয়োজন মনে করিনি, চলে এসেছি’

ধারা আরো শক্ত করে জড়িয়ে রাখে মানুষটাকে। এমনভাবে রাখে যেনো ছেড়ে দিলেই লোকটা পালিয়ে যাবে বহুদূরে। ওর আবার মন খারাপ ছুঁয়ে যাবে। ও চায়না মানুষটার থেকে কোনো দূরত্ব রাখতে। ওয়াসিফ ডাকে।

‘ মুমতাহিনা ‘!

‘ জি’

‘ ভালোবাসো আমাকে’?

এমন নরম কন্ঠ এমন কোমল কথা শুনে ফুপিয়ে কেঁদে উঠে ধারা বলে।

‘ ভালোবাসি, আমি ভালোবাসি আপনাকে মেজর সাহেব ‘

‘ কবে থেকে ‘?

‘ আজ থেকে, আপনার থেকে দূরত্ব বাড়িয়ে চলে আসার পর থেকে ‘

দীর্ঘ সময় পর গলা থেকে মুখ তুলে চাইলো ওয়াসিফ, হাত দিয়ে বৌয়ের চোখের পানিটুকু মুছে দিতে দিতে বলে।

‘ তোমার এই ভালোবাসা টুকু আমার জন্য আজীবন থাকুক মুমতাহিনা ধারা, আমি তোমাকে তোমার চাইতেও বেশি ভালোবেসে প্রমাণ করে দেখাবো মেজর শাহেদ ওয়াসিফও ভীষণ ভালোবেসে আগলে রাখতে জানে তার বৌকে। ‘

কিছু সময় চুপ থেকে ওয়াসিফ পরম আবেশে ঠোঁট ছোঁয়ায় বৌয়ের কপালে,গালে, থুতনিতে। বলে।

‘ এই ক’টাদিন মন দিয়ে পড়বে, পরীক্ষা দেবে। পরীক্ষা যেদিন শেষ হবে আমি ঐদিন তোমাকে এসে নিয়ে যাবো আবার। তুমি ছাড়া আমার ঐ কটেজ শূন্য। সারাদিনের ক্লান্তি শেষে আমি শান্তি পায়নি ফিরে। আমি বুঝেছি তুমি ছাড়া আমাকে ঐ শান্তি কেউ দিবেনা। আমার তোমাকে ই লাগবে, খুব করে লাগবে মুমতাহিনা’

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply