মেজর_ওয়াসিফ
লেখনীতেঐশীরহমান
পর্ব_১০
[ 🚫 কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ 🚫]
ধারা এক প্রকার ছো মেরে লোপার হাত থেকে মোরগটা নিয়ে ছেড়ে দেয়। ওমন ঘটনায় লোপা হতবাক।বোনের কান্ড দেখে লোপা দু-হাত মুখে চেপে চেচিয়ে উঠে বলে।
” ও ছোট আপা করলে কি তুমি? এবার বড়ো মা আমাকে মারবে”
ধারা ও কথাকে পাত্তা না দিয়ে একটা ঢিল ছুড়ে মারে মোরগের পাশে। তাড়িয়ে দেওয়ার মতো করে বলে।’ যা যা, আজকে সন্ধ্যার আগে বাড়ি আসবি না, তাহলে কিন্তু জবাই হয়ে যাবি’। মোরগটা কি বুঝলো কে জানে, লাফিয়ে ঝাপিয়ে চলে গেলো সেখান থেকে।
লোপার দিকে তাকিয়ে এক আঙুল তুলে শাসিয়ে বলে ধারা।
” তোর ভাইজান তো সরকারি চাকরিওয়ালা, চাইলে এমন একটা মোরগ কেনা তার কাছে দুধ-ভাত। আমার শখের পোষা মোরগের দিকে চোখ তুলে তাকাবিনা তোরা কেউ তাহলে কিন্তু এপোড়-ওপোড় করে দেবো”
লোপা কাঁদো কাঁদো হয়ে চেঁচিয়ে বলে।
” আমি কি তোমার মোরগের দিকে চোখ দিয়েছি নাকি? যারা দিয়েছে তাদের কে গিয়ে বলো, যাও গিয়ে ভাইজানকে বলো, বড়ো মা কে বলো”
ধারা চলে যাচ্ছিলো, লোপার কথায় থামলো, বেশ ভাব নিয়ে বললো।
” ঐ লোকের সঙ্গে আমি কথা বলিনা”
লোপার হচ্ছে মেজাজ খারাপ, ও মুখে ভেঙেছি কেটে বলে।
” যত্তসব ঢং, ঢং দেখলে আর বাঁচি না”
সঙ্গে সঙ্গে ধারা ওকে শাসিয়ে ওঠে।
” ছোট মুখে এতো কথা বলিস কেনো? যা ভাগ”
লোপা ঐখান থেকে ধুপধাপ পা ফেলে চেচিয়ে বড়ো চাচিকে নালিশ দিতে দিতে রান্না ঘরে ঢোকে। ধারা মোরগ বাঁচাতে পেরে আপাতত মহাখুশি। ও চনমনে হাঁটতে শুরু করে উল্টো পথে। আপাতত ওর গন্তব্য সহপাঠী নিতুর বাড়ি।
দোতালার উত্তর পাশে দুটো ঘর মেহমানদের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। একটা ঘরে আরিয়ান আর সামির অন্য ঘরটাতে শশী থাকছে। যেহেতু ওরা সাড়ে ছয় ঘন্টা পথ জার্নি করে এসেছে তারউপর গরমের ছাটও ইদানীং বেশ পড়েছে ওরা যে যার ঘরে ঢুকে আপাতত একটু জিরিয়ে নিচ্ছে। রান্না ঘর থেকে হাঁক ছেড়ে শাহেনূর ডাকে বাড়ির মেয়ে গুলোকে। লুইপা অনার্সের ফর্ম ফিলাপের কাজে আজ কলেজে গিয়েছে, বাড়িতে মেয়ে বলছে আছে ধারা আর লোপা। শাহেনূর ডাকতেই লোপা গিয়ে রান্না ঘরে দাঁড়ায়। লোপাকে দেখে শাহেনূর জিজ্ঞেস করে।
” ধারা কই রে”?
” জানিনা, ছোট আপাকে অনেকক্ষণ দেখি না”
শাহেনূর ফল আর ঠান্ডা পানির লেবুর শরবত গুছিয়ে একটা ট্রেতে করে লোপার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে।
” এইগুলো মেহমানদের ঘরে দিয়ে আয় তো মা”
আরেকটা ছোট খাটো আকৃতির ট্রে গুছিয়ে বললো।
” এটা দিবি তোর ভাইজানের ঘরে। “
লোপা ভদ্র মেয়ের মতো মাথা দুলিয়ে একেকটা করে ট্রে নিয়ে বড়ো ঘরে রাখে। ছোট খাটো লোপা সংকোচে পড়ে আগে কোনটা কোন ঘরে দিতে যাবে। ওর মাথায় আগে এলো মেহমানের গুরুত্ব বেশি। সেই হিসেবে ও বড়ো ট্রে হাতে নিয়ে চললো দোতলায়।
ওয়াসিফদের এই বাড়িটি সেই পুরাতন ডিজাইনের একটি দোতালা বিশিষ্ট বাড়ি। আধুনিক বাড়িগুলোর মতো ওতো চাকচিক্য না করলেও এবাড়িটির অন্যতম সৌন্দর্য হলো দোতলার দু’পাশে খোলা বড়ো দুটো বারান্দা। যেখানে দাড়িয়ে উপভোগ করা যায় এই গ্রামীণ পরিবেশের সৌন্দর্য। শীত হোক বা গরম, বা বৃষ্টি যেকোনো সিজনে এই বাড়িটির অদ্ভুত এক সৌন্দর্য ধরে রাখে খোলা বারান্দা দু’টি। সেই বারান্দায় আবার রয়েছে ছোট বড়ো বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালা, মাটির ছোট বড়ো আকৃতির টব গুলোতে একেকটি গাছ তার নির্দিষ্ট জায়গা দখল করে বেড়ে উঠছে। সারাবছর এই গোটা বারান্দা জুড়ে চলে ঐসব ফুল,ফলের রাজত্ব।
বিছানায় পিঠ ঠেকাতেই সামির ঘুমিয়ে পড়েছে সবে। ওদিকে আরিয়ান কোনো রকম ফ্রেশ হয়েই বারান্দায় হেঁটে হেঁটে দেখছে সেসব। ওর কাছে স্যারের বাড়িটা ভীষণ ভালো লেগেছে। এতো গরমের মধ্যে লাগছেনা এসি বা ফ্যান। শীতল বাতাসের ঝাপটা এসে ক্ষণে ক্ষণে ছুঁয়ে দিচ্ছে গা। ও যখন বারান্দায় হাঁটতে হাঁটতে ছোটখাটো টবে রোপন করা লাল পেয়ারা গাছের কাছে দাড়িয়ে একই ডালে দু’টো লাল পেয়ারা ছুঁয়ে দেখে চিকন কন্ঠে লোপা চেচিয়ে বলে।
” আরে আংকেল, তুলবেন না ওগুলো। আমার ছোট আপা দেখলে আপনার হাত কেটে নিবে”
আচমকা চমকে ওঠে আরিয়ান, তাকায় ওর থেকে হাত তিনেক দূরে দাড়িয়ে থাকা লোপার দিকে। মেয়েটির কন্ঠ যেমন চিকন গায়ে গতরেও তেমন হালকা পাতলা। উচ্চতা মোটামুটি থাকলেও চেহারায় বাচ্চা সুলভ ভাব রয়েছে এখনো। এই মেয়েটাকে এবাড়িতে আসার পর প্রথম থেকেই দেখছে। ভীষণ চালু। স্যার পরিচয় করিয়ে দিলো এটা তার বোন। স্যারের বোন হলে সে কিভাবে তাকে ভাই না ডেকে আংকেল ডাকতে পারে? চমকে ওঠা আরিয়ান আশেপাশে তাকিয়ে বলে।
” এই মেয়ে আংকেল ডাকো কাকে”?
লোপা ফটাফট জবাব দেয়।
” কাকে আবার? আপনাকে”
আরিয়ানের বিষয়টা হজম হলোনা। ও একবার নিজের গায়ের দিকে তাকিয়ে দেখে। সাতাশ বছর বয়স ওর।স্যারের থেকে গুনেগুনে চার বছরের ছোট সে। স্যার যদি এই মেয়ের ভাই হয় তবে ও কেনো আংকেল? বিষয়টা ভেবে মনে মনে ভীষণ অখুশি আরিয়ান। জিজ্ঞেস করে।
” কোন ক্লাসে পড়ছো”?
” এইটে পরীক্ষা দিয়ে পাশ করে এবার নাইনে উঠেছি”
আরিয়ান আশেপাশে তাকিয়ে আস্তে করে বলে।
” আমাকে আংকেল ডেকোনা, কেমন বুড়ো বুড়ো ফিল হয়। তুমি বরং আমাকে ভাইয়া ডাকতে পারো”
সঙ্গে সঙ্গে লোপা বলে ওঠে।
” না, না আপনি আংকেলই। আমার ছোট আপা আমাকে শিখিয়েছে প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষেরা সব আংকেল। তাদের ভাইয়া ডাকতে নেই। লোকে খারাপ কথা রটাবে অজানা, অপরিচিত লোককে হুট করে ভাই ডাকলে”
একথা শুনে পুরোপুরি তাজ্জব বনে গেলো আরিয়ান। এই মেয়েকে পুঁতে দিলে গাছ হবে। ঝুনো নারকেলের মতো সেম টু সেম। কথা জানে অনেক। আরিয়ান কি বলবে ভেবে না পেয়ে বলে।
” আমি কি এখান থেকে একটা লাল পেয়ারা খেতে পারি”?
” খবরদার আগে তুলবেন না। ছোট আপার অনুমতি লাগবে এই গাছের ফল খেতে হলে। এই লাল পেয়ারা গাছের মালিক আমার ছোট আপা। কলেজে বৃক্ষরোপন মেলা থেকে পুরস্কার পেয়েছিলো। তাই এই গাছের উপর ওর হক বেশি”
আরিয়ান চেনে না এই ছোট আপাকে। জানতে চেয়ে বলে।
” এই ছোট আপাটা কে”?
” আমার ছোট আপা”
” হ্যা, সে কে”?
” আমার বোন”
” কেমন বোন”
” চাচাতো বোন”
” ও আচ্ছা। তার নাম কি”?
আরিয়ানের এতো প্রশ্নের উত্তর দিতে মোটেও পছন্দ করছেনা লোপা। ও কিছুটা বিরক্ত নিয়ে বলে।
” এতো খোঁজ খবর নিয়ে লাভ নেই আংকেল। আমার ছোট আপা বিবাহিত “
আরিয়ান পরলো লজ্জায়। এই মেয়েটার কথায় খুব ধার। একে আর কিছু জিজ্ঞেস করা যাবেনা লজ্জায় ফেলে দেবে। লোপা আর বেশিক্ষণ দাড়িয়ে থাকতে চাইলোনা। হাতে ধরে রাখা ট্রে টা বারান্দার একটা চেয়ারের উপর রেখে বলে।
” বড়ো আম্মা পাঠিয়েছেন, আপনারা খেয়ে নিন”
আরিয়ান কিছু বলেনা, লোপার কাজ শেষে লোপা আবার দ্রুত পায়ে লাফাতে লাফাতে নিচে যায়। আরিয়ান কৌতুহলী দৃষ্টি ফেলে দেখে মেয়েটার চলে যাওয়া। লোপা চোখের আড়ালে যেতেই আরিয়ান বিড়বিড় করে বলে।
” এই বাড়ির মেয়ে গুলোর তো বেশ ঝাঁঝ আছে। স্যার জেনেশুনে এমন বিষ মরিচের একটাতে কামড় বসিয়েছে কেনো? স্যারের গাল জ্বলে নি”?
দুপুরে খাবার টেবিলে বসতেই বড়োসড়ো বাজটা ধারার মাথায় তখনই পড়লো যখন দেখলো এক গামলা ভর্তি পোলাও আর তারউপর মোরগের লেগফিচ দুটো সরু করে সাজিয়ে রাখা। ও চেয়ার ছেড়ে উঠেই দৌড়ে উঠানে যায়। তখনও মেহমান, ওয়াসিফ ওরা খেতে আসেনি।এদিকে ওদিকে খুঁজে যখন ওর সেই লাল ঝুঁটি মোরগটা কোথাও পায়না ওর চোখে পড়লো রান্না ঘরের পাশের ঝোপে মোরগের ফেলে দেওয়া পশমগুলো। ওর চিনতে বা বুঝতে একটুও ভুল হলোনা ওর সেই মোরগটাকেই আবার ধরেছিলো। ধারার চোখ দুটো ছলছল করে ওঠে। রাগে দুঃখে ওর নিজের মাথার চুলগুলো টেনে ছিড়তে ইচ্ছে করছে। নিজের উপর রাগ হয়। ও যে কেনো তখন মিতুর বাড়ি যেতে গেলো, বাড়িতে থাকলে এটা কখনো হতে দিতোনা ধারা। ও যখন চেচিয়ে মা কে কিছু বলতে যায়, সামিরা সঙ্গে সঙ্গে মেয়েকে চোখ রাঙিয়ে ওঠে।
” বেশি বাড়াবাড়ি করবিনা, বাড়িতে অতিথি, থাপ্পড় খাবি বলে দিলাম”
শাহেনূর এগিয়ে এসে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে।
” তোকে আমি বাজার থেকে এর থেকেও সুন্দর দেখতে আরেকটা মোরগ এনে দেবো মা। রাগ করিসনা। বাড়িতে মেহমান, হাতে সময়ও ছিলো না। তাই ওটাকেই..”
ধারা এই মুহূর্তে আর কোনো সান্তনা শুনতে চাইলো না। একটা কথাও না বাড়িয়ে ও চুপচাপ চলে যায় সেখান থেকে।
মেয়ের অভিমান দেখে শাহেনূরের খারাপ লাগে। জা কে বলে।
” তুই একটু বেশি বুঝিস, কি দরকার ছিলো এসবের, হাতে সময় নিয়ে বাজার করে রাতেও আয়োজন করা যেতো”
” বাদ দিন তো ভাবি, ওর ছেলেমানুষীতে সায় দেওয়ার সময় নেই। আপনি ওয়াসিফদের ডাকুন। “
সেদিন দুপুরে এমনকি রাতেও ধারাকে খাবার টেবিলে পাওয়া গেলোনা। এমনকি ঘর থেকেও বের হয়নি।ভাইবোনেরা কয়েকবার করে খেতে ডাকলেও তাদের ধমকে ধামকে তাড়িয়ে দিয়েছে ধারা। ওর কষ্টটা আসলে কেউ বুঝতে পারছেনা। ও কাউকে চাইছেও না বোঝাতে। শেষ বারের মতো মা, বড়ো আম্মা যখন এলো ওকে ডাকতে তাদের ডাকেও উঠলোনা ধারা, আর না বললো তাদের সঙ্গে কোনো কথা। চুপচাপ বিছানার ওপাশে মুখ ঘুরিয়ে শুয়ে রইলো। লুইপা শান্ত থাকা বোনকে কতক্ষণ চেয়ে দেখে বলে।
” তুই তো খিদে সহ্য করে থাকতে পারিস না। সেখানে দুপুর, রাত না খেয়ে কিভাবে আছিস? চল কটা খাবি”
ধারা নাক টেনে ভারী গলায় বলে।
” আমি খাবোনা আপা, দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়। আমি ঘুমাবো”
লুইপা হাল ছেড়ে দিলো। এই মেয়েকে সারারাত ডাকলেও উঠবেনা। জেদ ষোলো আনা। তবে লুইপার খারাপ লাগে। একটু রাগ ও হয় মা, চাচিদের উপর। ও যখন মানা করেছিলো কি দরকার ছিলো ঐ মোরগটা এভাবে জবাই দেওয়ার? লুইপা চুপচাপ ঘরের লাইট বন্ধ করে বোনের পাশে গিয়ে শুয়ে থাকে।
রাত তখন বোধহয় বারোটার কাছাকাছি, পুরোপুরি ঘুমোয়নি লুইপা। ওর কানে এলো চেপে রাখা দরজা থেকে পরপর দু’টো টোকার শব্দ। ও জলদি বিছানা ছেড়ে উঠেই জিজ্ঞেস করে।
” কে”?
ওপাশ থেকে ভারি গলায় আওয়াজ আসে।
” আমি”
লুইপা ভাইজানের গলা পেতেই ছুটে গিয়ে দরজা খুলতে চায় ওমনি ধারা খপ করে আপার হাত চেপে ধরে বলে।
” খুলবিনা আপা”
লুইপা ওকে পাত্তা দিলোনা,হাত ছাড়িয়ে নিয়ে গিয়ে দরজা খুলতে দেখে লম্বা চওড়া লোকটা দাড়িয়ে আছে। লুইপা বলে।
” ভেতরে আসবে ভাইজান”?
” নাহ। ও কি ঘুম”?
লুইপা সত্যি বলে।
” না ঘুমোয়নি”
” ওকে বল, পাঁচ মিনিটের মধ্যে উঠে খেয়ে নিতে, সময় পাঁচ মিনিট। আমার যেনো এঘরের সামনে পরেরবার আসা না লাগে”
লুইপা মাথা কাত করে বলে।
” আচ্ছা “
চলবে
[ যারা গল্প পড়বেন অবশ্য লাইক কমেন্ট করে যাবেন।]
Share On:
TAGS: ঐশী রহমান, মেজর ওয়াসিফ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ৬
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ৫
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ৭
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ১
-
মেজর ওয়াসিফ গল্পের লিংক
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ২
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ৯
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ৪
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ৮
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ৩