Golpo romantic golpo মেঘের ওপারে আলো গল্পের লিংক

মেঘের ওপারে আলো পর্ব ২৬


#মেঘের_ওপারে_আলো

#পর্ব_২৬

#Tahmina_Akhter

সকাল আটটা বাজছে। আলোকে সঙ্গে নিয়ে মাহরীন সিতারা বেগমের সঙ্গে দেখা করতে গেলেন৷ সিতারা বেগম যেন গত পাঁচদিনে শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছেন। আলো সিতারা বেগমের পাশে বসতে গিয়েও বসল না। কিন্তু, আলোর খুব ইচ্ছে করছিল সিতারা বেগমের পাশে বসতে। ইদানিং, কেন জানি আলোর মনে হয়, সিতারা বেগমের গা থেকে মা মা গন্ধ বের হয়! মাহরীন সিতারা বেগমের পাশে বসলেন। সিতারা বেগম শুকনো মলিন হাসি দিয়ে বললেন,

— আপনারা এসেছেন? আলোর বাপ আপনাদের দেখলে এখন কত খুশি হতো,জানেন?

কথাটি বলতে বলতে ঝরঝরিয়ে কেঁদে ফেললেন সিতারা বেগম৷ মাহরীন সিতারা বেগমের হাত ধরে স্বান্তনার সুরে বললেন,

— দুনিয়া কখনোই আমাদের চিরস্থায়ী ঠিকানা নয়; একদিন সবাইকেই ফিরে যেতে হবে।

কেউ আগে, কেউ পরে। এই সত্য থেকে পালানোর পথ নেই। তাই কান্নায় ভেঙে না পড়ে। মনকে শক্ত করে দাঁড়ান। আপনি যদি এখনই হার মানেন,

তবে আলোকে দেখবে কে?

— আলোকে আপনারা দেখবেন। আমি কি করব?

—আলো চিরচায়িত মাতৃত্বের রোগে আক্রান্ত। আপনার ছোট আলো মা হতে যাচ্ছে।

মাহরীনের কথা শুনে সিতারা বেগম কান্না থেমে যায়। আলোর দিকে বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে রইলেন। আলো মাথা নীচু করে রেখেছে। মায়ের সামনে কেন যেন লজ্জা লাগছে! সিতারা বেগম চোখের পানি মুছে ফেললেন। তারপর, হাত বাড়িয়ে আলোর হাতটা ধরে বললেন,

— আলো, মা হবার অনূভুতি কেমন রে? আমার অনেক জানতে ইচ্ছে করে! একজীবনে সব পেয়েছি। পারলাম না শুধু মাতৃত্বের স্বাদ গ্রহণ করতে।

—- কি জানি, আম্মা? মা হবার অনূভুতি কেমন হয়? কিন্তু, ভেতরে ভেতরে কি যেন অনুভব হয়? শরীরে কাটা দিয়ে উঠে এই ভেবে যে আমার শরীরে নতুন আরেকটি প্রাণের সঞ্চার ঘটেছে।

আলোর কথা মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় শ্রবন করল সিতারা। মাহরীন আলোর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। সিতারা বেগম আলোর হাতটা ধরে বলল,

— তোর বাপ আজ বেঁচে থাকলে অনেক অনেক খুশি হইত!

সিতারা বেগম ফের কেঁদে ফেললেন। আলোর চোখ ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে যায় চোখের জলে। বাবা থাকলে আজ সত্যি খুশি হতো!

সকাল দশটা বাজার আগেই আলোকে নিয়ে বাড়িতে ফিরে এলেন মাহরীন। এসেই আলোকে ড্রইংরুমে বসিয়ে ডিম সিদ্ধ করতে চলে গেলেন। কাজের বুয়ারা সকালের নাশতা বানিয়ে রেখেছে।

ডিম সিদ্ধ করে খোসা ছাড়িয়ে সামান্য লবন ছিটিয়ে একটা বাটিতে করে এনে আলোকে খেতে দিলো মাহরীন। আলো অসহায় দৃষ্টিতে তাকালো মাহরীনের দিকে। কিন্তু, মাহরীন চোখ পাকিয়ে তাকালো। আলো চুপচাপ এক হাতে ডিম নিলো অন্যহাতে নেয় পানির গ্লাস। কোনেমতে পানি দিয়ে ডিম গলাধঃকরণ করল সে।

এমন সময় মাহরীনের মোবাইলে কল এলো। কাব্য কল করেছে। মাহরীন কল রিসিভ করে কথা বলছে। ইতি তার শ্বাশুড়ির সঙ্গে কথা শেষ করে জানালো যে, সে আলোর সঙ্গে কথা বলতে চায়। মাহরীন আলোর দিকে মোবাইল এগিয়ে দেয়।

— হ্যালো, ভাবি। কেমন আছেন?

— আছি বেশ। তোমার কি কন্ডিশন? তোমার স্যার এবং আমি তো দুশ্চিন্তায় আছি। তুমি না-হয় বোঝো না কিন্তু, মেঘালয়…

ইতির কথা শুনে আলোর খারাপ লাগছে মেঘালয়ের জন্য। মানুষটাকে সবাই এখন খারাও ভাবছে!

— কাব্য তো বলেই ফেলেছে যে, মেঘালয়ের নামে মামলা দেয়া উচিত। সে একজন হবু ডাক্তার হয়ে কিভাবে এমন ভুল করেছে?

— আসলে ভাবি…

আলো মোবাইল ফোন নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কিছুটা দূরে সরে গেল। তারপর, ইতিকে সবটা খুলে বলল। সবটা শোনার পর ইতি বিস্মিত হয়ে বলল,

— আরে বোকা মেয়ে, সামনে যারা পরীক্ষা সে কিভাবে পারে এহেন বোকা কান্ড করতে? আরে পুরুষ মানুষের মিষ্টি কথায় মজতে নেই। এরা আজ ভালো তো কাল মন্দ৷ নিজের অবস্থান তৈরি করার পর বাচ্চা নেয়া উচিত ছিল তোমার। তোমার কথা শুনে আমার যে কি রাগ লাগছে?

ইতির কথার পিঠে কিছুই বলতে পারল না আলো। মাথা নীচু করে কেবল কথাগুলো শুনছে।

— বাচ্চা পেটে এসেছে বলে লেখাপড়া কিন্তু অফ করবে না। পড়াশোনা চালিয়ে যাও। সংসার ধর্ম যদি পার্মানেন্ট হয় পড়ালেখা, যোগ্যতা, নিজের পরিচয় তৈরি করা তোমার অধিকার। পরীক্ষার প্রিপারেশনের জন্য হাতে আছে একমাস। সো বি কেয়ারফুল। এতক্ষণ যা বলেছি তা নিয়ে রাগ করবে না। এজ এ্যা সিস্টার আমি তোমাকে বকা দিয়েছি এবং উপদেশ দিচ্ছি।

ইতি কল কেটে দিলো। আলো মোবাইল হাতে নিয়ে ফের আগের জায়গায় ফিরে এলো। ঘড়িতে এগারোটা বাজতে চলল। ডাক্তার সাহেবের ফিরে আসার সময় হয়ে গেছে। কিন্তু, ডাক্তার সাহেব এখনও বাড়ি ফিরছে না কেন?

সকাল এগারোটা পনেরো মিনিটে, মেঘালয় বাড়ি ফিরে এসেছে ক্লান্ত হয়ে। আলো তখন ড্রইংরুমে বসে ছিল মাহরীনের পাশে। মেঘালয়কে ফিরতে দেখে আলো উঠে দাঁড়ালো। মানুষটা পিপাসিত হয়ত! এক গ্লাস লেবুর শরবত বানিয়ে দিলে মন্দ হয় না। আলো রান্না ঘরে গিয়ে একগ্লাস লেবুর শরবত বানালো। গ্লাস হাতে নিয়ে ড্রইংরুমে এসে দেখল, মেঘালয় নেই। মাহরীন মুচকি হেসে বলল, “মেঘালয় ঘরে গিয়েছে।” অগত্যা আলো শরবতের গ্লাস নিয়ে চলল তাদের রুমের দিকে।

আলো রুমে ঢুকেই দরজা বন্ধ করে দিলো। গ্লাস বেডসাইড টেবিলের ওপরে রেখে দেয়। তারপর, সে বারান্দায় চলে গেল। ঘরের গুমোট আবহাওয়া যেন সে সহ্য করতে পারছে না। ঘ্রাণশক্তি এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছে যে, মনে হচ্ছে পুরো শহরের যত গন্ধ আছে, সে একাই সব পাচ্ছে। বারান্দার রেলিংয়ের ওপর হাত রেখে অদূরে বহুতল ভবনের দিকে তাকিয়ে রইল আলো। মনের কোনে মৃত বাবার স্মৃতি বারবার উঁকি দেয়। বাবার কন্ঠস্বরকে মিস করছে আলো। বাবা যদি বেঁচে থাকত হয়ত আলোকে সাত সকালে কল করে জিজ্ঞেস করত, “কি রে আলো, বাবাকে ছাড়া কেমন দিন কাটে তোর? বাবা কিন্তু তোকে ছাড়া ভালো থাকতে পারছি না”

আলো যখন স্মৃতির মাঝে ডুবেছিল, তখন মেঘালয় ভেজা গায়ে, টাওয়াল পরনে আলোর পেছনে দাঁড়িয়ে, আলোর কাঁধে তার থুতনি ঠেকিয়ে আলোর দুই হাতের ওপর তার দুই হাত রাখল। আলো আচমকা শিউরে ওঠে। মেঘালয় আলোর কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলল,

— রিল্যাক্স, মিসেস মেঘালয়।

আলো নিজের বুকে থুতু দিয়ে পেছনে ঘুরল। মেঘালয়ের দুই হাতের বন্ধনীতে আলো বন্দি। আলো কিছু বলবে, ঠিক ওই সময় মেঘালয় ভ্রু নাচিয়ে বলল,

— এই তুমি এত ভীতু হলে হবে! ডাক্তারদের সাহসী হতে হয়।

—হসপিটালে নিশ্চয়ই কেউ এসে হুটহাট আমাকে এভাবে ভয় দেখাবে না৷

আলোর ইঙ্গিতপূর্ণ কথা শুনে মেঘালয় ভ্রু কুঁচকে তাকালো। আলো অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে রাখল। মেঘালয় আলোর মুখটা ধরে নিজের দিকে ঘুরিয়ে বলল,

— আমি ছাড়া অন্য কেউ যদি এই ধরনের আচরণ করে, তাকে নিশ্চয়ই তুমি ছাড় দেবে না?

মেঘালয়ের কথা শুনে আলো অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। “কোথাকার কথা কোথায় টেনে নিয়ে যাচ্ছে মানুষটা!”

মেঘালয় আলোর কপালের চুলগুলো পেছন গুঁজে রাখল। তারপর, আলোর চোখে চোখ রেখে বলল,

—পথে-ঘাটে, ভীড়-ভাট্টায়, লোকাল বাসে এমন অনেক নারী আছে যারা প্রতিনিয়ত হ্যারাসমেন্টের স্বীকার হচ্ছে। সম্মানের খাতির অনেকেই আছে, যারা প্রতিবাদ করে না। কিন্তু, যদি কখনো তুমি এই ধরনের পরিস্থিতিতে পরো, তাহলে কিন্তু সহ্য করবে না। প্রতিবাদ করবে। কারণ, তুমি আজ সইলে পরদিন অন্য কাউকে এই পরিস্থিতর মধ্য দিয়ে যেতে হবে।

— আমি এতটাও সাহসী নই, ডাক্তার সাহেব। আপনি খুব ভীতু একটা মেয়ের সাহসী স্বামী।

আলোর কথা শুনে মেঘালয় মুচকি হেসে ফেলল। আলোর একগালে হাত রেখে বলল,

— তুমি বোকাও বটে।

আলো মেঘালয়ের কথার পিঠে কিছু বলল না। মানুষটার সামনে বোকা, আহ্লাদী, সাজতে মন্দ লাগে না তার।

— এবার চলো ঘরে। আমার পরনে যে শুধুমাত্র টাওয়াল, খেয়ালও ছিল না। আল্লাহ জানে, আজ কতজন আমাকে এভাবে দেখে ফেলেছে!

মেঘালয়ের কথা শুনে আলো বারান্দার নীচের রাস্তার উঁকি দিয়ে তাকিয়ে হেসে ফেলল।

মেঘালয় আলোর হাত ধরে বারান্দা থেকে ঘরে এলো। সাদা রঙের টিশার্ট এবং ব্লু রঙের ট্রাউজারে আজ কেন যেন মেঘালয়কে বেশ চোখে লাগছে! আলো বেশ কয়েকবার আঁড়চোখে তাকাচ্ছে। মেঘালয়ের ভ্রু ছুঁইছুঁই ভেজা চুলগুলো থেকো টুপটুপ পানি পরছে দেখে আলোর ইচ্ছে করল, পানিগুলো মুছে দিতে। কিন্তু, সাহসের অভাবে মেঘালয়ের সামনে নিজের আবদার পূরণ করার কথা বলা হলো না৷

মেঘালয় একটা ছোট লাল বক্স এনে আলোর হাতের ওপর রাখল। আলো বক্সের দিকে তাকিয়ে বলল,

— নাকফুল এনেছেন?

— কে যেন বলেছিল, নাকফুল পরলে নাকি তাকে আমার আমার লাগে?

আলো মাথা নীচু করে ফেলল। মাঝেমধ্যে ইচ্ছে করেই তাকে লজ্জায় ফেলতে এভাবে কথা দিয়ে খোঁচা দেয় মানুষটা।

—- বক্স খুলে দেখো তো, পছন্দ হয় কিনা?

আলো বক্সটা খুলে দেখল বেশ চমৎকার একটা লাভ সেইপ আকারের ছোট রুবি পাথরের নাকফুল। লাভ সেইপের মধ্য তিনটা স্টোন। দুইটা লাল রঙের। একটা নীল রঙের।

আলো ভীষন অবাক হয়ে নাকফুলের দিকে তাকিয়ে রইল। এমন ডিজাইন সে কখনো দেখেনি! মেঘালয় হাত বাড়িয়ে নাকফুল হাতে নিয়ে বলল,

— আরেকটু কাছে এসে বসো, আমি পরিয়ে দেব।

— আরে আপনি পারবেন না। আমি…

— আলো?

ব্যস, মেঘালয়ের মুখ থেকে “আলো” ডাক শুনে চুপটি করে রইল আলো। মেঘালয় বেশ যত্ন সহকারে আলোকে নাকফুল পরিয়ে দিলো।

নাকফুল পরিয়ে দেয়ার পর মেঘালয় বেশ কিছুক্ষণ আলোর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। কি আছে এই মুখটায়? ভাবতে থাকে কিন্তু উত্তর মেলে না। শ্যামাকন্যাকে ইদানিং না দেখলে কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগে! শত ব্যস্ততা শেষ করে ক্লান্ত হয়ে বাড়ি এসে এই শ্যামা মুখখানা দেখার পর যেন সকল ক্লান্তিরা বিদায় নেয়। অনেকেই বলে আলোকে দেখার অসুখ নাকি মেঘালয়ের সাময়িক মোহ। অথচ, মেঘালয় চায় তার সাময়িক মোহ জন্মান্তর পর্যন্ত চলুক। আলোকে দেখার অসুখ তার কখনোই না মিটুক।

মেঘালয় সামান্য ঝুঁকে টুপ করে আলোর নাকফুলের ওপর চুমু দিয়ে সরে গেল। আলো মাথা নত করে ফেলেছে। মেঘালয় আলোর হাত ধরে বলল,

— নাকফুলে আসলেই তোমাকে আমার আমার মনে হয়, মিসেস মেঘালয়!

চলবে…

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply