Golpo romantic golpo মেঘের ওপারে আলো গল্পের লিংক

মেঘের ওপারে আলো পর্ব ২৩


#মেঘের_ওপারে_আলো

#পর্ব_২৩

#Tahmina_Akhter

আলো হুট করে পেছনে ঘুরে অতি সন্তর্পনে চোখের পানি মুছে ফেলল। মেঘালয় হাত বাড়িয়ে আবারও গুটিয়ে ফেলে। দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো হৃদয় চিড়ে। যেন হৃদয়ের দহনে পোড়া গন্ধ বেরিয়ে এলো শ্বাস দিয়ে।

মেঘালয় ডানহাত দিয়ে তার চুলগুলো পেছনের দিকে ঠেলা দিয়ে আলোকে ডাক দিলো। আলো পেছনে ফিরে তাকায় না। তাকাবে কি করে? তার যে চোখের জলের বাঁধ ভেঙেছে আজ। আলোর দেহের দুলুনি দেখে মেঘালয় বুঝে ফেলল আলোর অবস্থা। একহাত দূরত্বকে মূহুর্তেই মিটিয়ে ফেলল মেঘালয়। আলোর পেছনে দাঁড়ালো। আলোর পিঠটা গিয়ে ঠেকল মেঘালয়ের প্রশ্বস্ত বুকে। মেঘালয় নিজের হাতদুটো ক্রস করে রাখল তার কোমরের ওপর। তারপর, আলোর মাথায় থুতনি ঠেকিয়ে আদুরে সুরে কিছু বলতেই যাবে, ঠিক ওই মূহুর্তে মেঘালয়ের মোবাইলে বিকট শব্দ তুলে কল রিংটোন বেজে উঠল। মেঘালয় আলোর থেকে দূরত্ব বাড়িয়ে পাঞ্জাবির পকেট থেকে মোবাইল ফোন বের কল রিসিভ করল। ওপাশ থেকে কি বলা হচ্ছে শুনতে না পেলেও মেঘালয়ের মুখের রিয়াকশন দেখে আলো বুঝতে পারল খারাপ কিছু ঘটেছে। হুট করে আলোর হৃদয়ে ভয় ঝেঁকে বসল।

মেঘালয় কথা শেষ করে আলোর হাত ধরে বলল,

— এখনি ফিরতে হবে আমাদের।

— কিন্তু, কি হয়েছে?

মেঘালয় জবাব দেয় না। আলোর হাতটা শক্ত করে ধরেই ছুটল বাইরের দিকে। কোনোমতে ওয়াশরুম এরিয়া ক্রস করে পার্টি এরিয়ায় গিয়ে রেদওয়ানের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পরল।

পুরো রাস্তা জুড়ে নীরবতায় কাটল দু’জনের। গাড়ি যখন দক্ষিণ খুলশীর দিকে না গিয়ে ওয়্যারলেস মোড়ে ঢুকল তখনই আলো মেঘালয়ের দিকে ফিরে বলল,

— আমরা কোথায় যাচ্ছি? রাত বাজে এগারোটা। আম্মুর জন্য রসমালাই নেয়ার কথা ছিল, আপনি ভুলে গেছেন?

মেঘালয় কেবল আলোর মুখের দিকে তাকালো। আলোর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর, আবারও সামনের দিকে দৃষ্টি রাখল। আলোর কেন যেন ভালো লাগছে না! মেঘালয়ের নীরবতা তাকে আতংকিত করে তুলছে।

আলো হুট করে সীটে গা এলিয়ে দিলো। চোখের কার্নিশে হুট করে যেন ঘুম এসে ধরা দিলো। অথচ, যেথায় সেথায় আলোর ঘুম আসে না সচারাচর।

আলোর ঘুম ভাঙল মেঘালয়ের ডাক শুনে। ঘুম ঘুম চোখে আলো চারপাশে তাকিয়ে নিজেকে আবিষ্কার করল গাড়িতেই। গাড়ির বাইরে তাকাতেই বুঝতে পারল, সে তার বাবার কোয়ার্টারের সামনে আছে। মেঘালয় কিছু বলার আগেই আলো আকস্মিকভাবে মেঘালয়ের বুকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলো গাড়ির সামনে থেকে। মেঘালয় পরে যাওয়ার আগে নিজের টাল সামলে ফেলল। আলোর পেছনে ছুটে যায় সে ।

আলো বাসার মূল গেটের মুখে দেখতে পেলো, কত চেনা অচেনা মানুষের সমাগম। আলোকে দেখে একজন বয়োবৃদ্ধ লোক সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলল,

— আফসারের মেয়ে এসেছে। সাইড দাও দেখি।

একে একে সবাই সরে দাঁড়ালো। আলোর পা যেন চলছে না ভয়ে। তবুও, সে যেন নিজেকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে। বারান্দা পেরিয়ে যেতেই চোখে পরল মেঝেতে রাখা একটা দেহের ওপর। সাদা চাদর দিয়ে পা থেকে মাথা পযর্ন্ত ঢাকা। পাশেই কারো কাঁধে মাথা রেখে বিলাপের সুরে কাঁদছে সিতারা বেগম। আলোর পায়ের শক্তি যেন ফুরিয়ে গেছে। দুই পা কোনোমতে এগিয়ে নিয়ে যায়। তারপর, ধপ করে বসে পরল দেহটার সামনে। কাঁপা কাঁপা হাতে মুখের ওপর থেকে চাদর সরিয়ে দিলো আলো। বাবার সদা হাসোজ্জল মুখটার বদলে ঘুমন্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে রইল আলো। ডানহাত দিয়ে তার বাবার মুখটা ধরে ডাক দিলো,

— বাবা, এই বাবা। কি হয়েছে, তোমার? দেখো, আমি তোমার, আলো এসেছি!

আলোর মস্তিষ্কে কিছু উল্টাপাল্টা চিন্তাভাবনা আসছে। আলো উদ্ভান্ত্রের ন্যায় তার বাবার হাতটা চাদরের আড়াল থেকে বের করল। হাতটা নিজের গালের সঙ্গে লাগাতেই টের পেলো তার বাবার হাত বরফ শীতল হয়ে আছে। নরম হাত জোড়া শক্ত হয়ে গেছে। আলো তার বাবার হাতটা গালের সঙ্গে লাগিয়ে বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল ।

“একি দুঃস্বপ্ন! সে কি এখনও ঘুমিয়ে আছে? হটাৎ কেউ ডাক দিলে তার ঘুম ভাঙবে। ঘুম ভাঙার পর কি এই দুঃস্বপ্ন থেকে পরিত্রাণ পাবে?”

— বাবা! ও বাবা! বাবা গো! তুমি কি আজ আমাকে চিরতরে এতিম করে চলে গেলে!

আলোর গলা দিয়ে শব্দ বের হয় না। বুকের মধ্যে কি এসে যেন চেপে ধরেছে! চোখ জ্বালা করছে। অথচ চোখের জল বের হচ্ছে না৷ কি হলো তার! বাবার সঙ্গে যদি তারও মৃত্যু হতো আজ? হায়, আল্লাহ!

এমন সময় সিতারা বেগমের অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ শুরু করেছে আলোকে৷ আলো পলকহীনভাবে তাকিয়ে রইল সিতারা বেগমের দিকে। তার নিজের মা নেই। আজ বাবাও চলে গেল। আচ্ছা, সিতারা নামের মানুষটা কি আর তাকে সৎ মেয়ে হিসেবেও পরিচয় দেবে না?

— জন্মের সময় মা’রে খাইছে। আর আজ আমার স্বামীটারে৷ যতদিন বেঁচে ছিল একটাদিনও শান্তি পায় নাই মানুষটা । এই মুখপুড়ির চিকিৎসার টাকার লোন মিটাতে গিয়ে মাস শেষে বেতনের তিনভাগের একভাগ টাকা থাকত। লোন শেষ হয়ে যাইত তারমধ্যে হলো এই মুখপুড়ির বিয়া। বিয়া হয় না, হয় না ; কইরা কত হা হুতাশ করছি। বিয়ে তো হইলো অথচ বিরাট বড়লোকের ছেলের সঙ্গে। বিয়ের জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান করতে গিয়ে এবার সুদের ওপর টাকা আনল মহাজনের কাছ থেকে। মাস শেষে সুদ দিবে নাকি সংসার চালাবে এই লোনের দুশ্চিন্তা করতে করতে মানুষটা আজ চইলা গেল। এবার শান্তি পাইছিস তুই? আমার নিজের মানুষ বলতে কে ছিল রে আলো? আমার নিজের পেটের সন্তান নাই। আমার বাপ-মা, ভাই কেউ নাই। তোর বাপ আমার আশ্রয় ছিল। আজ সেই আশ্রয় আমার থেকে কেড়ে নিলো, আল্লাহ! এখন আমার কে আছে? কে আছে আমার?

সিতারা বেগমের কথা শুনে এমন কোনো মানুষ নেই যে কাঁদেনি। আলোর ইচ্ছে করল এভাবে কাঁদতে, বুকের মধ্যে ধীরে ধীরে ব্যথা জমছে। কাঁদতে পারলে বোধহয় এই ব্যাথা কমে যেত!

আলো তার বাবার লাশের পাশে বসে রইল। কত মানুষ তাকে সরাতে চাইল কিন্তু ইঞ্চি কেউ সরাতে পারল না। ঠিক তখনি আলো নিজের কাঁধে কারো হাতের পরশ পেলো। আলো ঘাড় ফিরিয়ে তাকাতেই দেখতে পেলো, মাহরীনকে। মাহরীন তার পাশে বসে আছে। মাহরীনকে দেখেই যেন আলোর কান্নার বাঁধ ভেঙেছে। মাহরীনকে জড়িয়ে ধরে আলো কাঁদতে শুরু করল। আলোর এক একটা চিৎকার যেন উপস্থিত প্রত্যেকটা মানুষের হৃদয়ে প্রকম্পিত হচ্ছে।

_____________

আফসার সাহেবকে শেষবারের মত গোসল দেয়ার পর, শেষ কাপড় পরিয়ে তৈরি করা হচ্ছে অসীম যাত্রার উদ্দেশ্য। আলো চৌকাঠে বসে তাকিয়ে রইল মশারি খাটানো জায়গাটার দিকে। তার বাবাকে যে সেখানেই তারা তৈরি করে দিচ্ছে।

আফসার সাহেবের বিদায়বেলা চলে এলো। কিছু মহিলা সিতারা বেগম এবং আলো আরও একবার আফসার সাহেবের মুখটা দেখার জন্য ঘরের বাইরে নিয়ে আসে। আলো এবং সিতারা বেগম খাটিয়ার দুইপাশে বসল। আফসার সাহেবের মুখটার দিকে তাকিয়ে আলোর চোখ ভরে গেল জলে। সিতারা বেগমের কান্নায় আশপাশ আবারও থমথমে অবস্থা। আলো চোখের পানি মুছে তার বাবার মুখটার দিকে তাকায়৷ তুলা গুজা নাকটার দিকে তাকাতেই আলোর মনটা কেমন যেন করে উঠে। “বাবার নাকটা যে তুলের চাপে ফুলে আছে, বাবা কি ব্যথা পাবে না!” “বাবা না আগরবাতির সুগন্ধি পছন্দ করত না। অথচ সবাই যে আগরবাতি ধরিয়ে রেখেছে!” আলো হাঁটুতে ভর দিয়ে খাটিয়ার ওপর সামান্য ঝুঁকে আফসার সাহেবের গালের ওপর গাল রাখল। টুপ করে আলোর চোখের পানি গড়িয়ে পরল। আলোর গাল শিউরে ওঠে বাবার ঠান্ডা গালের স্পর্শে। এমন সময় কারা যেন এসে আলোকে সেখান থেকে সরিয়ে দেয়। তার বাবাকে নাকি নিয়ে যাওয়ার সময় হয়ে গেছে। অথচ, আলো এখনও ঠিকমত তার বাবার কাছ থেকে বিদায় নেয়নি।

সিতারা বেগম এবার আর উচ্চস্বরে কাঁদলেন না। মুখের ওপর কাপড় চাপিয়ে প্রিয়তমকে বিদায় জানাচ্ছেন। কিন্তু, আলো যে পারছে না নীরবে বিদায় জানাতে।

—-আন্টি, বাবার কাছ থেকে এখনও আমি বিদায় নেইনি। আর একবার আমাকে যেতে দিন। শুধু একবার। এরপর, তো চাইলেও আর বাবাকে দেখতে পাব না, স্পর্শ করতে পারব না৷ আন্টি, এত নিষ্ঠুর আপনি! আঙ্কেল আপনি বাবাকে ঢেকে দিচ্ছেন কেন? কাপড়ে বাঁধবেন না। প্লিজ, আঙ্কেল! আরেকবার আমাকে আমার বাবাকে দেখতে দেন।

মেঘালয় দূর দাঁড়িয়ে আছে। আলোর কান্না যে তার সহ্য হচ্ছে না। কিন্তু সহ্য না করেও যে উপায় নেই। মানুষ যখন মরে যায় সেই মানুষটাকে কি আর ফেরত পাওয়া যায়? যদি ফেরত পাওয়া যেত মেঘালয় সবার আগে তার বাবাকে ফিরিয়ে নিয়ে আসত।

মেঘালয়ের পাশে মাশফি দাঁড়িয়ে আছে। মাহরীন সিতারা বেগমের পাশে বসে রইলেন৷ মাহরীন হুট করে জীবনটা নিয়ে ভাবছেন। মাহরীন মৃত্যু পথযাত্রী সবাই জানে। অথচ, বিনা ঘোষণায় আজ কিনা আফসার সাহেব চলে গেলেন!

ধীরে ধীরে সবাই এগিয়ে এসে আফসার সাহেবের খাটিয়া কাঁধে তুলে নিলো। আলোকে কয়েকজন মিলেও আঁটকে রাখতে পারছিল না। সিতারা বেগমের আলোর আর্তনাদ দেখে আজ মায়া হলো। নিজের কান্না শোক ভুলে এগিয়ে এসে আলোকে বুকের মাঝে শক্ত করে ধরে বলল,

— তোর বাবা আর কোনোদিনও ফিরে আসবে না। তোর আমি আর আমার তোরে ছাড়া কেউ নাই, আলো। কাঁদিস না। তোর বাবার জন্য দোয়া কর। এখন তোর বাবার দরকার শুধুই দোয়া।

মসজিদে নামাজে জানাযা শেষ করে আফসার সাহেবকে খাটিয়ায় বহন করে নিয়ে যাওয়া হলো আকবার শাহ কবরস্থানেরদিকে ৷

সেখানে উনাকে কবর দেয়া হলো। কবর দেয়া হয়ে গেলে অনেকেই চলে যায় । বাকি মেঘালয়, মাশফি, আলোর দুই মামা এবং ইমাম সাহেব দাঁড়িয়ে রইল।

একটা সময় পর তাদেরও ফিরে আসার সময় হলো। তারাও চলে এলো। অন্ধকার কবরে একাই পরে রইলেন আফসার সাহেবের মরদেহ। জীবনের একমাত্র চিরস্থায়ী ঠিকানায়।

চলবে….

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply