মেঘের ওপারে আলো
পর্ব_১৯
Tahmina_Akhter
মেঘালয় আলোর হাত ধরে ঘর থেকে বের হয়ে এলো। সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় মেঘালয় ধীরে ধীরে পায়ের কদম ফেলল। যেন আলোর হাঁটতে সুবিধা হয়। সিঁড়ির শেষপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়ে পরল মেঘালয়। সেই সাথে আলো দাঁড়িয়ে যায়। মেঘালয় আলোর দিকে ফিরে হাত বাড়িয়ে দেয়, আলোর শাড়ির আঁচলের দিকে। আলো শক্ত হয়ে হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। মেঘালয় আলোর শাড়ির আঁচল তুলে আলোর মাথায় দিয়ে বলল,
–এবার ঠিক আছে। দেখতে মিসেস মেঘালয় মনে হচ্ছে।
আলো মাথা নীচু করে ফেলল। মেঘালয় আর আলোর হাত ধরল না। কারণ, বাড়ির বড় মানুষেরা আছে সেখানে। মেঘালয় আগে এবং পেছনে আলো। এভাবেই দুজনেই এগিয়ে যায়। ড্রইংরুমের সোফায় বসে ছিল মেঘালয়ের দুই চাচা, এবং এক ফুপি৷ মেঘালয় সেখানে এগিয়ে যায়। উপস্থিত সবাই মেঘালয় এবং তার নববধূর আগমনে খুশি হলো। আলো একে একে সবাইকে সালাম করল। ততক্ষণে মেঘালয়ের কাজিন গ্রুপ এসে আলোকে নিয়ে যায় ডাইনিং টেবিলের দিকে। কারণ, সেখানে বাড়ির মুরব্বিদের উপস্থিতি কম।
আলোকে একটা চেয়ারে বসিয়ে দিলো স্মিতা। তারপর, টেবিলের বাকি এগারোটা চেয়ার ধীরে ধীরে পরিপূর্ণ হয়ে যায়। মেঘালয় ড্রইংরুম থেকে তাকিয়ে ছিল আলোর দিকে। সে দেখল আলো মাথা নীচু করে বসে। মেঘালয় দৃষ্টি সরিয়ে মুরব্বিদের আলাপে মনোযোগী হলো।
সকালে নাশতার পর্ব শেষ হতেই আলোকে আবারও সাজিয়ে দেয়ার ক্ষণ এলো। তানিয়া একবারও আলোর সামনে এলো না। কিন্তু ইতি ছিল। স্মিতাকে সাহায্য করছিল বেশ। মেরুন রঙের লেহেঙ্গা পরিয়ে দেয়া হলো আলোকে। তারপর, আলোর চুলগুলো বেনী তাতে দুটো গোলাপ ফুল গুঁজে, কাঁধের একপাশে রেখে দিলো। কানে স্টোনের ঝুমকা আর গলায় গহনা। ঠোঁটে পিংক রঙের লিপস্টিক। চোখের কোলে কাজলরেখা। ব্যস, এতটুকু সাজানো হলো আলোকে। ইতি তো আলোকে দেখেই বলল,
— ইউ আর টোটালি ডিফারেন্ট, আলো! অসুন্দরের মাঝে তোমায় সুন্দর লাগে! কেন বলো তো? তোমাকে দেখলে চট করে মাথায় আসে, তুমি কৃষ্ণবতী। কিন্তু, তোমায় খুব সুক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করলে বোঝা যায়, তুমি কালো বলেই, দেখতে সুন্দর। ফর্সা সুন্দর হলে তোমায় দেখতে একটুও ভালো লাগত না।
ইতির কথা শুনে আলো কিছুই বলে না। শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে।
এমনসময় দরজা খুলে মেঘালয় নিজের ঘরে প্রবেশ করল। স্মিতা, ইতি এবং আলো মেঘালয়ের দিকে তাকালো। মেঘালয় হাতের ওয়াচ ঠিক করতে করতে তাকালো আলোর দিকে। তারপর, মুচকি হেসে স্মিতাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
— এবার তো ছাড়! এতক্ষণ যদি একটা মানুষকে এভাবে বসিয়ে রাখিস মেরুদণ্ডে সমস্যা হবে।
— সোজাসাপ্টা বলে দিলেই পারো যে, আমরা যেন তোমার ঘর থেকে বের হয়ে যাই। শুধু শুধু মেরুদণ্ডের সমস্যার কথা বলে নিজের দোষ ঢাকতে চাইছো যে?
স্মিতা হেসে কথাগুলো বলল। ইতি মুখে হাত দিয়ে হেসে ফেলল। মেঘালয় চোখ পাকিয়ে তাকালো। স্মিতার হাসি যেন দ্বিগুণ বেড়ে যায়। স্মিতা আলোর হাত ধরল , তারপর মেঘালয়কে উদ্দেশ্য করে বলল,
— ভাবিকে নিয়ে গেলাম। এতক্ষণ বসে থাকার পর ভাবির যাতে মেরুদণ্ডের সমস্যা না হয়, সেজন্য একটু হাঁটাহাঁটি করতে নিয়ে যাই। ইতি ভাবি, চলেন তো? ডাক্তারদের সঙ্গে থাকলে নিজেদের রুগি মনে হবে।
মেঘালয় হেসে ফেলল স্মিতার কথা শুনে। স্মিতা সত্যি সত্যি আলো এবং ইতিকে নিয়ে বেরিয়ে গেল। স্মিতার পাগলাটে চিন্তাধারা সম্পর্কে সে অবহিত। তাই কিছুই মনে করল না।
মেঘালয় এবার নিজেই তৈরি হলো। আয়নায় আরও একবার নিজেকে দেখে নিলো সে।
অফ-হোয়াইট শেরওয়ানি। আইভরি রঙের সাথে হালকা গোল্ডেন কাজ। সিম্পল কিন্তু রিচ। সামনে গোল্ড বোতাম, সাথে অফ-হোয়াইট চুড়িদার আর গোল্ডেন মুজারি। বুকের পাশে ছোট মেরুন-গোল্ড ব্রোচ আলোর মেরুন লেহেঙ্গার সাথে পারফেক্ট ম্যাচ এনে দিয়েছে।
মেঘালয় ঘর থেকে বের হতেই সম্মুখীন হলো ইনায়ার সঙ্গে। ইনায়া সম্পর্কে মেঘালয়ের বেয়াইন হয়। মাশফির ফুপু শ্বাশুড়ির একমাত্র মেয়ে। মেঘালয়কে দেখে ইনায়া এগিয়ে এসে বলল,
— হ্যালো, ডক্টর? বিয়েটা সেড়ে ফেললেন! কংগ্র্যাচুলেশনস।
— থ্যাংক ইউ। একা এসেছো নাকি?
— ইয়েস। মাম্মি একা পাঠাতে চাচ্ছিল না। আমি জোর করে এলাম।
— নিশ্চয়ই, আমার ওয়াইফকে দেখতে এসেছো?
মেঘালয়ের প্রশ্ন শুনে ইনায়া অবাক হয়ে যায়। মেঘালয় ইনায়াকে পাশ কাটিয়ে চলে যায়। কিন্তু ইনায়ার ডাকে মেঘালয় থেমে যায়। ইনায়া দৌঁড়ে যায় মেঘালয়ের কাছে। মেঘালয়ের সামনাসামনি দাঁড়িয়ে মেঘালয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
— আপনি এত কিছু বুঝেন! অথচ, আমি আপনাকে চেয়েছিলাম। সেটাই আপনি বুঝতে পারলেন না কেন? নাকি সব বুঝেও না বোঝার ভান ধরে ছিলেন?
— তুমি আমাকে চাইলে তো হবে না! আমার মাঝে তোমাকে চাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থাকতে হবে। আমি তোমাকে চাইনি কখনো।
— আমার মাঝে কিসের কমতি ছিল,মেঘালয়?
— কমতি, শূন্যতা এসব হৃদয়ের ব্যাপার না। এগুলো হচ্ছে লজিকের ব্যাপার। হৃদয় লজিক দিয়ে চলে না। হৃদয় নিজের নিয়মে চলে। আমার হৃদয় তোমাকে কখনোই চায়নি।
— একটা কালো মেয়েকে আপনার হৃদয় চেয়ে বসল? হাউ ফানি, এক্সকিউজ! তানিয়া আপুর কাছ থেকে জানতে পারলাম, আপনি বিয়ে করছেন। তখন আমি ভেবেছিলাম, মেঘালয় ইমতিয়াজ আহমেদ হয়ত এই শহরের সেরা অপ্সরাকে বিয়ে করছে। কিন্তু, সোশ্যাল মিডিয়ায় তানিয়া আপুর শেয়ার করা আপনাদের বিয়ের ছবি দেখে, আমার কেন যেন আপনার ওপর হাসতে ইচ্ছে করল! যার এত দম্ভ সে কিনা একটা কালো, গরীব ঘরের মেয়েকে …..
বাকি কথা সম্পূর্ণ করতে পারল না ইনায়া। মেঘালয় হাত উঁচু করে বলল,
— আমাদের বাড়িতে তুমি আজকের দিনের মেহমান। খাও, দাও, ইনজয় করো। বাট, ডোন্ট ক্রস লিমিটস ইনায়া। আই ওন্ট টলারেট। ইউ ক্যান সে মি এনিথিং। নট মাই ওয়াইফ। বিকজ শী ইজ মাই রেসপন্সিবিলিটি, শী ইজ মাই লাইফ পার্টনার।
— বাট নট ইউর সোলমেট। শুধু বিয়ে করে লাইফ পার্টনার হলেই হয় না। সোলমেট, আত্মার আত্মীয় হতে হয়। আপনি পুরুষ মানুষ তো। নতুন নতুন বিয়ে করেছেন। এখন সব কিছুই রঙিন মনে হবে। আর কয়েকটা দিন যাক। তারপর, না-হয় আপনার বলা কথাগুলো মিলিয়ে দেখব।
কথাগুলো বলে ইনায়া মেঘালয়ের সামনে থেকে সরে দাঁড়ালো। মেঘালয় হনহনিয়ে সিঁড়ি বেয়ে চলল ছাঁদের দিকে। কারণ, ছাঁদে রিসিপশনের জন্য ডেকোরেশন করা হয়েছে।
“ইনায়া মেয়েটা এমন কেন? তানিয়ার মত একরোখা, জেদি, এরোগেন্ট”
এসব ভাবতে ভাবতেই মেঘালয় ছাঁদে প্রবেশ করল।
আলোদের বাড়ি থেকে মোট চৌদ্দজন এলো। আফসার সাহেব, সিতারা বেগম, আলোর নানী, আলোর দুই মামি-মামি সহ তাদের ছেলে-মেয়েরা এলো। আলোর শ্বশুরবাড়ির বিরাট অবস্থা দেখে সবাই আশ্চর্য হলেন। আফসার সাহেব বাদে বাকি সবাই তব্দা খেয়ে বসে আছে।
আফসার সাহেবকে দেখে আলো এগিয়ে এসে তার বাবার সামনে দাঁড়ালো। চোখভর্তি জল নিয়ে তার বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। আফসার সাহেব মেয়ের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। মেয়েটা কি একদিন বদলে গেল? এতবছরের যত্নে ত্রুটি ছিল হয়ত? নয়ত আজ মেয়েটাকে এত সুন্দর লাগছে কেন? আফসার সাহেব কাঁপা কাঁপা হাতটা আলোর মাথায় রেখে বলল,
— তোকে ছাড়া আমার গৃহ আজ শূন্য রে, মা।
কথাটি বলতে বলতেই আফসার সাহেব ঝরঝরিয়ে কেঁদে ফেললেন। আলো তার বাবার হাত ধরে কান্না করে ফেলল। উপস্থিত সবার দাঁড়িয়ে দেখল হৃদয়বিদারক এক দৃশ্য।
মেঘালয় আফসার সাহেবকে দেখে এগিয়ে এসে সালাম জানালো। আফসার খুশি হয়ে মেঘালয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। মেয়ে এবং জামাইকে একসঙ্গে দেখে আফসার সাহেবের হৃদয়ে শান্তি অনুভব হয়। রাজপুত্রের ন্যায় দেখতে ছেলেটা নাকি তার কৃষ্ণবতী মেয়ের স্বামী।
মাহরীনকে দেখে আফসার সাহেব সেদিকে এগিয়ে গেলেন৷ ছাঁদ ভর্তি মানুষের চোখ ফাঁকি দিয়ে মেঘালয় আলোর দিকে সামান্য ঝুঁকে বলল,
— তুমি এত নিষ্ঠুর কেন মিথ্যাবতী? প্রতিবার আমার জন্য সেজেগুজে হাজির হয় সবার সামনে। অথচ আমাকে দেখাতে কেন এত কাপর্ণ্যতা তোমার!
— মেঘালয়? এদিকে আয়।
মাহরীনের ডাক শুনে মেঘালয় চলে গেল সেদিকে। আলো চুপটি করে বসে রইল। পাশের ফাঁকা অংশটায় একের পর এক মানুষ আসছে, বসছে। তার সঙ্গে কথা বলছে। দুই চারটা ছবি তুলে, চলে যাচ্ছে।
এরইমাঝে মেঘালয়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু, কলিগ সবাই আসে। আলোকে দেখে অনেকেই অবাক হয়। মেঘালয় তাদের ফেইস রিয়াকশন দেখে তাদের মনের অবস্থা বুঝতে পারে। কিন্তু, লোকের কথা কি আসে যায়?
অবশেষে অনুষ্ঠান শেষ হবার পর আলো এবং মেঘালয়কে নিয়ে আফসার সাহেব এবং সিতারা বেগম রওনা হলেন তাদের বাসার উদ্দেশ্য। বাকীরা চলে গেছে আগেই। মেঘালয় এবং আলোকে নিয়ল কোয়ার্টারে প্রবেশ করার পর আশেপাশের অনেকেই আসে নতুন জামাইকে দেখতে। অনেকেই তো আলোর হুট করে ভাগ্য পরিবর্তন দেখে হিংসায় জ্বলেপুড়ে যাচ্ছে।
ধীরে ধীরে মানুষে আনাগোনা কমতে শুরু করে। মেঘালয় একা বসে আছে আফসার সাহেবের কামরায়। এই ঘরটা বড়। তাই মেঘালয় এবং আলোকে এই ঘরে থাকতে দেয়া হয়েছে। আলোর সেই ছোট্ট দশ ফিটের ঘরে কি আর মেঘালয় থাকতে পারবে? আলো সিতারা বেগমের সঙ্গে কাজে সাহায্য করছে। মেহমানরা সবাই চলে গেছে। কারণ, ছোট্ট বাসায় অধিক মানুষ কেমন থাকবে?
রান্নাবান্না শেষ হলো রাত দশটার দিকে। আলো সবকিছু গুছিয়ে রাখল। তারপর, তার আগের ঘরটায় ঢুকে বাটিকের হলুদ রঙা থ্রি-পিছ নিয়ে গোসলখানায় ঢুকল। গোসল করার দরকার। শরীর থেকে মসলা, পেঁয়াজের গন্ধ আসছে। গোসল শেষ করে বের হতেই দেখল, সিতারা বেগম খাবার সব বেড়ে রেখেছেন টেবিলে। আলোকে দেখে সিতারা বেগম বললেন,
— জামাইকে ডেকে নিয়ে আয়।
আলো মাথা নাড়িয়ে চলে গেল তার বাবার ঘরে৷ রুমে ঢুকতেই দেখতে পেলো রুম অন্ধকার হয়ে আছে। আলো সুইচ অন করতেই সারা ঘরে আলো ছড়িয়ে গেল। খাটের দিকে তাকাতেই আলো দেখলে মেঘালয় কপালে ওপর হাত রেখে শুয়ে আছে। আলো ধীরপায়ে এগিয়ে যায়। খাটের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। তারপর, মেঘালয়কে উদ্দেশ্য করে বলল,
— এই যে, শুনছেন?
আলোর কন্ঠস্বর পেয়ে মেঘালয় কপাল থেকে সরিয়ে তাকালো। আলোকে দেখে বলল,
— আমি যে এই বাড়িতে আছি তোমার মনে আছে?
মেঘালয়ের কথা শুনে আলো মাথা নীচু করে ফেলল। মেঘালয় আলোর মুখের দিকে তাকালো। আলোর মাথায় লাল গামছা বাঁধা দেখে মেঘালয় উঠে বসল। খাট ওপর পা ঝুলিয়ে বসল সে।
— একটু আগে মা কল করেছিল। তানিয়া ভাবি নাকি রাগারাগি করে চলে গেছে বাড়ি থেকে। মাশফি ভাইয়া না চাইতেও ভাবির সঙ্গে ঢাকায় ফিরে গেছে।
কথাগুলো শুনে আলোর কষ্ট হলো। তানিয়া হয়তো তার কারণেই চলে গেছে। মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না আলোর। অপরাধ বোধ যেন গলার কাছে এসে আঁটকে গেছে।
— আমরা তিনভাই। মায়ের একটা মেয়ের ভীষণ শখ ছিল। ছোটবেলায়, বড়বেলায় অনেককেই বলতে শুনতাম, আমার মা’কে বলতো, আপনার তিন ছেলে দিয়ে তিন মেয়ে পাবেন। মা তার তিন ছেলেকে বিয়ে করিয়েছে। জানি ন আমার মা আদৌও তিন মেয়ে পেয়েছে কিনা? মাশফি ভাই তার বউ নিয়ে ঢাকায় থাকে। কাব্য ভাই আর ইতি ভাবি চলে যাবে, এটা তো তুমি জানোই। বাকি রইলাম আমি আর তুমি। আমার অনুপস্থিতিতে তুমি আমার মাকে দেখে রাখবে। ইট’স রিকুয়েষ্ট। আমার মা তোমাকে মেয়ে ভেবেছে। তার শেষ ইচ্ছার মান তুমি রাখবে। যতদিন মা বেঁচে আছে তাকে কোনোদিন কষ্ট দিয়ে কথা বলবে না। ধীরে ধীরে আমার মা মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে অথচ আমি কিছুই করতে পারছি না। কারণ, কিছু কিছু ব্যাপারে মানুষের ক্ষমতা সীমিত। আমি ডাক্তার। অথচ, আমি জানি না আর কোন চিকিৎসা পেলে আমার মা সুস্থ হবে?
আলো মেঘালয়ের কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনলো। কথার পিঠে জবাব দিলো না। সিতারা বেগমের ডাক পরতেই আলো মেঘালয়কে নিয়ে রাতের খাবার খাওয়ার জন্য ঘর থেকে বের হলো।
এরইমাঝে কেটে গেছে বহুদিন। মেঘালয় এবং আলোর বিয়ের বয়স মাত্র ১৩দিন চলছে। তানিয়া এবং মাশফি ফিরে গেছে ঢাকায়। কাব্য এবং ইতির আগামী পরশুদিন পোল্যান্ডে যাওয়ার দিন ফিক্সড হয়েছে। মেঘালয় আগের রুটিনে ফিরে গিয়েছে। হাসপাতালের ডিউটি। বিগত কয়েকদিন ধরে মাহরীনের পাশে বসে আলো অপেক্ষায় থাকে মেঘালয়ের হাসপাতাল থেকে ফিরে আসার । তখন মেঘালয়ের আনন্দ অনুভব হয়।
মাহরীনের শরীর আগের থেকে কিছুটা সুস্থ আছে। হয়ত, আলোর সেবা এবং সঙ্গ পেয়ে শরীরটা বেঁচে থাকার চেষ্টা করছে। আলোকে নিয়ে রোজ গার্ডেনে কিংবা ছাঁদবাগানে সময় কাটায় মাহরীন। আলো মাহরীনের কথাগুলো এত মনোযোগ নিয়ে শুনে। যেন মনে হয় কোনো ক্লাসের ইমপোর্টেন্ট লেকচার শুনছে। রোজ মাহরীনের চুল আঁচড়ে দেয়া। মাহরীনের সঙ্গে বসে পড়ন্ত বিকেলে চায়ের আড্ডা সবই আলো উপভোগ করছে। মাঝে মাঝে অবচেতন মনে যখন খেয়াল আসে, মাহরীন মাত্র আর কিছুদিনের মেহমান। তখন আলোর বুক ভেঙে আসে। মাঝে মাঝে সৃষ্টিকর্তার কাছে দোয়া করে, যেন কিছু একটা ম্যাজিক হোক আর মাহরীন সুস্থ হয়ে যাক।
আজ অসময়ে বিকেলবেলা মেঘালয় ফিরে এলো। তবে একা নয়। মাশফি-তানিয়া সহ স্মিতাসহ আটজন কাজিনকে সঙ্গে নিয়ে এসেছে। কাব্য আর ইতি তো আছেই। মাশফি-তানিয়াকে দেখে মাহরীন বেশ কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলেন। তিনি মনে মনে ভেবে রেখেছিলেন, আর বুঝি দেখা হবে না মাশফির মুখটা।
সবাই আনন্দ, হৈ হুল্লোড়ে মেতে উঠল। মেঘালয় মাহরীনের সামনে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসল। তারপর, মাহরীনের হাত ধরে বলল,
— মা, চলো আজ সেই ছোট্টবেলার মত তোমার তিন ছেলেকে নিয়ে তুমি ঘুরতে বের হবে। তোমার তিন ছেলে আজ তোমার পছন্দমত জায়গায় ঘুরতে যাবে। সেই ছোট্টবেলার মত। তুমি যেখানে যাবে আমরা সেখানে যাব।
মাহরীন মেঘালয়ের মাথা হাত কেঁদে ফেললেন । কাঁদতে কাঁদতে বলছেন,
— আমার জীবনের কোনো এক পূন্যের ফল বোধহয় তুই। তুই না থাকলে আমি কবেই মরে যেতাম রে মেঘালয়।
উপস্থিত সবাই আনন্দঘন মূহুর্তে এমন বিষাদময় মূহুর্তের সাক্ষী হলো। মাশফি মাহরীনের পাশে বসল। মাহরীনের হাতটা ধরল। মাহরীন আগের থেকে বেশ শুকিয়ে গেছে। মাশফির বুকটা ধক করে উঠে। কাব্য দূর থেকে তাকিয়ে থাকে। বাবাকে ছাড়া মানিয়ে নিয়েছে নিজেদের। কিন্তু, মা’কে ছাড়া…
চলবে…
Share On:
TAGS: তাহমিনা আক্তার, মেঘের ওপারে আলো
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
মেঘের ওপারে আলো গল্পের সবগুলো পর্বের লিংক
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ৬
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ৩০
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ২৫
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ১৪
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ১৩
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ২২
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ১
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ১৭
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ১৮