মেঘেরওপারেআলো
পর্ব_১৭
Tahmina_Akhter
মেঘালয়কে আড্ডার আসরে আটকে রেখেছিল ওর চাচাতো ভাইয়েরা। কথাবার্তা শেষ না করে উঠে আসা সম্ভব নয় তার পক্ষে। নয়ত তাকে নিয়ে হাসাহাসি, টিজ করবে সময়ে অসময়ে।
শেষমেশ মাশফি এসে মেঘালয়কে উদ্ধার করল। কাব্য হাসতে হাসতে মেঘালয়কে “অল দ্যা বেস্ট” বলল। কাব্যের কথা শুনে উপস্থিত সবাই হাসতে শুরু করল। কারণ, এই বাক্যের মিনিং ছিল অসঙ্গতিপূর্ণ।
মেঘালয় যেতে যেতে সবাইকে উদ্দেশ্য বলল
“আমারও দিন আসবে, গাইজ। সেদিন আমার কথা শুনলে তোমরা আবার সুশীল সাজতে যেও না!”
কাব্য সোফার ওপরে থাকা ছোট একটা কুশন নিয়ে ছুঁড়ে মারল মেঘালয়ের দিকে। মেঘালয় সরে গেল। কুশন গিয়ে পরল মেঘালয়ের ফুপির বিড়ালের ওপর। বিড়াল লাফিয়ে উঠল। ব্যস মেঘালয়ের ফুপি এসে কাব্যকে ঝারি মেরে চলে গেল।
এতক্ষণ ধরে চেপে রাখা হাসি ফুপি চলে যাওয়ার পর বেরিয়ে এলো। হাসতে হাসতে সবাই একে অপরের গায়ে ঢুলে পরল।
মেঘালয় নিজের ঘরের সামনে এসে দেখল একঝাঁক নারীর উপস্থিতি। তানিয়া, ইতি, স্মিতা, ফারিয়াসহ আরও কয়েকজন যারা কিনা সম্পর্কে মেঘালয়ের চাচাতো ভাইয়ের বউ হয়। সবাই মিলে একজোট হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।তার দরজা আড়াল করে যেন, মেঘালয় রুমের ভেতরে ঢুকতে না পারে। মেঘালয় এমন জটলা দেখে থুতনির ওপর হাত রেখে অবুঝ হবার ভান করে বলল,
–ব্যাপার কি? আমাদের বংশের অর্ধেক নারী আমার ঘরের সামনে? কোন দাবী পূর্ণ করার জন্য সবাই একজোট হয়ে আন্দোলনে নেমেছেন?
মেঘালয়ের কথা শুনে সবাই মেকি রেগে যাবার ভান করল। ঘরের ভেতরে থাকা আলো তাদের কথোপকথন শুনতে পাচ্ছে। আলোর মনে হচ্ছে এই বুঝি মেঘালয় তাদের দাবিদাওয়া পূরণ করে ঘরে ঢুকবে।
— টাকা দিলে তবেই তারপর ঘরে যেতে পারবে মেঘালয়।
তানিয়া হেসে জবাব দিলো মেঘালয়কে। বাকিরা উৎসুক দৃষ্টিতে তাকালো মেঘালয়ের দিকে। মেঘালয় বুঝতে পারল তার ওপর আরও একটা ঝড় যাবে এখন। বুদ্ধি খাটিয়ে যদি এদের কাছ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়, তবে মন্দ হবে না বিষয়টা। মেঘালয় গা সাড়া ভাবে জবাবে বলল,
— যদি টাকা না দেই?
— ঘরের ভেতরে ঢুকতে দেব না।
তানিয়া সোজাসাপটা উত্তর দিলো। মেঘালয় বাদে বাকি সবাই তানিয়ার কথায় সায় জানালো। মেঘালয় এক হাত কোমড়ে রেখে অন্যহাত দিয়ে থুতনিতে হাত রেখে বলল,
— ওকে, তাহলে দাঁড়িয়ে থাকুন আপনারা। আমি যাই। নতুন বউ যদি তার স্বামীর খোঁজ করে তবে তাকে জানিয়ে দেবেন,একদল স্বার্থপর মহিলাদের জন্য নতুন বউয়ের ঘরে প্রবেশ করতে পারল না তার হতভাগা স্বামী।
কথাগুলো বলেই মেঘালয় সোজা সামনের দিকে হাঁটা শুরু করল। মেঘালয়ের এমন কান্ড দেখে সবাই হতবাক হয়ে যায়। পরক্ষণেই ইতি সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলল,
— আরে যাবে কোথায়? ফিরে আসবে কিছুক্ষণের মধ্যে। নতুন বউ ঘরে রেখে বাইরে থাকবে কতক্ষণ?
আধা ঘণ্টা অতিক্রম হলো কিন্তু মেঘালয় ফিরে এলো না। দশজনের গ্রুপে ধীরে ধীরে কমে এসে দাঁড়ালো চারজনের। যারা চলে গিয়েছে তারা ক্লান্ত হয়ে চলে গেছে মেঘালয়ের অপেক্ষা করতে করতে। স্মিতা একবার ভাবল, মেঘালয় ভইয়া কোথায় আছে গিয়ে দেখে আসবে। কিন্তু ইতি ধমক দেয়ায় আর যাওয়া হয়নি তার।
মাহরীন নিজের ঘর থেকে বের হয়েছিল । এমন সময় দেখল শেরওয়ানী পরনে মেঘালয় এদিকেই আসছে। ছেলেকে অসময়ে ঘরের বাইরে দেখে মাহরীন মেঘালয়ের দিকে এগিয়ে যায়। মেঘালয় তার মা’কে দেখে বলল,
— কি হয়েছে, মা? এত রাত হলো, এখনো ঘুমাওনি যে?
— আমার কথা বাদ দে। তুই এতরাতে ঘরের বাইরে কি করছিস?
— আমার কতগুলো লোভী ভাবি আর বোন আছে না। এগুলো আমাকে আমার ঘরে ঢুকতে দিচ্ছে না। আজ নাকি নিজের ঘরে ঢুকব তাদের ট্যাক্স দিয়ে।
শেষের কথাটি শুনে মাহরীন হেসে ফেললেন। মেঘালয়ের কাঁধের ওপর থাপ্পড় দিয়ে বললেন,
— আজকের দিনটাই তো। এরপর তোর কাছ থেকে কে টাকা নিতে চাইবে?
— টাকা তো আমি মোটেও দেব না। যতক্ষন দাঁড়িয়ে থাকতে মন চায় দাঁড়িয়ে থাকুক তারা।
— কত টাকা চেয়েছে?
— জিজ্ঞেস করিনি।
— চল আমার সঙ্গে। কিপ্টা ছেলে কোথাকার?
মাহরীনের কথা শুনে মেঘালয় দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
— আমার অবস্থা আজ কেমন হয়েছে জানো? উপরে ফিটফাট, ভেতরে সদরঘাট। হাজার টাকার শেরওয়ানি আমার গায়ে অথচ পকেট ফাঁকা। যার পকেট ফাঁকা তাকে নিয়ে নদীতে চুবিয়ে মারলেও তো টাকা পাওয়ার কথা না।
মাহরীন মেঘালয়ের কথা শুনে হাসতে হাসতে হাঁটা ধরল। মেঘালয় মাহরীনকে অনুসরন করে যেতে লাগল।
তানিয়া, ইতি, স্মিতা আর নিঝুম ভাবি ঘুমের তাড়নায় হাই তুলছিল। এমন সময় মাহরীনের উপস্থিতিতে তাদের চোখের ঘুম উবে গেল। মাহরীন চারজনের দিকে তাকিয়ে বলল,
— কত টাকা লাগবে তোমাদের ?
— মা, আপনি কেন টাকা দিবেন?
তানিয়া জিজ্ঞেস করল। বাকি তিনজন চোখ পাকিয়ে তাকালো মেঘালয়ের দিকে.
বাট হু কেয়ার’স। মেঘালয় মাহরীনের পাশে দাঁড়িয়ে রইল। যেন তার ব্যাপারে এখানে কোনো কথাই হচ্ছে না।
— কারণ যার কাছে টাকা চাইছো সে আজ রাজা বেশে থাকা ফকির। তার কাছে পকেট আছে, কিন্তু টাকা নেই। তোমাদের সারারাত দাঁড় করিয়ে রাখতে পারবে কিন্তু টাকা দিতে পারবে না।
মাহরীন কথাগুলো বলার সময় মেঘালয় অসহায় দৃষ্টিতে তাকালো তার ভাবি এবং বোনদের দিকে। যেন সে সত্যি সত্যি রাজার বেশে থাকা ফকির। তানিয়া, ইতি, স্মিতা আর নিঝুম মুখ ভেঙচি কাটল।
— তাই বলে আপনার কাছ থেকে টাকা নেব,মা ? অসম্ভব! এই যে মেঘালয়, ঘরের ভেতরে ঢোকার অনুমতি পেলে। কিন্তু…
বলতেও পারল না ইতি। মেঘালয় হাত উঁচু করে থামতে বলল। ইতি চুপ হয়ে যায়।
— আগামীকাল নেভালে নিয়ে যাব আপনাদের। খুশি?
— বহুত খুশী। যান এবার ভেতরে যান।
ওরা চারজন সরে দাঁড়ালো দরজার সামনে থেকে। মেঘালয় দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে পরল।
মেঘালয়ের ঘরের ভেতরে চলে যাওয়ার পর, ইতি এগিয়ে গিয়ে মাহরীনের হাত ধরে বলল,
—আপনি না এলে এই বান্দা আজ আমাদের সারারাত দাঁড় করিয়ে রাখত!
মাহরীন হেসে ফেলল। মেঘালয় যে ওদের জ্বালানোর জন্য এরকম করেছে বুঝতেই পারল মাত্র।
অবশেষে, মেঘালয়ের আগমনে আলোর অপেক্ষার অবসান ঘটে। মেঘালয় ঘরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে খাটের দিকে এগিয়ে যায়। আলো ঘোমটার ফাঁকে টের পেলো মেঘালয়ের উপস্থিতি। হাঁটুর ওপরে হাতদুটো আরও শক্ত করে চেপে ধরল। শরীর কাঁপছে ভয়ে। এক গ্লাস পানি খেতে পারলে মন্দ হতো না।
— আসসালামু আলাইকুম।
আলো সালামের জবাব দিলো মনে মনে। আলোর দিক থেকে মেঘালয় সাড়া না পেয়ে মুচকি হাসল। তারপর, খাটের পাশ থেকে সরে গিয়ে কার্বাডের দিকে এগিয়ে যায়। সাদা রঙের টিশার্ট আর কালো ট্রাউজার বের করে চলে গেল ওয়াশরুমে।
মেঘালয়ের সাড়াশব্দ না পেয়ে আলো ঘোমটা তুলে ঘরের চারপাশে তাকাল। ওয়াশরুম থেকে পানি পরার শব্দ ভেসে আসায় বুঝতে পারল মেঘালয় ওয়াশরুমে আছে।
গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আসছিল। আর টিকে থাকতে পারবে না বোধহয়। তাই বাধ্য হয়ে আলো খাট থেকে নেমে পরল। টি-টেবিলের ওপর রাখা পানির জগ থেকে গ্লাসে পানি ঢেলে সবেমাত্র চুমুক দিয়েছে ঠিক ওই সময় মেঘালয় ওয়াশরুমের দরজা খুলে বের হলো।
আলো মুখভর্তি পানি নিয়ে তাকালো মেঘালয়ের দিকে। মেঘালয় আলোর ফোলাফোলা গাল দেখে ভ্রু কুঁচকে তাকালো। পরক্ষনেই আলোর হাতের গ্লাস দেখে বুঝতে পারল ফোলা ফোলা গালের রহস্য। মনে মনে ফন্দি আঁটে আলোকে এবার একটু রাগিয়ে দেয়া যাক।
টাওয়াল দিয়ে ভেজা চুল মুছতে মুছতে আলোর সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। তারপর, আলোর ফোলা ফোলা গালদুটোতে ডানহাত দিয়ে দিলো চাপ। পুচ..চ করে আলোর মুখ থেকে পানি বেরিয়ে আসার আগে মেঘালয় খানিকটা সরে গেল।
আলো বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে রইল মেঘালয়ের দিকে। মেঘালয় তার হাতে থাকা টাওয়াল দিয়ে হাত বাড়িয়ে আলোর ঠোঁটের কোনে লেগে থাকা সামান্য পানি মুছে দিয়ে বলল,
— সালাম দিয়েছিলাম, উত্তর দাওনি কেন? মুখভর্তি পানি ছিল বুঝি?
আলো মেঘালয়ের সামনে দমে গেল আজ। জবাব দেয়ার ভাষা রইল না। ভেজা চুলগুলো কপালের সঙ্গে লেপ্টে থাকা মেঘালয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আলোর হৃদয়ে কিছু একটা ত্রুটি হলো। এই ত্রুটির নাম কি দেয়া যায়? যন্ত্রে ত্রুটি হলে বলে “যান্ত্রিক ত্রুটি”। হৃদয়ে ত্রুটি হলে কি বলে?
— আচ্ছা থাক। কথা বলতে হবে না আমার সঙ্গে। ভারি শাড়িটা বদলে ফেলো। আলমারীতে মনে হয় কয়েকটা সুতি শাড়ি রাখা আছে। সেখান থেকে একটা পরে নাও। এবং যত দ্রুত পারো ওযু করে এসো। নামাজ আদায় করতে হবে।
কথাগুলো বলার সময় আলোর সামনে থেকে সরে দাঁড়ায় মেঘালয়। আলো তার জায়গা থেকে কিঞ্চিত পরিমান নড়ল না। মেঘালয় আলোকে একইভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলল,
— দাঁড়িয়ে আছো, কেন?
— আলমারী থেকে আপনি নিজ হাতে শাড়ি নামিয়ে দিন।
নরম সুরে জবাব এলো আলোর পক্ষ থেকে। মেঘালয় টাওয়াল নিয়ে বারান্দার দড়ির ওপর মেলে রেখে আসল। এসেই আলমারী থেকে একটা ছাই রঙা সুতি শাড়ি বের করে এনে আলোর দিকে বাড়িয়ে দেয়। আলো শাড়ী হাতে নিয়ে বলল,
— আপনি একটু রুমের বাইরে যাবেন। বেশী না দশমিনিট সময় দিলেই চলবে।
মেঘালয় পাল্টা প্রশ্ন করল না। ঘর থেকে বের হয়ে যায়। আলো ওয়াশরুমে ঢুকে প্রথমে গোসল করল। তারপর, পরনের শাড়ি বালতিতে ভিজিয়ে রাখল। রুমে এসে শাড়িটা পরল। তারপর, আবারও ওয়াশরুমে গিয়ে ওযু সেড়ে আসল। পেন্ডুলামের শব্দে আলো সময়ের অনুমান করতে পারল। রাত বারোটা বাজছে তখন।
আলো খুব ভালো করে মাথার ওপর শাড়ির আঁচল টেনে রুমের দরজা খুলে উঁকি দিলো বাইরে। দেখল অদূরে দাঁড়িয়ে আছে মেঘালয়। দেয়ালের সঙ্গে হেলান দিয়ে মোবাইল ফোনে কি যেন করছে?
আলো মেঘালয়কে ডাক দিতে গিয়েও থেমে যায়। কিভাবে ডাকবে? নাম ধরে? আরে না এটা করা যাবে না। তার নানী বলেছে স্বামীর নাম মুখে উচ্চারণ করা ভালো না। নাম ধরে না ডাকলে, তবে কি নামে ডাকবে?
হুট করে আলো “এই যে শুনছেন” বলে ডেকে উঠল। মেঘালয় অবাক হয়ে মাথা উঁচু করল। দেখল আলো তার ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে আছে মাথা নীচু করে।
মেঘালয়ের কেন যেন হাসি পাচ্ছে আলোর মুখ থেকে “এই যে শুনছেন” বাক্যটি শুনে। বন্ধুদের পঁচাতো সে। আর আজ কিনা তার বউ তাকে “এই যে শুনছেন” বলে সম্বোধন করছে!
মেঘালয় মোবাইল ফোন পকেটে ঢুকিয়ে হাঁটা ধরল। রুমের দরজার সামনে আসতেই আলো সরে দাঁড়ালো। মেঘালয় ঘর ঢুকে দরজা লক করে দিলো। আলোর বুকের ভেতরে ধুকপুক শুরু হয়ে গেছে। একা ঘরে এই মানুষটা সঙ্গে? হায়! হায়!
অবশেষে মেঘালয়ের ইমামতিতে আলো দুই রাকা’ত শোকরানা নামাজ আদায় করল। নামাজ আদায় করার পর জায়নামাজ ভাজ করে রাখল মেঘালয়।
আলো এখন কি করবে ভেবে খাটের কিনারায় বসে রইল। আঠারো বছরের মধ্যে স্বল্প সময়ের জন্য কোনো ছেলের সঙ্গে আলোর কথা হয়নি কখনো। অথচ, মেঘালয় নামক মানুষটা তার জীবনে আসার নিয়ম মেনে চলা জীবনটা হঠাৎ অনিয়মের মধ্য দিয়ে চলতে লাগল। যার হাত ধরে অনিয়মের শুরু, আজ তার ঘরে বসে আছে ; তারই স্ত্রী হয়ে।
মেঘালয় জায়নামাজ রেখে এসে আলোর পাশে বসলো। আলো তখন ভাবনার জগতে বিচরণ করছিল। হুট করে নিজের পাশে কারো অস্তিত্ব টের পেয়ে আলো বাস্তবে ফিরে আসে। ঘাড় ফিরিয়ে তাকাতে দেখতে পেলো মেঘালয় তার পাশে এসে বসেছে। মাত্র একহাত দূরত্ব তাদের মাঝে। আলো মেঘালয়ের কাছ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে মাথা নিচু করে ফেলল।
মেঘালয় আলোর অবিনস্ত মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা দেখছে। আজ কেন জানি চিন্তা করতে বাধ্য হলে,
” কখনো কি ভেবেছিল সে মিথ্যাবতী মেয়েটা তার বউ হবে? প্রথম দেখায় যে মেয়ে তাকে মিথ্যা বলতে পারে সে মেয়েকেই বিয়ে করতে হবে। এরকম কল্পনা সে কখনোই করেনি।”
আলো ভীষণ নার্ভাস ফিল করছিল। হাতের ভেতরে পেঁচিয়ে রাখা শাড়ির আঁচল টাকে শক্ত করে ধরে রেখেছে।
মেঘালয় সেই দৃশ্য দেখে আলোকে উদ্দেশ্য করে আদুরে সুরে বলল,
—- আজ ভয় পাচ্ছো আমাকে? অথচ, তুমি একদিন আমার সামনে দাঁড়িয়ে অনর্গল মিথ্যে বলেছিলে! সেদিনও তো ভয় পাওনি।
মেঘালয়ের মুখ থেকে এমন প্রশ্ন শুনে আলো মাথা নাড়িয়ে বলল,
–আমি ভয় পাচ্ছি না। আর সেদিন একটা কারণে মিথ্যা বলেছিলাম।
মাথা নীচু করে জবাব দিলো আলো। আলোর কথা শুনে মেঘালয়ের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠলো।
— যদি আমাকে ভয় না পাও, তাহলে মাথা নিচু করে রেখেছো, কেন? মাথা উঁচু করে আমার চোখের দিকে তাকাও । সামনের মানুষটার সঙ্গে যখন আমি কথা বলি, তার দৃষ্টি যদি আমার দিকে না থাকে। তাহলে আমার ফোকাস ধরে রাখতে অনেক সমস্যা হয়।
আলো না চাইতেও একবার মেঘালয়ের দিকে মুখ তুলে তাকালো। পরক্ষণেই মাথা নিচু করে ফেলল। মেঘালয় আর জোর করল না। তবে কিছু কথা ছিল আলোর সঙ্গে। সেগুলো আজই বলার দরকার।
— দেনমোহরের টাকাগুলো এখনো পরিশোধ করা হয়নি। তুমি তোমাদের বাড়িতে গেলে তোমার এনআইডি আর পাসপোর্ট সাইজ ছবি নিয়ে এসো যদি থাকে। তোমার নামে ব্যাংক একাউন্ট অপেন করে , তোমার একাউন্টে আমি টাকাগুলো ট্রান্সফার করে দেবো।
আলো মনোযোগ দিয়ে মেঘালয়ের কথাগুলো শুনল। মেঘালয় কথাগুলো শেষ করে উঠে চলে যাচ্ছিল।
— শুনুন?
আলোর ডাক শুনে মেঘালয় আবারও আগের জায়গায় গিয়ে বসল।
— কিছু বলবে?
— দেনমোহরের টাকা আমি চাই না। আমার লেখাপড়ার খরচ আপনি চালাবেন। আমি ডাক্তার হাতে চাই।
আলোর কথা শুনে মেঘালয় জবাব দেয়,
— যত টাকা লাগে আমি খরচ করব। কিন্তু তোমার দেনমোহর তো তোমার হক। সেই টাকা থেকে এক টাকাও আমি খরচ করব না।
— আমি দেনমোহরের হিসেব বুঝি না। শুধু আপনার কাছে আমার এতটুকুই চাওয়া। আমার স্বপ্নপূরণের জন্য আপনার সাহায্য চাই।
অষ্টাদশী আলোর কথা শুনে মেঘালয় খানিকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর, আলোকে বলল,
— অবশ্যই সাহায্য করব। ডাক্তার স্বামীর ডাক্তার বউ হলে ব্যাপারটা দারুন জমবে।
আলো মাথা নীচু করে হেসে ফেলল। এই প্রথম আলোর হাসি দেখতে পেলো মেঘালয়। আলোর মুখের দিকে কিছু সময় তাকিয়ে রইল মেঘালয়। তারপর উঠে গিয়ে লাইট অফ করে দিলো।
পুরো ঘরটাকে এবার অন্ধকার গ্রাস করল। আকাশের বুকে দখল করে থাকা চাঁদের আলো প্রবেশ করল ঘরের পশ্চিম কোনে। উত্তরের হাওয়ায় দুলে উঠল জানালার পর্দা৷
বিছানার কিনারায় বসে থাকা আলোর হাত ধরে মেঘালয় কাছে টানল। চুড়ির রিনঝিন শব্দে মুহূর্তের মধ্যে ঘরের মধ্যে বিরাজ করা সকল নীরবতা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। মেঘালয়ের প্রশ্বস্ত বুকে ছোট আলো মিশে যায়৷ মেঘালয় টের পেলো আলোর দেহের কাঁপুনি। শক্ত করে বুকের মাঝে চেপে ধরে ফিসফিস করে বলল,
— আজ থেকে আমার এই বুকের একমাত্র দখলদারিত্ব তোমাকে দিলাম।
চলবে….
Share On:
TAGS: তাহমিনা আক্তার, মেঘের ওপারে আলো
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
মেঘের ওপারে আলো গল্পের সবগুলো পর্বের লিংক
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ৪
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব (৮+৯+১০)
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ৩১
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ১১
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ২১
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ৭
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ২৮
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ১৮
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ১৯