মেঘের ওপারে আলো
পর্ব১৫এবং_১৬
Tahmina_Akhter
অফ–হোয়াইট শেরোয়ানী আর পাগড়ি পরনে মেঘালয়কে দেখে মাহরীন থমকে গেলেন। মনে হচ্ছে এই তো সেদিন মেঘালয় তার কোল জুড়ে এসেছিল। আর আজ সেই মেঘালয়ের বিয়ে। মাহরীন আজ মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল মেঘালয়ের মুখপানে।
শেরোয়ানীর সোনালি কারুকাজে রাজকীয় আভা, পাগড়ির পাশে ঝুলছে মুক্তার গুচ্ছ। গমরঙা ত্বক, ঘন ভ্রু যুগল আর অভ্র নয়ন জোড়া, চকলেট রঙা অধরের কোনে যখন হাসির রেখা ফুটে উঠে তখন মনে হয় আশপাশের সময় থমকে যায়।
মেঘালয়কে আপাদমস্তক বর সাজিয়ে মাহরীনের সামনে এনে দাঁড় করালো কাব্য। মাহরীন মেঘালয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। হুট করে মাহরীনের চোখ থেকে জল গড়িয়ে পরতে শুরু করে। মেঘালয় আর কাব্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে মাহরীনের হাত ধরে জিজ্ঞেস করে,
— কি হয়েছে,মা ? শরীর খারাপ লাগছে?
— আমার মেঘালয়কে আজ রুপকথার দেশের রাজপুত্রের মত দেখাচ্ছে। রাজপুত্রের মায়ের চোখ থেকে আজ আনন্দ অশ্রু ঝরছে।
কথাটি বলতে বলতেই মাহরীন চোখের পানি মুছে খাটের ওপর থেকে ফিরনির বাটি হাতে নিয়ে এক চামচ ফিরনি তুলে মেঘালয়ের মুখের সামনে ধরল। মেঘালয় ফিরনি খেলো সামান্য।
— মা, আমার বিয়ে হয়ে গেছে তাতে কি? আমাকে খাইয়ে দাও না ফিরনি?
কাব্যের কথা শুনে মাহরীন মুচকি হেসে কাব্যকে খাইয়ে দেয়।
এবার বরযাত্রীরা রওনা হবে। মাশফি-তানিয়া, কাব্য-ইতি, মাহরীন এবং মেঘালয় বাড়ি থেকে বের হয়ে এলো। তাদের বাড়ির গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
গেটের সামনে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে আছে রাজকীয় সাজে ফুলের আবরনে তৈরি ঘোড়ার গাড়ি৷ লাল-গোলাপের সমারোহ। মাশফি মেঘালয়ের কাঁধে হাত রেখে বলল,
— আমাদের পুরো চৌদ্দগুষ্টিতে কেউ ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে বিয়ে করতে যায়নি। তুই রেকর্ড ভেঙে দিলি, মেঘালয়। তোর বিয়ে পুরো রাজকীয় স্টাইলে করিয়ে ফেলল আমাদের মা।
মেঘালয় মাহরীনের দিকে তাকিয়ে বলল,
— অবশেষে তোমার স্বপ্ন, তোমার শখ পূরণ হতে যাচ্ছে মা। তোমার মেঘালয় ঘোড়ায় চড়ে বউ আনতে যাচ্ছে আজ।
অবশেষে, বরযাত্রী রওনা হলো।
একটা ঘোড়ার গাড়ি, দশটা বাইক এবং চারটা কার নিয়ে রওনা হলো সবাই। আশেপাশের সবাই এমন রাজকীয়ভাবে বরযাত্রীদের কনে আনতে যেতে দেখে অবাক হলো বেশ।
ঘোড়ার গাড়ি Hall 24 Convention Center–এর দিকে এগোতে লাগলো। গাড়ির সাথে একে একে দশটা বাইক, এবং চারটা চকচকে কার ধীরে ধীরে এসে দাঁড়ালো হলের প্রবেশদ্বারের পাশে।
কনে পক্ষের কিছু বাচ্চা ছেলে-মেয়ে মিলে “বর এসেছে” “বর এসেছে” বলে আনন্দে চিৎকার করতে শুরু করল। হলের ভেতরে থেকে প্রায় দশ বারোজন ছেলে মেয়ে বের হয়ে আসে ফুলের পাপড়ির থালা নিয়ে।
বরযাত্রীদের এবার ফুলের পাপড়ির বর্ষণে বরণ করা হলো।
সিতারা বেগম এগিয়ে এসে মাহরীনের গলায় ফুলের মালা পরিয়ে দিলেন।
মেঘালয়ের মা সহ বাকি সবাই একে একে চলে যায় হলের ভেতরে। বাকি রয়ে যায় মাশফি-তানিয়া,কাব্য-ইতি, মেঘালয় এবং তার নিকট বন্ধু এবং কাজিনরা।
পাঁচ হাজার টাকা নগদ দিয়ে তারপর গেটের ফিতা কেটে ভেতরে যাবার অনুমতি পেলো মেঘালয় এবং বাকিরা। বেশ আনন্দ করছে সবাই। কিন্তু মাশফির সঙ্গে তানিয়ার নীরব ঝগড়া বেঁধে গেছে। মাশফি নাকি কোন মেয়েকে “সুন্দরী বেয়াইন ” বলে সম্বোধন করেছে। তানিয়া রেগেমেগে মাশফিকে বলল,
— থাকো তোমার সুন্দরী বেয়াইন নিয়ে।
— আরে আমি তো এমনি বলেছি, যাতে তার একটুখানি প্রশংসা শুনে আমাদের তাড়াতাড়ি ভেতরে যেতে দেয়৷
মাশফি পরল বিপদে, বউ রেগে গেছে। এবার রাগ ভঙাবে কেমনে? বাড়িতে পৌঁছে বউয়ের রাগ ভাঙানো যাবে। এখন এদিকটা সামলে নিক আগে।
মেঘালয়কে নিয়ে কাব্য এবং মাশফি স্টেজে বসল। আলো এখন আসেনি শুনে মেঘালয় মোবাইল ফোন বের করে কল করল স্মিতার নাম্বারে।
স্মিতা তখন তার পার্লারে। আলোর চুলের সঙ্গে ওড়নায় ক্লিপ লাগিয়ে দিচ্ছিল। এমনসময় মেঘালয়ের কল এসেছে দেখে স্মিতার মাথায় দুষ্ট বুদ্ধি চেপে বসে। আলোর মুখের ওপর ওড়না টেনে দিয়ে মুখ ঢেকে দিলো। আলো কিছু বলতে চাইলে স্মিতা হাতের ইশারায় বলল,
— আরে দেখো না, ভাবি। কি হয়?
স্মিতা কল রিসিভ করে ব্যাক ক্যামেরা অন করে আলোর সামনে ধরল। মেঘালয় দেখল তার কিনে দেয়া লাল বেনারসি জড়িয়ে আছে আলোর সরিয়ে ৷ কিন্তু মুখের ওপর এভাবে শাড়ির আঁচল টেনে রেখেছে কেন?
— ঘোমটার আড়ালে কাকে দেখা যায় গো, মেঘালয় ভাইয়া?
স্মিতার ঢংয়ের সুরে বলা কথা শুনে মুচকি হেসে বলল,
— ঘোমটার আড়ালে মিসেস.মেঘালয়কে দেখা যায়।
মেঘালয়ের কন্ঠস্বর শুনে আলো অবাক হয়ে ঘোমটা সরিয়ে দেখতে চাইলে। স্মিতা হাত দিয়ে আলোকে বাঁধা দিয়ে ঠোঁট চেপে হাসি আঁটকে রেখে বলল,
— আরে এখনই দেখা দিও না। তোমাকে এত কষ্ট করে সাজালাম, সেই টাকাটা মেঘালয় ভাই থেকে নিয়ে নেই আগে। তারপর, তোমার যত ইচ্ছা দেখা দিও, সমস্যা নেই।
মোবাইলের ওপাশে থাকা মেঘালয় স্মিতার কথা শুনে বলল,
— তুই আগে তাড়াতাড়ি আলোকে নিয়ে আয়। এতক্ষণ লাগে সাজাতে? কি সাজিয়েছিস এতক্ষণ সময় ধরে?
–আর যেই সাজ সাজিয়েছি না, তুমি তোমার বউকে দেখলে মাথা ঘুরে পড়ে যাবা, ডাক্তার সাহেব।
স্মিতা হাসতে হাসতে কথাগুলো বলে কল কেটে দিল। তারপর আলোর মুখ থেকে ওড়নাটা সরিয়ে ঠিকঠাক করে আটকে দিলো চুলের সঙ্গে। এবার আলোর পুরো কনের সাজ কমপ্লিট। স্মিতা আলোর হাত ধরে টেনে নিয়ে আয়নার সামনে দাঁড় করালো।
— ভাবি দেখো?
আলো মাথা উঁচু করে তাকালো। আয়নায় ফুটে ওঠা নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে রইল পলকহীন চোখে।
লাল বেনারসি, লাল ওড়না, মাথায় টিকলি, নাকফুল, কানের দুল। হাতভর্তি চুড়ি, গলার হার। খোঁপায় বেঁধে রাখা চুলে বেলিফুলে তাকে নববধূর রুপ দান করেছে।
— তোমাকে একদম ন্যাচারল লুক দিয়েছি তাও আবার তোমার স্বামীর এডভাইস অনুযায়ী। আমার ভাইটা এত রুচিশীল কেন?
স্মিতার শেষের কথাটি শুনে আলোর মনে হলো স্মিতা তাকে খোঁচা মেরে কথাটি বলেছে। আলোর মলিন মুখখানা দেখে স্মিতা আলোর হাত ধরে টেনে তার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে বলল,
— আমি তোমাকে প্রথম যেদিন দেখলাম সেদিন সত্যি সত্যি তোমার গায়ের নিয়ে একটু কনসার্ন ছিলাম। কারণ, মেঘালয় ভাইয়ের সঙ্গে তোমার গায়ের রঙ ম্যাচ করেনি। কিন্তু, তোমাকে আমার নিজ হাতে হলুদের সাজ দেয়ার পর বিশ্বাস করো, আমি চোখ ফেরাতে পারিনি তোমার মুখ থেকে। তুমি কালো কিংবা শ্যামা হতেই পারো। কিন্তু, তোমার চেহারায় এত মায়া আর এত নিখুঁত তোমার চেহারায় গঠন! ও মাই গড! আমার ভাইয়ের সত্যি রুচি আছে, মানতে হবে।
আলো তাকিয়ে রইল স্মিতা নামের অতি সুন্দরী মেয়েটার দিকে। মেয়েটা আলোর প্রশংসা করছে! ভাবতেই অবাক লাগছে। আসলেই কি আলোকে সুন্দর দেখাচ্ছে? নাকি তার জন্য স্মিতার মনে ভালোবাসা জন্মেছে?
কারণ একমাত্র ভালোবাসা নামক অনুভূতির কারণে মানুষ হিংস্র, কুৎসিত পশুকে মায়া করতে পারে। সেখানে কালো মানুষকে ভালোবাসতে পারবে না কেন?
অবশেষে আলোকে স্মিতা কনভেনশন সেন্টারে চলে এলো। বাচ্চারা হৈ হুল্লোড় শুরু করল আলো এসেছে। সবার দৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দু এখন আলো। আলো যখন গেট দিয়ে ঢুকছিল, হলের ভিতরে। তখন আফসার সাহেব এগিয়ে এসে আলোর হাত ধরল। আলো, তার বাবার দিকে মুখ তুলে একবার তাকায়। আলো দেখল তার বাবার চোখের কোল ভেজা। হুট করে আলোর চোখ ভিজে আসতে শুরু করে। স্মিতা এই দৃশ্য দেখে আলোকে বারণ করল কান্না করতে ।
স্টেজের সামনে গিয়ে আফসার সাহেব আলোর হাত ছেড়ে দিলেন। আলো তার বাবার দিকে তাকালো অসহায়ের মত। যেন এই বিচ্ছেদ সে সহ্য করতে পারছে না। আফসার সাহেব সামনের দিকে তাকাতে ইশারা করল আলোকে ।
আলো সামনে তাকাতেই দেখতে পেল সাদা শেরওয়ানি, পাগড়ি পরনে মেঘালয়কে। আলো চোখ নামিয়ে ফেলল। মানুষটাকে দেখে হুট করে আলোর বুক ধুকপুক শুরু করতে শুরু করল। এই মানুষ যে তার ব্যক্তিগত মানুষ এবং এই মানুষটা যে আজ থেকে তার অধার্ঙ্গ। ব্যাপারটা মানতেই পারছে না আলো। মনে হচ্ছে সব মিথ্যা। স্বপ্ন জগতে তার বিচরণ শেষ হলে বাস্তবে এসে দেখবে মেঘালয় নামের কোনো মানুষ তার জীবনে কোনোদিন ছিলও না থাকবেও না।
অন্যমনস্ক হয়ে মেঘালয়ের হাতের উপর হাত রাখল আলো। মেঘালয় শক্ত করে আলোর হাত আঁকড়ে ধরে। তারপর, ধীরে ধীরে আলোকে টেনে তোলে স্টেজে।
একে একে দুই পক্ষের আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব সবাই এসে মেঘালয় এবং আলোর সঙ্গে ছবি তুলতে শুরু করেছে।
এত ভিড়ভাট্টার মাঝেও মেঘালয় আলোকে দেখতে ভুলল না। তার নামে বউ সেজে থাকা মেয়েটাকে দেখতেই কেন জানি আজ নিজের মানুষ বলে মনে হচ্ছে মেঘালয়ের !
— এহেম?এহেম?
গলা ঝেড়ে দুটো কাশি দিলো মেঘালয়। আলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা মাত্র। অবশ্য দ্বিতীয়বার আলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে মেঘালয়।
আলো মেঘালয়ের দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকালো। মেঘালয় হুট করে তার বুকের বা পাশে হাত রেখে বলল,
—বহুদিন পর তোমার চোখে আমার জন্য বিরক্তি দেখতে পেলাম, মিসেস মিথ্যাবতী।একটা প্রশ্ন মনে কুটকুট করে আমার! আমার দিকেই কেন এত বিরক্তি নিয়ে তাকাও, তুমি ?
মেঘালয় এহেন প্রশ্নের কোনে উত্তর নেই আলোর কাছে। মেঘালয়কে দেখে সে কখন বিরক্তির চোখে তাকায়?
— ভাবি, ওয়ান্স মোর। আরেকবার ভাইয়ার দিকে ওভাবে ভ্রু কুঁচকে তাকান । কি যে সুন্দর লাগছিল আপনাদের! এমন একটা মোমেন্ট ক্যাপচার করলে মন্দ হয় না।
ফটোগ্রাফারের কথা শুনে মেঘালয় এবং আলো দুজনেই চমকে তাকালো। আশেপাশের কাজিন মহলের অনেকেই ফটোগ্রাফারের কথা শুনে হাসিতে ফেটে পড়লো।
ফটোসেশানের পরে মেঘালয় এবং আলোকে চোখ বন্ধ রাখতে বলল তানিয়া এবং ইতি সহ আরও আরও কয়েকজন। মেঘালয় এবং আলোকে পাশাপাশি বসিয়ে একটা বড় ওড়না দিয়ে তাদের দুজনকে ঢেকে দিলো ইতি।
ওড়নার ভেতরে বড় একটা আয়না রেখে মাশফির বউ তানিয়া বলল,
— মেঘালয় আয়নায় কাকে দেখা যায়?
মেঘালয় চোখ খুলে আয়নায় তাকালো। আয়নায় আলোর মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
— মেঘের পাশে আলোকে দেখা যায়।
মেঘালয়ের উত্তর শুনে তানিয়া এবং ইতিসহ সবাই একযোগে হেসে উঠল। মেঘালয় আয়নায় তাকিয়ে অপেক্ষা করছিল এই বুঝি আলো চোখ মেলে তাকাবে তার দিকে। আলো চোখ বন্ধ করে রাখল। মেঘালয় আশাহত হলো না। অপেক্ষা করছিল কখন আলো চোখ খুলে তাকাবে তার দিকে।
ইতি এবার আলোকে জিজ্ঞেস করল,
— আয়নায় কাকে দেখা যায়, আলো?
— আলোকে আড়াল করে ফেলা মেঘকে দেখা যায়।
আলো কথাটি বলে চোখ খুলে তাকালো। আয়নায় চোখ রাখতেই দেখতে পেলো মেঘালয় তার দিকে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে আছে। আলো এবার মুখ ফিরিয়ে অন্য দিকে তাকালো। কারণ, একই ওড়নার তলে এই মানুষটার উপস্থিতি তাকে স্বাভাবিক থাকতে দিচ্ছে না। মনে হচ্ছে যেন, কেউ হৃদয় থেকে বারবার উসকানি দিচ্ছে, মেঘালয়ের প্রেমে পরতে। কিন্তু, এই মানুষটার প্রেমে পরা যে বারণ।
এদিকে ওদের দুজনের জবাব শুনে সবাই হাসতে হাসতে বলাবলি করছে,
“এমন কাব্যিক জবাব প্রথমবার শুনলাম বর-কনের মুখ থেকে!”
মেঘেরওপারেআলো
পর্ব_১৬
Tahmina_Akhter
কনে বিদায়ের সময় হয়ে গেছে। বেশিরভাগ বরযাত্রীদের মধ্যে অনেকেই আগেই রওনা হয়ে গেছে। মেঘালয়ের হাত ধরে আফসার সাহেব ঝরঝরিয়ে কেঁদে ফেললেন। আলো তার বাবার চোখের পানি দেখে কেঁদে ফেলল নীরবে। মেঘালয় আলোর কান্না দেখে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। মেঘালয় আফসার সাহেবের হাত ওপর হাত রেখে আস্বস্ত করে বলল,
— আলোকে সর্বোচ্চ ভালো রাখার চেষ্টা করব। কারণ, সে এখন আমার স্ত্রী।
আলো ওর বাবার সামনে এগিয়ে এসে বলতে পারল না, “বাবা আমি চলে যাচ্ছি।
আজ আমাকে যেভাবে বিদায় দিলে। ঠিক সেভাবে আর কখনোই আমি তোমার বাড়ির চৌকাঠে পা রাখতে পারব না । জন্মসুত্রে পাওয়া ঠিকানা আজ আমার নাই হয়ে গেছে জীবন থেকে।”
সিতারা বেগমসহ সবার কাছ থেকে বিদায় নিলো আলো। আলোর কান্নার শব্দ নেই অথচ অনবরত গড়িয়ে পরা চোখের পানি দেখে মেঘালয় দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
মেঘালয়ের দীর্ঘশ্বাস ফেলার দৃশ্যটুকু দেখে কাব্য মেঘালয়ের কানের কাছে মুখ বাড়িয়ে বলল,
— মেঘালয় তোর বউটা বেশি কান্নাকাটি করছে দেখে মায়া লাগছে তোর ? আহারে, কি দরকার মেয়েটাকে নিয়ে যাওয়ার? রেখে যাবি?
— লক্ষ টাকা খরচ করে বিয়ে করেছি বউক রেখে যাওয়ার জন্য।
মেঘালয় বিরক্তিকর সুরে কথাটি বলতেই কাব্য তার কনুই দিয়ে মেঘালয়ের পেটে গুঁতো দিয়ে বলল,
— তাহলে ওমন ফোসফাস করে শ্বাস ফেললি কেন? মেয়েরা বিদায় সময় একটুআধটু কাঁদবে। তুই এমন সেন্টি খাচ্ছিস কেন?
— কারণ, আমার বউ কাঁদছে। আমার অর্ধাঙ্গিনী কাঁদছে আর আমি দাঁত বের করে হাসব! তুমি কি এমন কিছু আমার কাছ থেকে এক্সপেক্ট করছো, ভাই!
মেঘালয়ের উত্তর শুনে কাব্য নিজের কপালে চাপড় দিয়ে বলল,
— না ভাই। তুই বউ পাগলা। তোর বউ কাঁদতেছে তুইও তোর বউকে কোম্পানি দে। একসঙ্গে গলা ধরে কান্না কর দুজনে মিলে।
কাব্যের কথা শুনে মেঘালয় ইতির দিকে তাকিয়ে বলল,
— ভাবি, একটা সিক্রেট বলি?
ব্যস, কাব্যের হাসি ফুস হয়ে গেল। কারণ মেঘালয় এবার মৌচাকে ঢিল ছুঁড়েছে। ইতি বেশ আগ্রহ নিয়ে মেঘালয়কে বলল,
— হ্যা ভাই, বলুন?
— আপনাদের যখন বিয়ে হলো না, আপনি যখন বিদায়ের সময় কাঁদছিলেন। তখন কাব্য ভাই আপনাকে ব্যঙ্গ করে কাঁদছিল। আমার কথা আপনার বিশ্বাস না হলেও অসুবিধা নেই। আমার কাছে প্রমাণ হিসেবে ছবি আছে। দেখবেন আপনি?
ব্যস, এতটুকু যথেষ্ট ছিল। ইতি চোখ বড় বড় করে তাকালো কাব্যের দিকে। কাব্য এবার মেঘালয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
— তুই না আমার ভাই! তুই এটা কি করলি?
— যা সত্য তাই বলেছি। ভাবি আমি বাসায় ফিরে আপনাকে ছবিগুলো দেখাব৷
কাব্য এগিয়ে যায় ইতির কাছে। কিন্তু ইতি কাব্যর কাছ থেকে সরে গিয়ে মাহরীনের পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। কাব্য রাগে দুঃখে পারছে না নিজের চুল ছিঁড়ে কাঁদতে।
ওয়েডিং হল থেকে বের হতেই চোখে পরল ফুলে সজ্জিত ঘোড়ার গাড়ির ওপর। আফসার সাহেব, সিতারা বেগম এবং আলো অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। আশপাশে সব কিছু আজ রুপকথার মত মনে হচ্ছে। মাহরীন এগিয়ে এসে আলোকে একপাশে জড়িয়ে ধরে বলল,
— আমার শখ ছিল মেঘালয় ঘোড়ায় চড়ে বিয়ে করে বউ আনবে আমার জন্য। আজ আমার শখ পূরন হলো আলো। দেখো মেঘালয় তোমার জন্য অপেক্ষা করছে।
মাহরীনের দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকালো আলো। দেখল মেঘালয় সত্যি সত্যি দাঁড়িয়ে আছে ঘোড়ার গাড়ির ওপর। আলো মেঘালয়ের দিকে তাকাতেই মেঘালয় হাত বাড়িয়ে দিলো। আলো এক হাতে শাড়ি উঁচু করে অন্য হাত বাড়িয়ে দিলো।
ব্যস মূহুর্তের মধ্যে পুরো আকাশ জুড়ে আতশবাজি ফোটানোর শব্দ ছড়িয়ে গেল। মাহরীন হাসতে হাসতে দেখল তার ছোট ছেলের স্বপ্নের বিয়ের আয়োজন। কাব্য এগিয়ে এসে মাহরীনের পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
— এবার আমাদের ফিরতে হবে, মা।
আলোকে বরণ করে ঘরে তোলা হলো। কাব্যের বিয়ের সময় এই বাড়িটা যেভাবে সাজানো হয়েছিল তারচেয়ে দ্বিগুণ সাজে সজ্জিত হয়েছে আজ। পুরো বাড়ি ঝাড়বাতির আলোতে উজ্জ্বল হয়ে আছে।
আলোকে ড্রইংরুমে বসানো হয়েছে। আশেপাশের ফ্ল্যাটের অনেকেই নতুন বউকে দেখতে এসেছে। বউ দেখে মোটামুটি অনেকেই অসন্তুষ্ট। কিন্তু, অনেকেই আবার প্রশংসায় পঞ্চমুখ।
তানিয়া, ইতি সহ মেঘালয়ের কাজিনগ্রুপ হাসিঠাট্টায় মাতোয়ারা। আলো মাথা নীচু করে তাদের কথা শুনছিল। তারপর, ধীরে ধীরে প্রতিবেশীদের ভিড় কমতে শুরু করল। মাহরীন তানিয়া এবং ইতিকে আদেশ করল আলোকে মেঘালয়ের ঘরে রেখে আসতে। শ্বাশুড়ির আদেশ শুনে দুই জা মিলে আলোকে মেঘালয়ের ঘরের দিকে নিয়ে চলল।
যেতে যেতেই তানিয়া আর ইতি আলোকে অনেক কিছু সম্পর্কে বোঝালো। আলো সবটা শোনার পর ইতিকে বলল,
— বিয়ে অনেক কঠিন একটা ব্যাপার, ভাবি৷ আমি এতদিন ভাবতাম অনেক সহজ একটা ব্যাপার।
আলোর কথা শুনে তানিয়া এবং ইতি দুজনেই হেসে ফেলল। দু’জনের তাদের বিয়ের প্রথম দিনগুলোর কথা মনে পরে গেল।
মেঘালয়ের রুমের সামনে এসে তানিয়া এবং ইতি দাঁড়িয়ে গেল। ইতি আলোর হাত ধরে বলল,
—সঠিক জীবনসঙ্গী পেলে এসব ভয় আর মনে থাকবে না আলো। আমিও আগে বিয়ে নামক শব্দটা শুনলে ভয় পেতাম। কাব্যর সঙ্গে যখন আমার বিয়ে হলো। মানুষটার যত্ন, ভালোবাসা। আমার শ্বাশুড়ির কাছ থেকে আদর পেয়ে আমার মনের সকল ভয় কেটে গেল। বিয়ের মত একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারকে গেইমের মত করে ভাবলে তুমি জিততে পারবে। কারণ, জীবনের প্রতিটা ধাপ রোমাঞ্চকর, প্রতিটা মূহুর্ত অনিশ্চয়তার। তবুও, মানুষ কদম ফেলে এগিয়ে যায়। ভয়কে জয় করতে পারলে তুমি বিজয়ী হবে।
ইতির আলোর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
— তোমাকে কখনো শাসন করব। কখনো ছোটবোনের মত স্নেহ করব। মন খারাপ করবে না, কিন্তু?
মেঘালয়ের ফুলে সজ্জিত ঘরটায় আজ আলোর পর্দাপন হলো। লাল গোলাপ আর রজনীগন্ধা দিয়ে সাজানো খাটের ওপর আলোকে বসিয়ে রেখে বের হয়ে গেল তানিয়া আর ইতি।
চলবে….
Share On:
TAGS: তাহমিনা আক্তার, মেঘের উপরে আলো
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ১৯
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ২০
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ৩১
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ৫
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ২৩
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ৬
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব (৮+৯+১০)
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ১৮
-
মেঘের ওপারে আলো গল্পের সবগুলো পর্বের লিংক
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ১৪