মেঘেরওপারেআলো
সূচনা পর্ব
—- আমার একটা স্ত’ন নেই হাসিব সাহেব। আমাকে বিয়ে করে ঠকে যাবেন আপনি। বেশ কয়েকবছর আগে টিউমার হয়েছিলো। টিউমারের গ্রোথ নাকি ভালো ছিল না। ক্যান্সারের আশংকা ছিল বোধহয়! তাই ডাক্তার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন স্ত’ন কেটে বাদ দিতে হবে। নয়ত শরীরের বাকি অংশে ছড়িয়ে পরার শঙ্কা ছিল। তারপর কেটে বাদ দিলো। আপনাকে বিয়ে করার পর হয়ত আপনার বাচ্চাকে আমি স্ত’নপান করাতে পারব না।
আমার কথা শুনে হাসিব সাহেব যেন চোখের পলক ফেলতে ভুলে গেলেন। আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাকি কথাগুলো বলে ফেললাম,
—- তার ওপর আমি দেখতে কালো। আপনার পাশে দাঁড়ালে আমাকে মানাবে না। এখন সিদ্ধান্ত আপনার, আমাকে বিয়ে করবেন কিনা? কারণ, আপনাকে দেয়ার মত আহামরি কিছুই আমার মাঝে নেই।
—- ক্যান্সার ভালো হয়েছে আপনার?
কাঁপতে কাঁপতে কথাগুলো বলল হাসিব সাহেব। আমি মুচকি হেসে হাসিব সাহেবকে জবাবে বললাম,
— ভালো না হলে নিশ্চয়ই আপনার সামনে বসে থাকতাম না!
হাসিব সাহেব আমার সঙ্গে আর কোনো কথা বললেন না৷ উঠে চলে গেলেন ড্রইংরুমে৷ আমি ঘর থেকেই শুনতে পেলাম পাত্রপক্ষের লোকদের মাঝে চলা গুঞ্জন।
অবশ্য এমন গুঞ্জন প্রায়ই শুনি। কারণ, আমাকে দেখার আগ পর্যন্ত তারা স্বাভাবিক থাকে। আমাকে দেখার পর, আমার কমতি সম্পর্কে জানার পর তারা অবাক হয়, বিরক্ত হয়। তারপর বিরক্ত হয়ে চলে যায়। আজকের ঘটনা রোজকার ঘটনার মত অবস্থা। আমি মাথা নীচু করে আছি। লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছে আমার। মনে মনে প্রার্থনা করছিলাম যেন মাটি দুইভাগ হোক আমি সেই মাটিতে ঢুকে পড়ি।
অবশেষে তারা চলে গেলেন। আমি যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। সাজ রিমুভ করে পরনের শাড়ি বদলে থ্রি-পিছ পরে নিয়েছিলাম। কারণ, বিকেল চারটায় আমার কোচিং-এ ক্লাস আছে। মাথা ওড়না তুলে, পার্স হাতে নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে ড্রইংরুম পেরিয়ে যাব এমন সময় বাবা আমাকে ডাক দিলেন। আমার কেন যেন আজ বাবার সামনে যেতে ইচ্ছে করল না। মনে হচ্ছে বাবার সামনে গেলে আমি কেঁদে ফেলব। একজন কন্যাদায়গ্রস্ত বাবার অসহায় কন্যা আমি। যেই কন্যা দুনিয়াতে আসার পর থেকে কেবল বাবাকে জ্বালিয়ে মারছে।
— বাবা, আমি রাতে এসে কথা বলব। অলরেডি লেইট আজকে।
—- এখনই শুনি তোর কথা!
আমি থমকে গেলাম, আমার তথাকথিত মায়ের কথা শুনে। তারপর আরও কিছু বিষাক্ত বাক্য আমার দিকে ছুঁড়ে দিলেন তিনি।
–তুই এমন অচল যে তোরে যৌতুক দিয়ে বিয়ে দিতে চেয়েও মাথা থেকে নামাতে পারছি না। কোনো চোর টাইপ ছ্যাচড়ার গলায় ঝুলে পর, নয়ত গাছের ডালে ফাঁসিতে? তবুও আমাদের মাথার ওপর বোঝা হয়ে না থেকে মরে যা। নয়ত পালিয়ে যা রাতের অন্ধকারে । রোজ রোজ পাত্রপক্ষের কাছ থেকে রিজেক্ট হতে তো আর ভালো লাগছে না।
আমার তথাকথিত সৎ মা আমার বাবার পাশে দাঁড়িয়ে উপরোক্ত কথা গুলো বলেছিল। উনার নাম সিতারা বেগম। আমার উপর তিনি ভীষণ বিরক্ত। অবশ্য বিরক্ত হবার পাকাপোক্ত কারনও আছে। আমার মায়ের মৃত্যুর তিনদিন পর আমার সৎ মাকে বিয়ে করে ঘরে তুলেন আমার বাবা আফসার উদ্দিন। তিনদিন বয়সী আমিটাকে আমার সৎ মায়ের কোলে তুলে দেন আমার বাবা। কোনো নারী বোধহয় বাসরঘরে তার স্বামীর কাছে এমন উপহার পায়নি। আমি নামক উপহার মায়ের পছন্দ হলো না। রোজ রোজ মানসিক অত্যাচার পেয়ে বড় হলাম। এবার তো আমাকে বিয়ে দিতে হবে । কিন্তু আমাকে কে করবে বিয়ে? এই তো আজ দুপুরে পাত্রপক্ষ এসেছিল। আমি পাত্রের সঙ্গে আলাপের এক পর্যায়ে গিয়ে আমার কিছু কমতি নিয়ে বলছিলাম। এরপর যা হলো, আপনারা সেই সম্পর্কে অবগত হলেন।
আমি চোখের জল আড়াল করতে পেছনে ফিরে গেলাম। বাবা কিছু বলার জন্য আমার দিকে এগিয়ে আসলেন। কিন্তু বাবাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে আমি বের হয়ে গেলাম। রাস্তায় এসে দাঁড়াতেই একটা রিকশা পেয়ে গেলাম। রিকশা আমাকে নিয়ে চলল গন্তব্যের উদ্দ্যেশে।
কোচিংয়ের বিল্ডিয়ের সামনে এসে রিকশা থেমে গেল। আমি রিকশা ভাড়া দিয়ে ভেতরে ঢুকলাম।
— আজও এত দেরি কেন মিস. আলো?
আমি পিছনে ঘুরতেই দেখলাম কাব্য স্যার দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের কোচিংয়ের গণিত টিচার তিনি। আমি তাকে সালাম দিয়ে বললাম,
— স্যার, আসলে বাসায় গেস্ট এসেছিল।
— রোজ গেস্ট আসে! অদ্ভুত! আগামীকাল থেকে যদি একমিনিটও লেইট হয় তাহলে আপনার কোচিংয়ে আসার দরকার নেই। আপনি রোজ দেরি করে আসেন। আমার বাকি স্টুডেন্টের পড়ালেখায় ডিস্টার্ব হয়। ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড ওয়াট আয় এম সেয়িং?
— ইয়েস স্যার।
— গো টু ইউর সিট।
আলো দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তারপর নিজের সীটে বসেল। এবার পড়ায় মনোযোগী হওয়া উচিত। সমাজে বেঁচে থাকতে নিশ্চয়ই বিয়ে করার প্রয়োজন নেই। লেখাপড়া কোনোমতে শেষ করে একটা চাকরি জোটাতে পারলে হলো।
পুরুষ মানুষের শারিরীক পরীক্ষার বস্তু না হয়ে বরং নিজের জন্য বেঁচে থাকা ঢের ভালো। কোচিং শেষ করে সেগুন বাগান ৬নং লাইনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে আলো। দুটো টিউশনি আছে। টিউশনির টাকা দিয়ে আপাতত কলেজের বেতন ফি চলছে। প্রথম টিউশনি শেষ করে দ্বিতীয় টিউশনির পথে পা বাড়ায়। পথিমধ্যে কিছু বখাটে ছেলে রোজ তাকে হেনস্তা করে। পাত্তা দেয় না। দেখেও না দেখার ভান করে। শুনেও যেন শুনতে পায় না তাদের নোংরা কথা৷ কিন্তু, আর কতদিন এভাবে এড়িয়ে চলতে পারবে কে জানে?
এমন সময় কে যেন রাস্তার পাশে মাথা ঘুরে পরে গেল। যেহেতু সন্ধ্যাবেলা তাই মানুষজন কম রাস্তায়। আলো দৌড়ে যায় মানুষটার দিকে। একজন সুশ্রী মহিলা অচেতন প্রায়। আলোকে দেখে কোনোমতে বলল,
“মা আমার ব্যাগে মোবাইল আছে। পাসওয়ার্ড ১২৩৫। আমার ছেলের নাম্বার কললিস্টে আছে। মেঘালয় ওর নাম। “
ব্যস এতটুকু কথা যেন বহুকষ্টে তিনি বললেন। আলো দিশেহারা বোধ করল। ভদ্র মহিলার পাশে পরে থাকা হ্যান্ডব্যাগ থেকে মোবাইল বের করে লক খুলে, কললিস্টে গেল তারপর “মেঘালয়” দিয়ে সেভ করা নাম্বার দিয়ে কল করল আলো।
— হ্যালো? মা, কোথায় আছো তুমি? সবাই তোমার জন্য অপেক্ষা করছে।
— আসলে, রাস্তায় একজন মহিলা অচেতন হয়ে পরে আছে। সম্ভবত আপনার মা হোন উনি। উনার পাশে আছি আমি। আপনি কাইন্ডলি একটু তাড়াতাড়ি আসবেন?
আলোর কথা শুনে ওপাশে থাকা মানুষটা কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল,
— এড্রেস বলুন?
আলো এড্রেস জানিয়ে কল কেটে দিলো। ততক্ষণে রাস্তার মানুষজন তাদের ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের মধ্যে থাকা দুয়েকজন এসে পানির বোতল এগিয়ে দিলো আলোর দিকে। আলো বোতল হাতে নিয়ে পানির ছিটা দিলো সেই নারীর মুখের ওপর।
মিনিট পাঁচেকের মধ্যে সেই নারীর জ্ঞান ফিরে এলো। চোখ খুলে সর্বপ্রথম আলোকে দেখে খানিকটা অবাক হলেন তিনি। আলোর ঠোঁটের কোনে হাসি ফুটে উঠল।
— আন্টি আপনি ঠিক আছেন? এখন কেমনবোধ করছেন?
এমনসময় একটা কালো রঙের কার এসে থামল রাস্তার ধারে। উৎসুক জনতার ভিড় ঠেলে একটা ছেলে এগিয়ে এলো। কাঙ্ক্ষিত মানুষটার অস্তিত্ব খুঁজে পেয়ে দ্রুত পা চালিয়ে এগিয়ে এসে হাঁটু গেড়ে বসল।
আলো খানিকটা পিছিয়ে গেল। মাথার কাপড়টা সামান্য টেনে উঠে দাঁড়ালো। তারপর, চলে যাচ্ছে সেখান থেকে। কি দরকার এখানে দাঁড়িয়ে থেকে? “ধন্যবাদ” শব্দটা তার কাছে এ্যালার্জির মত লাগে। এখানে আর কিছুক্ষণ থাকলে সত্যি সত্যি ধন্যবাদ শুনতে হবে। তাই চলে যাওয়াটা বেটার অপশন।
এদিকে মেঘালয় নামের ছেলেটা তার মা’কে হাত ধরে টেনে উঠালো। তারপর গাড়ির দিকে এগিয়ে যায়। মেঘালয়ের মা এদিক-ওদিক তাকিয়ে যেন কাউকে খুঁজছেন!
— কাউকে খুঁজছ, মা?
— মেয়েটাকে খুঁজছি, মেঘ।
— কোন মেয়েটাকে মা? তোমার পাশে তো আমি দু’জন বয়স্ক মহিলাকে দেখলাম!
—আরে আমার এমন দুঃসময়ে শ্যামাকন্যা পাশে ছিল রে মেঘ। তুই খেয়াল করিসনি বোধহয়? আজ যদি শ্যামাকন্যা না থাকত, তাহলে আমি বোধহয় মারা যেতাম!
— এসব কথা বাদ দাও মা৷ মেয়েটার হয়ত কোনো তাড়া ছিল, তাই চলে গেছে।
— এই দেখ, আমার ব্যাগটা সামলে রেখেছিল মেয়েটা। হয়ত মোবাইল বের করার সময় টাকাগুলো দেখেছে। কিন্তু, মেয়েটা নেয়নি। মেয়েটা চাইলেই অনায়াসে ব্যাগটা নিয়ে পালিয়ে যেতে পারত। একটা ধন্যবাদ মেয়েটা ডির্জাভ করে মেঘ। মেয়েটার খোঁজ নিবি? আমি মেয়েটাকে আরও একবার দেখতে চাই৷ আমার চাওয়া পূর্ণ করবি তো বাপ?
মেঘালয় দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তারপর ওর মা’কে গাড়িতে বসিয়ে দিয়ে ড্রাইভিং সিটে বসল। স্টেয়ারিং হাত রেখে বলল,
— নাম, ঠিকানা যেহেতু জানিনা, তাই সময় একটু লাগতে পারে মেয়েটাকে খুঁজতে । চলবে?
— চলবে মানে! দৌঁড়াবে।
মেঘালয় অবাক হয়ে দেখল তার মা’কে। যে নারী কখনো তার বাসার মানুষদের খোঁজখবর ঠিকভাবে নেয়ার প্রয়োজন মনে করে না। সেই মানুষটা একটা অচেনা মেয়ের খোঁজ পেতে চাইছে! অদ্ভুত তো!
চলবে….
মেঘেরওপারেআলো
সূচনা_পর্ব
Share On:
TAGS: তাহমিনা আক্তার, মেঘের উপরে আলো
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ১৯
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ২০
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ২২
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ১৭
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ৬
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ২৬
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ২১
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ২৯
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ৪
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ১২