Golpo romantic golpo মাই টক্সিক হাসব্যান্ড

মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ৪০


মাই টক্সিক হাসব্যান্ড

পর্ব_৪০

কলমেতাসনিমতালুকদার_বুশরা

     হ্যাশট্যাগ ছাড়া কপি করা নিষিদ্ধ🚫

আবরার বেরিয়ে যেতেই রুম টা হঠাৎ অদ্ভুত রকম নীরব হয়ে গেল।সেই নীরবতায় কিছুক্ষণ কুহেলি আবার ঘুমিয়ে পড়ল হালকা, ভাঙা ভাঙা ঘুম। জানালার ফাঁক গলে আসা রোদের ছায়া ধীরে ধীরে বিছানার চাদরে সরে এল,যেন তাকে জাগাতে চাইছে।কিছুক্ষণ পর কুহেলি চোখ মেলে তাকাল।একা লাগছে একা মানে শূন্য না,বরং অভ্যাসের হঠাৎ বিরতি।

সে উঠে বসে।সারাদিন এভাবে রুমে বসে থাকা কারই বা ভালো লাগে?চার দেয়ালের মধ্যে আটকে থাকলে মনটা ভারী হয়ে আসে।তাই হালকা পায়ে দরজা খুলে রুম থেকে বেরিয়ে বাগানের দিকে এগিয়ে গেল।

বাগানে ঢুকতেই মনটা খানিকটা হালকা হলো। পাতার ফাঁক দিয়ে রোদ পড়ছে,হালকা বাতাসে ফুলের গন্ধ ভাসছে। কুহেলি ধীরে ধীরে হাঁটল কখনো গাছের পাতায় আঙুল বুলিয়ে,কখনো দূরের আকাশটার দিকে তাকিয়ে।মনে হচ্ছিল, এই সবুজের ভেতর দাঁড়িয়ে থাকলে নিজের ভেতরের অস্থিরতাগুলো একটু শান্ত হয়।কিছুক্ষণ এভাবে ঘোরাঘুরি করে আবার রুমে ফিরে এলো সে।

তবু বসে থাকতে ইচ্ছে করছিল না।অলসতা নয় বরং অকারণ ব্যস্ততার খোঁজ।কুহেলি চারপাশে তাকাল।রুমটা এমনিতেই গুছানো,তবু হাত যেন নিজে থেকেই কাজে লেগে গেল।বালিশগুলো ঠিক করল,পর্দার ভাঁজগুলো টানটান করে দিল, টেবিলের উপর রাখা জিনিসগুলো একটু সাজিয়ে নিল।গুছোতে গুছোতে মনে হচ্ছিল এই ছোট ছোট কাজগুলোই তাকে নিজের মতো করে জায়গাটা দখল করতে সাহায্য করছে।

শেষে ওয়ার্ডরোবের সামনে এসে দাঁড়াল।দরজা খুলতেই ভেতর থেকে পরিচিত গন্ধ আর কাপড়ের রঙে চোখ ভরে গেল। এক এক করে কাপড়গুলো গুছাতে লাগল কুহেলি ভাঁজ ঠিক করছে,রঙ মিলিয়ে রাখছে।কাজের ফাঁকে ফাঁকে হালকা হাসি চলে আসছে ঠোঁটে।

ওয়াড্রোবের ভেতর কাপড় গুছাতে গুছাতে হঠাৎই কুহেলির চোখে পড়ে একটা সাদা রঙের আইডি কার্ড।অন্য সব কিছুর ভিড়ে সেটা যেন একটু আলাদা করে নজর কাড়ে।কৌতূহল সামলাতে না পেরে কার্ডটা হাতে তুলে নেয় সে। চোখ বুলাতেই ঠোঁটের কোণে আপনাআপনি এক চিলতে হাসি খেলতে থাকে।

বাহ্…!

নিজের মনেই হালকা স্বরে বলে ওঠে কুহেলি।
কার্ডে লেখা জন্মতারিখ দেখে সে একটু অবাকই হয়।

জানুয়ারির এক তারিখ?মানে নতুন বছরের প্রথম দিনই আমার ক্রিমিনাল হাসব্যান্ডের জন্মদিন!

মনে মনে হিসেব কষতে থাকে সে।নতুন বছরের শুরু,আতশবাজি,আলো—সব কিছুর সঙ্গে যদি আবরারের জন্মদিন একসাথে পড়ে,ব্যাপারটা যে বেশ জমবে,সেটা ভাবতেই চোখদুটো চকচক করে ওঠে।

বাহ্…এক ঢিলে দুই পাখি!

কুহেলি সাবধানে আইডি কার্ডটা আগের জায়গাতেই রেখে দেয়। যেন কেউ বুঝতেই না পারে সে কিছু দেখেছে। তারপর আর দেরি না করে দ্রুত ফোনটা হাতে তুলে নেয়। আঙুলগুলো প্রায় দৌড়াতে দৌড়াতে শায়লার নাম খুঁজে বের করে।

আজ থেকেই শুরু হবে “মিস্টার মাফিয়া”-র জন্মদিনের সারপ্রাইজ প্ল্যান।

কুহেলির চোখে তখন দুষ্টু আনন্দের ঝিলিক, ঠোঁটে রহস্যময় হাসি।আবরার যদি জানত—তার শান্ত, নিরীহ বউটার মাথার ভেতর এই মুহূর্তে কী কী পরিকল্পনা পাক খাচ্ছে!

~~

দুপুর ঠিক দুইটা।

লম্বা মিটিং শেষ করে আবরার নিজের কেবিনে এসে বসেছে।দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করেই কেবিনের আলো নিভিয়ে দিল।কেবিনটা মুহূর্তেই নীরব অন্ধকারে ডুবে গেল শুধু সামনের দেয়াল জুড়ে ঝুলে থাকা বিশাল পর্দাটায় জ্বলে উঠল একটি ছবি।

কুহেলির ছবি।

আবরার চেয়ারের পেছনে হেলান দিয়ে তাকিয়ে রইল।ঠোঁটের কোণে অজান্তেই একটা নরম হাসি ফুটে উঠল।এই মানুষটা যাকে দেখে পুরো ব্ল্যাকলাইট ব্রাদারহুড কেঁপে ওঠে,যে কখনো ভয় শব্দটার মানে জানত না আজ সে নিজেই নিজের অনুভূতির কাছে অসহায়।

নিম্ন স্বরে, প্রায় নিজের সাথেই কথা বলতে লাগল আবরার,

জানো পাখি আমার মতো পাষণ্ড মানুষকে কেউ কখনো ভয় দেখাতে পারেনি।কেউ কখনো কন্ট্রোল করতে পারেনি।একটু থেমে আবার ছবিটার দিকে তাকাল।”অথচ তুমি পারছো।”

কণ্ঠটা এবার আর কঠিন রইল না।সেখানে ভেসে উঠল এক অদ্ভুত আশঙ্কা,এক অচেনা দুর্বলতা।

হ্যাঁ আমি ভয়ে থাকি।আবরার দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
ভয় পাই এই ভেবে কখন জানি তুমি এসে বলো, তুমি আমাকে ভালোবাসো না।

চোখ দুটো আরও গাঢ় হয়ে উঠল। মনে পড়ে গেল ফাহিমের সঙ্গে সেই দৃঢ় কণ্ঠে বলা কথাগুলো,

আমি জোর গলায় বলেছিলাম,তুমি আমার সাথে ভয়ে নও।বরং তুমি নিজের ইচ্ছায় আমার পাশে আছো আর থাকবে সারাজীবন!

আবরার ধীরে উঠে দাঁড়াল।পর্দার সামনে গিয়ে হাত বাড়িয়ে দিল,যেন ছবিটার ভেতর থেকেই কুহেলিকে ছুঁতে চায়।

এই ইচ্ছাটাই আমাকে ভয় দেখায়,পাখি,আবরার ফিসফিস করে বলল,
কারণ ভালোবাসা যদি জোর করে হয়,আমি সেটা চাই না।আর যদি তুমি নিজে থেকেই থেকো তাহলে সেটাই আমার সবচেয়ে বড় শক্তি!আবার সবচেয়ে বড় দুর্বলতাও..!

অন্ধকার কেবিনে শুধু পর্দার আলো আর এক মাফিয়ার নিঃশব্দ স্বীকারোক্তি রয়ে গেল।

ঠিক সেই মুহূর্তেই আবরারের চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেদিনের গোডাউনের ঘটনা,একটা স্মৃতির মতো নয়,বরং অমোঘ কোনো ছায়ার মতো,যা চাইলেও ঝেড়ে ফেলা যায় না।

সেদিন গোডাউনের বাতাসটাও যেন ভারী ছিল। ফাহিম গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে ছিল,চোখে অদ্ভুত এক দৃঢ়তা।আবরার স্বভাবসুলভ ঠান্ডা গলায় জিজ্ঞেস করেছিল,

কি শর্ত..?!

ফাহিম এক মুহূর্ত থেমে গভীর শ্বাস নিয়েছিল, তারপর স্পষ্ট করে বলেছিল,

এক মাস।পুরো এক মাস আমি আর শিশা তোর বাড়িতে থাকবো।

আবরারের ভ্রু কুঁচকে গিয়েছিল। প্রশ্নটা চোখেই ছিল, শিশা?!

ফাহিম যেন সেই না-বলা প্রশ্নটা বুঝেই হালকা হাসল,তবে সেই হাসিতে আনন্দ ছিল না,ছিল তীক্ষ্ণতা।তারপর বিদ্রুপ কন্ঠে বললো,

ভাবছিস শিশা এখানে কোথা থেকে এলো?আসলে
শিশা তোকে ভালোবাসে, আবরার।সেই ভালোবাসা থেকেই কুহেলিকে কিডন্যাপ করার সময় আমাকে হেল্প করেছিলো!

কথাগুলো আবরারের বুকে বজ্রপাতের মতো আঘাত করেছিল।যাকে সে রাস্তা থেকে তুলে এনে নিজের দুনিয়ায় আটকে রেখেছিল সবকিছু কি তবে এতটা পরিকল্পিত ছিল?বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আবরার এক মুহূর্তের জন্য নিশ্চুপ হয়ে গিয়েছিল।

ফাহিম তখন আরও কাছে এসে,নিঃশব্দ অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলেছিল,

এক মাস আমি কুহেলির আশেপাশেই থাকবো। কোনো জোর নেই,কোনো ভয় দেখানো নেই।যদি কুহেলি আমাকে বেছে নেয়,তাহলে তুই ওকে ছেড়ে দিবি আর যদি তোকে বেছে নেয়!তাহলে আমি চিরদিনের জন্য তোদের জীবন থেকে সরে যাবো। অনেক দূরে।

গোডাউনের ভেতর তখন নিঃশব্দতা জমে উঠেছিল।আবরারের ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে এক বাঁকা হাসি ফুটে উঠেছিল সে হাসি অহংকারের নয়,আত্মবিশ্বাসের।

“ডান..!”
এক শব্দেই সে রাজি হয়েছিল।

দরজায় নক করার শব্দটা যেন হঠাৎ করেই বাস্তবে ফিরিয়ে আনলো আবরার কে।চিন্তার পর্দা সরিয়ে সে উঠে দাঁড়াল।কেবিনের অন্ধকার ভেঙে আলো জ্বলে উঠলো।দেয়ালের লম্বা পর্দায় ভেসে থাকা কুহেলির ছবিটা নিঃশব্দে অফ করে দিলো সে। তারপর ধীর অথচ কর্তৃত্বপূর্ণ কণ্ঠে বললো,

— কাম ইন।

সাথে সাথে দরজা খোল একজন দৌড়ে এসে আবরারকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো।আবরার চমকে উঠলো।বিরক্তি আর সতর্কতা একসাথে ঝাঁপিয়ে পড়লো তার মধ্যে।এক ঝটকায় নিজেকে ছাড়িয়ে সামনে ঘুরতেই চোখে পড়লো পরিচিত মুখ “শিশা” সাথে সাথে আবরার ওর গালে থাপ্পড় বসায় কিন্তু শিশা আবরার কে অবাক করে দিয়ে পুনরায় জরিয়ে ধরলো ওকে!

এইবার আবরারের ধৈর্য ভাঙলো।

সে আর এক মুহূর্ত দেরি করলো না। শক্ত হাতে শিশাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলো।ফলস্বরূপ ভারসাম্য হারিয়ে শিশা ফ্লোরে পড়ে গেলো।

তবুও শিশা নিজেকে সামলে দাঁড়িয়ে পড়ল।চোখে জল,মুখে একরাশ জেদ দুটোর অদ্ভুত মিশেল।
আবরারের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।দাঁতে দাঁত চেপে,দম আটকে রাখা রাগে সে বলল,

অসভ্য!বেহায়া মেয়ে!অন্যের স্বামীর দিকে হাত বাড়াতে লজ্জা করে না?

কণ্ঠে ছিল বজ্রের মতো কঠোরতা। কেবিনের নিস্তব্ধতায় শব্দটা ধাক্কা খেয়ে ফিরে এল।কিন্তু শিশা থামল না। বরং ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের একচিলতে হাসি টেনে এনে বলল,

না, করে না।একটু থেমে,কাঁপা গলায় যোগ করল,
কারণ মাঝখান থেকে ওই মেয়েটা উড়ে এসে সব দখল করে নিল।তোমাকে তো আমার পাওয়ার কথা ছিল, আবরার।তাহলে ও কীভাবে এলো?

শিশা ধীরে ধীরে আরও কাছে এগিয়ে এল।আবরারের ব্যক্তিগত পরিসর ভেঙে দাঁড়িয়ে পড়ল তার সামনে।চোখে ছিল একধরনের উন্মত্ত আশা যেন শেষবারের মতো কিছু দাবি করছে।

আচ্ছা, শিশা ফিসফিস করে বলল,
ঐ মেয়ে কে না হয় বাড়িতে ভালোবাসবে! আর আমাকে বাইরে ভালোবাসো আমি তাতেই খুশি!

শিশার কথা শেষ হতেই আবরারের ঠোঁটের কোণে একরাশ ঠান্ডা,তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল।আবরার ধীরে ধীরে শিশার দিকে ঝুঁকে এল লাল টকটকে মনিওয়ালা চোখ দুটো এবার বরফের মতো স্থির, ভয়ংকর শান্ত।

তারপর নরম কন্ঠে বললেও ভেতরে লুকিয়ে ছিল হিমশীতল হুমকি,

প্রত্যেক টা জিনিসের একটা নিদিষ্ট জায়গা আছে!আর আমার জিনিস টারও একটা নিদিষ্ট জায়গা আছে!এসব ডাস্টবিনে আমার জিনিস পড়ে না!

কথাটা শেষ করেই সে আর এক মুহূর্ত দেরি করল না।এক ঝটকায় শিশাকে নিজের থেকে সরিয়ে দিল।ভারসাম্য হারিয়ে শিশা কয়েক কদম পিছিয়ে গেল।

আবরারের কণ্ঠ এবার কঠিন, নির্দয়,আর একবার যদি আমার এত কাছে আসো,তাহলে সরাসরি উপরের টিকিট ধরিয়ে দেবো। এখন বের হও আমার কেবিন থেকে।

শিশার চোখ জলে টলমল করছিল।কিছু বলার চেষ্টা করেও পারল না। অপমান,ক্ষোভ আর অপূর্ণ ভালোবাসার ভার বুকে চেপে ধরে সে নিঃশব্দে কেবিন ছেড়ে বেরিয়ে গেল।

দরজাটা বন্ধ হতেই আবরার গভীরভাবে শ্বাস নিল।একের পর এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস যেন এতক্ষণ ধরে নিজেকে শক্ত করে বেঁধে রেখেছিল।তারপর চেয়ারে যেয়ে বসলো!

আবরার চাইলেই এই শিশা কে এক মিনিটে শেষ করতে পারে!

কিন্তু ফাহিমের শর্ত।

এই এক মাস না ফাহিম, না শিশা কাউকেই কিচ্ছু করবে না ও!

এই এক মাস…!
তারপর কী হবে?

সে নিজেই জানে।

চেয়ারে হেলান দিয়ে আবরার জানালার বাইরে তাকাল।চোখে আবার সেই বাঁকা হাসি যেটা সাধারণত ঝড়ের আগের নিস্তব্ধতার মতো।

খেলাটা এখনো শেষ হয়নি।
বরং…এখনই শুরু।

                      চলবে...!!

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply