মাই টক্সিক হাসব্যান্ড
পর্ব_৩৭
কলমেতাসনিমতালুকদার_বুশরা
হ্যাশট্যাগ ছাড়া কপি করা নিষিদ্ধ🚫
তারপর আবরার শান্ত কন্ঠে বললো,
তুমি যাও, আমি আসছি।
মেইড মাথা ঝুঁকিয়ে চলে গেল।
আবরার ঘুরে কুহেলির দিকে এগিয়ে এলো।তারপর হালকা কন্ঠে বললো,তুমি রেস্ট নাও আমি নিচে থেকে আসছি।
কুহেলি ভুরু তুলল,চোখে সন্দেহের সরু রেখা
নিচে কে আসছে? বললো!
আবরার ঠান্ডা গলায় শুধু বলল,
কেউ না। তুমি থাকো আসছি।বলেই আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। কুহেলির মুখে কথা আসার আগেই দরজার দিকে হাঁটা দিলো সে।
দরজা বন্ধ হওয়ার সাথে সাথেই কুহেলি ভেঙচি কেটে বললো,অদ্ভুত মানুষ! আমার কথা খানা না শুনেই চলে গেলো?!
আবরার সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতেই তার বুকের ভেতর চাপা অস্বস্তি বাড়তে থাকল। লিভিংরুমের মোড় ঘুরতেই দৃশ্যটা চোখে পড়ল,
শিশা আর ফাহিম পাশাপাশি বসে আছে সোফায়।
ফাহিমের মুখে সেই চিরচেনা আধা-হাসি যেন কিছুই ঘটেনি, সব ঠিকঠাক আছে।শিশা হাত জোড়া করে বসে আছে, মুখটা অস্বস্তিতে শক্ত, কিন্তু চোখের কোণে একধরনের প্রত্যাশা, যেন আবরারের প্রতিক্রিয়া দেখার অপেক্ষায়।
আবরার ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে সোফার এক কোণে বসলো। বসার ভঙ্গিটাতেই একটা ঠান্ডা দম্ভ
শিশা আর ফাহিম দু’জনের দিকে তাকিয়ে তার ঠোঁটের কোণে ব্যঙ্গের দিয়ে বললো,
তোদের দুইজনকে বিয়ে দিলে কিন্তু খারাপ হয় না!
ফাহিমের মুখ হাঁ হয়ে গেল এক মুহূর্তের জন্য, তারপরই সে গরম নিঃশ্বাস ফেলে বিদ্রূপ ভরা কণ্ঠে বলল,তর এই সব ফালতু স্বপ্ন নিজের কাছেই রাখ! আর মনে রাখিস আমি যা বলি তাই হয়। আমি তর নাকের ডগা দিয়ে কুহেলিকে নিয়ে যাবো আর তুই চেয়ে চেয়ে দেখবি! কারণ এই গল্পের নায়ক আমি!
লিভিংরুমের হঠাৎ করেই আরও ঠান্ডা হয়ে গেল।
আবরার ধীরে ধীরে সামনে ঝুঁকল।তার চোখে অদ্ভুত শান্তি যেন ঝড়ের ঠিক আগের অস্বস্তিকর নীরবতা।একটা ব্যঙ্গাত্মক নরম হাসি তুলে সে বলল,
নায়ক?!
তারপরই সেই ভয়ানক শান্ত স্বরে আবার বলল,
যেই গল্পের ভিলেন স্বয়ং মাফিয়া কিং এরিক আবরার খান,সেখানে নায়ক নায়িকা পাবে তা ভাবলি কীভাবে?
ফাহিম হালকা হাসল যে হাসিতে বিষ মেশানো আত্মবিশ্বাস লুকিয়ে থাকে।
দেখা যাক শেষ পর্যন্ত কে জিতে?!
তার কণ্ঠ ঠান্ডা। চোখে চ্যালেঞ্জের আগুন।
আর এমনিতেও কুহেলি তোকে ভালোবাসে তার প্রমাণ কী? কখনো বলেছে? একবারও মুখ খুলে বলেছে যে ভালবাসে তোকে?
ফাহিম সোফায় হেলান দিয়ে তারপর হেয়ালি কন্ঠে বললো,না তো! তাহলে?আসলে তোকে সে ভালোবাসেই না।বিশ্বাস কর—একদিন ঠিকই চলে যাবে।
এই কথাগুলো আবরারের বুকের মধ্যে তীরের মতো ঢুকে গেল।এক মুহূর্তের জন্য তার নিঃশ্বাস আটকে গেল—সত্যিই তো কুহেলি কোনোদিন বলেনি ভালোবাসি।কোনোদিন না।
তার বুক ধক করে উঠল একটা ভয় যা সে কারও সামনে কখনোই দেখাতে চায় না।
কিন্তু মুখে?
কোনো বদল নেই।
চোখে টানটান শান্তি।
আবরার শুধু বলল,
দেখা যাক।
তারপর আবরার তার লাল টকটকে মনিওয়ালা চোখ দিয়ে শিশার দিকে তীক্ষ্ণ ভাবে তাকালো যেনো এই তাকানোতেই শিশা জ্বলে ভস্স হয়ে যাবে!
শিশার দিকে।শিশা প্রথমে চোখ নামিয়ে ফেলল, তারপর আবার তাকাতে সাহস করল কিন্তু আবরারের চোখের দৃষ্টি তাকে স্থির করে দিল।
আবরার শান্ত, ঠান্ডা গলায় বলল,
আমি তকে আশ্রয় দিয়েছিলাম, শিশা। মাথার উপর ছাদ, নিরাপত্তা সব দিয়েছিলাম। আর তুই? পিছন থেকে ছুরি মারবি এটা কোনোদিন ভাবিনি।
শিশার গলা শুকিয়ে গেল।
আবরার আরও কাছে ঝুঁকলো। তার কণ্ঠ ভয়ংকরভাবে নরম তকে চাইলে আগেই শেষ করে দিতে পারতাম।
লিভিংরুমের নীরবতা পাথরের মতো ভারী হয়ে পড়ল।
কিন্তু না..!আবরার মাথা দোলাল ধীরে, কিন্তু ভয়ানকভাবে আত্মবিশ্বাসে।
আমি তকে তিলে তিলে মারব।
শিশা ভয় পেলো আবরার কে তবে মুখে অভিব্যক্ত একদম শান্ত!
আবরার শেষ বাক্যটা বলল ঠান্ডা আগুনের মতো
তুই যখন তিলে তিলে মরবি, সেই দৃশ্য দেখে আমি শান্তি পাবো।
আবরারের ভয়ানক শান্ত স্বরের পরও শিশা হঠাৎ হালকা হেসে ফেলল,একটা তিক্ত, ভাঙা হাসি।
তার ঠোঁট কাঁপছিল,চোখ লাল হয়ে উঠছিল যন্ত্রণায়।
আমি তোমার সাথে আছি কত বছর ধরে, আবরার..!শিশার কণ্ঠে যেন জমে থাকা অভিমান ফেটে বেরোলো।অথচ ওই মেয়েটা এসে দুই দিনেই তোমার মনে জায়গা করে নিল?সে উঠে বসল, ভেজা চোখে আবরারের দিকে তাকিয়ে বলল,ওই মেয়ের মধ্যে এমন কী আছে যা আমার মধ্যে নেই? আমি কি সুন্দর নই?তাহলে আমাকে কেন ভালোবাসলে না?কেন ওই মেয়েকে ভালোবাসলে? আমার অনুভূতি কি তুমি বুঝতে নি?!শিশার চোখ ঝাপসা হয়ে উঠল।আমার অনুভূতি কি কোনোদিন তোমার চোখে পড়তো না?
তার ঠোঁট কাঁপল, রাগ আর কষ্ট মিলেমিশে গলা ভারী হয়ে গেল।একটা তীব্র যন্ত্রণায় ভরা কথায় সে এগিয়ে এল,একটা সামান্য মে….
কথা শেষ করার আগেই আবরার ঝড়ের মতো উঠে দাঁড়িয়ে এগিয়ে গেল।বাতাস ভারী হয়ে উঠল।
এক মুহূর্ত
তারপরই ঠাস!
চড়টা ছিল চাপা,কিন্তু ভয়ঙ্কর দৃঢ়।শিশা বাকরুদ্ধ হয়ে গালে হাত রাখল—চোখ বিস্ফোরিত বিস্ময়ে ভরে উঠল।
সে দাঁড়িয়ে গেল না, কিছু বললও না। শুধু আবরারের দিকে তাকিয়ে রইল—অবিশ্বাসে, অপমানে, ভাঙা অনুভূতিতে।
আবরারের বুক উঠানামা করছিল, চোখে ক্রোধ নয়—বরং একধরনের সীমাহীন সতর্কতা।
একটা অঘোষিত সীমা আজ সে টানল।
আবরার শক্ত কন্ঠে বললো,
ও শুধু একটা মেয়ে নয় ও এরিক আবরার খানর রাজ্যের রানি!ওর একটা কথাই আমার পুরো রাজ্যে ওর পায়ের নিচে ঠেলে দিতে প্রস্তুত! তাই এরপর ওকে নিয়ে কথা বলতে গেলে আগে দশ বার ভাবে!
বলেই আর দাঁড়ালো না গটগট করে বেরিয়ে গেলো বাড়ি থেকে আর পিছনে রেখে গেলো বিস্মিত কিছু মুখ!
~~
রাত সারে বারোটা..!
নিঃশব্দ বাড়িটা যেন ঘুমিয়ে আছে,কিন্তু একটি হৃদয়ের ভিতর ঝড় বইছে।
আবরার দরজা ঠেলে রুমে ঢুকতেই নরম আলোয় কুহেলিকে দেখা গেল।সোফায় আধশোয়া,চোখ আধাবোজা,চাদরটা কাঁধে নামিয়ে পড়েছে দেখলেই বোঝা যায়, সে অপেক্ষা করছিল।
দীর্ঘক্ষণ ধরে।
তার নিঃশ্বাসের ভঙ্গি, গালের পাশে চুলের এলোমেলোতা সবই বলে দিচ্ছে, আবরারের জন্য কতটা ক্লান্ত হয়ে থেকেছে।
কিন্তু আবরার থামলো না।
কুহেলির দিকে একবার তাকালও না।
সে সোজা ওয়াশরুমে চলে গেল যেন রুমে আর কেউ নেই।
জল পড়ার শব্দ, তারপর নীরবতা।কিছু ক্ষণ পর
আবরাব ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এল ফ্রেশ হয়ে।কিন্তু সে কুহেলির দিকে না গিয়ে দরজা খুলে বারান্দায় চলে গেল।ঠান্ডা রাতের বাতাসে রেলিংয়ের পাশে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর আঙুলে ধরা সিগারেট জ্বলে উঠল ছোট্ট আলো হয়ে।রাতের অন্ধকারে ধোঁয়া ধীরে ধীরে মিশে যাচ্ছিল আকাশে,আর আবরার দাঁড়িয়ে ছিল বিশাল কোনো বোঝার নিচে চাপা পড়ে যাওয়া মানুষের মতো।চুপচাপ। ভারী নিঃশ্বাসে।
কুহেলি দাঁড়িয়ে উঠল।খুব ধীরে।পা টিপে টিপে বারান্দার দরজার কাছে এল।
সে ঘুমিয়ে ছিল ঠিকই কিন্তু আবরার রুমে ঢোকার শব্দে চোখ খুলে ফেলেছিল।তার মন আজ অদ্ভুত নরম হয়েছিল—মনে হচ্ছিল আজ আবরার ওকে কোলে তুলে নেবে,মাথায় হাত বুলিয়ে বলবে,
পাখি, আমি আসছি উঠো।
এর পর কুহেলি আধঘুম চোখে হাসিমুখে তাকাবে,
তার মাথা আবরারের বুকে গুঁজে দেবে এভাবেই তো চলছিলো গত কয়েক দিন..!
তাহলে আজ কেনো নয়?কুহেলির বুকটা ধক করে উঠল।তার চোখ ভেজা হয়ে উঠল উদ্বেগে।আবরার আজ কেনো এভাবে দাঁড়িয়ে আছে?কেনো ওর কাছে এল না?কেনো এই দূরত্ব, এই ঠান্ডা নীরবতা?আর কেনো সিগারেট হাতে?
কুহেলির মনে হাজার প্রশ্ন দানা বাঁধল।সামনে দাঁড়িয়ে থাকা আবরারকে দেখে তার বুকটা ভারী হয়ে উঠল—যেন সে ঠিক এখনই হারাতে যাচ্ছে এমন কাউকে,যাকে সে এখনও ঠিকমতো নিজের করে পায়নি।
রাতের হাওয়া বইছিল,কিন্তু কুহেলির মনে চলছিল এক ঝড় অপ্রকাশিত ভয়, অজানা ব্যথা, আর একটুখানি অভিমান..!তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাআজ যেন তাকে দূরে ঠেলে দিচ্ছিল।কেনো?কী ঘটেছে?সে কি কিছু ভুল করেছে?
নাকি আবরারের ভিতরে কোনো ভাঙন চলছে
যার কাছে সে পৌঁছাতে পারছে না?
কুহেলির হাত ঠান্ডা হয়ে গেল এভাবে কখনো আবরার তাকে উপেক্ষা করেনি।তাহলে আজকে কেনো..?!
কুহেলি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না।তার মনের ভেতর জমে থাকা অস্বস্তি, উদ্বেগ,অভিমান সব একসাথে যেন তাকে ঠেলে দিল।সে একমুহূর্তে এগিয়ে গেল আবরারের খুব কাছে।তারপর কোনো সতর্কতা ছাড়াই
টান!
সে হাত বাড়িয়ে আবরারের আঙুলের ফাঁক থেকে সিগারেটটা টেনে নিয়ে সরাসরি মেঝেতে ফেলে দিল।জ্বলন্ত আগুনের ছোট্ট অংশটা ঠুস করে নিভে গেল মেঝের টাইসের সঙ্গে লেগে।
আবরার খানিকটা চমকে গেল।তার দৃষ্টি সিগারেট থেকে উঠে ধীরে ধীরে কুহেলির দিকে গেল।
চোখে বিস্ময় হালকা অবিশ্বাস আর খুব সামান্য অবাক হওয়া ছায়া।
তবু আবরার কিছু বলল না।
একটুও নয়।
কুহেলির বুক ওঠানামা করছিল রাগ আর দুশ্চিন্তায়।তার চোখে জল, কিন্তু সে শক্ত গলায় বলল,
আপনি সিগারেট কেনো খাচ্ছেন? জানেন না এটা শরীরের জন্য কতটা খারাপ?
আবরারের মুখে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই।
নীরবতা আরও ভারী হয়ে উঠল।
কুহেলি কথা চালিয়ে গেল এবার কণ্ঠে রাগের নিচে কাঁপা উদ্বেগ স্পষ্ট।
আর আমিও পছন্দ করি না সিগারেট খাওয়া! আমাকে প্রমিস করুন,আর কখনোই সিগারেট খাবেন না!
কথাগুলো এত দ্রুত, এত জোরে বেরিয়ে এল যে মনে হচ্ছিল সে দীর্ঘক্ষণ ধরে এগুলো বুকের ভেতর আটকে রেখেছিল।
আবরার এবার একটু নড়ল।ধীরে,অথচ অস্থিরতায় ভরা একদম অস্বাভাবিক ভঙ্গিতে।
হঠাৎ
আবরার কুহেলিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো!
যেন কাউকে হারানোর ভয় তাকে ভিতর থেকে ছিঁড়ে ফেলছিল।কুহেলি থমকে গেল।তার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।শরীর স্থির হয়ে গেল চমকে।
আর পরের মুহূর্তেই
আবরার হুঙ্কার ফেলে কান্নায় ভেঙে পড়ল।
হাউমাউ করে।
শব্দটা এমন,যেন বছরের পর বছর জমে থাকা ব্যথা, ভয়, অপরাধবোধ, হতাশা সব বেরিয়ে আসছে একসাথে।
কুহেলির মনে শীতল একটা শিউরে ওঠা অনুভব হলো।সে অবাক, হতবম্ব, বাকরুদ্ধ।
আবরার কান্না করছে?কেনো?কি এমন ভেঙে গেল ওর ভেতরে?কুহেলি তার হাত কাঁপতে কাঁপতে আবরারের পিঠে রাখল কিন্তু কোনো শব্দ বের হলো না তার মুখ থেকে।এত দৃঢ়, এত শক্ত, এত অটল মানুষটা আজ যেন ভেঙে পড়েছে ভীত সোনামাছের মতো।
রাতের ঠান্ডা হাওয়া থেমে আছে যেন।
তারারা নিঃশব্দ।আর দুইজন মানুষ সেই বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে একজন ভেঙে যাওয়া,অন্যজন উদ্বিগ্ন!
কুহেলি শুধু ভাবতে পারছিল আবরারের ভিতরে এমন কি আগুন পুড়ছে যা তাকে এমন করে ফেলল?কোন স্মৃতি? কোন আঘাত? কোন ভয়?
তার চোখে দুশ্চিন্তার ছায়া গাঢ় হলো…!
চলবে....!
Share On:
TAGS: তাসনিম তালুকদার বুশরা, মাই টক্সিক হাসব্যান্ড
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ১৫
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ৩৬
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ১৬
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ৩২
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ৪৪
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ৭
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ৪৬
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ৫১(সমাপ্ত)
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ১২
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ৮+স্পেশাল