মাই টক্সিক হাসব্যান্ড
পর্ব_২
কলমেতাসনিমতালুকদার_বুশরা
কপি করা বিশেষ ভাবে নিষিদ্ধ ❌
রাত তিনটে…..!
রুমজুড়ে নিস্তব্ধতা,শুধু দূরে কোথাও ঘড়ির কাঁটার টিকটিক শব্দ কুহেলি ধীরে ধীরে চোখ মেললো। শরীরের প্রতিটি অঙ্গ যেন ভারী হয়ে আছে হাড় পর্যন্ত ক্লান্তি মিশে গেছে। ব্যথায় ওর নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল।
আস্তে আস্তে উঠে বসলো সে। চারপাশে ছায়া, অন্ধকার, আর ভেজা চাদরের গন্ধ কুহেলির চোখ গিয়ে থামলো পাশের মানুষটার দিকে এরিক আবরার খান।লোকটা ঘুমাচ্ছে নিশ্চিন্তে,শান্ত মুখে। নিঃশ্বাসের ছন্দে এক অদ্ভুত প্রশান্তি যেন সে পৃথিবীর কোনো অপরাধেই জড়িত নয়।কুহেলি কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো তার দিকে। তারপর কয়েক ঘন্টা আগের কথা মনে হতেই তার চোখের কোণে জল জমে উঠলো। কুহেলি মুখ ফিরিয়ে নিলো। নরমভাবে ঠোঁট কামড়ে কান্না চেপে রাখার চেষ্টা করলো, কিন্তু পারলো না। অঝোরে গড়িয়ে পড়লো চোখের পানি এ ব্যথা শুধু শরীরের না, আত্মারও।
কুহেলির দুই হাত এখনো উড়না দিয়ে বাঁধা নিঃশব্দে দাঁত দিয়ে গিঁটটা খুলতে লাগলো সে কষ্ট হচ্ছিল তবুও থামলো না। কয়েকবার চেষ্টা করার পর অবশেষে গিঁটটা আলগা হলো হাত মুক্ত হতেই বুকের ভেতর একটা গভীর নিঃশ্বাস নিলো যেন বহুক্ষণ পর ফুসফুসে প্রথমবার বাতাস ঢুকলো।
চোখ নামিয়ে তাকালো মেঝের দিকে। তার জামা খানা পড়ে আছে ওখানে এলোমেলোভাবে।
শরীরের ব্যথা উপেক্ষা করে ধীরে ধীরে ফ্লোরে নেমে এল কুহেলি। পোশাকটা হাতে তুলে পরার সময় আঙুল কাঁপছিল,কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিলো নিজেকে যেন আবার নিজের মতো করে গুছিয়ে নিতে চায়।ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়ালো সে। ঠান্ডা টাইলসের ওপর খালি পায়ের শব্দ যেন নিস্তব্ধ রুম টাকে আরও ভারী করে তুললো।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে যখন নিজের প্রতিবিম্ব দেখলো, কুহেলি এক মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধ হয়ে গেল।জামার হাতা ছেঁড়া, কাঁধের কাছে আঁচড়ের দাগ,গলায় দশটার মতো কামড়ের দাগ যা নীলচে ছাপ আর ঠোঁট খুবই বিশ্রি ভাবে কামড়ের দাগ সাথে ফুটে গেছে গালে কয়েক টা দাগ আছে তবে অস্পষ্ট তারপর কি মনে করে যেনো কুহেলি নিজের পেটের জায়গায় জামা উন্মুক্ত করলো ঐ খানেও অনেক গুলো কামড়ের দাগ পুনরায় আয়নার দিকে তাকালো সব মিলিয়ে আয়নায় যে মেয়েটাকে দেখা যাচ্ছে,তাকে কুহেলি চেনতে পারলো না।
তার চোখ ভরে উঠলো অশ্রুতে হাত বাড়িয়ে আয়নার গায়ে স্পর্শ করলো,যেন নিজেরই ভেতর থেকে হারিয়ে যাওয়া মেয়েটাকে ছুঁয়ে দিতে চায়।এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো এই পৃথিবীটা আসলে কত নির্মম হতে পারে।ভয়, ঘৃণা আর অপমান একসাথে বুকের ভেতর জমে গিয়ে নিঃশ্বাস বন্ধ করে দিচ্ছে।
কিছুক্ষণ নিঃশব্দে কাঁদলো কুহেলি।নিজের মুখটা দুই হাতে ঢেকে রেখেছিলো,কিন্তু চোখের পানি থামাতে পারলো না কান্নার প্রতিটি ফোঁটা যেন বুকের ভেতরের আগুনকে আরও ছড়িয়ে দিচ্ছিল।
আয়নায় আবার তাকালো সে চোখ দুটো লালচে, ঠোঁট শুকনো,মুখে এক অসহায় অভিব্যক্তি। মনে হলো,এই মেয়েটা কুহেলি নয়, অন্য কেউ… কেউ যে হঠাৎই জীবনের সমস্ত নিশ্চিন্ততা হারিয়ে ফেলেছে।
হঠাৎ মনে পড়লো ওর মনে পড়লো কাপড় তো নেই…! এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেলো কুহেলি, তারপর ধীরে ধীরে নিজের উড়নাটা খানা নিয়ে সেটি মাথায় তুলে নিলো,যত্ন করে গলায় পেঁচিয়ে এমনভাবে হিজাব বেঁধে ফেললো যাতে শরীরের ক্ষতচিহ্নগুলো আর দেখা না যায়।চোখের কোণে জমে থাকা শেষ অশ্রুবিন্দুটা মুছে ফেললো সে। মুখে এক অদ্ভুত কঠোরতা নেমে এলো ভয় নয়, ঘৃণা নয়, এবার শুধু সিদ্ধান্ত।
ওয়াশরু থেকে বেরিয়ে বেরিয়ে একবার সোজা বেরিয়ে যেতে নিলো রুম থেকে কিন্তু দরজার কাছে গিয়ে হঠাৎ থেমে গেল এক মুহূর্তের জন্য বিছানায় আবরার শান্তভাবে ঘুমাচ্ছে,যেন কিছুই ঘটেনি যেন তার অপরাধের কোনো বোঝা নেই কাঁধে।
কুহেলির বুকের ভেতর এই লোকার জন্য একরাশ ঘৃণার ঢেউ উঠলো।এক মুহূর্তের জন্য চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে হলো তুই মানুষ না…! তুই একটা জানোয়ার….! কিন্তু তার সম্ভব না তারপর আর এক মুহূর্ত রুমে দাঁড়ালো না দরজা খোলে সোজা রুম থেকে বেরিয়ে গেলো…!
নিচে নেমেই কুহেলি এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেলো।ক্লাবের আলো-ঝলমলে মঞ্চে এখনো গান বাজছে, কেউ হাসছে কেউ মাতাল হয়ে নাচছে।
এই কোলাহলের ভেতরেও কুহেলির কাছে সবকিছু কেমন যেন বধির মনে হচ্ছিল ওর নিজের নিঃশ্বাসের শব্দটাই শুধু কানে বাজছিল ধীরে, কাঁপা,ভারী।টেবিলের কোণায় পড়ে থাকা নিজের পার্সটা তুলে নিলো কুহেলি।মাথা নিচু করে, চোখে কোনো অভিব্যক্তি ছাড়াই ক্লাবের দরজা পেরিয়ে বাইরে চলে এলো।বাইরে এসে থামলো এক মুহূর্তের জন্য। রাতের ঠান্ডা হাওয়া ওর মুখে লাগলো, কিন্তু কুহেলি অনুভব করলো না কিছুই।
আর কখনোই এখানে ফিরবো না এখানে মনের ভেতর প্রতিজ্ঞার মতো উচ্চারণ করলো সে মরে গেলেও না…!
রাস্তাটা নির্জন।চারপাশের আলো ঝাপসা হয়ে আছে, যেন শহরও আজ ঘুমিয়ে পড়েছে।
একবার মাথা উঁচু করে আকাশের দিকে তাকালো কুহেলি চাঁদটা আধেক ঢাকা,মেঘের আড়ালে।
তারপর এক নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে হাঁটা শুরু করলো।
পা দুটো ভারী লাগছিল, তবুও থামলো না।
মাথার ভেতর তখন শুধু একটাই চিন্তা বাড়ি পৌঁছাতে হবে।প্রায় আধা ঘণ্টা হাঁটার পর কুহেলি অবশেষে নিজের এলাকার গলিতে ঢুকলো।
কিন্তু ওর মনে হচ্ছিল কিছু একটা ঠিক নেই।
পেছনে যেন কেউ আছে অচেনা কোনো ছায়া, নরম পায়ের শব্দ,দূর থেকে তাকিয়ে থাকা নজর।
কুহেলি কয়েকবার ঘুরে তাকালো কেউ নেই।
তবুও বুকের ভেতরটা কেমন শীতল হয়ে গেলো, যেন রাতটা ওর পিছু নিচ্ছে।অবশেষে বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালো সে।চাবি বের করতে গিয়ে হাত কেঁপে উঠলো।তালায় চাবি ঢোকানোর সময় কুহেলির বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দটা আরও জোরে বাজছিল।
দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলো নীরবতা।পুরো বাড়িটা নিস্তব্ধ, যেন সময় থেমে গেছে।এই সময় কে-ই বা জেগে থাকবে?আসলে, কেউ জেগে না থাকাই ভালো হয়েছে।
কারণ কেউ যদি এখন ওকে দেখতো এই অবস্থা, এই চোখ, এই মুখ তাহলে প্রশ্ন করতো..!আর কুহেলি কি উত্তর দিতো সেই প্রশ্নের?
এক নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে নিজের রুমের দিকে হাঁটলো।পায়ের আওয়াজ যেন পুরো বাড়িটা জুড়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল প্রতিটি ধাপ যেন কুহেলির ভেতরের ভারকে আরও গভীর করে তুলছিল।
রুমে ঢুকেই দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিলো কুহেলি।বিছানার পাশে গিয়ে একবার আয়নার দিকে তাকালো, তারপর চোখ ফিরিয়ে নিলো।
আর তাকাতে ইচ্ছে করছিল না কারণ আয়নায় যে মেয়েটা আছে, তাকে সে আর চিনতে পারছে না।
আর এক মুহূর্তও দেরি করলো না কুহেলি এক দৌড়ে সোজা চলে গেলো ওয়াশরুমে।মাথা ঝিমঝিম করছে, শরীর ব্যথায় ভরা,কিন্তু ওর চোখে এখন কেবল একটাই জিনিস ঘৃণা নিজের প্রতি পৃথিবীর প্রতি ভাগ্যের প্রতি।
ওয়াশরুমের ভেতরে ঢুকে কুহেলি দু’হাতে ট্যাপ ঘুরিয়ে ঝর্ণা ছেড়ে দিলো জলের ধারা প্রচণ্ড শব্দে পড়তে লাগলো মেঝেতে।পরের মুহূর্তেই কুহেলি ফ্লোরে বসে পড়লো পুরো ভিজে গেলো, কিন্তু পরোয়া করলো না।দু’হাত দিয়ে মুখ ঢেকে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো সে গলা ফাটানো কান্না নয় একটা নিঃশব্দ আর্তনাদ, যা কেবল দেয়াল শুনতে পেলো।
আমার সাথেই কেনো এমন হয় ?কণ্ঠ ভাঙা, নিশ্বাস কাঁপছে।আমি কেনো এতো অভাগা? আমি কি সত্যিই কোনো দোষ করেছি?ওর কান্নার শব্দ মিলিয়ে যাচ্ছিল পানির ঝরঝর শব্দে।চোখ থেকে গড়িয়ে পড়া লোনাজল মিশে যাচ্ছিল ঝর্ণার ঠান্ডা পানিতে।
ঠিক তখনই এক অদ্ভুত দৃশ্য চোখে পড়লো ওর চুল থেকে কালো রঙটা ধুয়ে যাচ্ছে পানির সাথে গাঢ় রঙটা গড়িয়ে পড়ছে মেঝেতে,যেন কোনো অদৃশ্য অন্ধকার ধীরে ধীরে গলে যাচ্ছে।আর যেখানে রঙটা মুছে যাচ্ছে, সেখানে দেখা দিচ্ছে সাদা চুল ঝকমকে, ঠান্ডা, নিঃশব্দ। তার সাদা চুলে ঘেরা মুখ লালচে চোখ, ঠোঁট কাঁপছে, তবু এক অদ্ভুত শীতলতা যেন ছড়িয়ে পড়েছে তার ভেতরে…!
~~
সকাল আটটার দিক।
সূর্যের আলো জানালা ভেদ করে রুমে ভেতর ঢুকে পড়েছে, হালকা পর্দার ফাঁক গলে এসে পড়ছে আবরারের মুখে।চোখ খুলে সে এক মুহূর্তের জন্য নিঃশব্দে তাকিয়ে রইলো পাশে খালি বিছানা।
মেয়েটা নেই।
কিছুক্ষণ স্থির হয়ে রইলো আবরার।
তারপর ধীরে ধীরে উঠে বসল।চোখে রাগের কোনো ছাপ নেই, বরং অদ্ভুত এক প্রশান্তি।
যে মানুষ সামান্য কারণে জিনিস পত্র ছুড়ে দেয়, দেয়ালে ঘুষি মারে,সে আজ সম্পূর্ণ শান্ত।ওর ঠোঁটে একটুখানি হাসি ফুটলো একটা এমন হাসি, যেটা দেখে বোঝা যায়, এই মানুষটার মন পড়া অসম্ভব।
বিছানা থেকে টেবিলের দিকে হাত বাড়ালো টেবিলের ওপর পড়ে থাকা ফোনটা হাতে তুলে নিলো একটু স্ক্রল করলো, তারপর আঙুল থামলো
একটা ছোট্ট মেসেজ টাইপ করলো।কোনো আবেগ নেই, শুধু আদেশের ভাষা।
পাঁচ মিনিটও যায়নি এর আগেই
দরজায় টোকা পড়লো।
আবরার গভীর কণ্ঠে বললো,
Come in.
দরজা খুলে ভিতরে ঢুকলো প্রায় সাতাশ বছরের এক সুঠামদেহী পুরুষ। কালো পোশাক, গলায় ছোট চেন,আর চোখে এমন দৃষ্টি যেখানে ভয় আর অনুগত্য একসাথে মিশে আছে।
আবরার তাকাল না তার দিকে, টেবিলে আঙুল ঠুকতে ঠুকতে শুধু বললো,ফেটিক্স….!এই এক শব্দই যথেষ্ট ছিল।
লোকটা মাথা নুইয়ে এক নিঃশ্বাসে বলতে শুরু করলো মেয়েটার নাম কুহেলি তাজ রহমান।
বাবার নাম আব্বাস রহমান।মা নেই সৎ মা আছে, আর এক সৎ বোন।বাড়িটা এখান থেকে হেঁটে গেলে আধা ঘণ্টার পথ,আর গাড়িতে গেলে দশ মিনিট।ফেটিক্স থামলো না, যেন তার প্রতিটি তথ্য আগেই প্রস্তুত ছিল।
আবরার চুপচাপ শুনে গেলো চোখে কোনো বিস্ময় নেই, শুধু নিঃশব্দে এক ধরনের সন্তুষ্টি।
শেষ কথা বলেই ফেটিক্স মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো।
রুমের ভেতর একধরনের গা-ছমছমে নীরবতা ছড়িয়ে আছে।সূর্যের আলো এখন পুরোপুরি জানালায় এসে পড়েছে, কিন্তু সেই আলোতেও আবরারের মুখে কোনো উষ্ণতা নেই শুধু কঠিনতা।
বিছানায় থেকে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো আবরার
তার চোখে সেই আগের মতোই লালচে দীপ্তি এক অদ্ভুত তেজ, যা দেখলে কারো সাহস থাকে না চোখ মেলানোর।
গম্ভীর কণ্ঠে বললো,যাও, গাড়ি রেডি করো।
ফেটিক্স এক মুহূর্ত দ্বিধায় পড়ে গেলো।ও জানে যখন আবরার নিজে বের হতে চায়,সেটা কখনোই ভালো লক্ষণ নয়।তবুও সাবধানে বললো,কিন্তু স্যার…!
আর কিছু বলার আগেই আবরার ধীরে মাথা ঘুরিয়ে তাকালো ওর দিকে।চোখের মণি টকটকে লাল,দৃষ্টি যেন ছুরি নির্মম, নিঃশব্দ, ভয়ঙ্কর।ফেটিক্সের গলা শুকিয়ে গেলো।এক মুহূর্তেই সমস্ত সাহস গিলে ফেললো নিজের মধ্যে।মাথা নিচু করে বললো,জি, স্যার।
তারপর দ্রুত রুম থেকে বেরিয়ে গেলো।
দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দের সাথে সাথে রুমে আবার নেমে এলো নিস্তব্ধতা।আবরার কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো তারপর ধীরে ধীরে ঠোঁটের কোণে ফুটলো এক স্নান তীক্ষ্ণ অশুভ হাসি।
সেই হাসিটা যেন বাতাসকেও থামিয়ে দিলো এক মুহূর্তের জন্য।আবরার নিঃশব্দে জানালার দিকে তাকালো, চোখে এক অদ্ভুত মুগ্ধতা,তারপর খুব আস্তে, প্রায় ফিসফিস করে বললো,কুহেলি কিন্তু আমি তোমাকে কুকিল পাখি বলেই ডাকবো।রেডি হও, কুকিল পাখি আমার রাজ্যে বন্দি হওয়ার জন্য।তার কণ্ঠে ছিল না ক্রোধ, ছিল এক শীতল নিশ্চিততা যেন সে জানে, পৃথিবীর যেখানেই যাক না কেন,কুহেলি তার রাজ্যের বাইরে কখনোই যেতে পারবে না।
এক ঘণ্টা পর…!
আবরার দরজার সামনে দাঁড়ালো চুপচাপ,ধীর।
ওর মুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট, তবুও চোখে সেই পুরোনো আগুনের ঝিলিক।পড়েছে ধূসর রঙের শার্ট, যার বোতাম খোলা দুই পর্যন্ত তার ওপর কালো ওভারকোট ভারী, তীক্ষ্ণ, রাজকীয়।কালো প্যান্ট, কালো বুট, আর চোখে ধোঁয়াটে সানগ্লাস যা তার চেহারার প্রতিটি রেখাকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে।
চুলগুলো নিখুঁতভাবে সেট করা নয় ইচ্ছে করেই এলোমেলো,যেন সে অরাজকতার মধ্যেই নিজেকে সাজায়।কব্জিতে রুপালি ব্যান্ড ঘড়ি,
আঙুলে ভারী রিং সব মিলিয়ে এক রাজকীয় নির্লিপ্ততা,যার নিচে লুকিয়ে আছে ভয়ংকর কিছু।
আবরার কিছু বললো না।কেবল ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগলো গাড়ির দিকে তার প্রতিটি পদক্ষেপের সাথে যেন প্রতিধ্বনি হচ্ছিলএকটা নিঃশব্দ ঘোষণা,যে আজ কেউ না কেউ তার সামনে নত হতেই হবে।গাড়ির সামনে পৌঁছাতেই দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা গার্ড দ্রুত এগিয়ে এলো সতর্ক ভঙ্গিতে গার্ড গাড়ির দরজা খুলে দিলো।আবরার একবারও তাকালো না তার দিকে শুধু সামনের সিটে গিয়ে বসল।স্টিয়ারিংয়ের পেছনে বসেছে ফেটিক্স।তার মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই শুধু চোখে দৃঢ়তা আর দায়িত্ববোধের এক অদ্ভুত মিশেল।
গাড়ি ধীরে ধীরে ক্লাব ছেড়ে বেরিয়ে এলো।ইঞ্জিনের শব্দ নিস্তব্ধ সকালটাকে কাঁপিয়ে তুললো।
ফেটিক্সের হাতের হালকা ইশারায় পিছনে আরও চারটা কালো গাড়ি সার বেঁধে চলতে শুরু করলো
একটা নিঃশব্দ কনভয়,যেন কোনো অদৃশ্য রাজা যাচ্ছেন নিজের হারানো সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধার করতে।আবরার জানালার বাইরে তাকিয়ে রইলো।
চোখে সানগ্লাস, কিন্তু ঠোঁটে এখনো সেই অদ্ভুত হাসি খেলা করছেযে হাসির ভেতরে ভয় আর আনন্দের পার্থক্য বোঝা যায় না।
প্রায় দশ মিনিটের পথ রাস্তাটা ফাঁকা, হালকা কুয়াশা জমেছে,আর সূর্যের আলো এখনো পুরোপুরি ছড়ায়নি।গাড়িগুলো অবশেষে এসে থামলো এক পুরোনো দোতলা বাড়ির সামনে।বাড়িটা শান্ত, জানালার পর্দা টানা,বাইরে একটা পুরোনো আমগাছের ছায়া যেন বাড়িটাকে আরও নীরব করে তুলেছে।ফেটিক্স নিঃশব্দে বললো,স্যার, পৌঁছে গেছি।
সাথে সাথেই এক গার্ড দ্রুত দৌড়ে এসে দরজা খুলে দিলো।আবরার ধীরে ধীরে পা নামালো,যেন প্রতিটি পদক্ষেপে মাটির নিচে এক অদৃশ্য কম্পন ছড়িয়ে পড়ছে।ওর ধূসর শার্টের কলার হালকা বাতাসে দুলছে, আর চোখের চশমার আড়াল থেকে বেরিয়ে আসা লালচে দৃষ্টিটা যেন চারপাশের বাতাসকেও ভারী করে তুলেছে।
সে কিছু না বলে সোজা বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করলো।ফেটিক্স নিঃশব্দে পিছনে পিছনে চলছে একটাও শব্দ না করে, ঠিক যেমন ছায়া চলে আলোর পাশে।আবরারের বডিগার্ডরা কুহেলি দের বাড়ির চারপাশে ঘিরে ফেললো জায়গাটা।পুরো বাড়িটাই মুহূর্তে যেন বন্দি হয়ে গেলো একটা নিঃশব্দ যুদ্ধক্ষেত্র,যেখানে শুধু আবরারই জানে সে কী চায়।
বাড়ির সামনে গিয়ে আবরার থামলো একবার।
চোখ তুলে তাকালো সামনের দিকে দরজাটা আধখোলা,আর ভেতর থেকে কারও কণ্ঠ ভেসে আসছে।
সে এক মুহূর্ত পকেটে হাত দিয়ে চুপ করে দাঁড়ালো
মেয়েলি একটা গলা রাগ আর হতাশার মিশ্রণ এই কুহেলি! আজ সকাল থেকে কি করছিস তুই? রান্না করিসনি, রুম থেকেও বের হসনি! তিনবার ডেকেছি তাও কোনো সাড়া নেই!
আবরারের ঠোঁটে হালকা এক হাসি খেলে গেলো।
কুহেলি. নামটা উচ্চারণ না করেই যেন মনে মনে স্পর্শ করলো সে।
ভেতরে তখন রিনা রহমানের রাগে কণ্ঠ কেঁপে উঠছে।তিনি আবারও বললেন,এই মেয়েটার কিছু একটা সমস্যা আছে সারাদিন নিজের মতো থাকে, কে জানে কীসব ভাবছে!এমন সময় তিনি দরজার দিকে ঘুরে তাকালেন আর দেখলেন দুইজন অচেনা পুরুষ দাঁড়িয়ে আছে দোরগোড়ায়।রিনা এক পা এগিয়ে এসে বললো এই আপনারা কে? সাত সকালে আমাদের বাড়িতে এসেছেন কেন? কোনো দরকার থাকলে বলুন না থাকলে বেরিয়ে যান…!
রিনা রহমানের কথা শুনে ফেটিক্সের বুকের ভেতর ধকধক করছে।আবরারের সামনে কেউ ঠিকভাবে ভালো কথাই বলতে পারে না তার কণ্ঠের নিচে যেন একটা অদৃশ্য হুমকি লুকিয়ে থাকে।কিন্তু এই মহিলা…! এই সাহস কোথা থেকে পেলো? এমন ঠান্ডা অথচ কটাক্ষভরা স্বরে কথা বলছে, যেন জানেই না সে কাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
ফেটিক্সের কপালে ঘাম জমেছে। সে বুঝতে পারছে এখন যে কোনো মুহূর্তে ঝড় উঠবে।আবরার সাধারণত নীরব থাকে, কিন্তু যখন সে কথা বলে, তখন চারপাশের বাতাসও যেন কেঁপে ওঠে।
কিন্তু এবার যা ঘটলো, তা ফেটিক্সের কল্পনাকেও ছাড়িয়ে গেলো।
আবরার একটাও কথা না বলে ধীরে ধীরে বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেলো।তার প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গে মেঝে যেন হালকা কেঁপে উঠছে।ভেতরের সাজানো ড্রইংরুমে এসে সে এক মুহূর্ত চারপাশে তাকালো সাদা দেয়াল,একপাশে একটা ছোট্ট টেবিল,আর মাঝখানে গাঢ় বাদামি রঙের সোফা।
আবরার সোজা গিয়ে সেই সোফায় বসল।
চুপচাপ।তারপর ধীরে ধীরে পা তুলে অন্য পায়ের ওপর রাখলো,যেন এই পুরো বাড়িটা এখন তার রাজ্য।ফেটিক্স পেছনে দাঁড়িয়ে নিঃশ্বাস আটকে আছে।রিনা রহমান হতভম্ব, তার হাতের ওড়না কাঁপছে।
আবরার একটু মাথা কাত করে তার দিকে তাকালো। তার লাল মনিওয়ালা চোখে দিয়ে তীক্ষ্ণ ভাবে তাকালো রিনা রহমানের দিকে তারপর তার সেই চিরচেনা গম্ভীর, ধীর কণ্ঠে বললো,আমি বেশি কথা বলতে বা শুনতে একদম পছন্দ করি না…!একটা ছোট্ট বিরতি।তারপর সে ঠোঁটের কোণে স্নান হাসি ফুটে উঠলো। বরং আমি বেশি হাত চালাতে বেশি পছন্দ করি।
রিনার শরীর জমে গেলো।ফেটিক্স মাথা নিচু করে ফেললো সে জানে, আবরারের কথা মানেই
ঘূর্ণিঝড় শুরু হবার আগের নিস্তব্ধতা।
চলবে.....!
Share On:
TAGS: তাসনিম তালুকদার বুশরা, মাই টক্সিক হাসব্যান্ড
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ৯
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ৪
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ৬
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ৮+স্পেশাল
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ১
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ৭
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড গল্পের লিংক
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ৩
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ৫
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ১০