ভালোবাসার_সমরাঙ্গন ||অন্তিম||
সারিকা_হোসাইন
আজকের রাতের আকাশটা পরিস্কার।আকাশে মস্ত বড় চাঁদ উঠেছে।বোধ হয় পূর্ণিমা রাত।চারিধার দিনের আলোর ন্যয় স্পষ্ট।ফিনফিনে শীতল বাতাস বয়ে চলেছে থেকে থেকে।বাতাসে জেসমিনের সুবাস।
রণ আর মৌনতা যখন কুসুমপুর পৌছালো তখন ঘড়িতে সময় রাত এগারোটা।অত্যাধিক গ্রাম হওয়াতে এখানকার পরিবেশ অধিক স্তব্ধ আর গা ছমছমে।আশেপাশে কোনো বৈদ্যুতিক আলোর ছিটেফোঁটা নেই।নেই মানুষের হাঁকডাক।যেনো ঘুমন্ত ভয়াল রাক্ষসপুরি।দূরে শেয়ালের পাল হুক্কাহুয়া শব্দের রব তুলেছে।তাতে ভয়ে মৌনতা অল্প শিউরে উঠলো।কুসুমপুরে সে এসেছিলো খুব ছোট বেলায়।তাও দিনের বেলায়।সঙ্গে শায়লা সহ বাড়ির সকলে ছিলো।কিন্তু আজকের আগমন ভিন্ন।এখানে তার প্রানের মানুষটি ব্যতীত আর কেউ নেই।
মৌনতার হঠাৎ বুক কেঁপে উঠলো
“যদি ডাকাত এসে সব লুটে নেয়?
পরক্ষণেই মনে পড়লো তার প্রানের স্বামী একাই যথেষ্ট সেসব ডাকাতের জন্য।
“কি ভাবছিস এভাবে?ভেতরে যাবি না?
রণ’র আকস্মিক ঠান্ডা গলায় মৌনতার ভাবনার সুতো কাটলো।গাড়ি থেকে না নেমে সে আগডুম বাগডুম ভাবনায় মশগুল ছিলো ভেবেই দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে মাথা নাড়ালো।অতঃপর গাড়ি থেকে নেমে চারপাশে এক পলক নজর বুলালো।
চাঁদের ফর্সা আলোয় কাঠের তৈরি দূতলা বাড়িটি কেমন রাজ প্রাসাদতুল্য মনে হচ্ছে।বাড়ির চারপাশে ঘেষে বড় বড় সেগুন মেহগনি আর আগর গাছের সারি।দুই একটা জবা আর জারুলের গাছ আছে।এখন জারুলের মৌসুম নয়।শুধু হলদেটে পাতা গাছ জুড়ে ।মৌনতা রণ’র কাছ ঘেষে বললো
“অন্ধকার কেনো ভেতরে?কারেন্ট নেই?
রণ গাড়ি থেকে নিজেদের লাগেজ বের করতে করতে বলল
“এখানে এখনো বিদ্যুতের ছোয়া আসেনি।
“তাহলে?
“তাহলে কি?
“অন্ধকারে কিভাবে কি করবো?
“অন্ধকারেই তো ভালো।লজ্জা পাবি না।আলো থাকলে খুশি হতি বুঝি?
মৌনতা মাছি মারার ভঙ্গিতে চোখ মুখ কুঁচকে বললো
“ধ্যাত সারাক্ষন খালি বাজে বকে,আলো ছাড়া ভেতরে ঢুকে চুপ করে বিছানায় বসে থাকবো?
“তা থাকবি কেন?পটের বিবি হয়ে বসে থাকতে এখানে নিয়ে এসেছি?
“আমি কিন্তু এবার রেগে যাচ্ছি রণ ভাই।
রণ লাগেজ নিয়ে হনহন করে ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বলে উঠলো
“এখানে দাঁড়িয়ে বিদ্যুতের রচনা লিখতে থাক।একটু পর বাগডাসা এসে কাম ড়ে খেয়ে ফেলবে তোকে।
বাঘের মত দেখতে কদাকার প্রানী টির চেহারা চোখে ভাসতেই রণ’র বাহু খামছে ধরলো মৌনতা।এরপর কন্ঠ চেপে বললো
“আমার ভয় লাগছে।মনে হচ্ছে আশেপাশে কেউ দেখছে আমাদের।
ঘরের তালা খুলতে খুলতে রণ বলল
“আলবাত দেখছে।
মৌনতা ভয়ে গুটিয়ে ফাঁকা ঢোক গিলে শুধায়
“কে দেখছে?
“ভুতে দেখছে।
বলেই ঘরে ঢুকে পড়লো রণ।ভুতের ভয়ে মৌনতা হুড়মুড়িয়ে ঘরে ঢুকে ধাম করে দরজা লাগিয়ে দিল।নীরব প্রকৃতির মাঝে দরজার শব্দ ভয়ানক হুংকার তুললো।
ঘরের এক কোনে টিমটিমে হ্যারিকেন জ্বলছে।তার আলোয় ঘরটা কমলা রঙে ভরে উঠেছে।মৌনতা ঘরে ঢুকে কমলা রঙা আলোয় ঘরের চারপাশে নজর বুলালো।বৃহৎ ঘরের কোণে ডাবল সাইজের এক খানা বিছানা।তাতে ধবধবে সাদা চাদর বিছানো।লাল গোলাপের পাপড়ি দিয়ে বিছানায় লাভ বানানো।গ্রামের কেউ করেছে মনে হচ্ছে।বিছানার পাশের বড় ফুলদানিতে বাহারি তাজা ফুল।সেগুলো মন মাতানো সুবাস ছড়াচ্ছে।কোণের ছোট টেবিলে এক গ্লাস দুধ দেখা যাচ্ছে।দুধ টুকু দেখে মৌনতা লজ্জা পেলো।সে ঠোঁট কামড়ে হাসি রোধ করে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।রণ খেয়াল করলো তা।অতঃপর বললো
“তুই বললে খাবো।
মৌনতা ইতস্তত করে মিনমিন গলায় বলল
“এমনিতেই অসুরের শক্তি তোমার গতরে।
আর কোনো কথা হলো না।রণ ঠোঁট বাকিয়ে হাসলো।বললো
“কাপড় পাল্টে নে।অনেক রাত হয়েছে।ঘুমুতে হবে।
মৌনতা ঠোঁট ফুলিয়ে শ্বাস ফেলে বললো
“গোসল করতে হবে।প্রচন্ড অস্থির লাগছে।
রণ চোখ মেলে মৌনতা কে দেখলো।বললো
“বাইরে কল পাড়ে গোসল করতে হবে।এখানে রুমের ভেতর ওয়াশরুম নেই।পারবি?
খোলা বৃহৎ গ্রিল ওয়ালা জানালা দিয়ে বাইরে উকি দিলো মৌনতা।শেয়ালের দল আরো জোরসে খেপেছে।কিন্তু শরীর ও চুলকাচ্ছে।গোসল না করলে রাতে তার ঘুম ই হবে না।মৌনতা আই ঢাই করে বললো
“তুমি ও চলো।
রণ লাগেজ থেকে নিজের পোশাক বের করে ওপর রুমে গিয়ে পাল্টে নিলো।বেরিয়ে এলো উদোম গায়ে একটা ট্রাউজার পরে।মৌনতা এক পলক দেখে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো।অতঃপর নিজের শাড়ি খোলার জন্য অন্য রুমে পা বাড়ালো।রণ যেতে দিলো না।চেপে ধরলো মৌনতার হাত।মৌনতার একদম সন্নিকটে এসে ফিসফিস গলায় বললো
“এখানেই চেন্জ কর।
বিস্ময়ে বিস্ফারিত হলো মৌনতার বড় বড় চোখ জোড়া।সে কপাল কুঁচকে বললো
“ছি ছি,লাজ শরমের ব্যাপার আছে।
রণ আরেকটু কাছে এলো মৌনতার।অতঃপর হাস্কি স্বরে বললো
“লাজ শরম কি ছুঁয়ে ভেঙে দিই নি আমি?
মৌনতা মুচড়ে হাত ছাড়িয়ে লজ্জানত মুখে বললো
“চক্ষুলজ্জা বলতে কিছু তো আছে নাকি?
রণ ঠোঁট উল্টে শুধায়
“ওহ রিয়েলি?খুব লজ্জা হচ্ছে এখন?সকালেই কিসব দেখাচ্ছিলি! তখন?তখন চক্ষুলজ্জা হানা দেয় নি?
মৌনতার মনে পড়লো সকালের ঘটনা।এবার সে মিইয়ে গেলো।পালাতে চাইলো।রণ দিলো না।উল্টো সুগন্ধি মোমে আলো জ্বালিয়ে বিশেষ ভাবে আলোকিত করলো পুরো কামরা।কামরা জুড়ে হলদু কমলা আলো আর ম ম করা সুগন্ধ।রণ দৃঢ় পদচ্ছাপে এগিয়ে এলো মৌনতার একদম কাছে।হাত বাড়িয়ে বাধাহীন মৌনতার কাঁধের আঁচল সরালো।উন্মুক্ত হলো ফর্সা কাঁধ।কোমল উষ্ণ আলোয় বেশ মোহনীয় লাগলো তা।রণ হোঁচট খেতে নিয়ে সামলে নিলো নিজেকে।ধীরে ধীরে আলগা হলো শাড়ির কুচি।দৃশ্যমান মেদ হীন কোমল উদর।এবার আগ্রাসী হলো রণ।নিজের শক্ত কঠিন হাত দিয়ে সজোড়ে চেপে ধরলো মৌনতার কোমর।ব্যথায় কোকিয়ে রণ’র হাত শক্ত করে চেপে ধরলো মৌনতা।মৌনতার বেদনার্ত মুখ খানা এক পলক দেখলো রণ।তাচ্ছিল্য হাসলো।এরপর আলতো মৌনতার গলা চেপে ধরে অন্য হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে নির্দয়ের মতো মুছে দিলো অধরের লাল রঙ।ধীরে ধীরে মৌনতার সৌন্দর্য বেকাবু করলো রণ কে।নিজের খেই হারিয়ে মৌনতার চুলের মুঠি চেপে ধরে রণ কাতর গলায় বললো
“সর্বনাশী!
মৌনতার শ্বাস ঘন হয়ে আসছে।ক্রমাগত বুক উঠানামা করছে।রণ মৌনতা কে টেনে চেপে ধরলো টেবিলের সাথে।কোমড় চেপে উঁচু করে বসালো টেবিলটায়।অস্থির হাতের ছুটোছুটি তে ঝনঝন শব্দে পরে গেলো দুধের গ্লাস খানা।সেসব কেউ গায়ে মাখালো না।আদিম প্রবৃত্তি হানা দিলো শরীরে।ক্ষয়ে ক্ষয়ে নিভে গেলো মোম।হারিকেনের শলতে ফুরিয়ে আলো ক্ষীন হয়ে ঘর অন্ধকার হলো।কিন্তু তার হিসেব রাখলো না কেউ।শুধু মৌনতার ভগ্ন গলার কাতর স্বর বন্দি হলো অন্ধকার ঘরের কোণে।
রাতের গভীরতার সাথে মিলিয়ে চাঁদের স্থান পরিবর্তন হয়েছে।খামার বাড়ির পশ্চিম পাশে বিশাল দীঘি।তার পাড়ে বাঁশের তৈরি মজবুত মাচা।সেই মাচায় রণকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে বসে আছে মৌনতা।দুজনের দৃষ্টি দীঘির জলে নিবদ্ধ।চাঁদের রুপালি আলোয় থৈথৈ জল চিকচিক করছে।যেনো সদ্য গলানো রুপার তরল।
মৌনতার চুলে বিলি কাটতে কাটতে রণ বলে উঠলো
“তোকে একটা কথা বলা হয়নি!
মৌনতা উৎসুক চোখে রণ’র পানে তাকালো।রণ এক পলক দৃষ্টি মেলে চোখ সরালো।কথাটা কিভাবে বলবে বুঝে উঠতে পারছে না।অপরাধ বোধ কাজ করছে রণ’র মধ্যে।মৌনতা কেমন রিয়াক্ট করবে সেটাও অজানা।রণ ফস করে শ্বাস ছেড়ে মৌনতার বাহু জড়িয়ে কপালে কপাল ঠেকালো।অতঃপর চোখ নামিয়ে বললো
“আজ ভোরেই আমি মিশনে চলে যাবো মৌনতা।দুই বছর আমাকে ছাড়া তোর একা থাকতে হবে।জানি কষ্ট হবে।কিন্তু আমি নিরুপায়।আমি জানি তুই পারবি।জেনে বুঝেই তো তুই আমায় বিয়ে করেছিস তাই না?
মৌনতা যেনো দুঃস্বপ্ন দেখছে।সবটাই বিষাদের ঘোর মনে হচ্ছে তার কাছে।বড় বড় চোখের কোটর গুলো জলে ভরে উঠল আকস্মিক।মৌনতা কথা বলতে ভুলে গেলো।নোনতা ধারা ভাসিয়ে দিলো গোলাপি কপোল।ললাটে অবিশ্বাসের ভাঁজ।নাকের নরম পাতা ফুলে ফুলে উঠছে শুধু।মৌনতা রণ’র শার্টের কলার চেপে ধরে ঠোঁট টিপে ফুঁপিয়ে উঠলো।কোনো জবাব তার কাছে নেই।রণ কাঁদতে দিলো মৌনতা কে।কিছুক্ষন আগের সুখানুভূতি আর্তনাদে রূপ নিলো।রণ অসহায় নিজের প্রাণাধিক প্রেয়সীর অশ্রুফোটা গুনতে লাগলো।কিছু সময় অতিবাহিত হতেই মৌনতা নাক টানলো।হাতের উল্টো পিঠে চোখ মুছে ঠোঁট উল্টে বাচ্চাদের মতো আবদার জুড়লো
“আমাকেও লাগেজে ভরে তোমার সঙ্গে নাও রণ ভাই।নয়তো প্রাণে যে বাঁচবো না।
রণ সেই আবদারে কেমন কেঁপে উঠলো।ভালোবাসায় বুঝি এতোটাই মাদকতা আর যন্ত্রনা?সত্যি ই ব্যাগে ভরে মৌনতাকে নিতে পারবে সে ওই দূর দেশে?
রণ মৌনতা কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো।মাথার তালুতে চুমু খেয়ে বললো
“দুই বছর দেখতে দেখতে কেটে যাবে।
“তুমি পারবে আমাকে ছাড়া থাকতে?কষ্ট হবে না?
“তোকে ছাড়া থেকেছি না সীমান্তে?তখন কি তুই জানতি তোকে আমি কতোটা ভালোবাসি?ভালোবাসা প্রকাশ না করতে পারার বিরহ তো আরো মারাত্মক যন্ত্রণাদায়ক।সেই যন্ত্রনা আমি একা সয়েছি।তুই তো খবর ও রাখিস নি।
আশা ভরা দৃষ্টি নিয়ে মৌনতা শুধায়
“প্রতিদিন ভিডিও কল করবে বল?
“সপ্তাহে একদিন করবো।তাও দুই মিনিটের জন্য ।ওখানে প্রত্যেকটা মুহুর্ত ইম্পরট্যান্ট।
মৌনতার আশা ভেঙে গুঁড়িয়ে গেলো।সে রণকে ছেড়ে মাচা থেকে নেমে দাঁড়ালো।অতঃপর ঘরের দিকে অগ্রসর হয়ে বলল
“পারলে লুকিয়ে চলে যেও।নয়তো আমি নিজেকে আটকাতে ব্যর্থ হবো।তোমাকে আমি কিছুতেই যেতে দেবো না।তোমাকে কাছে পাবার ব্যাপারে আমি শতভাগ স্বার্থপর।
রণ মৌনতার পেছন পেছন গিয়ে মৌনতা কে পাজা কোলে তুলে ঘরের ভেতর ঢুকে দরজা আটকে দিলো।বিছানায় পরম যত্নে মৌনতা কে শুইয়ে শক্ত বাহুতে আবদ্ধ করলো।নীরবে চোখের জল গড়ালো মৌনতার চোখ দিয়ে।সেই জল ভিজিয়ে দিলো রণ’র বলিষ্ঠ বাহু।হাতের বন্ধন আরেকটু শক্ত করে মৌনতার অধরে অধর ছোয়ালো রণ।কাঁদতে কাঁদতে ঘুমের ঘোরে ঢলে পড়লো মৌনতা।
রণ মৌনতার ভেজা পাপড়িতে নাক ঘষে বলে উঠলো
“কত সহজে কেঁদে কষ্ট গুলো উজাড় করলি।অথচ আমি হাহাকার টুকু করতে পারলাম না।বুক ফেটে দগদগে হলো।রক্ত ক্ষরণ হলো হৃদয়ে।ভাঙনের তোলপাড়ে কেঁপে উঠলো রূহ।অথচ আমি নির্বিকার রইলাম।কারন আমি পুরুষ মানুষ।তার চাইতেও বড় কথা আমি দেশের সেবক।
সূর্যের তেজী আলো যখন ধরনীতে উত্তাপ ছড়ালো তখন মৌনতার ঘুম ভাঙলো।পিটপিট চোখ মেলে চারপাশে নজর মেলতেই গত রাতের কথা মনে পড়লো।মৌনতা ত্বরিত বিছানায় উঠে বসে আর্তনাদ করে চিৎকার করলো
“রণ ভাই!
কিন্তু কোনো সাড়া নেই।মৌনতা হাটু ভাঁজ করে কপাল ঠেকিয়ে শব্দ করে কেঁদে উঠলো।চোখের জলে বুক ভিজে গেলো।কত সময় ধরে কাঁদলো তার ঠিক নেই।দুপুরের প্রারম্ভে মাহির এসে ব্যথিত গলায় বললো
“বাড়ি চল।
মির্জা বাড়িতে ফেরার পর রণ’র ফাঁকা ঘরটাতে স্থান হয়েছে মৌনতার।ঘরের চারিকোণে রণ’র স্মৃতি ছড়ানো।বাতাসে রণ’র শরীরের গন্ধ।সব আছে এই ঘরে শুধু নেই রণ।দেয়ালে আর্মি পোশাকে রণ’র বিশাল এক ছবি বাঁধানো।তার সাথেই বকবক করে কাটে মৌনতার সময়।এদিকে মৌনতার এসএসসি পরীক্ষা ঘনিয়ে এসেছে।মৌনতা আজকাল পড়াশুনায় প্রচুর মেধা খাটায়।সপ্তাহে নিয়ম করে গভীর রাতে কথা হয় দুজনের তাও খুব কম সময়ের জন্য।প্রথমে কষ্ট পেলেও নিজেকে সামলে নিয়েছে মৌনতা।মৌনতা শুধু সময় গুণে।কত মাস,কত দিন,কত ঘন্টা,কত সেকেন্ড পর রণ’র সান্নিধ্য পাবে সেই হিসেবে কসেই পেরিয়ে যায় তার সকল সন্ধ্যা।
রাত দিন পড়াশোনা করে ফেইল হওয়া বিষয় গুলোতে পরীক্ষা দিয়েছে মৌনতা।রেজাল্ট বের হবে দুই একের মধ্যেই।এবার আর মৌনতা রেজাল্ট নিয়ে ভয় পায়না।তার বিশ্বাস সে ভালো রেজাল্ট করবেই করবে।
হলোও তাই।সৌম্য জানালো মৌনতার সাবজেক্ট দুটোতে” এ” গ্রেড মার্ক এসেছে।মৌনতা খুশিতে উৎফুল্ল হলো।কখন রণ কে জানাতে পারবে কথাটা তার আর তর সইলো না।দিন রাত মাড়িয়ে ছয় দিন বাদে কথা হলো
“ভালো রেজাল্ট এসেছে রণ ভাই।
খুশিতে অমায়িক হাসলো রণ।অতঃপর বললো
“কি গিফট চাস বল
“খুব দ্রুত তোমাকে চাই।বিরহ মোহনায় রাত কাটছে।
সময় শেষ,কল কেটে গেলো।মৌনতা হতাশা মিশ্রিত শ্বাস ফেললো।দম বন্ধ লাগছে ।এক সঙ্গে কাটানো স্মৃতি গুলো কষ্ট দিচ্ছে।
বেলকনিতে গিয়ে অল্প ফুঁপিয়ে কাঁদলো মৌনতা।নিজেকে নিজেই বুঝ দিলো
“জেনে বুঝে বিষ খেয়েছি আমি।বাঁচার আশা করা বোকামি।
কলেজের দিন গুলো ভালো ভাবে কাটতে লাগলো মৌনতার ।নতুন নতুন বন্ধু হয়েছে তার।মেয়ে দুটো বেশ ভালো।মৌনতা কে এক মুহূর্ত মন খারাপ করতে দেয় না।আগলে নেয় পরম ভালোবাসায়।
দেখতে দেখতে মৌনতার ইয়ার চেন্জ শেষ হলো।হাতে প্রচুর সময়।কলেজ বন্ধ যাচ্ছে।শায়লা বাপের বাড়ি ঘুরতে যাবে তাই জন্য মৌনতাকেও জোর করলো।মৌনতা গেলো না।শায়লার ও যাওয়া হলো না।মৌনতার বড় মামা এসে জোরাজোরি করলো ঢাকা বেড়াতে যেতে।মৌনতা গেলো না।
দেওয়ান মির্জা নাতনির এহেন বেহাল দশা দেখে ডেকে বললেন
“এমন অগোছালো তোমাকে মানাচ্ছে না মৌনতা সাবেরি।নিজেকে গুছাও।আমার মনে হয় একজন আর্মি অফিসার কে বিয়ে করার আগে তোমার ভাবনা চিন্তার দরকার ছিলো তুমি আদৌ তার সহধর্মিণী হবার যোগ্যতা অর্জন করেছো কি না।মন দুর্বল হলে কি করে বাঁচবে তুমি?
মৌনতা মন ভার করে বাগানের জাম গাছে পাতা ঝোলনায় গিয়ে বসলো।যখন মনটা খুব খারাপ হয় তখন একাকী বসে থাকে সে।প্রকৃতির নির্মল বাতাস,ফুলের সুবাস আর পাখির কিচিরমিচির ডাক তার অশান্ত মনকে শান্ত করে।
মৌনতা আনমনে দোলনায় বসে চোখ বন্ধ করে দোলনার দড়িতে মাথা ঠেকিয়ে নিজেদের রোমাঞ্চকর মুহূর্তে মন খোয়ালো।
দোলনা দুলতে লাগলো ধীরে ধীরে।সময় গড়াতেই বাড়লো দোলের মাত্রা।এবার হাওয়ায় ভাসছে মৌনতা।দোলের তীব্রতা বাড়তেই মৌনতা তাল হারালো ।সে পরে যেতে নিলো।কিন্তু শক্ত পুরুষালি হাত তাকে আগলে নিলো নিজের সাথে।মৌনতা চোখ খুললো অবিশ্বাস্য ভঙ্গিতে।কিন্তু সে পিছন ফিরলো না।সবটাই ভ্রম মনে হলো।মৌনতা মানুষটার বুকে মাথা ঠেকিয়ে নীরবে কেঁদে ফেললো।মানুষটা ঠোঁট বাকিয়ে হাসলো।ঝটকায় তুলে নিলো কোলে।অতঃপর ছুটলো নিজেদের ঘরে।
“কত অভিযোগ জমেছে বল দেখি!
মৌনতা হাতের আজলায় রণ’র রোদে পুড়ে যাওয়া তামাটে মুখমুন্ডল ভরে তীক্ষ্ণ নাকের ডগায় ঠোঁট ছোয়ালো।বললো
“একটাও না।
রণ প্রসারিত হাসলো।মৌনতা রণ’র মাথার চুলে হাত বুলিয়ে বললো
“নিজের যত্ন নাওনি কেন?
“যত্ন নেবার মানুষটা এখানে পরে ছিলো তাই।
রণ’র খসখসে শুষ্ক ঠোঁটে ছোট চুমু একে মৌনতা বলল
“চারমাস,নয়দিন, ছয় ঘন্টা,চুয়াল্লিশ সেকেন্ড আগে ফিরে এসেছো তুমি!
রণ ফিক করে হেসে মৌনতা কে বুকে জড়ালো।ঠান্ডা কোমল গলায় বলল
“বড্ড জ্বালাচ্ছিলো তোর উন্মাদনা ভরা নখের আঁচড় গুলো।এজন্য তল্পিতল্পা গুটিয়ে ভেগে আসতে হলো।
মৌনতা আলতো কিল বসালো রণ’র বুকে।
“তুমি চূড়ান্ত ঠোঁট কাটা নির্লজ্জ্ব লোক।ছি, মিশবোনা তোমার সাথে।
রণ ফিসফিস করে মৌনতার কানের কাছে মুখ নিয়ে বললো
“মিশিস না।নয়তো আমার মতো নিগ্রো বেড়ে উঠবে তোর পেটে।
মৌনতা রণ’র বুকে মুখ লুকালো।রণ মৌনতা কে আরেকটু লজ্জা দিতে শুধালো
“আপনি প্রস্তুত মিসেস রণ?
লজ্জায় লুটিয়ে মৌনতা আধমরা হলো।বেসামাল গলায় বলল
“জানিনা”
“আমি জানি”
মৌনতা চোখ বুজে ফেললো।
“ইস কি লজ্জা!
রণ নেশালো গলায় বললো
“দেড় বছরের ক্ষুধার্ত আমি।পুরো খেয়ে ফেলব তোকে।
মৌনতা দৌড়ে পালাতে চাইলো।কিন্তু বদ্ধ দরজায় রণ’র হাতে ধরা পড়লো।বিসর্জন দিতে হলো নিজেকে।রণ ভালোবাসার উষ্ণ চাদরে মৌনতা কে বন্দি করে বলে উঠলো
“একেলা পাইয়াছি রে জান
এই বন্ধ ঘরে……
আজ পাশা খেলবো রে বউ…..
-----////সমাপ্ত////-----
Share On:
TAGS: ভালোবাসার সমরাঙ্গন, সারিকা হোসাইন
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ৯
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ১৮
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ২০
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ৮
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ২৪
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ১
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ২৭
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ৩০
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ১২
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ৩৮