ভালোবাসার_সমরাঙ্গন ||৩৮||
সারিকা_হোসাইন
চোখের সামনে জীবিত আর্মি পোশাক পরিহিত শক্ত চোয়ালের লম্বা চওড়া আর্মি অফিসার কে দেখে ক্ষণকালের জন্য মস্তিষ্ক বিকল হলো নোমানের।চোখের পলক ফেলতে ভুলে গেলো সে সেই সাথে শ্বাস টাও আটকে রইলো গলার কাছে।রণ আর্মি পুলিশের ভীড় ঠেলে টেবিলের সামনে এসে ঝুকে বাঁকা হেসে বলে উঠলো
“তুমি বড্ড আনাড়ি হাতের খেলোয়াড় নোমান শাহরিয়ার।এত বোকা হলে হয় বল?
নোমান ফাঁকা ঢোক গিললো।এত সহজে তার পতন হতে পারে না।এত সহজে আর্মি পুলিশ তাকে ধরে চার দেয়ালে বন্দি করতে পারে না।নয়তো নিজের শরীরে কাপুরুষ আর বোকার দাগ লাগবে বিশ্রী ভাবে।নোমান তপ্ত শ্বাস ফেললো,নিচের দন্তপাটি দিয়ে ঠোঁট কামড়ে ধরলো।অতঃপর আয়েশ করে খেতে আরম্ভ করলো।মুরগির লেগ পিসে বড় কামড় বসিয়ে চোখ বুজে চিবুতে আৰম্ভ করলো।গোগ্রাসে নয় বরং ধীরে সুস্থে খেলো প্রত্যেকটা খাবার।মৌনতার ঘেন্না হলো মানুষটার প্রতি।মনে মনে মৌনতা নির্লজ্জের চরম সীমায় ভূষিত করলো নোমান কে।কিন্তু তাতে নোমানের কি আসে যায়?
খাওয়া শেষ করে আঙ্গুল চাটতে চাটতে নোমান অনুর উদ্দেশ্যে বলে উঠলো
“তোদের বাড়িতে এভাবে মেহমানদারী হয়?খেতে দিয়ে জেল জরিমানা?আগে তো বলিসনি এবাড়িতে খেতে বসলে জেলের সাজা গুনতে হবে?
অনু চোখ নামিয়ে নিলো।গত রাতেই নোমান সম্পর্কে গায়ে কাঁটা দেবার মত কথা সৌম্যের থেকে শুনেছে সে।অনুর পানে তাকিয়ে তাচ্ছিলো হাসলো নোমান।অতঃপর উঠে দাঁড়ালো টেবিল ছেড়ে।দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললো
“যেতেই যখন হবে তখন একটু চুলটা আঁচড়ে নেই মেজর সাহেব।পত্রিকায় ছবি উঠবে কি না!ছবিতে চেহারা সুন্দর হওয়া চাই।নোমান শাহরিয়ার কি আর বিধ্বস্ত অবস্থায় জেলে যেতে পারে?
রণ নাক ফুলিয়ে নিজের রিভলবার নোমানের দিকে তাক করে হিংস্র গলায় বলে উঠলো
“আমার সাথে বেশি চালাকি একদম করবে না।তোমাকে ক্রস ফায়ার এর ওর্ডার আছে উপর থেকে।কিন্ত আমি এতোটা নিষ্ঠুর হতে চাইছি না।ভালোই ভালোই চলো।অহেতুক দেরি করছো।পোলাও মাংস খাবার সময় দিয়েছি সেই ঢের।
নোমান শুনলো না রণ’র ফাও লেকচার।সে পকেটে হাত ঢোকালো।মুহুর্তেই সারি সারি বন্দুক তাক হলো নোমানের দিকে।নোমান পকেট থেকে চিরুনি বের করে সকলের উদ্দেশ্যে দেখিয়ে বললো
“আরে ভাই চুল ই আচড়াতে চেয়েছি আর কিছু নয়।সামান্য চুল আচড়ানোর দোষে এত কামান দাগা?দেশের সেবক এত নিষ্ঠুর?আহ খুব দুঃখ পেলাম মনে ভাই খুব দুঃখ!
বলেই “ইউ ক্যান নেভার কিল মি” শিস বাজালো নোমান।চুল আচড়ানো অবস্থায় রণ নির্দেশ দিল পুলিশ অফিসার নেহাল কে
“এরেস্ট হীম”
নেহাল এগিয়ে আসার আগেই চতুর হাতে সুকৌশলে মৌনতা কে নিজের কাছে টেনে ওপর হাতে বুক পকেটে থাকা বন্দুক মৌনতার মাথায় ঠেকিয়ে নোমান কিটকিটিয়ে হেসে উঠলো।চোখের পলকেই ঘটনাটা ঘটে গেলো।কেউ যেন কিচ্ছুটি বুঝতে পারলো না।মৌনতা ভয়ে ফুঁপিয়ে উঠলো,শায়লা আচঁলে মুখ গুজে বিস্ফারিত তাকিয়ে রইলেন।সৌম্য চোয়াল চেপে ধমকে উঠলো
“মৌনতা কে ছেড়ে দে তুই।নয়তো ভুলে যাবো তুই অনুর ভাই।
নোমান হেঁয়ালি হেসে বললো
“তাতে কি এসে যায় সৌম্য মির্জা?
রণ গর্জে বলে উঠলো
“তুই লিমিট ক্রস করে গেছিস নোমান।খুব পস্তাবি।
নোমান এক ভ্রু উঁচিয়ে ঠোঁট বাঁকালো।বললো
“তোমার বৌ আমার হয়ে গেলে আমি সব ভুলে যাবো মেজর ।অনেক ভালো সেজে থাকা হয়েছে।ধৈয্যে আর কুলাচ্ছে না।জোর জবরদস্তি না চালালে এই মেয়ে এমনিতেও আমার হবে না।তাছাড়া আগেই জানতাম তুমি আমাকে পাকড়াও করবে ।সব প্রস্তুতি নিয়েই মাঠে নেমেছি।খেলায় কে জিতে কে হারে সেটা এখন দেখার পালা।
নোমানের শক্ত থাবা মৌনতার ফর্সা হাতে লাল দাগের জ্বলুনি তুললো।মৌনতা নিজেকে ছড়ানোর চেষ্টা করলো।কিন্তু নোমান আরেকটু শক্ত করে চেপে ধরে মৌনতার কাঁধে থুতনি ছোয়ালো।নোমানের স্পর্শে মৌনতার শরীর রিরি করে উঠলো।ঘেন্নায় সর্বাঙ্গে আগুন জ্বললো।সেই আগুনে ঘি ঢেলে নোমান মৌনতার কান ছুঁইছুঁই ঠোঁট নিলো।মৌনতা কেঁদে ফেললো শব্দ করে।নোমান হিসহিস করে বলে উঠলো
“ভালোয় ভালোয় চলো।নয়তো এবার আর ভুল হবে না।মরার আগে তোমাকে আর তোমার রণ ভাইকে মেরে তবেই ক্ষান্ত হবো।আমি কতটা নিষ্ঠুর হৃদয়হীন তুমি কল্পনাও করতে পারবে না মৌনতা সাবেরি।আর সময় নষ্ট করো না তো।তাড়াতাড়ি চলো।
মৌনতার গাল ভেসে গেলো জলে।
দেওয়ান মির্জা উঠে এসে সপাটে এক চড় বসালেন নোমানের গালে।চিৎকার করে বললেন
“নির্লজ্জ্ব ফাজিল ছেলে।কোন সাহসে আমার নাতির শরীর স্পর্শ করেছ তুমি?এক্ষুনি ছেড়ে দাও বলছি।
নোমানের ক্রোধ সপ্তম আকাশ ছাড়ালো।সে কোনো কিছু বিবেচনা না করে বন্দুকের গ্রিপ দিয়ে আঘাত করলো দেওয়ান মির্জার কপালে।মুহূর্তেই ছিটকে পড়লেন বৃদ্ধ।সেই সাথে কেটে রক্তাক্ত হলো কপাল।সৌম্য দৌড়ে এসে দেওয়ান মির্জাকে চেপে ধরলো
“দাদা ভাই!
রণ তেড়ে এসে নোমানের সামনে দাঁড়ালো।নোমান ঠোঁট উল্টে বললো
“বেশি কাছে এসো না মেজর।নইলে তোমার বউয়ের খুলি উড়িয়ে দিতে এক মুহূর্ত সময় নেবো না আমি।
রণ দাঁতে দাঁত পিষলো।তাকালো আগত অফিসারদের দিকে।দাঁড়ালো নিরাপদ দুরুত্বে।বন্দুক তাক করলো নোমানের বরাবর।নোমান ঘাড় কাত করলো।পেছনে তাই ব্যাকআপ আছে।মুহূর্তেই তারা এসে ধরাশায়ী করবে সমস্ত অফিসার কে।সে অনায়াসে ধরে নিয়ে যাবে মৌনতা কে এরপর রচনা করবে সুখের সংসার।কিন্তু তারা এখনো আসছে না কেন?
মিনিট দশেক না যেতেও যখন কেউ এলো না তখন ঘাবড়ালো নোমান।নিজের ভয় লুকাতে মৌনতার হাত আরো চেপে ধরলো সে।নোমানের নখের আঘাতে মৌনতার বাহু কেটে রক্ত ঝড়লো।মৌনতা ভগ্ন গলায় বলল
“খুব কষ্ট পাচ্ছি রণ ভাই।
মৌনতার কষ্টভরা কন্ঠ রণ’র হৃদয় কাঁপিয়ে তুললো।যেটা না করতে বদ্ধপরিকর ছিলো সেটাই হৃদয়ে আগ্রাসী হয়ে হানা দিলো।দুই হাতে শক্ত করে চেপে ধরলো বন্দুকের গ্রিপ।অতঃপর মৌনতার চোখে চোখ রাখলো।রণ’র চোখের ভাষা বুঝলো মৌনতা।সে দুই কান চেপে চোখ বুজে রইলো।নিমিষেই কিছু বোঝার আগেই একটা বুলেট নোমানের কপাল ভেদ করে ওপাশের থাই জানালায় বিদ্ধ হলো।নোমান বড় বড় চোখ করে রণ’র পানে খানিক তাকিয়ে রইলো।এরপর মৌনতা কে নিয়েই মাটিতে লুটিয়ে পড়লো।মৌনতা চিৎকার করে উঠলো।মির্জা বাড়ির সকলেই আতংকে শক্ত হুই দাঁড়িয়ে রইলো।অনু চিৎকার করে উঠলো সর্ব শক্তি দিয়ে নিজের ভাইয়ের জন্য।রেহনুমা আর শায়লা নিজেদের স্থান থেকে নড়তে ভুলে গেল।রণ মৌনতা কে জাপ্টে ধরে নোমানের কাছ থেকে তুলে আনতে চাইলো।কিন্তু নোমান শক্ত করে ধরেই রইলো।অতঃপর গুঙিয়ে বলে উঠলো
“আমি সত্যই তোমাকে ভালোবেসে ছিলাম মৌনতা সাবেরি…
নোমানের তাজা রক্তে ভেসে গেলো ডাইনিং রুমের সাদা মেঝে।বড় বড় চোখ খুলে সেই রক্তের ধারায় চিৎ হয়ে পড়ে আছে নোমান।তার ফ্যাকাসে দৃষ্টি এখনো হাপিত্তেস তৃষ্ণা নিয়ে দেখে যাচ্ছে মৌনতা কে।একজন আর্মি সোলজার এসে সেই চোখ জোড়া বুজিয়ে দিলো।অতঃপর রণ নির্দেশ দিলো
“নিয়ে চলো তাকে।
নোমানের ঠিক করা লোক গুলোকে আগেই এরেস্ট করেছে আর্মি,এভার শুধু নোমান কে ধরে তুলে দেয়া হলো পুলিশের গাড়িতে।পোস্ট মর্টেম শেষে তাকে ফেরত দেয়া হবে।মির্জা বাড়ির সকলে নোমানের মৃতদেহের পানে ভীত দৃষ্টি দিলো।রেহনুমার মনে অল্প দরদ কাজ করলো।সাদনান মির্জা যেনো প্রাণে বাচলেন।তিনি কোনো দুঃখ করলেন না নোমানের এহেন অপমৃত্যুতে।বরং খুশিই হলেন।মৌনতা এখনো রণ’র বুকে গুটিয়ে আছে।একের পর এক ধকল সে আর নিতে পারছে না।শায়লা মৌনতা কে আগলে নিয়ে বলে উঠলো
“ঘরে চল।
মৌনতা নড়তে পারলো না।তার দৃষ্টি নোমানের রক্ত ধারায় নিবদ্ধ।মানুষটার ভয়ানক কন্ঠ বারবার কর্ণকুহরে বেজে চলেছে।শায়লা টেনে হিচড়ে মৌনতা কে ঘরে নিয়ে খিল দিলেন।পুলিশ নোমানের দেহ নিয়ে চলে গেলো।সঙ্গে গেলো সকলে।ম্যালা কাজ জমে আছে আর্মি হেডকোয়ার্টার এ ।
রণ যাবার আগে দেওয়ান মির্জাকে বলে উঠলো
“দুদিন পর বাড়ি ফিরবো।বিয়ের আয়োজন শুরু করো দাদা ভাই।
চলবে….
Share On:
TAGS: ভালোবাসার সমরাঙ্গন, সারিকা হোসাইন
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ১
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ১৩
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ২৯
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ২৪
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ১৬
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ৩১
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ৫
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ২
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ১৭
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ৯