Golpo ডিফেন্স রিলেটেড ভালোবাসার সমরাঙ্গন

ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ২৫


ভালোবাসার_সমরাঙ্গন ||২৫||

নিজের তৈরি করা জাল পরিচয় পত্র ব্যবহার করে মৌনতাকে নিয়ে একটি বিলাসবহুল হোটেলে এলো রণ।হোটেল ম্যানেজার পরিচয় পত্র দেখেই যা আন্দাজ করার করে ফেললেন।চোখে চোখে কথা হলো তার সাথে রণ’র।ম্যানেজার বেছে বেছে সুন্দর একটা রুমের চাবি রণ কে দিলো।রণ মৌনতা কে নিয়ে যখন লিফট ধরতে নিলো তখন একটা মেডিক্যাল বক্স নিয়ে দৌড়ে এলো ম্যানেজার।কোনো প্রকার বাক্য ব্যয় না করে সেটা রণ’র হাতে দিয়ে পুনরায় নিজের চেয়ারে গিয়ে বসলো।এমন অদ্ভূত মানবের সাথে রক্তাক্ত মেয়েটিকে দেখে হোটেলের অন্যান্য স্টাফ কানাঘুষা করতে আরম্ভ করলো।পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে হোটেল ম্যানেজার ধমকে বলে উঠলো

“যাও নিজের কাজে যাও।উনারা আমার নিকট আত্মীয়।

সকলেই আলগোছে ধমক শুনে সরে দাঁড়ালো।এমন সময় রণ’র টিমের বাকি সদস্য এসে ম্যানেজার এর সামনে নিজেদের কার্ড শো করে বলে উঠলো

“যতখন স্টে করবে ততক্ষণ কেউ যাতে একটা নক পর্যন্ত না করে।

ম্যানেজার মাথা ঝাকিয়ে সায় জানালো।বাকি টিম মেম্বার লবিতে অপেক্ষায় বসে রইলো।এয়ারপোর্ট এ সেরকম সন্দেহ জনক কাউকে পাওয়া যায়নি।রবিনকে হসপিটালে এডমিট করা হয়েছে।সে সুস্থ হলে ঘটনার পিছনে কার হাত রয়েছে তা জানা যাবে।হেড কোয়ার্টার এ খবর পৌঁছনো হয়েছে।বাকি বিষয় পুলিশ, গোয়েন্দা দেখবে।আপাতত সপ্তাহ খানেক ছুটি।কিন্তু সিটি পাস ছাড়া বাহিরে বের হওয়া নিষেধ।ক্যান্টনমেন্ট এই কাটাতে হবে বোরিং দিন গুলো।

মৌনতা কে হোটেল রুমের জানালার ধারের সোফায় বসালো রণ।ভয়ে মেয়েটা সিটিয়ে আছে।চোখ মুখ শুকিয়ে মলিন।ঠোঁট জোড়া শুষ্ক।চোখে ভয়।গলার ক্ষতটা থেকে এখন আর রক্ত ঝরছে না।রক্ত জমাট বেঁধে কালো হয়ে আছে।মৌনতার এমন করুন মুখায়ব দেখে রণ কাতর হয়ে মৌনতার পানে তাকিয়ে রইলো।মৌনতার সামান্য কষ্ট তার হৃদয়পুর সহ্য করতে পারছে না।বুকটা ভার হয়ে আছে অসহনীয় ব্যথায়।রণ’র ইচ্ছে হলো রবিন কে খু ন করতে।যদি মৌনতা এভাবেই মুখ ভার করে রাখে,যদি না হাসে তবে রবিনকে কিছুতেই বাঁচিয়ে রাখবে না রণ।মৌনতার চোখে মুখে ,অন্তরে শুধু রণ’র জন্য ভয় থাকবে।আর কারোর জন্য নয়।

মৌনতার মুখ পানে ব্যথিত নজরে তাকিয়ে হতাশা মিশ্রিত উষ্ণ শ্বাস ছুড়ে মেডিকিট বক্সটা খোললো রণ।ভেতর থেকে স্যাভলন,তুলা,ব্যান্ডেজ আর ওয়েন্টমেন্ট বের করলো। স্যাভলনে তুলো ভিজিয়ে মৌনতার দিকে হাত বাড়ালো রণ।জ্বলে উঠবে গলা সেই ভয়ে চোখ মুখ খিচে বন্ধ করে দূরে সরে গেল মৌনতা।রণ হাত গুটিয়ে বললো

“কিচ্ছু হবে না আমার কাছে আয়।

মৌনতা মাথা ঝাকিয়ে না করলো।সে যাবে না।রণ ভারী গলায় বলল

“কাছে আয় মৌন।তুই ছোট বাচ্চা নস।আমার অনেক কাজ আছে।তোকে ধরে নিয়ে বসে থাকার সময় নেই আমার।

মৌনতার মন ভার হলো কথাটা শুনে।কেমন নিষ্ঠুর বাণী শোনালো তা মৌনতার কর্ণকুহরে।মৌনতা মুখে আধার মেখে বলে উঠলো

“আমি কাউকে বলিনি আমাকে ধরে বসে থাকতে!”

রণ এক ভ্রু উঁচু করে মৌনতার পানে তাকালো।আজকাল মেয়েটা সাংঘাতিক দস্যি হয়ে উঠেছে।না কাউকে ভয় পাচ্ছে না কারোর কথার তোয়াক্কা করছে।রণ মুহূর্তেই নিজের কাতর চেহারা বদলালো।কিঞ্চিৎ হিংস্রতা ফুটলো শ্যাম মুখশ্রী তে।ব্যাগ্র ভঙ্গিতে মৌনতার দিকে ঝুঁকে ছো মেরে চুলের বিনুনি টেনে হিসহিস করে দাঁত পিষে বললো

“অনুমতি ছাড়া এয়ারপোর্ট এসেছিস কোন সাহসে?তোকে বারণ করিনি আমাকে বলা ছাড়া কোথাও যেতে?কথা অমান্য করার এতবড় দুঃসাহস কোথায় পেয়েছিস?ভালোবাসার ডোজ বেশি হয়ে গেছে?ভুলে গেছিস আমি কত খারাপ?আদরে যেমন মাথায় তুলেছি তেমনি আছাড় দিয়ে মাটিতে ফেলতে দু’সেকেন্ড সময় নেবো না।

বলেই অন্যহাতে মৌনতার ক্ষততে তুলো চেপে ধরলো।ব্যাথা আর জ্বলুনিতে মৌনতা সইতে না পেরে রণ’র বুকের কাছের শার্ট খামচে ধরলো অতঃপর চোখ খিচে বন্ধ করে রণ’র নাকে কপাল ছুঁইয়ে মাথা ঝুকে রইলো।আলগোছে বিনুনি ছেড়ে দিয়ে রণ থুতনি চেপে ধরে মুখ উঁচু করলো মৌনতার।মৌনতা কে ইশ পর্যন্ত করতে পারার সুযোগ না দিয়ে দ্রুত গলা পরিস্কার করে মলম লাগিয়ে ব্যন্ডেজ মেরে বলে উঠলো

“পা দুটো যদি ভেঙে দেই এখন?

রণ’র শক্ত হাতের পিস্টনে মৌনতার ফর্সা থুতনি গোলাপি হয়ে উঠলো।ঠোঁট জোড়া গোল হয়ে আছে।রণ এক পলক দেখলো সেই গোলাপি ঠোঁট জোড়া।তার ইচ্ছে হলো কামড়ে খেয়ে ফেলতে।মোহনীয় আগ্রাসী হয়ে ঠোঁটের কাছে তেড়ে এলো রণ।কিন্তু পরক্ষণেই মৌনতা কে ছেড়ে দিয়ে বলে উঠলো

“কালই বাড়ি জাবি।নয়তো লাত্থি দিয়ে কোমরের হার ভেঙে ফেলবো।বুঝেছিস কি বলেছি?

মৌনতা মিনমিন করে বললো

“তুমি বলেছিলে আমায় বিয়ে করবে আজ।

এবার রণ’র দুটো ভ্রূই উপরে উঠলো সেই সাথে চোয়াল ঝুলে গেলো।রণ অবাক হলো মৌনতার আরেক দুঃসাহসে।মেয়ে বলে কি?এটা কি সেই মৌনতা যেই মৌনতা কে গাঁধী বলে রণ সকাল বিকাল চড়াত?

রণ উষ্ণ শ্বাস ফেললো।অতঃপর বললো

‘আমার চোট কুলাতে পারবি না।যখন তখন অধিকারের দোহায় দিয়ে তোকে বেকাবু করবো।তুই ছোট মানুষ ওসব তোর দ্বারা হবে না।তুই বাড়ি যা।

“আমি বাড়ি যাবো না।তোমাকে না দেখে, তোমার সঙ্গে কথা না বলে আমি থাকতে পারবো না রণ ভাই ।রূহ টা তোমার কাছে পরে থাকবে।

রণ ঠোঁট কামড়ে কিছু ভাবলো,এরপর নিচে ফোন করলো টিম ক্যাপ্টেন সোহানের কাছে।

“যেখান থেকে পারো একটা কাজী ধরে নিয়ে এসো সোহান।বাসর পেয়েছে।

বলেই খট করে লাইন কেটে বলে উঠলো

“জেদ করলি হেরে গেলি।ঘন্টা দুয়েক পর বড্ড পস্তাবি।এখনো সময় আছে ভেবে বল।আমি কিন্তু খুব খারাপ।

মৌনতা স্পষ্ট গলায় শুধালো

‘তুমি কতোটা খারাপ রণ ভাই?

“যতোটা খারাপ হলে তোর সব কিছু হরণ করার জন্য হিংস্র আর উন্মাদ হবো ততোটা।সব সব লুটে নেবো।তোকে আঘাত করবো।তুই অসহ্য হয়ে মুক্তি চেয়ে চিৎকার করবি।কিন্তু আমি তখন বধির হয়ে যাবো রে মৌন।ওই উন্মাদনা থেকে তুই তো আমায় ফেরাতে পারবি না।কি ভুল পথে পা বাড়ালি বল তো?

বলেই ঘোর লাগা চোখে মৌনতার পানে তাকালো রণ।সেই দৃষ্টিতে কিছুটা ভরকালো মৌনতা সেই সাথে ভীত ও হলো।বুক দুরু দুরু করে কাঁপলো।মৌনতা বুকের কাছের ওড়না খামচে ধরে বলে উঠলো

“ভালোবাসা কি এমনই যন্ত্রনাদায়ক রণ ভাই?

“সবার টা জানিনা।তবে আমারটা যন্ত্রনাদায়ক।জঙ্গলে থেকে থেকে আমি জংলী হয়ে গেছি ।দরদ নেই হৃদয়ে।কঠিন মানুষ আমি।

মৌনতা ফাঁকা ঢোক গিলে বলে উঠলো

“একটু তো কোমল হতে পারো!

“কোনো কোমলতা আশা করিস না।ওসব আমার ধাতে নেই।যেখানে ছুবো ওখানেই কালসিটে দাগ হবে।নয়তো আমার অবর্তমানে আমায় মিস করবি কি করে?ওই ব্যথাতুর ভালোবাসা গুলোই তো তোকে আমার জন্য শিহরণ তোলাবে ক্ষনে ক্ষণে।তখন তুই কেঁদে কেঁদে আমার স্পর্শ ভিক্ষা চাইবি।

রণ’র কথা শেষ হতেই দরজায় টোকা পড়লো।রণ উঠে গিয়ের দরজা খুলতেই সোহানের সাথে একটা চিকন গড়নের খাটো, পাতলা দাড়িওয়ালা মুরুব্বি চোখে পড়লো।রণ তাকে দেখে কপাল কুচকাতেই সোহান বললো

“হোটেলের পাশেই কাজী অফিস স্যার।বেশি খুঁজতে হয়নি।দু একজনের কাছে জিজ্ঞেস করতেই তথ্য পেলাম উনার হাতের বাধন বড্ড মজবুত।কোনো ছাড়াছাড়ির রেকর্ড নাই।এক কবুলেই কবর পর্যন্ত।

সোহানের কথায় কাজিকে আরেকবার পরখ করে রণ বললো

“কিন্তু দেখে তো মনে হচ্ছে ফুঁ দিলেই উড়ে যাবে সোহান!

কথা খানা কাজির ইগোতে হোঁচট খেলো।গাঁয়ের রুমাল চেপে আঙ্গুল তুলে কাজী বললো

“সাইজ নিয়ে একদম রসিকতা করবেন না।সাইজ ড্যাজেন্ট ম্যাটার।

কাজির ঐদ্ধত্বে রণ’র ইচ্ছে হলো আঙ্গুল মুচড়ে ভেঙে গলা টিপে উঁচু করে রুমে ঢোকাতে।কিন্তু আপাতত এহেন ইচ্ছে মাটি চাপা দিলো।এসব মানুষের বিশ্বাস নেই।যখন তখন বদদোয়া দিয়ে সংসারে ঝামেলা পাকাবে।রণ দরজা ছেড়ে সরে দাঁড়ালো।কাজী ফাঁকা জায়গা পেয়ে বুক উঁচু করে রুমে ঢুকে সোফায় আয়েশ করে বসলো।পাশে তাকাতেই ঘোমটা জড়ানো মৌনতা কে চোখে পড়লো।মনে মনে মৌনতা কে বেহায়া গালি দিলো কাজী

“অসভ্য বেহায়া নির্লজ্জ্ব মেয়ে কোথাকার!বাপ মা ফেলে ঢ্যাঙ ঢ্যাঙ করতে করতে বিয়ে বসতে চলে এসেছে।

কাজির মনোভাব বুঝলো বোধ হয় রণ।সে কাজির সামনের সোফায় বসে সেন্টার টেবিলে রাখা নিজের বন্দুক খানা হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করলো।কাজী এই দৃশ্য দেখে ভয়ে জড়সড় হলো।রণকে গুন্ডা বদমায়েশ লোক মনে হলো কাজির।যেই বদমায়েশ ছেলে মেয়েটাকে জবরদস্তি করে হোটেলে এনে বিয়ে করতে চলেছে।মৌনতার গলার ব্যান্ডেজ দেখে কাজির সন্দেহ আরো জোড়ালো হলো।বিয়ের কাজ কোনো মতে শেষ হলেই পাশের থানায় গিয়ে অমানুষ্টার নামে কেইস ফাইল করবে এটাও ভেবে রাখলো।রণ এবার ধমকে উঠলো

“এতো মনে মনে কথা বলেন কেন?এতো কথা বলার কোনো দরকার আছে আপনার?যেই কাজ করতে এসেছেন সেটাই করুন না।বড্ড তাড়া আমার বুঝতে পারছেন না?

কাজী বিস্ফারিত চোখে রণকে দেখলো।এরপর ফাঁকা ঢোক গিলে বললো

“মেয়ের গার্ডিয়ান লাগবে।মেয়ে পক্ষের পুরুষ লোক ব্যতীত এ বিয়ে বৈধ হবে না।

রণ “চ” সূচক শব্দ করলো বিরক্তিতে।অতঃপর বললো

“আমিই ওর গার্ডিয়ান।বাড়িতে আমার চাইতে বড় গার্ডিয়ান আর নেই।আপনি বিয়ে পড়ান।বিয়েতে আমার মত আছে।

কাজী ভ্রুকুটি করে মৌনতা কে শুধালো

“তোমার মত আছে মা?

রণ উঁচু গলায় বলল

“আবার কথা বাড়ায়?মত আছে বলেই তো আমাকে এখানে ধরে এনে জোড় চালাচ্ছে এই টুকু বুঝতে পারছেন না?

এবার আরেক দফায় চমকিত হলো কাজী।এরপর একবার মৌনতা কে দেখলো আরেকবার রণ’কে।শেষমেশ কাগজ পত্র ঠিক করে মৌনতা কে শুধালো

“মত থাকলে আলহামদুলিল্লাহ বলুন।

কথাটা শুনে মৌনতার শরীর দুলে উঠলো।অজানা আতঙ্ক কলিজায় কামড় দিলো।মৌনতা শ্বাস নিতে পারছে না।ভয় কব্জা করেছে সারা শরীর।মৌনতা কে নিশ্চুপ দেখে রণ ক্ষেপে গেলো।সে বাজখাই গলায় বলল

“নাটক মারাচ্ছিস?বেলকনি দিয়ে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেব একদম পনেরো তলার নীচে পড়বি।সব নাটক একবারে বেরিয়ে যাবে ।

মৌনতা তবুও নিশ্চুপ রইলো।এবার আর দেরি সহ্য হলো না রণ’র।সে মৌনতার মাথায় চাটি মেরে বললো

“কবুল বল হারামজাদী!

মৌনতা ভয়ে ভয়ে ভেঙে ভেঙে বললো

“ক,ক কবু ল।

রণ,কে শুধানোর আগেই রণ বলে উঠলো

“আলহামদুলিল্লাহ কবুল।মিস্টি আনো সোহান।

সহসাই হাতের পেছন থেকে মিষ্টির বাক্স বের করে সোহান বলে উঠলো

“আগেই এনেছি,জানতাম শুভ কাজে আপনি বিলম্ব করবেন না।

সোহানের উপস্থিত বুদ্ধিতে খুশি হলো রণ।পকেট থেকে এক হাজার টাকার একটা কচকচে নোট বের করে বলে উঠলো

“যাও ফুর্তি করো।

সোহান ঠোঁট টিপে বললো

“বর্তমান যুগে এক হাজার টাকা খুব ছোট এমাউন্ট স্যর।আপনি বোধ হয় বিয়ের খুশীতে সব ভুলে গেছেন।

“কিছুই ভুলিনি সোহান।ঘরে বউ তোলা আর সাদা হাতি কিনে বাড়িতে নিয়ে আসা একই জিনিস।ওই যে বসে আছে আইটেম!আমারই চাচাতো বোন।ওকে পালা দুঃসাধ্য।এতো কম সরকারি বেতনে তাকে পালতে পারবো না।আর ঝামেলা না পাকিয়ে এখান থেকে সটকে পড়ো।হাতে পাঁচ ঘণ্টা সময় বাকি আছে আর।প্রত্যেকটা মুহূর্ত এখন ইম্পরট্যান্ট।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply