ভবঘুরে_সমরাঙ্গন
পর্ব_৭৩
তাজরীন ফাতিহা
দিনের সূচনালগ্নে দূর হতে আজানের ধ্বনি ভেসে আসে ইস্ট লন্ডন মসজিদের মিনার থেকে। সেই শব্দ ছড়িয়ে পড়ে ইটের দেয়াল, জানালা আর সরু গলির ভেতর। লন্ডনে শহরের পূর্বাংশে অবস্থিত একটি এলাকার নাম হোয়াইটচ্যাপেল। হোয়াইটচ্যাপেলের বাড়িগুলো এক নজরে খুব সাধারণ মনে হয়। দুই পাশে সারি সারি টেরেসড বাড়ি দুই বা তিনতলা। লালচে ইটের গায়ে অদ্ভুত দাগ। কোথাও রং খসে পড়েছে আবার কোথাও নতুন রংয়ের প্রলেপ। দরজাগুলো সরু, জানালাগুলো উঁচু ও কাছাকাছি বসানো। এই বাড়িগুলো একসময় একেকটি পরিবারের স্বপ্ন নিয়ে তৈরি হয়েছিল; এখন তারা একাধিক পরিবারের বাস্তবতা বহন করে।
ভোরের আলো ফুটবে ফুটবে ভাব। ছাদের কার্নিশে দেখাচ্ছে হালকা পরিষ্কারভাব। এলাকায় বসবাসরত মানুষগুলো এখনো পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। বাচ্চার কেঁদে ওঠায় নিশাতের ঘুম হালকা হলো। সে তড়িঘড়ি করে উঠে বসল। কাল রাতে ঘুম আসছিল না আঁখিজোড়ায়। প্রায়ই নির্ঘুম কাটায় সে। ফজরের খানিক আগমুহূর্তে ঘুম পরীরা এসে নেত্র মিলিয়ে দিয়েছিল। ভাগ্যিস ওয়াক্ত শেষ হওয়ার আগেই জেগে গেছে। সে পাশে তাকাতেই দেখল হাত, পা তুলে নিশাতের দিকে তাকিয়ে আছে ছোট বাচ্চাটি। তাকে তাকাতে দেখেই অদ্ভুত শব্দ করে ফিচফিচ করে হাসল। নিশাতও হেঁসে তার গালে চুমু বসিয়ে বলল,
“উঠে গেছে আমার সোনামানিক?”
বাচ্চাটি কি বুঝল জানা নেই। সে নিজের মতো করে শব্দ করতে করতে আঙুল চুষে চলেছে। নিশাত শিশুটির পাশে তাকাতেই দেখল নাহওয়ান উল্টাপাল্টা ভাবে শোয়া। সে ছেলেকে ঠিকঠাক করে গায়ে ব্ল্যাঙ্কেট টেনে দিল। ইদানিং সবকিছুই বিরক্ত লাগে তার। নিজের জীবনের হাসি, আনন্দ হারিয়েছে বহুদিন হয়। তবুও বেঁচে আছে এইটুকুই। যান্ত্রিক শহরে নিজেকেও এখন যান্ত্রিক লাগে। নিশাত ফজরের পর পর কুরআন তেলাওয়াত করল। চেয়ারে দুলতে দুলতে বাইরে তাকিয়ে চারপাশ দেখতে লাগল।
হোয়াইটচ্যাপেলের বাড়িগুলোর আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য যেন। এই যেমন নিশাতদের বাসার ভেতর ঢুকলে বোঝা যায়, জায়গা কম কিন্তু আসবাবপত্রে ঠাসা। বাসার ভেতরে ঘনত্ব বেশি। সরু সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলে আলাদা ফ্ল্যাট, আলাদা দরজা, আলাদা সংসার। কিচেন থেকে ভেসে আসছে মসলা ভাজার গন্ধ। ভাজা পেঁয়াজ, হলুদ ও জিরার সংমিশ্রণে তৈরি ঝাঁঝালো গন্ধ, আরেক চুলোয় ভাঁজা হচ্ছে আলু কুচি। ভাজির ঘ্রাণে পুরো ঘর ভরে গেছে। বসার ঘরের এক কোণে নামাজের জায়নামাজ, দেয়ালে কোরআনের আয়াত, পাশে বাংলা ও ইংরেজি ক্যালেন্ডার। এখানে লন্ডন আর বাংলাদেশ যেন পাশাপাশি দুরত্বে অবস্থান করছে। এখানকার অধিকাংশ বাসার অবস্থাই এমন। কারণ হোয়াইটচ্যাপেল “বাঙালি পাড়া” নামেও খ্যাত।
টেরেসড বাড়ির ফাঁকে ফাঁকে দাঁড়িয়ে আছে মাঝারি উচ্চতার ফ্ল্যাট ব্লক। পাঁচ, সাত কিংবা দশ তলা। বাইরে ধূসর কংক্রিটের গায়ে বিশেষ কোনো সৌন্দর্য নেই কিন্তু এখানকার ব্যালকনিগুলো সৌন্দর্য বহন করে। সেখানে ঝুলছে ধোয়া কাপড়, ছোট টবের গাছ, কোথাও কোথাও শিশুর সাইকেল। এই ভবনগুলোই হোয়াইটচ্যাপেলের পরিবারের মূল আশ্রয় বিশেষ করে মুসলিম ও বাংলাদেশি পরিবারগুলোর।
এখানে এসে দেশটাকে বড্ড মনে পড়ে নিশাতের। সেই গাছগাছালি, মাটির রাস্তা, সোদা গন্ধ, বৃষ্টির ঝমঝম আওয়াজ, পাখির কিচিরমিচির শব্দ, আকাশে বাতাসে মাতৃভূমির ঘ্রাণ। দিনশেষে দেশটা তাকে কিছুই দেয়নি কিন্তু তারপরেও জন্মভূমির মায়া ভুলবার নয়। কত দিন পেরোলো কিন্তু অতীত পিছু ছাড়েনা। ভাবনায় ছেদ পড়ল নাহওয়ানের ডাকে। বাচ্চাটা ঘুম থেকে উঠে বসেছে। দিনে দিনে বড় হয়ে যাচ্ছে তার বাচ্চাটা। সেদিন না এইটুকু ছিল? যত বড় হচ্ছে বাপের চেহারা একদম গেড়ে বসছে। নিশাতের ধারণা ছেলে পূর্ণবয়স্ক হয়ে গেলে একদম বাপের জেরোক্স কপি হবে। নিশাতের মস্তিষ্ক যন্ত্রণায় ছেয়ে গেল। নাহওয়ান মাকে দেখতে পেতেই বলল,
“মা, উঠতে দেরি হয়ে গেল স্যরি।”
নিশাত ফ্যাকাসে হেঁসে বলল,
“সমস্যা নেই। হাত, মুখ ধুয়ে ফেলো।”
নাহওয়ান মাথা নাড়িয়ে চলে যেতে নিয়ে হঠাৎ থেমে গেল। বলল,
“মা, ভাই মুখ ধুয়েছে?”
“হ্যাঁ।”
“ভাই কোথায়?”
“ওর নানা নিয়ে গেছে। চিন্তা কোরো না আবার দিয়ে যাবে।”
নাহওয়ান মাথা নাড়িয়ে মায়ের কথা মেনে ওয়াশরুমে চলে গেল। নিশাত ধীরে ধীরে উঠে ছেলের জন্য নাস্তার ব্যবস্থা করতে গেল। রাবেয়া খাতুন রুটি, ভাজি বানিয়ে রেখেছেন। নিশাত একটা ডিম পোচ করে প্লেটে নিল। প্লেট হাতে রুমে প্রবেশ করতেই দেখল নাহওয়ান জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজ পড়ছে। দৃশ্যটা দেখে নিশাতের কি যে শান্তি লাগল। এইটুকু বয়সে ফরজ নামাজ পড়তে না পারলে কাযা আদায় করে। অথচ তার ছেলেটার নামাজ ফরজই হয়নি এখনো।
মাকে দেখতে দেখতে নামাজের প্রতি ভালোবাসা তৈরি হয়ে গেছে বাচ্চাটার। মারওয়ান আজাদের ফাইয়াজ অনেক বড় হোক। নিশাত চোখের পানি মুছে টেবিলে নাস্তা রাখল। নাহওয়ান জায়নামাজ ভাঁজ করে ভদ্র বাচ্চার মতো নাস্তা খেতে এল। এই বয়সেই নিজের কাজ নিজে করার চেষ্টা করে সে। রুটি ছিঁড়ে একটু আলু ভাজি, ডিম পোচ নিয়ে মায়ের মুখের সামনে ধরল। নিশাত ছলছল চোখে সেই হাতের দিকে চেয়ে রইল। নাহওয়ান মায়ের চোখে পানি দেখে তড়িঘড়ি করে বলল,
“কাঁদছ কেন মা?”
নিশাত চোখ মুছে বলল,
“কিছুনা এমনি।”
“বাবার কথা মনে পড়ছে?”
নিশাত ছেলের কথায় একটু তাল হারালো। নিজেকে শক্ত করে বলল,
“না, খাও তুমি।”
“তুমি আগে হা করো।”
নিশাত খাবার মুখে নিল। তার ছেলে বড় হয়ে গেছে। মায়ের দায়িত্ব নিতে শিখে গেছে। সেসময় মাহবুব আলম নাতিকে নিয়ে ঢুকলেন। নিশাত মাহবুব আলমকে দেখে উঠতে চাইলে তিনি বললেন,
“আরে বসো। আফসীনের হাতের নখ বড় হয়ে গেছে। তুমি কেটে দিও তো মা। আমাকে খামচে টামচে শেষ করে দিল।”
কোলের শিশুটি নানার কোলে বসে দন্তবিহীন হাসছে। যেন নানাকে আঁচড় মারতে মেরে সে বেশ খুশি। নিশাত শ্বশুরের কথায় মাথা নাড়ল। উঠে আফসীনকে নিল। নাসির উদ্দিন রুম থেকে বেরিয়ে বললেন,
“কিরে হাতির পা পড়ল মনে হয় আমাদের বাসায়।”
মাহবুব আলম নাহওয়ানের পাশে বসে বড় নাতিকে নাস্তা খাওয়াচ্ছিলেন। নাসির উদ্দিনের খোঁচা মারা কথায় হালকা হেঁসে বলল,
“তুই যাস না কেন? উপর তলা আর নিচ তলা। এইটুকু হাঁটতেও কষ্ট?”
নাসির উদ্দিন চেয়ার টেনে বসে বললেন,
“বাতের ব্যথায় রাতে ঘুমাতে পারিনা। হেঁটে কোথাও যেতে ইচ্ছে করেনা। নিশাত, নানাভাই তো প্রতিদিনই যায়। বুড়ো হয়েছি এখন একটু বিশ্রাম নেই। আর কত টানাহেঁচড়া সহ্য করব বল।”
মাহবুব আলম শেষ কথায় থমকে গেলেন। নিশ্চুপ হয়ে গেলেন। কথা আর বেশিক্ষণ এগোলো না। মুহূর্তেই চুপচাপ হয়ে গেল পরিবেশ। প্লেটের টুংটাং শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দই শোনা গেল না।
হোয়াইটচ্যাপেলে দুপুরের দিকে এলাকা একদম বদলে যায়। Whitechapel Road তখন জীবন্ত। বাসের শব্দ, দোকানের শাটার, মানুষের কোলাহল। রাস্তার দুই পাশে হালাল রেস্টুরেন্ট, বাংলা মুদি দোকান, ফার্মেসি, ট্রাভেল এজেন্সি। সাইনবোর্ডে বাংলা আর ইংরেজি পাশাপাশি যেন দুটি ভাষাভাষী মানুষের মাতৃভাষার গুরুত্ব বোঝায়।
নিশাত বোলের মধ্যে হালকা কুসুম গরম পানির ভেতরে অল্প বেবি ওয়াশ দিল। তারপর আফসীনকে কোলে নিয়ে বোলের মধ্যে দিয়ে মোলায়েম ভাবে গোসল করাতে লাগল। বাচ্চাটা পানি পেয়েই খুশি হয়ে গেল। হাত, পা ছড়িয়ে ফিচফিচ করে ফোকলা দাঁতে হাসল। নাহওয়ানও ভাইয়ের গোসল দেখছে। নিশাত গোসল করাতে করাতে আদর করে বলতে লাগল,
“আমার ইনাম সোনা কই? আমার আফসীন পাখি কই? ইনাম সোনা গোসল করে?”
ইনাম নিশাতের কথা শুনে হাসতে হাসতে পানিতে দাপাতে লাগল। নাহওয়ান নিজেও খুশিমনে ছোট ছোট হাত দিয়ে ভাইয়ের শরীর ডলে দিতে লাগল। যেদিন মা ইনামকে গোসল করায় সে আগ্রহ নিয়ে তা দেখে। কি যে ভালো লাগে তখন।
নিশাত গামছা দিয়ে ইনামের পুরো শরীর মুছিয়ে দিল। বাচ্চাটা নানারকম শব্দ করছে। নিশাত নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বলল,
“আমার সোনামানিক এখন খাবার খাবে?”
ইনাম লাফিয়ে উঠে হাসল। যেন নিশাতের সব কথাই সে ভালোভাবে বোঝে। খাবারের কথা বলায় সে বেশ খুশি। নিশাত ইনামের নাকে নাক ঘষে ফিডার মুখে দিল। নাহওয়ান মায়ের পাশে বসে বসে ভাইয়ের খাওয়ানো দেখছে। নিশাত তা দেখে বলল,
“গোসল করে এসো যাও।”
নাহওয়ান ঘাড় কাত করে বলল,
“আরেকটু থাকি। ভাইয়ের খাওয়া শেষ হলেই যাব।”
নিশাত আদেশ দিয়ে বলল,
“বেশি দুপুর করে গোসল করলে ঠান্ডা লাগবে। এখনই যাও। ভাইয়ের খাবার দেখলেই হবে? তোমার খিদে লাগেনি?”
নাহওয়ান মন খারাপ করে চলে যেতে নিলে নিশাত আটকে বলল,
“আচ্ছা বসো। ইনামকে খাওয়ানো শেষ করে গোসল করিয়ে দেব নে।”
নাহওয়ানের চোখ চকচক করে উঠল। সে আবারও মায়ের পাশে বসে ভাইয়ের খাওয়া দেখতে বসে গেল। যে বর্তমানে একবার নিশাতের দিকে তো আরেকবার নাহওয়ানের দিকে চোখ রেখে চুকচুক করে ফিডার খেতে ব্যস্ত। নাহওয়ান ইনামের গুলুমুলু পা দুটো ধরে নাড়াতে লাগল। ইনাম খাওয়া রেখে বড় ভাইয়ের দিকে তাকালো। যেন বুঝিয়ে দিল, খাওয়ায় ডোন্ট ডিস্টার্ব।
__
নিশুতি রাত। নিশাত চেয়ারে বসে আশেপাশের প্রকৃতি দেখছে। দেখতে দেখতে অতীতের স্মৃতি রোমন্থন করতে লাগল। সেগুলো স্মৃতি না বলে কালো অধ্যায় বলাই শ্রেয়। এইতো লন্ডনে আসলো সেদিন। পরিবারের সবাইকে নিয়ে লন্ডন পারি দেয়া সহজ ছিল না। আজারাক সাইফারের সমস্ত স্মৃতি ঝেড়ে মুছে পরিষ্কার করে তবেই এসেছে বাংলাদেশ থেকে সদূর লন্ডনে। সেখানে থাকলে প্রতিটা মুহূর্ত জান হাতে নিয়ে বাঁচতে হতো। সেদিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাইফারকে ছেড়ে দিয়েছিল ঠিকই কিন্তু তার স্পর্ধার জন্য সরকারের মন্ত্রী তাকে কিংবা তার পরিবার ও সাহায্যকারীদের এত সহজে ছেড়ে দিতো?
লন্ডনে না আসলে এতদিন লাশ হয়ে যেতে হতো সবাইকে। পরিবারের সকলকে খুঁজে খুঁজে মেরে ফেলতে সময় নিতো না। বাংলাদেশের আইন তো দুর্বল। সেখানে কারোর নিরাপত্তা বা বিচার কখনো হয়না। কারণ সেখানের দেশ পরিচালনার সিস্টেমেই যে গণ্ডগোল। গোড়াতেই গলদ। দেশ পরিচালনা করে অযোগ্য ব্যক্তিরা। কত মানুষ যে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে, বিচার পাচ্ছে না তার হিসেব করতে বসলে শেষ করে ওঠা যাবে না। আহ্ প্রাণের মাতৃভূমি! নিশাত ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে অতীতের পাতায় ডুবে গেল।
সেদিন হাসপাতালে সাইফারকে দেখে নিজেকে ধরে রাখতে পারেনি নিশাত। লোকটার সারা শরীর নীল হয়ে ছিল। জখমগুলোতে রক্ত জমাট বেঁধে ছোপ ছোপ হয়ে গিয়েছিল। ঠোঁট কেটে রক্ত পড়ছিল, চোখ, মুখ ফুলে চেহারা বিকৃত হয়ে অদ্ভুত দেখাচ্ছিল। হাসপাতালের বেডে মুমূর্ষ অবস্থায় শায়িত মারওয়ান আজাদকে দেখতে নিশাতের মারাত্মক বিভৎস লাগছিল। আশ্চর্য সুঠামদেহী এক পুরুষের এ কি হাল! নিশাতের মুখ দিয়ে কোনো কথাই বেরোচ্ছিল না। যেন বুকে শক্ত কিছু চেপে ছিল। তার গলার স্বর, আওয়াজ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল মুহূর্তের মাঝে। ডাক্তাররা কোনো আশা দিতে পারেনি তাদেরকে। রিকভারি করতে পারবে কিনা সেটাও অনিশ্চিত। যে অমানসিকভাবে সাইফারকে মারা হয়েছে যে কেউ দেখলে বুঝবে মেরে ফেলার উদ্দেশ্যেই এই আঘাতগুলো তাকে করা হয়েছিল।
নিশাত সেদিন অনেক ভেবেছিল। কি দিয়ে মেরে এরকম জখম করে ফেলেছিল? লোহা জাতীয় কিছু? রড টাইপ? নাকি বুটের জুতার লাথি? এর থেকেও জঘন্য কোনো যন্ত্র দিয়ে মারেনি তো? ইশ কতটা যন্ত্রণা আর আঘাত দিয়ে মেরেছিল ঐ নীতিবান পুরুষটিকে? নিশাতের কি এরজন্য কষ্ট পাওয়া উচিত নাকি পুরুষটির নীতি নৈতিকতার জন্য আনন্দ পাওয়া উচিত? নিজেকে কোনরকম দমিয়ে অজ্ঞান পুরুষটির শিয়রে বসে মোলায়েমভাবে ডেকেছিল,
“নাহওয়ানের বাবা, ঘুমোচ্ছেন?”
ওপাশ থেকে কোনো সাড়া আসেনি। নিশাত দীর্ঘক্ষণ সেই নির্জীব জখম যুক্ত মুখটার দিকে চেয়ে আবার ডেকেছিল,
“ফাইয়াজের বাবা!”
এবারও সাড়া আসেনি মোটেও। নিশাত হাল ছাড়েনি। নার্স এসে তাকে নিয়ে যেতে চাইলে নিশাত গেল না। এই লোকটাকে ছাড়া সে কিছুতেই যাবে না। এত তাড়াতাড়ি তো তার থেকে মুক্তি নেই এই লোকের। কি আশ্চর্য, তাকে একলা রেখে একা একাই চলে যাবে? তা কি করে হয়? নিজেকে শক্ত রেখে ক্যানুলা যুক্ত হাতটি আস্তে করে ধরে বলল,
“এই ফাইয়াজের বাবা, উঠছেন না কেন? ফাইয়াজ আপনার অপেক্ষায় আছে। উঠে একবার পান্ডা, পটলের বাচ্চা, কবুতরের ছাও বলে ডাকুন তো। আপনাকে চুপচাপ একটুও ভালো লাগছে না।”
উপস্থিত সকলে একজন স্ত্রীর পাগলামো দেখছিল। এতক্ষণ রোগীর সাথে দেখার অনুমতি নেই। কিন্তু নিশাতকে নার্সরা কিছুতেই বের করতে পারেনি। এতবছরের অভিজ্ঞতায় তারা এসব দেখে অভ্যস্ত। তাই কারো মৃত্যুতেও তেমন প্রভাব পড়ে না ডাক্তার কিংবা নার্স কারোরই। কিন্তু নিশাতের এই হৃদয় নাড়া দেয়া কথপোকথনে তাদের চোখ ছলছল করছিল। নিজেদের শক্ত করে যখন আবার নিশাতকে ধরতে চাইল নিশাত শান্ত গলায় কেমন করে যেন বলল,
“একটু কথা বলি ওনার সাথে। আপনারা বোধহয় আমাকে পরনারী ভাবছেন। আসলে আমি ওনার স্ত্রী। একটুও ডিস্টার্ব করব না তাকে। শুধু একটু কথা বলব। আমি জানি, উনি আমার কথা শুনছেন। এখন অভিনয় করে পড়ে আছে। ইনি আবার অভিনয়ে অনেক ভালো। অভিনয় করলে ধরতেই পারবেন না, বাস্তব নাকি অভিনয়।”
নিশাত একবার হাসছে একবার চুপ হয়ে যাচ্ছে। নার্সরা নিশাতের পাগলামি বুঝতে পারল। স্বামীর এহেন করুণ দশা দেখে একজন নারীর পাগলামি। নিশাত স্বামীর কোঁকড়া কোঁকড়া চুলের ভাঁজে হাত ছুঁইয়ে নিজের মনে বলতে লাগল,
“এই ফাইয়াজের বাবা, একবার লিলিপুট ডাকুন তো। আপনার মুখে কতদিন লিলিপুট ডাক শুনিনা। আপনি উঠুন। আপনাকে উঠতেই হবে। এখনো আমাদের একসাথে অনেকদূর পথচলা বাকি। এইটুকুতেই থেমে গেলে চলবে না। আমরা একসাথে নামাজ পড়ব, আপনি মধুর সুরে কুরআন তেলাওয়াত করবেন আমি মনোযোগ দিয়ে শুনব, আপনি দোয়ার জন্য হাত ওঠাবেন আমিও আপনার দেখাদেখি ওঠাবো। ফাইয়াজের বাবা, ফাইয়াজের মা, ফাইয়াজ একসাথে হজ করব। সুন্দর না? আপনি শুয়ে থাকলে কিভাবে হবে বলুন তো? দ্রুত উঠুন।”
সেদিন মারওয়ান আজাদ কোনো উত্তর দেয়নি। নিষ্ক্রিয় ও নির্জীব হয়ে পড়েছিল একভাবে। নিশাত কথাগুলো বলতে বলতে যখন উত্তেজিত হয়ে যাচ্ছিল তখন নার্সরা নাসির উদ্দিনকে ইনফর্ম করল নিশাতকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। তিনি এসে ভেজা চোখে মেয়েকে নিয়ে যেতে চাইলেন। কিন্তু নিশাত কিছুতেই যেতে নারাজ। বাবার হাত ছাড়িয়ে নিয়ে অভিযোগের সুরে বলল,
“এই ফাইয়াজের বাবা, দেখুন আমাকে কিভাবে টানাহেঁচড়া করছে। উঠে আপনার শ্বশুরকে কিছু বলুন তো। আমি কি আপনাকে জ্বালাচ্ছি? শান্ত, ভদ্র হয়ে কথা বলছি ভালো লাগেনা আপনার শ্বশুরের। এর একটা হেস্তনেস্ত করুন তো।”
নাসির উদ্দিন মেয়ের উল্টাপাল্টা কথায় বুঝলেন নিশাত তার সেন্সে নেই। কথাবার্তা জড়িয়ে যাচ্ছে। শক্তি দিয়ে নিশাতকে টেনে উঠালো। নিশাত মারওয়ানের অচল হাতের ভাঁজে নিজের হাত ঢুকিয়ে আঁকড়ে ধরতে চাইল কিন্তু সেই হাতের মালিকের একটুও নড়চড় নেই। নিশাতকে আগলে রাখা মানুষটার হাতের শক্তি যে ফুরিয়েছে। নিজের চেতনা, ধ্যান-ধারণা কোনোটাতেই সে নেই। শক্তভাবে স্ত্রীকে আগলে রাখা পুরুষটি নিশ্চল হয়ে পড়ে আছে একভাবে। নাসির উদ্দিন সেই হাত ছাড়িয়ে মেয়েকে টেনে নিয়ে আসতে লাগলেন। নিশাত নিশ্চুপ হয়ে নিজের হাতের দিকে তাকালো। এত সহজেই লোকটা তাকে ছেড়ে দিল? তার হাতের ভাঁজে লুকিয়ে থাকা হাতটা এত দ্রুত খসে পড়ল? কিন্তু সে তো খুব শক্ত করে ধরেছিল। তাহলে ঐ শক্তপোক্ত হাতটার অস্তিত্ব এত তাড়াতাড়ি নাই হয়ে গেল কেন? কখনো তো এমন হয়নি। পাখি কি তবে তার পিঞ্জর থেকে উড়েই গেল?
চলবে….
(আসসালামু আলাইকুম।)
Share On:
TAGS: তাজরীন ফাতিহা, ভবঘুরে সমরাঙ্গন
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ১
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৪৩+৪৪
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন ১৫+১৬
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৬০
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৫৯ (৫৯.১+৫৯.২+৫৯.৩)
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৫১+৫২
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৪১+৪২
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৪
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৬৮
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৭১