ভবঘুরে_সমরাঙ্গন
পর্ব_৬৯
তাজরীন ফাতিহা
নিশাত স্কুলের চাকরি ছেড়েছে বহুদিন হয়। মারওয়ান অবশ্য বাধা দিয়েছিল কিন্তু তার একটাই কথা স্বামী ইনকাম করলে তার এক্সট্রা ইনকামের প্রয়োজন নেই। ছেলেকে সময় দেবে। আদর্শ মানুষ বানানোর চেষ্টা করবে। সারাদিন বাচ্চাটা মাকে ছাড়া থাকতে থাকতে খিটখিটে হয়ে যাচ্ছিল। এখন সম্পূর্ণ নজর ছেলের প্রতি দিচ্ছে। নাহওয়ান আগের চেয়ে শান্ত হয়ে গেছে। মায়ের কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করার চেষ্টা করে। তবে বাপ, পুত্র এক হলে আবার যেই লাউ সেই কদু। ইদানিং মারওয়ানের কর্ম ব্যস্ততা বেড়েছে। বাসায় খুবই কম থাকে। নাহওয়ানও বাবার সঙ্গ না পেয়ে পেয়ে ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।
নিশাত ফ্লোরে বসে লাল শাক বাছছে। পাশেই নাহওয়ান মায়ের পাশে বসে হাত পা ছড়িয়ে লাল শাক হাতের তালুতে নিয়ে ছিঁড়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু মায়ের মতো দক্ষ ভাবে পারছে না। লাল শাক ভর্তা বানিয়ে ফেলছে। শাকের লালাভ রঙে হাতের তালু রক্তিম হয়ে গেছে। নাহওয়ান মাকে দেখিয়ে বলল,
“মা মিন্দি লাগিয়েছি।”
“তাই?”
নাহওয়ান ঘাড় কাত করে সম্মতি জানিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে মায়ের দু’গালে লাগিয়ে দিল। নিশাত তা দেখে বলল,
“হয়েছে আমাকে আর মেহেদী লাগানো লাগবে না বাপজান। বিয়ের পর বউকে এভাবে মেহেদী লাগিয়ে দিয়েন। বউ লাল টুকটুকে হয়ে যাবে।”
নাহওয়ান রঞ্জিত হাত দুটো দিয়ে মুখ ঢেকে বলল,
“এত্ত পচা কতা বলেনা। সরম।”
“ওরে বাবা, বিয়ের কথা বলতে না বলতেই এত শরম? বিয়ে হলে না জানি কত শরমায় আমার বাপধনে।”
“ইননা, বাবা বলেছে বুউ পচা।”
“তোর বাপ এখানেও তোকে পিন মেরে দিয়েছে? লোকটা নিজেও বউয়ের কদর করলো না ছেলেকেও ওই পথে নিচ্ছে। আজকে বাসায় আসুক, বউ পঁচা? একটা শিক্ষা না দিলেই নয়।”
নিশাত রান্নার কাজে ব্যস্ত ছিল। নাহওয়ান পাশের ফ্ল্যাটে তার বয়সী এক খেলার সাথী জুটিয়েছে। পা টিপে টিপে টুল এনে তার উপরে দাঁড়ালো। দরজার ছিটকিনি খুলতে নিলেই নিশাত পিছন থেকে বলল,
“কোথায় যাওয়া হচ্ছে?”
নাহওয়ান থতমত খেয়ে বলল,
“কুতাও না, কুতাও না।”
নিশাত ভ্রু কুঁচকে বলল,
“কি করা হচ্ছিল?”
নাহওয়ান দিশেহারা ভঙ্গিতে বলল,
“ইট্টু দজযা দেকি।”
“এই ভরদুপুরে দরজায় কী দেখেন?”
নাহওয়ানের মিনমিন করে হেসে বলল,
“বাবা বলেছে দেকতে।”
নিশাত কিছু বলতে নিলে সেই মুহূর্তে দরজায় করাঘাতের শব্দ হলো। নাহওয়ান উচ্ছ্বসিত হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কে বাবা?”
ওপাশ থেকে মারওয়ান জবাব দিল,
“হ্যাঁ, পান্ডা দ্রুত দরজা খোল।”
নাহওয়ান মায়ের দিকে চাইতেই নিশাত এসে দরজা খুলল। মারওয়ান নিশাতের গম্ভীর মুখের দিকে চেয়ে বলল,
“কি অবস্থা? দুই মা, বেটা ঝগড়া করছিলে নাকি?”
নিশাত হাত ভাঁজ করে বলল,
“আপনি নাকি ছেলেকে দরজা দেখতে বলেছেন?”
মারওয়ান কিছু না বুঝে জিজ্ঞেস করল,
“দরজা? কোন দরজা?”
“বাইরের দরজা।”
মারওয়ান একবার দরজার দিকে চেয়ে বলল,
“এটার দেখার কি আছে? কাঠের একটা দরজা, খুললে গ্যাড় গ্যাড় শব্দ করে। ডিসগাস্টিং জিনিস।”
“সেটা ছেলেকেই জিজ্ঞেস করুন। পাশের ফ্ল্যাটে চুরি করে যাচ্ছিল ধরা পড়ার পর বলে বাবা দরজা দেখতে বলেছে। আপনার চক্করে পড়ে যে নাহওয়ান মিথ্যা কথা বলে আপনি জানেন?”
“সেটা কি আমার দোষ? ওকে কি মিথ্যা কথা বলতে আমি শিখিয়ে দিয়েছি? ছেলের সব দোষে আমাকে জেরা করো কেন?”
“কারণ ছেলের যত খারাপ গুণ আছে সব আপনার থেকে পেয়েছে।”
মারওয়ান হতবাক হয়ে নিশাতের যাওয়ার পানে তাকিয়ে বলল,
“কি আশ্চর্য! ধরলাম না, ছুঁলাম না, জানলাম না বাসায় ঢুকেই শুনি সব দোষ আমার? পটলের বাচ্চাটা আমার উপর সব দোষ চাপিয়ে ভেগেছে। আজকে ধরতে পারলে জাস্ট ভর্তা করে ফেলতে হবে।”
বলেই মারওয়ান হনহনিয়ে রুমে ঢুকে দেখল কোথাও নাহওয়ান নেই। সে বাথরুম, বারান্দা, পাশের রুম, খাটের তলা সব খুঁজে দেখল। নাহওয়ানের অস্তিত্বই নেই কোথাও। মারওয়ান আবারও হনহনিয়ে রান্নাঘরে এসে বলল,
“ফাইয়াজ কই?”
নিশাত রান্না করতে করতেই জবাব দিল,
“আলমারির ভেতরে ঢুকে আছে কিনা দেখুন।”
মারওয়ান আলমারি খুলে দেখল ঘাপটি মেরে বসে আছে নাহওয়ান। সে চোখ রাঙিয়ে বলল,
“বেরো।”
“ইননা, মারবে।”
“মারব কেন? আদর করব, সোহাগ করব। তারপর জাস্ট ভর্তা করে ফেলব।”
নাহওয়ান বাবাকে ফুঁসতে দেখে চিৎকার করে মাকে ডেকে উঠল। নিশাত ছেলের চিৎকারে দৌড়ে এসে বলল,
“কি হয়েছে?”
নাহওয়ান পিটপিটিয়ে বলল,
“বাবা মারে।”
মারওয়ান চোখ কপালে তুলে কিছু বলতে নিলে নিশাত বলল,
“আপনি ওকে ধমকাচ্ছেন কেন? নিজের দোষ স্বীকার করতে লজ্জা লাগে? এখন ছেলেকে ধমকিয়ে দোষকে ধামাচাপা দিতে চান? আপনার লজ্জা করেনা?”
মারওয়ান কোমরে এক হাত রেখে বলল,
“আশ্চর্য! কিছু করছি না, বলছিনা সব দোষ আমার হয়ে গেল? দুই মা, ছেলে পরিকল্পনা করে আমাকে দোষী সাব্যস্ত করছে। যত দোষ মারওয়ান রোস্ট!”
নিশাত ছেলেকে আলমারি থেকে বের করে বলল,
“হ্যাঁ আপনাকে রোস্ট করতে আমাদের মা, ছেলের ভালোই লাগছে।”
বলেই নাহওয়ানকে নিয়ে চলে যেতে নিলে মারওয়ান পিছন থেকে বলল,
“আমার আশেপাশে আর আসিস। তোকে স্যান্ডউইচ বানিয়ে ফেলব পটলের বাচ্চা।”
একটু পরই নাহওয়ানকে থালা হাতে বাবার আশেপাশে ঘুরঘুর করতে দেখা গেল। মারওয়ান মোটেও পাত্তা দিল না। সবসময় তাকে দোষারোপ করা মা, বেটার স্বভাব হয়ে গেছে। সে আর মা, ছেলের ফন্দিতে পা দিচ্ছে না। ইনোসেন্ট চেহারা দেখিয়ে তাকে ঘোল খাওয়ানো। অন্যদিকে মারওয়ানকে পাত্তা দিতে না দেখে নাহওয়ান খাটের উপর কষ্ট করে উঠে শুয়ে থাকা বাবার গলা জড়িয়ে ধরে বলল,
“বাবা, রাগ করছ?”
মারওয়ান মুখ ঘুরিয়ে নিল। নাহওয়ান তার নরম নরম মোলায়েম হাত দুটো দিয়ে বাবার গাল ধরে বলল,
“সরি, আর মিত্তা বলব না।”
মারওয়ান তবুও পাত্তা দিল না। নাহওয়ান বাবার গাল ধরে ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল,
“কতা বলবে না? আমি কাদি দেকো।”
মারওয়ান মুখ ঘুরিয়ে রেখেই বলল,
“তুই কাঁদলে আমার কী? দোষ করে সে আর নাম পড়ে আমার। বেশি করে কাঁদ।”
নাহওয়ান গলা ছেড়ে কাঁদতে শুরু করে দিতেই নিশাত এসে বলল,
“কি হলো আবার?”
নাহওয়ান চোখ কচলাতে কচলাতে বলল,
“বাবা মারছে।”
মারওয়ান হতভম্ব হয়ে চিৎকার করে বলল,
“কিহ!!”
নাহওয়ান বাবার চিৎকারে কান্না থামিয়ে আবার কেঁদে উঠে বলল,
“না না মা মারছে।”
নিশাত বেরিয়ে যেতে যেতে বলল,
“আল্লাহ সব পাগল আমার কপালে জুটিয়েছে। বাপ, বেটা দুটোই বদ্ধপাগল।”
__
সাইফার তাহমিদের সামনে গম্ভীর বদনে বসে আছে। তাহমিদের এসবে হেলদোল নেই। সে এক দৃষ্টিতে সামনের দেয়ালে তাকিয়ে আছে। মারওয়ান তীক্ষ্ণ নজরে তাহমিদের দিকে চেয়ে বলল,
“তোমার মা, বাবা নামে যারা পরিচিত তারা তোমার আপন বাবা, মা নয় তাইতো?”
তাহমিদ তাচ্ছিল্য হেসে বলল,
“সেদিন তো বললামই।”
“আচ্ছা, তুমি কি করে জানলে তুমি জা*রজ? তোমার পিতামাতা থাকতেও পারে?”
তাহমিদ পাগলের মতো হেসে বলল,
“পিতামাতা সেটা আবার কী? জা*রজদের পিতামাতা থাকেনা জানেন না আপনি?”
সাইফার চেয়ার ঘুরাতে ঘুরাতে বলল,
“তুমি শিওর হচ্ছ কিভাবে?”
তাহমিদ অদূরে দৃষ্টি ফেলে মলিন গলায় বলল,
“আমার তথাকথিত বাবার মুখে প্রায়ই শুনি। তখন আমার বয়স সাত। একদিন বাবা কোত্থেকে এসে মাকে তুমুল গালিগালাজ করতে লাগল। আমাকে দেখিয়ে বলছিল এই জা*রজের বাচ্চাকে কোথা থেকে এনেছিস? এমন নানা কটু কথা। মা সেদিন ভীষণ মার খেয়েছিল সাথে আমিও। সেকি অমানসিক নির্যাতন! মাইরের তীব্রতায় বহুদিন জ্বরে ভুগেছি। ওইটুকু বয়সে এত আঘাত সহ্য করতে পারিনি। পরে শুনেছি ভাইপার বাবাকে এসব বলেছিল। টাকার লোভ দেখিয়ে মা ও বাবাকে ব্ল্যাক ভাইপার হাত করে নিয়েছিল। পরবর্তীতে ভাইপার আমাকেও তার কাজে যুক্ত করে নেয়। আমার পড়াশোনাও ভাইপারের টাকাতেই হয়েছে। তার সাথে থেকে থেকে ছাত্রজীবন থেকেই খারাপ কাজে যুক্ত হয়ে গিয়েছিলাম।”
সাইফার গালে দুই আঙ্গুল ঠেকিয়ে বলল,
“শুনেছিলাম, তোমার পিঠে বুকে অজস্র জখম রয়েছে?”
“হ্যাঁ। ছোটবেলায় অনেক মার খেয়েছি। বাবা রাগ উঠলেই কুকুরের মতো মারত। এরপর এমন আঘাত বহু পেয়েছি তবে সেসব আর গায়ে লাগেনি। ওসবে আমি অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম। আপনাদের জেলখানার মার আমার কাছে বাতাসের মতো লেগেছে। গায়েই লাগেনি।”
বলেই তাহমিদ জোরে হেসে উঠল। সাইফার সামনে বসা হাস্যরত পুরুষটির দিকে তাকিয়ে কোথাও না কোথাও তীব্র ধাক্কা খেল। বুকে সীমাহীন কষ্ট নিয়েও মানুষ এভাবে হাসতে পারে? জেলের মাইর মোটেও বাতাসের মতো না। বরং সাংঘাতিক ব্যথা হয়। অনেকের কোমর, বুকের হাড্ডিও ভেঙে যাওয়ার রেকর্ড আছে। সেখানে সামনের পুরুষটি বলছে বাতাসের মতো লেগেছে! সে একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বলল,
“এজন্যই কি তুমি ভাইপারের প্রতি তীব্র ঘৃণা বহন করে তার চালেই তাকে ফাঁসাতে চেয়েছিলে?”
তাহমিদ হাসি থামিয়ে ঠোঁট প্রসারিত করে বলল,
“শুধু কি ফাঁসাতে? তাকে অপদস্ত হতে দেখতে চেয়েছিলাম। ঐ লোকটার কারণে আমার শৈশব, বয়সন্ধিকাল কোনোটাই ভালো কাটেনি। যেখানে সেখানে জা*রজ বলে অপদস্ত হতে হয়েছিল। বাবাকে সেদিন ওসব না জানালে খুব বেশি ক্ষতি হতো কি? যেদিন আপনার বাসায় আমার তথাকথিত বাবা, মাকে ক্যামেরা ফিট করতে পাঠিয়েছিল সেদিন ইচ্ছে করেই আমার প্রফেশনের কথা বলতে বলেছিলাম যেন আপনি বুঝে যান ডাল মে কুচ কালা হ্যায়। তারপর আরকি আমার পরিকল্পনা মতো আপনি সব বুঝে গেলেন এরপর আমরা ধরা পড়লাম।”
“কিডন্যাপের দিন ইচ্ছে করেই বিভিন্ন ভাষা বলেছিলেন তাইনা?”
“হুম। ভাইপার যে বিভিন্ন ভাষা জানে তা তো আপনি জানতেনই। এজন্য এখানেও একটা ক্লু দিয়ে এসেছিলাম।”
“কিন্তু আমার বাচ্চাকে অমানসিক ভাবে মারার কারণ কী?”
“সেটাও ভাইপারের কারণেই করেছি। আপনার ছেলেকে মারার কিংবা খারাপ আচরণের ভিডিও সব ভাইফারের কাছে পাঠিয়ে দেয়া হতো। আমি শুধু তার গুটি। এখানে আমার কোনো কিছুতে হাত ছিল না। ভাইপার কোনোদিনও আস্তানায় আসতো না। পরে অবশ্য আপনার কেরামতিতে আসতে বাধ্য হয় এবং এসেই সে ফাঁসে। আপনাকে শেষ করে পথের কাঁটা সরিয়ে ফেলতে চেয়েছিল। কারণ চল্লিশ বছরেও কেউ তার অপকর্মের ব্যাপারে নাগাল পায়নি সেখানে আপনি দুইদিনের গোয়েন্দা হয়ে তার সমস্ত কুকর্মের তথ্য কালেক্ট পরে ফেলেছিলেন। এমনকি আমাকে সিক্রেট এজেন্ট বানানোর পিছনেও আপনাকে ধ্বংস করাই মুখ্য ছিল।”
তাহমিদ একটু দম নিয়ে আবার বলল,
“আপনাকে বাঁচিয়ে রাখে কি করে বলুন? কেউ কি তার শত্রুকে বাঁচিয়ে রাখে? খুব অল্প সময়ে গোয়েন্দা হিসেবে ভালো সাড়া জাগিয়ে ফেলেছিলেন। আমি নিজেও আপনাকে এজন্যই অপছন্দ করতাম। আপনার প্রতি আমার রাগ হিংসাপরায়ণ মনোভাব থেকেই এসেছে। জানেনই তো, মানুষ মানুষের ভালো কিংবা সফলতা দেখতে পারেনা।”
সাইফার একটা বড় দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। বলল,
“আচ্ছা, যাকে তুমি মা হিসেবে চেন তিনি করেন?”
“মা নার্স অর্থাৎ সেবিকা ছিলেন। বাবার আপত্তি থাকায় পরবর্তীতে সেই কাজ তিনি ছেড়ে দেন।”
সাইফার রহস্যময় ভঙ্গিতে বলল,
“আই সি।”
ভাইপারের সামনে বসে আছে সাইফার ও তাহমিদ। সাইফার কয়েকদিনের টর্চারে বুড়িয়ে যাওয়া ব্ল্যাক ভাইপারের দিকে তাকিয়ে বলল,
“যদিও আপনার সাথে আমার লেনাদেনা শেষ। তবে একজন অনাদরে বেড়ে ওঠা মানুষকে তার আপন মানুষের কাছে ফিরিয়ে দেয়া আমার কর্তব্য মনে হলো।”
ভাইপার বিধ্বস্ত শরীর নিয়ে কোনরকমে বললেন,
“কি বলছ বুঝতে পারছি না?”
সাইফার এবার সরাসরি ভাইপারের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তাহমিদ আপনার ভাইয়ের ছেলে তাইনা?”
ভাইপার কথাটায় বেশ চমকালো। আগ্রাসী ভঙ্গিতে উত্তেজিত হয়ে বলল,
“মিথ্যে কথা। ও একটা জা*রজ।”
সাইফার বাঁকা হেসে বলল,
“কিন্তু ডিএনএ টেস্ট যে ভিন্ন কথা বলল।”
তাহমিদ এতই অবাক হয়েছে যে তার মুখ দিয়ে কোনো কথা বেরোচ্ছে না। সে আদৌ ঠিক শুনেছে কিনা বা বাস্তবে আছে কিনা সেটাই বুঝতে পারছে না। কি শুনছে এসব সে? তার পায়ের তলায় মাটি সরে গেছে মনে হচ্ছে। উমায়ের ভুঁইয়া ওরফে ব্ল্যাক ভাইপার গর্জে উঠে বলল,
“তোকে আমি শেষ করে ফেলব সাইফারের বাচ্চা। তুই আমার সমস্ত জীবনটা ওলোট পালোট করে দিয়েছিস। শুধু একবার যদি মুক্তি পেতাম ডিরেক্ট তোর খুলি উড়িয়ে দিতাম।”
সাইফার ঠান্ডা গলায় বলল,
“রিল্যাক্স মিস্টার ভাইপার, এত হচ্ছেন কেন হাইপার?”
“তোকে আমি বাঁচিয়ে রেখেছিলাম যে কেন আমার আফসোস হয়।”
সাইফার হাসলো। বলল,
“আফসোস করে লাভ নেই। নিজের ভাইয়ের সন্তানকে যে পিতৃমাতৃত্ব থেকে বঞ্চিত করে সে যে কি পরিমাণ অমানুষ সেটা আর প্রমাণ করার প্রয়োজন নেই। পিতামাতার পরিচয় জানার পরেও যে জা*রজ বলে গালি দিতে পারে নিজের আপন ভাইয়ের ছেলেকে, যাকে রাস্তার ছেলের মতো অবহেলা, অনাদরে মানুষ হতে হয় আপনার মতো কুলাঙ্গার চাচার জন্য তার আফসোস করা ছাড়া আর কি করার আছে? আমি নাহয় আপনার কুকর্মের তথ্য জেনে গিয়েছিলাম কিন্তু আপনার ভাই কি অপরাধ করেছিল? যাকে আপনি পিতা হওয়া থেকে বঞ্চিত করেছিলেন? আপন রক্তের সাথে কেন বেইমানি করেছিলেন?”
ভাইপার উন্মাদের মতো হাসতে হাসতে বলল,
“আমার ইচ্ছা। আমার রাজত্বে আমি একাই রাজা। সেখানে তিলে তিলে গড়ে তোলা সম্পদ খাবে ভাইয়ের ছেলে? পুত্র সন্তান জন্ম দিতে না পারায় আমি আমার প্রথম স্ত্রীকে খুন করি। আমার প্রথম বিয়ে উজানের বিয়ের এক বছর পরেই হয়। আমার দ্বিতীয় স্ত্রী, সন্তান, উজান কিংবা উর্মি কেউই তা আজ পর্যন্ত জানে না। সেসময় উজানের একের পর এক ছেলে সন্তান হওয়ার খবরে আমি উন্মাদ হয়ে পড়েছিলাম। এজন্য নিজের ছেলে সন্তানের আশায় আমি লুকিয়ে বিয়ে করি। ভেবেছিলাম আমার ছেলেকে দেখিয়ে একেবারে সকলকে জানাবো বিয়ের কথা। রীতিমত তড়পাচ্ছিলাম পুত্র সন্তানের আশায়। কিন্তু আমার প্রথম স্ত্রী কন্যা সন্তান ধারণ করেছিল যেটা সহ্য করতে না পেরে রাগের বশে তার তলপেটে প্রচণ্ড জোরে লাথি মেরে বসি। প্রচণ্ড রক্তক্ষরণে মা ও বাচ্চা দুজনই মারা যায়।
ভাইপার পাগলের মতো বলে চলেছে,
“ভেবেছিলাম আরেকটা বিয়ে করলেও যদি মেয়ে হয় এভাবে আর কয়টা খুন করব আমি? তাই বিয়ের চিন্তা বাদ দিয়ে উজানের সন্তান নষ্ট করার পরিকল্পনা করি। বারবার মেডিসিন দিয়ে ওর সন্তান নষ্ট করে দিচ্ছিলাম। শেষে যখন ডাক্তার বলল, এই সন্তানের পর আর সন্তান জন্মদানের ক্ষমতা উজানের বউ একেবারেই হারিয়ে ফেলবে তখন আরেক পরিকল্পনা সাজাই। ওর এই সন্তানকে আমার ডান হাত বানাবো। সমস্ত খারাপ কাজ, কুকর্ম করাবো ওকে দিয়ে। ভুঁইয়া পরিবারের হওয়া সত্ত্বেও কোনোদিন জানতে পারবে না ও উজানের রক্ত। এতে আমার দিল ঠান্ডা হবে। আমার সম্পদের দিকে নজর দিলে কাউকে আমি ছেড়ে দেইনা। উর্মির শাশুড়িকেও আমি এজন্য সরিয়ে দিয়েছিলাম। ঐ মহিলাও আমার সম্পত্তির দিকে নজর দিয়েছিল। উজানের ছেলে থাকলে সমস্ত সম্পত্তি ওর নামে লিখে দিতে হতো। তা আমি হতে দেই কি করে? কি করে?”
বলেই ভাইপার পাগলের মতো চিৎকার করতে লাগলো। একই কথা বারবার পুনরাবৃত্তি করতে লাগল। পুলিশ এসে তাকে লকাপে ঢুকিয়ে দিল। ভাইপার বারবার গজরাতে লাগলো। সাইফার সরু চোখে সেদিকে তাকিয়ে বলল,
“উন্মাদ সাইকো।”
__
মানহার শরীর খুবই দুর্বল হয়ে পড়েছে। কোনো খাবার মুখে দিলেই বমি করে ঘর ভাসিয়ে ফেলে। এজন্য তার মাথার পাশে বালতির ব্যবস্থা করে দিয়েছেন মায়মুনা বেগম। মাহাবুব আলম মেয়েকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন। ডাক্তার বলেছে বেবির মাথা জরায়ুর মুখে ঘুরে গেছে। এসময় এমন হালকা বমিভাব হয়। মানহা অস্থির হয়ে ইহাবের নম্বরে ডায়াল করল। নম্বর বন্ধ দেখাচ্ছে। তার সবকিছু বিষাক্ত লাগছে। ইহাবকে গতরাত থেকে পাচ্ছে না। ইহাব যাওয়ার প্রায় এক মাস হয়ে গেছে। এতদিন ফোনে কথা হয়েছে তবে দুইদিন ধরে তাকে ফোনে পাওয়া যাচ্ছে না। চিন্তায় মানহা অস্থির হয়ে যাচ্ছে। মাহাবুব আলম কয়েকবার বলছেন,
“হয়তবা কোনো কাজে ব্যস্ত। এত অস্থির হওয়ার প্রয়োজন নেই। কাজ শেষে এমনিতেই ফোন দেবে।”
কিন্তু মানহা কারো কথাই মানতে নারাজ। লোকটার কণ্ঠ শোনেনা দুইদিন হয়। তার মনে হচ্ছে বুকটা বেশি কাঁপছে। ধড়াস ধড়াস করছে। হার্টবিট দ্রুত ওঠানামা করছে। লোকটা তার ঘুম হারাম করে ফোন অফ করে কোথায় গেছে? দুইদিনে একটুও গর্ভবতী স্ত্রীকে ফোন দেয়ার সময় পায়নি সে? এত ব্যস্ততা তার? কোন মহৎ কর্ম করছে যে তাকে ফোন দেয়ার সময়ই তার হয়ে উঠছে না?
চলবে….
(আসসালামু আলাইকুম।)
Share On:
TAGS: তাজরীন ফাতিহা, ভবঘুরে সমরাঙ্গন
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৫৫
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৬৮
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৭০.২
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ১
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ১৭+১৮
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৮
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৬৬
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব (৫৬.১+৫৬.২)
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ২
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৬১