ভবঘুরে_সমরাঙ্গন
পর্ব_৬২
তাজরীন ফাতিহা
জিনান কয়েকটি কাগজ একত্রিত করে ল্যাপটপে কি যেন টাইপ করছিল। হুট করে ইরা এসে আতঙ্কিত গলায় বলল,
“এই শুনছো উমাইয়ার বাবাকে নাকি গ্রেফতার করা হয়েছে?”
জিনান কিবোর্ডে হাত চালাতে চালাতে উত্তর দিল,
“হুম।”
ইরা কপাল কুঁচকে বলল,
“হুম আবার কেমন উত্তর? কি বলেছি শোনো নি? আমার এত খারাপ লাগছে। উমায়ের আংকেল কত ভালো মানুষ অথচ তাকে বিনাদোষে গ্রেফতার করেছে আইনের ফালতু লোকগুলো।”
জিনান এক ভ্রু তুলে বলল,
“বিনাদোষে গ্রেফতার করেছে তোমাকে কে বলল?”
ইরা মুখ ঝামটে বলল,
“কে বলবে আবার? পাপা বলেছে। আংকেল বাবার কাছের বন্ধু মানুষ সেজন্য আপসেট হয়ে আছেন। চিন্তাও করছেন বেশ। শোনো না তুমি একটু দেখ কিছু করতে পারো কিনা?”
জিনান ইরার কথায় পাত্তা না দিয়ে মনোযোগ দিয়ে কাজ করে চলেছে। ইরা জিনানের গা ঘেঁষে বসে বলল,
“কি বলেছি শোনো নি?”
“না।”
“এমন করছ কেন? পাপার কথাও শুনবে না? তিনি না তোমার শ্রদ্ধেয় মামা হন।”
জিনান বিরক্তি নিয়ে বলল,
“সেটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন? আমার মামা হয়ে তার বলদামির সীমা পরিসীমা নেই কেন? তার মতো একজন বিচক্ষণ মানুষের বন্ধু কি করে এমন ব্যক্তি হয় সেটাই তো বড় আশ্চর্যের!”
ইরা হতভম্ব হয়ে বলল,
“কি বলছ এসব?”
“এই কানের কাছে ঘ্যান ঘ্যান কোরো না তো। কাজ করতে দাও।”
ইরা রাগে কথা বলতে ভুলে গেল। সবসময় তাকে ইনসাল্ট করে কথা বলা স্বভাব হয়ে গেছে। সে রাগে চেঁচিয়ে বলল,
“সমস্যা কি? সবসময় এভাবে কথা বলো কেন? আমি কি তোমার অপরিচিত কেউ? রাস্তার মানুষের সাথেও তো মানুষ একটু সুন্দর করে কথা বলে আর তুমি কেমন বিহেভ করো আমার সাথে? কথা বলতে না চাইলে মানা করে দেবে কিন্তু কথার টোন এমন হবে কেন সবসময়? পাপা তোমার মতো মানুষকে আমার যোগ্য ভাবলেন কি দেখে সেটাই বড় আশ্চর্যের! প্রত্যেকটা কথা কাঠকাঠ করে বলবে! আমার সাথে এভাবে কথা আর কখনো বলবে না বলে দিচ্ছি। তার বাসায় এসেছি দেখে কথার ঝাঁচ দেখাচ্ছে। অসহ্য!”
বলে চোখের পানি মুছে দ্রুত রুম থেকে বেরিয়ে গেল। জিনান হতভম্ব হয়ে বসে রইল। একটা গুরুত্বপূর্ন কাজ করছিল দেখে একটু কড়া গলায় কথা বলেছে দেখে এতগুলো কথা শুনিয়ে গেল। তারও রাগ উঠে গেল। মেয়েটার বেশি স্পর্ধা হয়েছে। মেয়েটার থেকে এত বড় হওয়া সত্ত্বেও কিভাবে হুমকি ধমকি দিয়ে কথা বলে গেল। ছোট থেকে জ্বালিয়ে যাচ্ছে। পুরো তার ছিঁড়া মহিলা।
হাতের কাজ শেষ করতে করতে বিকেল হয়ে গেল। এখনো দুপুরের খাবার খাওয়া হয়নি তার। ইরার কোনো আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে না। রুম থেকে বেরিয়ে পাশের রুমে তাকাতেই দেখল দরজা আটকানো। নিশ্চয়ই গাল ফুলিয়ে রেখেছে। সে একটা লম্বা শ্বাস ফেলে রান্নাঘরে যেয়ে পাতিলের ঢাকনা উঠিয়ে দেখল বিরিয়ানি রান্না করা। কালারটা বেশ লাল দেখাচ্ছে। বিরিয়ানি একটুও কমেনি। যেমন রেঁধেছে তেমনই আছে। অর্থাৎ ইরাও খায়নি। মেয়েটা এত অভিমানী। উফ! সে প্লেটে বিরিয়ানি বেড়ে ইরার দরজায় অনবরত টোকা দিতে লাগল। ওপাশ থেকে ইরার কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না। প্রায় পাঁচ মিনিট ধাক্কিয়েও যখন লাভ হলো না তখন জিনান বলল,
“দুই সেকেন্ডের মধ্যে দরজা না খুললে দরজা ভেঙে ফেলব কিন্তু ইরা। সবসময় জিদ দেখাবে না।”
ইরা তবুও উত্তর দিল না। জিনান বাঁকা হেঁসে বলল,
“তোমার বাবাকে তাহলে চলে যেতে বলি। মেয়েকে নিতে এসেছিলেন তিনি।”
ইরা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই দরজা খুলে দেখল জিনান বিরিয়ানি হাতে দাঁড়িয়ে আছে। জিনানের চালাকি বুঝতে পেরে সে ঝটপট দরজা আটকাতে নিলে জিনান পা দিয়ে আটকে দিল। ইরা পা দাপিয়ে চিল্লিয়ে বলল,
“দরজা ছাড়ো।”
জিনান শয়তানি হাসি দিয়ে শক্তি দিয়ে পুরো দরজা খুলে রুমের ভেতরে ঢুকল। টেবিলে প্লেট রেখে ইরাকে ধরতে নিলে ইরা ফুড়ুৎ করে দৌড়ে বেরিয়ে গেল। জিনানও পিছুপিছু ছুটতে ছুটতে বলল,
“দাঁড়াও। আজকে তোমার খবর আছে। দরজা আটকে মৌনব্রত পালন করা হচ্ছিল? সবসময় জিদ দেখানো তাই না? আজকে মাইর দিয়ে ত্যাড়ামি ছুটাবো। আগে তো মামার মেয়ে দেখে হুটহাট মারতে পারতাম না এখন বউ হয়েছ। ইচ্ছেমত পিটিয়ে সোজা করে ফেলব। কত বড় সাহস দুপুরে আমাকে যা ইচ্ছে তাই বলে গেছ ভেবেছ কিছু বলব না? আজকে তোমাকে শিক্ষা দিয়েই ছাড়ব। এতটুকু মেয়ে বড়দের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় জানো না? আবার বিরিয়ানিতে রাগ দেখিয়ে ঝাল দেয়া তাই না? সব তোমাকে খাওয়াবো।”
ইরা সোফার ওপাশে আর জিনান এপাশে। ইরা মুখ ভেঙিয়ে বলল,
“বেশ করেছি আরও খাওয়াব। সবসময় আমাকে ধমকাবে কেন?”
জিনান চোখ বড়বড় করে বলল,
“কি বললে! দাঁড়াও আজকে তোমার খবর আছে।”
বলেই দ্রুত বেগে ছুটে এসে ইরাকে পিছন থেকে ঝাপটে ধরল। ইরা ছটফটিয়ে জিনানের হাত থেকে ছাড়া পেতে চাইল। ছলছল চোখে চেয়ে বলল,
“আর করব না। স্যরি। তুমি বকেছ তাই এমন করেছি। মারবে না প্লিজ। আমি না তোমার ছোট? বাচ্চাদের গায়ে হাত দিলে পাপ হয়।”
জিনান ইরাকে ধরে রেখে আশ্চর্যান্বিত গলায় বলল,
“তুমি বাচ্চা?”
ইরা ইনোসেন্ট মুখ করে বলল,
“বাচ্চা না হই তোমার থেকে তো ছোট। ছোটদের মারলে আল্লাহ পাপ দিবে।”
জিনান মুখ শক্ত করে বলল,
“আর বড়দের সাথে তর্ক করলে, বেয়াদবি করলে আল্লাহ পাপ দেবে না?”
ইরা ঠোঁট উল্টে বলল,
“না ছোটরা তো অবুঝ। ওরা ভুল করবে নাতো আধ বুড়োরা করবে?”
“কি বললে!”
ইরা থতমত খেয়ে বলল,
“কই কিছু বলিনি তো।”
জিনান মুখ গম্ভীর রেখেই বলল,
“আর বিরিয়ানি গুলো খাবে কে?”
ইরা মুখ নামিয়ে নিল। চোখ ফুঁড়ে পানি বেরোলো। জিনান ইরার দিকে চেয়ে বলল,
“কাঁদছো কেন? তোমাকে মেরেছি?”
ইরা নাক টেনে বলল,
“কত কষ্ট করে বিরিয়ানি রেঁধেছিলাম। তোমার জন্য সব নষ্ট হলো।”
“আমি কি করেছি? করেছ তো তুমি।”
ইরা জিনানের বাহু থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে বলল,
“উছিলা তো তুমি। আমাকে রাগিয়েছ কেন?”
জিনান বিরক্তি নিয়ে বলল,
“বেক্কল মেয়ে।”
ইরা গাল দুটো ফুলিয়ে বলল,
“আমাকে বেক্কল বলবে না। সব দোষ তোমার।”
জিনান আর কথা বাড়ালো না। খিদায় পেট চোঁ চোঁ করছে। গত রাতে পাউরুটি এনেছিল। সেটার সন্ধানে রান্নাঘরে গেল। ইরাও নাক টেনে টেনে পিছুপিছু এল। জিনান পাউরুটির প্যাকেট থেকে রুটি একটা বের করতেই দেখল প্রত্যেক রুটি কামড়ে কামড়ে রেখে দেয়া। সে হতভম্ভ হয়ে ইরার দিকে চেয়ে বলল,
“ইঁদুরের বাচ্চা।”
ইরা ততক্ষণে ভোঁ দৌড়।
__
মারওয়ান ছেলেকে শার্ট প্যান্ট পরিয়ে ইন করে দিল। হাতে পরালো ছোট্ট ঘড়ি। মাথার চুল আঁচড়ে ফিটফাট বাবু সাহেব বানিয়ে দিল। নাহওয়ান ফিচফিচ করে হেঁসে বলল,
“শাট পচ্চি, প্যান পচ্চি।”
“তারপর?”
হাত ঘড়ি দেখিয়ে বলল,
“টারপল গরি পচ্চি।”
মারওয়ান মুখ টানটান করে বলল,
“এবার শুয়ে গড়াগড়ি কর।”
নাহওয়ান লাফাতে লাফাতে বলল,
“ইননা, গুত্তে যাব।”
“তোকে নেবে কে পটলের বাচ্চা?”
নাহওয়ান ঘাড় কাত করে মায়াবী চোখে চেয়ে বলল,
“টুমি।”
মারওয়ান সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলল,
“নিতে পারি এক শর্তে। তোর মাকে একটা কামড় দিতে হবে। পারবি?”
নাহওয়ান অবুঝ গলায় বলল,
“পালব।”
“যা তাহলে। জোরে দিবি। গো ফাস্ট।”
নাহওয়ান গুলুমুলু শরীরটা নিয়ে রুম থেকে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে বেরিয়ে গেল। মারওয়ান বাঁকা হাসল। এখনো গলা, হাতের বাজু কামড়ের তীব্র দংশনে জ্বলছে। আজকে টের পাবে কত ধানে কত চাল! একটু পর নিশাতের গলার আওয়াজ শোনা গেল। মারওয়ান কিছু জানে না এমন ভঙ্গিতে তৈরি হচ্ছে। নাহওয়ান দৌঁড়ে এসে মারওয়ানের পা জড়িয়ে ধরল। নিশাত পিছু পিছু চেঁচাতে চেঁচাতে এসে বলল,
“এই কামড় দিলি কেন?”
নাহওয়ান ততক্ষণে বাবার পায়ে মুখ লুকিয়েছে। মারওয়ান অবিন্যস্ত চুল গুলো হাত দিয়ে নাড়তে নাড়তে বলল,
“তোমার স্বভাব পেয়েছে।”
“আমার স্বভাব মানে? আমি কি হুটহাট কামড় দেই নাকি? এই এদিকে আসো। কেন কামড় দিলে বলো?”
মায়ের ধমক ও চোখ রাঙানোতে নাহওয়ান ছলছল চোখে বলল,
“বাবা বলেচে।”
মারওয়ান তাড়াহুড়ো করে বলল,
“আমি কখন বলেছি ডাম্বলের বাচ্চা।”
নিশাত গুরুগম্ভীর গলায় বলল,
“নাহওয়ান কখনো মিথ্যা বলেনা।”
মারওয়ান মুখ লটকে বলল,
“হ্যাঁ শুধু আমিই বলি।”
নিশাত ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
“এত ফিটফাট হয়ে কোথায় যাচ্ছেন দুজন?”
মারওয়ান উল্টো ঘুরে চুলে চিরুনি চালাচ্ছিল। নিশাতের প্রশ্ন শুনে ত্যাড়া কণ্ঠে বলল,
“বিয়ে করতে।”
নিশাত হাত মুছে এগিয়ে এসে বলল,
“বাপ বেটা দুজনই?”
“হ্যাঁ।”
নাহওয়ানের দিকে ইশারা করে বলল,
“কিরে বিয়ে করতে যাচ্ছিস?”
নাহওয়ান না বুঝেই লাফিয়ে উঠে বলল,
“যাচ্চি। মুজা মুজা।”
নিশাতের হাসি পেল তবে হাসলো না। মুখ গম্ভীর করে বলল,
“মনে হচ্ছে পাত্রী রেডি।”
“হ্যাঁ।”
“কে সেই দুর্ভাগ্যবতী?”
মারওয়ান নির্লিপ্ত গলায় বলল,
“দুর্ভাগ্যবতী হবে কেন? বলো সৌভাগ্যবতী। কামড়বতী থেকে সৌভাগ্যবতীর কাছে যাব।”
নিশাত মুখ টিপে মারওয়ানের গম্ভীর মুখশ্রীর দিকে চেয়ে রইল। বুকে হাত গুজে বলল,
“ভালো ভালো। তা ছেলের পাত্রী ঠিক করেছেন?”
মারওয়ান কোঁকড়া চুলগুলো কোনো রকম আঁচড়াতে আঁচড়াতে বলল,
“কথা বোলো না তো, কাজে ডিস্টার্ব হচ্ছে। বা*লের চুল।”
নিশাত এগিয়ে এসে বলল,
“মাথাটা নিচু করুন।”
মারওয়ান ভ্রু কুঁচকে বলল,
“কেন?”
নিশাত বলল,
“আগে করুন।”
মারওয়ান মাথা নিচু করতেই নিশাত মারওয়ানের হাত থেকে ছোঁ মেরে চিরুনি নিয়ে এক হাত দিয়ে শক্ত করে চোয়াল চেপে ধরে মাথা আঁচড়াতে আঁচড়াতে বলল,
“চুলটা আঁচড়াতেও যার আলসেমি সে নাকি আবার বিয়ে করতে যাচ্ছে? কাল কামড় দিয়েছি বলে ছেলেকে দিয়ে প্রতিশোধ নিলেন? ব্যাপারটা ভালোই।”
মাথা নুইয়ে রাখায় মারওয়ানের ঘাড় ব্যথা করতে লাগল। নিশাতের দিকে চেয়ে বলল,
“এখন শক্ত করে চোয়াল চেপে সেটার সাধ মেটাচ্ছ নাকি? এটা কিন্তু বেইনসাফি। তুমি আমাকে রীতিমত টর্চার করছ লিলিপুট।”
নিশাত চুলের জট ছাড়াতে ছাড়াতে বলল,
“কথা বলবেন না। বেশি কথা বললে এরপর হার্ট চেপে ধরব।”
মারওয়ান মুখ কুঁচকে রেখে সব সহ্য করল। নাহওয়ান এখনো তার পায়ে মুখ লুকিয়ে আছে। নিশাত বহু কসরৎ করে কোঁকড়ানো চুলের জট ছাড়াল। চিরুনি রেখে বলল,
“মাথা এমন কাকের বাসার মতো করে রেখেছেন কেন? কতদিন হয় চুল আঁচড়ান না? যে কেউ পাগল ভেবে মারা শুরু করবে। আপনার অফিসের লোকজন কিছু বলে না? এতদিন নাহয় কাজকাম ছিল না তাই ভবঘুরের মতো ঘুরেছেন এখন তো কাজের দায়িত্ব কাঁধে পড়েছে তবুও এমন ছন্নছাড়া ভাব কেন? সপ্তাহে তিনদিন অন্তত চুলে শ্যাম্পু দিয়ে চুলগুলো সিল্কি রাখবেন। এতে ময়লা পরিষ্কার হয়ে আর জট বাঁধবে না। দেখবেন মাথাটাও রিফ্রেশ লাগছে। এমন মাসে একবার চিরুনি আর বছরে একবার শ্যাম্পু করলে চুলে তো জট পড়বেই। লুক লাইক পাখির বাসা।”
মারওয়ান এক ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
“তুমি আমাকে উপদেশ দিচ্ছ নাকি অপমান করছ? ইদানিং বড্ড বার বেড়েছে দেখছি তোমার।”
নিশাত বলল,
“ইদানিং স্বামী মহাশয় কামাই করা শুরু করেছন তো তাই বড্ড বার বেড়েছে বুঝলেন মিস্টার ভবঘুরে। স্বামী কামাই করল স্ত্রীর পাওয়ার বাড়ে। আজকে বাপ, বেটাকে একা যেতে দেব না। আমিও যাব। এতদিন আমার টাকা খসিয়েছেন আজ আপনারটা খসাবো।”
মারওয়ান মুখ আরও গম্ভীর করে বলল,
“তোমাকে নেবে কে?”
নিশাত দুই হাত বুকে গুঁজে তীক্ষ্ম চোখে চেয়ে বলল,
“নেবেন না?”
কথাটা এত তীব্র ছিল যে মারওয়ান মুখের উপর না করতে পারল না আবার সম্মতিও জানালো না। নিশাত এরপর ফিটফাট হওয়া বাপ পুত্রকে বসিয়ে রেখে মুখ ধুয়ে বোরকা পরলো। মুখে ক্রিম মাখল আর ঠোঁটে লিপগ্লস দিল। দীঘল চুলগুলো আচঁড়ালো বেশ সময় নিয়ে। তারপর খোঁপা করে হেয়ার ক্লিপ আটকালো। মারওয়ান বিরক্তি নিয়ে নিশাতের দিকে চেয়ে আছে। নিশাতের তৈরি হতে সময় লাগছে দেখে সে শুয়ে পড়েছে। পায়ের উপর পা তুলে নিশাতের কর্মকাণ্ড কপাল কুঁচকে দেখছে। নিশাতকে এখনো রেডি হতে দেখে বলল,
“কয় বছর লাগবে রেডি হতে?”
নিশাত নিকাব পরতে পরতে বলল,
“এইতো হয়ে গেছে।”
“সেটা তো ঘণ্টা ধরে দেখছি। মেয়ে মানুষ সবকিছুতে ডিস্টার্ব। এক জায়গায় বের হব আর এদের রেডি হওয়াই শেষ হয়না। এতক্ষণ ঘুরে টুরে চলে আসাও যেত অথচ এখন পর্যন্ত বেরই হতে পারলাম না। বিরক্তিকর, সবকিছুতে ডিস্টার্ব।”
নাহওয়ান বাবার কথায় তাল মিলিয়ে বলল,
“উফফু ডিস্টাব।”
নিশাত চোখ বড় বড় করে বলল,
“বাপের সাথে থাকতে থাকতে বাপ ন্যাওটা হচ্ছিস? ডিস্টার্ব আবার কি? কত বড় বিচ্ছু বলে কিনা ডিস্টার্ব! তোদের মতো শার্ট প্যান্ট পরেই বেরিয়ে যেতে পারলে তো ভালোই হতো। মেয়েদের কত ঢেকে ঢুকে বেরোতে হয় জানিস? আসিস আর মায়ের কাছে।”
মারওয়ান ছেলেকে কোলের মধ্যে টেনে কানে কানে বলল,
“বল বেশি বেশি আসব।”
নাহওয়ান ফিচফিচ করে হেঁসে বলল,
“বিশি বিশি আচব।”
নিশাত আলমারি থেকে হ্যান্ড ব্যাগ বের করতে করতে বলল,
“আসিস মাইর দেবনি।”
এরপর ঘরের জানালা বন্ধ করতে করতে বলল,
“শুয়ে আছেন কেন এখনো? উঠুন। আসছে মেয়ে মানুষ মানে ডিস্টার্ব বলতে। ঘরের কয়টা কাজ করেন যে বুঝবেন কত কাজ থাকে এই সংসারে? এক বিন্দু বসে থাকতে কখনো দেখেছেন?”
মারওয়ান ছেলেকে কোলে নিয়ে উঠে বসল। চোখের সামনে ব্যস্ত ভঙ্গিতে অনর্গল কথা বলতে বলতে ছুটতে থাকা রমণীকে দেখল। যে এক সেকেন্ডের জন্যও বিশ্রাম নেয়না। পুরো ঘরটা সামলায়। একটা নিঃশ্বাস ফেলে নাহওয়ানকে কোলে নিয়ে বেবি স্নিকার্স পরিয়ে দিল। সে নিজেই গত পরশু তাদের তিনজনের জন্য স্নিকার্স জুতো এনেছিল। নিজেও সেটা পরল। দরজা খুলে বের হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। নিশাত এখনো ঘরে। হয়তোবা কাজ করছে কোনো। আচ্ছা তার মতো অগোছালো পুরুষের কপালে এমন সাংসারিক নারী জুটলো কিভাবে? আল্লাহ এত ভালো নারীকে তার সাথে জোড়ালো কেন?
নিশাত তাড়াহুড়া করে লেডিস স্নিকার্স পরে বের হলো। অতঃপর স্বামী, স্ত্রী ও তাদের সন্তান বেরিয়ে পরল তাদের গন্তব্যে। বিকেলের নরম আলোয় পিতার কোলে পুত্র আর কয়েক ইঞ্চি দূরে মাতা ব্যাগ নিয়ে হেঁটে চলছে। শরতের বিকেলের কি চমৎকার মায়াময় দৃশ্য!
রেস্টুরেন্টে পাশাপশি বসে আছে মারওয়ান, নিশাত। আর তাদের মুখোমুখি নাহওয়ানকে কোলে নিয়ে বসে আছে ইনাবা। ইনাবার সাথে হুট করেই দেখা হয়েছে। একেবারে অপ্রত্যাশিত সাক্ষাৎ যাকে বলে। সে শপিং এ বেরিয়েছিল। পথিমধ্যে মারওয়ানকে দেখতে পেতেই এগিয়ে এসেছে। তারপর মারওয়ানই নিজ থেকে খাবার অফার করল। সেও নাহওয়ানের সাথে আরেকটু থাকার লোভ সামলাতে পারল না। আবার এই প্রথম সাইফার স্যারের ওয়াইফকে দেখতে পেল। এই মহয়সী নারীকে দেখার তীব্র ইচ্ছে তার বহুদিনের। আজকে দেখা হয়ে গেল। যদিও মুখশ্রী দেখতে পায়নি তবুও কথাবার্তা হয়েছে। ইনাবার কেন যেন বেশ হাসি পেল। সে ভেবেছিল স্যারের ওয়াইফ স্যারের মতোই লম্বা কিন্তু এখানে তো পুরোই ভিন্ন। ম্যাডামের মতো খাটো একজনের কথায় সাইফার স্যারের মতো তাগড়া, ইন্টেলিজেন্ট, দক্ষ ফাইটার উঠে বসে ব্যাপারটা ভাবলেই তো কেমন চমৎকার আবহ তৈরি হয়। খাবার চলে আসায় নিশাত ইনাবাকে উদ্দেশ্যে করে বলল,
“আপনি ওকে আমার কোলে দিন।”
ইনাবা নাহওয়ানকে শক্ত করে বুকে চেপে বলল,
“না না। ও থাকুক আমার কাছে। আর প্লিজ আমাকে আপনি বলবেন না। আমি আপনার ছোট হব ম্যাম।”
নিশাত টেবিলে দুই হাত রেখে বলল,
“তা আমি আপনার কেমন টিচার যে ম্যাম ডাকছেন?”
“স্যারের ওয়াইফ তো ম্যামই।”
“সেটা আপনাদের কর্মক্ষেত্রে। আমাকে কেউ ম্যাম ডাকুক এটা আমার পছন্দ না। আপু নয়তো ভাবি যেকোনো একটা ডাকো।”
ইনাবা মাথা নাড়িয়ে সায় দিল। মারওয়ানের এদিকে খেয়াল নেই সে খাওয়ায় ব্যস্ত। ইনাবা পাস্তা স্পুনে তুলে নাহওয়ানের মুখের সামনে তুলে ধরল। নাহওয়ান মুখ ঘুরিয়ে ডাকল,
“বাবা।”
মারওয়ান চোখ তুলে গম্ভীর বদনে চাইল। নাহওয়ান হাত বাড়িয়ে দিতেই ইনাবা বলল,
“একটু আমার কাছে থাকো। আমাকে ভুলে গেছ?”
নাহওয়ান ঠোঁট উল্টে বলল,
“বুলি নাই। বাবাল কাচে যাব।”
“সবসময় তো বাবার কাছেই থাকো। আজকে নাহয় আমার কাছে একটু থাকো।”
নাহওয়ান মোচড়ামুচড়ি করতে করতে নেমে দাঁড়িয়ে বলল,
“ইননা। বাবা কাইয়ে ডিবে। মুজা মুজা হবে।”
ইনাবা নাহওয়ানকে শক্ত করে ধরে তার মতো করে বলল,
“আমি খাইয়ে দেই। মুজা মুজা বেশি লাগবে।”
নাহওয়ান ছলছল চোখে চেয়ে বলল,
“ইননা। পুচা পুচা লাগবে।”
ইনাবা এতটুকু গুলুমুলু বাচ্চার আদুরে কথা শুনে হেসে উঠে নুয়ে গালে চুমু খেল। নাহওয়ান গাল ডলতে ডলতে ইনাবার উরুতে কামড় বসিয়ে দিল। ইনাবা ব্যথাসূচক আওয়াজ করল। মারওয়ান বলল,
“ওকে ছেড়ে দাও।”
ইনাবা নাহওয়ানকে দু’পা দিয়ে আটকে বলল,
“দুঃখিত স্যার। আপনার এই কথাটা আজকে পালন করতে পারলাম না। ওকে আজকে আমি বাসায় নিয়ে যাব। কামড় দিল কেন? জবাবদিহি চাই আমি।”
নাহওয়ান ভয় পেয়ে কেঁদে উঠে বলল,
“বাবা মাচ্চে, চিপা ডিচে।”
ইনাবা মনে মনে হেসে মুখ গম্ভীর করে বলল,
“তোমাকে আজকে খেয়ে ফেলব লাড্ডু সোনা।”
“মা মালবে।”
ইনাবা নিশাতকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আপু আপনি আমাকে মারবেন?”
নিশাত মুখ টিপে না জানালো। নাহওয়ান তা দেখে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“বাবা বিশি বিশি মালবে।”
ইনাবা মারওয়ানকেও একই প্রশ্ন করল,
“স্যার আপনি আমাকে মারবেন?”
মারওয়ান খেতে খেতেই জবাব দিল,
“হ্যাঁ।”
ইনাবা থতমত খেল। এমন উত্তর আশা করেনি সে।ভেবেছিল ফর্মালিটি করেও স্যার তার কথায় তাল দেবে কিন্তু এ দেখি পুরো উল্টো হলো। মুখের উপর হ্যাঁ। কথার কোনো রাখ ঢাক নেই। এজন্যই এই স্যারের সঙ্গে কথা বলতে গেলে তার হাঁটু কাঁপে। কোনো কথার লাগাম নেই তার। সে মন খারাপ করে নাহওয়ানকে ছেড়ে দিল। নাহওয়ান খুশি মনে বের হয়ে নিশাতের পা জড়িয়ে ধরল। নিশাত ইনাবার মন খারাপ বুঝতে পেরে বলল,
“আন্টি কষ্ট পেয়েছেন। এভাবে আন্টিকে কষ্ট দিতে হয়না আব্বা।”
নাহওয়ান মাথা ঘুরিয়ে ইনাবার দিকে চাইল। তারপর মায়ের দিকে মুখ ঘুরিয়ে বলল,
“কসটো পেয়েচে?”
নিশাত মাথা নাড়ালো। নাহওয়ান এগিয়ে এসে ইনাবার হাঁটুতে গুলুমুলু হাতদ্বয় রেখে বলল,
“লাগ কচ্চো?”
ইনাবা মাথা নাড়িয়ে সায় জানালো অর্থাৎ রাগ করেছে। নাহওয়ান ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,
“লাগ কলে না। আমি কেয়ে চলি আচবো।”
ইনাবা কিছু বলল না। সে বিরস মুখে পাস্তা মুখে পুরলো। নাহওয়ান ইনাবাকে কথা বলতে না দেখে বলল,
“আচ্চা ইট্টু কাবো। বিশি না।”
ইনাবা খুশি হয়ে নাহওয়ানকে কোলে তুলে কয়েক চামচ খাইয়ে দিল। তারপর ঠেসে ঠেসে চুমু খেল। নাহওয়ান ঠোঁট ফুলিয়ে গাল ডলতে ডলতে খেল। তারপর মায়ের দিকে চেয়ে বলল,
“উফফু সান্টি নাই। কালি চুমায়।”
ইনাবা হেসে ফেলল। সে পর্দা না করলেও হিজাব পরে। হিজাবে চিকেন চাপের ঝোল ভরিয়ে ফেলল নাহওয়ান। ইনাবা কিছুই বলল না। উল্টো ঠান্ডা মাথায় টিস্যু দিয়ে মুছে ফেলল চেরি কাপড়ের হিজাবটি। নাহওয়ানকে চুমু দিয়ে গোশত ছিঁড়ে মুখে দিল। নাহওয়ান গাল ফুলিয়ে চিবোতে লাগল। ইনাবা স্যুপ, অন্থন সব অল্প অল্প করে বাচ্চাটার মুখে দিল। নাহওয়ান মাথা নাড়িয়ে নাড়িয়ে খেল।
খাবারের বিল দিয়ে মারওয়ান রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে ইনাবাকে রিকশায় তুলে দিল। ইনাবা সবার থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেল। নিশাত বলল,
“বাহ্ সুন্দরী সুন্দরী কলিগ আছে দেখি আপনার।”
মারওয়ান মুখ কুঁচকে বলল,
“ও ইহাবের বোন।”
নিশাত অবাক হয়ে বলল,
“মানহার ননদ?”
“হ্যাঁ।”
“ও গোয়েন্দা সংস্থায় কাজ করে?”
“হুম।”
“আমাকে আগে বলেননি কেন? তাহলে মানহার ব্যাপারে খোঁজ নিতে পারতাম। এখন চলে যাওয়ার পর বলছেন? আর ও চেনে না আপনাকে?”
মারওয়ান রাস্তার এপাশ ওপাশ দেখতে দেখতে বলল,
“চেনে।”
“তাহলে স্যার, ম্যাম এগুলো কি?”
মারওয়ান নুয়ে নাহওয়ানের হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে বলল,
“কেন তুমি কি চাচ্ছিলে আমাকে ভাইয়া ডাকুক?”
নিশাতের মুখ কুঁচকে গেল। আসলেই ভাইয়া ডাকটা কেমন যেন লাগছে। এর চেয়ে স্যারই ঠিক আছে। এখনকার মেয়েরা তো আবার বিবাহিত পুরুষের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়। দেখা যাবে ভাইয়া থেকে সাইয়া বানিয়ে ফেলবে জানতেও পারবে না। যদিও মানহার ননদ এমন না সে জানে তবুও বলা তো যায়না কখন কি হয়ে। বিপদ, অবসেশন তো আর বলে কয়ে আসেনা। তবুও নিশাতের মুখশ্রী কেন যেন চিন্তিত হয়ে উঠল।
চলবে….
(আসসালামু আলাইকুম।)
ছবি:@Famika Hasan❤️
Share On:
TAGS: তাজরীন ফাতিহা, ভবঘুরে সমরাঙ্গন
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৮
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৪৩+৪৪
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ২৯+৩০
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ২৪+২৫
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন ১৫+১৬
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ১৩+১৪
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৩৯+৪০
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৫৭+বোনাস
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন গল্পের সব লিংক
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ১৭+১৮