Golpo romantic golpo ভবঘুরে সমরাঙ্গন

ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৬০


ভবঘুরে_সমরাঙ্গন

পর্ব_৬০

তাজরীন ফাতিহা

পুরো হলরুম নিস্তব্ধ। সকলের চোখে মুখে বিস্ময় ফুটে উঠলেও অপরাধীরা কিছু হয়নি এমন চেহারায় উপবিষ্ট। নিজেদের মধ্যে সামান্যতম অপরাধবোধও নেই তাদের। সকল নিস্তব্ধতাকে ছাপিয়ে সাইফার উঠে দাঁড়িয়ে বলল,

“আসল অপরাধীদের তো মুখোশ উন্মোচিত হলোই এখন এখানে আমার আর কোনো দরকার আছে বলে মনে হয়না। আমার যেটুকু কর্তব্য আশা করি সবটুকু করতে পেরেছি।”

এটুকু বলে সাইফার ভাইপারের সম্মুখে এগিয়ে এসে বলল,

“আমার বাসায় একবার বিয়ের সম্বন্ধ পাঠিয়েছিলেন মনে আছে?”

ভাইপার ভ্রু কুঁচকে অবুঝ ভঙ্গিতে বলল,

“কিসব বলছ? আমি কেন সম্বন্ধ পাঠাতে যাব?”

সাইফার নিচে বসা তাহমিদের দিকে চেয়ে রহস্যময় গলায় বলল,

“ও আচ্ছা তাহলে সেটা মহামান্য আপনার কাজ?”

ভাইপার কৌতূহলী গলায় বলল,

“কী?”

সাইফার হাই দিয়ে বলল,

“আমার স্ত্রীর সম্বন্ধ নিয়ে এসেছে খুবই ভালো কথা তবে ছেলের প্রফেশন জানিয়ে তারা সবচেয়ে বোকামি করেছেন। এই প্রফেশনে যারা থাকে তারা কোনোদিন নিজেদের প্রফেশন এত সহজে রিভিল করেনা। তবে তার বাবা, মা সরল মনে না বুঝে বোধহয় বলে ফেলেছিল। পরে সম্ভবত এই বোকামির জন্য আফসোসও করেছিল। তাইনা মিস্টার তাহমিদ?

ভাইপার শান্ত চোখে তাহমিদের দিকে চাইল। তাহমিদ চোখ সরিয়ে অন্যদিকে দৃষ্টি ফেলল। তার চোখ বরাবর রুবানা আজমেরী মেয়েটা দাঁড়ানো। সরু নেত্রে সেদিকেই চেয়ে রইল। ভাইপার হুট করে উঠে দাঁড়িয়ে তাহমিদের সামনে এল। তাকে টেনে উঠিয়ে বলল,

“তোর বাবা মাকে আমি অন্য কাজে পাঠিয়েছিলাম তারা তোর প্রফেশন কখন বলেছিল? মাইক্রোফোনে তো সম্পূর্ণ কনভারসেশনই শুনছিলাম কোথায় এমন তো কিছু শুনিনি। কি লুকিয়েছিস তোরা পুরো পরিবার? আমার সম্পূর্ণ প্ল্যান ফ্ল্যাপের জন্য একমাত্র দায়ী তুই। আমার তো মনে হচ্ছে তুই কোনোদিনও আমার হয়ে কাজ করিসনি। শুধু উপরে উপরে দেখাতি যে আমার সঙ্গে আছিস তুই। আদতে তুই হলি নীরব ঘাতক।”

সাইফার তার কথা শেষ হতেই বলল,

“এই না অস্বীকার করলেন আপনি কিছুই জানেন না। এখন আবার অন্য কাজে পাঠিয়েছিলেন বললেন যে?”

তাহমিদ উচ্চ শব্দে হেঁসে উঠে বলল,

“পাঠিয়েছিলই তো। পিপহোল ক্যামেরা আলমারির কোনায় অতি সূক্ষ্মভাবে সেট করতে পাঠিয়েছিল যেন আপনার প্রত্যেকটা কাজের উপর নজরদারি রাখা যায়। পরবর্তীতে ঐ ক্যামেরা কাজ করেনি। এজন্য বাবা, মাকে পানিশমেন্টও দিয়েছিলেন তিনি।”

ভাইপার তার মুখ বরাবর ঘুষি বসিয়ে দিল। ঘুষির তীব্রতায় তাহমিদের মুখ ছিটকে রক্ত বেরিয়ে এল। সাইফার তাচ্ছিল্য হেঁসে বলল,

“যাক নিজের মুখে সমস্ত প্ল্যানের অংশ বলেই দিলেন তাহলে। ভাগ্যিস সেদিন তারা যাওয়ার পর পুরো ঘর সার্চ করেছিলাম নয়তো এই লোক সম্পূর্ণ লাইভ দেখতো আমাদের। কতবড় জঘন্য লোক! প্রাইভেসি বলে কিচ্ছু থাকতো না। ননসেন্স পিপল।”

ভাইপার নিজের ক্রোধ কিছুতেই দমাতে পারছে না। এভাবে সমস্ত পরিকল্পনা ভেস্তে যেতে দেখে পরিজয়ের গ্লানিতে ক্ষুধার্ত বাঘটা জেগে উঠতে চাইছে। তাহমিদ পাগলের মতো হেঁসেই যাচ্ছে। ভাইপার তার কোটের কলার ধরে আরোও কয়েক ঘা দিয়ে বলল,

“সত্যি করে বল তোর উদ্দেশ্য কি ছিল?”

তাহমিদ নিজের কলার ছাড়িয়ে নিয়ে বলল,

“একদমই কোনো উদ্যেশ্যে নেই। আমি তো কেবল আপনার দাবার গুটি। দর্শকও বলতে পারেন।”

বলেই হো হো করে আবারও হেঁসে উঠল। ঠোঁটের কোনা বেয়ে লাল রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। সাইফার রুবানার সামনে এসে বলল,

“ঘুমিয়ে পড়েছে?”

রুবানা এতক্ষণ ঘোরে ছিল। স্যারের কণ্ঠে বাস্তবে এল। সাইফারের দৃষ্টি তার কোলে ঘুমিয়ে পড়া নাহওয়ানের দিকে। সে ফোঁস করে নিঃশ্বাস নিয়ে বলল,

“স্যার ও যে আপনার সন্তান আমাকে জানাননি কেন? ভাইয়া আই মিন মুনতাজির স্যারও বলেনি কেন এসম্পর্কে? আমি তো বাচ্চাটাকে ঐ লোকটার সন্তান ভেবেছিলাম। নিজের সন্তানকে নিয়ে এতো বড় রিস্ক কিভাবে নিলেন? অবিশ্বাস্য!”

সাইফার ভ্রু কুঁচকে গম্ভীর গলায় বলল,

“আমার বাচ্চা বললে তুমি এক্সট্রা কদর করতে। অন্যসব কাজে ফোকাস কম দিতে। এখানে তোমাকে একটা উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়েছিল সাথে এদেরকে নজরদারি করতে। আমার বাচ্চা শুনলে নিশ্চয়ই তুমি বেশি বেশি খাতির যত্ন করতে তখন সকলের সন্দেহ বাড়তো। আমাদের স্পাই ভাবতো এবং তোমার জীবন ঝুঁকিতে পড়তো। আসল কার্য হাসিল হতো না। আর না বলার পিছনেও একটা কারণ ছিল। তোমার কাজের দক্ষতা দেখার প্রয়োজন ছিল। একটা অপরিচিত বাচ্চাকে নিজের বুদ্ধিমত্তা দিয়ে কিভাবে ট্রিট করো এসব দেখার দরকারও ছিল।”

রুবানা মাথা নাড়িয়ে কথার সাথে সায় জানালো। এই স্যারের সঙ্গে কথা বলতে গেলে তার হাঁটু কাঁপে। অন্যান্য গোয়েন্দা অফিসাররা তো একটু হেঁসে কথা বলে আর এই স্যার মুখ খুললেই মনে হয় বোমা ফেলছে। এমন তিতা মানুষের সাথে যে নারী জুড়ে আছে সেই বা কোন ধাতুর গড়া? তার সাথে ম্যাডাম সংসার করছে কিভাবে সেটাই বড় আশ্চর্যের। ভাবনার মাঝে সাইফার আবার বলল,

“ওকে দাও। ওর মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিয়ে আসি।”

রুবানা ওরফে ইনাবার মাতৃ হৃদয়ে কথাটা বেশ লাগলো। বাচ্চাটা এত্ত আদুরে মনে হচ্ছিল আজীবন বুকের মধ্যে ঢুকিয়ে রাখতে। পরিকল্পনাও তো করে ফেলেছিল বাচ্চাটাকে নিয়ে অনেক দূরে চলে যাবে। ভেবেছিল ঐ জালিম লোকটার পুত্র এখন শোনে এটা সাইফার স্যারের ছেলে। আর সেও বা কেমন বলদ ঐ তাহমিদ না কাহমিদ যখন সাইফার স্যারের মুখোশ পড়ে বাচ্চাটার সামনে আসতো তখনই তো বুঝে যাওয়া উচিত ছিল ঘাপলা কিছু অবশ্যই আছে। তার নিজের ভাইও তো তাকে জানাতে পারতো এবিষয়ে কিছু। দুই বন্ধু একই স্বভাবের। শুধু কথা গোপন করে। রুবানা ভারাক্রান্ত মন নিয়ে ঘুমন্ত নাহওয়ানকে সাইফারের কোলে দিল। একজনের কোল থেকে অন্যজনের কোলে যাওয়ার কারণে নাহওয়ানের ঘুম ভেঙে গেল। কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছিল সে। আশেপাশে তাকাতেই সামনে তার বাবার মুখোশ পড়া তাহমিদকে দেখল। বাচ্চাটা গুটিয়ে গেল। তাহমিদ অবশ্য অন্যদিকে চাওয়া। ঠোঁট গলিয়ে রক্ত পড়ছে তার। সাইফার তাকে নিয়ে বেরিয়ে যেতে নিলে বাচ্চাটা ছলছল চোখে তাহমিদের দিকে চেয়ে ‘বাবা’ বলে ডেকে উঠল। সাইফার দাঁড়িয়ে গেল। ঘাড় থেকে ছেলের মাথা উঠিয়ে বলল,

“ফাইয়াজ।”

নাহওয়ান ফ্যালফ্যাল করে সাইফারের দিকে চেয়ে আছে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে আবার তাহমিদের দিকে চাইল। তাহমিদ মুখ কুঁচকে ঠোঁটের রক্ত পরিষ্কার করছে। নাহওয়ান মোড়ামোড়ি করে সাইফারের কোল থেকে নামতে চাইল। সাইফার বলল,

“কী চাই?”

নাহওয়ান একই চেহারার দুজন ব্যক্তিকে দেখে বিভ্রান্তিতে পড়ে গেল। বারবার চোখ ঘুরিয়ে দুজনকে দেখতে লাগল। সাইফারের ভিন্ন রূপ ও তাহমিদের পরনে সাদামাটা পোশাক দেখে অবুঝ মস্তিষ্ক তাকেই বাবা ভাবলো। তাহমিদের দিকে হাত উঁচিয়ে বলল,

“ওইত্তো বাবা।”

সাইফারের মুখে আঁধার নেমে এল। সে ছেলেকে কোল থেকে নামিয়ে দিতেই নাহওয়ান দৌঁড়ে তাহমিদের কাছে চলে এল। উপস্থিত সকলে বিস্মিত নেত্রে সেদিকে তাকিয়ে রইল। তাহমিদ নিজেও হতবাক বাচ্চাটার কান্ডে। তাহমিদের পা জড়িয়ে ‘বাবা বাবা’ করতে লাগল। ঘুমের আগে বাবাকে এই পোশাকে দেখেছিল দেখে বাচ্চাটার ধারণা আরও তীব্র হয়েছে এটাই তার বাবা। দূরে যে দাঁড়িয়ে আছে সে অন্য কেউ। যে বাবার রূপ ধারণ করেছে। নেওয়াজ রাগান্বিত গলায় বলল,

“মিস্টার তাহমিদ মুখোশটা খুলে ফেলুন। এখনো মুখোশ পড়ে থেকে কি লাভ?”

মুনতাজির এগিয়ে এসে মুখোশ খুলতে তাড়া দিতেই সাইফার বাধা দিল। বলল,

“থাকুক। নিজের সন্তান যদি বাবাকে চিনতে না পারে তবে সেটা মুখোশের নয় পিতৃত্বের দোষ। সন্তানের মনে এখনো সেই টান তৈরি করতে পারিনি এজন্য আজ আমার কোল থেকে নেমে ঐ নকল বাবার প্রতি টান দেখাচ্ছে।”

সাইফারের কথায় উপস্থিত সকলে পীড়া অনুভব করল। কথাটার ওজন অনেক। যে সন্তান বাবা বলতে অজ্ঞান সেই সন্তানের এমন মুখ ফিরিয়ে নেয়া মানা যায়না। অপরদিকে সাইফার এক দৃষ্টিতে ছেলের দিকে চেয়ে আছে। মানসপটে কোনো স্মৃতিরা হুটোপুটি খাচ্ছে কি?

জন্মের প্রথম প্রথম মারওয়ান ছেলেকে কোলে নিতো না। আর দশটা বাবার মতো সন্তান হওয়ার খুশিতে আবেগী, উচ্ছ্বাসিত কিছুই হয়নি। একদম নির্লিপ্ত। মাহাবুব আলম তো একদিন বলেই বসেন,

“কিরে নিজের ছেলেকে কোলে নিতে এত দ্বিধা কেন তোর? তোরই তো সন্তান একবার কোলে নে। বাপ হওয়ার অনুভূতি কেমন লাগে বুকে জড়িয়ে দেখ।”

মারওয়ান এড়িয়ে গেছে। ঐ মোমের মতো নাজুক মাংসল পিণ্ডটা ধরতে সাহস পায়নি সে। পাছে না আবার কোমল অস্থিসমূহ দলিত মথিত হয়ে যায়। দূর হতে কেবল ছোট্ট লালাভ দেহাবয়বটিকে স্থির চিত্তে পর্যবেক্ষণ করতো। মাঝে মধ্যে স্নিগ্ধ তুলোময় কায়াবিন্যাসটি দেখে বিস্মিত হতো। মনুষ্য প্রাণ এতো নাজুক হয়ে জন্মায়! কোলে নেয়ার সামান্যতম প্রয়াসও তার জন্মাতো না। অনুভূত হতো, নবজন্মের ঐ কোমল দেহলতাটিকে দেখেই অনন্তকাল পার হয়ে যাবে। কোলে নিয়ে ফায়দা কি?

নাহওয়ানের দুই মাস ছুঁই ছুঁই মুহূর্তে মারওয়ান একদিন রুমে গভীর নিদ্রায় মগ্ন ছিল। ঘুমে ছিল প্রায় অর্ধমৃত। নিশাত ঘুমন্ত নাহওয়ানকে তার পাশে শুইয়ে নামাজে গেছে। ঘুমের মধ্যে বেখেয়ালে মারওয়ানের হাত নাহওয়ানের পাশে পড়ে। বাচ্চাটার ঘুম ভেঙে যায়। সচরাচর দুধের শিশুরা ঘুম ভেঙে গেলে মাকে না পেলে চিল্লিয়ে কাঁদে। নাহওয়ানও ব্যতিক্রম নয়। মাকে না দেখে হাপুস নয়নে কেঁদে উঠলো। মারওয়ান ঘুম ঘুম চোখে পিটপিট করে সেদিকে চেয়ে হাত এগিয়ে দেয়। ঘুমে বেহুঁশ অবস্থায় তৎক্ষণাৎ তার করণীয় কি সেটাই বুঝে উঠতে পারেনি সে। বাচ্চাটা কান্নারত অবস্থায় ঐ দৃঢ় শক্ত হাতটিকে আঁকড়ে ভরসা পায়। হয়তবা বাবার স্পর্শ পেতে নাজুক শিশুটিও মরিয়া হয়ে ছিল। চোখ বুজে বলিষ্ঠ হাত আঁকড়ে আবারও ঘুমিয়ে যায়। নিশাত এসে পিতা, পুত্রের ঘুমন্ত এই সুন্দর মুহূর্তটিকে দেখে কতক্ষণ থম মেরে ছিল। হয়তবা নাহওয়ানকে কান্না বন্ধ করে ঘুমিয়ে যেতে দেখে বিস্মিত হয়েছিল। এইটুকু বয়সে এতো ভরসা! যে বাবা জন্মের পর একবার কোলেও তোলেনি সেই বাবাকে!

নিশাত ঐ মুহূর্তটা প্রায়ই বলতো তাকে। কোলে যে একেবারে তোলেনি তা নয়। মাহাবুব আলম নাহওয়ানের এক মাস বয়সে একবার জোর করে তুলে দিয়েছিলেন। ওই একবারই নিয়েছিল। নিজ থেকে একবারও কোলে নেয়নি সে। মাত্র দুই মাস বয়সে যে সন্তান এতটা ভরসার সহিত তার হাত ধরেছিল সেই সন্তান আজ নিজ থেকেই তার থেকে মুখ ফিরিয়ে অন্য একটা লোককে বাবা মনে করছে। তার কি হাহাকার লাগছে? কলিজা এফোড় ওফোড় হয়ে গেছে কি এক নিদারুণ যন্ত্রণায়? সে প্রতিক্রিয়াবিহীন কেবল শক্ত হয়ে দাঁড়িয়েই রইল।

তাহমিদ সাইফারকে স্তব্ধ হয়ে যেতে দেখে নাহওয়ানকে অতি যত্ন নিয়ে কোলে তুলেছে। সাইফারের যন্ত্রণাময় মুখটা দেখতে তার পৈচাশিক আনন্দ অনুভূত হচ্ছে। আহা সাইফারকে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কি যে ভালো লাগছে! ইশ ওর ছেলেকে দিয়ে ওকে কষ্টে পিষে ফেলা যাবে। ভাইপার হো হো করে হেঁসে বলল,

“আয় হায় একি দেখছি। ইতিহাসে এই প্রথম বোধহয় বাবাকে ছেড়ে সন্তান অন্য কাউকে বাবা বলে গ্রহণ করল। সাইফার আজ খেলায় জয় তোমার হলেও প্রকৃত হার কিন্তু তোমারই হয়েছে। বাবা হিসেবে আজ পরাজিত তুমি। আফসোস তোমার জন্য।”

তারপর আবারো উচ্চশব্দে হেঁসে উঠল। নেওয়াজ, মুনতাজির, মার্ভ জেন সকলে ক্ষিপ্ত চোখে তার দিকে চাইল। নাহওয়ান এত মানুষ দেখে ভীত সন্ত্রস্ত হলো। তাহমিদের গলা জড়িয়ে বলল,

“বাবা।”

তাহমিদ মধুর গলায় মোলায়েম স্বরে বলল,

“এইযে বাবা। কিছু খাবে?”

নাহওয়ান মাথা উঠিয়ে তার দিকে চাইল। কান চুলকে তাকে পর্যবেক্ষণ করছে। তারপর মোচড়ামুচড়ি করে কোল থেকে নামতে চাইল। তাহমিদ বলল,

“কী চাই আমাকে বলো? আমি এনে দিচ্ছি।”

নাহওয়ান তার কোল থেকে নামার জন্য ছটফট করছে। সে নামিয়ে দিল। নাহওয়ান দৌঁড়ে আবার সাইফারের সামনে এসে কতক্ষণ তাকিয়ে থেকে ডাকল,

“বাবা।”

সাইফার প্রত্যুত্তর করল না। কেবল চেয়েই রইল। নাহওয়ান আবারও ডাকল,

“বাবা।”

সাইফার অবচেতনে বলল,

“বল পান্ডা।”

নাহওয়ান ঘাড় নাড়িয়ে হাত তাক করে বলল,

“আমাল বাবা।”

সাইফারের হৃদয় নড়ে উঠল। হাঁটু ভেঙে নাহওয়ানের সামনে বসে বলল,

“আমার কবুতরের ছাও, পটলের বাচ্চা।”

নাহওয়ান ছলছল চোখে সাইফারের দিকে চেয়ে ফোঁপাতে লাগল। সাইফার সম্ভবত ছেলের চোখের ভাষা বুঝল। নিজের লম্বা কোটটা খুলে ইন করা শার্ট বের করল। নিজের অবিন্যস্ত কোকড়া চুলগুলো আরও এলোমেলো করে দিল। একটুর মধ্যে সেই চিরচেনা মারওয়ান আজাদ রূপে নাহওয়ানের সামনে ধরা দিল। নাহওয়ান আর এক মুহুর্ত না দাঁড়িয়ে বাবার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি তুলে ফেলল। মারওয়ান ছেলেকে জড়িয়ে রাখল। নাহওয়ান কেঁদে কেঁদে বলল,

“মাচ্চে, বিশি বিশি মাচ্চে।”

মারওয়ানের বুকটা আবারও হুহু করে উঠল। ছেলেকে বুক থেকে উঠিয়ে দেখল গালে থাপ্পড়ের চিহ্ন ফুটে উঠেছে। কতটা কষ্ট তার সন্তানকে ভোগ করতে হয়েছে এই পরিকল্পনার জন্য। সব দোষ তার। নিশাত ঠিকই বলে এই পেশায় থাকলে সে শুধু স্ত্রী, সন্তানের কষ্টই বাড়াবে কিন্তু এই পেশা ছাড়াও যে তার পক্ষে অসম্ভব। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নাহওয়ানের চোখের পানি মুছিয়ে দিল। হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে ক্ষিপ্ত ভঙ্গিতে তাহমিদের সামনে এসে মুখোশ টেনে হিঁচড়ে খুলে জোরসে ঘুষি বসিয়ে দিল। শক্ত হাতের কয়েকটা দাবাং চড় বসিয়ে দিল তাহমিদের গালে। ফুঁসে উঠে বলল,

“এইটুকু বাচ্চার গায়ে হাত ওঠাতে বুকে কাঁপন ধরল না? তাকিয়ে দেখ শেমরের বংশধর, থাপ্পর দিয়ে এইটুকু গাল কি করেছিস? পাষণ্ড জালিম কোথাকার।”

বলে আরও কয়েকটা ঠাটিয়ে চড় বসিয়ে দিল। তাহমিদ পাল্টা আঘাত করার আগেই সব ঘটে গেল। তার উপর মুখোশ টেনে খোলায় চামড়া কিছু জায়গায় ছিলে লাল হয়ে উঠেছে। ঠোঁট, মুখের অবস্থা বেহাল। মাইরের চোটে নেতিয়ে পড়েছে সে। ক্রোধের উত্তাপে মারওয়ানের মুঠোকৃত হাতের শিরাসমূহ দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। তাকে এতটা রেগে যেতে দেখে নেওয়াজ, জিনান এগিয়ে এসে ধরতে চাইল। মারওয়ান বলিষ্ঠ গলায় থামিয়ে দিল,

“ঐযে কোট খুলে রেখেছি। এখন আমি আজারাক সাইফার নই। শুধুই একজন বাবা। আমাকে থামাতে আসবেন না আর নাতো কোনো কথা আমি শুনব। নিজের সাথে অন্যায়ের জন্য একটা টু শব্দও আমি করিনি, করবও না। কিন্তু আমার সন্তান তার বাবাকে অভিযোগ জানিয়েছে সেই অভিযোগের শাস্তি তো অবশ্যই দিতে হবে। আমার ফাইয়াজকে কষ্ট দিলে এই পৃথিবীর কারো সঙ্গে কোনো আপোষ নয়, সামান্যতমও নয়।”

তারপর ভাইপারের দিকে চেয়ে কঠিন গলায় বলল,

“শুধুমাত্র ইহাবের মামা এবং বয়সে মুরুব্বি বলে আজকে বেঁচে গেলেন নয়তো আপনাকে এর চরম মূল্য দিতে হতো। তবে শাস্তি তো আপনি অবশ্যই পাবেন। কাঠগড়ায় দাঁড়াতে প্রস্তুত হন মিস্টার উমায়ের ভুঁইয়া।”

_

শয্যাশায়ী নিশাতের পাশে বাড়িওয়ালার স্ত্রী বসা।মারওয়ান নিশাতকে তার কাছেই রেখে গিয়েছে। সন্তানের চিন্তায় চিন্তায় অস্থির ও অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। গত কয়েকদিন দুশ্চিন্তা করে করে নির্ঘুম রাত কাটিয়ে একেবারে শরীর ভেঙে ফেলছে। তাই ঘুমের ওষুধ খাইয়ে দিয়েছেন তিনি। দরজা নকের আওয়াজে উঠে গেট খুলে দিলেন। মারওয়ানকে দেখতে পেতেই উচ্ছ্বাসিত গলায় বলল,

“এসেছ, তোমার বউকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছি। মাত্রাতিরিক্ত টেনশন করছিল। আলহামদুলিল্লাহ বাচ্চাটাকে পেলে তাহলে।”

মারওয়ান তাকে পাশ কাটিয়ে রুমে ঢুকল। ঢুকেই দেখল নির্ভার ভঙ্গিতে গভীর ঘুমে মগ্ন এক চিন্তিত ক্লান্ত মা। নাহওয়ান ঘুমন্ত মাকে দেখতে পেতেই কেঁদে উঠে হাত বাড়িয়ে ডাকল,

“মা মা।”

নিশাতের পক্ষ হতে কোনো জবাব এল না। সে কঠিন ঘুমে মগ্ন। যদি চেতনায় থাকতো এতদিন পর নিজের বুকের ধনকে দেখে বোধহয় পাগলই হয়ে যেতো। যার চিন্তায় অসুস্থ হয়ে বিচানাগামী তাকেই দেখতে পেল না হতভাগী মা। মারওয়ান নাহওয়ানকে বিছানায় নামিয়ে দিল। নাহওয়ান গুলুমুলু শরীরটা নিয়ে হামলে পড়ে মায়ের বুকের উপর শুয়ে পড়ল। কেঁদে কেঁদে ডাকল,

“মা চবাই মাচ্চে। ইনদি বেতা ডিচে, কুব বেতা।”

নিশাত ঘুমের ওষুধের প্রভাবে কোনমতে একটু চোখ খুলে ঘোরের মধ্যে প্রলাপ বকার মতো বলল,

“আমার আব্বা, আমার ছানা।”

নাহওয়ান মায়ের বুকে চুপটি করে লুকিয়ে বলল,

“টুমি কই চিলে? টোমাকে কুতাও পাই নাই।”

নিশাত ওষুধের প্রভাবে কিছুই বলতে পারল না। কিসব আবোল তাবোল বকে আবারো ঘুমে বিভোর হয়ে পড়ল। তবে যতই অবচেতনে থাকুক সন্তানের ঘ্রাণ ঠিকই পেয়েছে। তাই তো শক্ত করে বুকে জড়িয়ে রেখেছে। মা তো মাই। চেতনা হারিয়েও সন্তানকে আঁকড়ে ধরতে ভোলেনি। অবুঝ নাহওয়ান মায়ের বুকে কেঁদেই যাচ্ছে। চোখের অশ্রুতে ভিজিয়ে ফেলেছে মায়ের গ্রীবা, ললাট ও কপোল। কতদিন পর মাকে পেয়েছে, মায়ের ঘ্রাণ পাচ্ছে। নিশাতের জামা শক্ত করে নিজের ছোট্ট মুঠোতে চেপে ধরে আছে। অবুঝ হলেও এই তিনদিনে বুঝে গেছে দুনিয়াটা মাকে ছাড়া বড্ড কষ্টের। আগলে রাখার মানুষটা যে ছিল না। তাই তো কত অনাদর, অবহেলা। মায়ের বুকে এক স্বর্গীয় শান্তি! এতদিন এই শান্তিটা কোথাও পায়নি সে। আরামে ফোঁপাতে ফোঁপাতে বাচ্চাটা সেথায় একভাবে পড়ে রইল। বাড়িওয়ালা মহিলাটি নাহওয়ানকে সরাতে চাইলে মারওয়ান বাধা দিল,

“থাকতে দিন। আজ সন্তানের ভারে সে কষ্ট পাচ্ছে না বরং চেহারায়, মনে এই ভার পরিতৃপ্তির হয়ে ধরা দিয়েছে। দেখছেন না অবচেতনেও কিভাবে বুকের মধ্যে আঁকড়ে ধরেছে সন্তানকে।”

বাড়িওয়ালা মহিলাটি হাত গুটিয়ে নিলেন। তারপর মুচকি হেসে তাদেরকে একান্তে থাকতে দিয়ে চলে গেলেন। রাতে ভাত, তরকারি দিয়ে যাবেন বলে জানিয়ে গেলেন। মারওয়ানের সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। সে তো একদৃষ্টিতে মাতা, পুত্রের আলিঙ্গন দেখতে মত্ত। সে খুশি নাকি বেজার কিছুই তার চেহারায় ফুটে উঠল না। সেখানে কেবল অপার নীরবতা।
নিঃসন্দেহে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মুহূর্ত মা, সন্তানের এই বাহুবন্ধন। তবে দৃশ্যটি যদি এমন হয় কাঠখোট্টা পিতা দূর হতে মাতা, পুত্রের এই সুন্দর মুহূর্তটি দর্শন করছে সেটিও কি কোনো অংশে কম বিশেষ?

চলবে….

(আসসালামু আলাইকুম।)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply