Golpo romantic golpo ভবঘুরে সমরাঙ্গন

ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৫৯ (৫৯.১+৫৯.২+৫৯.৩)


ভবঘুরে_সমরাঙ্গন

পর্ব_৫৯.১ (রহস্য উন্মোচন -১)

তাজরীন ফাতিহা

উমায়ের ভুঁইয়া, এজেন্ট তাহমিদ চুপচাপ বসে আছে। আশপাশের গার্ডসরাও অস্ত্র নামিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। এজেন্ট তাহমিদের দুই হাতে ব্যান্ডেজ করা। রক্তে ব্যান্ডেজ ভিজে একাকার। সেদিকে তার বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই। তার চোখে একধরনের ক্রোধ ফুটে আছে। আজারাক সাইফার, জিনান আদহাম, নেওয়াজ শাবীর, মুনতাজির জায়েদ সকলেই তাদের সামনে উপবিষ্ট। রুবানা আজমেরী একটু দূরেই নাহওয়ানকে কোলে নিয়ে দাঁড়ানো। বাচ্চাটা কাঁদছিল দেখে সে কান্না থামাতে কোলে নিয়ে হেঁটেছে কিছুক্ষণ। নাহওয়ান তার ঘাড়ে মাথা ফেলে হেঁচকি তুলে ফোঁপাচ্ছে।

আজারাক সাইফার একটু ধাতস্থ হয়ে গম্ভীর কণ্ঠে শুধালো,

“এবার বলুন মিস্টার ব্ল্যাক ভাইপার আপনার মূলত আমাকে নিয়ে সমস্যা কি? এত এত লোক ভাড়া করে আমাকে ধ্বংস করার উন্মাদনায় কেন নেমেছেন? আমার সাথে আপনার শত্রুতা কি নিয়ে? যতদূর জানি আমি আপনার কোনো ক্ষতি করেছি বলে তো মনে পড়ে না।”

সাইফারের ছোঁড়া প্রশ্নে পুরো হলরুম নিস্তব্ধতায় ছেয়ে গেল। পিনপতন নীরবতা পুরো রুমে। সকলের দৃষ্টি উমায়ের ভুঁইয়া ওরফে ব্ল্যাক ভাইপারের দিকে স্থির। তার মুখে কোনো শব্দ নেই। মাথা নিচু করে চুপচাপ বসা। মুনতাজির কঠোর গলায় বলল,

“চুপ করে আছ কেন? কেন সাইফারের প্রতি আমাকে উস্কেছিলে? তার সাথে আমার দুরত্ব কেন চাইতে? কেন ফাটল ধরিয়েছিলে আমাদের দুজনের মাঝে? তোমার সমস্যা কি তাকে নিয়ে? বলো জবাব দাও। আনসার মি ড্যাম ইট!”

নেওয়াজ এগিয়ে এসে মুনতাজিরকে সামলালো।

“শান্ত হোন মিস্টার মুনতাজির।”

রাগে মুনতাজিরের শরীর থরথর করে কাঁপছে। সাইফার আগের ন্যায় শক্ত মুখে চেয়ে। মুনতাজির কাঁপতে কাঁপতে চেয়ারে বসে বলল,

“শান্ত হতে বলেছেন? আমার উপর সেই দিনগুলোতে কি কি গেছে উপর আল্লাহ আর আমি ছাড়া কেউ জানে না। বন্ধুত্বের বিচ্ছেদ কতটা যন্ত্রণাদায়ক সেটা কাউকে বোঝানো যায়না। প্রেম-ভালোবাসার বিচ্ছেদে মানুষ কষ্ট পায়, প্রেমের সমাধি বানায়, উপন্যাস-কাব্য রচনা করে কিন্তু বন্ধুত্বের বিচ্ছেদে কে কি করে? আমি কতরাত কেঁদে কেঁদে বালিশ ভিজিয়েছি আল্লাহ আর আমি জানি। সাইফার যখন আমার প্রতি মুখ ফিরিয়ে নিল, আমি ওকে ভুল বুঝে দূরে সরে গেলাম হেন মুহূর্ত নেই তাকে মনে করিনি। দিশেহারা হয়ে পড়েছিলাম। সে ছাড়া আমার আশপাশটা ধূ ধূ মরুভূমি যেন! তার ভিন্ন রূপ দেখে সবচেয়ে হতবাক আমিই হয়েছিলাম। যাকে চোখ বুজে বিশ্বাস করতাম, যে বন্ধুর জন্য কলিজা কেটে দিতেও দ্বিধাবোধ করতাম না সেই বন্ধুর সাথে গাদ্দারী, দেশদ্রোহী রূপ, বিচ্ছেদ কতটা যন্ত্রণার কাউকে যদি বোঝাতে পারতাম! দেহ থেকে চামড়া তুলে ফেলার সমতুল্য। ওই লোকটার জন্য কত দহন যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে দুজনকে যেতে হয়েছে কেউ জানে? নাটক মানে কি সবকিছুই নাটক ছিল? বরং সবাইকে যা দেখানো হয়েছে এর থেকেও ভয়াবহতা ছিল সম্পর্কে।

একটু নিঃশ্বাস নিয়ে,

“কতদিন হয় হাব ডাকেনা। এখনো সম্পর্ক ঠিক হয়ে যাওয়ার পরেও সেই মন কেমন করা সম্বোধনে আমাকে আর ডাকেনি। হয়তবা বিশ্বাসের পারদ নড়বড়ে হয়ে গিয়েছে। হওয়াটাই স্বাভাবিক। আগের ন্যায় বিশ্বাস করাটাই বরং অস্বাভাবিক। ওই লোককে বলুন সেই বন্ধুত্বপূর্ণ ভালোবাসার ডাক আর বিশ্বস্ততা ফিরিয়ে দিতে। পারবে?

উপস্থিত সকলের চেহারায় বিমর্ষতা ফুটে উঠল। সাইফার গাম্ভীর্য দৃষ্টিতে ব্ল্যাক ভাইপারের দিকে চেয়ে। মুনতাজিরের কথা শুনেও তার চেহারার কোনো পরিবর্তন হয়নি। গাল ও কপালে ডান হাতের দুই আঙ্গুল ঠেকিয়ে সামনাসামনি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিবদ্ধ করে রেখেছে। নেওয়াজ ব্ল্যাক ভাইপারকে নিশ্চুপ থাকতে দেখে বলল,

“কিছু বলছন না কেন? পারবেন?”

আজারাক সাইফার কোট থেকে সিগারেট বের করে লাইটার জ্বালিয়ে আগুন ধরিয়ে ঊর্ধ্বমুখী ধোঁয়া ছাড়ল। ধূম্র গুলো ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে গেল। সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে নাক, মুখ থেকে ধোঁয়া ছাড়িয়ে দুই হাঁটুর উপর কনুইয়ের ভর দিয়ে খানিক সামনে এগিয়ে এসে বলল,

“একটা গল্প বলি। কারো কোনো অবজেকশন থাকলে বলতে পারবেন। নো টেনশন..”

শেষের কথাটা ব্ল্যাক ভাইপারের দিকে চেয়ে টেনে টেনে বলল সাইফার। সিগারেট দুই ওষ্ঠে চেপে ধোঁয়া ছাড়িয়ে বলতে লাগল,

“একজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ীর দুই পুত্র সন্তান ছিল। বড় পুত্র সন্তান যখন নয় এবং ছোট পুত্র যখন চার বৎসরে পদার্পণ করল সেই মুহূর্তে তাদের মা দুনিয়া থেকে বিদায় নিলেন। তাদের পিতা ছিলেন ব্যবসায়ী মানুষ। বাচ্ছাদুটোকে লালন পালন করা তার কাছে ভীষণ কষ্টসাধ্য ছিল। অনেকের পরামর্শে দ্বিতীয় বিয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে সন্তানদ্বয়কে মাতৃ ছায়া দিতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞবদ্ধ হলেন। নিজের হিমশিম খাওয়া অবস্থায় বিয়ে করে অবুঝ সন্তানকে মা এনে দিলেন। সেই মা তাদেরকে আগলে বড় করতে লাগলেন। বড় পুত্র মহাশয় দ্বিতীয় মায়ের আগমনে নারাজ ছিল। কোনোভাবেই সহ্য করতে পারত না তাই সর্বদাই সৎ মা থেকে দুরত্ব বজায় রেখে চলত। সৎ মায়ের প্রতি এতটাই বিদ্বেষ পোষণ করত যে মাত্র দশ বছর বয়সেই হোস্টেল লাইফে থেতু হলো। সেখানে থেকে পড়াশোনায় মনোনিবেশ করতে লাগল। ছোট পুত্র সৎ মায়ের ছত্রছায়ায় লালিত পালিত হতে লাগল। এভাবেই দিন যাচ্ছিল। হঠাৎ একদিন বড় পুত্রের কাছে খবর পৌঁছুলো তার বোন নাকি পৃথিবীতে আগমন করেছে। নিজের সমস্ত রাগ, জেদ সব গিয়ে পড়ল ওই কন্যা শিশুটির উপরে।

এটুকু বলে একটু থেমে ব্ল্যাক ভাইপারের দিকে চাইল। সকলের উৎসুক দৃষ্টি সাইফারের দিকে নিবদ্ধ। সাইফার আবারও বলতে শুরু করল,

“বড় পুত্র মহাশয় হন্তদন্ত হয়ে বাড়িতে এসে হুলস্থূল ঘটিয়ে ফেলল। সৎ মা, বাবা সকলেই ভীত হয়ে পড়ল মাত্র এগারো বছর বয়সী বড় পুত্রের এই বিধ্বংসী রূপ দেখে। বাবা কিছুতেই পুত্রের ক্রোধকে দমাতে পারছিলেন না। নিজের সেই ক্রোধ এক মাস বয়সী দুধের শিশুটিকে দেখাতে গিয়েই চরম ফাঁসা ফাঁসল বড় পুত্র। দোলনায় দুলতে থাকা লাল টুকটুকে হাত পা ছড়িয়ে তার দিকে ফিচফিচ করে হাসতে থাকা পুতুলটিকে দেখে নিজের সমস্ত ক্রোধ নিমেষের মধ্যে কোথায় যেন গায়েব হয়ে গেল। সে একদৃষ্টিতে শিশুটির দিকে চেয়েই রইল। এরপর থেকে শিশুটি অস্ফুট আওয়াজ করলেও সবার আগে উপস্থিত থাকত তার বড় ভাই। এভাবেই বড্ড আদর, সোহাগে বড় ভাইয়ের একমাত্র দুলালী বোন বড় হতে লাগল। সৎ মায়ের প্রতি অসন্তুষ্টি, অনিচ্ছা থাকলেও সেটা কখনো আর প্রকাশ করেনি। বোনের সমস্ত চাহিদা, খুশি তার কাছে ফার্স্ট প্রায়োরিটি ছিল। বোন মুখ ফুটে কিছু চাওয়ার আগেই সবকিছু হাজির করে ফেলত। হোস্টেল লাইফ ছেড়ে পুরোদমে বাড়িমুখী হলো সে। এভাবেই বড় হতে লাগল ভাইয়ের আদরের দুলালী ছোট্ট পুতুলটি।

উপস্থিত সকলে আগ্রহী শ্রোতার মতো শ্রবণ করছে। সাইফার গাম্ভীর্য বজায় রেখে বলল,

“বোনটিও ভাই বলতে অজ্ঞান। আস্তে ধীরে ভাইয়ের আদুরী বড় হতে লাগল। যখন যুবতী বয়সে পদার্পণ করে ঠিক তখন সবার অগচরে নিজের প্রেমিককে বিয়ে করায় বড় ভাই আবারও ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে পড়ে। বোনের হাসিমুখ দেখে নিজেকে দমালেও যখন পিতা সেই কন্যাকে অর্ধেক সম্পত্তির মালিকাধীন করে যান তখনই ঘটে মহাঅঘটন।”

জিনান আগ্রহী গলায় শুধালো,

“তারপর?”

সকলেই উন্মুখ হয়ে আছে পরবর্তী কাহিনী শোনার জন্য। সাইফার হাই তুলে বলল,

“তারপর আর কি? টিপিক্যাল বাঙালিদের মতো সম্পত্তির জন্য সম্পর্কের দাফন। বড় পুত্র ছোটবেলা থেকে নিজের না পাওয়ার খাতা খুলে অতীতের সকল ক্রোধ আবারও পুঞ্জীভূত করে বোনের স্বামী, সন্তানের প্রতি বিক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। সকল কুমন্ত্রণা কাজে লাগিয়ে সে হয়ে উঠল কালো জগতের অধিপতি। বোনের সংসারে ফাটল ধরাতে, তার সন্তানদের ক্ষতি করতে তিনি ছিলেন সর্বদা সচেষ্ট। এক প্রতিশোধের খেলায় মেতে উঠেছিল সে।”

ব্ল্যাক ভাইপার চাপড় মেরে ক্রোধান্বিত গলায় বলল,

“মিথ্যে মিথ্যে মিথ্যে। সবকিছু মিথ্যে।”

প্রত্যেকে ভ্রু কুঁচকে তার পানে চাইল। সাইফার ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলল,

“ওহ আচ্ছা। তাহলে সত্যটা আপনিই বলুন।”

উমায়ের ভুঁইয়া ওরফে ব্ল্যাক ভাইপার শান্ত হয়ে বসে বলল,

“মায়ের মৃত্যুর পরে বাবার পাশে কোনো দ্বিতীয় নারীকে আমি সহ্য করতে পারিনি। সেজন্য ওই মহিলাকে আমি এভয়েড করতে হোস্টেল লাইফ বেছে নিয়েছিলাম। নিজের মতো থাকতে পছন্দ করতাম। উর্মি যখন হয় তখন আমি খুশি ছিলাম না। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় ও আমার সবচেয়ে আদরের হয়ে ওঠে। ওকে আমি প্রথম প্রথম পছন্দ না করলেও পরবর্তীতে ওই আমার প্রাণ ভোমরায় রূপ নেয়। আমার কলিজার একটা টুকরা ছিল উর্মি। ভাইজান বলে যখন ডাক দিত আমার পরাণটা জুড়িয়ে যেত। এই দুহাতে আমি পুতুলটাকে মানুষ করেছি। একটা নরম তুলা ছিল ও। ভাইজান ভাইজান বলে যখন আবদার করত কোনোদিন ওর আবদার ফিরিয়ে দেয়ার দুঃসাধ্য কিংবা দুঃসাহস আমার কিংবা উজান কারোরই ছিল না। ওর আবদারের ভান্ডার ছিলাম আমি। কেউ কোনো কিছু না দিলে আমাকে এসে নালিশ জানাতো। আমি শত ব্যস্ততার মাঝেও আমার পুতুলটার সব নালিশ মনোযোগ দিয়ে শুনে সবাইকে শাস্তি দিতাম। মোটকথা ও আমার পাথুরে হৃদয়ে মরুর ফুল হয়ে ফুটেছিল। একদিন..”

এই পর্যন্ত বলে ব্ল্যাক ভাইপারের কণ্ঠরোধ হয়ে এল। একটু পানি খেয়ে ধাতস্থ হয়ে বলল,

“একদিন কলেজ শেষ করে আমার কাছে ছুটতে ছুটতে এল। তখন আমি জরুরি বৈঠকে ছিলাম। কিন্তু উর্মির কাছে সবকিছু তুচ্ছ ছিল। উর্মি উচ্ছ্বাসিত গলায় তার স্বপ্নের পুরুষটির কথা বলল। আমার কাছে তাকে চাইল। আমি ভেবেছিলাম স্রেফ বয়ঃসন্ধিকালের পাগলামি। তাই গুরুত্ব দেইনি তেমন। কিন্তু পরবর্তীতে ওর পাগলামি দেখে আমি খোঁজ লাগাই সেই পুরুষের। বয়স আমার মতোই। নেতা গোছের ছেলে। সুদর্শন, বলিষ্ঠ পুরুষ। এক দেখাতেই বুঝে গিয়েছিলাম উর্মির ঘুম উড়াল দেয়ার রহস্য। সারাদিন সেই স্বপ্নপুরুষের নাম জপার কারণই বা কি সেটাও বুঝলাম। সেদিন উর্মিকে যেয়ে বলেছিলাম, পছন্দ হয়েছে কিন্তু বয়সটা বেশি। বেচারি কেঁদেকুটে একেবারে সমুদ্র বানিয়ে ফেলেছিল। পরে কতকিছু করে কান্না থামিয়েছি। বলেছিলাম কলেজ শেষ হলেই বিয়ে করিয়ে দেব। আমার পুতুলটা সেদিন কত যে খুশি হয়েছিল!”

ব্ল্যাক ভাইপারের ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা। মুনতাজির, রুবানা উভয়ের ঠোঁটের কোণেও মুচকি হাসি লেগে আছে। মায়ের গল্প শুনলে প্রত্যেক সন্তানই খুশি হয় বোধহয়। স্মৃতিচারণ করতে করতে হঠাৎই মুখের হাসি অস্তমিত হয়ে গেল ব্ল্যাক ভাইপারের। শক্ত মুখে বলতে লাগল,

“আমার পুতুলের সুখ বেশিদিন স্থায়ী ছিল না। একদিন কাঁদতে কাঁদতে অস্থির হয়ে আমার গলা জড়িয়ে বলল, তার স্বপ্নপুরুষ নাকি তাকে চায়না। ভালবাসে না। ওই স্বপ্নপুরুষকে ছাড়া সে বাঁচবে না এমন নানা কথা। আমি কিছুতেই বোনের কান্না সহ্য করতে পারছিলাম না। পাগলের মতো করছিল ও। আমি তার স্বপ্নপুরুষকে এনে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিলাম। বোনকে কাউন্সেলিং করিয়ে মোটামুটি সারিয়ে তুললাম। তারপর একটু সুস্থ অনুভব করায় হাসিমুখে কলেজে গেল। তবে সেই হাসিমুখ আমি চিরদিনের মতো হারিয়ে ফেলব তা বুঝতে পারিনি। দুপুর নাগাদ একটা কল আসে আমার ফোনে। উর্মি নাকি হাসপাতালে গুরুতর অবস্থায় ভর্তি। আমি হন্তদন্ত হয়ে ছুটলাম পুতুলটার কাছে। হাসপাতালে পৌঁছেই দেখি তার স্বপ্নপুরুষ দেয়ালে হেলান দিয়ে রক্তে ভেজা জামাকাপড়ে দাঁড়িয়ে। আমি বারবার হোঁচট খাচ্ছিলাম। উর্মি উর্মি বলতে বলতে এগিয়ে আসতেই ওই ছেলেটা এগিয়ে আসল। ওর চোখে পানি ছিল। মনে করেছিলাম আমার পুতুলের জন্য বোধহয় কাঁদছিল। পরে অবশ্য বুঝেছিলাম কেন, কার জন্যে ছিল সেই পানি। আমি কোনো কথা না বলে কাউন্টারে উর্মির কেবিন নম্বর জিজ্ঞেস সেদিকে ছুটলাম।”

একটা দম নিয়ে বলল,

“উর্মির কেবিনের সামনে আসতেই দেখতে পেলাম আমার পুতুলটা কিভাবে শুয়ে আছে। হাত-পায়ে ক্যানোলা, মুখে ভেন্টিলেটর সংযোগ দেয়া রক্তাক্ত ছোট্ট পুতুলটাকে। যে একদমই চুপচাপ হয়ে শুয়ে আছে। কোনো নড়চড় নেই। হার্ট মনিটরে বিপ বিপ শব্দে রেখা ওঠানমা করছে। আমি একদম ভেঙে পড়ছিলাম কাচের দরজা দিয়ে ওর এই অবস্থা দেখে। আমার কলিজার এহেন দশায় আমি পাগল হয়ে গিয়েছিলাম যেন। হৃদযন্ত্রটা বেসামালভাবে তড়পাচ্ছিল আমার পুতুলটার কাছে যাওয়ার জন্য। পুরো দুইদিন আইসিইউতে ভর্তি থাকার পরে ডাক্তার খবর জানালো রোগীর জ্ঞান ফিরেছে হালকা। অবস্থা গুরুতর আমার সঙ্গে কথা বলতে চায়। আমি তো দুইদিন এক পাও নড়িনি আইসিউ রুমের সামনে থেকে। যদি কোনো আপডেট পাই সেই আশায় চাতক পাখির ন্যায় অপেক্ষারত ছিলাম। দুদিনের মাথায় আপডেট ঠিকই এসেছিল তবে…”

এটুকু বলে একটা বড় নিঃশ্বাস ফেলে বুক চেপে ধরলো ব্ল্যাক ভাইপার। সকলের উৎসুক চাহনি তার দিকে স্থির। ব্ল্যাক ভাইপার আবার বলতে শুরু করল,

“কেবিনে ঢুকে আমি মৃত্যুর ঘ্রাণ পাচ্ছিলাম কেবল। ঔষধ ও বিভিন্ন রাসায়নিক বস্তুর গন্ধ মিলেমিশে এক অদ্ভুত ঘ্রাণ নাসাগহ্বরে বারি খাচ্ছিল শুধু। কেমন গা ছমছম করছিল আমার। সেই ছোট্ট লাল লাল দেখতে উর্মির কথা মনে পড়ছিল বারবার। এগিয়ে যেতেই পুতুলটা আমার দিকে খুব কষ্টে হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। আমি তার পাশে বসতেই ভেন্টিলেটর খুলে খুব ধীরে ইশারা করল কান এগিয়ে দিতে। আমি দুরুদুরু বুকে কান এগিয়ে দিতেই ধীরে ধীরে ভাঙা গলায় উর্মি আমাকে বলছিল,

ভাইজান আমার স্বপ্নপুরুষের স্বপ্নের মানুষ আছে। আমি সেই সৌভাগ্যবতী নারীটিকে বাঁচিয়েছি, জানো? ভীষণ মিষ্টি দেখতে। কি সুন্দর চেহারা! একদম পুতুলের মতোন। উনি তার রক্তাক্ত দেহটা নিয়ে কেমন ছটফটাচ্ছিল। আমি যে তার স্বপ্নের নারীকে বাঁচাতে গিয়ে আহত হয়েছি সে খেয়ালও করেনি। আপুটা আমার চেয়ে বয়সে বড়। কেউ নেই তার। আমাকে অনেক স্নেহ করতেন তিনি। মানসিকভাবে কিছুটা অস্থিতিশীল। আমাদের কলেজ ক্যাম্পেইনের সময় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কয়েকজন আপু এসেছিল বলেছিলাম না? সেই সময় এই আপুটাও ছিল। আমাকে অনেক হেল্প করেছিল। প্রথম বর্ষে পড়ে। খুবই ভালো মানুষ। এই ঢাকা শহরে পরিচিত কেউ নেই, এতিম। তুমি জানলে অবাক হবে, আপুটার নাম ঊর্মিলা। উনি বোধহয় উর্মি মালা ডাকে। রক্তাক্ত দেহটা নিয়ে বারবার উর্মি মালা উর্মি মালা করছিল। আমার প্রাণটা জুড়িয়ে যাচ্ছিল। আমাকে তো কোনদিন ডাকবে না অন্তত আমার নাম নিয়ে ওই আপুকে ডেকেছে এই সই। আহ উর্মি মালা, কি মধুর সেই ডাক!”

ব্যাস এইটুকু বলে চিরনিদ্রায় শায়িত হয়ে গেল আমার ছোট্ট লাল লাল পুতুলটা। আমাকে নিঃস্ব করে দিয়ে চিরদিনের জন্য চলে গেল। আমাকে কেউ আর ভাইজান ভাইজান বলে সেদিনের পর ডাকেনি। আবদারের ঝুলি নিয়ে দৌঁড়ে আসেনি। পুরো বাড়ি মাতিয়ে রাখার জন্য সেই উর্মি আর কোনোদিন আসেনি। ওর মৃত্যু আমি কিছুতেই মানতে পারছিলাম না। পাথরের মতো শক্ত হয়ে লাশটা বুকে জড়িয়ে কেবল ফ্যালফ্যাল করে মূর্তির মতো বসে ছিলাম। যেন আমার সমস্ত ক্রোধের সমাধি গড়া পুতুলটাকে কেউ ভেঙে টুকরো টুকরো করে ফেলেছিল। ওর মৃত্যুর পরে বহুদিন ঘর থেকে বের হয়নি। খালি কানে ভাইজান ভাইজান ডাকটা প্রতিধ্বনি হতো। মস্তিষ্কের বিভ্রান্তি ঘটেছিল। বারবার মনে হতো আমার পুতুলটা এই বুঝি এসে ডাকল ভাইজান।”

এইটুকু বলে ব্ল্যাক ভাইপার ‘আমার ছোট্ট পুতুল’ বলে ঢুকরে কেঁদে উঠলেন। মুনতাজির, রুবানা উভয়ই স্তব্ধ, বাকরুদ্ধ। এতবড় শক তারা জীবনেও খায়নি। এসব কি শুনছে তারা! সকলে ব্ল্যাক ভাইপারকে সময় দিল। প্রত্যেকেরই খারাপ লাগছে সেই উর্মি ভুঁইয়ার বিয়োগে। ব্ল্যাক ভাইপার বেশ কিছুক্ষণ পর ভাঙা গলায় বলল,

“উর্মি মারা যাওয়ার পরে ওর কলেজে গিয়েছিলাম ওর সেই স্বপ্নপুরুষের খোঁজ নিতে। পুতুলের কলেজের সামনেই আস্তানা ছিল তার। নেতাগিরি করত, চরম দাপট নিয়ে চলত। তারপর ঊর্মিলার খোঁজ নিলাম। দুজনের উপরে নজরদারি করতে লাগলাম। জানতে পারলাম ঊর্মিলা নামের মেয়েটি উর্মির সেই স্বপ্নপুরুষটিকে পছন্দ করেনা। সেই ছেলের একপাক্ষিক ভালোবাসা হলো ঊর্মিলা মেয়েটি। দুজনকে একসাথে দেখলেই উর্মির রক্তাক্ত দেহটা চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠত। ক্রোধে শরীর ফেটে পড়ত। ক্রোধ কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারতাম না। পারব কিভাবে ছোট থেকে ক্রোধ নিয়ন্ত্রনের মানুষটাই তো ছিল আমার উর্মি। সেই তাকেই তো এদের জন্য চিরদিনের মতো হারিয়ে ফেলেছি।

ঊর্মিলাকে আমার পুতুল বাসের ধাক্কা থেকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেকে বিসর্জন দিয়েছে। সেও আহত হয়েছিল। আর আমার জন্য প্লাস পয়েন্ট ছিল ও ছিল ডিমেনশিয়ার রোগী। এছাড়াও ওর মেডিকেল হিস্ট্রিও তেমন ভালো ছিল না। সেই সুযোগটাই আমি নিয়েছিলাম। ওর সামনে আপন ভাই সেজে উপস্থিত হয়েছিলাম। ঊর্মিলা বিশ্বাস করতে চায়নি। প্রায় তিনমাস বহু কসরৎ করে ওকে বিশ্বাস করিয়েছিলাম আমিই ওর ভাই উমায়ের ভুঁইয়া। ওর নাম ঊর্মিলা নয় উর্মি ভুঁইয়া। ব্যাস একজন ডিমেনশিয়ার রোগীকে কব্জা করে প্রতিটি ধাপে ধাপে এগোতে লাগলাম। আমার বুকে প্রতিশোধের আগুন দাউদাউ করে জ্বলছিল। ততদিনে জেনে গিয়েছিলাম উর্মির সেই স্বপ্নপুরুষ আর আমাদের পদবী একই; ভুঁইয়া। আর সে জানত ঊর্মিলার ভাই আমি। কারণ হাসপাতালে উর্মি বলতে বলতে যখন ছুটে আসছিলাম তখন ভেবে নিয়েছিল তার ঊর্মিলাকে দেখতে পাগলের মতো ছুটে গিয়েছিলাম সেখানে। এটাও ছিল আমার জন্য বড় প্লাস পয়েন্ট।”

চলবে…..

(আসসালামু আলাইকুম।)

ভবঘুরে_সমরাঙ্গন

পর্ব_৫৯.২

তাজরীন ফাতিহা

অতীত শুনে উমায়ের ভুঁইয়ার বোনের জন্য সকলেই বিমর্ষিত হলো। এদিকে মুনতাজির, রুবানা উভয়ই বজ্রাঘাতের মতো সবকিছু শ্রবণ করছে। ছোট থেকে যা জেনে, মেনে বড় হয়েছে আচমকা সেটা মিথ্যা শুনলে যে কেউ তব্দা খাবে। মুনতাজির বহু কষ্টে বলল,

“এজন্যই আমার মায়ের প্রতি, আমার প্রতি এবং আমাদের পরিবারের প্রতি আপনার এত রাগ?”

ব্ল্যাক ভাইপার লাল চোখ দুটো মুনতাজিরের দিকে স্থির হলো। হয়তবা ছোট থেকে ভাগ্নের মুখে তুমি ডাক শুনে অভ্যস্ত হঠাৎ করে আপনি ডাকায় বিভ্রান্ত হলেন। একটু ধাতস্থ হয়ে বললেন,

“ঊর্মিলা থাকত ঢাকার ওর এক দূরসম্পর্কের আত্মীয়ের বাড়িতে। ওর কেমন খালা হয় যেন। অত খেয়াল রাখিনি। সেসময় মেয়েরা অত পড়তে পারত না। মেয়েদের উচ্চশিক্ষা গ্রহণে নানা প্রতিকূলতা, বাধার সম্মুখীন হতে হতো। সেসময় কঠোর ধর্মীয় অনুশাসন ছিল। হাতে গোনা কয়েকজন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ত। ঊর্মিলা তার মধ্যে একজন। বহু কসরৎ করেই অতটুকু যেতে পেরেছিল। ভীষণ মেধাবী মেয়ে। বাংলায় স্নাতক করছিল। খোঁজ খবর নিয়ে একদিন চলে গেলাম সেখানে। দেখলাম কোমরে ওড়না পেঁচিয়ে পুরো ঘর পরিষ্কার, বাসন কোসন মাজা থেকে শুরু করে রান্নাবান্না সবই ওকে দিয়ে করানো হচ্ছে। এতিম ছিল তো তাই কোনো রকম দয়া পরবশ হয়ে থাকতে দিয়েছে এই বেশি। তাই পয়সা উসুল হিসেবে গাধার খাটুনি খাটিয়ে নিত তারা। কেন যেন চোখের সামনে আমার পুতুলটা ভেসে উঠেছিল সেদিন। একদিন যেয়ে বললাম আমি ওর ভাই। ওনারা কিংবা উর্মি কেউই বিশ্বাস করতে চাইছিল না বহু বুঝিয়ে সুজিয়ে ওকে নিয়ে আসলাম আমার বাড়িতে।

বাবা গত হয়েছিলেন বহু আগে। সৎ মা মেয়ের শোকে পাগলের মতো জীবন যাপন করছিল। সেসময় উর্মিকে নিয়ে বাড়িতে ওঠায় আমাকে বাঁধা দেয়ার কেউ ছিল না। আত্মীয় স্বজনরা আপত্তি ওঠালেও আমি কাউকেই পাত্তা দেইনি। ভালো ভালো খাবার, জামাকাপড়, একটা সুন্দর জীবন সবই ওকে দিয়েছিলাম আমি। তবে ভেতরে ভেতরে ওর প্রতি চাপা রাগ কিংবা বিদ্বেষ ঠিকই বিদ্যমান ছিল। কিন্তু আস্তে আস্তে আমি এই উর্মির প্রতিও দুর্বল হয়ে পড়লাম। ওর ভাইজান ডাকের মধ্যে আমার পুতুলকে খুঁজে পেলাম। মেয়েটা প্রথম প্রথম আমার সাথে কমফোর্ট ফিল করত না। নিজেকে গুটিয়ে রাখত। মন ভোলা ছিল অনেক। অনেককে দেখলেও পরবর্তীতে চিনতে অসুবিধা হতো। ওর চিকিৎসা করালাম। আস্তে আস্তে সুস্থ হতে লাগল। আমি ততদিনে ঊর্মিলার মধ্যে উর্মিকে পুরোপুরি খুঁজে পেয়েছি। ঊর্মিলাকে একদমই চোখের আড়াল করতাম না। বেশ ভয় কাজ করত ওকেও আমার পুতুলের মতো হারিয়ে ফেলব না তো?

ইমতিয়াজ উর্মির পিছনে পাগলের মতো ঘুরছিল। ওকে কোনোভাবেই সহ্য করতে পারতাম না। মনে হতো ও আবার আমার উর্মিকে নিয়ে যাবে। কিছুতেই আমি সেটা হতে দেব না। উর্মিকে কারো সঙ্গে মিশতে বারণ করতাম বিশেষ করে ইমতিয়াজের থেকে কয়েশো হাত দুরত্ব বজায় রাখতে বলতাম। উর্মি এসে আমাকে জানাতো ইমতিয়াজ ওকে যেখানে সেখানে ডিস্টার্ব করে। তাই নিজের দলবল নিয়ে ওর ভার্সিটিতে যেয়ে ওকে শাসিয়ে আসি। ইমতিয়াজ আর আমি সমবয়সী হওয়াতে ওর পড়াশোনার পাঠ চুকেছিল বহু আগেই। শুধু এখানে সেখানে রাজনৈতিক নেতা হয়ে দাপট নিয়ে চলত। শাসানোর পর ইমতিয়াজ আমাকে থ্রেট দিয়ে এক মাসের ভেতর উর্মিকে বিয়ে করে আমার সামনে উপস্থিত হয়।”

১২ই শ্রাবণ, ১৩৯৪ বঙ্গাব্দ

তুমুল বর্ষণে আশপাশ তলিয়ে গেছে প্রায়। ঊর্মিলা ক্লাস শেষ করে বের হতে না হতেই আবারও তীব্র বেগে জলবর্ষণ শুরু হলো। ছাতা আনতে ভুলে গেছে আজ। আশেপাশে ছাউনী জাতীয় কিছু নেই যেখানে আশ্রয় নেবে। শরীরে ওড়না ভালোভাবে টেনে দিল। মাথায় কাপড় দেয়া আছে। মোটা জামাকাপড় ভিজে একাকার হলেও দেহের ভাঁজ, গড়ন কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। ঊর্মিলা আশেপাশে তাকিয়ে রিকশা খুঁজছে কিন্তু একটা রিকশাও কম টাকায় যাবে না। সামনের দোকান থেকে রেডিও উচ্চ শব্দ ভেসে আসছে। খবর শুনছে আর চা বানাচ্ছে দোকানদার। দূরে কয়েকজন লোক জোরে জোরে কথা বলছে। একজনকে ঘিরে কয়েকজন দাঁড়িয়ে আছে। ঊর্মিলা শুনেছিল কোন দলীয় নেতা প্রায়ই আসে এখানে। হাঙ্গামা, মারামারি করে। আজকেও নাকি এসেছে। ঊর্মিলার সেসব দেখার সময় নেই। বাসায় গিয়ে রান্না বসাতে হবে। নাহয় খালার হাতে মার খেতে হবে। চিন্তায় উদ্বিগ্ন হয়ে রিকশা খুঁজতে লাগল। বেশি ভাড়া চাইলে এবার হেঁটেই যাবে। এত ভাড়া দিয়ে রিকশায় ওঠার সামর্থ্য তার নেই। কপালে চিন্তার বলিরেখা।

দূর হতে ইমতিয়াজ ভুঁইয়া সবকিছু পর্যবেক্ষণ করল। মেয়েটার উদ্বিগ্ন ও মায়াবী চোখে চেয়ে বেশ মায়া কাজ করল। একজনকে ডেকে বলল,

“একটা রিকশা ঠিক কর তো।”

“রিসকা দিয়া কি করবেন ভাই?”

ভ্রু কুঁচকে বলল,

“যা বলেছি তাই কর।”

“আচ্ছা ভাই।”

কিছুক্ষণ পর রিকশা হাজির করতেই ইমতিয়াজ অদূরে দাঁড়ানো মেয়েটির সামনে যেতে বলল। ভাড়া নিজ থেকেই দিয়ে দিল। শিখিয়ে দিল,

“ভাড়া দেয়া হয়নি এমন ভাব করবে। যেমন অন্য প্যাসেঞ্জারদের কাছে বলো সেভাবেই বলবে।”

রিকশা ওয়ালা মাথা নাড়িয়ে খুশি মনে ঊর্মিলার সামনে এসে বলল,

“আফা ওডেন।”

ঊর্মিলা কপাল ভাঁজ করে বলল,

“জিগাতলা যাবেন?”

রিকশাওয়ালার মাথায় পলিথিন বাঁধা। বৃষ্টিতে পুরো শরীর ভিজে একাকার। প্যাডেলে পা রেখে বলল,

“জে, ওডেন।”

“আরে দাঁড়াও। কত টাকা ভাড়া?”

“যা মুন চায় দিয়েন।”

“না আপনি বলেন।”

“এমনে দিনে বিশ টেকা নেই, বৃষ্টির দিন দেইখা ত্রিশ দিয়েন।”

ঊর্মিলা মাথায় হাত দিয়ে বলল,

“ত্রিশ! ডাকাতি করতে নেমেছেন নাকি আজ?”

“বৃষ্টির দিনে ভাড়া এট্টু বেশিই আফা।”

“না এত ভাড়া দেব না। বিশ টাকায় গেলে চলো নয়তো দরকার নেই।”

“আইচ্ছা দিয়েন। আহেন।”

ঊর্মিলা উঠে বসতে গেলেই রেডিও থেকে ভেসে এল গান,

“বকুলের মালা শুকাবে
রেখে দেব তার সুরভী
দিন গিয়ে রাতে লুকাবে
মুছো নাকো আমারই ছবি
আমি মিনতি করে গেলাম”

রিকশা সাঁই করে টান দিয়ে চলে যেতেই গানটা শোনা হলো না আর। গানটা তার বেশ পছন্দের। ইশ আরেকটু আগে রেডিও স্টেশনটা পাল্টালে গানটা শোনা যেত। ভিজে চুপচুপে হয়ে গেছে সে। জ্বর না বাঁধলেই হলো।

এদিকে রেডিওর গানটা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছে ইমতিয়াজ।

“তুমি চোখের আড়াল হও
কাছে কিবা দূরে রও
মনে রেখ আমিও ছিলাম
এই মন তোমাকে দিলাম
এই প্রেম তোমাকে দিলাম।”


আজ ঊর্মিলার ভার্সিটির সামনে ইমতিয়াজ দাঁড়িয়ে আছে। চাতক পাখির ন্যায় আশেপাশে তাকাচ্ছে। মেয়েটা তার রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। তার সাঙ্গপাঙ্গোরা নেতার এমন অস্থিরতায় চিন্তিত ও স্থবির হয়ে আছে। কখনো এমন বেশ দেখেনি তাই বোধহয়। রুক্ষ ভারিক্কি মেজাজে দেখেই অভ্যস্ত সেজন্য ম্লান, উদ্বিগ্ন চেহারা ঠিক হজম করতে পারছে না। খানিক পর ঊর্মিলার দর্শন পেতেই ইমতিয়াজ ভুঁইয়া উজ্জ্বল মুখে এগিয়ে গিয়ে বলল,

“ভালো আছেন মিস?”

ঊর্মিলা ভয় পেয়ে খানিকটা পিছিয়ে গেল। হঠাৎ এমন মুখের সম্মুখে চলে আসায় বেশ চমকিত হয়েছে। কঠিন দৃষ্টিতে চাইল। ইমতিয়াজ ভুঁইয়া চমৎকার হেঁসে বলল,

“ভয় পেয়েছেন? আমি সুদর্শন পুরুষ কোনো ভূত টুত নই।”

ঊর্মিলা এসব কথায় চরম বিরক্ত হচ্ছে। অপরিচিত এক লোকের অযথা বকবক বিরক্ত লাগারই কথা। পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নিলে ইমতিয়াজ পথ আগলে বলল,

“উহু, কথা শেষ হয়নি মিস। তোমার নাম কি?”

ঊর্মিলা এবার শক্ত গলায় বলল,

“পথ ছাড়ুন, আজব লোক। এটা কেমন ম্যানার্স?”

ইমতিয়াজ ভুঁইয়া কথায় পাত্তা না দিয়ে বলল,

“গুড ম্যানার্স। শোনো নাম বললেই ছেড়ে দেব।”

ঊর্মিলা হাত ভাঁজ করে কোনো কিছু না ভেবেই রাগী স্বরে বলল,

“নাম হলো গুলি মেরে উড়িয়ে দে।”

ইমতিয়াজ বুঝতে না পেরে বলল,

“এ্যাঁ”

ঊর্মিলা বলেই পাশ কাটিয়ে চলে গেছে। ইমতিয়াজ হতবুদ্ধির মতো বলল,

“কি বলে গেল?”

একজন চ্যালা এগিয়ে এসে বলল,

“ভাই বলেছে গুলি মেরে উড়িয়ে দে।”

“এ্যাঁ, এটা আবার কেমন নাম?”

“ভাই নাম না। আপনাকে গুলি মেরে উড়িয়ে দেয়ার থ্রেট দিয়ে গেল।”

ইমতিয়াজ ভুঁইয়ার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। মেয়েটা ভারী বজ্জাত তো। সেদিন দেখে মোটেও তা মনে হয়নি। ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা গো বেচারা টাইপ মনে হয়েছে।


ঊর্মিলার একটা কলেজে স্টুডেন্ট ক্যাম্পেইন ছিল। সেখানে তার নামের একটি মেয়ের সাথে পরিচিত হয়েছে। সাদা কলেজ ড্রেস পরিহিত দুই বেণী করা। কলেজ মাঠের এ মাথা হতে ও মাথা ছোটাছুটি করে বেড়াচ্ছে। ইতোমধ্যে তাকে বড় আপা ডেকে বেশ কয়েকবার জড়িয়ে ধরেছে। দুজনের একই নাম শুনে মেয়েটা উৎফুল্ল ও পুলকিত হয়ে উঠছিল। বেশ মিষ্টি মেয়েটি। বারবার আপা আপা বলে মাথা খারাপ করে ফেলছিল। রিনরিনে কণ্ঠের আদুরে ডাকটুকু বেশ আপন আপন লাগছিল ঊর্মিলার। উর্মি হাতে জুস আর চিপস নিয়ে এগিয়ে এসে বলল,

“আপা নাও।”

“আমি খাব না উর্মি।”

“আরে খাও। আমরা না মিতা?”

ঊর্মিলা নিতান্ত অনিচ্ছা শর্তেও নিল। আজকের কর্মসূচি নিয়ে খানিকক্ষণ আলোচনা হলো। উর্মি একটু পর পর এটা ওটা নিয়ে আসছিল। অনেক চঞ্চল মেয়েটা। কোথাও একটু স্থির হয়ে বসে নেই। পুরো মাঠ দৌঁড়ে, চক্কর দিয়ে বেড়াচ্ছে।

দুপুরে খাওয়ার বিরতিতে ঊর্মিলা অন্যান্য সদস্যদের থেকে আলাদা বসল। মাঠে চাদর বিছিয়ে টিফিন বক্স বের করে ভাত তরকারি নামিয়ে খেতে বসল। সাদামাটা খাবার। ভাত, করল্লা ভাজি আর গুড়ো মাছ। একটু পরে পাশে কারো বসার শব্দে ঘাড় ফিরিয়ে চাইল। উর্মি মেয়েটা হাতে বক্স নিয়ে বসেছে। বক্স খুলে নিজের খাবার বের করে পাশে রাখল। চিকেন কারি, চিংড়ি ভুনা আর ভাত এনেছে সে। ঊর্মিলাকে ওসব দিয়ে খেতে দেখে বক্স থেকে চিংড়ি, চিকেন বেড়ে দিল। ঊর্মিলা না না করলেও শোনেনি সে। অগত্যা খেতে শুরু করল। উর্মি বলল,

“আপা, আমি করল্লা ভাজি পছন্দ করিনা। তুমি আমাকে ছোট মাছ দাও। আচ্ছা আজকে নাহয় তোমার করল্লা একটু খেয়ে দেখা যাক।”

ঊর্মিলা খুশি মনেই দিল। মেয়েটা এত মিশুক আর মিষ্টি তার দারুন লাগছে কথা বলে। ভাগাভাগি করে খাওয়া সম্পন্ন করল। একটু পরে আবারও কাজে লেগে পড়ল। ঊর্মিলা প্রতিটা পদক্ষেপে উর্মিকে সাহায্য করল। কাজ করতে করতে কোত্থেকে যেন একটা কারেন্টের তার উর্মির উপরে পড়তে যাচ্ছিল সে নিজের জীবন ঝুঁকিতে রেখে উর্মিকে সেখান সরিয়ে দিয়েছে। উর্মির একটা কৃতজ্ঞতাবোধ আর ঋণ রয়ে গেল মানুষটার প্রতি।


ইমতিয়াজের কয়েকদিন ধরে ঘুম ভালো হচ্ছে না। শয়নে স্বপনে শুধু একজনই হানা দিচ্ছে। মেয়েটার নাম জেনেছে বহু কষ্টে। ঊর্মিলা। কি সুন্দর নাম! তার উর্মিমালা। আজকেও ভার্সিটির সামনে বাইকে চেপে বসে আছে। ঊর্মিলাকে দেখা যেতেই বাইক থেকে নেমে এগিয়ে আসল। ঊর্মিলা তাকে দেখেও না দেখার ভান করে চলে যেতে নিলে ইমতিয়াজ পিছন বলল,

“এই গুলি মেরে উড়িয়ে দে।”

ঊর্মিলা আঁতকে উঠে ব্যাগ চেপে ধরল। এসব নেতা ফেতাদের কাছে গুলি থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। তাকে সেদিনের স্পর্ধার জন্য মেরে ফেলবে নাকি? ভয়ে ভয়ে বলল,

“নাহ।”

ইমতিয়াজ এগিয়ে এসে বলল,

“কি না গুলি মেরে উড়িয়ে দে?”

ঊর্মিলা কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,

“আমাকে গুলি করবেন না।”

ইমতিয়াজ ঊর্মিলাকে ভয় পেতে দেখে হো হো করে হেঁসে বলল,

“তোমাকে গুলি করব কখন বললাম? তোমার নামই তো গুলি মেরে উড়িয়ে দে। ভুলে গেছ? সেদিন বলেছিলে কিন্তু।”

শেষের কথাটা ভ্রু নাচিয়ে বলল। ঊর্মিলা নিজের বোকামোতে মারাত্মক বিরক্ত হলো। সেদিন কি না কি বলছে লোকটা মাথায় নিয়ে বসে আছে। আশ্চর্য লোক তো! ঊর্মিলা চলে যেতে নিলে ইমতিয়াজ বলে উঠল,

“উর্মিমালা আর কত জ্বালাবা?”

ঊর্মিলা অপরিচিত কারো মুখে নিজের নাম শুনে হতবাক হলো। বলল,

“আপনি নাম জানলেন কিভাবে?”

কানের পিঠ চুলকে বলল,

“জেনেছি এভাবে ওভাবে।”

ঊর্মিলা আর এক মুহুর্ত দাঁড়িয়ে না থেকে চলে গেল। লোকটা কয়েকদিন ধরে সাংঘাতিক বিরক্ত করছে।


ঊর্মিলা কিছু কাজে উর্মির কলেজে এসেছে। কাজটা করে বেরোতেই সেদিনের টিজ করা লোকটাকে বাইকে হেলান দিয়ে কয়েকজনের সঙ্গে আলাপ করতে দেখল। এই লোকের কাজ কি শুধু এখানে ওখানে আড্ডা মারা নাকি? যেসময়ই বের হয় এখানে নয়তো ওখানে তার দেখা পাওয়া যাবেই। এসব ভাবতে ভাবতে রাস্তার মাঝে চলে এসেছিল সে খেয়ালই করেনি। বাস পুরো অগ্রভাগে এসে পৌঁছাতেই কারো ধাক্কা খেয়ে পাকা সিমেন্টের সঙ্গে বারি খেল। রক্তে হাত ভরে গেল। জ্ঞান হারানোর পূর্বে আবছা আবছা চোখে দেখল রক্তাক্ত একটি মেয়ে রাস্তায় পড়ে আছে।

ইমতিয়াজ নিজের চোখের সামনে উর্মিমালার এই অবস্থা দেখে ঠিক থাকতে পারল না। চিৎকার করে অজ্ঞান ঊর্মিলাকে আগলে নিয়ে ডাকল,

“উর্মিমালা, এই উর্মিমালা? কথা বলো। এই মেয়ে। এই তোরা তাড়াতাড়ি গাড়ি নিয়ে আয়।”

সাইরেন বাজিয়ে অ্যাম্বুলেন্স আসতেই গাড়িতে করে দুটো বডি ঢোকানো হলো। ইমতিয়াজের ঊর্মিলার থেকে আশেপাশে চোখ যায়নি এতক্ষণ। ঊর্মিলার থেকেও বেশি রক্তাক্ত হয়েছে কলেজের একটি মেয়ে। আল্লাহ জানে কার মেয়ে! ইমতিয়াজ কাঁপা কাঁপা হাতে মেয়েটির রক্তাক্ত হাত ছুঁয়ে ভেতরে ঢুকিয়ে দিল। অবচেতনে মেয়েটা তা জানতেও পারল না। জানলে কি খুশি হতো?


হাসপাতালে রক্তাক্ত শার্টে বসে আছে ইমতিয়াজ। কিছুক্ষণ আগে ঊর্মিলার কেবিনে এক ব্যাগ আর সেই মেয়েটির কেবিনে তিন ব্যাগসহ মোট চার ব্যাগ রক্ত ম্যানেজ করে দিয়ে এসেছে সে। তার দলের ছেলেরা নিজ ইচ্ছায় কাঙ্ক্ষিত রক্ত ডোনেশন করেছে। একটু পর ‘আমার উর্মি ‘ ‘ আমার উর্মি ‘ করতে করতে এক লোককে ঢুকতে দেখে ইমতিয়াজ বুঝল এটা তার উর্মিমালার ভাই। ছলছল চোখে এগিয়ে যেতেই লোকটা কেমন করে যেন চাইল। হন্তদন্ত হয়ে উপরে চলে গেল। ইমতিয়াজের হাত, পা কাঁপছে। তার উর্মিমালার কিছু হবে না তো? ওই কলেজের মেয়েটা বাঁচবে তো? তার উর্মিমালাকে বাঁচাতে গিয়ে ছোট্ট মেয়েটা…। আর ভাবতে পারল না মুখ ঢেকে হাঁটু ভেঙে ফ্লোরে বসে পড়ল। তার দলের ছেলেরা এগিয়ে এল।

চারদিন পর ঊর্মিলার ডিসচার্জ হয়। ইমতিয়াজ দেখতে আসতে পারেনি। জরুরী তলবে গ্রামে যেতে হয়েছে তাকে। এমনিতে তার চ্যালাদের সাথে ফোনে যোগাযোগ করে জেনেছে ঊর্মিলা ভালো আছে। তাই নিশ্চিন্তে যেতে পেরেছে। শুনেছে কলেজের সেই মেয়েটি নাকি মারা গিয়েছে। ইমতিয়াজ বেশ খারাপ লেগেছে। কার যক্ষের ধন হারালো কে জানে? ঢাকায় ফিরে মেয়েটার পরিবারের সাথে যোগাযোগ করবে ভাবল। তবে বহু কাজের প্রেশারে সেসব ভুলে বসল।


বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরোতেই দারোয়ান এসে একখানা খাম ধরিয়ে দিতেই ঊর্মিলা বেশ ঘাবড়ে গেল। আশেপাশে তাকিয়ে ভয়ে ভয়ে নিল সেটা। এটা কে দিয়েছে? এ শহরে তাকে চিঠি দেয়ার মতো কে আছে? নিতে চাইছিল না তবুও কি ভেবে যেন নিল। তৎক্ষনাৎ ব্যাগে ভরে কোনোদিকে না তাকিয়ে হেঁটে চলে গেল। তার গমন পানে একজনের চক্ষু নিরলস ভাবে চেয়ে রইল।

রাত তিনটা। আশেপাশে ঝিঁঝিঁ পোকা আর অদূর হতে কুকুরের ডাক ছাড়া আর কোনো আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে না। শুনশান নীরবতা। সকলেই গভীর ঘুমে নিমগ্ন। মোমবাতির হালকা আলোতে ঊর্মিলা দুরুদুরু বুকে ব্যাগ হতে চিঠির খাম বের করে ছিঁড়তেই একটা সুন্দর সুবাস নাকে ঠেকল। ভেতরে একখানা পত্র, ময়ূর ও পায়রার পালক এবং কিছু গোলাপের পাপড়ি। সুবাসে বিমোহিত হয়ে পত্রখানা মেলে ধরতেই চোখের সামনে ধরা দিল ছোট ছোট অক্ষরে টানা টানা কিছু লেখা। হাতের লেখন বেশ সুন্দর। এক দেখায় মুগ্ধ হওয়ার মতো।

উর্মিমালা,

কেমন আছ কঠিন হৃদয়ের রমণী? আমি কেমন আছি জানতে চেও না মেয়ে। বড্ড বেশিই খারাপ আছি। তুমি কি জানো তুমি একজন নিদ্রাহরণকারিণী? তোমার ঐ ডাগর ডাগর আঁখি জোড়া রাত্রে আমাকে ঘুমোতে দেয়না। ইদানিং কাজকর্মেও অমনোযোগী হয়েছি বটে। সারাবেলা কেবল কল্পনায় মশগুল থাকি। রুচিও হারিয়ে ফেলেছি। কোনো খাবারে স্বাদ অনুভূত হয়না। শয়নে স্বপনে শুধু তুমিই এসে হানা দাও। খুবই খারাপ এটা। বাস্তবে তো তুমি ধরা ছোঁয়ার বাইরে তবে কল্পনায় এত জ্বালাচ্ছো কেন বলো তো?

পত্রখাম খুলতেই একটা সুবাস পেয়েছ না? শোনো এটা আমার নিজের গাছের হাসনাহেনা, বেলি ও বকুলের ঘ্রাণমিশ্রিত সুবাস। এই তিনটে ফুল আমার অত্যাধিক প্রিয়। তাই সবসময় টাটকা টাটকা পুষ্পত্রয় একত্র করে পারফিউম তৈরি করে সংরক্ষণ করে রেখে দেই। সেটারই কিছুটা তোমাকে উৎসর্গ করলাম। সাথে গোলাপের পাপড়ি, ময়ূর ও পায়রার পালক। পায়রা আমার নিজেরই তবে ময়ূরের পালক কেনা। শুনেছি চিঠির সঙ্গে পায়রা ও ময়ূরের পালক দিলে অপরপাশে মানুষের দিল নরম হয়। তুমি তো পাষাণ ললনা; আমার ঘুম কেড়ে নিয়ে করছ কেবল ছলনা।

এগুলো যত্ন করে রেখে দিও সাথে যত্ন করে রেখ তোমার মন। মনের দখলদারিত্ব করা এখনো কিন্তু বাকি।

ইতি
কাছের অথবা দূরের কেউ


৬ ভাদ্র, ১৩৯৫ বঙ্গাব্দ

দুদিন আগে ঊর্মিলার ভাই এসে ইমতিয়াজকে শাসালো। উর্মিমালার সঙ্গে যেন কথা না বলে। ইমতিয়াজের রাগ উঠল বেশ। মেয়েটা সব কথা তার ভাইকে সাপ্লাই করে। নির্ঘাত তার সম্পর্কে উল্টাপাল্টা মন্তব্য করেছে নয়তো তার ভাই এসে শাসাবে কেন? আজকে হাতের কাছে পেলে খবর করে ছাড়বে। একটু পরেই মাথায় ওড়না প্যাঁচানো ঊর্মিলাকে দেখতে পেতেই তার মধ্যে জেদ ভর করল।

হুট করে এসে হাত শক্ত করে চেপে ধরে বলল,

“চলো বিয়ে করব।”

“পাগল নাকি?”

“হ্যাঁ তোমার প্রেমে পাগল।”

“হাত ছাড়ুন।”

“দেখো রোজ রোজ বেগানা নারীকে দেখতে, টিজ করতে আমার ভালো লাগেনা। তার চেয়ে বরং বিয়েটা করে ভালো করে দেখে টেখে টিজ করব কেউ আর আড়চোখে চাইবে না। প্রতিদিন একজন তাগড়া পুরুষের এমন লাস্যময়ী রমণীর দিকে প্রেমময় দৃষ্টিপাত ধর্ম এবং সমাজের কেউই ভালো চোখে দেখছে না।”

“আশ্চর্য! আমি কিন্তু এবার চিৎকার করব।”

“দ্রুত করো। বিয়ের জন্য সাক্ষীরও তো দরকার আছে।”

মাথায় ওড়না ভালোভাবে টেনে চারিপাশ পর্যবেক্ষণ করে ধীর অথচ কঠিন স্বরে বলল,

“দেখুন মানুষ জড়ো হওয়ার আগে এখান থেকে কেটে পড়ুন। নয়তো আশেপাশের মানুষকে দিয়ে আপনাকে গণপিটুনি খাওয়াব। বখাটে কোথাকার!”

ইমতিয়াজ ভুঁইয়া শীষ বাজিয়ে গাইতে লাগল,

“ওহে পাষাণ ললনা একটুখানি কবুল বলো না,
আমি যে তোমার বিরহে ভাত মুখে তুলব না।”

ঊর্মিলা বেশ বিরক্ত হলো এসব কথায়। বলল,

“আজগুবি কথা রাখুন। আপনি ভাত মুখে না তুললে আমার কি?”

ইমতিয়াজ এবার সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলল,

“তুমি সত্যিই বিয়ে করবে না উর্মিমালা?”

কথাটা শুনে ঊর্মিলা একটু থমকালো। কেমন বাচ্চাদের মতো মুখ ফুলিয়ে কথা বলছে। ঊর্মিলা ইদানিং এই লোকটার প্রতি খানিকটা দুর্বলতা অনুভব করে। প্রায় এক বছর ধরে পিছনে পড়ে আছে। এখনো পিছু ছাড়ল না। বড় ভাইজানের সঙ্গে লোকটার সম্পর্কে বলতে হবে। ভাইজান যদি রাজি হয়ে যায় তাহলে তার আপত্তি নেই কোনো। ঊর্মিলা সেটা মুখে প্রকাশ না করে চলে যেতে নিলে ইমতিয়াজ পিছন একটা গোলাপ এগিয়ে বলল,

“ওগো উর্মি মালা,
তরঙ্গের ন্যায় ঢেউ খেলো
আমার মনের উঠোনে।
তোমার প্রেমেতে পড়ে
ঝাঁপ দিয়েছি মন পুকুরে।

তোমার স্মৃতিতে কাটে আমার
সকাল বিকেল রাত্রি,
তুমি কি আমার সাথে
থাকবে দিবারাত্রি?”

ঊর্মিলা একটু অবাকই হলো ইমতিয়াজের গলায় আবৃত্তি শুনে। ইমতিয়াজ একটু শ্বাস নিয়ে বলল,

“তোমার জন্য কাল সারা রাত জেগে লিখেছি। কেমন হয়েছে?”

ঊর্মিলা কবিতা আবৃত্তি পছন্দ করে লোকটা জানে নাকি? আনাড়ি কবিতাটা খারাপ হয়নি। তবে মুখে বলল,

“একদমই বাজে।”

বলেই প্রস্থান করল। ইমতিয়াজ তার যাওয়ার পানে মুখ অন্ধকার করে হতাশ হয়ে চেয়ে রইল। আসলেই বাজে হয়েছে?


১৫ আশ্বিন, ১৩৯৫

ইমতিয়াজ ভুঁইয়া ঊর্মিলাকে তুলে নিয়ে এল কাজী অফিস। ঊর্মিলা হতবাক হয়ে শুধালো,

“এসব কি?”

“বিয়ে করব।”

“আপনি কি আসলেই সুস্থ?”

“হ্যাঁ কেন? তোমার অসুস্থ মনে হয়?”

“তা নয়তো কি? বলা নেই কওয়া নেই এভাবে কাজী অফিস নিয়ে আসে কে?”

ইমতিয়াজ নির্লিপ্ত গলায় বলল,

“আমি।”

ঊর্মিলা বিরক্ত হয়ে বলল,

“এসব আজগুবি কথা রাখুন, আমাকে যেতে দিন।”

ইমতিয়াজ এবার ঊর্মিলার চোখের দিকে চেয়ে বলল,

“আমার চোখের দিকে চেয়ে সত্যি করে বলবে, তোমার কি আমাকে এক বিন্দুও পছন্দ না? একবার না বলো আর জীবনেও তোমার সামনে আসব না।”

ঊর্মিলা কিছু বলতে পারল না। উশখুশ করতে লাগল। ইমতিয়াজ তাকে উত্তর দিতে না দেখে চলে যেতে উদ্যত হতেই ঊর্মিলা ধীর গলায় বলল,

“ভাইজান মানবে না?”

ইমতিয়াজ ফিরে যেতে চেয়েও বলল,

“কেন?”

“আপনার আর আমার বংশ একই।”

“হ্যাঁ তো?”

ঊর্মিলা মিনমিন করে বলল,

“ভাইজান এক বংশে বিবাহ পছন্দ করেন না।”

“আমার তো তোমার আর আমার একই বংশ ব্যাপারটা ইন্টারেস্টিং লাগছে। আমাদের ছেলে মেয়েকে সবাই ডাবল ভুঁইয়ার পুত্র, কন্যা বলে সম্বোধন করবে ব্যাপারটা ইন্টারেস্টিং না?”

ঊর্মিলা মুখ শক্ত করে বলল,

“মোটেই না। বিয়েই হয়নি, বাচ্চা পর্যন্ত চলে গেছে।”

ঊর্মিলা মুখ ঘুরিয়ে নিতেই ইমতিয়াজ বলল,

“যদি বলি তোমার ভাই বিয়েতে রাজি তাহলে বিয়ে করবে?”

ঊর্মিলা কিছু বলল না। ইমতিয়াজ তার কথা না বলাকে সম্মতি ধরে নিল। কাকে যেন ফোন দিতেই ঊর্মিলার দিকে এগিয়ে দিল। ঊর্মিলা ফোন কানে ধরতেই ওপাশ থেকে ভেসে এল,

“বিয়েটা করে ফেল। আমার পূর্ণ সম্মতি আছে।”

ব্যাস কবুল বলে কাগজে কলমে ও ধর্মীয়ভাবে ইমতিয়াজ ভুঁইয়ার অর্ধাঙ্গিনী হয়ে গেল ঊর্মিলা ওরফে উর্মি ভুঁইয়া।
………

এতটুকু বলে ব্ল্যাক ভাইপার থামল। বলল,

“সেদিন আমি কোনো অনুমতি দেইনি। আমার কণ্ঠ হুবহু নকল করে ইমতিয়াজের এক বন্ধু এই কাজ করছিল। আমি কিছুতেই সেসব মেনে নিতে পারিনি।”

মুনতাজির বলল,

“আপনি মম, পাপার সবকিছু এভাবে খুটিয়ে খুটিয়ে কিভাবে জানলেন? তারা বলেছিল?”

ব্ল্যাক ভাইপার সম্ভবত জানত এই প্রশ্নটা মুনতাজির করবে। সে ব্রিফকেস থেকে একটা কালো মলাটের ডায়েরি মুনতাজিরের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,

“এটার ভেতর সব লিখিত আছে। যেটায় তোমার বাবা নিজের জীবনের পুঙ্খানুপুঙ্খ সব ঘটনা নিজ হাতে লিপিবদ্ধ করেছিল।”

মুনতাজির ডায়েরিটা হাতে নিতেই বলল,

“এটা কোথায় পেলেন?”

ব্ল্যাক ভাইপার একটা দীর্ঘনিশ্বাস ছেড়ে বলল,

“তোমার বাবাকে ব্যবহার করতে, হাতে রাখতে কিংবা ফাঁদে ফেলতে যাই বলো সেজন্য এই ডায়েরিটা লুকিয়ে চুরি করেছিলাম বিভিন্ন তথ্য জানতে।”

মুনতাজির ডায়েরিটায় হাত বুলিয়ে মাঝের একটা পৃষ্ঠা খুলতেই নজরে পড়ল টানা টানা চিকন অক্ষরে লেখা কিছু অনুভূতি,

“তাকে ভালোবেসেছিলাম আশির দশকে। তখনকার ভালোবাসা এত রঞ্জিত ছিল না আর নাতো ছিল সে। সাদামাটা ছিমছাম গোছের এক ইস্পাত রমণী। পিছলে পড়লাম একদম ঘোর বর্ষায়। আসমান চিরে তুমুল বর্ষণ আর তর্জন গর্জন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণের সামনে ভিজে একাকার হয়ে অসহায় বদনে এদিক ওদিক তাকাচ্ছিল। ডাগর ডাগর সেই মায়াবী চোখে চাইতেই সর্বনাশটা হয়ে গেল। একটা টান অনুভব করছিলাম। ব্যাস চেয়ারম্যান পুত্র দাপুটে ইমতিয়াজ ভুঁইয়া হয়ে গেল উর্মিমালার একপাক্ষিক একনিষ্ঠ প্রেমিক পুরুষ। পরে বুঝেছিলাম সেই টান কিংবা মহব্বত সৃষ্টিকর্তারই ইশারা ছিল।”

                                ~ ইমতিয়াজ ভুঁইয়া

চলবে…

(আসসালামু আলাইকুম।)

ভবঘুরে_সমরাঙ্গন

পর্ব_৫৯.৩ (রহস্য উন্মোচন-২)

তাজরীন ফাতিহা

ডায়েরির কভারটা ক্যালেন্ডারের সাদা অংশ দিয়ে মোড়ানো। যেন বছরের পর বছর ডায়েরিটা সুরক্ষিত থাকে। ছিঁড়ে টিরে গেলেও কভারটা ক্ষতিগ্রস্ত যেন না হয়। তবুও ডায়েরির জায়গায় জায়গায় ছিঁড়ে গেছে। কিন্তু আসল মলাটটা মোটামুটি ঠিকই আছে। ইমতিয়াজ ভুঁইয়ার অতি যত্নে গাঁথা এই ডায়েরিটা। জীবনের বেশিরভাগ কাহিনী এইখানে টুকে রেখে দিয়েছেন স্মৃতি হিসেবে। অতীতের মানুষ গুলো বোধহয় চিঠি ও ডায়েরি লেখায় বেশ পারদর্শী ছিল। লেখাগুলো কি সুন্দর টানা টানা করে লিখিত। পুরোনো মানুষগুলো যত্ন নিতে জানত আর বর্তমান মানুষ অবহেলা করতে জানে। দিন যত যায় পৃথিবী উন্নত হয় মানুষের নীতি নৈতিকতার ততই অবনতি হয়। মানুষ এখন সম্পর্কের যত্ন নিতে জানে না। অতীতের সম্পর্কগুলো দেখতে এজন্য এতটা সুন্দর। মুনতাজির ডায়েরিটা সযত্নে নিজের কাছে রেখে দিল। মুনতাজির ছোট্ট করে নিঃশ্বাস ফেলে ব্ল্যাক ভাইপারের উদ্দেশ্যে বলল,

“এই ডায়েরি নিয়ে আপনার কি ফায়দা হলো?”

ব্ল্যাক ভাইপার হাসল। বলতে লাগল,

“তোমার মা, বাবা যখন বিয়ে করে এল তাদেরকে আমি মেনে নেইনি। সেই প্রথম উর্মির প্রতি আমি কঠোরতা প্রকাশ করেছিলাম। মেয়েটা ভয়ে কাঁপছিল। সে বুঝতেই পারেনি ইমতিয়াজ এত বড় একটা ধোঁকা দিয়ে তাকে বিয়ে করবে। আমি সেদিন উর্মিকে আর ঘরে তুলিনি। মেয়েটা চিৎকার করে ভাইজান ভাইজান করে ডাকছিল। সেদিন বৃষ্টি ছিল। বাড়ির বড় গেটে দারোয়ানকে তালা মেরে দিতে আদেশ করেছিলাম। সেই বৃষ্টির কাদা মাটিতে বসে চিৎকার করে কেবল আমাকেই ডেকে গিয়েছিল। আমি ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়লেও সাড়া দেইনি কোনো। ও আমাকে সেদিন অনেক বড় আঘাত দিয়েছিল। ইমতিয়াজ ওকে নিয়ে চলে গেলে আমার বুকে ব্যথা ওঠে। আমার পুতুলের মৃত্যু, উর্মিকে তাড়িয়ে দেয়া সবকিছু আমার মস্তিষ্কে বাজে ভাবে প্রভাব ফেলে। মাত্র ২৮ বছর বয়সে প্রথম স্ট্রোক করি আমি।”

এইটুকু বলে একটা লম্বা নিঃশ্বাস ফেলল ভাইপার। মুনতাজিরের এ পর্যায়ে বেশ খারাপ লাগে সামনের মধ্যবয়স্ক মানুষটির জন্য। রুবানার কোলে নাহওয়ান ঘুমিয়ে পড়েছে। যদি সে নিজের আসল রূপে থাকত নির্ঘাত কেঁদে ফেলত। এই মানুষটা ছোট্ট বেলা থেকে তাদের দুই ভাইবোনকে ভীষণ আদর করতেন। কিন্তু কি এমন কারণে তার এই বদলে যাওয়া। কেন এত জঘন্যতা সাইফার স্যারের সঙ্গে?

রুবানা জয়েন হয়েছে বেশিদিন হয়নি। এমনিতেও সে এই সংস্থায় অনির্ধারিত সহযোগী হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত। বিভিন্ন গুপ্ত অপরাধীকে ধরতে তাকে ব্যবহার করা হয়। সবসময় এজেন্ট সংস্থায় সে সম্পৃক্ত থাকে না। কারণ ভার্সিটি পড়ুয়া অবস্থায় এজেন্ট সংস্থায় কেউই জয়েন হতে পারেনা। এরকম কোনো নিয়ম গোয়েন্দা সংস্থায় নেই। তবে মুনতাজিরের জন্য এক্ষেত্রে সে সুপারিশ পেয়েছে। সে মূলত বড় পদের কেউ না। শুধু তথ্য আদান, প্রদান করাই তার কাজ। এজন্য ডিপার্টমেন্টের হেড তাকে ছাড় দিয়েছে। তবে শর্ত একটাই যেকোনো মুহূর্তে, যেকোনো অবস্থায় ডাকা হলে কাজকে আগে প্রাধান্য দিতে হবে। কোনো সময় ‘না’ বলা যাবেনা তাতে যত জরুরি কাজেই সে থাকুক না কেন। রুবানা সমস্ত শর্ত মেনেই এ কাজে যুক্ত হয়েছে। ব্ল্যাক ভাইপার আবারও বলতে শুরু করল,

“আমি হাসপাতালে শুনে উর্মি এসেছিল তবে তাকে দেখতে দেয়া হয়নি। ওর সঙ্গে সমস্ত যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছিলাম। কারণ ইমতিয়াজকে আমি কিছুতেই সহ্য করতে পারতাম না। ওর কারণে আমি আমার পুতুলকে হারিয়েছিলাম। ওকে চোখের সামনে দেখলেই পুরোনো ক্ষত তাজা হয়ে উঠতো। দুই বছর পর যখন একদিন হঠাৎ তোমাকে নিয়ে উপস্থিত হলো আমার সামনে। আমি মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে ছিলাম। সেই ছোট্ট উর্মি একেবারে পরিপক্ব নারীর বেশে আমার সামনে দাঁড়ানো।

এতদিন পর ওকে দেখে চোখে পানি এসে গিয়েছিল। চেহারার হাল বেহাল ওর। মনে হয় কতরাত ঘুমায় না। কোলে বাচ্চা কাঁদছে। আমাকে দেখতে পেতেই ছুটে এসে হুমরে পড়ে কেঁদে উঠলো। আমি ওর কান্না সহ্য করতে পারছিলাম না। পরে ওর থেকেই শুনলাম স্বামী, সন্তান নিয়ে সুখে থাকলেও শ্বশুর, শাশুড়ি কেউই মেনে নেয়নি তাকে। শ্বশুর মেনে না নিলেও অত্যাচার করেনা তবে শাশুড়ি তাকে নানাভাবে অত্যাচার করে। ইমতিয়াজের সাথেও সংসার জীবনে দুরুত্বের সৃষ্টি হয়েছে। শাশুড়ি তার ছেলেকে অন্যত্র ধনী ঘরে বিয়ে দিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। ইমতিয়াজ এসবে আগ্রহী না বিধায় তিনি তেমন সুবিধা করতে পারছিলেন না। উর্মির চোখের পানি কেন যেন সহ্য হচ্ছিল না। নিজের ভেতরের জমায়িত সমস্ত ক্রোধ জেগে উঠতে লাগল। ভেতরের ঘুমন্ত পশুটা জাগ্রত হয়ে উঠল। উর্মিকে নিয়ে সেবার ওর শ্বশুরবাড়ি যাই। ওর শাশুড়িকে নজরে নজরে রাখি। উনি আমার সামনে মেকি ভাব নিয়ে থাকতেন। দেখাতেন উর্মিকে বড্ড আদরে রাখেন তিনি। একদিন দেখলাম জ্বলন্ত খুন্তি উর্মির হাতের উপরে ছ্যাঁকা দিচ্ছেন। উর্মি মুখে হাত চেপে আর্তনাদ বন্ধ করছে।”

একটু শ্বাস নিয়ে বলল,

“উর্মির সাথে তার সমস্যা ছিল অনাথ, গরীব ঘরের মেয়ে এজন্য ওকে সহ্য করতে পারত না। নিজের পছন্দের মেয়ের সাথে ইমতিয়াজের বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু উর্মি আসায় সবকিছু লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। উর্মি যে অনাথ এটা জেনেছে উর্মির ওই দুঃসম্পর্কের আত্মীয়ের মাধ্যমে। তিনি উর্মির এত ভালো জায়গায় বিয়ে হয়েছে শুনে গিয়েছিল দেখতে। তবে থেকেই শুরু ওর উপরে অমানুষিক নির্যাতন। ওর একটাই দোষ সে এতিম। আমিও সব যোগাযোগ ছিন্ন করে ফেলেছিলাম দেখে আরও চড়াও হয়েছিল। সেদিন খুন্তি ছ্যাঁকা দিয়েছিল ওর নামে যেন আমি আমার জায়গা সম্পত্তি অর্ধেক লিখে দেই এটা বলতে বলেছিল। কিন্তু উর্মি নাকচ করায় ক্ষেপে যান তিনি। হাতের কাছে কিছু না পেয়ে খুন্তির ছ্যাঁকা দিয়ে বসেন। আমি সেই দৃশ্য সহ্য করতে পারিনি। তৎক্ষনাৎ গিয়ে উর্মিকে ছাড়িয়ে জড়িয়ে ধরে রক্তচক্ষু নিক্ষেপ করে ওনাকে নানা কথা বলি। তিনি রাগে চেঁচিয়ে উর্মি আর আমাকে…”

এ পর্যায়ে ভাইপার থেমে যান। গ্লাসের পানি ঢকঢক করে পান করেন। সকলে উন্মুখ হয়ে তার দিকে চেয়ে। মুনতাজিরের চোখে তীব্র বিস্ময় ও কৌতূহল। ভাইপার নিজেকে সামলে বলতে লাগল,

“উর্মি আর আমাকে জড়িয়ে নানা নোংরা নোংরা কথা রটাতে থাকে। আমাদের নাকি অবৈধ সম্পর্ক আছে এরকম আরও জঘন্য জঘন্য কথা। তবে এতকিছু হওয়ার পরেও ইমতিয়াজ উর্মিকে কখনো অবিশ্বাস করেনি। কিন্তু মায়ের মুখের উপর প্রতিবাদও করেনি। উর্মির চোখের অশ্রু, চরিত্রহীন অপবাদ, আমাকে জড়িয়ে ওকে অপমান নিজের মনের গুপ্ত ক্রোধ আকারে বেরিয়ে এল। সকলের অগোচরে আমি উর্মির শাশুড়িকে সিঁড়ি দিয়ে ধাক্কা দিয়ে মেরে ফেলি। রাগে ক্ষোভে আমার উপরে সেদিন অদৃশ্য শক্তি ভর করেছিল।

ইমতিয়াজ দ্রুত এসে মায়ের রক্তাক্ত দেহটা আগলে ধরে। আমি ইতোমধ্যে সেখান থেকে কেটে পড়েছি। উর্মি এসে শাশুড়ির রক্তাক্ত দেহের পাশে ইমতিয়াজ ভুঁইয়াকে দেখতে পেতেই তার বদ্ধমূল ধারণা হয়ে যায় খুনটা ইমতিয়াজ করেছে। কারণ রাতেই নাকি উর্মিকে বলছিল মায়ের একটা কঠোর বিচার সে করবে। এরপর ইমতিয়াজ কিছুতেই আর উর্মিকে বিশ্বাস করাতে পারেনি এই কাজ তার না। উর্মির মস্তিষ্ক সেটা অটো সেট হয়ে গিয়েছিল। এসব ঘটনা উর্মিকে মানসিক ভাবে আরও ভেঙে দিয়েছিল। ও অকারণে খিটখিট করতো, মেজাজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলত। উন্মাদের মতো করতো। অনেক কিছুই ভুলে যেত তবে শাশুড়ির মৃত্যুটা কিছুতেই সে ভুলতে পারেনি। রক্ত দেখলেই ভয়ে কেঁপে উঠতো। শাশুড়ির মৃত্যুর পর উর্মি একেবারেই উদ্ভট আচরণ করা শুরু করল। ওকে সাইকিয়াট্রিস্ট দেখানো হলো। একটু সুস্থ হলেও পরিপূর্ণ সুস্থ হতে সময় লেগেছিল কয়েক বছর। অন্যদিকে ইমতিয়াজের ধারণা ওর মায়ের দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু হয়েছে। এখন পর্যন্ত সে এটাই জানে।”

এটুকু বলে থামল ভাইপার। মুনতাজির, রুবানা কি রিয়েকশন দিবে সেটাই ভুলে গেছে। এত এত অজানা কথা লুকায়িত আছে তারা জানেও না। ভাইপার থেমে থেমে বলতে লাগল,

“ওর শাশুড়ির মৃত্যুর পর শ্বশুর বছর কয়েক বেঁচেছিলেন। এ কয়েকটা বছর উনি উর্মিকে ভীষণ আদর করেছেন। তার নিজের মেয়ের মতোই আগলে রাখতেন। তার দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে যাওয়ায় উর্মিকেই মেয়ে মনে করতেন। শ্বশুর মারা যাওয়ার পরে উর্মি আবারও মানসিক ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে। চিকিৎসা করিয়ে মোটামুটি সুস্থ করানো হয়। তবে এখনো সে ইমতিয়াজকে খুনি হিসেবে আখ্যায়িত করে। ইমতিয়াজ প্রথম প্রথম নিজের পক্ষে সাফাই গাইলেও এখন আর নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করেনা। তোমার মায়ের সমস্ত পাগলামীকে সায় দেয়। কারণ উর্মির অসুস্থতার পিছনে তার মায়ের অত্যাচার, মানসিক নির্যাতন ছিল বলে সে বিশ্বাস করে। আর এটা ওর মাথায় আমিই ঢুকিয়ে দেই।”

সাইফার এতক্ষণ একটা টুশব্দ না করে সিগারেট টানছিল। তার চারপাশ ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে। এবার মুখ খুলল,

“আপনি আর কার মাথায় কি ঢুকিয়েছেন এসব দ্রুত শেষ করে আপনার সাথে আমার লেনাদেনা কি তাই বলুন। আপনার পরিবারের কাহিনী শুনতে বসিনি এখানে। আমার সাথে আপনার সমস্যা কি? আমি বাসায় যাব। মাথা ব্যথা করছে। এত বকবক শুনতে পারিনা। আমার সাথে সমস্যাটা বলুন। তারপর নিজেদের কেচ্ছা নিজেরা খতম করুন। এর আগে আমাকে বিদায় করুন। একটু শুনে যাই আপনার কোথায় আমি হাত দিয়েছিলাম।”

ভাইপার হাসল কেবল। বলল,

“তোমার সাথে আমার সমস্যা কোনো সমস্যা নেই বলছ? আমি ব্যক্তি মানুষটা সাধু হলেও অন্যায়ের দুনিয়ায় আমিই রাজা, হিংস্র থেকে হিংস্রতর।”

সাইফার ভ্রু কুঁচকে তাকালো। ভাইপার আবার বলল,

“আমার প্রত্যেকটা কাজ যখন সে একে একে নষ্ট করে দিচ্ছিলে তখন থেকেই আমার অদৃশ্য ক্ষোভ ছিল তোমাদের পুরো পরিবারের উপর। অবশ্য আমার দুর্বল জায়গায় যারা হাত দেয় তাদেরকে আমি বাঁচিয়ে রাখিনা এমনিতেও।”

বলেই কুটিল হাসল। সাইফার এগিয়ে এসে দুপায়ে ভর দিয়ে বলল,

“সে তো আপনাকে দেখেই মনে হয় আপনি সাইকো। নতুন করে প্রমাণ করার কিছু নেই। যাইহোক আপনার কেচ্ছা শেষ হয়েছে?”

ভাইপার কিছু বলল না। সাইফার উঠে দাঁড়িয়ে কোটের পকেটে দু’হাত ঢুকিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বলল,

“আমি বলি। মিস্টার রাসেল ভাইপার মিসটেক ব্ল্যাক ভাইপার সাহেব আমাকে অপছন্দ করতেন তার ভাগ্নের বন্ধু থাকাকালীন। ভাগ্নের সঙ্গে আমার গভীর বন্ধুত্ব তিনি মানতে পারতেন না। তবে শত্রুতা এবং তীব্র ঘৃণা করা শুরু করেন মূলত তার সমস্ত অন্যায়ের প্রমাণ আমার কাছে চলে এসেছিল এজন্য। ড্রাগ সাপ্লাই, মাদক ব্যবসা, অর্গান পাচার, অন্য বিদেশি ক্লায়েন্টদের কাছে অবৈধভাবে অস্ত্র আনা নেয়া সবই আমি জেনে গিয়েছিলাম। যদিও আমি তখন জানতাম না ব্ল্যাক ভাইপারই উমায়ের ভুঁইয়া। উনি আমাকে ঠিকই সিক্রেট এজেন্ট হিসেবে চিনতো। সেই থেকে নিজের ভাগ্নের সঙ্গে আমার জানে জিগার টাইপ দোস্তি তিনি একেবারেই সহ্য করতে পারতেন না। এজন্য একটা বিশ্রী পরিকল্পনা করে আমাদের মধ্যে ফাটল ধরিয়েছিলেন তিনি। এতক্ষণ ওনার মুখ থেকে বিভিন্ন ঘটনাবলী শুনে এতটুকু নিশ্চয়ই ধারণা হয়েছে উনি ওনার পছন্দের মানুষদের অন্য কারো সাথে সহ্য করতে পারেন না। আমার সমূহ ধারণা উনি সাইকো টাইপ মানুষ।

আমাদের এত বছরের বন্ধুত্বে আমি কোনোদিন চেয়্যারম্যান বাড়িতে পা অবধি রাখিনি। কারণ আমি ধনীদের তেমন পছন্দ করিনা। তারা অহংকারী স্বভাবের হয়ে থাকে। কিন্তু মুনতাজির বন্ধু হিসেবে মন জয় করে নিয়েছিল। অবশ্য এফোর্টটা সেই বেশি দিয়েছিল। আমি চুপচাপ ছিলাম বিধায় অনেকেই মিশত না আমার সঙ্গে। তাদের টাইপের আমি ছিলাম না কিন্তু ঐ একমাত্র আমাকে ওর বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেছিল। আস্তে আস্তে বন্ধুত্ব গাঢ় হয়। সে মাঝে মধ্যে চেয়ারম্যান বাড়িতে এলে ভাগ্নের সঙ্গে আমার দোস্তির কথা সবই শুনতেন তিনি। মনে মনে রুষ্ট হলেও প্রকাশ করতেন না। যখন উভয়ই গোয়েন্দা সংস্থায় যোগদান করি উনি জানতে পারেননি। তবে একদিন ঠিকই কানে চলে যায়। যেটা ইমতিয়াজ ভুঁইয়ার মাধ্যমে জানতে পারেন।”

সাইফার থামল খানিকটা। তারপর আবারও পায়চারি করতে করতে বলল,

“ইমতিয়াজ ভুঁইয়া ছিল তার টোপ। যে টোপ দিয়ে তিনি আমাদের সকল গতিবিধি নজরে রাখতেন। ইমতিয়াজ ভুঁইয়া তার টোপ গিলেছিলেন। তার মস্তিষ্কে আমার প্রতি তীব্র বিষ ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছিল। তিনি আমাকে এমনিতেও অপছন্দ করতেন ছেলের কম্পিটিটর ভেবে। সেটাই মূলত কাজে লাগিয়েছেন মিস্টার ভাইপার। যেদিন ইমতিয়াজ ভুঁইয়া ভরা মজলিসে আমাকে চোর বলে অপদস্ত করল সেটা ছিল এই ভাইপারের শিখিয়ে দেয়া মুখস্ত বুলি। মোটকথা একটা মানুষকে কথার দ্বারা হ্যালুসিনেট ও ম্যানুপুলেট করার ক্ষমতা ভাইপারের ছিল। তিনি খুব সহজেই মানুষকে প্রভাবিত করতে পারতেন। ভাইপার নামের মতোই তার কার্যকলাপ ছিল। মনুষ্য মস্তিষ্কে তীব্র বিষাক্ত বিষ ছড়াতে তিনি পারদর্শী ছিলেন।

উর্মি ভুঁইয়া এবং ইমতিয়াজ ভুঁইয়া উভয়ই ছিল তার গুটি। উভয়কে সে সেভাবেই পরিচালিত করত যেমনটা সে চাইত। যেহেতু উর্মি ভুঁইয়ার ডিল্যুশনাল ডিজঅর্ডার ও ডিমেনশিয়া ছিল তাই তিনি বাস্তব ও অবাস্তবের মধ্যে পার্থক্য করতে পারতেন না। ডিল্যুশনাল ডিজঅর্ডারের কারণে তিনি ভ্রান্ত বিশ্বাস করতেন যে ইমতিয়াজ ভুঁইয়া খুনি। অন্যরা তার ক্ষতি করতে চায়। এসব সূক্ষ্মভাবে তার মস্তিষ্কে সেট করে দিয়েছিল মিস্টার ভাইপার। তাছাড়া তিনি একই সাথে প্যারানয়েড সাইকোসিস রোগেও ভুগছিলেন। যার দরুন তিনি মনে করতেন তাকে কেউ হত্যা করতে চায়, খাবারে বিষ মিশিয়ে মেরে ফেলতে চায় ইত্যাদি অহেতুক সন্দেহ।”

কথাটা শেষ করে রুবানার দিকে চাইল। রুবানা স্যারের ইশারা বুঝতে পেরে সকলের সম্মুখে কিছু মেডিকেল রিপোর্ট টেবিলের উপরে রাখল। এই রিপোর্ট উর্মি ভুঁইয়ার ফিজিক্যাল ও মেন্টাল হেলথ কন্ডিশন সবই উল্লেখিত আছে। যেটা রুবানা একটু একটু করে সংগ্রহ করেছে। নেওয়াজ রিপোর্টটা মনোযোগ সহকারে পড়ে শোনালো। সাইফার টেবিলে দু’হাত ঠেকিয়ে বলল,

“দ্যা মোস্ট ইমপরট্যান্ট থিং, কয়েকদিন ধরে উর্মি ভুঁইয়ার আক্রমনাত্মক, সন্দেহপ্রবণতা বেড়ে যাওয়ার পেছনে বড় ভূমিকা পালন করছিলেন সম্মানিত ভাইপার সাহেব। তার রিয়েল মেডিসিন বদলে ভুল মেডিসিন ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন তাও সকলের অগচরে বাট বাট..”

সাইফার ভাইপারের দিকে বাঁকা হেঁসে বলল,

“বাট তিনি এবার আর সকলের চোখকে ফাঁকি দিতে পারেননি। তিনি হয়তোবা জানেন না মানহাকে ঐ বাড়িতে এমনি এমনি আমি পাঠাইনি। বোনের সমস্ত নিরাপত্তা দিয়েই পাঠিয়েছি। মুনতাজিরকে বাড়ির আনাচে কানাচে গোপন ক্যামেরা ফিট করতে বলেছিলাম। মানহার সমস্ত গতিবিধি মুনতাজিরকে নজরে রাখতে বলি। সবকিছু জেনে মিস্টার ভাইপার সর্বপ্রথম যে মানহাকে টার্গেট করবেন সে আমি খুব ভালোভাবেই জানতাম। উর্মি ভুঁইয়াকে ব্যবহার করে খুব সহজে মানহার চোখে ভিলেন বানাতে চেয়েছিলেন উনি। ভুলটা তিনি সেবারই করলেন। অতি চালাকের গলায় দড়ি একদিন ঠিকই পড়ে। টুড্যে অর টুমোরো। ফলাফল স্বরূপ গত কয়েকমাসের সমস্ত কাহিনী তো আপনারা জানেনই।”

কথা শেষ করে বড় একটা নিঃশ্বাস ফেলল সাইফার। ভাইপারের সামনের চেয়ারে পায়ের উপর পা তুলে বসে বলল,

“এবার আপনাদের কোনো কনফিউশন থাকলে করতে পারেন মিস্টার রাসেল আই মিন ব্ল্যাক ভাইপার।”

কথাটা রসিকতার সহিত বলল সাইফার। ভাইপারের চোখ মুখ বিকৃত হয়ে আছে। বোঝাই যাচ্ছে রাগে শরীর কাঁপছে তার। নিজেকে সামলে গুরুগম্ভীর কণ্ঠে শুধালেন,

“আমি শুধু জানতে চাই তোমরা দুজন এক হয়েছ কবে? তোমার দেশদ্রোহিতার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হওয়ার কথা ছিল তবে তুমি ছাড়া পেলে কিভাবে? শুনেছিলাম তোমার চাচা তোমাকে ছড়িয়েছিল কিন্তু আজীবনের জন্য চাকরিচ্যুত হয়েছিলে তবে কিভাবে আবার এই পেশায় এলে? আর বিশ্বাসঘাতককে মাফ করা এতই সোজা?”

সাইফার ঠোঁট এলিয়ে হাসল। যেন জানত এই প্রশ্নটাই তাকে করা হবে। আরেকটা সিগারেট ঠোঁটে নিয়ে লাইটার দিয়ে আগুন ধরিয়ে লম্বা টান দিল। মুখ দিয়ে ধোঁয়া ছাড়িয়ে বলল,

“জেলে যাওয়ার তিন মাসের মাথায় হঠাৎ একদিন নোটিশ আসে আমাকে খালাস দেয়া হয়েছে। অবাক হয়েছিলাম। ততদিনে বন্ধুত্ব শব্দটা আমার কাছে বিষতুল্য। ছাড়া পেতেই একদম নির্লিপ্ত হয়ে যাই। সবার সঙ্গে মেশা বন্ধ করে দেই। নিজের মর্জি মাফিক চলতে শুরু করি। কাজের প্রতি অমনোযোগী হয়ে পড়ি। শুয়ে বসে দিনাতিপাত করতে থাকি। সকলের কাছে ভবঘুরে হিসেবে পরিচিতি লাভ করি। ভাদাইম্মা, বেকার, ভবঘুরে, পাগল আরও নানা উপাধি আশেপাশের মানুষ থেকে অর্জন করি। এসব কথা আমার গায়ে লাগত না। নিজের জীবন নিয়ে আমার আর কোনো চাওয়া পাওয়া, এক্সপেক্টেশন কিছুই ছিল না। মানুষকে বিরক্ত লাগতো। একা থাকতে ভালো লাগতো।

সেই ঘটনার প্রায় বছর খানেক পর চাচ্চু ডাকলেন তার বাসায়। সেসময় বেশ অবাধ্য হয়ে পড়েছিলাম। কারো কোনো কথা গ্রাহ্য করতাম না, শুনতামও না। তবে তার ডাকে সাড়া না দিয়ে পারিনি। তাকে আইডল ভাবি নিজের সেজন্যই বোধহয়। গিয়ে দেখি তার সঙ্গে মুনতাজিরও আছে। বিরক্তি ও ঘৃণায় মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিলাম। ঐ মুখটা সহ্য করতে পারতাম না। অতীতের বিশ্বাসঘাতকতা মাথা চাড়া দিয়ে উঠতো। মুখ কুঁচকে এক দলা থুতু নিক্ষেপ করেছিলাম ওর সম্মুখে। ওর চোখে মুখে অসহায়ত্ব, কষ্ট ফুটে উঠেছিল তবে আমি সেসবে পরোয়া করিনি, গলেও যাইনি। কেবল ঘৃণাই হতো ওকে দেখে। চাচ্চু তার পাশে বসিয়ে সেদিন মুনতাজিরের আত্মত্যাগ সম্পর্কে বিস্তারিত খুলে বলেছিলেন।”

সাইফার সিগারেট মুখে নিয়ে মুনতাজিরের দিকে চাইল। মুনতাজির এবার বলতে শুরু করল,

“ওকে মানানো অতটা সহজ ছিল না। ওর চাচ্চুর সহায়তায় সাইফারের দেশদ্রোহিতার সমস্ত এভিডেন্সের সত্যতা যাচাই করা হয়েছিল। আমিই সেসব বের করেছিলাম। এজেন্ট তাহমিদের সাইফারের মুখোশ পড়া জালিয়াতি, ফেইক রেকর্ড, কণ্ঠ নকল সমস্ত প্রমাণ আদালতে পেশ করেছিলাম। আপনাদের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, এসব আমি কোথায় পেয়েছিলাম? আমার মামাই যে আসল কালপ্রিট এটাও কি আমি জানতাম? উত্তর হলো না। এসব তথ্য আমি ব্ল্যাক ভাইপারের সহচর অর্থাৎ এজেন্ট তাহমিদের থেকে আদায় করেছিলাম। সেটাও ভাইপারের অগচরে। এমনভাবে অভিনয় করেছিলাম যে তাহমিদ বিশ্বাস করতে বাধ্য হয়েছিল যে আমি আসলেই সাইফারের শত্রু। তার মাধ্যমে এসব জালিয়াতির বিভিন্ন তথ্য কালেক্ট করেছিলাম। সেসময় এজেন্ট তাহমিদের সঙ্গে আমার ভালোই বন্ডিং তৈরি হয়ে গিয়েছিল। তাই সে আমায় বিশ্বাস করে সমস্ত কিছু বলতে দ্বিধাবোধ করেনি। তবে বিশ্বাসভাজন হওয়াটা সহজ ছিল না। বহু চড়াই উৎরাই পেরিয়ে, কসরৎ করে সেই জায়গাটায় পৌঁছেছিলাম। তাদের দেখাতাম আমি সাইফারের জাত শত্রু, ওকে সহ্যও করতে পারিনা অথচ ভেতরে ছিল ভিন্ন রূপ। তখন বন্ধুত্বের কাছে অন্যসব কিছু ফিঁকে ছিল। বিশ্বাসঘাতকতার বিপরীতে বিশ্বাসঘাতকতাই ছিল তাদের মোক্ষম জবাব।

মুনতাজির থামতেই ব্ল্যাক ভাইপার কষে চড় বসালেন এজেন্ট তাহমিদের গালে। থাপ্পড়ের তীব্রতা এতই ছিল যে তাহমিদ চেয়ার থেকে ছিটকে গিয়ে পড়ল। ব্ল্যাক ভাইপারের হাতের মুঠো শক্ত হয়ে গেল রাগে। তার অগচরে এতবড় গাদ্দারী! তাহমিদ হাত মুষ্ঠিবদ্ধ করে নিজের ক্রোধকে দমন করল। মুনতাজির সেসবে পাত্তা না দিয়ে আবারও বলতে শুরু করল,

“এই সমস্ত প্ল্যান ছিল সাইফারের চাচ্চুর। আমি নিজেও সাইফারকে অবিশ্বাস করেছিলাম শুরুতে। তবে চাচ্চুর বদৌলতে সেই ধারণা আমার ভাঙে। যখন ভেতরে ভেতরে বন্ধু বিয়োগে গুমরে মরছিলাম তখন তিনি পথ দেখান আমাকে। অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মানুষ ছিলেন। যদিও আমাদের থেকে তার বয়সের পার্থক্য খুব বেশি ছিল না। সাইফারের থেকে মাত্র তেরো বছরের বড় ছিলেন তিনি। সাইফার ছোট থেকে তাকে অনুসরণ করতো। এই গোয়েন্দা হবার ভূত তিনিই ওর মাথায় ঢোকান। এজন্য তিনি বাড়ি ছাড়াও হয়েছিলেন। সাইফারের এমন দুর্দশার পিছনে ওর চাচার সম্পূর্ণ হাত আছে বলে মাহাবুব আংকেল বিশ্বাস করতেন। তাই নিজের ছোট ভাইয়ের সঙ্গে ছেলেকে মিশতে দিতেন না। ছোট থেকেই তিনি হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা শেষ করেন। এরপর গোয়েন্দা বিভাগে যোগদান করেন। মাহাবুব আংকেল ভাইয়ের কাজে অসন্তুষ্ট হয়ে তার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। কিন্তু তার সঙ্গে সাইফারের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল।

সাইফারের চাচা বাড়িতে মাঝেমধ্যে যেতেন। সেবার আমিই তার সঙ্গে যোগাযোগ করে বন্ধুত্বের এই বেহাল দশার কথা জানাই। তারপর তিনি সাইফারকে ডেকে সমস্ত কিছু খুলে বলেন। সাইফারের মন খানিক নরম হলেও পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারেনি আমায়। আস্তে ধীরে সম্পর্কটা স্বাভাবিক হতে শুরু করে। চাচ্চু পরিকল্পনা করেন কিভাবে উমায়ের ভুঁইয়া ওরফে ব্ল্যাক ভাইপারকে বশে আনা যাবে। এমন পরিকল্পনা করলেন যেন কৈয়ের তেলে কৈ ভাজা হয়ে যায়।”

নেওয়াজ বলল,

“কিন্তু এজেন্ট তাহমিদের এতবড় জালিয়াতি, মিথ্যাচারের সত্ত্বেও তার কোনো শাস্তি হয়নি কেন?”

মুনতাজির মুচকি হেসে বলল,

“সেটার পিছনেও হাত ছিল চাচ্চুর। কারণ এজেন্ট তাহমিদের তথ্য ফাঁস হলেই তো শত্রু তার লক্ষ্য পরিবর্তন করে ফেলতো। কোনোদিন তাকে ধরা যেত না। চাচ্চু সেজন্য ডিপার্টমেন্ট থেকে সময় চেয়ে নিয়েছিল। সময় হলে রাঘব বোয়ালসহ সবাইকে ধরিয়ে দেয়া হবে এখন চুনোপুটি ধরে হাত ময়লা করার প্রয়োজন নেই। তবে সাইফারকে আজীবন বহিষ্কার করার আদেশ পাল্টে চার বছরের জন্য সাসপেন্ড করার নির্দেশ আদালত থেকেই দেয়া হয়। যেটা গোয়েন্দা ডিপার্টমেন্ট প্রচার করেছিল আজীবনের জন্য বহিষ্কৃত করা হয়েছে আজারাক সাইফারকে। মোটকথা শত্রুপক্ষকে দেখানো হয়েছিল সাইফারের মেরুদন্ড ভেঙে দেয়া হয়েছে। তাই এজেন্ট তাহমিদ কিংবা ব্ল্যাক ভাইপার কেউই বুঝতে পারেনি এই সমস্ত কিছু পরিকল্পনা মাফিক হয়েছিল।”

নেওয়াজ মাথা নাড়িয়ে বলল,

“কিন্তু আমার আরেকটা প্রশ্ন, এজেন্ট তাহমিদ যে এইসমস্ত কাজের সাথে যুক্ত ছিল সেটা কিভাবে জেনেছিলেন?”

মুনতাজির বড় নিঃশ্বাস ফেলে বলল,

“এটা জেনেছিলাম এজেন্ট তাহমিদের ডেস্কের একটা ফাইল থেকে। যেটায় আজারাক সাইফার নামের উপরে ক্রস চিহ্ন দেয়া ছিল। সন্দেহ আরও তীব্র হয় সাইফারকে সাসপেন্ড করা হয় যেদিন সেদিনের তারিখ উল্লেখ করে মিশন সাক্সিড লেখা ছিল পাশে। সম্ভবত ভুলে সেদিন এটি গোয়েন্দা সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ ফাইল গুলোর সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন তিনি। ব্যাস সেদিনের পরেই পরিকল্পনা করে তার আস্থাভাজন হয়ে সমস্ত তথ্য কালেক্ট করলাম। তাকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলাম। ডিপার্টমেন্টও তাকে ভরসা করতে অনাগ্রহী ছিল। তার কারণে গুরুত্বপুর্ণ এবং মেধাবী একজন গোয়েন্দা চার বছরের জন্য সাসপেন্ড হয় এটা হেড মানতে নারাজ ছিলেন। একটা ক্ষোভ তৈরি হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু চাচ্চুর জন্য পরিকল্পনা অন্যদিকে মোড় নেয়। সেই থেকে এজেন্ট তাহমিদ SAD ডিপার্টমেন্টে কাজ করে আর আমি হস্তান্তর হয়ে IMF ডিপার্টমেন্টে আসি।”

সাইফার সিগারেট শেষ করে পায়ের উপর পা তুলে বলল,

“আমার মৃত্যুদণ্ড না হয়ে আজীবনের জন্য বহিষ্কার হয় এটা ভাইপার সাহেব মানতে নারাজ ছিলেন। আমাকে নজরে রাখতে মিস্টার ভাইপার সাহেবের কত আয়োজন ছিল। ট্র্যাকার, সিসি ক্যামেরা, ছদ্মবেশী দ্বারা সর্বক্ষণ নজরে রাখতে শুরু করে। আমি আসলেই কাজ করি কিনা তা সম্পর্কে নিশ্চয়তা পেতে চাচ্ছিলেন। আমার ঘরে হিডেন মাইক্রোফোনও ছিল যেটা আমার স্ত্রীর ব্যাগে খুব সূক্ষ্মভাবে সেট করে দেয়া হয়েছিল। যেহেতু আমি প্রতিদিন পুরো ঘর একবার হলেও সার্চ করতাম সেদিনও করতে গিয়ে এসব পাই। তীক্ষ্ম মস্তিষ্কে ঐদিনই সবটা ধরে ফেলি। তবে কাউকেই সেটা বুঝতে দেইনি। সেই মাইক্রোফোনের মাধ্যমে সে আমার ঘরের সমস্ত ঝগড়া, কূটক্যাচাল শোনেন তাই না মিস্টার ভাইপার? নিজের সংসারে অ্যাপ্লাই করেছেন কখনো সেসব?”

সাইফারের খোঁচায় ভাইপার থতমত খেয়ে গেল। এভাবে তার সমস্ত পরিকল্পনা ভেস্তে যাবে তিনি বুঝতেও পারেননি। সাইফার আবারও বলতে শুরু করল,

“আমার স্ত্রীর অফিস কলিগ নাজমা নামের মহিলাটি ও তার স্বামী এই লোকের গোপনীয় লোক। প্রতিনিয়ত আমার সম্পর্কে নেগেটিভ কথা বলে আমার স্ত্রীর মন আমার প্রতি বিষিয়ে দিচ্ছিল ভাগ্যিস সে ঐ ফাঁদে পা দেয়নি নয়তো আমার সংসার ভাঙতো বহু আগে। হাসপাতালে মুনতাজির ভর্তি হয়েছিল সেটাও কিন্তু এই লোকের কারণেই।”

সকলে হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। বিশেষ করে মুনতাজির জায়েদ। বিস্মিত গলায় বলল,

“মানে? সেটা তো একটা অ্যাকসিডেন্ট ছিল। আর বাদবাকি সবকিছু অভিনয় ছিল।”

সাইফার চেয়ারের হাতলে দুই হাত রেখে ঊর্ধ্বমুখী চেয়ে বলল,

“উহু মানহাকে সবকিছুতে ডিফেন্ড করতি বলে তোকে সন্দেহ করা শুরু করেছিল। পরিকল্পনা করে গাড়ির ধাক্কায় পা ভেঙে দিয়েছিল। আমি হলে মেরে ফেলতো শুধু তুই বলে হালকা শাস্তি দিয়ে ছেড়ে দিয়েছিল। হিডেন মাইক্রোফোনের সাহায্যে তোর সঙ্গে আমার খারাপ ব্যবহার সবই শুনেছিল। আসলে দেখতে চেয়েছিল তোর প্রতি আমার ভালবাসা, বিশ্বাস এখনো আগের মতো আছে কিনা। হাসপাতালে তোকে এজন্যই অভিনয় করতে বলেছিলাম। সেখানেও তার গুপ্ত সহচর ছিল। নাম গার্বেজ ওরফে পারভেজ। যে ঠ্যাং ভাঙা মজনু রূপে আমাদের প্রত্যেকটা পদক্ষেপের নজর রাখছিল। মানহাকে কষিয়ে চড় মারার অংশটাও তার স্ত্রী সেজে থাকা মহিলাটা লুকিয়ে ক্যাপচার করেছিল। তুই তো তোর মামার এতসব লুকায়িত রূপ সম্পর্কে দুদিন আগেও জানতি না তবে আমি আর চাচ্চু সবই জানতাম। সেই বিশ্বাসঘাতকতার পর আমার তোকে বিশ্বাস করতে কষ্ট হতো। মনে হতো তুই অভিনয় করছিস। তোর মামাই তোকে আমার সাথে ভাব জমাতে ব্যবহার করছে। কিন্তু সেদিনের ঘটনার পর আমার ধারণা পুরোপুরি পাল্টে গেল। তুইও যে এই লোকের স্রেফ একটা দাবার গুটি বুঝে গিয়েছিলাম।”

সাইফার একটু থেমে আবার বলতে লাগল,

“কিলার জাদ ওরফে আমজাদ পাঠান ছিল এই লোকের ডান হাত। সমস্ত অপকর্ম, কুকর্ম কিলার জাদকে দিয়েই করাতো সে। জানোয়ারটা আমার বোনকে বিয়ে করতে উঠে পড়ে লাগে। সেসময় তুই মানহার ঢাল হয়েছিলি নয়তো ঐ বাস্টার্ড মানহাকে ভালোভাবে বাঁচতে দিতো না। গ্রামে বাবাকে থ্রেট দেয়া, ভাইদের অত্যাচার করা সবই আমার কানে পৌঁছেছিল। সেসময় আমাদের পরিবারে তুই ঢাল না হলে আমার পরিবারকে বোধহয় হারিয়ে ফেলতাম। এজন্য তোকে বোনের জামাই হিসেবে প্রথমে মানতে নারাজ হলেও বাবা সেদিন ডেকে নিয়ে চুপিচুপি সমস্ত কিছু খুলে বলায় আর আপত্তি করিনি। তোর কাছেই মানহার সুরক্ষা কবচ তুলে দিয়েছিলাম। আমার কিংবা আমার পরিবারের জন্য সে ও তার সহযোগীরা ত্রাস হিসেবে ভূমিকা পালন করল। দুই বছর ধরে গোয়েন্দা সংস্থায় বিভিন্ন ক্রিমিনালের তথ্য সাপ্লাই করা শুরু করি তবে অফিসিয়ালি সাসপেন্ড মেয়াদ শেষ হয় কিছুদিন আগে। চার বছরে একটু একটু পরিকল্পনা করেছি। এবার গোয়েন্দা সংস্থায় যোগদান করে সর্বপ্রথম কিলার জাদকে ধরি। আবারও ক্ষেপে ওঠেন মিস্টার ব্ল্যাক ভাইপার। তার কৃতকর্মের সবকিছু আমার কাছে সুরক্ষিত আছে বিধায় তার সম্রাজ্য বাঁচাতে উঠে পড়ে লাগেন আমাকে নিশ্চিহ্ন করতে।

এরপর থেকে প্রতিটা মুহূর্ত অপেক্ষা করেছি কবে মিস্টার ভাইপারকে পাকড়াও করব। এজন্য কত পরিকল্পনা করেছি, ভিন্ন সত্তায় নিজেকে উপস্থাপিত করেছি। নিজের সন্তানকে পর্যন্ত আমি ব্যবহার করেছি। এতটাই ধূর্ত ছিল এই লোক। যাকে ধরা, ছোঁয়া যেত না। ঠাণ্ডা মাথায় চাচ্চু আর আমি পরিকল্পনা করি। তবে আমার সন্তান ও সন্তানের মা হয় এবার ভুক্তভোগী। ভাইপার ভেবেছিল আমার সন্তানের মাধ্যমে আমাকে ধরে এনে নিশ্চিহ্ন করে দেবে। কিন্তু সে ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি এসব আমার পরিকল্পনার অংশ ছিল। বাপেরও যে বাপ আছে সেটা সে কোনোদিনও কল্পনা করেনি।”

কথা শেষ করতেই সাইফারের চোখ মুখ লাল হয়ে উঠলো। ভাইপার কপালে হাত ঠেকিয়ে পরাজিত ভঙ্গিতে খুব ধীর গলায় শুধালো,

“তোমার চাচার নাম কী?”

“মার্ভ জেন।”

মুনতাজির শান্ত গলায় বলল। মার্ভ জেন হাসিমুখে উপস্থিত হলো। ভাইপার দেখে অবাক হয়ে বলল,

“তুমি তো সেই যে আমাকে সাইফার ও তার পরিবারের সমস্ত মুভমেন্টের তথ্য এনে দিতে। তোমার নাম হাবিব আকরাম না?”

মার্ভ জেন হাসিমুখে জবাব দিল,

“জ্বি স্যার আমিই সেই। “

ব্ল্যাক ভাইপার তীব্র ক্রোধে ঝট করে দাঁড়িয়ে বলল,

“এতবড় গাদ্দারী, ছলনা, বিশ্বাসঘাতকতা!”

“জ্বি একেবারে আপনার মতো তাই না স্যাররর? ধোঁকা সবই ধোঁকাআ। আহারে আপনার জন্য বড্ড খারাপ লাগছে। এতবড় মাইনকার চিপায় কিভাবে পড়লেন ভাইপার সাপ থুক্কু সাব?”

মার্ভ জেন টেনে টেনে কথাটা বলল।

চলবে…

(আসসালামু আলাইকুম।)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply