Golpo romantic golpo ভবঘুরে সমরাঙ্গন

ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব (৫৬.১+৫৬.২)


ভবঘুরে_সমরাঙ্গন

পর্ব_৫৬.১

তাজরীন ফাতিহা

তিমির ফুরিয়ে ঊষাকালের ঘনঘটা। অরুণোদয়ের মিষ্টি সুবাস অনিলে ছড়াচ্ছে দিকবিদিক। মহান রবের প্রার্থনা শেষে মানহা বারান্দায় পাতা চেয়ারে আসন পেতেছে। দৃষ্টি তার প্রভাতের আলো ছায়াময় গগনে। ইদানিং শরীরের অবনতি দেখা দিয়েছে তার। খাবারে অরুচি, নিদ্রাহীন জীবন, সবকিছুর প্রতি তীব্র বিতৃষ্ণা, হুট করেই মেজাজের অনিয়ন্ত্রতা এবং মানসিক টানাপোড়ন। সবমিলিয়ে বেশ হাঁপিয়ে উঠেছে বিবাহ পরবর্তী জীবনে। ইদানিং বেশিরভাগ সময় নিজ রুমে বন্দী জীবনযাপন করছে সে। ইহাবের সঙ্গেও দুরুত্বের সৃষ্টি হয়েছে হাসপাতালের ঘটনার পর পরই। জরুরী আলাপ ছাড়া একটা টু শব্দও হয়না এই দাম্পত্যজীবনে। সেও প্রায় এক মাসের কাছাকাছি। তার কাছে মনে হচ্ছে সময় থমকে আছে। একটা কৃষ্ণবর্ণ গহ্বরে আটকে গেছে সে। একমাত্র তার অস্তিত্ব ব্যতীত সেখানে আর কেউ নেই।

আজ হুট করেই মানহার তার বিবাহের কথা স্মরণ হচ্ছে। এই বিয়ে করায় মোটেও আগ্রহী ছিল না সে। পিতা মাহাবুব আলম সেদিন তাকে ডেকে নিয়ে গিয়ে একান্তে শুধু একটা কথাই বলেছিলেন। সে কথাটা এখনো তার কানে বাজে। না এই বিয়ে করতে মাহাবুব আলম তাকে মোটেও জোর করেননি আর নাতো কোনো ব্ল্যাকমেইল করেছেন। তার সম্পূর্ণ মতামতেই বিয়েটা সেদিন হয়েছিল। বাবার প্রতি অগাধ বিশ্বাস ও শ্রদ্ধাতেই বোধহয় এই মতামত দিতে একটুও কার্পণ্য করেনি সে। কিন্তু মানহার একটা হিসেবে গড়মিল লেগেই যায়। বাবা বড় ভাইয়ের সম্পূর্ণ কাহিনী জেনেও এই লোকটাকে তার যোগ্য সঙ্গী ভাবলেন কি করে? যদিও মানহাকে যে অসুখী রেখেছে তা নয় তবুও শ্বশুর এবং জামাইয়ের এই সম্পর্ক স্থাপনে কি কারণ থাকতে পারে যা সকলের থেকে গুপ্ত?

মানহার মনে আছে, বিয়ের প্রথম রাতেই লোকটা তার স্বল্প ভাগ দেনমোহর শোধ করে দিয়েছিল। ঐ রাতে দেনমোহর পরিশোধের অভিনয় করে তাকে একেবারে অজ্ঞান করে ফেলেছিল লোকটা। সেদিন উপরে উপরে ভয়হীন দেখালেও ভিতরে ভিতরে একদম ভয়ে সিটিয়ে ছিল সে। বিয়ের দেনমোহর ধার্য করা হয়েছিল আট লক্ষ। বিয়ের রাতে দুই লক্ষ পরিশোধ করে তার মাস চারেক পরে বাকি ছয় লক্ষ পরিশোধ করে দিয়েছিল ইহাব। টাকাগুলো এখনো সযত্নে আলমারিতে তোলা আছে। সেখান থেকে মানহা এক টাকাও খরচা করেনি। মূলত খরচ করার প্রয়োজন পড়েনি। তার ভার্সিটির সমস্ত খরচ ইহাবই দেয়। আর টাকা খরচ করার মতো কোনো প্রয়োজন এখনো পড়েনি। বিয়ের পর পর উর্মি ভুঁইয়ার মতো শাশুড়িকে পেয়ে মানহা মহাখুশি হয়েছিল। সবকিছুতে মায়ের মতো আগলে রাখতেন অথচ সেই তারই ভয়ঙ্কর রূপের সাথে পরিচিত হয়ে সে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা খেয়েছিল। উর্মি ভুঁইয়ার এমন সীমাহীন পরিবর্তন তার মস্তিষ্ক এখনো ধারণ করতে সক্ষম হয়নি।

মানহার ভাবনা চিন্তার অন্ত ঘটলো চেয়ার টানার শব্দে। বুঝল তার পাশে চেয়ার এগিয়ে কেউ বসেছে। মানহা সেদিকে চাইল না। দৃষ্টি নিবদ্ধ তার অদূরের বৃক্ষরাজির কুঞ্জে। ইহাব বেশ কয়েকবার গলা খাঁকারি দিল। মানহা শেষে বিরক্ত হয়ে মুখ খুলল,

“কিছু বলার হলে বলুন, অহেতুক কানের কাছে খুচুরমুচুর করছেন কেন?”

ইহাব মানহার দিকে পূর্ণ দৃষ্টি দিয়ে শুধায়,

“ওহে প্রভাতরাগিণী, মন কেন বিষন্ন তোমার?”

মানহা এর কোনো জবাব দিল না। তাকে চুপ থাকতে দেখে ইহাব মলিন বদনে বলল,

“আজ ডাক্তারের কাছে নেব তোমায়। তৈরি থেকো।”

“কোথাও যেতে ইচ্ছে করছে না। যেদিন ভালো লাগবে সেদিন যাব।”

ইহাব দৃঢ় গলায় বলল,

“তোমার ভালো লাগেনা দেখেই নিতে চাইছি।”

মানহা এই কথারও জবাব দিল না। অদূরে চেয়ে রইল নির্মিশেষ। ইহাব মানহার বিরক্তিবোধ বুঝতে পেরে উঠে চলে যেতে নিলে মানহার কথায় থমকে দাঁড়াল।

“জানেন বিয়ের আগে বাবা আমাকে একান্তে কিছু কথা বলেছিলেন।”

ইহাব উল্টো ঘুরেই দাঁড়ানো। পিছনে ঘুরল না। মানহাও সামনে দৃষ্টি স্থির রেখেই বলে চলল,

“এরমধ্যে একটি ছিল, আপনি নাকি আমার যোগ্য জীবনসঙ্গী। কথাটা আমি একটুও বিশ্বাস করতে চাইনি তবে বাবাকে অবিশ্বাস করার ক্ষমতাও আমার ছিল না।”

এবার মানহা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে ইহাবের সামনে দাঁড়িয়ে চোখে চোখ রেখে বলল,

“বাস্তবিকই বাবার কথাটা একটুও মিথ্যা ছিল না। আপনি জীবনসঙ্গী হিসেবে নিখুঁত হলেও মানুষ হিসেবে জঘন্য ত্রুটিযুক্ত।”

বলেই মানহা রুমে চলে গেল। ইহাব ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইল অনিমেষ।


নাস্তার টেবিল বমি করে ভাসিয়ে ফেলেছে মানহা। খেতে খেতেই আচানক বমির উদ্গীরণ ঘটেছে। উর্মি ভুঁইয়া, ইমতিয়াজ ভুঁইয়া হুলস্থূল করে দাঁড়িয়ে গেলেন। মানহার পাশের চেয়ারেই ইহাবের শরীর মাখামাখি হয়ে আছে। সে কোনরকম নাক ও চোখ বন্ধ করে শক্ত হয়ে বসে আছে। উর্মি ভুঁইয়া চেঁচিয়ে বললেন,

“এই মেয়ে, তুমি দেখনি আমরা খাচ্ছি। বমি পেলে বেসিনে যেয়ে করতে পারতে। সকলের খাওয়া নষ্ট করলে কেন? দিনদিন একটা অসহ্যে পরিণত হচ্ছ। ইয়াক আমারও বমি পাচ্ছে। এখানে এক সেকেন্ড থাকলে আমিও সব বের করে দেব। রাবিশ!”

বলেই গটগট পায়ে উপরে চলে গেলেন তিনি। পিছুপিছু ইমতিয়াজ ভুঁইয়াও গেলেন। এখানে থাকা তার জন্যও পসিবল নয়। পুরো ডায়নিং রুম এখন ফাঁকা। সার্ভেন্টরা এসে টেবিল পরিষ্কারে লেগে পড়ল। মানহা পাথরের মতো নির্জীব ভঙ্গিতে বসে রইল। ইহাব কিছুই বলল না। ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে মানহাকে ধরতে নিলে মানহা একদম শক্ত হয়ে বসে থাকল। নড়ল না একবিন্দু। ইহাব রাগান্বিত স্বরে বলল,

“জিদ দেখালে এতগুলো সার্ভেন্টের সামনে কঠিন থাপ্পড় খাবে।”

কথা শেষ করে মানহাকে কাঁধে তুলে নিচের ওয়াশরুমে নিয়ে এল। যেখানে যেখানে বমি লেগেছে সব পানি দিয়ে পরিষ্কার করে দিল। মানহা বারবার বারণ করলেও তার নিষেধাজ্ঞা মানল না। নিজেকেও পরিষ্কার করে ফের আবার মানহাকে কাঁধে তুলে উপরে নিয়ে এল। মানহা অহেতুক চেঁচালেও বিশেষ ফায়দা হলো না। রুমে এনে ওয়াশরুমে নামিয়ে বলল,

“শরীর থেকে বমির গন্ধ আসছে, শাওয়ার নিয়ে ফেল।”

মানহা ত্যাড়ামি করে বলল,

“পরে করব।”

“ওকে।”

বলেই ইহাব রুম থেকে দুজনের জামাকাপড় এনে ওয়াশরুমের দরজা বন্ধ করে দিল। মানহা চিল্লিয়ে বলল,

“আপনি গোসল করলে করুন। আমাকে বের হতে দিন।”

“নোপ, আজকে একসঙ্গে অঙ্গধৌত হবে।”

মানহা চোখ রাঙিয়ে বলল,

“অশ্লীল কথা বলবেন না, বের হন বলছি।”

ইহাব মানহার কথা গ্রাহ্যই করল না। বাথটাবে পানি ভর্তি করতে লাগল। মানহা এই ফাঁকে বেরিয়ে যেতে নিলে ইহাব খপ করে তাকে ধরে ফেলল। মানহা চেঁচাতে চেঁচাতে গলা ব্যথা বানিয়ে ফেলেছে। ইহাব মানহাকে ধরে রেখে বলল,

“এত হাউকাউ করো না, কানের পর্দা ফাটার জন্য নড়াচড়া করছে। সো, ডোন্ট শাউট।”

বাথটাব ভর্তি হয়ে গেলে এক হাত দিয়ে নিজের পরনের শার্ট খুলতে নিলে মানহা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। ইতোমধ্যে ইহাব অর্ধেক শার্ট খুলে ফেলেছে। মানহার কান্না শুনে বলল,

“ঢং করবে না রিন পাউডার। মনে হচ্ছে এই প্রথম আমাকে উদোম দেখছ?”

সম্পূর্ণ শার্ট খুলে মানহাকে নিয়ে বাথটাবে ঝাঁপিয়ে পড়ল।

_

নিশাত বিড়াল ছানাকে দুধ দিয়ে টাকা উঠাতে বাইরে গেল। নাহওয়ান বিড়াল ছানার সামনে উপুড় হয়ে মনোযোগী দৃষ্টিতে খাওয়া দেখছে। পাশেই তার অর্ধ খাওয়া গুড়ো দুধের বাটি। মারওয়ান দরজা আটকে ছেলের পাশে এসে বসল।

“কিরে কি করিস কবুতরের ছাও?”

নাহওয়ান দুহাত গালে ঠেকিয়ে বাবার দিকে চেয়ে বলল,

“বিল্লু চানা ডুডু কায়।”

“হ্যাঁ, দেখতে পাচ্ছি।”

নাহওয়ান ফিচফিচ করে হেঁসে বলল,

“আমিও ডুডু কাই, বিল্লু চানাও কায়।”

মারওয়ান রসিকতার সহিত বলল,

“বাহ্! এখন দুজনে গলায় গলা মিলিয়ে ফেল।”

নাহওয়ান বাবার কথা রাখতে বিড়াল ছানাটাকে টিপ দিয়ে ধরল। মারওয়ান নিষেধ করে বলল,

“ওকে রাখ। চল একটা খেলা খেলি।”

নাহওয়ান উৎসাহী হয়ে বলল,

“চলো কেলি।”

মারওয়ান ফ্লোরে আসন পেতে বলল,

“খেলার নাম লুকোচুরি।”

নাহওয়ান বিস্মিত গলায় বলল,

“লুকোচুলি!”

“হুম, দাড়া তোকে শিখিয়ে দেই।”

মারওয়ান এবং নাহওয়ান লুকোচুরি খেলার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। মারওয়ান অন্তত ধৈর্যের সহিত ছেলেকে গত একঘন্টা ধরে শিখিয়েছে কিভাবে লুকোচুরি খেলতে হয়। সে সিরিয়াস ভঙ্গিতে ছেলের দিকে তাকিয়ে বলল,

“রেডি?”

নাহওয়ান লাফাতে লাফাতে জানান দিল,

“লেডি লেডি।”

মারওয়ান কোমরে দুই হাত ঠেকিয়ে বলল,

“চোর হবি তুই আর আমি কিন্তু পুলিশ। এক থেকে দশ অবধি গুনব এরমধ্যে লুকিয়ে পড়বি। একদম গোপনীয় জায়গায়, বুঝলি?”

নাহওয়ানও বাবাকে দেখে সিরিয়াস হয়ে অনবরত ঘাড় নাড়িয়ে সম্মতি জানাল। মারওয়ান নিজেদের রুমে গিয়ে খাটে উপুড় হয়ে শুয়ে খুবই ধীর গতিতে জোরে জোরে এক থেকে দশ অবধি গুনল। প্রায় পাঁচ মিনিট লাগিয়ে গুণে উঠে মন্থর গতিতে পা ফেলে ফেলে ছেলেকে খুঁজতে রুম থেকে বেরুল। রুম থেকে বেরুতেই চোখের সামনে তাদের নতুন ফ্রিজ দর্শিত হলো। তাকিয়ে দেখল ফ্রিজের কোণায় নাহওয়ান উল্টো ঘুরে দাঁড়িয়ে আছে চোখের উপরে আঙুল দিয়ে। মারওয়ান কটিদেশে হাত ঠেকিয়ে সেদিকে দৃষ্টি স্থির করে বলল,

“এই পটলের বাচ্চাটাকে কি শিখিয়েছি গত এক ঘন্টা? এটাকে কেমন লুকানো বলে? পুলিশের মুখের সামনে পশ্চাৎ দেখিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।”

এগিয়ে এসে রাগান্বিত গলায় বলল,

“ঐ তোকে না লুকোতে বললাম?”

নাহওয়ান পূর্বের অবস্থায় থেকেই বলল,

“লুকিয়েচি, কুজো কুজো।”

“কী খুঁজব?

“আমাকে কুজো।”

“এটাকে লুকোনো বলে?”

নাহওয়ান নিজের নেত্রে গুলুমুলু আঙুল গুলো আরও দাবিয়ে বলল,

“হুম, কিচু ডেকতে পাচ্চি না। চব কালু কালু। টুমিও ডেকতে পাবে না।”

মারওয়ান হাসবে নাকি কাঁদবে বুঝতে না পেরে বলল,

“বাহ্ কি চমৎকার বুদ্ধি!”

নাহওয়ান গর্বের সহিত চোখ ঢেকেই বলল,

“চমটকাল বুড্ডি।

মারওয়ান দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

“হ্যাঁ, নাসির উদ্দিন ওরফে ব্রিটিশের নাতি মিস্টার বুদ্ধিউদ্দিন।”

নাহওয়ান তবুও পিছু ঘুরল না। মারওয়ান তাকে কাঁধে তুলে নিয়ে বলল,

“পুরো খেলা বাংচাল করে দিয়েছিস আন্ডার বাচ্চা।”

নাহওয়ান হেঁসে বলল,

“আচ্চা, আবাল আবাল।”

“না তোর সাথে খেলে মজা নেই, তুই লুকাতে জানিস না।”

নাহওয়ান বাবার কথায় ঠোঁট ফুলিয়ে ফেলল। মারওয়ান ছেলের মন খারাপ বুঝতে পেরে আবারও খেলতে আগ্রহী হলো। সে আবারও এক থেকে দশ অবধি গুণে এসে পুরো রুমে খুঁজেও আর নাহওয়ানকে পেল না। এরমধ্যে দরজার করঘাতে মারওয়ান দ্রুত দরজা খুলে আবারও ছেলেকে খুঁজতে লেগে পড়ল। নিশাত ঢুকেই বলল,

“নাহওয়ান কই? আজকে ওর টিকার ডেট একদম ভুলে বসে আছি। ওকে নিতে আসলাম। ছেলেকে ডাকুন, ঘুমিয়ে পড়েছে নাকি?”

বলতে বলতে নিশাত ফ্যান ছেড়ে বিছানায় বসল। মারওয়ান উদ্বিগ্ন গলায় বলল,

“ওকে খুঁজে পাচ্ছি না। পুরো ঘর খোঁজা শেষ। এই মিনিট কয়েক আগে লুকোচুরি খেলার জন্য লুকোতে বললাম এখন কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না।”

নিশাত তড়াক করে লাফিয়ে উঠে বলল,

“কী বলছেন এসব? কোথায় যাবে? ভালো করে খুঁজে দেখুন আছে আশেপাশে কোথাও। ঘর তো আমাদের বড় নয় যে খুঁজে পেতে সমস্যা হবে?”

মারওয়ান অধৈর্য কণ্ঠে বলল,

“আরে সব জায়গায় তন্নতন্ন করে খুঁজেছি। ডাক দিচ্ছি সাড়াও দিচ্ছে না।”

নিশাত অস্থির হয়ে সম্পূর্ণ ঘর খুঁজল। কোথাও বাচ্চাটার চিহ্নটুকু পর্যন্ত নেই। সে মারওয়ানের শার্ট খামচে ধরে বলল,

“এই মারওয়ান আজাদ আমার ছেলেকে এনে দিন বলছি। আপনি নিশ্চয়ই নাটক করছেন? প্লিজ এসব করবেন না। আমার দম আটকে আসছে, নিঃশ্বাস নিতে পারছি না। আমার বুকের মানিক কোথায় বলুন?”

মারওয়ান নিজেও ভিতরে ভিতরে বেশ অস্থির হয়ে আছে। উপরে শক্ত দেখালেও ছেলের চিন্তায় অসুস্থ অসুস্থ লাগছে। গলা শুকিয়ে গেছে। তীব্র পিপাসায় পানির অভাববোধ করল। দ্রুত ফ্রিজ খুলে পানি নিতে গেলে দেখল নাহওয়ান ফ্রিজে ঢুকে বসে আছে। মারওয়ান দ্রুত কোলে নিয়ে বলল,

“তুই এটার মধ্যে কী করিস রে ফাইয়াজ?”

নিশাত পিপাসার্ত জননীর মতো মারওয়ানের কোল থেকে ছেলেকে ছিনিয়ে এনে বুকের মধ্যে চেপে রাখল অনেকক্ষণ। চুমুতে চুমুতে ভরিয়ে দিল। ফ্রিজে থাকায় হালকা শরীর ঠান্ডা হয়েছে। ভাগ্যিস নরমালে ঢুকেছিল ডিপ ফ্রিজে ঢুকলে তার মানিককে আজ বোধহয়.. নিশাত আর ভাবতে চাইল না। হুহু করে কেঁদে দিল। নাহওয়ান মাকে কাঁদতে দেখে দাঁত বের করে বলল,

“ইট্টু লুকাইচি।”

মারওয়ান এগিয়ে এসে বলল,

“আর লুকানোর জায়গা পাসনি?”

নাহওয়ান বাবার দিকে চেয়ে বলল,

“টুমিই টো বলচো?”

মারওয়ান তড়িঘড়ি করে জবাব দিল,

“এই আমি বলেছি মানে? তোকে আমি লুকাতে বলেছি, ফ্রিজে লুকাতে বলিনি। উল্টাপাল্টা কথা বললে জাস্ট উড়িয়ে ফেলব।”

বাবার চোখ রাঙানি দেখে নাহওয়ান চুপসে গেল। মায়ের কোলে গুটিয়ে গেল। নিশাত ছেলেকে নিয়ে তৈরি হয়ে টিকা দিতে চলে গেল। মারওয়ানের সঙ্গে কোনো কথা বলল না। মারওয়ান মনে মনে বলল,

“আরেকটুর জন্য কেস খাইয়ে দিচ্ছিল পান্ডাটা।”

_

নিশাত টিকা দিয়ে বের হতেই রাস্তার ওপারে মারওয়ানকে দাঁড়ানো অবস্থায় দেখল। একমনে সিগারেট টানছে। এদিকে ধ্যান নেই। পরনে সেই কালো কোটটা। নিশাত মনে মনে বলল,

“ঠিকানা জেনেছে কিভাবে? আজকে তো বলেও আসেনি।”

নিশাত এগোবে না ভেবে আবার কি মনে করে যেন এগোলো। কিছু কেনাকাটা করতে হবে। লোকটা সাথে থাকলে সুবিধা হবে। ছেলেকে ধরিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত মনে বাজার করা যাবে। নাহওয়ান বাবাকে দেখেই হাত বাড়িয়ে ডাকতে লাগল। মারওয়ান চাইল। নিশাত ছেলেকে কোল থেকে নামিয়ে দিতেই নাহওয়ান দৌঁড়ে এসে বাবার পা জড়িয়ে ধরল। সিগারেট মুখে রেখে মারওয়ান ছেলেকে কোলে তুলে নিল। নিশাত এগিয়ে এসে বলল,

“কিছু কেনাকাটা করতে হবে। ওকে নিয়ে আসুন।”

মারওয়ান মুখ থেকে সিগারেট ফেলে দিয়ে নিশাতের দিকে চেয়ে কেমন করে যেন হাসল। নিশাত সামনে তাকিয়ে ছিল বিধায় তেমন খেয়াল করল না। সামনে এগিয়ে যেতেই ব্যাগে ফোন বাজতে লাগল। নিশাত ফোন বের করে দেখল মারওয়ানের নম্বর থেকে কল আসছে। তার ভ্রু কুঁচকে গেল। ঘুরে দেখল মারওয়ান ছেলেকে নিয়ে দাড়িয়ে তার পানে চেয়ে আছে। নিশাত বুঝল না লোকটা সামনে দাঁড়িয়ে থেকে ফোন দিচ্ছে কেন? সে কাঁপা হাতে ফোন রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে মারওয়ান বলল,

“তোমরা কোথায়? এবারের টিকা এসএম স্কুলে দিচ্ছে না? আমি আসছি, চলে যেও না আবার।”

নিশাত ফোন কানে নিয়ে ছেলেকে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটার পানে চাইল। ওপাশ থেকে মারওয়ানের হ্যালো হ্যালো শব্দ কর্ণকুহরে প্রবেশ করছে না তার। মনে হচ্ছে, সে টাইম লুপে আটকে গেছে। আশপাশের কোনো শব্দ শুনতে পাচ্ছে না সে। শুধু পিয়ানোর সুরের মতো একটা শব্দই খালি মস্তিষ্কে পিনের মতো বাজছে। মারওয়ানের অজস্র প্রশ্নের বিপরীতে অনেকক্ষণ পর গলা দিয়ে আওয়াজ বেরুল,

“আপনি আমার সামনে না?”

এবার ওপাশ থেকে পিনপতন নীরবতা। খানিক পর জবাব এল,

“কেন তোমার সামনে কি আমাকে দেখতে পাচ্ছ?”

“হ্যাঁ, ঐযে ছেলেকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন আমার দিকে চেয়ে।”

মারওয়ান ওপাশ থেকে গর্জে উঠে বলল,

“নিশাত কি করেছ তুমি? ওটা আমি নই। ছেলেকে ওর কাছ থেকে নাও, ওটা একটা ভ্রম।”

নিশাত কেমন যন্ত্রের মতো বলল,

“ভ্রম?”

“কোথায় আছ দ্রুত বলো?”

“এসএম স্কুলের পিছনের রাস্তার শপিং মলের সামনে।”

নিশাত এগিয়ে আসতে নিলে একটা গাড়ি সাঁই করে এসে লোকটার সামনে দাঁড়ালো। মারওয়ানীয় ভ্রমটা নিশাতের দিকে ঘাড় কাত করে চেয়ে পিছন থেকে প্রাণপণে ধেয়ে আসা মারওয়ানের দিকে বিদঘুটে নজরে চাইল। মুখ থেকে কূটধোঁয়া ছড়িয়ে দিয়ে নাহওয়ান সমেত গাড়িতে উঠে বসল। নিশাত অনেকটাই কাছে চলে এসেছে। গাড়ির দরজা আটকাতে আটকাতে লোকটা বিদ্রূপাত্মক ভঙ্গিতে রূঢ় হেঁসে ফ্যাসফেসে গলায় বলল,

“গুড বায় মিস্টার অ্যান্ড মিসেস সাইফার। ধন্যবাদ ফৌজিয়া নিশাত সাইফারের জিয়ন কাঠি আমার হাতে তুলে দেয়ার জন্য। আলবিদা, গুলে গুলে, আরিভেদার্চি।”

চোখের পলকে গাড়িটি উধাও হয়ে গেল। নিশাত অন্তঃসারশূন্য দৃষ্টিতে ধূলো উড়ানো গাড়িটির চলে যাওয়া দেখল।

চলবে….

(আসসালামু আলাইকুম।)

ভবঘুরে_সমরাঙ্গন

পর্ব_৫৬.২

তাজরীন ফাতিহা

রাস্তায় নির্জীবের মতো বসে আছে নিশাত। নিজের বুকের ধনকে চোখের সামনে দিয়ে নিয়ে যেতে দেখলে কোনো মা-ই ঠিক থাকতে পারে না। মারওয়ান গাড়ির পিছনে অনেকটা দৌঁড়েও ধরতে পারেনি। অনেকটুকুই সামনে চলে এসেছে সে। চেহারায় ক্লান্তি, বিধ্বস্ততার ছাপ। ক্ষোভের চিহ্ন স্পষ্ট। চোখ লাল হয়ে উঠেছে তার। নিশাতের দিকে এগিয়ে গেল। বসা থেকে উঠাতে চাইলে নিশাতকে বিন্দুমাত্র নড়াতে পারল না। যেন একটা পাথর। আরেকবার ধরতে গেলে নিশাত ছিটকে তার হাত সরিয়ে দিয়ে কেঁদে উঠে বলল,

“আমার নাহওয়ানরে। আমার আব্বা, যাদু, মানিক..”

আশেপাশে অনেকে জড়ো হয়ে গেছে। ভিড়ের মধ্যে একজন নারী এগিয়ে এসে বললেন,

“কি হয়েছে আপনার? এনিথিং রং?”

নিশাতের এদিকে একদমই খেয়াল নেই। সে নিজের মতো কাঁদতে ব্যস্ত। চোখের পানিতে নিকাবের বেশিরভাগ অংশ ভিজে উঠেছে। মারওয়ান একবার চারপাশ পরখ করে নিশাতকে বলল,

“প্লিজ এখানে সিনক্রিয়েট কোরো না, এতে পরে তুমিই এতগুলো পুরুষের সামনে পর্দা খেলাপ করেছ দেখে কষ্ট পাবে।”

নিশাতের খেয়াল হলো সে বাইরে বসে চেঁচামেচি করছে। তার দিকে অসংখ্য মনুষ্য চোখ বিমূঢ় দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। চারপাশ একবার দেখে হনহন করে একা একাই বাসায় চলে এল। একটু পর মারওয়ানও ঘরে পৌঁছুলে নিশাতের ভিন্নরূপ রূপ দেখল। বোরকাটা শরীরে এখনো জড়ানো। নিকাব খুলে ফেলেছে। খোপা খুলে যাওয়ার উপক্রম। ঘরের সবকিছু তছনছ করে ফেলেছে সে। রণমূর্তি ধারণ করেছে নিশাত। মারওয়ান এগিয়ে এসে ধরতে চাইলে নিশাত সামনে ছুরি ধরে বলল,

“এক পাও এগোবেন না মিস্টার আজারাক সাইফার। এই পরিচয়ের জন্য আজকে আমার সন্তান আমার কোলছাড়া। এই পরিচয়ের জন্য নিজের ক্যারিয়ারের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নষ্ট হয়েছে, এই পরিচয়ের কারণে বন্ধুত্ব ভেঙে গিয়েছে, এই পরিচয়ের জন্য পুরো গ্রামের সামনে আপনার পরিবারকে অপমানিত হতে হয়েছে, এই পরিচয়ের জন্য আমার জীবনে এখন পর্যন্ত সুখের কোনো চিহ্ন আপনি রচনা করতে পারেননি, এই পরিচয়ের জন্য বিপদ আমাদের পিছু ছাড়ে না। আপনার এই পরিচয়টা অভিশপ্ত। যেদিন এই পরিচয় ছেড়ে সত্যিকারের মারওয়ান আজাদ হয়ে আমার সামনে ধরা দিতে পারবেন সেদিনই আমাকে ডাকবেন নতুবা আমি আপনার সংসার একটা সেকেন্ডের জন্যেও আর করছি না। লোকে আমাকে স্বার্থপর, অধৈর্যশীল নারী বললে তাতেই সই। কারো কথায় এখন আমার কিচ্ছু যায় আসেনা। এতদিন আপনার সবকিছু মুখ বুজে সহ্য করে এখানে পড়ে থেকেছি শুধুমাত্র আমার নাহওয়ানের জন্য। সেই নাহওয়ানকেই যখন আপনার এই সো কল্ড কাজের জন্য হারিয়ে ফেললাম তখন আপনাকে প্রশ্রয় দেয়া মোটেও সমীচীন হবে না। আমার সন্তানকে আমার বুকে ফিরিয়ে না দেয়া অব্দি আমি নিশাত একটা দানাও আমি মুখে তুলব না।”

এক নিশ্বাসে কথগুলো বলে নিশাত ফোঁসফোঁস করতে লাগল। এ যেন এক সন্তান হারা মায়ের রণচণ্ডী রূপ। মারওয়ান এই প্রথম নিশাতকে এতটা রাগতে দেখল। সন্তান হারালে প্রত্যেক মা-ই বোধহয় এমন বেদনা মিশ্রিত ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে যায়। মারওয়ান হালকা গলায় বলল,

“দোষটা কিন্তু তোমার। নাহওয়ান তোমার থেকে হারিয়েছে, এখন আমাকে দোষারোপ করছ কেন?”

মারওয়ানের এমন নির্লিপ্ত উত্তর শুনে নিশাত সীমাহীন দহনে ফেটে পড়ল। এগিয়ে এসে মারওয়ানের শার্টের কলার চেপে ধরে চিল্লিয়ে বলল,

“আমার দোষ? আমার? এতবড় জঘন্য মিথ্যা অপবাদ দিতে আপনার মুখে আটকালো না? আমি সেদিন আপনাকে কফিশপের কথা জানাইনি? বলিনি আপনাকে আমি দেখছি? সেদিন আপনি কেন স্বীকার করলেন ওটা আপনি? বলুন কেন? আপনার সেই মিথ্যার কারণে আজকের এই দিনটা দেখতে হচ্ছে। আপনার ভ্রম আসলো কই থেকে? আপনি না গোয়েন্দা? আপনার তো হিন্টস দিলেই বুঝে যাওয়ার কথা। ইহাব ভাই সেদিন অতীত বলার সময় কিছু ভিডিও ক্লিপের কথা বলেছিল যেটা এডিটেড ছিল না তাহলে নিশ্চয়ই বুঝে যাওয়া উচিত ছিল আপনাকে ফাঁসাতে কেউ ওনাকে ব্যবহার করেছে। সেই কেউ একজনকে কেন খোঁজার চেষ্টা করেননি? আমি একজন সাধারণ মানুষ হয়ে যেখানে পানির মতো সবকিছু বুঝে যাচ্ছি আপনি একজন গোয়েন্দা আইনের লোক হয়েও কেন বোঝেননি?”

মারওয়ান শার্টের কলার থেকে নিশাতের হাত ঝাড়া মেরে সরিয়ে দিয়ে বলল,

“বুঝেছি কি বুঝেনি সেটা তোমার কাছ থেকে জানতে হবে না। আমি কারো কথায় চলিনা। যেটা আমার কাছে সঠিক লাগে ঠিক সেটাই করি। আমি আমার মস্তিষ্কের অনুসারী, আমার নিয়ন্ত্রক শুধুমাত্র আমার মস্তিষ্ক।”

মারওয়ানের চোখ টকটকে লাল হয়ে আছে। যতই উপরে উপরে শক্ত দেখাক সন্তান হারানো এক পিতার অন্তর্দহন কেউ বোঝে না। পুরুষ মানুষ বুকের মাঝে অজস্র কষ্ট দাফন করেও ঠিক নির্লিপ্ত থাকতে পারে। নারীরা যেমন সব উগলিয়ে দেয় পুরুষরা চাইলেও তা পারে না। সেজন্য নারীদের তুলনায় পুরুষরা বাঁচে কম। তাদের গড় আয়ু নারীদের তুলনায় অনেক কম। নিশাত মারওয়ানের এমন জবাব শুনে তাচ্ছিল্য হেঁসে বলল,

“নিজের ভুল তবুও স্বীকার করবেন না? মস্তিষ্কের অনুসারী বলে নিজেকে বড় করতে চাইছেন? সব হারিয়েও আপনার দাম্ভিকতায় চুল পরিমাণ ভাটা পড়েনি। ইহাব ভাই ঠিকই বলেন, আপনি একটা পাষাণ। মন বলতে কিছু আল্লাহ আপনাকে দেননি। আল্লাহ আপনাকে পাথর বানাতে চেয়ে মানুষ বানিয়ে ফেলেছেন। একটা পাথর মানব আপনি। এখন তো মনে হচ্ছে আপনার বন্ধুই সঠিক। এমন ঘাড়ত্যাড়া লোককে বোঝানোর সাধ্য কোনো মহাপুরুষেরও বোধহয় নেই। সন্তান হারিয়েও যে পিতার দম্ভ চূর্ণ হয়না, নিজের কাজকেই সঠিক মনে হয় সেই মানুষের কাছে আর কিছু আশা করা বোকামি।”

নিশাত রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল। দরজা বন্ধ করে জায়নামাজ বিছিয়ে রবের নিকট তার অভিযোগগুলো ব্যক্ত করার প্রয়াসে লেগে পড়ল। কাঁদতে কাঁদতে জায়নামাজ ভিজিয়ে ফেলল। ঘরের কোথাও তার সন্তানের সাড়া শব্দ না পেয়ে সন্তান হারা এক মায়ের আর্তনাদ আবারও ঘর থেকে ভেসে এল। মারওয়ান শব্দহীন তা চুপচাপ শুনে গেল।

__

নাহওয়ান চেয়ারে বসে আছে। মনের আনন্দে গুলুমুলু পা’দুটো নাড়িয়ে যাচ্ছে। আজকে বাবার সাথে গাড়িতে চড়ে মন বেশ ফুরফুরে তার। এই প্রথম এমন বড় চলন্ত গাড়িতে উঠেছে সে। সারাপথ মুখ দিয়ে বুম বুম শব্দ করে এসেছে। বাবা তাকে বেশ কয়েকবার ধমকে উঠলেও সে থামেনি। একটু দূরেই মারওয়ান বসা। পাশে অনেক লোক। চেহারা ভয়ংকর এদের। নাহওয়ানের ভয় লাগছিল কিন্তু বাবা সাথে থাকায় ভয় একদম চলে গেছে। একা একা বসে থাকতে বিরক্ত হচ্ছিল দেখে ছোট্ট শরীরটা নিয়ে বহু কষ্টে চেয়ার থেকে নামতে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ল। হাঁটুর অস্থিসন্ধি ও চোয়ালে বেশ ব্যথা পেয়ে চিৎকার করে কান্না জুড়ে দিয়ে ‘বাবা বাবা’ করে ডাকতে লাগল।

নিজের আলোচনায় ব্যঘাত ঘটায় লোকটা তীব্র বিরক্ত হলো। ইতোমধ্যে সেখানে উপস্থিত প্রত্যেকই কান্নার আওয়াজে কপাল কুঁচকে বিরক্তির জানান দিয়ে ফেলেছে। একজন এগিয়ে এসে বলল,

“একে কি করবেন?”

সেখানে বসা একজন মারওয়ানীয় ভ্রমের দিকে ইশারা করে বলল,

“সেটা ওনাকেই জিজ্ঞেস করুন। পিতার দায়িত্ব পালন করুন মিস্টার।”

লোকটা সামনে বসা সকলের উপহাসে সীমাহীন রাগে থরথর করে কাঁপতে লাগল। চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে নাহওয়ানের সামনে দাঁড়াতেই বাচ্চাটা জল ভরা নেত্রে হাঁটু ও চোয়াল দেখিয়ে ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল,

“বাবা বাবা বেতা পাইচি, ইনদি বেতা।”

সামনে দাঁড়ানো লোকটির কোনো ভাবান্তর দেখা গেল না। সে বাচ্চাটার কথা গ্রাহ্যই করল না। নিষ্ঠুরের মতো নাহওয়ানকে উঠিয়ে কয়েকটা চড় লাগাল। বাবার হাতে এই প্রথম মার খেয়ে বাচ্চাটা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেল। এতই অবাক হয়েছে যে গালে মারের দাগ বসে যাওয়ার পরেও একবিন্দু কেঁদে উঠল না সে। বাচ্চার কান্না বন্ধ হওয়ায় লোকটা চলে যেতে নিলে নাহওয়ান দৌঁড়ে এসে পা জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠে মুখ ফুলিয়ে বলল,

“বাবা মাচ্চে, বাবা মাচ্চে।”

লোকটা এবারও নিষ্ঠুরের মতো নাহওয়ানকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল। বাচ্চাটা আবারও ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করে এবার ‘মা মা’ করতে লাগল। লোকটা কাকে যেন ইশারা করতেই একজন দড়ি আর টেপ নিয়ে এসে তার হাতে দিল। মুহুর্তের মাঝে নাহওয়ানের হাত, পা বেঁধে মুখে টেপ আটকে দিতেই সম্পূর্ণ পরিবেশ শান্ত হয়ে গেল। নাহওয়ান এক কোণায় বাঁধা অবস্থায় চোখে মুখে চরম আতঙ্ক নিয়ে অশ্রু বিসর্জন করতে লাগল।

আজকের পর বাচ্চাটার জন্মদাতার প্রতি অগাধ বিশ্বাস, ভালোবাসা প্রবল ভয় ও আতঙ্কে রূপ নেবে। কোনোদিন পিতাকে নিজের নির্ভরযোগ্য ভরসার স্থানে পূর্বের ন্যায় বসাতে পারবে না। জন্মদাতার উপস্থিতি ছোট্ট মনে তীব্র ভীতি জাগাবে, ভয়ে মুষড়ে পড়বে। নিজেকে গুটিয়ে নেবে। অতিশয় পিতৃভক্ত এইটুকু শিশুর মনে বাবাকে নিয়ে যে বৈরী মনোভাব তৈরি হলো তার মাশুল মারওয়ান আজাদ আদতেই কোনোদিন গুনতে পারবে? কী দিয়ে মুছবে ছেলের চোখের এই তীব্র ভয় ও বিতৃষ্ণাকে?

_

দুঃস্বপ্ন দেখে আচমকা চোখ মেলে আশেপাশে চাইল মারওয়ান। গলা শুকিয়ে বুকটা পিপাসার্ত হয়ে উঠেছে। কিসের যেন চিৎকার শুনেছে সে। মাথা ব্যথায় ছিঁড়ে যাচ্ছে। কয়টা বাজে তার হিসেব মারওয়ানের কাছে নেই। চারিপাশ গাঢ় আঁধারে নিমজ্জিত। সময়টা যে গভীর রাত তা বুঝতে বেগ পেতে হয়নি তার। পাশ হাতড়ে ছেলেকে খুঁজতে লাগল। নাহওয়ান জন্মের পর থেকে কোনদিন পাশ হাতড়ে ছেলের উপস্থিতি পায়নি এমন হয়নি। আজকে না পেয়ে কোথায় যেন তীব্র ব্যথা অনুভূত হলো। নিশাতেরও কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। সে কেমন ফ্যাসফাসে গলায় ডাকল,

“ফাইয়াজ..”

কোনো ফিরতি প্রত্যুত্তর এল না। বাবার ডাককে একপ্রকার উপেক্ষা করেই সন্তানের কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না। আবারও ডাকতে নিলে সকালের দুঃসহ স্মৃতি স্মরণ হতেই মারওয়ানের বুকটা সন্তান বিরহে কাতর হয়ে উঠল। অজস্র রক্তক্ষরণে বুকের পেশী সক্রিয় হয়ে উঠতে লাগল। হাত, পায়ের শক্তি কেমন ফিকে হয়ে এসেছে। মনে হচ্ছে একটা ব্ল্যাকহোলে আটকে পড়েছে সে। বহু কষ্টে উঠে বসে নাহওয়ানের সকালে পরিধানকৃত সেন্ডুগেঞ্জি নজরে এল। যেটা খাটের মাথায় নিশাত মেলে রেখে গিয়েছিল। বাসায় এলে আবার পরাবে ভেবে। মারওয়ান সেটা নিয়ে এসে বুকে জড়িয়ে প্রানভরে নিঃশ্বাস নিতে লাগল। এইতো তার পান্ডা, পটলের বাচ্চা, কবুতরের ছাওয়ের ঘ্রাণ। বাবা মাকে ছাড়া কেমন আছে তার অবুঝ শিশুটা? বাবাকে কি মনে পড়ছে তার? চোখ বুজে নানা চিন্তায় ডুবে গেল সে।

নিশাত ‘নাহওয়ান’ বলে চিৎকার দিয়ে একেবারে শান্ত হয়ে গেছে। এত জোরে চিৎকারেও কেউ এল না। মারওয়ান কি বাসায় নেই? নাকি শুনেও তার চিৎকারকে উপেক্ষা করেছে? সারাদিন সে জায়নামাজে পড়ে ছিল। কারো পেটেই আজ দানা, পানি কিচ্ছু পড়েনি। সন্তান বিরহে পিতা মাতা উভয়ই ভেঙে পড়েছে। মারওয়ান উপরে উপরে যথেষ্ট স্ট্রং থাকলেও তার মানসিক অবস্থা প্রচণ্ড ভঙ্গুর। নিশাত শারীরিক মানসিক উভয় দিকেই ক্লান্ত, নিঃস্ব। কোনমতে জায়নামাজ থেকে উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করে খেয়াল করল সারাদিন পেটে দানাপানি না পড়ায় শরীরে বিন্দু পরিমাণ শক্তি অবশিষ্ট নেই। তাছাড়া খুবই খারাপ স্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙেছে ওটার প্রভাবও পড়েছে মস্তিষ্ক ও শরীরে। অন্ধকার হাতড়ে কোথায় যাচ্ছে কি করছে কিছুই তার বোধগম্য হচ্ছে না। শুধু প্রলাপের মতো মুখে আওড়ে যাচ্ছে,

“আমার বুকের মানিক, সাত রাজার ধন কই রে? আমার নাহওয়ান সোনা কই? আমার কথা বলা তোতা পাখিটা কই? আজ একবারও মা বলে ডাকিসনি যে? কোথায় আমার ছোট্ট পাখিটা?

আপাত দৃষ্টিতে মনে হবে একজন মা তার সন্তানকে বড্ড আদর করে ডেকে চলেছে কিন্তু আদতে তা নয়। সন্তানকে না পেয়ে মায়ের মস্তিষ্ক এখন শুধুই সন্তানের স্মৃতি আঁকড়ে ধরতে চাইছে। অন্ধকারে নিশাত কয়েকবার আসবাবপত্রের সঙ্গে হোঁচট খেল। সারাদিনও যে দরজা খোলা হয়নি সে দরজা বহু কষ্টে খুলে চারপাশ হাতড়াতে হাতড়াতে পাশের রুমে এল। মুখে রয়েছে সেই প্রলাপ। বিছানার দিকে এগোতে গেলে পায়ের কাছে শক্ত কিছু ঠেকল। অবচেতনে নিশাত আবার এগোতে নিলে বাঁধা পেয়ে উল্টেপাল্টে বস্তুটার উপর পড়ল। মারওয়ান আচমকা শরীরের উপর কিছু পড়ায় ব্যথাসূচক শব্দ করল। এমনিতেই ফ্লোরে শোয়ার কারণে পিঠ ঠান্ডা হয়ে আছে। ভারী কিছু পড়ায় শক্ত ফ্লোরে বেশ ভালো রকমের আঘাত পেল। নিশাত মারওয়ানের বুকের উপর শুয়েই আগের প্রলাপ আওড়ে যাচ্ছে এক মনে। মারওয়ানের বুকের উপরে ছেলের সেন্ডুগেঞ্জি পেয়ে আঁকড়ে ধরে ঘ্রাণ নিয়ে ডাকল,

“এইতো আমার আব্বা, মা এখন তোমার ঘ্রাণ পাচ্ছি। কতক্ষণ পরে তোমাকে পেলাম। তোমার বাবা তোমাকে নিয়ে রেখেছে, দেখেছ কেমন খারাপ?”

মারওয়ান বুঝল নিশাতের মস্তিষ্কে সন্তান হারানো বেশ ভালো রকমই প্রভাবিত করেছে। কি বলেছে, কি করছে কিছুই সে সজ্ঞানে করছে না। অবচেতনে একাগ্রচিত্তে একই কথা বারবার পুনরাবৃত্তি করছে। চোখের সামনে দিয়ে সন্তানকে নিয়ে যেতে দেখলে কোন জন্মদাত্রী মা ঠিক থাকে? মারওয়ান নিশাতকে ঝাঁকিয়ে বলল,

“নিশাত, নিশাত?”

নিশাত কথা থামিয়ে বাস্তবে এল যেন। আশেপাশে কোথাও নাহওয়ানকে না দেখে হুঁ হুঁ করে কেঁদে উঠল। ছেলের গেঞ্জি নাকের কাছে ধরে বুকের মধ্যে নিয়ে মারওয়ানের বুকে অজস্র কিল ঘুষি মারতে লাগল। মারওয়ান থামাল না। এক সন্তানহারা মায়ের পাগলামীকে সায় দিয়ে গেল। বেশ খানিক পর নিশাত আপনাআপনি শান্ত হয়ে ফোঁপাতে ফোঁপাতে নিস্প্রভ গলায় বলল,

“আমার সন্তানকে আমার বুকে ফিরিয়ে দিন। কথা দিচ্ছি আপনার থেকে আমরা বহু দূরে চলে যাব।”

মারওয়ান জবাব দিল না। নিশাত মারওয়ানের বুকে মাথা রেখে একই কথা বারবার বলে তন্দ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। সারাদিনের ক্লান্তিতে মস্তিষ্ক এখন বিভ্রান্ত ও দুর্বল হয়ে পড়েছে তার। নিশাত ঘুমিয়ে পড়তেই মারওয়ান নিশাতের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,

“ওয়াদা করলাম, আমাদের সন্তানকে তোমার কাছে সহিসালামতে ফিরিয়ে দিয়ে যাব।”

__

মানহার প্রচণ্ড অস্থির লাগছে। কেমন যেন করছে মনটা। আগে কখনো এমন হয়নি তবে কাল রাত থেকেই মনটা কেমন যেন অস্থির অস্থির হয়ে আছে। কিছুই ভালো লাগছে না। কারো বিপদ হয়নি তো আবার? মানহাকে নিয়ে আজকে হাসপাতালে যাবে সেটার বন্দোবস্ত করছে ইহাব। কয়েকদিনের অসুস্থতায় শরীর একদমই ভেঙে পড়েছে মানহার। ইহাব আগের মেডিকেল রিপোর্ট গুলো গুছিয়ে নিল। মানহা এগিয়ে এসে বলল,

“শুনুন?”

ইহাব হাসপাতালের ফাইলে কাগজপত্র ভরতে ভরতে জবাব দিল,

“শুনছি।”

মানহা অস্থির হয়ে পায়চারি করতে করতে বলল,

“আমার না কেমন অস্থির লাগছে আজকে। মনে হচ্ছে কারো কোনো বিপদ হয়েছে বা হবে। একটু বাবাকে ফোন করবেন?”

“তুমিই তো করতে পারো।”

“আমার কেমন ভয় করছে। আপনি একটু করে দেখুন।”

ইহাব বউয়ের টেনশন দেখে অগত্যা শ্বশুড়কে কল লাগালো। কয়েকবার রিং বেজে ওপাশ থেকে ধরল। ইহাব সালাম দিয়ে কুশলাদি বিনিময় করল। কথায় কথায় জানতে পারল মারওয়ান, নিশাত দুজনেরই ফোন বন্ধ গতকাল থেকে। ইহাব শুধু হু হা করে শুনে গেল। মানহাও কিছুক্ষণ কথা বলল। বাবা, মায়ের সঙ্গে কথা বলেও মনে শান্তি পাচ্ছে না। খুব সাহস করে ইহাবকে উদ্দেশ্যে করে বলল,

“একবার ভাইয়াকে ফোন করে দেখব?”

ইহাব আলমারির ড্রয়ার খুলে ফাইল রাখতে রাখতে মানহার দিকে শীতল নজরে চাইল। বলল,

“তোমার ইচ্ছে।”

মানহা বেশ কয়েকবার ফোনে ট্রাই করল তবে ওপাশ থেকে বন্ধ পেল। এবার মানহা বেশ চিন্তিত হয়ে ইহাবকে বলল,

“একটু দেখুন না প্লিজ। ভাইয়া, ভাবি কেউ ফোন ধরছে না। দুজনের ফোনই সংযোগ দেয়া সংযোগ হচ্ছে না। আমার মনটা কেমন যেন করছে। মনে হচ্ছে, কোনো খারাপ কিছু ঘটেছে।”

ইহাব কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না। চুপচাপ সেখান থেকে চলে গেল। মানহা আশাহত হয়ে আবারও ফোনে ট্রাই করতে লাগল তবে এবারও ফলাফল শূন্য।

__

নাহওয়ান খিদেয় কান্নাকাটি শুরু করেছে। এতটুকু বাচ্চার পেটে গতকাল থেকে এক গ্লাস পানি আর একটা ডিম ছাড়া আর কিছুই পড়েনি। একজন লোক গতরাতে এসে তাকে শক্ত রুটি খাওয়াতে চাইলে বাচ্চাটা সব মুখ থেকে ফেলে দিয়েছে। তারপর লোকটা ধমক দিয়ে না খাইয়েই চলে গেছে। অপরিচিত কারো হাতেই কোনো খাবার মুখে তুলছে না বাচ্চাটা। নাহওয়ানের হাত, পা খুলে দেয়া হয়েছে। ফ্লোরে প্রাণহীনের মতো পড়ে আছে সে। কয়েকজন লোক বাচ্চাটার এই দশা দেখে নকল মারওয়ানের কাছে এসে বলল,

“আজারাক সাইফার যদি জানতে পারে, আপনি তার সন্তানকে এমন নিকৃষ্টভাবে ট্রিট করেছেন আদৌ বাঁচতে পারবেন?”

লোকটা শক্ত চোখে চেয়ে বলল,

“ওকেই বাঁচিয়ে রাখব না আর ওর সন্তান তো মামুলী বিষয়।”

একজন বললেন,

“এত বড় বড় কথা পিছনে পিছনেই বলতে পারেন। তার সামনে দেখব হিসু করে দিয়েছেন। আর কেউ না জানুক তার ভয়ংকর রূপের সাথে আমাদের সবারই ভালো জানাশোনা আছে।”

লোকটা বিশ্রী হেঁসে বলল,

“এজন্যই তো বস তার প্রাণভোমরাকে তুলে আনতে বলেছেন। এখন তেজ দেখাবার আগে কয়েকবার ভাববে। বেশি তেড়িবেড়ি করলেই ওর বাচ্চা শেষ। এতদিন বহুত চেষ্টা করেছে স্ত্রী, সন্তান, পরিবারকে রক্ষা করতে। পেরেছে কি? আমার হাতের নাগাল থেকে বাঁচা কিছুতেই সম্ভব নয়।”

তার কথা শুনে সবাই চুপ হয়ে গেল। একজন ফট করে বলে বসল,

“সম্ভব হবেই বা কীকরে? প্রত্যেকবার ছলনার আশ্রয় নিয়ে তাকে কাবু করেছেন। সামনাসামনি বস কিংবা আপনার কারোরই ক্ষমতা নেই তাকে টেক্কা দেয়ার। এটা অস্বীকার করতে পারবেন?”

লোকটা এই কথা শুনে প্রচণ্ড রাগান্বিত হলো। উত্তেজিত হয়ে উঠে এসে ওই ব্যক্তির মুখে ঘুষি বসিয়ে দিল। সবাই এগিয়ে এসে থামাল। নিজের লোকদের সাথে মারামারি করে রক্তারক্তি ঘটালে শত্রুকে দমন করা যাবেনা। সবাই বুঝিয়ে নকল মারওয়ানকে শান্ত করল।

দূরে দাঁড়ানো একজন এগিয়ে এসে বলল,

“কাল থেকে বাচ্চাটিকে কিছুই খাওয়াতে পারছি না। বহু কষ্টে একটু পানি ও ডিম খাইয়েছি। কারো হাতেই কিছু খাচ্ছে না স্যার। এভাবে থাকলে বাচ্চাটা মারা যাবে।”

লোকটা রকিং চেয়ারে দোল খেতে খেতে বলল,

“যাক, সেটাই তো চাই।”

সেই মুহূর্তে বসের ফোনকল এল। লোকটার দিকে ফোনকল এগিয়ে দিতেই ওপাশ থেকে নির্দেশ দেয়া হলো বাচ্চাটাকে যেকোনো মূল্যে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। আজারাক সাইফারকে এখানে আনার একমাত্র হাতিয়ার ওই শিশুটি। বহু বছর ধরে পাতানো ফাঁদ এক নিমিষে ভেস্তে দেয়া যাবে না। বাচ্চাটাকে খাইয়ে পরিয়ে সুস্থ করে সাইফারকে ডাকতে হবে। ছেলের ডাকে এমনিতেই হাজির হয়ে যাবে। তখনই আসল খেলা জমবে।

ওপাশ থেকে কল কেটে যাওয়ায় মারওয়ান সেজে থাকা লোকটা বসের নির্দেশমতো নাহওয়ানের দিকে এগিয়ে আসতেই বাচ্চাটা ভয়ে কুকড়ে গেল। বাচ্চাটাকে ভয় পেতে দেখে জিদে বলল,

“এইটা এমন করছে কেন? আবারও মাইরে ঘুরায় এরে?”

তার বডিগার্ড এগিয়ে এসে বলল,

“স্যার আপনি এখন আসল চেহারায় আছেন।”

“ওহ শিট।”

বলেই ভিতরে চলে গেল। সিলিকন ফেসিয়াল মাস্ক লাগিয়ে পুরোপুরি মারওয়ানের রূপ ধারণ করে নাহওয়ানের সামনে দাঁড়াতেই বাচ্চাটা নির্জীব গলায় বলল,

“বাবা, পুচা। মাচ্চে, বেতা বেতা।”

নকল মারওয়ান ফোঁস করে উঠে কিছু বলতে চাইলে বডিগার্ড তাকে বসের কথা স্মরণ করিয়ে দিল। লোকটা থেমে গিয়ে খাবারের প্লেট হাতে নাহওয়ানের সামনে বসতেই বাচ্চাটা পিছিয়ে গেল। লোকটা বিশেষ পাত্তা দিল না। মারওয়ানের কণ্ঠ অনুকরণ করে কর্কশ গলায় ডাকল,

“এই খেতে আয়।”

নাহওয়ান এল না। বাবাকে ভীষণ ভয় পাচ্ছে সে। বডিগার্ড আবারও এগিয়ে এসে বলল,

“স্যার বাচ্চাদের এভাবে ডাকলে তারা ভয় পায়। আদুরে গলায় ডাকুন।”

নকল মারওয়ান এবার ধমক দিয়ে বলে উঠল,

“এসব ন্যাকামি আমার মুখে আসেনা। এত আদর করতে চাইলে তুমি এই মাস্ক পরে খাওয়াও। আলগা আদর, কথা কোনোটাই মুখ দিয়ে বেরোয় না আমার।”

বডিগার্ড লোকটি ভীত না হয়ে বলল,

“এতে আপনারই ক্ষতি স্যার। মনে রাখবেন, আজারাক সাইফারের জিয়ন কাঠি কিন্তু এই বাচ্চাটা।”

এবারে লোকটা শান্ত হলো। খুবই মোলায়েম কণ্ঠে ডাকল,

“এদিকে এসো।”

পিছন থেকে বডিগার্ড আবারও বলল,

“স্যার আপনার কণ্ঠ এখনো কর্কশ শোনাচ্ছে।”

“আরে এর থেকে মিষ্টি সুরে কেমনে ডাকব? ছাগলের মতো বারবার স্যার স্যার করবে না।”

বর্ডিগার্ড কথায় দাড়ি টানল। নকল মারওয়ান অনেক মোলায়েম গলায় ডেকে কালকের থাপ্পড় মারা স্থানে অর্থাৎ গালে আদর করে বলল,

“এইযে বাবু, বাবা তোমার জন্য খাবার এনেছি। আসো খাইয়ে দেই।”

নাহওয়ান গাল ফুলিয়ে ছলছল চোখে চেয়ে আছে তার দিকে। এই ডাকে মোটেও ভালোবাসা খুঁজে পাচ্ছে না বাচ্চাটা। বাবা তো কখনো তাকে এভাবে ডাকেনি। শিশুরা নাকি ভালোবাসা, আদর, রাগ সব বোঝে। কে তাকে আসলেই ভালোবাসছে অথবা মেকি ভালোবাসছে সবই তারা বুঝতে পারে। নাহওয়ানেরও মনে হচ্ছে বাবা নামক লোকটা তাকে মোটেও আদুরে গলায় ডাকছে না। কেমন যেন খাপছাড়া গলায় ডাকছে। নাহওয়ান এতে সাড়া দিল না। নকল মারওয়ান এবার ত্যক্ত বিরক্ত হয়ে বলল,

“এমন পান্ডার মতো চেয়ে আছিস কেন? ডাকছি কথা কানে যায়না। গোল আলু কোথাকার।”

নাহওয়ান এবার ‘বাবা বাবা’ করে ডেকে উঠে দুর্বল শরীরটা টেনে বহু কষ্টে দৌঁড়ে এসে নকল মারওয়ানের গলা জড়িয়ে ধরল। এতে লোকটা যারপরনাই অবাক হলো। এতক্ষণ এত মিষ্টি সুরে ডেকেও লাভ হলো না যেই খ্যাটখ্যাট করে কথা বলল অমনি সাড়া দিল? সাইফারের পুত্র আরেক সাইফার। ভালোবাসার মিষ্টি ভাষা বোঝে না, বোঝে শুধু রাগের ভাষা। যাক ভালোই হয়েছে। বাচ্চাটাকে তো বশ করা গেল। খাবার মুখে তুলে খাইয়ে দিতে লাগল। নাহওয়ান না করল না। চুপচাপ ভদ্র বাচ্চার মতো লোকটার শরীরে লেপ্টে খেতে লাগল। খাওয়া শেষ করে পানি খাইয়ে মুখ মুছিয়ে দিয়ে লোকটা শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল,

“এই তোর নাম কি?”

নাহওয়ান গোলগোল আঁখিতে চেয়ে আছে। নকল মারওয়ান যদিও নামটা জানে তবুও বাচ্চাটাকে রিল্যাক্স করতে জিজ্ঞেস করল। নাহওয়ানকে হা করে তাকিয়ে থাকতে দেখে বলল,

“এভাবে চেয়ে আছিস কেন? তোর নাম কি? তোর বাপের নাম কি?”

নাহওয়াম নিজের নাম মোটামুটি বলতে পারলেও বাবার নাম বলতে পারেনা। ভাঙা ভাঙা গলায় বলল,

“আমাল নাম নাওয়ান।”

“তোর নাম নাহওয়ান সেটা আমি জানি। পুরো নাম কী? সম্পূর্ণটা বল।”

“পাইয়াজ নাওয়ান।”

“ফাইয়াজ নাহওয়ান। বাহ্ বেশ ভালো নাম।”

নাহওয়ান লোকটার সাথে লেপ্টে থেকে বলল,

“মা কুতায়? মায়েল কাচে যাব।”

“কি জ্বালা! তোর মাকে আনব কই থেকে আবার?”

বডিগার্ড এবার এগিয়ে এসে ফিসফিস করে বলল,

“স্যার আপনি বললে আপনার বউ সাজতে আমি রাজি।”

নকল মারওয়ান ধমকে উঠে বলল,

“পাছায় লাত্থি মারতে মারতে তোমার চামড়া তুলে ফেলব বেয়াদব। আমার বউ সাজতে রাজি মানে?”

বডিগার্ড জিহ্বায় কামড় দিয়ে আস্তে করে বলল,

“স্যার আপনার বউ বলতে বাচ্চাটার মা হতে রাজি বুঝিয়েছি। যেহেতু আপনি বাবার ক্যারেক্টারে আছেন আমিও আপনার সহযোগী হিসেবে মায়ের ক্যারেক্টার প্লে করতে রাজি সেটাই বোঝালাম।”

নকল মারওয়ান এবার শান্ত গলায় বলল,

“বাচ্চারা কি এতই বোকা যে বেটা বেটি চিনতে পারবে না? মায়ের সাজে থাকা পুরুষকে চিনতে দুই মিনিটও লাগবে না তাদের।”

“স্যার এখন মেয়ে পাব কই তাহলে? আপনাকে যেহেতু চেনেনি আমাকেও চিনবে না। এমন মেকাপ করব একেবারে আসল মাকেও ছাড়িয়ে যাবে দেখবেন।”

“বেক্কলের মতো কথাবার্তা। তুমি ওর মাকে কোনোদিন দেখেছ?”

এ পর্যায়ে বডিগার্ড লোকটার কথায় ভাটা পড়ল। আসলেই তো দেখেনি। তাহলে কিভাবে কি হবে? গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,

“স্যার কোনো ব্যাপার না, ওর মা তো বেশিরভাগ সময়ই বোরকা পড়ে আমিও সেভাবে উপস্থিত হবো। এখন আরও আমার সুবিধা হবে।”

“তোমার যা ইচ্ছে তাই করো।”

বডিগার্ড খুশি হয়ে বোরকা পড়ে রেডি হয়ে এল। সেখানে উপস্থিত সবার তার এই সাজে মারাত্মক হাসি পেল। কয়েকজন হেঁসেও ফেলল তবে নকল মারওয়ানের গুরুগম্ভীর চাহনিতে সেই হাসি স্থায়ী হলো না। তার কোলে থাকা নাহওয়ান চোখ ডিমের আকৃতি করে বোরকা পড়া পুরুষটির দিকে চেয়ে আছে। আসলে বোঝার চেষ্টা করছে এটা কে? লোকটা ওর চাহনি অনুসরণ করে বলল,

“ঐযে তোমার মা।”

নাহওয়ান তার গলা আরও শক্ত করে ধরে বলল,

“ইননা, ইটা মা না।”

বডিগার্ড এগিয়ে এসে নাহওয়ানকে নিতে চাইলে বাচ্চাটা গেল না। নকল মারওয়ানকে চেপে ধরে থাকল। কয়েকজন ইতোমধ্যে ফিক করে হেঁসে ফেলেছে। বোরকা পরা বডিগার্ড নকল মারওয়ানের কানে কানে ফিসফিস করে বলল,

“স্যার চলেন রোমান্টিক মুডে কথা বলি। তাহলে বুঝবে আমি ওর মা।”

লোকটা বেশ বিরক্ত গলায় বলল,

“আর কিছু? অনেস্টলি বলি, তোমাকে দেখে কিছুতেই মেয়ে মনে হচ্ছে না। ওর মা হওয়া তো দূরের বিষয়।”

“আরে স্যার এত কষ্ট করে এতদূর এসেছি। শেষ চেষ্টা তো করতে দিন।”

“করো তোমার আখেরি চেষ্টা।”

বডিগার্ড এবার রোমান্টিক মুডে লোকটাকে জড়িয়ে ধরে বলল,

“আমার বাচ্চাটাকে নিয়ে আপনি কোথায় চলে গিয়েছিলেন প্রিয়তম?”

নকল মারওয়ান দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিস করে বলল,

“ওভার অ্যাক্টিং কম করো।”

বডিগার্ডও ফিসফিস গলায় বলল,

“স্যার কথা না বলে কোঅপারেট করেন।”

লোকটা গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,

“এইতো প্রিয়তমা এখানেই ছিলাম।”

নাহওয়ান অপরিচিত একজন নারীকে বাবাকে জড়িয়ে ধরতে দেখে রাগান্বিত হয়ে হাত দিয়ে সরিয়ে দিতে দিতে কিল বসিয়ে বলল,

“চারো বাবাকে। পুচা কোতাকার, চারো। মাকে কিনটু সব বলে ডিব।”

লোকটা এবার বডিগার্ডকে ঝাড়া মেরে সরিয়ে দিয়ে নাহওয়ানকে ধরে বলল,

“রিল্যাক্স, ওটা কোনো মেয়ে নয়। দেখ ওটা একজন আংকেল।”

বডিগার্ড বোরকা খুলে ফেলতেই তাকে দেখে নাহওয়ান গুলুমুলু শরীরটা দুলিয়ে ফিচফিচ করে হেঁসে বলল,

“আংটেল মংটেল।”

বডিগার্ড লোকটা গোমড়ামুখে নাহওয়ানের ফোঁকলা হাসির দিকে চেয়ে রইল। ভাবা যায়, এইটুকু বাচ্চা তাকে মেরেছে শুধু তার বাবাকে ধরার জন্য? সাংঘাতিক! সেখানে উপস্থিত সকলে ইতোমধ্যে হেঁসে খুন।

চলবে…..

(আসসালামু আলাইকুম।)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply