ভবঘুরে_সমরাঙ্গন
পর্ব_৪৯ (প্রথমাংশ)
তাজরীন ফাতিহা
দুর্নিবার এই যাত্রাপথ ঘটায় আকস্মিকতা
জীবন রচে অমরগাঁথা, মন কেন দিশাহারা?
~তাজরীন ফাতিহা
মানবজীবনে মাঝে মধ্যে কিছু অভাবনীয় পরিবর্তনের ঝলক দেখা যায় যা আকস্মিক ভাবে তার চমকপ্রদ উপস্থিতির জানান দেয়। একরাশ সীমাহীন কষ্ট পেরিয়ে দুঃখ ক্লেশ গুলো অন্তরীক্ষের শূন্যগর্ভের ন্যায় অতলে তলিয়ে যায় মুহুর্মুহু। অদৃশ্য ঝলকানির পেরেক গেঁথে মনকে করে আন্দোলিত। নিশাতের ব্যাপারটা কোন পর্যায়ে ফেলা যায় তার পরিধি এখনো করা হয়নি।
বিছানায় শায়িত এক সত্তা। মাথার উপরে সিলিং ফ্যান ঘুরছে বিরামহীন। বালিশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা খোলা চুলগুলো বাতাসে উড়ছে এলোমেলো। অদূরে জানালার পর্দাগুলো দুলছে। পিটপিট করে চোখ খুলে আশেপাশে নজর বুলালো নিশাত। কেউ নেই রুমে। দীর্ঘক্ষণ চোখ বন্ধ থাকায় মাথা ব্যথা করছে তার। কোথায় ছিল, কি ঘটেছিল এসব স্মৃতিপটে উঁকি দিতেই নিশাত তড়াক শোয়া থেকে উঠে বসল। দ্রুত রুম থেকে বেরুতেই দেখল মারওয়ান রান্নাঘরে কি যেন করছে। নিশাত হুড়মুড় করে মারওয়ানের বাহু ধরে উত্তেজিত কণ্ঠে বলল,
“এই আপনি আমার স্কুলে গিয়েছিলেন?”
মারওয়ান চা বানাতে গিয়ে চিনির শরবত বানিয়ে ফেলেছে। এটা নিয়েই তার মেজাজ খিটমিট করছিল এখন আবার নিশাতের প্রশ্নে আরও মেজাজ চড়া হলো। রুক্ষ গলায় বলল,
“তোমার স্কুলে আমি যাব কেন? Why? সেখানে আমার কাজ কি”
নিশাত মারওয়ানের শার্টের দুপাশ চেপে ধরে বলল,
“খবরদার মিথ্যা বলবেন না। আমি স্পষ্ট আপনাকে দেখেছি। ওটা আপনিই ছিলেন। আমার সাথে কোনো লুকোচুরি খেলা খেলবেন না বলে দিলাম।
খরখরে গলায় মারওয়ান প্রতিউত্তর করল,
“আশ্চর্য তোমার সাথে কি আমার খেলাধুলার সম্পর্ক? তুমি ফুটবল খেলোয়াড় নাকি ক্রিকেট খেলোয়াড়?”
নিশাত শার্ট আরও শক্ত করে চেপে বলল,
“ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কথা বলবেন না। যা বলার সাফ সাফ বলুন। ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কথা বলে ভীতু আর অপরাধীরা। আপনি কি সেরকম কিছু? একদম হেলা করবেন না বলে দিচ্ছি। মোটেও ভালো হবে না।”
মারওয়ানের শ্লেষাত্মক কণ্ঠ,
“আচ্ছা করলাম না হেলা। হ্যাঁ তোমার স্কুলে আমিই ছিলাম। এবার কি করবে?”
নিশাত আশ্চর্যান্বিত হয়ে কলার ছেড়ে দিল। একবার জেরা করতেই ঘাড়ত্যাড়া লোকের কাছে এমন ফটাফট উত্তর আশা করেনি নিশাত। ধীর কণ্ঠে বলল,
“আপনি পুলিশ?”
মারওয়ান বাঁকা হাসল,
“হ্যাঁ। এবার তোমাকে থানায় ট্রান্সফার করব। একজন আইনের লোকের কলার ধরার অপরাধে, এতদিন মুখে মুখে তর্ক করার কারণে তোমাকে গ্রেফতার করা হলো ফৌজিয়া নিশাত। ইউ আর আন্ডার অ্যারেস্ট।”
নিশাত জবাব না দিয়ে ঢোক গিলতে লাগল। মারওয়ান এক ভ্রু উঁচিয়ে তার দিকে চেয়ে। নিশাত একটু স্থির হয়ে বলল,
“বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে।”
“তো কোরো না। কে বলছে বিশ্বাস করতে?”
মারওয়ানের খাপছাড়া উত্তর। নিশাত একটা লম্বা শ্বাস ফেলে বলল,
“কতদিন হলো এই পেশায় আছেন?
“বহুদিন।”
“আপনি ভাদাইম্মা, আকাইম্মা দেখাতেন আদতে আপনি তা নন তাইতো?”
“জানি না।”
“কখনো বলেননি কেন?”
“আমার ইচ্ছা।”
“আমার সাথে এত গোপনীয়তা কেন?”
“কারণ তুমি বিশ্বাসভাজন নও তাই।”
“বিশ্বাসভাজন কে তাহলে?”
“আমার একান্তজন।”
“আপনার একান্তজন কে?
মারওয়ানের বিরক্ত কণ্ঠ,
“এত প্রশ্নের উত্তর দিতে বাধ্য নই। চা বানিয়ে দাও।”
নিশাত জেদি গলায় বলল,
“আমিও চা বানাতে বাধ্য নই। আপনার একান্তজনকে বলুন।”
“ত্যাড়ামি কোরো না ফৌজিয়া নিশাত। একদম জেলে ভরে দেব।”
“দিন। এই সংসারের চেয়ে জেল অত্যাধিক শ্রেয়।”
“ভয় ডর নেই?”
“না।”
“স্বামীর মুখে মুখে তর্ক করা বেত্তমিজ মহিলাদের কাজ। তুমি কি বেত্তমিজ?”
মারওয়ানের গুরুগম্ভীর প্রশ্ন। নিশাত সোজাসাপ্টা বলল,
“আপনাকে স্বামী কে বলল? জালিমদের উচিত জবাব দেয়া ভালো কাজ।”
“স্পর্ধা কত? আমাকে ইনডাইরেক্টলি জালিম বলছো?”
“ইনডাইরেক্টলি বলিনি ডাইরেক্টই বলেছি। অবশ্য আপনার গায়ে লাগলে তো? যেই গন্ডারের চামড়া, বাপরে!”
মারওয়ান ভ্রু কুঁচকে বলল,
“আজকে মনে হয় বেশি মুখ চলছে? ভুলে যাচ্ছ নাকি আমি কে?”
নিশাত চুলগুলো হাত খোঁপা করতে করতে বলল,
“ভুলিনি। আগে তর্ক করতাম না বেকার, ভবঘুরে দেখে। এদের সাথে তর্ক জমিয়ে বিশেষ ফায়দা নেই। তর্ক জমে সেয়ানে সেয়ানে।”
“বলতে চাচ্ছ আগে আমি বুদ্ধিমান ছিলাম না?”
“অবশ্যই না। বুদ্ধিমান পুরুষ কোনোদিন শুয়ে বসে থেকে বউকে ইনকামে পাঠায় না। বুদ্ধিমান বলছি কি প্রকৃত পুরুষ মানুষ কখনো বউয়ের টাকায় চলে না। উল্টো বউকে ঘরের রাণী করে রাখে। ঠিক যেমন ঝিনুক তার মুল্যবান মুক্তা খোলসে সযত্নে রাখে ঠিক তেমন।”
মারওয়ান হামি দিয়ে নির্লিপ্ত গলায় বলল,
“ও আচ্ছা।”
“যাইহোক আপনি এসব কাজ আমার আড়ালে করতেন তো নাহওয়ানকে রাখতেন কোথায়?”
“কোথায় আবার রাখব, আমার কাছেই থাকত। আর তুমি স্কুলে থাকতে কাজে গিয়েছি আজকেই শুধু। বেশিরভাগ সময় তুমি বাসায় ফিরলে যেতাম।”
“কই আজ তো দেখলাম না। আজকে ছেলেকে কোথায় রেখেছিলেন?”
“ও ঘুমে ছিল। তাই ঘুম পাড়িয়ে রেখে এসেছিলাম। ওর ঘুম থেকে উঠতে উঠতে আমি হাজির হয়ে যেতাম।”
কথা শেষ হতেই নাহওয়ানের গলার আওয়াজ পাওয়া গেল। ঘুম ঘুম চোখ ডলতে ডলতে বাচ্চাটা উঠে এসেছে। মাকে সামনে দেখে ডেকে উঠল,
“মা।”
নিশাত এগিয়ে এসে ছেলেকে কোলে নিয়ে গালে ওষ্ঠ চেপে ধরে বলল,
“আমার ছানার ঘুম ভেঙেছে?”
নাহওয়ান নিশাতের ঘাড়ে মাথা ফেলে ঘুম ঘুম গলায় বলল,
“বাংগিচে। সুসু কলব।”
“চলুন চলুন হিস করিয়ে আনি।”
নিশাত ছেলেকে নিয়ে রান্নাঘর থেকে বেরুতে নিলেই পিছন থেকে মারওয়ান বলে উঠল,
“মিসেস মারওয়ান এক কাপ মশলাদার চা পেতে পারি?”
সম্বোধনে নিশাতের চলন্ত পা জোড়া থেমে গেল মুহুর্তেই। চেহারায় ফুটে উঠল কিংকর্তব্যবিমূঢ়তা নাকি প্রশান্তি বোঝা গেল না। বিস্মিত নেত্রে কেবল মাথা নাড়াল।
__
আজকে মানহার ইয়ার ফাইনাল এক্সাম শুরু হয়েছে। ইহাব মানহার কলেজের সামনে বাইকে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। গেট দিয়ে ঢুকতে বেরুতে প্রায় সকলের চক্ষু তার উপরে পড়ছে। পড়াটাই স্বাভাবিক। স্বয়ং চেয়ারম্যান পুত্রের পদধূলি পড়েছে কলেজ প্রাঙ্গণে এটা তো খুশির সংবাদ। অধ্যক্ষ মহোদয়ের সাথে মোলাকাত করে এসেছে ইহাব। তিনি ইহাবের ব্যাপারে হৃদ্যতা প্রকাশ করেছেন। ইহাব বেশিক্ষণ থাকেনি। পরিকল্পনা করেছে মানহাকে নিয়ে এখান থেকে শ্বশুরবাড়ি যাবে। যেহেতু মানহার ক্যাম্পাসের কাছেই তাদের বাড়ি তাই একবার দেখা দিয়ে আসা দরকার। অনেকদিন কাউকে জ্বালানো হয়না। ইশ মারওয়ানটা যদি থাকত তাহলে একেবারে জমে যেত। ভাবনার মাঝে মানহাকে দৃষ্টিগোচর হলো তার। নিকাব থাকায় মানহার ভাবমূর্তি বোঝা যাচ্ছে না তবে ইহাবের কেন যেন মনে হচ্ছে পরীক্ষা ভালো হয়নি মানহার। মানহা এগিয়ে এসে বলল,
“আপনাকে চলে যেতে বলেছিলাম না?”
“তুমি যেতে বললেই আমি যাব কেন? আমার মর্জি।”
মানহা গম্ভীর স্বরে বলল,
“এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নারীদের দর্শন দিচ্ছেন সেটা বললেই তো হয়। মহিলা কলেজের সামনে আপনার দাঁড়িয়ে থাকতে হবে কিজন্য? অন্য কোথাও দাঁড়ানোর জায়গা ছিল না?”
ইহাব সানগ্লাস খুলে বলল,
“আর ইউ জেলাস?”
“না স্বামীর জন্য জেলাস হব না, হব অন্য বেডার জন্য। যত্তসব সিনেমার ডায়লগ মারাইতে আসে আমার সামনে।”
ইহাব হতবাক হয়ে বলল,
“এসব কি ভাষা! তুমি এমন ভাষা ইউজ করো?”
“কেন এসব ভাষা কি কারো জন্য দলিল করা যে আমি বলতে পারব না? সরুন সামনে থেকে। মটকা গরম থাকলে আমি সব ভাষায় কথা বলি। তাই যথাসম্ভব দুরত্ব বজায় রাখুন যেকোনো সময় মটকা ফেটে যেতে পারে।”
“মটকা ফেটে গেলে ব্রেইনও নিশ্চয়ই ফেটে যাবে? ভালোই হবে, এরকম আনরোমান্টিক ব্রেইনের প্রয়োজন নেই।”
মানহা রাগে কথা বলতে ভুলে গেল। সিরিয়াস সময়ে এমন ইতরামি কার ভালো লাগে? খিটমিটে মেজাজে বলল,
“আপনি ভালো হবেন না?”
ইহাব বাইকে বসে বলল,
“আমি খারাপ হলাম কবে?”
“আমি সিরিয়াস কথা বলছি।”
“আমিও তো সিরিয়াসলি বলছি। কেন তোমার মনে হচ্ছে না? কাছে আসো মটকা ফাটিয়ে দেই।
ছু মন্তর ছু
কালি কুত্তার গু
লাক ভেলকি লাক
দ্রুত মটকা ফাট।”
মানহা আর এক মুহুর্ত দাঁড়িয়ে না থেকে রাগান্বিত হয়ে হেঁটে যেতে লাগল। পথিমধ্যে তার ক্লাসের এক মেয়ের কথায় থেমে যেতে বাধ্য হলো।
“চেয়ারম্যান বাড়ির বউ হয়ে ভাবের ঠেলায় পা মাটিতে পড়ে না। না চাইতেও পেয়ে গেছে তো তাই মূল্য দেয়না। আমার জামাই এত্ত কেয়ারিং, মজার হলে আমি তো মাথায় করে রাখতাম। এইজন্যই ছোট বাড়ির মেয়ে বড় বাড়িতে বউ করা উচিত না। বেশি পেয়ে এরা দাপটে পা ফেলে না। ঢং দেখলে বাঁচি না।”
ইহাবের কর্ণকুহরে কথাটা পৌঁছাতেই চোখ মুখ ক্রোধে লাল হয়ে উঠল। তৎক্ষণাৎ সেদিকে ঘুরে বলল,
“বাঁচতে বলেছে কে? মরে যান। বিশ্বাস করুন, মানহার ঢংয়ে যদি আপনি মরেন তাহলে আমি নিজ দায়িত্বে ওকে আরও ঢং শেখাব। ঢংয়ের বদৌলতে আপনাদের মতো দু চারটা মরলে তার আরও সওয়াব হবে। আমি চেয়ারম্যান পুত্র ইহাব ভুঁইয়া বলছি, সমাজ থেকে এরকম বিষাক্ত কীট দূর করার দায়ে মিসেস আফরিনকে পুরস্কারে ভূষিত করব। মাইন্ড ইট।”
কথা শেষ করে মানহার দিকে একপল চেয়ে বলল,
“রাস্তার কুকুর ঘেউ ঘেউ করবেই। এতে দাঁড়িয়ে না থেকে সামনে এগিয়ে যেতে হয়।”
কথা শেষ করে হাত মুঠো করে একনজর মেয়েটির পানে চেয়ে মানহার হাত ধরে চলে গেল। সহপাঠী মেয়েটি চরম অপমানিত হলো। ভরা রাস্তায় এতগুলো মানুষের সামনে এমন অপমান ও কুকুর সম্বোধনে লজ্জাও পেল বেশ। ভবিষ্যতে মানহার সাথে পাঙ্গা দেয়ার আগে আজকের কথা অবশ্যই মনে পড়বে তার। সাপের লেজে পাড়া দিয়েছে ছোবল তো খেতেই হবে।
চলবে….
(আসসালামু আলাইকুম।)
ভবঘুরে_সমরাঙ্গন
পর্ব_৪৯ (বর্ধিতাংশ)
তাজরীন ফাতিহা
সময়টা মধ্যাহ্নের খানিক আগে। নিশাত বাজারে গিয়েছে। গতকাল মারওয়ান নিজ থেকেই হাতে টাকা ধরিয়ে বলেছে যা ইচ্ছে হয় কিনে আনতে। নিশাতের কি যে ভাল্লাগছিল তখন। এমন একটা মুহূর্তের জন্য সেই বিয়ের পর থেকে অপেক্ষারত ছিল। আল্লাহ তার মনস্কামনা পূরণ করেছেন। আল্লাহর দরবারে ইতোমধ্যেই কয়েকবার শুকরিয়া জ্ঞাপন করে ফেলছে নিশাত। স্কুল থেকে কিছুদিনের ছুটি নিয়েছে সে। ওই ঘটনার পরে একদিনও স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। ঘরেই অলস সময় পার করছিল বিধায় বাজারের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েছে। ঘরের সওদাপাতি দরকার ছিল কিছু। মারওয়ান ছিল তখন ঘুমে। অনবরত দরজা ধাক্কানোর ফলে সে বেশ বিরক্ত হলো। এইসময়ে এমন বুলডোজার চালাচ্ছে কে দরজার ওপর? নিশাত তো এমন কান্ডজ্ঞানহীনের মতো দরজা ধাক্কায় না। নিশ্চয়ই দারোয়ান নয়তো ময়লাওয়ালা এসেছে। এরা এমনভাবে দরজা ধাক্কাবে যেন পারেনা দরজা ভেঙে ঘরের মধ্যে ঢুকে যায়। মারওয়ান বিরক্তিকর চেহারা বানিয়ে দরজা খুলে দিতেই গায়ের উপর হুড়মুড়িয়ে কিছু পড়ল।
“আসসালামু আলাইকুম শ্লা ব্রো। দিনকাল কেমন যায়?”
মারওয়ান বজ্রাঘাত পড়ার ন্যায় হা করে তাকিয়ে আছে। মুখে রা নেই। ইহাব জোরসে ধরায় হাড্ডি গুলো একত্র হওয়ার জোগাড়। ইহাব একটা অকল্পনীয় কান্ড ঘটিয়ে ফেলেছে। শ্বশুরবাড়ি থেকে সোজা মারওয়ানের বাড়িতে হাজির হয়ে গেছে। মানহা ভাইকে দেখে এগিয়ে এলো। বোনের ডাকে মারওয়ান স্তব্ধতা কাটিয়ে কোনরকম বলল,
“তোরা এখানে?”
উত্তরটা ইহাব দিল,
“মিস করছিলাম ব্রো।”
মারওয়ান গম্ভীর সুরে বলল,
“বাসা চিনলি কিভাবে?”
ইহাব মারওয়ানকে ঠেলে ভিতরে ঢুকতে ঢুকতে বলল,
“আরে এটা আমার জন্য কোনো ব্যাপার হলো? ইহাব’স কেরামতি বস।”
মানহা ভাইয়ের কুঞ্চিত চেহারার দিকে চেয়ে বলল,
“ভাইয়া, তিনি মজা করছেন। ঠিকানা আব্বা দিয়েছেন।”
মারওয়ান মুখ টানটান করে বলল,
“ভেতরে আয়। তোর ভাবি বাজারে গেছে। আসলে গেট খুলে দিস। আমার ঘুম হয়নি এখনো, খবরদার ডিস্টার্ব করবি না। আর তোর পাশেরটাকে বলিস দরজার পাশে ময়লার বালতি রাখা আছে ওটা নিচে ফেলে আসতে। এসেছে যেহেতু শখ মিটিয়ে যাক।”
বলেই গটগট পায়ে প্রস্থান করল। মানহা আহাম্মকের মতো দাঁড়িয়ে রইল। ইহাব পিছন থেকে চিল্লিয়ে বলল,
“মেহমান দিয়ে ময়লা ফেলে কে ভাই?”
ঘর থেকে মারওয়ানের আওয়াজ ভেসে এলো,
“মেহমান কে?”
ইহাবের ছটফটে উত্তর,
“মেহমান কে মানে? আমি কী?”
“অফকোর্স উড়ে এসে জুড়ে বসা মাল।”
“এত বড় কথা! এক্ষুনি চলে যাব। কেউ আটকাতে পারবে না বলে দিচ্ছি।”
মারওয়ান রুম থেকেই বলল,
“হ্যাঁ তোকে আটকাতে দরজার পাশে বিল গেটস বসে আছে।”
ইহাব মুখ লটকে জোরে বলল,
“একবার বেরিয়ে গেলে আর আটকানো যাবে না কিন্তু।”
মারওয়ান রুম থেকে বেরিয়ে এসে সটান দাঁড়িয়ে বলল,
“কে আটকাবে শুনি?”
ইহাব মুখ ভার করে বলল,
“জানি না। তবে যেই আটকাক আমি থাকব না।”
মারওয়ান ভ্রু কুঁচকে বলল,
“আশ্চর্য তোকে আটকাচ্ছে কে?”
“মেহমানকে এত অপমান আল্লাহ সইবে না।”
“মেহমান?? আমি তো দেখছি আস্ত এক গার্বেজ। শোন ময়লা ফেলতে নিচে গেলে নিজেকেও ফেলে আসিস। হুদাই সকাল সকাল চোখ মুখ দুইটাই নষ্ট হলো।”
কথা শেষ করে একমুহুর্ত দাঁড়িয়ে না থেকে আবারও রুমে চলে গেল। ইহাব প্রতিউত্তর করতে যাচ্ছিল অমনি মানহা পাশের রুমে টেনে নিয়ে গেল। এরা দুটো এক হলেই সাপ, বেজির মতো কামড়াকামড়ি শুরু করে। বাপরে!
রান্নাঘরে নিশাতের সাথে হাতে হাতে কাজ করছে মানহা। নিশাত বাজার থেকে এসে মানহাদের দেখে অবাকের সাথে সাথে খুশিও হয়েছে বেশ। এই প্রথম মানহা তাদের বাসায় এসেছে খুশি না হয়ে উপায় আছে? ভাগ্যিস নিশাত বাজারে গিয়েছিল নয়তো মেহমানদের কি দিয়ে আপ্যায়ন করতো? আল্লাহ তায়ালা মেহমান পাঠাবেন বলেই বোধহয় আজ বাজারে গিয়েছিল সে। আলহামদুলিল্লাহ।
চুলোয় শুঁটকি ভুনা করছে নিশাত। মানহা রোস্টের জন্য চিকেন মেরিনেট করে রাখছে। আরেকপাশে পানি ঝরতে পোলাওয়ের চাল ধুয়ে রেখেছে। মানহা চিকেন মেরিনেট করে চাপা দিয়ে রাখল। তারপর নিশাতের দিকে ফিরে বলল,
“ভাবি, সংসার করা অনেক ঝামেলার।”
নিশাত কড়াইয়ে ঢাকনা দিয়ে বলল,
“সব কিছুই ঝামেলা বোন। ঝামেলা ছাড়া কোনো কাজ হয়?”
“সেটা ঠিক বলেছ। তবে আমার মনে চায় সারাদিন ঘুমিয়ে থাকি কিন্তু সেটা অসম্ভব।”
নিশাত বেসিনে হাত ধুয়ে বলল,
“তোমার শ্বশুর, শাশুড়ি, ননদ কেমন আছেন?”
“আলহামদুলিল্লাহ সবাই ভালো।”
“একদিন তোমার শ্বশুরবাড়ি যাব বুঝলে। তোমার শাশুড়ি মানুষটাকে দেখার আমার বড্ড ইচ্ছে। যেভাবে বর্ণনা করেছ মনে হয় সেই নারীকে সামনাসামনি না দেখলে একদমই চলবে না।”
মানহা একটু উদাসীন হয়ে গলার আওয়াজ কমিয়ে বলল,
“যেতে ইচ্ছে হলে ভাইয়াকে নিয়ে যেও। ভাইয়াটা এত্ত কাঠখোট্টা। একটুও রসকষ নেই বুঝলে? এসেছি পর একটাবার জিজ্ঞেস অবধি করেনি কেমন আছি? উনার সাথে মিলে সাপ বেজির মতো হাউকাউ জুড়ে আবার ঘুমাতে চলে গেছে। উফ এত্ত ঝগড়া বোধহয় মহিলারাও করতে পারবে না যতটা তারা দুইজন করে। মাগো!”
কথা শুনে নিশাত মুচকি হাসছে। মানহা তা দেখে বলল,
“হেসো না তো ভাবি। তুমি কিভাবে যে ভাইয়ার সঙ্গে থাকো আল্লাহই জানে। এমন ঘাউরা আর রোবট কিসিমের মানুষ আমি ইহজনমে আর দুটো দেখিনি। এক্কেবারে হিটলারের যমজ ভাই বিটলার। মায়া, মহব্বত কম।”
মানহার কথায় নিশাত একটু জোরেই হেঁসে দিল। মারওয়ান নিশাতের হাসির মাঝেই রান্নাঘরে ঢুকে ভ্রু বেঁকিয়ে বলল,
“রান্নাবান্না রেখে এত হাসাহাসি হচ্ছে কেন? খিদেয় পেট চো চো করছে আর তারা আমোদ ফুর্তি করছে। এইটা এসে আরও ডিস্টার্ব করছে। যা এখান থেকে। রান্নাবান্নার ‘র’ ও তো জানিস না এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দাঁত কেলাচ্ছিস কেন? যা ভাগ।”
বলেই মানহার মাথায় চাটি মারল। মানহা ঠোঁট উল্টে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
“রান্নাবান্নার ‘র’ ও না জানলে শ্বশুরবাড়ি কি তুমি রেঁধে দিয়ে আসো?”
মারওয়ান মানহার মাথায় আবারও ঠোঁসা দিয়ে বলল,
“আমকে ওসব ভংচং বিশ্বাস করতে বলিস না। তোর শ্বশুর বাড়ি যেই বড়লোক তুই সেখানে ঘুম ছাড়া আর কোনো কাজ করিস বলে মনে হয়না। সেখানে উঠতে, বসতে, শুতে কাজের লোক ফিক্স। ইভেন হাগতেও তোদের লোক লাগে। এখানে এসে যতই ফাঁপর মারিস সত্য কোনোদিন মিথ্যা হবে না।”
ভাইয়ের কথা শুনে মানহা নিশাতের দিকে গাল ফুলিয়ে চাইল। নিশাত হেঁসে তরকারি নাড়াতে নাড়াতে বলল,
“সবসময় এত বিটলামি করেন কেন বিটলার মহাশয়?”
মারওয়ান ভ্রু নাচিয়ে বলল,
“বিটলার আবার কে?”
নিশাত কিছু বলতে নিলেই মানহা চোখ দিয়ে ইশারা করল কিছু না বলতে। নিশাত তা দেখে কথা ঘুরিয়ে বলল,
“কেউ না। আপনি বাইরে যাবেন?”
“না।”
“কেন আপনার কাজ নেই আজ?”
মারওয়ানের দিকে চেয়ে নিশাতের কথা বন্ধ হয়ে গেল। এমনভাবে তাকিয়ে আছে যেন নিশাতকে এখনি চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে। নিশাত জিভে কামড় দিয়ে অন্যদিকে তাকালো। মানহা নিশাতের দিকে চেয়ে অবাক গলায় বলল,
“ভাইয়া এখন কাজ করে ভাবি?”
নিশাত আমতা আমতা করে বলল,
“আরে না। সিগারেট টানতে বাইরে যায় তো তাই মজা করে সেটাকে কাজ বলেছি।”
মানহা চোখ সরু করে কিছু বলতে নিলেই মারওয়ান গম্ভীর স্বরে বলে উঠল,
“শোন যেটা বলতে এখানে এসেছি, তোর জামাইকে বল আমার ছাওকে দিতে। ওকে সেই যে নিয়েছে এখনো দেয়নি। যা গিয়ে বল।”
মানহা ভাইয়ের গম্ভীর কণ্ঠ শুনে এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে না থেকে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে গেল। মানহা বেরিয়ে যেতেই মারওয়ান নিশাতের মাথায় পেঁচিয়ে রাখা ওড়নার নিচ থেকে লম্বা বেণী টেনে ধরে বলল,
“তোমাদের পেট পাতলা মেয়েদের এইজন্য কিছু জানাতে হয়না। সব এখানে ওখানে সাপ্লাই করার জন্য বসে থাকো। মাথামোটা মেয়েছেলে।”
নিশাত মাথার পিছনে হাত দিয়ে বেণী চেপে বলল,
“খেয়াল ছিল না। এত কথা শোনানোর কী আছে?”
“তোমার খেয়াল থাকে কি? আমার সাথে কিভাবে পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়া করা যায় সেটা? মন চাচ্ছে টিপে চেপ্টা করে দেই। সাইজও কম বুদ্ধিশুদ্ধিও কম। লিলিপুট কোথাকার।”
নিশাত মুখ ফুলিয়ে মারওয়ানের দিকে চেয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিল। রান্নায় মনোযোগী হলো। একটা কথাও বলবে না সে। সামান্য একটু কথা মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে এতে কি দুনিয়া একেবারে ধ্বংস হয়ে গেছে? বিড়বিড় করে বলল,
“মানহা ঠিকই বলেছে, বিটলার কোথাকার।”
মারওয়ান নিশাতের কানের কাছে গিয়ে বলল,
“তুমি তো তাহলে মিসেস বিটলার।”
নিশাত থতমত খেল। কথা শুনল কি করে?
“কান পাতছেন কেন?”
“তুমি আস্তে বলছ কেন?”
ইহাব নাহওয়ানকে বুকে নিয়ে শুয়ে আছে। নাহওয়ান ইহাবের আদরে ভর্তা হয়ে গেছে। ইহাব হেন জায়গা বাদ রাখেনি চুমু দিতে। বাচ্চাটা অসহায় হয়ে প্রথমে চিল্লাচিল্লি করেও বিশেষ ফায়দা করতে পারেনি। চিল্লালে চুমুর ডোজ আরও বেড়ে যায় অগত্যা নিরুপায় হয়ে চুমু খেয়েছে। ইহাব চুমু দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে বাচ্চাটাকে নিয়েই শুয়ে পড়েছে। নাহওয়ানের নড়াচড়ায় বিরক্ত কণ্ঠে বলল,
“এত নড়ছ কেন রসগোল্লা?”
“টিপ ডিচ্চ কেনু? উফ বেতা।”
“তোকে চটকে খেয়ে ফেলিনি শুকরিয়া কর শ্লার বেটা।”
নাহওয়ান বুকের উপর শুয়ে ছলছল নয়নে বলল,
“মাল কাচে যাব।”
“ওলে লে রসগোল্লাটা মার কাছে যাবে। না ফুপার কাছে থাকো। তোমাকে আরও চুমু দেব নে।”
বাচ্চাটা ছটফট করতে করতে বলল,
“ইননা, বাবা।”
“এই বাবাকে ডাকলে খবর আছে। এত বাবা বাবা করো কেন? ফুপা ফুপা করতে পারো না?”
নাহওয়ান ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল,
“পুপা পুচা। বাবা ভালু।”
“চুপ। তোমার বাপ একটা গোঁয়ার। যেটা নিজে ভাববে ঐটাই সঠিক আর বাকিদের আবেগ অনুভূতি সব বেঠিক।”
নাহওয়ান কিছু বুঝতে না পেরে ঠোঁট দুটো ফুলিয়ে ফেলল। ইহাব ওই ফুলো ঠোঁটে আবারও চুমু দিল। নাহওয়ান গুলুমুলু হাত দুটো দিয়ে মুখ ঢেকে গুনগুন করে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“কুতাও সান্টি নাই। চবাই বিশি বিশি চুমায়।”
ইহাব এত কিউট কিউট কথা শুনে আরও কোলের মধ্যে ঢুকিয়ে হেঁসে বলল,
“ওরে আমার রসগোল্লা, চমচম, ল্যাংচা। তোকে খেয়ে ফেলি ন্যাংটা?”
“ইননা। বাবা টুমাকে কুব মালবে।”
ইহাব ভয় পাওয়ার ভঙ্গিমায় চোখ বড় বড় করে বলল,
“ওরে বাবা! ভয় পেয়েছি। খুব মারবে?”
নাহওয়ান ঘন ঘন মাথা নাড়াল অর্থাৎ খুব মারবে। ইহাব হামি দিয়ে বলল,
“মারতে এলে তোর বাপকেও চুমিয়ে দেব বুঝলি সমুন্ধির বেটা?”
মানহা রুমে ঢুকতেই নাহওয়ান ফুপির কোলে যাওয়ার জন্য ছটফট শুরু করল। মানহা এগিয়ে এসে বলল,
“একি ওকে আপনি এমন চেপে ধরেছেন কেন? ও ব্যথা পাচ্ছে না?”
“এই সমুন্ধির বোন বেশি কথা বলবে না। বেশি কথা বললে ওকে ছেড়ে তোমাকে এভাবে ধরব।”
মানহা মুখ কুঁচকে বলল,
“ওকে ওর বাবা নিয়ে যেতে বলেছে। আমাকে দিন, ভাইয়ার কাছে দিয়ে আসি।”
নাহওয়ান বাবার কথা শুনেই ‘বাবা বাবা’ করতে লাগল। ইহাব বিরক্ত হয়ে বলল,
“এই শ্লাটা মারাত্মক ত্যাদর। একটু ওর ছেলেকে কোলে নিয়েছি এতে জ্বলে পুড়ে যাচ্ছে।”
“আপনি ওকে এতক্ষণ রেখেছেন কি মনে করে? ও বাচ্চা মানুষ বাবা, মা ছাড়া কিছু বোঝে?”
ইহাব শোয়া থেকে উঠে বসে বলল,
“বোঝে না দেখেই তো বুঝাচ্ছি। ট্রেনিং দিচ্ছি যেন বাপ বাপ না করে ফুপা ফুপা করে।”
“আপনার মতো তাড়ছিড়া দুটো দেখিনি। কোনো বাচ্চাকে দেখেছেন বাপ বাপ না করে ফুপা ফুপা করতে?”
ইহাব নাহওয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,
“দেখিনি তো কি হয়েছে? এখন দেখব। এই রসগোল্লাটা এরকম করবে। তাইনা রসগোল্লা?”
নাহওয়ান ইহাবের হাটুর উপরে বসা। ইহাবের প্রশ্নে গেঞ্জি ধরে বলল,
“ইননা।”
“মুখের উপর এভাবে না বলতে হয়না বাছা।”
ইহাবের অভিমানী জবাব। মানহা ফিক করে হেঁসে দিয়েছে। নাহওয়ান ফুপিকে হাসতে দেখে নিজেও ফিচফিচ করে হেঁসে দিল। মানহা হাত বাড়িয়ে বলল,
“আসেন আব্বা বাবার কাছে যাই।”
নাহওয়ান ফুপির দিকে হাত বাড়িয়ে বলল,
“বাবার কাচে যাব। পুপা পুচা।”
“এই পঁচা বললে কেন? আর ছাড়ব না। পঁচা বলার শাস্তি এটা। কত আদর করে রসগোল্লা ডাকি আর সে আমাকে পঁচা ডাকে। খুব কষ্ট পেলাম, রাগ করেছি।”
বলেই ইহাব ঠোঁট উল্টালো। নাহওয়ান ইহাবের কোলের মধ্যে চুপটি করে বসে ইহাবের দিকে চাইল। পা দুটো দুলিয়ে কানের পিঠ চুলকে বলল,
“লাগ কচ্চ?”
ইহাব নাহওয়ানের মতো বাচ্চামি করে বলল,
“কচ্চি।”
নাহওয়ান বেশ খানিকক্ষণ ইহাবের দিকে তাকিয়ে কানের পিঠ ডলে গেল। তারপর আস্তে করে বলল,
“লাগ কমচে?”
“কমেনি।”
“ককোন কমবে?”
ইহাব মুখ ঘুরিয়ে বলল,
“সেটা দিয়ে তোমার কি দরকার? আমার রাগে কার কি এসে যায়?”
নাহওয়ান একটু ভেবে বলল,
“টোমাল লাগ কমলে যেতে পালব টাই জিগ্গেস কচ্চি।”
মানহা বিছানার পাশে বসে দুই হাতের তালুতে মুখ ঠেকিয়ে তাদের খুনসুটি দেখছিল। নাহওয়ানের উত্তরে হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খেল। ইহাব চোখ কপালে তুলে বলল,
“শ্লার বেটা মারাত্মক সেয়ানা।”
“তুমি আমার সঙ্গে কথা বলো না কেন রিন পাউডার?”
মানহার কোলে মাথা রেখে ইহাব বলল। মানহা মুখ গোমড়া করে রাখল, প্রতিউত্তর করল না। একটু আগে ভাতিজাকে দিয়ে এসে বিছানায় বসেছে। ইহাব আবারও বলল,
“বাবা, মার কাছে নিলাম তারপর ভাইয়ের কাছে আনলাম তাও মন ভালো হয়নি?”
মানহা মুখ গম্ভীর রেখেই বলল,
“আপনি আমার কলেজে আর যাবেন না।”
“কেন?”
“এখনকার মেয়েরা খুবই খারাপ। এদের নজর হ্যান্ডসাম ছেলেদের উপর পড়লে যা তা বিশ্রী বিশ্রী ইঙ্গিত, কথা শুরু করে।”
ইহাব ঝট করে শোয়া থেকে উঠে বসে বলল,
“আচ্ছা, সমস্যা তাহলে এখানে। তা কে কী বলছে শুনি?”
মানহা মুখ ঘুরিয়ে বলল,
“বলব না।”
“বলো বলছি।”
ইহাব অনেক জোর করায় শেষে মানহা না চাইতেও বলল,
“হট, একেবারে খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে এরকম আরও কথা। ছিঃ ওসব মুখে আনলেও গুনাহ হবে। আস্তাগফিরুল্লাহ।”
ইহাব মানহাকে খেপাতে বলল,
“বউ কদর না করলে কি হবে? বাইরের মেয়েরা ঠিকই কদর করে।”
মানহা রাগান্বিত হয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“আচ্ছা, যেয়ে আরেকটু কদর খেয়ে আসুন।”
ইহাব মানহাকে জড়িয়ে ধরে হেঁসে ওঠে বলল,
“তুমি ফেঁসে গেছ সমুন্ধির বোন।”
__
চেয়ারম্যান বাড়িতে তাণ্ডব বয়ে গেছে। উর্মি ভুঁইয়া কাঁচের প্লেট ভেঙে চৌচির করে ফেলেছেন। সামনেই কঠোর ভঙ্গিমায় পেছনে দু’হাত শক্ত করে মুঠ করে ইমতিয়াজ ভুঁইয়া দাঁড়ানো। উমায়ের ভুঁইয়া বোনকে ধরে সোফায় বসালেন। ইনাবা অদূরে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে। উমায়ের ভুঁইয়া উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“ওর সাথে এমন না করলেও পারতেন।”
“আপনার বোন কম জ্বালায়নি আমায়? এতবছর তার সব পাগলামি সহ্য করে গেলেও পরশুদিনের ঘটনাকে কোনভাবেই পাগলামি আখ্যা দেয়া যায়না। তার স্পর্ধা দেখে আমি অবাক হচ্ছি সে নিজের পুত্রবধূকে শত্রু মনে করে, আমাকে শত্রু ভাবে। ইহাব তো জানে না। জানলে একটা কুরুক্ষেত্র হয়ে যেত। ভাগ্যিস আমি দেখে দুধটা ফেলে দিয়েছিলাম। মানহাকে বিষ খাইয়ে মারতে চেয়েছিল এই সাংঘাতিক নারী। কি জঘন্য আপনি ভাবতে পারছেন? এই জঘন্য কাজটাকে আপনি সাপোর্ট দিচ্ছেন কীভাবে?”
উমায়ের ভুঁইয়া গম্ভীর গলায় বলল,
“আমি সাপোর্ট দিচ্ছি না চেয়ারম্যান সাহেব। তার মানসিক অবস্থা এখন অনুকূলে নেই আপনাকে এটা বুঝতে হবে। ঠাণ্ডা মাথায় বুঝিয়ে বললেই কিন্তু হয়ে যায়।”
“এসব ঠান্ডা মাথায় বোঝানোর জিনিস? এতদিন তো ভালোই ছিল। গলায় গলায় কি মিল মহব্বত! আমি কিছু বললে আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ত তাহলে কী এমন হয়ে গেছে যে এখন সেই মহব্বত গলার কাঁটায় রূপ নিয়েছে?”
উমায়ের ভুঁইয়া একটু রয়ে সয়ে বললেন,
“তাকে কয়েকদিনের জন্য রিল্যাক্স ফিল করান। জিনিসটা মারাত্মক প্রভাব ফেলার আগে ডাক্তারের শরনাপন্ন হন।”
উর্মি ভুঁইয়া তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে বললেন,
“ডাক্তারের শরনাপন্ন হবে মানে? আমি কি পাগল? ওই মেয়ে যত নষ্টের গোড়া। এই লোকটার কথায় ভুলেও তাল দিও না। তার অতীত ভুলে গেছ তোমরা? আমাকে জঘন্য বলে অথচ নিজে কী ছিল ভুলে গেছে? তুমি এসবে তাল দিচ্ছ কেন ভাইজান?”
ইমতিয়াজ ভুঁইয়া কপাল গুটিয়ে বললেন,
“দেখেছেন কিভাবে রিয়েক্ট করে? কতবার ডাক্তারের কাছে নিতে চেয়েছি জিজ্ঞেস করুন। ডাক্তারের কথা শুনলেই খিটমিট করে, আমাকে কামড়ায় পর্যন্ত। এমনিতেই তার মেডিকেল হিস্ট্রি খারাপ।”
উমায়ের ভুঁইয়া বোনের দিকে এগিয়ে এসে অনেকক্ষণ বোঝালেন। উর্মি ভুঁইয়া চোখ বুজে ভাইয়ের কাঁধে মাথা এলিয়ে পড়ে রইল। ইনাবা কারো কথার আগামাথা না বুঝতে পেরে বোকার মতো চেয়ে রইল। কি ছিল সবার অতীত? মায়ের মেডিকেল হিস্ট্রির কথাই বা বলা হলো কেন? মায়ের কি কোনো প্রবেলম আছে? কই কখনো তো তাকে ভয়ংকর কিংবা অসুস্থ মনে হয়নি। মায়ের এমন ভয়ংকর রূপ এই প্রথম দেখছে তারা। এতটা বছর তাকে আগাগোড়া ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন নারী ব্যতীত আর কিছুই ভাবেনি সে। তার ব্যক্তিত্ব এতটাই প্রকট এবং প্রখর ছিল যে তিনি চাইলে গোটা একটা উপন্যাস রচয়িত হতে পারত। তবে সেই ব্যক্তিত্ববান রমণীর এ কি দশা! স্বামী, পুত্রবধূ কেন তার কাছে বিষতুল্য?
__
মারওয়ান না চাইতেও ইহাব, মানহার সাথে খেতে বসেছে। নিশাতই অবশ্য জোর করেছে। মেহমান মানুষের সাথে ঘরের অন্তত একজন মানুষকে বসতে হয় নাহলে মেহমানদের প্রতি আদবের খেলাফ হয়। মারওয়ান রাগারাগি করলেও পরে বসতে বাধ্য হয়েছে। মারওয়ানের কোলে নাহওয়ান বসা। পাটির বিপরীতে বসা ইহাব আর তার পাশে মানহা। নিশাত এখানে নেই। সে রুমে খাবার নিয়ে গেছে। পাটিতে সব পদ একে একে সাজিয়ে দিয়ে রুমে চলে গেছে। মানহা প্রথমে বড় ভাইয়ের প্লেটে পোলাও বেড়ে দিল তারপর ইহাবের প্লেটে দিল শেষে নিজের প্লেটে নিল। সবার প্লেটে একে একে রোস্ট দিয়ে দিল। পাশের বাটিতে আলু দিয়ে গরুর গোশত রান্না সেটা মারওয়ানের পাতে দিতে গেলেই মারওয়ান নিষেধ করে বলল,
“আমাকে আরেকটা রোস্ট দে। নাহওয়ান খাবে।”
মানহা আরেক পিস তুলে দিল। রোস্ট দেখে নাহওয়ান হাত তালি দিল। মারওয়ান রোস্ট ছিঁড়ে ছেলের মুখে দিল। বাচ্চাটা মুখে নিয়ে মাথা নাড়িয়ে নাড়িয়ে খাচ্ছে। মানহা ইহাবকে গরুর গোশত দিতে চাইলে ইহাব পরে নেবে জানাল। মানহা বাটি রেখে বিসমিল্লাহ বলে খেতে শুরু করল। ইহাব মুখে এক লোকমা তুলেই বলল,
“আহা কি অতুলনীয় রান্না! এই রান্না খেয়ে কেউ কি করে এখনো রসকষহীন থাকতে পারে?”
কথাটা বলে যে মারওয়ানকে খোঁচা দিল সেটা স্পষ্ট বোঝা গেল। মারওয়ান দ্বিতীয় লোকমা মুখে পুরতে গিয়ে ইহাবের এই উদ্ভট কথা শুনে লোকমা পাতে রেখে দিল। ভ্রু কুঞ্চিত করে বলল,
“তোর তো বহুত রস। গ্লাস ভরে দে, খাই।”
মানহা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আবার শুরু হবে ঝগড়া। ইহাব মুখ নামিয়ে আরেক লোকমা মুখে নিয়ে বলল,
“ওসব রস দেখা যায়না পাগলা। পাগলে কি বোঝে এসবের মূল্য?”
“ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চা সবসময় একটু বেশিই লাফায়। অনেক জ্ঞানী ভাবে নিজেকে আদতে ছাগল তো ছাগলই।”
মারওয়ানের কথায় ইহাব বিশেষ পাত্তা দিল না। ইহাব গরুর গোশত পাতে নিয়ে মুখে দিয়ে বলল,
“আহা অমৃত! এই খাবার খেয়ে খবিসও মানুষ হয়ে যাবে।”
মারওয়ান খেতে খেতেই বলল,
“ছাগলের কথাও ছাগল ছাগল। এতবার নিজেকে ছাগল প্রমাণ করার প্রয়োজন নেই। সবাই জানে তুই ছাগল।”
ইহাব গুনগুন করে বলল,
“পাগলে কিনা বলে
ছাগলে কিনা খায়।
গাধাকে যত পেটাও
গাধা কি ঘোড়া হয়?”
মারওয়ান পাটিতে চাপড় মেরে বলল,
“মাইন্ডব্লোয়িং। এরকম কবিতার মাধ্যমে নিজেকে বর্ণনা করতে কজন পারে বল? পাগল, ছাগল, গাধা দারুন কম্বিনেশন। চরিত্রের সাথে একেবারে খাপেখাপ।”
নাহওয়ানও বাবার দেখাদেখি পাটিতে চাপড় মেরে বলল,
“কাপেকাপ।”
ইহাব মুখ লটকে কিছু বলতে নিলে মানহা বলল,
“আপনি ভাইয়াকে খোঁচাতে যান কেন? কেমন লাগে খোঁচা খেতে?”
“অপূর্ব।”
“শুনুন আলমারিতে দুই হাজার টাকা রেখেছিলাম এখন খুঁজে পাচ্ছি না। কে নিল বলুন তো?”
নিশাত চিন্তিত কণ্ঠে বলল। মারওয়ান শুয়ে থেকেই জবাব দিল,
“কেউ নেয়নি তুমিই নিয়েছ।”
“আমি কখন নিলাম?”
“বাজার করেছ কী দিয়ে?”
“সেটা তো আপনার টাকায় করেছি।”
মারওয়ান হামি দিয়ে বলল,
“উহু, ওটা তোমারই টাকা। আমি শুধু দিয়েছি।”
নিশাত হতভম্ভ গলায় বলল,
“কিহ!!”
“জ্বি।”
নিশাত বেক্কলের মতো দাঁড়িয়ে রইল। স্বামীর টাকায় প্রথম বাজার করে সারাদিন এত খুশি থেকে যদি রাতে শোনে টাকাটা তার নিজেরই তাহলে ঠিক কেমন লাগা উচিত ভেবে পেল না সে।
“আমার টাকা আমাকে দিলেন কেন?”
“রাগ করছিলে, ভাবলাম কিছু দেই।”
নিশাত আশ্চর্যান্বিত গলায় বলল,
“সেইজন্য আমার টাকাই আমাকে দেবেন?”
চলবে….
(আসসালামু আলাইকুম।)
Share On:
TAGS: তাজরীন ফাতিহা, ভবঘুরে সমরাঙ্গন
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৬৩
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৪
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৩১+৩২
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ১৭+১৮
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ২৬+২৭
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ১৩+১৪
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব (৫৬.১+৫৬.২)
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৩৩+৩৪
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৭
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৫৭+বোনাস