Golpo romantic golpo ভবঘুরে সমরাঙ্গন

ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৪১+৪২


ভবঘুরে_সমরাঙ্গন

পর্ব_৪১

তাজরীন ফাতিহা

কখনো কখনো ধরিত্রীতে এমন কিছু অতিপ্রাকৃতিক কিংবা অভাবনীয় ঘটনা ঘটে যার কোনো ব্যাখ্যা মানুষ্যজাতির কাছে থাকে না। সৃষ্টিকর্তা তার সৃষ্টির জন্য এই ভূলোক একটা জটিল ধাঁধার স্থান হিসেবে নির্মাণ করেছেন। এখানে অনেক কিছুরই কোনো বিশ্লেষণ হয়না, হতে পারেনা। বিজ্ঞানও এর সঠিক সমাধান বের করতে পারেনা। সৃষ্টির সূচনা লগ্ন থেকে প্রতিনিয়ত এমন রহস্যময় স্থান, অমীমাংসিত রহস্য এবং ঘটনার সাথে আবাস গড়েই প্রাণীকুল টিকে আছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম। সৃষ্টির বিনাশ লগ্নেও কি থাকবে কোনো জটিল রহস্য?

ঘুমের মধ্যে ঢুকরে কাঁদছে নিশাত। শরীরটা কেঁপে কেঁপে উঠছে তার। ছটফট করছে সে। আচমকা ঘুম ভেঙে গেলে হাঁপাতে হাঁপাতে লাফিয়ে উঠে বসলো। তড়িৎ আশেপাশে তাকিয়ে খুঁজলো কাউকে। কিন্তু কেউ নেই। পুরো রুম নিস্তব্ধ। চারিপাশে পিনপন নীরবতা। নিশাতের আত্মা লাফাচ্ছে যেন। চোখের পাপড়ি ভেজা। তার বুক ধড়ফড় করছে। শ্বাস টানতে পারছে না। চোখ থেকে অনবরত অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। নিশাত কোনমতেই নিজেকে থামাতে পারছে না। দু হাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে সে। বুকটা হাপরের মতো ওঠানামা করছে তার। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।

একটু ধাতস্থ হয়ে হুড়মুড় করে পাশের রুমে গেলো। পুরো রুম অন্ধকার। চোখে ঝাপসা দেখছে সে। কাঁদতে কাঁদতে চোখ ব্যথা করছে। হার্ট দ্রুত লাফাচ্ছে। হাতড়িয়ে হাতড়িয়ে রুমের লাইট জ্বালালো। চোখে লাইট পড়তেই তীব্র জ্বলন শুরু হলো। বিছানায় তাকিয়ে স্বস্তির দম নিলো। বাবা ছেলে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে। ছেলেকে কোলের মধ্যে টেনে মারওয়ান আজাদ ঘুমাচ্ছে। নিশাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো তিনটা বাজে। তাহাজ্জুদের সময় হয়ে গেছে। কাঁপা শরীরে ওযু করে জায়নামাজ বিছিয়ে সৃষ্টিকর্তার সান্নিধ্যে দাঁড়ালো। কান্নার দমকে সূরা, কেরাত, দোয়া কোনকিছুই ঠিকমতো পড়তে পারছে না সে। মহান রব তাকে কিসের সংকেত দিচ্ছেন বারবার। সে ভাবতে পারছে না কিছু। শুধু কাঁদছে। বোবা কান্না যাকে বলে। মোনাজাতও আজ ঠিকমতো করতে পারলো না।

“আল্লাহ তুমি আমাকে এ কোন ইশারা দিচ্ছো? ইস্তেখারার রেজাল্ট যদি এটা হয় তাহলে আমি এটা চাইনা মাবুদ। তুমি রক্ষা করো আমার পরিবারকে। আমাকে পথ দেখাও ইয়া আল্লাহ। আমার স্বামী, সন্তানকে সুস্থ রাখো।”

এটুকু বলে হাত তুলে রেখে আবারও বুক ভাঙা কান্নায় ভেঙে পড়লো নিশাত। তার চারপাশ ভূমিকম্পের মতো দুলছে।

কোনোমতে জায়নামাজ রেখে আবারও পাশের রুমে গেলো সে। মারওয়ান চিৎ হয়ে শোয়া। মাথার নিচে এক হাত রেখে ভ্রু বেঁকিয়ে ঘুমাচ্ছে সে। আরামের গভীর আলিঙ্গনে ডুবে আছে তার নিদ্রা। নিশাত কেঁদে উঠে হুমড়ি খেয়ে তার বুকের উপর মাথা ঠেকিয়ে নিঃশব্দে কাঁদতে লাগলো। নিশাতের শরীর দোলায় মারওয়ান নড়েচড়ে উঠলো। কপাল কুঁচকে আশপাশ হাতড়ালো। বুকের উপর ভারী কিছুর অস্তিত্ব অনুভব করায় ঘুম ভেঙে গেলো তার। চোখ পিটপিট করে খুলে দেখলো তার বুকের উপর কিছু কাঁপছে। বিরক্তিকর দৃষ্টি মেলে বললো,

“এতো রাতে কার শরীরে এতো কারেন্ট যে কাঁপাকাঁপি করার জন্য আমার বুকটাকে বেছে নিয়েছে?”

নিশাত কান্না থামিয়ে বুকের মধ্যে মাথা আরও গেড়ে দিলো। মারওয়ান চ্যাহ শব্দ করে বললো,

“বুকটা কি ফেড়ে দেবো যেন শরীর সুদ্ধ আমার ভিতরে ঢুকে যেতে পারো?”

নিশাত কথা না বলে কাঁপতে লাগলো। মারওয়ানের ঘুম ভাঙায় মারাত্মক বিরক্ত লাগছে। স্বাভাবিক সেটা। ঘুমের কোনো মানুষকে ওঠালে যে কেউ বিরক্ত হয়। সে কর্কশ কণ্ঠে বললো,

“আশ্চর্য কিছু না বলে মৃগী রোগীর মতো করছো কেন?”

নিশাত প্রতিউত্তর না করে মারওয়ানের গেঞ্জি ভেজাতে লাগলো। মারওয়ান বুকের কাছে ভেজা অনুভূত হওয়ায় বললো,

“আরে হয়েছেটা কি? রাত তিনটায় পতিভক্তি দেখাচ্ছো কেন? পতিব্রতা হয়েছো ভালো কথা কিন্তু আমাকে ডিস্টার্ব করছো কেন?”

নিশাত হেঁচকি তুলে কাঁদতে কাঁদতে মাথা ব্যথা বানিয়ে ফেলেছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে তার। শ্বাস টানতে পারছে না। মনে হচ্ছে বুকে ভারী কিছু বিঁধে আছে। নিশাতের কান্না থামলেও হেঁচকি বন্ধ হয়নি। অতিরিক্ত হেঁচকির ফলে শ্বাস নিতে পারছে না সে। কষ্ট হচ্ছে ভীষণ। নিশাতের এমনিতেও শ্বাসকষ্ট আছে। মারওয়ান নিশাতকে অস্বাভাবিক আচরণ করতে দেখে নিশাতকে নিয়ে উঠে বসলো। নিশাত এখনো মারওয়ানের বুকে মাথা দিয়ে আছে। মারওয়ান নিশাতকে বুক থেকে সরাতে চাইলেও নিশাত সরলো না। জিদ নিয়ে মাথা দিয়ে রাখলো। মারওয়ান বললো,

“কি হয়েছে বলবে তো? শ্বাস টানতে পারছো না তবুও জিদ দেখাচ্ছো কেন? খারাপ স্বপ্ন দেখেছো নাকি কেউ কিছু বলেছে?”

নিশাত স্বপ্নের কথা শুনে আবারও মারওয়ানের বুকের মধ্যে মুখ চেপে ধরে অশ্রু ঝড়াতে লাগলো। মারওয়ান মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো। নিশাত একটু থেমে মাথা উঠিয়ে মারওয়ানের চোখে চোখ রেখে ধীর কণ্ঠে বলতে লাগলো,

“আপনি কি খারাপ কোনো কাজে যুক্ত? আমাকে একটু বলুন প্লিজ? আপনি কি আসলেই এমন নাকি আপনার আরেকটা চরিত্র আছে?”

মারওয়ান থম মেরে গেলো। চোয়াল শক্ত করে নিশাতের দিকে তাকালো। নিশাত হেঁচকি তুলে কোনরকম শ্বাস নিয়ে বললো,

“আল্লাহর কসম আপনি খারাপ কোনো কাজে জড়াবেন না। যদি জড়িয়ে থাকেন ফিরে আসুন প্লিজ। আমার নাহওয়ান আপনাকে ছাড়া থাকতে পারবে না।”

মারওয়ান ভ্রু কুঁচকে বললো,

“কিসব আবোল তাবোল কথা বলছো এই রাত বিরেতে? মাথা ঠিক আছে?”

নিশাত মারওয়ানের বুকে মাথা রেখে বললো,

“আমি কি বলছি নিজেও জানি না। আমাকে একটু ঘুম পাড়িয়ে দিন। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে।”

মারওয়ান মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললো,

“আমার সাধের পাকা ঘুমটা ভাঙানোতে আমারও কষ্ট হচ্ছে।”

নিশাত চোখ বুজে অস্ফোস্ট স্বরে বললো,

“আপনার কষ্টের চেয়ে আমার কষ্ট হাজার গুণ বেশি। ঘুম পাড়িয়ে দিন। দয়া করে আমি ঘুমিয়ে গেলে আপনার বুক থেকে আমাকে ওঠাবেন না।”

কাঁপতে কাঁপতে কথাগুলো বলে মারওয়ানের বুকে পাখির বাচ্চার মতো পড়ে রইলো। মারওয়ান মুখ গম্ভীর করে ভ্রু জোড়া কুঁচকে রেখেই নিশাতের দিকে চেয়ে আছে। আসলে নিশাতের উল্টোপাল্টা কথার আগামাথা ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না সে।

_

তোমাকে চাই আমি আরও কাছে
তোমাকে বলার আরও কথা আছে
আমি বলতে পারিনা মুখে তওবা তওবা
দিলে জখম হলো উহু আহা..

ইহাব রান্নাঘরে এসেই মানহাকে দেখে গানটা গেয়ে উঠলো। মানহা মাথায় কাপড় দিয়ে কাজ করছিল। গান শেষ হতেই ইমতিয়াজ ভুঁইয়া রান্নাঘরের ভিতর থেকে গলা খাঁকারি দিয়ে উঠলেন। ইহাব বাবাকে রান্নাঘরে দেখে কথা বলতে ভুলে গেলো। মানহা তো লজ্জায় শেষ। একদিন শাশুরির সামনে আজকে আবার শ্বশুরের সামনে। ইশ কি লজ্জাটায়ই না পড়তে হলো! উর্মি ভুঁইয়া অসুস্থ থাকায় ইমতিয়াজ ভুঁইয়া আজকে স্ত্রীকে সারপ্রাইজ দিতে রান্নাঘরে ঢুকেছেন স্পেশাল কিছু রাঁধতে। মানহাকে ধমকে ধমকে সব কাজ করাচ্ছিলেন। নিজেও টুকটাক হেল্প করছিলেন। কাজের থেকে বেশি মুখ চলছিল তার। কিছুক্ষণের জন্য চুপ হতেই ছেলের গান শুনে নিজেও অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন। ইহাব চাবি ঘুরাতে ঘুরাতে বললো,

“তোমার এখানে কি পাপা? ভেবেছিলাম মম রান্নাঘরে তাই তার জন্য গাইলাম এখন দেখি সেই নাই। খুবই দুঃখজনক।”

ইমতিয়াজ ভুঁইয়া গলা পরিষ্কার করে বললেন,

“মায়ের জন্য এই গান?”

ইহাব থতমত খেয়ে বললো,

“হ্যাঁ, তো?”

“কিছু না। কিম্ভুতকিমাকার!”

ইহাব কোনরকম রান্নাঘর থেকে কেটে পড়ে বুকে থু দিয়ে বললো,

“আল্লাহ বাঁচিয়েছেন। বাবার আজই ওখানে থাকতে হলো। ধুরু ধুরু মুডের দফারফা!!”

ইহাব চলে গেলে মানহা ঘোমটা আরেকটু টেনে কাজ করতে লাগলো। লোকটার জন্য শ্বশুরের সামনে কি বিচ্ছিরি একটা অবস্থা হলো। ইমতিয়াজ ভুঁইয়া ধমকে বললেন,

“এখনো দাঁড়িয়ে আছো কেন? স্বামী বাড়িতে আসার সাথে সাথে তার পিছু পিছু যেতে হয় এটাও শিখিয়ে দিতে হবে? শাশুড়ির সাথে থেকে এইসব শিখেছো? মহিলা নিজেও ত্যাদড় ছিল এখন ছেলের বউকেও ত্যাদড় বানাচ্ছে।”

মানহা শ্বশুরের কথা শুনে কোনরকমে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে গেলো। তার এত লজ্জা লাগছিল। ভালোই হয়েছে শ্বশুর নিজেই তাকে সরিয়ে দিয়েছেন নাহলে আর কিছুক্ষণ থাকলে লজ্জাতেই মরে যেতো সে।


তোমাকে চাই আমি আরও কাছে
তোমাকে বলার আরও কথা আছে
বলতে পারিনা মুখে তওবা তওবা
দিলে জখম হলো উহু আহা..

উর্মি ভুঁইয়া বিছানায় শায়িত। ইমতিয়াজ ভুঁইয়া মুখে গান শুনে ভ্রু ভাঁজ করলো। ইমতিয়াজ ভুঁইয়া সেই গান বারবার আওড়াচ্ছেন আর উর্মি ভুঁইয়াকে চোখ মারছেন। উর্মি ভুঁইয়া তা দেখে বললেন,

“বুড়ো বয়সে ভিমরতি ধরেছে?”

“না প্রেম ধরেছে। আসো উর্মিমালা প্রেম করি।”

“আমার শরীরে এত বিদ্যুৎ নেই। আপনার শরীরে বেশি বিদ্যুৎ থাকলে পারমাণবিক কেন্দ্রে দান করুন। দেশে বিদ্যুতের ঘাটতি কমবে।”

বলেই চোখ বুজলো। কয়েকদিন ধরে মাথা ব্যথাটা আবারও বেড়েছে। ভালো লাগছে না কিছুই। খাবারও বিস্বাদ ঠেকছে। শুয়ে শুয়েই দিন পার করছেন উর্মি ভুঁইয়া। ইমতিয়াজ ভুঁইয়া স্ত্রীর কথায় হতাশ হয়ে বললেন,

“তুমি সবসময় তিতা রসকষহীন। আমার ফিলিংসের দফারফা করে দাও অলওয়েজ। হতাশ চরম হতাশ!”

_

মাঝরাতে শুনশান রাস্তায় দৌড়াচ্ছে কেউ একজন। পিছন পিছন দৌড়াচ্ছে ইন্টিলিজেন্স ডিপার্টমেন্টের সদস্যরা। হঠাৎ সামনের লোকটি ঘুরে গুলি তাক করলো নেওয়াজের দিকে। ইন্টিলিজেন্স গ্রুপের সবাই দাঁড়িয়ে গেলো। সামনের লোকটি গুলি তাক করে বললো,

“এক পা এগুলে শ্যুট করে দেবো। ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকা হয় যেন।”

কথা শেষ করে পা বরাবর গুলি ছুড়তে ছুড়তে দৌঁড়াতে লাগলো সামনের লোকটি। হঠাৎ সামনে কালো গাড়ি এসে পড়ায় সে দ্রুত উঠে বসলো গাড়িতে। গাড়ির পিছে পিছে সকল এজেন্ট ছুটতে লাগলো। কিন্তু হাতের নাগালে পেলো না। জিনান আদহাম রাস্তায় পা দিয়ে বারি মেরে গাড়িটার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে বললো,

“শিট শিট! আজকেও হাত থেকে পালালো ওই কিলার জাদ। This guy is absolutely rubbish. He’s a complete waste of time.”

তার কথা শেষ হতেই গুলির আওয়াজ হলো। রাতের ধ্বংসাত্মক নিরবতা ছাপিয়ে গুলির আওয়াজ ছড়িয়ে পড়ল চারিদিকে। ঠিক তখনই সামনের চলন্ত গাড়িটা দাঁড়িয়ে গেলো। ডিপার্টমেন্টের সবাই তা দেখে আবারও দৌঁড়াতে লাগলো। সেখানে গিয়ে দেখলো সম্পূর্ণ কালো লং কোটে আবৃত হুডি পড়া একজন যেই লোকটাকে তারা ধাওয়া করছিল তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে বন্দুক হাতে নিয়ে। তাদের বুঝতে বাকি রইলো না একটু আগে সেই গাড়ির সবগুলো চাকা পাংচার করে দিয়েছে গুলি করে। সামনের লোকটি ও তার লোকদের পায়েও গুলি করে রাস্তায় বসিয়ে রেখেছে। আবছা গূঢ় কণ্ঠে পিস্তল কপালে ঠেকিয়ে বললো,

“কিলার আজাদ!”

সামনের লোকটি দাঁত কিড়মিড় করে বললো,

“কে তুই?”

“তোর যম।”

কিলার জাদ আকাশ পাতাল কাঁপিয়ে ভয়ংকরভাবে হাসতে লাগলো। তারপর হাসি থামিয়ে বললো,

“যে নিজেকে আড়াল করে রাখে সে নাকি এই কিলার জাদের যম। হাস্যকর!”

কালো কাপড়ে আবৃত লোকটি হাঁটু ভাঁজ করে বসে বললো,

“আড়াল থেকে বেরুলে যদি প্যান্ট ভিজিয়ে ফেলিস তাহলে ব্যাপারটা বাজে লাগবে না?”

“এই কিলার জাদ কিছুতে ভয় পায়না। প্যান্ট ভেজানো তো দূরের কথা।”

কালো আবরণের লোকটি পিস্তল কপালে ঘষতে ঘষতে বললো,

“সত্যি..!”

“ইয়েস। লুকিয়ে লুকিয়ে ফাঁপর আর কত দিবি? নিজের পরিচয় দে? কে তুই?”

কালো কাপড়ে আবৃত ব্যক্তিটি উঠে দাঁড়ালো। নিজের হুডি মাথা থেকে সরিয়ে রহস্যময় কন্ঠে বলে উঠলো,

“সাইফার। আজারাক সাইফার।”

কিলার জাদ চোখ বড় বড় করে তাকালো। তার শরীরে কারেন্টের ঝটকা লেগেছে। ইন্টিলিজেন্স গ্রুপের সদস্যরাও অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। এই সেই বিশেষ এজেন্ট। আজারাক সাইফার কিলার জাদের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেঁসে বললো,

“You came to play, I built the game.
(তুই খেলতে এসেছিস আর আমি খেলাটা বানাই।)”

কিলার জাদ ক্ষেপা বাঘের মতো গর্জন করে বললো,

“তোকে আমি ছাড়বো না আজারাকের বাচ্চা। তোকে শেষ না করা পর্যন্ত আমার বিনাশ হতে পারেনা।”

আজারাক সাইফার নিজের লং কোটের পকেটে হাত ঢুকিয়ে বললো,

“অথচ আজ তোর বিনাশ হয়ে গেছে। কতদিন আর বাইরে ঘুরবি বল? এবার একটু নিজের আসল ঠিকানায় চল। অনেক আপ্যায়ন করবো প্রমিস।”

বলেই ইন্টিলিজেন্স সদস্যদের চোখ দিয়ে ইশারা করলো। তারা চোখের ইশারা বুঝে সবাইকে গাড়িতে উঠালো। কিলার জাদকে ধরতে এলেই ছিটকে সরে গেলো সে। আস্তে আস্তে নিজেই খোঁড়া পা নিয়ে উঠে দাঁড়ালো। তারপর আজারাক সাইফারের দিকে বাজের দৃষ্টি ফেললো। আজারাক সাইফার ঠোঁট বেঁকিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে আছে তার দিকে। জিনান আদহাম তার পাশেই দাঁড়ানো। সবাইকে গাড়িতে ওঠানো হলে আজারাক সাইফার নিজের Glock 19 পিস্তলটি কোটে ঢুকিয়ে ফেললো। জিনান হাত বাড়িয়ে বললো,

“পারফেক্ট সময়ে এসেছেন। I am Zinan Adham.”

আজারাক সাইফার হাত মিলিয়ে বললো,

“I’m Azarak Cipher.”

“কঠিন নাম। আপনাকে সাইফার সাহেব বলে ডাকলে মাইন্ড করবেন?”

“No.”

নেওয়াজ শাবীর নিজেও হাত মিলিয়ে হালকা ঠোঁট প্রসারিত করে বললো,

“আপনার ডেডিকেশন কিন্তু চমৎকার। খুবই ঠাণ্ডা মাথার খিলাড়ি আপনি।”

আজারাক সাইফার ঠোঁট প্রসারিত করে রহস্যময় ভঙ্গিতে হাসলো।

চলবে….

(আসসালামু আলাইকুম।)

ভবঘুরে_সমরাঙ্গন

পর্ব_৪২

তাজরীন ফাতিহা

বিবাহের চতুর্থ বর্ষের দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে মারওয়ান আজাদের আজ কি বোধোদয় হলো জানা নেই তবে নিশাতকে নিয়ে আজই প্রথমবারের মতো বাইরে পদার্পণ করেছে সে। ছেলেকে নিয়ে অসংখ্যবার বাইরে বেরুলেও নিশাতকে নিয়ে এই প্রথম প্রকৃতির সান্নিধ্যে এসেছে সে। নিশাত অদ্ভুত নজরে তা শুধু চেয়ে দেখছে। ফজর পড়ে নাস্তা বানাতে গেলে হঠাৎ মারওয়ান এসে বললো,

“আজ নাস্তা বানানো লাগবে না বাইরে নাস্তা করবো। সেখান থেকে তুমি নাস্তা করে স্কুলের উদ্দেশ্যে রওনা দিও।”

নিশাত প্রথমে গাঁইগুই করছিলো না যাওয়ার জন্য। কিন্তু মারওয়ানের ধমকে রেডি হতে বাধ্য হয়েছে। দায়বদ্ধ স্ত্রীর মতো ছেলেকে তৈরি করে নিজের ভ্যানিটি ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে মারওয়ানের সাথে। রাস্তায় এই প্রথম মারওয়ানের পাশে কোথাও যাওয়ার উদ্দেশ্যে হাঁটছে সে। অনেকেই অদ্ভুত চোখে তার সাথের লম্বা পুরুষটির দিকে তাকিয়ে ছিল যেন বিশ্বাস করতে পারছে না তার পাশে এই লোকটা কে? এলাকার অনেকেই জানে নিশাত সিঙ্গেল এখনো বিয়ে হয়নি থাকে বাবা মায়ের সাথে আর পড়াশোনার পাশাপাশি জব করে। এটা কিভাবে ছড়িয়েছে নিশাত জানে না। হয়তোবা নিশাতকে কখনো মারওয়ানের সাথে দেখেনি বিধায় লোকজন নিজ মনে ভেবে নিয়েছে।

সেদিন স্কুল থেকে আসার সময় এক ভদ্রমহিলা তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে বসেন।। তার ছেলের জন্য নাকি এরকম ধার্মিক মেয়ে খুঁজছেন তিনি। অনেকদিন ধরেই নাকি তার উপরে নজর রাখছেন। বাসার ঠিকানা চেয়েছেন সম্বন্ধ নিয়ে আসবেন। নিশাত থতমত খেয়ে গিয়েছিল। অন্যকাউকে ভেবে তাকে বলে দিয়েছে মনে করে দ্রুত চলে এসেছে সেখান থেকে। কি সাংঘাতিক এক বাচ্চার মাকে কিনা বিয়ের প্রস্তাব দিচ্ছে লোকজন!

মারওয়ান ছেলেকে কোলে নিয়ে পার্কের সরু রাস্তায় হাঁটছে। পাশেই নিশাত চারিপাশ মন্ত্রমুগ্ধের মতো চেয়ে দেখছে। কি সুন্দর প্রকৃতি! মুখ দিয়ে আপনাআপনি বেরিয়ে গেলো সুবহানাল্লাহ। নিস্তব্ধ চারিপাশে ছায়াময় বৃক্ষরাজি, পাতার ফাঁকে ফাঁকে গলিয়ে পড়ছে প্রাতঃকালের নরম রৌদ্রের ছায়া সাথে পাখিদের কলতান জুড়িয়ে দিচ্ছে প্রাণ। ইস্ মন জাগানিয়া এক পরিবেশ!

চারিধারের দৃশ্য অবলোকন করতে করতে কখন যে মারওয়ানের হাতের ফাঁকে নিজের হাত গলিয়ে দিয়েছে খেয়াল নেই নিশাতের। মারওয়ান নিজের হাতের ভাঁজে মুঠোকৃত হাতটির দিকে চেয়ে নিশাতের দিকে শান্ত দৃষ্টি ফেললো। নিশাত মগ্ন প্রকৃতি দেখায়। মারওয়ান নিকাবে আবৃত মুখটির দিকে দৃষ্টি মেলে বুঝলো ভিতরে রয়েছে আদুরে উচ্ছ্বসিত একখানা মুখশ্রী। সকালের মিষ্টি রোদ যেন নিশাতের চক্ষুদ্বয়কে আরও উজ্জ্বল এবং প্রাণবন্ত করে তুলেছে। নাহওয়ান বাবার কোলে বসে একটু পর পর বলে চলেছে,

“উইত্তো গাচ, উইত্তো পাকি, উইত্তো পুল।”

নিশাত অদূরে একটা পাখি দেখিয়ে নাহওয়ানকে বললো,

“নাহওয়ান দেখো বুলবুলি পাখি।”

নাহওয়ান মাকে অনুসরণ করে হাত উঁচিয়ে বললো,

“বাবা বাবা বুলবুল পাকি।”

মারওয়ান আশেপাশে চোখ বুলাতে বুলাতে বললো,

“আমি দেখেছি, তুই দেখ গোল আলু।”

নাহওয়ান হাত তালি দিচ্ছে আর নিজের আনন্দ জানান দিচ্ছে। একটু পর মারওয়ান ছেলেকে কাঁধে তুলে নিলো। নাহওয়ান ফিচ ফিচ করে হেঁসে দিলো। তার হাসির ধ্বনি চারপাশে মুখরিত হচ্ছে। ফৌজিয়া নিশাত অবচেতনে তার কাঠখোট্টা অর্ধাঙ্গের ডান হাত জড়িয়ে সেই নির্মল, নিষ্পাপ হাসি শ্রবণ করছে।

“ভোজন বিলাস” হোটেলের তিন চেয়ার দখল করে আছে মারওয়ান, নিশাত আর নাহওয়ান। একটি চেয়ার ফাঁকা যেটায় নিশাত ব্যাগ রেখেছে। নাহওয়ান বাবার কোলে বসে পাশের চেয়ারে পা ছড়িয়ে দিয়েছে। নিশাত মারওয়ানের মুখোমুখি চেয়ারে বসা। তার অস্বস্তি হচ্ছে এত মানুষের ভিড়ে। হোটেলটা ছোট তবে মানুষে গিজগিজ করছে। সকালের এই সময়টায় কর্মব্যস্ত মানুষের ভিড় লেগে থাকে হোটেলটায়।

তাছাড়া এই হোটেলের প্রত্যেকটা আইটেম অনেক সুস্বাদু হয়। দামও কম থাকে তাই সাধ্যের মধ্যে মজার মজার আইটেমের স্বাদ নিতে নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত সকলে ভিড় জমায়। মারওয়ান এখানে প্রায়ই খায় তাই এই হোটেলেই এনেছে নিশাতকে। ছেলেকে নিয়ে আগেও অনেকবার আসা হয়েছে তবে নিশাতকে নিয়ে এই প্রথম। নিশাত আশপাশ দেখে হাসফাঁস করছে। মারওয়ান তীক্ষ্ণ নজরে নিশাতের অস্বস্তি, বার বার এদিক ওদিক চাওয়া পর্যবেক্ষণ করলো। আচমকা বললো,

“লিলিপুট, আমার পাশে এসে বসো।”

নিশাত চমকে মারওয়ানের দিকে চাইলো। মারওয়ান ছেলেকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে নিশাতকে ভিতরে ঢোকার জন্য ইশারা করলো। নিশাত ব্যাগ নিয়ে ভিতরে ঢুকে গেলো। সমস্যা হলো নিশাতের বড় ভ্যানিটি ব্যাগটায়। এতক্ষণ তো সেটা নিশাতের পাশের খালি চেয়ারটায় রেখেছিল এখন কোথায় রাখবে এই ভেবে উদ্বিগ্ন হলো। মারওয়ান পাশে বসে বললো,

“ব্যাগটা টেবিলের উপরে কোণায় রাখো।”

নিশাত রাখলো। মারওয়ান খাবারের অর্ডার দিয়ে এলো। নিশাত ঘামছে প্রচুর। এত মানুষের ভিড়ে কমফোর্ট ফিল করছে না সে। মনে হচ্ছে তার দিকে সবাই তাকিয়ে আছে। উপরন্তু মানুষের ভিড়ে চারপাশ উত্তপ্ত লাগছে। মারওয়ান পাশেই ছেলের সাথে দুষ্টুমি করছে।

“তোকে কিছু খাওয়াবো না পান্ডা।”

নাহওয়ান বাবার কোলে পা দুলাতে দুলাতে বললো,

“ইননা, আমি কাবো।”

মারওয়ান ভ্রু নাচিয়ে বললো,

“কি খাবি?”

“চিপ।”

“তোর জন্য এই সকাল সকাল চিপস বানিয়েছে কে?”

নাহওয়ান মারওয়ানের দিকে আঙুল তাক করে বললো,

“টুমি।”

“এহ্ ওনার জন্য চিপস বানাবো আমি? রাণী ভিক্টোরিয়ার আওলাদ ভাবিস নিজেকে?”

নাহওয়ান মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো। নিশাত ফিক করে হেঁসে দিলো। যা শুধু মারওয়ানের কর্ণগোচর হলো। মারওয়ান ঘাড় ফিরিয়ে চাইলো নিশাতের দিকে। নিশাত নিকাবের আড়ালে মুচকি মুচকি হাসছে। মারওয়ান কপাল কুঁচকে বললো,

“তুমি হাসছো কেন?”

“কে যেন ছেলেকে ব্রিটিশের নাতি বলে? ভিক্টোরিয়া কিন্তু ব্রিটিশ রাণী।”

মারওয়ানের কপাল আরও কুঞ্চিত হলো। ঠিকই তো, এটা তো খেয়াল ছিল না তার। এই মা, ছেলে মহাচালাক। ভাবা যায়, তাকে ঘোল খাওয়াচ্ছে। এরমধ্যেই নাস্তা এসে হাজির। মারওয়ান তার আর নিশাতের জন্য পরোটা, ডাল, ভাজি আর গরুর গোশত অর্ডার করেছিল। আর নাহওয়ানের জন্য তেল ছাড়া রুটি আর ডিম অর্ডার করেছে। নিশাতের দিকে পরোটার প্লেট আর তরকারির বাটি এগিয়ে দিয়ে নিজে খাওয়া শুরু করলো।

নিশাত নিকাব একটু উঠিয়ে বিসমিল্লাহ বলে ডাল আর গোশত ভুনায় পরোটা ডুবিয়ে মুখে পুড়লো। উম পুরোই অমৃত। মুখে দেয়ার সাথে সাথে চোখ বন্ধ হয়ে গেলো তার। মারওয়ান ছেলেকে খাইয়ে নিজেও খেলো। নিশাতের খেতে বেশ সময় লাগলো। নিকাব পড়ে খাচ্ছে দেখে সময় লাগলো তার। খাওয়া শেষে মারওয়ান বিল মিটিয়ে দিলো। নিশাত বুঝলো পকেট ভারী আজ। নিশ্চয়ই টাকা পাঠিয়েছেন শ্বশুর আব্বা। ছেলেকে আদর করে নিশাত স্কুলে চলে গেলো। আজকে তার মনটা ফুরফুরে লাগছে।



গত দুইদিন ধরে উর্মি ভুঁইয়া মানহার সাথে রাগারাগি করছেন। কিছু থেকে কিছু হলেই মেজাজ দেখাচ্ছেন। মানহা এই প্রথম উর্মি ভুঁইয়াকে ভিন্নরূপে দেখলো। তাকে যখন ধমক দিচ্ছিলো তখন তার চোখে পানি এসে গিয়েছিল। এই বাড়িতে যাকে এত্তো আপন ভাবতো সেই যখন বদলে যায় তখন এর থেকে কষ্টের বোধহয় আর কিছু হয়না। সামান্য রান্না, ছোটখাটো বিষয় নিয়ে উর্মি ভুঁইয়া কথা শুনিয়েছেন সেটা ভাবলেই কেমন গা শিউরে উঠছে তার। তাহলে কি এতদিন যেই রূপ দেখেছে সেটা ছিল মুখোশ?

যত পুরোনো হবে ততই কি খোলস পাল্টে যাবে সবার। স্বামী, শ্বশুর, শাশুড়ি নির্যাতন করে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেয় এটা কি তার বেলাতেও বাস্তবায়ন হবে? তার কেমন দম বন্ধ হয়ে আসছে। আগের মানহা হলে বোধহয় প্যানিক অ্যাটাক করে সেন্সলেস হয়ে যেতো। তবে এখনকার মানহা কথায় কথায় প্যানিক অ্যাটাক করেনা তাই এই কষ্ট হজম করা জানতে হবে তার। শ্বশুরবাড়ি তো এমনই। এই বাড়িতে তার আপন কেউ নেই। সবাই স্বার্থের জন্য তাকে ব্যবহার করছে। ফ্লাফিকে নিয়ে মন খারাপ করে বারান্দায় বসে বসে এসবই ভেবে চলছে সে।

ইহাব ক্লান্ত হয়ে ঘরে ঢুকলো। আশেপাশে মানহাকে না দেখে ডাক দিলো। মানহা ডাক শুনে রুমে আসলো। তার চোখ মুখ ফোলা। কান্নার ফল। ইহাব ভ্রু কুঁচকে বললো,

“কি হয়েছে?”

“কিছু না।”

ইহাব এগিয়ে আসতে আসতে বললো,

“চোখ মুখ তো ভিন্ন কথা বলছে।”

মানহা কোনো প্রতিউত্তর না করে মুখ শক্ত করে রাখলো। ইহাব মানহার গালে, কপালে হাত দিয়ে পরীক্ষা করে বললো,

“কই জ্বর তো আসেনি। তাহলে মন খারাপ কেন?”

“মন খারাপ নয়। আমি ঠিক আছি।”

বলেই পাশকাটিয়ে চলে গেলো। ইহাব কপাল কুঁচকে বললো,

“ওহে মাহাবুব দুহিতা,
মন কেন বিষণ্ন তোমার?
গভীর নেত্রের তনয়া,
হৃদয় করেছো তোলপাড়
একটুখানি হেঁসে আমার
হিয়া করো চুরমার।”

মানহা অবাক হয়ে ইহাবের দিকে চাইলো। ইহাব কোমরে দুই হাত রেখে মানহার দিকে এক ভ্রু উঁচিয়ে চেয়ে আছে। মানহা থতমত খেয়ে বললো,

“ফ্রেশ হন। খাবার দিচ্ছি।”

বলেই রুম থেকে বেরুতে নিলে ইহাব বললো,

“আরে কবিতার উত্তরে তো কিছু বলে যাও পাষাণ নারী।”

মানহা কিছু না বলে দ্রুত প্রস্থান করলো। বেচারি শরম পেয়েছে। তাই তো পালিয়ে গেলো। ইহাব মানহার যাওয়ার পানে তাকিয়ে বললো,

“একবার তোমাকে পাই, ধরবো জড়াই।”


ইমতিয়াজ ভুঁইয়া স্ত্রীকে কোনোভাবেই শান্ত করতে পারছেন না। উর্মি ভুঁইয়া পাগলামি করছেন। সবার সাথেই মেজাজ দেখাচ্ছেন। ইমতিয়াজ ভুঁইয়া মহা ফ্যাসাদে পড়েছেন। হঠাৎ আবার এই আচরণের মানে বুঝতে পারছেন না তিনি। উর্মি ভুঁইয়া শক্ত গলায় বললেন,

“এখান থেকে যান। আমাকে একা থাকতে দিন। ভালো লাগছে না কিছু।”

ইমতিয়াজ ভুঁইয়া বললেন,

“ওষুধটা খাও তারপর যাচ্ছি।”

“বললাম না আমি এখন ওষুধ খাবো না। পেটে একটাও মানুষ ধরিনি। সব কয়টা বজ্জাত হয়েছে। মায়ের কথা শোনে না। এই পরিবারে আমি এখনো তো ওই দুইটা শত্রুর জন্যই পড়ে আছি নাহলে এই সংসারকে লাথি মেরে কবে চলে যেতাম। আমার কথা অমান্য করে কত বড় বেয়াদব।”

ইমতিয়াজ ভুঁইয়া কপাল কুঁচকে বললেন,

“তুমি কি তোমার ভাইদের সাথে আবারও কথা বলেছো?”

উর্মি ভুঁইয়া তেজ দেখিয়ে বললেন,

“হ্যাঁ বলেছি তো কি হয়েছে? ওর মামা ওকে কতবার যেতে বলেছে অথচ সে নাকি ফোনই ওঠায় না। আমি বলে দেয়ার পরেও কতবড় অবাধ্য সে! বউ আসার পর দিনদিন উচ্ছন্নে যাচ্ছে সে।”

ইমতিয়াজ ভুঁইয়া বললেন,

“কিন্তু তোমার ছেলে তো আগেও এমন ছিল। পরের মেয়ের দোষ টানছো কেন?”

“কিহ আমি দোষ টানছি? ছেলের বউয়ের পক্ষ নিচ্ছেন যে হঠাৎ? ওদেরটা চোখে পড়ে না, আমারটাই চোখে পড়ছে আপনার? পড়বেই তো। নিজের সন্তানের সব দোষ মাফ আর স্ত্রীর বেলায় লাফ?”

যত্তসব আজগুবি কথাবার্তা। কোথায় লাফ দিয়েছে সে। মাথার এন্টেনা সব ছিঁড়ে গেছে মনে হয়। ইমতিয়াজ ভুঁইয়া আর কথা না বাড়িয়ে উর্মি ভুঁইয়াকে জোর করে ওষুধ খাইয়ে দিলেন। বকবক করতে করতে কিছুক্ষণের মধ্যেই উর্মি ভুঁইয়া ঘুমে ঢুলে পড়লেন। ইমতিয়াজ ভুঁইয়া দীর্ঘনিশ্বাস ছেড়ে চেয়ারে মাথা এলিয়ে দিলেন। তিনি সামনের দিনগুলো ভেবে শঙ্কিত।



হেড রকিং চেয়ারে দুলছেন আর চায়ে চুমুক দিচ্ছেন। সামনে বসে আছে জিনান আদহাম, নেওয়াজ শাবীর, মুনতাজির জায়েদ। হেড মুনতাজিরের উদ্দেশ্যে বললেন,

“শরীর কেমন তোমার?”

“জ্বি মোটামুটি ভালো।”

“নিজের যত্ন নিও। AC এর সাথে সাক্ষাৎ হয়েছে সবার?”

জিনান, নেওয়াজ উভয়ই মাথা নাড়ালো। হেড দু হাত সামনে এনে বললেন,

“পারফরমেন্স কেমন?”

নেওয়াজ জোর দিয়ে বললো,

“আউটস্ট্যান্ডিং অ্যান্ড আনবিলিভ্যাবল। আমরা এতটাও আশা করিনি।”

হেড মুখে সন্তুষ্টির রেখা ফুটে উঠলো। জিনানকে কোনো কথা বলতে না দেখে বললেন,

“What’s your opinion, Adham?” (তোমার মতামত কি আদহাম?)

জিনান ধ্যান চ্যুত হলো। গলা পরিষ্কার করে হেডের দিকে গুরুগম্ভীর কণ্ঠে বললো,

“এক্সিলেন্ট স্কিল। His performance is excellent.”

হেড হালকা হাসলো। মুনতাজিরের দিকে চেয়ে বললো,

“তুমি তো ছুটিতে ছিলে তাই তার সাথে সাক্ষাৎ হয়নি একটু পরে আসবে দেখা করে নিও।”

মুনতাজির মুখ টানটান করে বললো,

“আমি তো তাকে চিনি স্যার। মোটামুটি পরিচয় আছে। তাই তার সম্পর্কে একটু হলেও ধারণা আছে।”

হেড মাথা নাড়াতে নাড়াতে বললেন,

“হ্যাঁ তাইতো।”

হঠাৎ কিছু মনে করার ভঙ্গিতে বললেন,

“তোমাদের তো বলাই হয়নি, আরেকজন বিশেষ এজেন্টও আজকে অ্যাটেন্ড করবে। সেও চমৎকার দক্ষতা সম্পন্ন। আমার পছন্দের। আর কিলার জাদকে পুলিশ কাস্টডিতে পাঠাতে হবে আজ।”

সবার মুখে উদ্বেগ দেখা দিলো। গ্লাস ডোরে নকের শব্দ হলো। হেড আসার সম্মতি দিলেন। ডোর টেনে প্রবেশ করলো কঠোর মুখ ভঙ্গির সুঠাম দেহ ও বলিষ্ঠ গড়নের একজন। মাথায় হ্যাট পরনে লং কোট। হেড দাঁড়িয়ে সংবর্ধনা জানালেন। হেডের সাথে সাথে বাকিরাও দাঁড়িয়ে গেলো।

“আরে তোমার অপেক্ষাতেই ছিলাম। কতদিন পর আমাদের ডিপার্টমেন্টে তুমি। ওয়েলকাম ওয়েলকাম মিস্টার মার্ভ জেন।”

মার্ভ জেন পকেটে হাত ঢুকিয়ে হেঁটে এগিয়ে এসে হেডের সাথে করমর্দন করে হালকা রসিকতার স্বরে বললো,

“Thanks Sir. Maybe You have gained weight.” (ধন্যবাদ স্যার। মনে হচ্ছে আপনার ওজন কিছুটা বেড়েছে।)

হেড উচ্চস্বরে হেঁসে দিয়ে বললেন,

“আসলেই??”

মার্ভ জেন মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো। এদিকে জিনান আদহাম, নেওয়াজ শাবীর, মুনতাজির জায়েদ তিনজনের মুখই গম্ভীর। দেখে মনে হবে কেউ তাদের মুখে বিছুটি পাতা লাগিয়ে দিয়েছে। হেডকে এই প্রথম এত হাসতে দেখছে তারা। মনে হচ্ছে পার্টনার পেয়েছে তার। অথচ তাদের বেলায় মুখটা সবসময় গম্ভীর করে রাখবে। নেওয়াজ মুখ লটকে বললো,

“সেদিন আমিও তো বলেছিলাম স্যার আপনি সামান্য মোটা হয়ে গেছেন ওইদিন মুখটাকে কেমন করে ফেলেছিল দেখেছিলেন না আপনারা? তার সুঠাম দেহের প্রতি নাকি বদনজর দিচ্ছি অথচ আজকে তার বিশেষ এজেন্ট এসে ওজন বেড়ে গেছে বলায় কি খুশি! মানে কুচ ভি।”

জিনানও খেয়াল করেছে বিষয়টা। মুনতাজির জায়েদ তো একেবারই সাইলেন্ট হয়ে গেছে। একটা টু শব্দও করছে না। মার্ভ জেন মুখ গম্ভীর রেখেই কিছু বলে চলেছে। সেটার প্রেক্ষিতে হেড জোরে জোরে হাসছেন। তার মনে হচ্ছে কানের পাশ দিয়ে সাঁই সাঁই করে বুলেট যাচ্ছে। জিনান মুনতাজিরকে খোঁচা দিয়ে বললো,

“ব্যাপারটা কি বলুন তো মুনতাজির সাহেব?”

মুনতাজির চোখ তীক্ষ্ণ করে রসকষহীন গলায় বললো,

“স্পেশাল ট্রিটমেন্ট ফর স্পেশাল এজেন্ট।”

চলবে…

(আসসালামু আলাইকুম।)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply