Golpo romantic golpo ভবঘুরে সমরাঙ্গন

ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৩৯+৪০


ভবঘুরে_সমরাঙ্গন

পর্ব_৩৯

তাজরীন ফাতিহা

তোমার ঘরে বাস করে কারা ও মন জানো না
তোমার ঘরে বসত করে কয়জনা
একজনে ছবি আঁকে এক মনে ও ওমন
আরেকজনে বসে বসে রং মাখে
আবার সেই ছবি খান নষ্ট করে
কোন জনা কোন জনা
তোমার ঘরে বসত করে কয়জনা
মন জানোনা
তোমার ঘরে বসত করে কয়জনা..

খাটে শুয়ে শুয়ে গলা ছেড়ে লালনগীতি গাইছে মারওয়ান আজাদ। নিশাত রান্নাঘর থেকেই শুনতে পারছে। আহা মনে কি খুব আনন্দ! এখন যদি সে কোনো কাজের কথা বলে তখন চোখ মুখ কালো করে মরার মতো পড়ে থাকবে। এমন ভাব ধরবে কানেই শোনে নি। পৃথিবীর নম্বর ওয়ান বয়রা হয়ে যায় কাজের কথা শুনলে। নিশাতের কেন যেন ঐ লোকের ফুর্তি সহ্য হচ্ছে না। এসেই ছেলেকে নিয়ে চিৎপটাং হয়ে গলা ছেড়ে রেডিও চালু করেছে। রেডিও বলতে আবার গলা খারাপ না, কণ্ঠ ভালোই। এই কণ্ঠে কুরআন তেলাওয়াত করলে দারুন শোনাতো কিন্তু তা তো করবে না। যতসব খারাপ কাজ করায় ওস্তাদ এই পুরুষ। মাঝে মধ্যে বাতিক উঠলে এই গানটা প্রায়ই গায় সে। নিশাত রান্নাঘর থেকে রুমে এসে বললো,

“নাহওয়ান আঙ্গুর খাবে?”

বাবার বুকে শুয়ে থেকেই উত্তর দিলো,

“আঙুল কাবো না।”

“কেন? তুমি আঙ্গুর খাও দেখে নিয়ে আসলাম। এখন খাবে না কেন?”

“একন কাবো না।”

“আচ্ছা যখন মন চাইবে খেও।”

নিশাত চলে যেতে নিলে আবার পিছু ফিরে মারওয়ানকে উদ্দেশ্য করে বললো,

“শুনুন, ঘরে চাল নেই। চাল আনতে পারবেন? আমার আজ মনে ছিল না আনার কথা।”

কথা শেষ করে দেখে মারওয়ানের নাক ডাকার আওয়াজ আসছে। এই মাত্র চোখ বন্ধ করে ঠ্যাং দোলাচ্ছিল ছিল এখন কাজের কথা বলায় ভং ধরেছে। নাহওয়ান বাবার বুকের উপর শুয়ে হা করে নাক ডাকার আওয়াজ শুনছে। নিশাত হতাশ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। নাহ, এই পুরুষ কোনোদিন ভালো হবে না। আচ্ছা এরমধ্যে কি আল্লাহ মন দেয়নি? পাথর কেন এমন? কোনো অনুভূতি নেই, সংসারের প্রতি উদাসীন। হৃদয় নামক বস্তুটি কি আল্লাহ তাকে দেয়নি? দিয়েছে। এই আলসে, ভ্যাগাবন্ড পুরুষটিরও একটা হৃদয় আছে। যার দরজা কোনো সময় না খুললেও ফাইয়াজ নাহওয়ান নামক গোল আলুর সময় ঠিকই উন্মুক্ত হয়।

নাহওয়ান যেদিন প্রথম বাবা ডাকলো সেদিন কঠোর, অনুভূতিহীন, উদাসীন মারওয়ান আজাদ প্রথমবারের মত কাঁদলো। চিৎকার করে কান্না নয় সেই কান্না ছিল চোখের কোল ঘেঁষে গড়িয়ে পড়া অশ্রু বিন্দুর এক নীরব নৃত্য। নিশাত জানে না সংসার বিরাগী, নিরাসক্ত পুরুষটি কিসের জন্য সেদিন দু’ফোঁটা চোখের জল ফেলেছিল। সে অবাক পানে শুধু চেয়ে দেখেছিল। হয়তবা এও ঠাহর করতে পেরেছিল মারওয়ান আজাদ নামক ভবঘুরে পুরুষটির দুর্বলতা তারই অংশ ওই নরম তুলতুলে মাংসল কায়াটি। কাঁপা গলায় নিজের বড় হাতের তালুর উপর চার মাসের ছোট্ট মোলায়েম প্রাণপিণ্ডের হাত মেলে রেখে যখন বিড়বিড় করে বলছিল,

“কি বললি? আবার বল দেখি?”

নাহওয়ান তখন অস্পষ্ট স্বরে আবার ডেকেছিল,

“বা..ব্বা.. বা।”

সেটাই ছিল নাহওয়ানের প্রথম বুলি।

(এই বয়সী বাচ্চারা কথা বলতে জানে না। শুধু অস্পস্ট শব্দ আওড়ায়। এটা বাচ্চাদের একধরনের খেলা। এত ছোট বাচ্চারা মূলত ব্যাবলিং করে। এগুলোকে বলা হয় pre-linguistic sounds। এই আধো আধো বুলিকেই মারওয়ান বাবা ডাক ধরে নিয়েছে।)

অতীতের স্মৃতিচারণ থেকে বের হয়ে নিশাত ফোঁস করে নিশ্বাস ছাড়ে। এই কথা মনে পড়লে নিশাতের দুঃখ প্রশমিত হয়। সামনে শায়িত পুরুষটির প্রতি রাগ পড়ে যায়। মারওয়ান আজাদের সেই দুফোঁটা চোখের জল তার সংসার জীবনের নড়বড়ে খুঁটি। নয়তো সংসার নামক খুঁটিটা বহু আগেই বোধহয় ভাঙতো। মাঝে মধ্যে খুব ইচ্ছে করে ওই রগ বাঁকা পুরুষটির কলার ঝাঁকিয়ে জিজ্ঞেস করতে,

“আমাকে বিয়ে করেছিলেন কেন? কিভাবে, কোন এঙ্গেলে কত ঘণ্টা ঘুমান তা দেখাতে?”


ইমতিয়াজ ভুঁইয়া মানহার উপর চেঁচামেচি করছেন। মানহা নিঃশব্দে চোখের পানি ফেলছে। নিজের শখের ফুল গাছ ভেঙে ফেলায় ইমতিয়াজ ভুঁইয়া ক্ষেপে গেছেন। মানহাকে মুখ নিচু করে কাঁদতে দেখে ধমকে বললেন,

“এই মেয়ে কান্না থামাও। কিছু বললেই কান্না শুরু। মহিলা জাতই বেজাত।”

উর্মি ভুঁইয়া চিৎকার চেঁচামেচি শুনে নিচে এসে দেখলেন ইমতিয়াজ ভুঁইয়া মানহার উপর মেজাজ দেখাচ্ছেন। তাই সেখানে গিয়ে এই কথা শুনে গুরুগম্ভীর কণ্ঠে বললেন,

“কি হয়েছে?”

ইমতিয়াজ ভুঁইয়া স্ত্রীর কণ্ঠ শুনে চুপ করে গেলেন। তারপর চোয়াল ঝুলিয়ে বললেন,

“গাছ ভেঙেছে আমার, কাঁদবো আমি তা না দুটো কথা শুনিয়েছি অমনি কেঁদে কুটে একসার।”

মানহা ইমতিয়াজ ভুঁইয়ার কথা শুনে চিৎকার করে বলতে ইচ্ছা করলো কয়েশ কথা শুনিয়ে বলে দুটো কথা শুনিয়েছি। তার বড্ড অভিমান হলো শাশুড়ির পাশে দাঁড়ানো ওই বুড়োটার প্রতি। তাকে খালি ধমকায়, দেখলেই খিটমিট করে। মানহার প্রতি তার কিসের এত বিদ্বেষ যে সবসময় চিরতার মতো আচরণ করে? তার শাশুড়ি আম্মু এমন চিরতার সাথে কিভাবে এত বছর সংসার করেছেন? উর্মি ভুঁইয়া মানহাকে ভেতরে যেতে বললেন। মানহা চোখ মুছে বাড়ির ভেতরে চলে গেলো। উর্মি ভুঁইয়া চোখ ছোট করে স্বামীর পানে চাইলেন। ইমতিয়াজ ভুঁইয়া কাচুমাচু করছেন।

“তো, আপনি আবার কবে থেকে গাছের প্রতি যত্নশীল?”

স্ত্রীর প্রশ্নে ইমতিয়াজ ভুঁইয়া থতমত খেয়ে বললেন,

“এভাবে বলছো কেন? সব সময়ই তো যত্নশীল।”

উর্মি ভুঁইয়া হাত ভাঁজ করে বললেন,

“তাই নাকি? কে যেন সপ্তাহে সপ্তাহে টবের গাছ ভাঙতো, বাগানের গাছ উগরে মাটি খাবলাতো?”

ইমতিয়াজ ভুঁইয়া গলা খাঁকারি দিয়ে মিনমিন গলায় বললেন,

“সেটা তো ছোট থাকতে। ছোটদের দ্বারা এসব ছোট খাটো ভুল হতেই পারে।”

“হ্যাঁ ত্রিশ বছরের দামড়া ফিডার খাওয়া ছোটদের দ্বারা ভুল হতেই পারে। ওগুলো কোনো ব্যাপার না। ছোট বলে কথা। আপনার কথা অনুযায়ী মানহা তো নবজাতক শিশু। ছোটদের ভুল ধরতে নেই আর নবজাতক শিশুর ভুল বুঝি ধরতে হয়? এগুলো তো তাদের খেলা।”

স্ত্রীর সূক্ষ্ম অপমানে মুখটা লটকে গেলো চেয়ারম্যান ইমতিয়াজ ভুঁইয়ার। এভাবে কথার মারপ্যাঁচে ফেলবে কল্পনাও করতে পারেননি তিনি। না বুঝে কথা বলে সর্বনাশ করে ফেলেছেন। এখন কিছু বললে তার সোনার অতীত ধরে টান মারবে। না বাবা এখান থেকে মানে মানে কেটে পড়াই উত্তম। মুখ গম্ভীর করে উল্টো পথে হাঁটা দিয়ে দিয়েছেন এরমধ্যে। উর্মি ভুঁইয়া পিছন থেকে বললেন,

“ছোট বাবু কি গোসসা করলেন?”


মানহা মুখ কালো করে ফ্লাফিকে নিয়ে বসে আছে। ইহাব রুমে ঢুকে হাত ঘড়ি খুলতে খুলতে আয়নায় মানহার প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে বললো,

“মন খারাপ নাকি?”

মানহা ঘাড় নাড়িয়ে না জানালো। তোয়ালে ঘাড়ে নিয়ে ওয়াশরুমে যেতে যেতে বললো,

“শোনো আগামীকাল ডক্টরের কাছে যাবো। সন্ধ্যায় রেডি হয়ে থেকো।”

“ডাক্তারের কাছে কেন? কার অসুখ হয়েছে?”

ইহাব চলন্ত পা জোড়া থামিয়ে বললো,

“তোমার প্যানিক অ্যাটাকের জন্য কাউন্সিলিং করাবো। এভাবে কতদিন? বিয়ে হয়েছে একমাসের মতো হয় অথচ বউয়ের ধারে কাছেও ঘেঁষতে পারিনা এরকম আর কতদিন চলবে? তাই ঠিক করেছি তোমাকে কাউন্সিলিং করিয়ে সুস্থ করবো তারপর আমার হিসেব নিকেশ।”

মানহা আঁতকে উঠলো। কাঁপতে কাঁপতে বিছানায় উল্টে পড়লো। ফ্লাফি মিঁউ মিঁউ করে ডেকে মানহার শরীরে উঠছে নামছে। ইহাব বোকার মতো চেয়ে থাকলো। তার কল্পনায় বাংলাদেশি মিডিয়া ভেসে উঠলো। যেখানে আজাইরা বট সাংবাদিকরা প্রচার করছে,

“স্বামী হিসেবে নিকেশ চাওয়ায় স্ত্রী সেন্সলেস।”

“স্বামীর কারণে স্ত্রী অ্যাটাক।”

ইহাব মাথা নাড়িয়ে বাস্তবে এলো। ভাগ্যিস বাংলাদেশি ইউটিউবার কিংবা সাংবাদিক এখানে উপস্থিত নেই। নাহলে আজকে তারা রসালো একটা শিরোনাম পেতো সাথে প্লাস পয়েন্ট হিসেবে সে জেলে বসে মশা মারতো। বাংলাদেশের মানুষরা তো আবার নারীঘটিত ব্যাপার এলে ডানে বামে তাকায় না ডিরেক্ট অ্যাকশনে চলে যায়।

পায়ে সুরসুরি পেয়ে নিচে তাকিয়ে দেখলো ফ্লাফি জিহ্বা বের করে তার পা চাটছে আর মিঁউ মিঁউ আওয়াজ করছে। বোবা প্রাণীটা হয়তোবা মানহার কাছে যাওয়ার জন্য তাকে বলতে এসেছে। সে হতাশ ভঙ্গিতে বিছানার দিকে এগুলো। এই নারীর অ্যাটাক দেখতে দেখতে কোনদিন যেন সেও অ্যাটাকের শিকার হয়। প্যানিক অ্যাটাক না সে করবে হার্ট অ্যাটাক।

_

স্কুল থেকে বাসায় ফেরার পথে নিশাতের মনে হলো কেউ তার পিছু পিছু আসছে। সে ঘুরে পিছনে তাকালো। কাউকে দেখলো না। একজন ভিক্ষুক থালা নিয়ে বসা রাস্তার পাশে। আরেকটু দূরে ঝালমুড়ি ওয়ালা ঝালমুড়ি বানাচ্ছে আর গলির মুখে একজন বেলুন ওয়ালা দাঁড়িয়ে আছে। চায়ের দোকানে বসে কয়েকজন চা খাচ্ছে। সন্দেহভাজন কিছুই চোখে পড়লো না। হয়তবা মনের ভুল। সে আবারও সামনে তাকিয়ে হাঁটা দিলো নিজ গন্তব্যে। বাসায় ঢুকে স্বস্তি পেলো। ভীষণ পিপাসা পেয়েছে। দুই গ্লাস পানি খেয়ে বিছানায় শরীর এলিয়ে দিলো। বাচ্চা কাচ্চাদের পরীক্ষা আসলে অনেক চাপ পড়ে। ডিউটি করো, খাতা জমা দাও, খাতা কাটো। উফ একটা যুদ্ধ যেন।

নাহওয়ান মাকে দেখে মায়ের বুকে উঠে শুয়ে আছে। নিশাত জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে। তার ফলে বুকটা দ্রুত ওঠানামা করছে। নিশাত দেখলো বুকের উপর শ্বাসের ছন্দপতনে তার ছানার ছোট্ট শরীরটা ওঠা নামা করছে। সে নাহওয়ানকে জড়িয়ে ধরে আদর করে বললো,

“আমার ছানার কি হয়েছে?”

মারওয়ান টয়লেট থেকে বেরুতে বেরুতে বললো,

“তোমার ছানার ঘুম পেয়েছে।”

নিশাত উঠে বসে বললো,

“সেকি ওকে ঘুম পাড়াননি কেন?”

মারওয়ান গেঞ্জি খুলে শার্ট গায়ে জড়িয়ে বললো,

“ও তোমার সাথে খাবে দেখে বসে আছে। আজকে মুড অফ তাই বেশি ঘাটিনি।”

নিশাত চিন্তিত হয়ে ছেলের গালে কপালে হাত ছোঁয়ালো। নাহ জ্বর তো নেই তাহলে তার ছানার মুড অফ কেন? সে ছেলেকে আদুরে গলায় জিজ্ঞেস করলো,

“ভাত খাবেন আব্বা?”

“কাবো না।”

বলেই মুখ চুপসে ফেললো। নিশাত মাথায় হাত বুলিয়ে বললো,

“কেন? অন্য কিছু খাবেন?”

নাহওয়ান ছলছল চোখে তাকিয়ে মাথা নাড়িয়ে না জানালো। নিশাত গাল টেনে দিতেই ঝরঝর করে কেঁদে দিলো। নিশাত ব্যস্ত হয়ে বললো,

“কি হলো? কাঁদছো কেন? কোথাও ব্যথা পেয়েছো নাকি?”

নাহওয়ান কাঁদতে কাঁদতে মাথা নাড়ালো। ছেলের কান্নায় ইতোমধ্যে মারওয়ানও এদিকে তাকিয়েছে। নিশাত বললো,

“ব্যথা পাওনি, খুদা লাগেনি তাহলে কাঁদছো কেন?”

“বাবা মালচে।”

নিশাত এতই অবাক হলো যে কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। সে কি ঠিক শুনেছে? মারওয়ান মেরেছে? পৃথিবী উল্টে গেলেও তো সে বিশ্বাস করবে না এটা। আবার ছেলে তো মিথ্যাও বলে না। সে ঘাড় ফিরিয়ে মারওয়ানের দিকে চাইলো যে বর্তমানে চোখ বড় বড় করে এদিকে তাকিয়ে আছে। মারওয়ান জোরে বলে উঠলো,

“কিহ!! এই পটলের বাচ্চা তোকে আমি কোন জন্মে মেরেছি?”

নিশাত শান্ত কণ্ঠে বললো,

“নাহওয়ান তো কখনো মিথ্যা বলে না।”

“কি মিথ্যা বলে না? আজকে দুধ খেতে গিয়ে আটার বয়াম খুলে আটা খেয়েছে। মুখে মাখিয়ে ভূত হয়েছে।মরিচের গুঁড়ার কৌটা খুলে হাত ঢুকিয়ে খাওয়ার সময় ভাগ্যিস আমি রান্নাঘরে গিয়েছিলাম। পুরো কুরুক্ষেত্র বানিয়ে ফেলেছিল। আমি ছিলাম শুয়ে এই পান্ডার সাড়াশব্দ না পেয়ে উঠে দেখি এই কাণ্ড। দিয়েছি ধমক সেই থেকে মুখ ফুলিয়ে রেখেছে। কত্তবড় সেয়ানা মা আসার সাথে সাথে নালিশ দেয়া শেষ আবার বলে বাবা মারছে। তোকে না মেরেই ভুল করেছি। আলু ভর্তা করা উচিত ছিল আলুর বাচ্চা।”

বলেই ছেলের দিকে চোখ রাঙিয়ে তাকালো মারওয়ান। নিশাত ফোঁস করে দম ছেড়ে স্বস্তির শ্বাস ফেললো। যাক সে ভুল ছিল না। সে এটা কিভাবে ভুলে গেলো নাহওয়ান তো বকা, মারা সবকিছুকে মাইর বলে। ছেলেকে আদর করে বললো,

“হয়েছে আর কাঁদে না। তুমি দুষ্টুমি করেছো কেন?”

নাহওয়ান গোলগোল চোখ করে বললো,

“ইট্টু ডুড কেয়েচি। মুজা না।”

মারওয়ান হাসতে হাসতে বললো,

“আটার গুঁড়া খেয়ে বলে দুধ খেয়েছি। আবার কয় মজা না। ঠিক হয়েছে অতি সেয়ানের গলায় দড়ি।”

নাহওয়ান বাবার দিকে তাকিয়ে মুখ ফুলিয়ে বললো,

“টুমি পুচা। নানা টুমাকে ডিচুম ডিচুম মালবে।”

নাসির উদ্দিনের কথা শুনে মারওয়ান কটমট চোখে ছেলের দিকে চাইলো। নিশাত মুখ টিপে হাসছে। মারওয়ানের সহ্য হলো না। সে চিৎকার করে বললো,

“কি বললি ব্রিটিশের নাতি? আজকে তোর খবর আছে। ভর্তা করে পার্সেল করবো তোর হিটলার নানার কাছে।”

নাহওয়ান ‘ইননা’ বলে মুখ লুকিয়েছে মায়ের কোলে। নিশাত বাপ, ছেলের খুনসুটি উপভোগ করছে। তার বেশ মজা লাগছে এই ঠোকাঠুকি।

__

নেওয়াজ শাবীর টেবিলে ভর দিয়ে বললো,

“এই প্রফেশনে এসে যে আর কি কি করা লাগবে আল্লাহ মালুম। শেষ পর্যন্ত বেলুন বেঁচা লাগলো।”

সামনে ডিপার্টমেন্টের দুই এজেন্ট বসা। তাদের মধ্যে একজন মুখ কালো করে বললো,

“আর আমার যে ঝালমুড়ি বেঁচা লাগলো। মুনতাজির সাহেব অলওয়েজ বেঁচে যান। হয় ছুটিতে থাকেন নয়তো আসেন না আর নাহলে অন্য কাজে থাকেন। সব ঝড় জঞ্জাট আমাদের উপর দিয়ে যায়। জীবনে প্রথম একটা কেস নিয়ে এত লড়াই যাচ্ছে।”

অন্য এজেন্টটা মাথা নাড়িয়ে সহমত প্রকাশ করলো। জিনান আদহাম ল্যাপটপ টাইপিং করছে। তার নীলাভ চোখে ল্যাপটপের আলো পড়ে রিফ্লেক্স হচ্ছে। জ্বলজ্বল করছে মণি। সে ল্যাপটপে আঙুল চালাতে চালাতেই বললো,

“ওসব দুঃখ বিলাস বাদ দিন। মিশন সলভ হওয়াটাই মুখ্য। আমিও তো ভিক্ষা করেছি। তো কি হয়েছে? ভেবে দেখলাম ভিক্ষা করাও খারাপ না। এই মিশনে হারলে রোজ ভিক্ষার থালা হাতে ছদ্মবেশে নেমে যাবো। শুয়ে শুয়ে ইনকাম করার মতো শান্তি দুনিয়ায় আর কোথাও নেই। প্যারাও নাই আবার টাকাও আয় হলো। ভিক্ষার পয়সা এখনো কোটে ঝনঝন করছে। কবি বলেছেন, কোনো কাজকে ছোট করে দেখতে না। তাছাড়া বাংলাদেশের ভিক্ষুকদের ডিমান্ড হাই লেভেলের। তারা ভিক্ষায় নামে স্যুট, টাই, সানগ্লাস পড়ে। এদেশ আর কিছুতে এগোক আর না এগোক এই সেক্টরে উন্নতির শিখরে।”

বলেই কোট ঝেড়ে পয়সার আওয়াজ শোনালো। উপস্থিত দুই এজেন্ট থতমত খেয়ে গেলো। গলা খাঁকারি দিতে লাগলো। নেওয়াজ উচ্চ শব্দে হেঁসে উঠে বলতে লাগলো,

“বড়লোক্স দেমাগি ভিক্ষুক ( যারা পরিপূর্ণ সুস্থ তবুও হাত পাতে) ও গুষখোরদের আইক্কাওয়ালা বাঁশ দিলো দ্যা গ্রেটেস্ট এজেন্ট জিনান আদহাম। আহ চমৎকারভাবে এক ঢিলে দুই পাখি মারলেন বস!”

জিনান আদহাম রহস্যময় ভঙ্গিতে হেঁসে হাত চালাচ্ছে ল্যাপটপে।

চলবে….

(আসসালামু আলাইকুম।)

ভবঘুরে_সমরাঙ্গন ( সংবেদনশীল পর্ব)

পর্ব_৪০

তাজরীন ফাতিহা

অদূরে মরা গাছটার উপরে একটা কাক অনবরত কা কা করে ডেকে চলেছে সেই সকাল থেকে। নিশাত রান্নাঘরের জানালা দিয়ে সেদিকে উদাস দৃষ্টি ফেললো। ছোটবেলায় অনেকের মুখে মুখে শুনতো কাক ডাকা ভালো লক্ষণ নয়। কাক ডাকলে নাকি বিপদ আসে। যদিও ইসলাম এসব কুসংস্কার বিশ্বাস করতে নিষেধ করে দিয়েছে। এগুলো বিশ্বাস করা শিককের শামিল। তাই মুসলিম হিসেবে এসব বিশ্বাস করা আকীদাহ এর পরিপন্থী। নিশাত আর কিছু না ভেবে কিছু দোয়া পড়ে আল্লাহর কাছে পানাহ চাইলো। এই কাক ডাকা নিয়ে হঠাৎ একটা স্মৃতি তার মানসপটে উঁকি দিলো।

নিশাত তখন স্বামী সংসারে নতুন পদার্পণ করেছে। মারওয়ানের স্বভাব, ব্যবহার সম্পর্কে সে অবগত ছিল না। তাই তার উচ্ছলতা কিংবা উড়নচণ্ডী রূপ প্রায়ই প্রকাশ করে ফেলতো। মারওয়ান ভ্রু কুঁচকে বিরক্তির জানান দিতো। মারওয়ানের কাছে এসব আদিখ্যেতা লাগতো। একবার প্রচণ্ড রূঢ় ভাষায় তাকে কথা শুনিয়েছিল বলে নিশাত রাগে অভিমানে কাঁদতে কাঁদতে শ্বশুরের সাথে বাবার বাড়ি চলে এসেছিল। টানা পনেরোদিন ছিল বাপের বাড়ি কিন্তু ওই ঘাড়ত্যাড়া পুরুষ একটা খোঁজ পর্যন্ত নেয়নি। শ্বশুর, শাশুড়ি নিয়ম করে খোঁজ নিলেও মারওয়ান তাকে পাত্তাই দিতো না যেন সে বাবার বাড়ি থেকে না আসলে মারওয়ান আজাদের কিছুই হবে না উল্টো ভালো হবে।

তো দিন এমনই পার হচ্ছিলো। একদিন উঠোনে কাক ডাকতে ডাকতে মাথাটা ধরিয়ে দিচ্ছিলো ঐসময় শ্বশুরবাড়ি থেকে কল আসে মারওয়ান নাকি অ্যাকসিডেন্ট করেছে। নিশাত তখন অভিমান ভুলে শ্বশুর বাড়িতে ছোটে। কাঁদতে কাঁদতে বেচারি তো অজ্ঞান হওয়ার দশা। নতুন বিয়ে তার উপর গ্রামের সবাই বলাবলি করছে বউটা অপয়া, ভালো না হ্যান ত্যান। সে গিয়ে দেখে মারওয়ানের সারা শরীর ব্যান্ডেজে আবৃত। গ্রামের মানুষের ভিড় লেগে আছে। নিশাত এত মানুষের সামনে ঠিকমত দেখতেও পারেনি লোকটাকে। অ্যাকসিডেন্ট নাকি করেছে দুইদিন আগে। নিশাতকে জানতে দেয়নি তার শ্বশুর বাড়ির লোকজন। গ্রামের মানুষ এই নিয়ে নানান কানাঘুষা করেছিল। সবাই বের হয়ে গেলে যখন সে রুমে লোকটাকে একা পেয়েছিল তখন বেশ করুণ গলায় শুধেছিল,

“কিভাবে হলো?”

ভাঙা গলায় আওয়াজ এসেছিল,

“আজরাইল মোলাকাতে এসেছিল।”

নিশাতের বুকটা কামড় দিয়ে উঠেছিল। ঠোঁট কামড়ে বলেছিল,

“আমাকে জানালে কি খুব ক্ষতি হতো?”

ব্যান্ডেজ বাঁধা পাষাণ লোকটা আস্তে আস্তে ঠোঁট নাড়িয়ে বলেছিল,

“তুমি কে? হু আর ইউ?”

নিশাতের অক্ষিপট জলে টলমল করছিল।

“আমাকে চেনেন না?”

“না।”

“স্মৃতিশক্তি নাই?”

“আছে। সেখানে তুমি নাই।”

ব্যাস আর কিছু বলেনি সে। বুকের উপর হুমড়ি খেয়ে প্রায় ঘণ্টা খানেক কেঁদেছে। মারওয়ান আজাদ ব্যথা পেলেও নিশাত বুক থেকে মাথা তোলেনি। কাঁদতে কাঁদতে মারওয়ানের বুকের উপরেই ঘুমিয়ে পড়েছিল। ঘুম ভেঙেছিল মাথায় হাতের ছোঁয়ায়। চোখ উঠিয়ে দেখেছিল মারওয়ান ঘুমের ঘোরেই তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। হুশ নেই তার, গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। কে জানে আদতেই ঘুমে ছিল? নাকি নিশাতের চর্মচক্ষুর আড়ালে অন্য কিছু ঘটেছিল।

সেই থেকে কাক ডাকলেই ওই স্মৃতি মস্তিষ্কে কড়া নাড়ে তার। নিশাত দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে ভাবনা থেকে বেরুলো। নাহওয়ান পাশে বসে হাত পা ছড়িয়ে গোশত আর আলু খাচ্ছে। নিশাত মায়াময় নজরে ছেলের পানে চাইলো।

“আব্বা?”

নাহওয়ান খাওয়ার তালেই জবাব দিলো,

“হু।”

“আরেকটু গোশত দেবো?”

“আলু ডাও। কুব মুজা মুজা।”

মাথা নাড়িয়ে জিহ্বা বের করে মজা বোঝালো। নিশাত কষানো গোশত থেকে আরেক টুকরো মুরগির ছোট পিস আর আলু উঠিয়ে দিলো। বাচ্চাটা মুখে মাখিয়ে ফেলেছে। মারওয়ান রান্নাঘরে এসে বললো,

“ওই আলুর বাচ্চা, আলু খাস?”

নাহওয়ান বাবার দিকে আলু ধরে মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বোঝালো।

“উলু কাবে?”

নিশাত চোখ রাঙিয়ে বললো,

“উলু বলতে নিষেধ করেছি না। আলু বলবে।”

নাহওয়ান ঘাড় নাড়িয়ে সায় জানালো। মারওয়ান বাটি হাতে নিশাতের পাশে দাঁড়ালো। তার চোখ চকচক করছে। ঘরে ভালো মন্দ রান্না হলে তার থেকে খুশি আর কেউ হয়না। নিশাত বললো,

“রান্না শেষ হলে খাবেন। আজকে গোশত কম রেঁধেছি।”

“ছেলের বেলায় কম পড়ে না। আমি চেয়েছি অমনি কম পড়ে গেলো।”

মারওয়ানের গুরুগম্ভীর উত্তর। নিশাত হতাশ হয়ে বললো,

“আপনি তো আর নাহওয়ানের মতো খান না তাই ছেলের সাথে তুলনা টানা বন্ধ করুন।”

মারওয়ান ভ্রু কুঞ্চিত করে বললো,

“কি বোঝাতে চাইছো? আমি বেশি খাই? তুমি খাবারের খোটা দিচ্ছো আমায়? আসলে তুমি মূলত চাচ্ছো আমি না খাই।”

“ইয়া আল্লাহ! কোন কথা থেকে কি টেনে এনেছে? নিন ধরুন খান। আমি বরং ডিম ভাজি করে খেয়ে নেবো নে।”

বলেই নিশাত বাটিতে মুরগির দুই পিস সলিড পিস উঠিয়ে দিলো। মারওয়ান হাড়ের গোশত বেশি পছন্দ করে তাই হাড্ডি যুক্ত গোশত চাইলো। নিশাত একপিস হাড্ডি ওয়ালা গোশত মারওয়ানের বাটিতে দিয়ে থালাবাসন ধুতে লাগলো। মারওয়ান গোশত পেয়ে ছেলের পাশে পা গুটিয়ে খেতে লাগলো। নিশাত আড়চোখে বড় আর মিনি মারওয়ান আজাদের কান্ডকারখানা দেখছে। নিজের পাতের গোশত শেষ করে নাহওয়ানের পাতের দিকে সরু নজরে চাইলো মারওয়ান। নাহওয়ান হাত, পা ছড়িয়ে হাড্ডি কামড়াচ্ছে। ছেলের পাতের গোশত নিজের পাতে নিয়ে টুপ করে মুখে নিয়ে চিবোতে লাগলো। কুড়মুড় শব্দ হচ্ছে। নাহওয়ান ফ্যালফ্যাল নয়নে সেদিকে চেয়ে রইলো। মারওয়ান কোণা চোখে চেয়ে বললো,

“কি হয়েছে?”

নাহওয়ান মায়ের দিকে তাকিয়ে কান্না গলায় পা দাপিয়ে বলতে লাগলো,

“মা, আমাল গুস্ত কাইচে। উহুলি গুস্ত নিচো কেনু? আমাল গুস্ত ডাও।”

মারওয়ান ছেলের চিক্কুর শুনে মুখ থেকে গোশতের টুকরো বের করে ছেলের মুখে ঢুকিয়ে দিলো। নাহওয়ান কান্না বন্ধ করে কুড়মুড় চিবোতে লাগলো। মারওয়ান মুখ লটকে বিড়বিড় করে বললো,

“ব্রিটিশের নাতি পুরাই ব্রিটিশ।”

নিশাত পিছন থেকে বললো,

“উহু, খেঁকশিয়ালের ছেলে পাতি শেয়াল।”


বিশদিন হলো ইহাব মানহাকে কাউন্সিলিং করাচ্ছে। প্রত্যেকবার ডাক্তারের রুমে মানহা একাই ঢোকে। ইহাব আর জোর করেনা। সে ওয়েটিং রুমে বসে বসে অপেক্ষা করে। কখনো পেপার পড়ে, কখনো ফোনে কাজ সাড়ে আবার কফি খায় এরকম করে সময় পেরোয়। আজকেও মানহার ডাক্তারের সাথে এপয়েন্টমেন্ট আছে। ইহাবের জরুরি কাজ আছে বিধায় সাথে সে সাথে যেতে পারবে না। নাস্তার টেবিলে উর্মি ভুঁইয়াকে জানানোর পর উর্মি ভুঁইয়া নিয়ে যাবেন বলেছেন। ইমতিয়াজ ভুঁইয়াও স্ত্রীর সাথে যাবেন বলে তর্কাতর্কি করছেন নাস্তার টেবিলে। উর্মি ভুঁইয়া বললেন,

“আমাদের সাথে আপনার কি কাজ?”

“আশ্চর্য কি কাজ মানে? তোমাকে কোনো মতেই একা ছাড়া যাবে না উর্মি? তুমি নিজেও জানো তোমাকে কেন একা ছাড়তে চাইছি না আর তাছাড়া চেয়ারম্যান বাড়ির দুই বধূ একা একা বাইরে যাবে ব্যাপারটা বাজে দেখায়। আমি আর কোনো কথা শুনতে রাজি নই। আমার রাগ সম্পর্কে নিশ্চয়ই ওয়াকিফাল তুমি।”

ইমতিয়াজ ভুঁইয়ার গুরুগম্ভীর টান টান মেজাজি গলা। উর্মি ভুঁইয়া স্বামীর রাগ দেখে আর কিছু বললেন না। সকালের নাস্তা সেরে গাড়িতে করে ঢাকার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লেন। ঢাকার বিখ্যাত মহিলা সাইকিয়াট্রিস্ট এর কাছে কাউন্সিলিং করছে মানহা। এখন একটু আধটু নরমাল হলেও পরিপূর্ণভাবে এখনো সুস্থ হয়নি সে। তার মধ্যে একটা আতঙ্ক বিরাজ করে সবসময়।

রাত দশটা। ইহাব ঘরে এসেই হাত ঘড়ি খুলে রাখলো। মানহা তোয়ালে এগিয়ে দিলো। ইহাব মুচকি হেঁসে বললো,

“গিয়েছিলে থেরাপিস্টের কাছে?”

“জ্বি।”

“আগের থেকে বেটার ফিল করছো?”

মানহা ঘাড় নাড়িয়ে সায় জানালো। ইহাব তোয়ালে নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেলো। কিছুক্ষণ পর ইহাব আর মানহা খাবার ডাইনিং টেবিলে খেতে এসেছে। মানহা খাচ্ছে কম প্লেটে আঁকা উকি করছে বেশি। ইহাব সবটাই লক্ষ্য করলো তবে পিতামাতার সামনে কিছুই বললো না। খাওয়া শেষে ইহাব রুমে চলে গেলো। মানহা খানিক পর এলো। ইহাব ডাকলে এখন আর মানহা আগের মতো প্যানিক অ্যাটাক করে না। তবে সুস্থ মানুষের আচরণও করেনা। অস্বাভাবিক একটা ভাব আছে তার এখনো। ইহাব ভ্রু কুঁচকে কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করে ডাকলো,

“মানহা এদিকে এসো।”

মানহা রোবটের মতো এগিয়ে গেলো। ইহাব পাশে বসালো। আগের মতো অস্বাভাবিক আচরণ করছে না সে। ইহাবের জহুরী চোখ অন্যকিছু দেখছে। সে হাত ধরলো। হাতের ভাঁজে হাত নিলো। মানহা স্বাভাবিক যেন এরকম কিছুই ঘটবে সেটা সে অবগত। ইহাব আরেকটু সাহস করে পিঠে হাত দিলো। মানহা কোনো আপত্তি জানালো না। একদম শক্ত হয়ে বসে আছে যেন আশেপাশে কিছুই ঘটছে না। ইহাব ডাকলো,

“মানহা?”

“হু।”

মানহার অবচেতনে উত্তর। ইহাব মানহার হাত ছেড়ে ফোন হাতে নিয়ে বারান্দায় চলে গেলো। একটা নাম্বার ডায়াল করলো। খানিক বাদে রিসিভ করলে ইহাব বললো,

“ম্যাম কোনো ডেভেলপমেন্ট হচ্ছে?”

অপরপাশ থেকে সাইকিয়াট্রিস্ট ডা. নাজনীন আনোয়ারা বললেন,

“হচ্ছে। তবে আমি চাইবো তুমি তাকে এই সময়টাতে সাপোর্ট দাও। তার মধ্যে ভীতি আছে। তুমি আমার পরিচিত যে সেটা তাকে না জানিয়ে ভালোই করেছো নাহলে মেয়েটা আমাকে সবকিছু খুলে বলতো না। শোনো আজকে অনেককিছুই জানতে পেরেছি। ওর অতীতে বাজে কিছু স্মৃতি আছে। খুব ছোটবেলায় ও বাজে রকমের যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে ওর এক প্রতিবেশীর দ্বারা। এটা তার মস্তিষ্ককে এখনো তীব্রভাবে গেঁথে আছে। ওই ট্রমা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি সে। তাই বিবাহ ভীতি কিংবা স্বামীর সাথে মেলামেশা তার মধ্যে ভীতির সৃষ্টি করে সবসময়। এজন্য তোমার সাথে থাকলেই ওর প্যানিক অ্যাটাক হয় মাত্রাতিরিক্ত। ওকে স্বাভাবিক অবস্থায় আনতে তোমার সাপোর্ট খুবই জরুরি।”

ইহাব এতক্ষণ মনোযোগ দিয়ে শুনছিল ডাক্তারের কথা। তার বুকটা ভার ভার লাগছে। আরও টুকটাক কথা বলে রুমে এসে দেখলো মানহা আগের মতোই বসে আছে। আগের মানহা হলে ঘুমিয়ে পড়তো তবে এখন সে হয়তোবা ইহাবের জন্য জেগে আছে। ইহাব বারান্দা থেকে মানহাকে দেখতে লাগলো। মেয়েটা এতোবড় ঘটনা কাউকে জানানোর প্রয়োজনবোধ করেনি? তাকে একবার জানিয়ে দেখতো বোকা মেয়েটা? নিজের মধ্যে এই ট্রমা আর কতবছর বয়ে বেড়াতে চেয়েছিল সে? ইহাব মানহার পাশে দাঁড়িয়ে বললো,

“মানহা দাড়াও তো?”

মানহা উচ্চবাচ্য না করে স্বাভাবিক ভাবেই দাঁড়ালো। ইহাব হাত দুদিকে ছড়িয়ে বললো,

“আমাকে জড়িয়ে ধরো।”

মানহা জড়িয়ে ধরলো না। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো। ইহাব নিজ থেকেই ধরলো। মানহা কাঁপলো কিছুক্ষণ। তবে প্রতিক্রিয়া জানালো না আগের মতো। শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। চোখ বন্ধ করলেই কিছু বিশ্রী স্মৃতি ভেসে উঠতে লাগলো চোখের সামনে। মানহা ইহাবের বন্ধন থেকে ছুটতে চাইলো। ইহাব ছাড়লো না। মানহা ভুলতে চায় অতীত। ইহাব কি পারবে তার অতীত ভুলিয়ে এই মানসিক ট্রমা থেকে বের করতে?



অফিসরুমে তর্কাতর্কি হচ্ছে। একটা ফাইল পাওয়া যাচ্ছে না। এ ওর ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে দিচ্ছে। কারণ ফাইলটা গুরুত্বপূর্ণ। হেড জানলে চাকরি নিয়ে টানাটানি না পড়ে যায় আবার। জিনানের এদিকে মনোযোগ নেই। সে আয়েশ করে নুডুলস খাচ্ছে। নেওয়াজ খানিক চিল্লাচিল্লি করে এসে পাশের চেয়ারে বসলো।

“আপনি অলওয়েজ এমন শান্ত থাকেন কিভাবে আদহাম সাহেব? সবাই ফাইল খুঁজে হয়রান আর আপনি এদিকে নিশ্চিন্ত মনে মজা করে খাচ্ছেন।”

“তো কি করবো?”

“কি করবেন মানে? অন্তত চিন্তিত তো হতেই পারেন?”

নুডুলস শেষ করে জিনান মুখ মুছলো। তারপর বললো,

“এতগুলো মানুষ চিন্তিত হয়েছে তাতে কি কম পড়েছে বস? আমার চিন্তার কি দরকার? আমি চিন্তা করলে কি ফাইল ফুড়ুৎ করে হাতের মুঠোয় চলে আসবে?”

নেওয়াজ চুপ করে গেলো। ঠিকই তো বলেছে চিন্তা করলে তো ফাইল পাওয়া যাবে না। জিনান আদহাম ল্যাপটপের স্ক্রিন নেওয়াজের দিকে ঘুরিয়ে বললো,

“আজারাক সাইফার অ্যান্ড মার্ভ জেন।”

নেওয়াজ ভ্রু উঁচিয়ে বললো,

“ওনারা দুজনই তো বয়স্ক মনে হচ্ছে। আমি তো ভেবেছিলাম ইয়াং কেউ হবে।”

জিনান চেয়ারে শরীর এলিয়ে বললো,

“আমি অবশ্য ধারণা করেছিলাম ইয়াং কেউ হবে না। ধারণা মিলে গেছে।”

“ওনারা কি শীগ্রই জয়েন হচ্ছেন নাকি? হেডের পক্ষ থেকে নোটিশ এসেছে?”

জিনান তীক্ষ্ণ নজরে পেপারওয়েট ঘুরাতে ঘুরাতে বললো,

“হুম।”


নিশাত স্কুল থেকে বাসায় এসে দরজা নক করতে গেলে দেখলো দরজা খোলা। অবাক হলো বেশ। এরকম দরজা খুলে তো কখনো রাখে না লোকটা তাহলে আজ এমন খোলা কেন? সে কাঁধের ব্যাগ চেপে দরজা খুলে ভিতরে প্রবেশ করলো। পুরো ঘর চুপচাপ। শুনশান নীরবতা বিরাজ করছে। নিশাতের মনে কু ডাকছে। ধীরে ধীরে তাদের বেড রুমে প্রবেশ করে ঝটকা খেলো যেন। চেয়ারের উপর রাজকীয় ভঙ্গিতে বসে আছে কেউ একজন। পুরো শরীর কালো কাপড়ে আবৃত। সামনে মারওয়ানকে হাঁটু গেড়ে বসিয়ে রাখা হয়েছে। তাকে পিছন দিক দিয়ে ধরে আছে তিনজন লোক। মুখ থেকে অনবরত রক্ত ঝরছে মারওয়ানের। বোঝাই যাচ্ছে মারা হয়েছে তাকে। নিশাতের হাত থেকে ব্যাগ পড়ে গেলো। সে জোরে চিৎকার দিয়ে উঠলো।

“আপনারা কারা? এখানে কিভাবে ঢুকলেন?”

কালো কাপড়ে আবৃত লোকটি নিশাতের দিকে চাইলো। পিছনে দাঁড়ানো বর্ডিগার্ডটা লোকটার কানে কানে কিছু বললো। লোকটা বোরকা পরিহিত নিশাতের উপর থেকে নিচ পর্যন্ত স্ক্যান করলো। তারপর জিহ্বা বের করে মারওয়ানের দিকে দৃষ্টি ফেলে বললো,

“কিরে ঘরে এত সুন্দরী বউ লুকিয়ে রেখেছিস অথচ আমাদের জানতেও দিলি না। অনেক চালাক তো তুই?”

মারওয়ান চোখ উঠিয়ে চাইলো। রক্তলাল চোখ। সামনের লোকটি তার লোকদের ইশারা দেয়া মাত্র লোকগুলো মারওয়ানকে আবারও মারতে লাগলো। নিশাত দৌঁড়ে মারওয়ানের কাছে যেতে চাইলে বসা লোকটি তার হাত ধরে ফেললো। নিশাতের গা ঘিনঘিন করে উঠলো। একজন পর পুরুষ তার হাত ধরেছে ভাবতেই গা গুলিয়ে উঠলো। মারওয়ান মার খেতে খেতেই তা দেখছে। গর্জে উঠে বললো,

“ওকে ছাড় নয়তো জ*বাই করে ফেলবো তোদের। তোর সমস্যা আমার সাথে আমার স্ত্রীর দিকে হাত বাড়াচ্ছিস কেন?”

কালো কাপড়ে আবৃত লোকটি অট্টহাসিতে মেতে উঠলো।

“তোর বউ তো জানি। একদিনের জন্য নাহয় আমার হলো। সমস্যা কি? তোর সামনে আজকে তোর বউয়ের সাথে একটু মাস্তি করবো..”

কথা শেষ করতে পারলো না মারওয়ান সবাইকে ছাড়িয়ে লোকটার গলা টিপে ধরলো।

“কু**বাচ্চা তোকে আজকে শেষ করে দেবো। ওই জবান দিয়ে আমার স্ত্রীকে নিয়ে আরেকটা বাজে কথা বললে তোর জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলবো জারজের বাচ্চা।”

পিছন থেকে মাথায় আঘাত লাগায় মারওয়ান ছেড়ে দিলো লোকটাকে। লোকটা মারওয়ানের মুখে জোরে জোরে আঘাত করতে লাগলো। মারওয়ান খুব কষ্টে বললো,

“নিশাত পাশের রুমে ছেলেকে আটকে রেখেছি দয়া করে ওকে নিয়ে এখান থেকে চলে যাও।”

নিশাত কাঁদতে কাঁদতে বললো,

“আপনাকে ছেড়ে যাবো না।”

মারওয়ান প্রতিরোধ করতে করতে বললো,

“আরে আমার চিন্তা না করে নিজের চিন্তা করো। আল্লাহর কসম তুমি এখান থেকে যাও। এখানে থাকলে তোমার শরীরে হাত দেবে ওরা যা আমি সহ্য করতে পারবো না।”

মারওয়ান একা ওদের সাথে লড়তে পারছে না। নিশাত কাঁদতে কাঁদতে পাশের রুমে চলে গেলো। পিছন পিছন লোকগুলো যেতে চাইলে মারওয়ান আটকে ধরলো। রক্তে তার শার্ট রঞ্জিত। কপাল চুয়ে চুয়ে রক্ত গড়াচ্ছে। ঠোঁট ফেটে চৌচির। কালো কাপড়ে আবৃত লোকটি ইচ্ছেমত মারতে লাগলো মারওয়ানকে। মারওয়ান লোকগুলোকে ছাড়ছে না তবুও। নিশাত ছেলেকে কোলে নিয়ে নিজেদের রুমের দিকে চাইলো। দেখলো মারওয়ানের রক্তে রুম ভেসে যাচ্ছে। নিশাত ডুকরে কেঁদে উঠলো। নাহওয়ান বাবার দিকে হাত বাড়িয়ে কেঁদে উঠে ডাকলো,

“বাবা।”

মারওয়ান ছেলের ডাকে সেদিকে চাইলো। রক্তাক্ত চেহারায় বিষাদমাখা এক হাসি ফেরত দিয়ে বললো,

“যাও তোমরা। বাবা তোমাকে রক্ষা করছি পান্ডা।”

নিশাত ছেলেকে নিয়ে খালি পায়ে দ্রুত বাসা থেকে বেরিয়ে গেলো। পিছন পিছন লোকগুলো তাদের ধরতে চাইলে মারওয়ান নিজের শেষটুকু দিয়ে লড়াই করে গেলো। বেশ খানিক ধস্তাধস্তির পর বাসা শান্ত হয়ে গেল। মেঝের উপর নিঃশ্বাস বিহীন রক্তাক্ত মারওয়ান পড়ে রইলো একভাবে। হয়তোবা শ্বাসের স্পন্দন চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে। কালো কাপড়ে আবৃত লোকটি মারওয়ানের সামনে হাঁটু ভাঁজ করে বললো,

“তোর স্ত্রী, সন্তানকে নাহয় আজকে বাঁচিয়ে গেলি তবে আমার নাগাল থেকে এরপর বাঁচাবে কে?”

বলেই ভয়ংকর অট্টহাসিতে কেঁপে উঠলো ছোট্ট ফ্লাটটি।

চলবে….

(আসসালামু আলাইকুম।)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply